অদ্ভুত ইঙ্গিত আসে ঈশ্বর থেকে : শামীম আহমেদ

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

সুবর্ণচরের কৃষক মতি মিয়াকে চেনেন? মতি মিয়ার জীবনে কী আছে আর কী নেই তা কেউ জানে না। মতি মিয়া নিজেও বুঝে ওঠে না সে কী চায় কিংবা কী চায় না! মানব সৃষ্টির রহস্য তাকে ভাবায় না; কিন্তু অলৌকিকভাবে শিক্ষিত হয়ে ওঠা মতি মিয়া দুনিয়াদারির খবর রাখেন। কোনো কোনো অমাবস্যার রাতে তার মনে হয় দুনিয়ার তাবৎ রহস্যের সমাধান বোধহয় আছে এই সুবর্ণচরের নারিকেল বাগানের পেছনে, যেখানে বালিয়াড়ি মেশে বঙ্গোপসাগরের মোহনায় আর অন্ধকার রাতেও আকাশে ফুটে থাকে কোটি তারার মেলা!

সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির পর প্রতি সন্ধ্যায় মতি মিয়া গোসল করে বাড়ির পাশের বাঁধানো পুকুরটার ঠাণ্ডা পানিতে। তারপর ভাত খায়। ভাত খায় না বলে বলা ভালো ভাত গেলে। ভাতের সাথে একেকদিন একেক সালুন। তার বউ মাশাআল্লাহ রান্না ভালো করে। কচুঘেচু যাই রান্না করে খেতে বড় ভালো লাগে মতি মিয়ার। খেয়েদেয়ে বাড়ির কাছের চায়ের দোকানে বসে মতি মিয়া পান খায়, গান গায়, আকাশের তারা গোনে। চায়ের দোকানটা চালায় পচু মিয়া। পচু মিয়া এই দোকান কয়দিন ধরে চালায় কেউ বলতে পারে না। মনে হয় বুঝি শতাব্দী ধরে। মতি মিয়া যখন মাদ্রাসায় পড়ত, তখনও পচু মিয়া এই দোকান চালাত। তার অবয়বে তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি সময়ের বিবর্তনে! আগে মতি মিয়া পচু মিয়াকে কী বলে ডাকত তা এখন আর তার মনে না পড়লেও, নাম ধরে যে ডাকত না তা নিশ্চিত। মতি মিয়ার ইদানীং বেশ নাম-ডাক-বিত্ত- বৈভব হয়েছে। না পারতে কাউকে মতি মিয়া খুব একটা বেশি সম্মান দিয়ে কথা বলে না। অর্থে, প্রভাব-প্রতিপত্তিতে যারা খানিকটা নিচে অবস্থান করে তাদের বরঞ্চ নাম ধরে ডাকতেই তার স্বাচ্ছন্দ্য।

কোনো কোনো দিন সমস্ত দিনের শেষে, কাজের পরে শরীরে জোর থাকলে বাড়ি ফিরে বউটাকে কাছে টানে মতি মিয়া, আদর সোহাগ করে, রাতের নিরিবিলিতে সেই আদরের শব্দ শোনা যায় সুবর্ণচরের অন্যপ্রান্ত থেকেও। বউয়ের সাথে ভালোবাসা করুক কিংবা নাই করুক, অলৌকিক জ্ঞানপ্রাপ্ত মতি মিয়া রাত করে চরের এক কোনায় গিয়ে একাকী বসে থাকে মাঝে মাঝে। রাতের আঁধার মাঝেও যে আলো, নারকেল গাছের পাতায় পাতায় রাতের বাতাসে ঘষা খেয়ে যে দীর্ঘশ্বাসের শব্দ আসে, তার মধ্যে সে শোনে ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা।

সুবর্ণচরের এক কৃষক যে কিনা দু’বেলা চাষ দেয় জমিতে আর মানুষে; তার আধ্যাত্মিকতা ভাবিয়ে তোলে বঙ্গোপসাগরের নোনা জলকে, বাদাম খেতের বড় বড় দানার বালিকণাকে আর ভাবায় নারকেল বাগানের ভেতরে লুকিয়ে থাকা না দেখা এক অদৃশ্য শক্তিকে, যার দায়িত্ব সুবর্ণচরের মানুষের ভূত-ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা।

আজ অন্য দু-দশদিনের চাইতে ভিন্ন কিছু ঘটেনি এই চরের মানুষের জীবনে। প্রতি ভোরের মতোই বিধবা রোজিনা বিনা কারণেই বলা চলে বেদম পেটায় তার দুই পুত্র সন্তানকে! দুপুরবেলা জমিতে চাষ দিয়ে ক্লান্ত কৃষকরা কোনোমতে হাতটা ধুয়ে বসে পড়ে বাড়ি থেকে আসা খাবারের ঝোলা নিয়ে। গরম গরম ভাত, ডাল আর সাথে অন্য কোনো তরকারি। কারও পাতে শাক-ডালের চচ্চড়ি তো কারও পাতে আলু-বেগুন ভর্তা। পরিশ্রমী কৃষকরা গোগ্রাসে ভাত গিলতে থাকে। প্রথম এক গামলা ভাত তারা মেরে দেয় শুধু এক হাতা ডাল, আর শুকনো মরিচ দিয়ে। তারপর আর যা কিছু থাকে, ঝাঁপিয়ে পড়ে তার ওপরে। খাবার শেষে তাদের পাতের দিকে তাকালে মনে হয় ঈশ্বর বোধহয় আজ বেজায় ক্ষ্যাপা ছিল সুবর্ণচরের ওপর। পাতটাকে মনে হয় একটা দ্বীপ আর সেই দ্বীপের সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে কোনো এক চিরসত্য বেমালুম চেপে দাম্ভিক দেবতা যেন গেছে কোনো এক নির্জন অভিসারে!

খাবারের থালা সামলে পাশের আলটাতে বসে খানিকটা জিরিয়ে নেয় কৃষকের দল। খাবারের এঁটোসেঁটো নিয়ে ঘরে ফেরে বাচ্চা মেয়েরা। তাদের বাদামি বর্ণের ঝলসানো শরীর চিক চিক করতে থাকে দুপুরের প্রখর রোদ্দুরে, বাদামি থেকে কালো বর্ণ ধারণ করে, দেখে মনে হয় আকাশে মেঘ জমেছে ঘন, তার মাঝে বজ্রপাতের মতো ক্ষণে ক্ষণে হেসে ওঠে কিশোরীর দল, তাদের মনে কী চলে কে জানে! সন্ধ্যা হলে যে দু’একটা চায়ের দোকান আছে, সেখানে বাতি জ্বলে, আগুন জ্বলে। উনুনের ধারে জড়ো হয় চরের মানুষেরা। এখানে নারী-পুরুষ-শিশুর বিরোধ নেই, সবাই এক হয়ে বসে। কেউ গান ধরে, কেউ বা ঘুড়ি ওড়ায়, নারকেলের মৃতদেহ নিয়ে ফুটবল খেলায়ও মেতে ওঠে কিছু শিশু-যুবা-বৃদ্ধ!

সুবর্ণচরের চাষি আমাদের বিখ্যাত মতি মিয়ার মন আজ ভালো না। আকাশে ব্যাপক মেঘ করেছে, বাতাসও দিয়েছে অস্থির রকমের, ঝড় নামবে সে বিষয়ে কারও মনে কোনো সন্দেহ নেই। ঝড় নামলেও কী না নামলেও কী! মতি মিয়ার তাতে কিছু যায় আসে না। এই আজিব চরেও তার পাকা বাড়ি, দু’টো আলকাতরা ডলা নৌকা আর আছে বাদাম, তরমুজের বেশুমার ক্ষেত। বালু বিক্রির ব্যবসায়ও আজকাল হাত পাকাচ্ছেন, লাভের মুখ দেখছেন মতি মিয়া, সেটা তার ঘরবাড়ি দেখলেই বেশ বোঝা যায়।

টাকাপয়সা নিয়ে মতি মিয়া চিন্তা করা ছেড়ে দিয়েছেন সেই কবেই! কী এক খানদানি রোগ যে হয়েছে তার! মতি মিয়ার খালি দেশ নিয়ে চিন্তা হয়। বিদেশ নিয়েও চিন্তা হয়। আর চিন্তা হয় ঝাউবাগানের পিছের থেকে রাত্রের বেলা উড়ে উড়ে যেই পরী আসে তার কাছে, তাকে নিয়ে!

এই সুবর্ণচরে জিন-পরী থাকবে এই নিয়ে অনেকের মনে সন্দেহ থাকলেও মতি মিয়ার নেই। এই বিষয়ে পরিষ্কার দিকনির্দেশনা আছে, মাঝে মাঝেই এশার নামাজ শেষে আনসার হুজুর তাকে এই ব্যাপারে বয়ান দেন। তবে আজকাল লোকজন ধর্ম-কর্ম কম করে, জিন-পরীতেও তাদের বিশ্বাস নষ্ট হয়ে গেছে! এইজন্যই মতি মিয়া স্কুল-কলেজের বিপক্ষে, দেশে এত স্কুল-কলেজের দরকার কী? বেশি বেশি মাদ্রাসা দিলে মানুষের মনের ক্বালবটা শক্ত হতো, ইবাদত বন্দেগি আর ব্যবসাপাতিতেও লাভের মুখ দেখতো এই বেকুব সুবর্ণচরবাসী। কিন্তু কে শোনে কার কথা!

এখানকার বেকুব লোকজন এখন রেডিও শোনে, টিভি দেখে। টিভি ভরা ইহুদি-নাসারাদের অনুষ্ঠান। এদের ওপর খাস শয়তানের আছর আছে। এরা কথা বলে মনোহর করে, শুনতে ভালো লাগে, নেশার মতো হয়, দিলে অবিশ্বাস জন্মে। মতি মিয়া ঘরের পাশে একদলা থু-থু ফেলেন। বাতাসের দমকে থু-থুর খানিকটা তার নিজের পায়েই এসে পড়ে। মতি মিয়া মেজাজ খিচরে একটা অশ্লীল গালি দেন। তারপর হাঁটা ধরেন পুকুরের দিকে। একবারে হাত-পা ধুয়ে অজু করে এসে এশার নামাজটা পড়ে শুতে যাবেন।

পুকুরের পাশ দিয়ে যাবার সময় কয়েক বাড়ি পরেই আক্কাস মিয়ার বাড়ি। তার বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, মেঝ মেয়েরও বিয়ের বয়স যায় যায় প্রায়। এই রাতেরর বেলাও এই মেয়েকে দূর থেকে দেখা যায় কার সাথে যেন হেসে হেসে কথা বলছে। মেয়ের চরিত্র ভালো না। মাথায় কাপড় তো দূরে থাক, মেয়েটা বুকে ওড়নাও রাখতে চায় না। হাঁটতে হাঁটতে মতি মিয়ার খালি মেয়েটার বুকের দিকে চোখ যায়। তার কেবল সেই পরীর কথা মনে হয়। বড্ড অস্বস্তি হয় মতি মিয়ার। বুকটা খাঁ খাঁ করে।

এই পরী, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে অবগত শুধু মতি মিয়াই, সেই পরীই তাকে প্রথম খবর দিয়েছিল যে আকাশ থেকে একটা বিশাল পাখি এই চরের পাশ দিয়ে যেয়ে নিকটবর্তী একটা দ্বীপে নেমেছে। জিন-পরীদের নিকটবর্তী স্থান মানেও সে প্রায় শত মাইল দূরের বিষয়। রাতের বেলা যখন এই পরীর সাথে মতি মিয়া প্রেম ভালোবাসা করে, তখন চারদিক থাকে সুনসান। তাদের এই চরটার অবস্থান এমন এক জায়গায় যে এখানকার আকাশ দিয়ে কখনও কোনো উড়োডিঙ্গি যেতে দেখা যায় না। চলাচল করে শুধু ঐশ্বরিক ক্ষমতা প্রাপ্ত সৃষ্টির সেইসব প্রাণের যাদের এড়িয়ে চলে মানুষেরা। পরী তার বুক থেকে মতি মিয়ার মুখ সরিয়ে এক লহমায় যেয়ে ঘটনা দেখে আসে। মতি মিয়া বোঝে বিশাল পাখি বলতে পরী তাকে উড়োডিঙ্গি-ই বোঝায়। পরীর কাছ থেকে মতি মিয়া আরও জানতে পারে যেই দ্বীপে নেমেছে উড়োডিঙ্গি, সেই দ্বীপের দখল আবার আল্লাহ-রাসুলের শত্রু ইহুদি-নাসারাদের!

পুকুরের পাড়ে বসে মতি মিয়া অজু করে। করতে করতে মনে পড়ে এই পরী কী ভয়ঙ্করভাবেই না তাকে ভালোবাসে। এই শুক্কুরবারে তার আসার কথা আছে। ভাবতেই মতি মিয়া এক ধরনের পুলক অনুভব করে। শিরদাঁড়া দিয়ে এক অদ্ভুত শিহরণ বয়ে যায় তার। আক্কাস মিয়ার মেঝ মেয়ের বুকের কথা ভাবতে ভাবতে তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলেন আর বোঝেন অজুতে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছেন শয়তানের কারসাজিতে।

আস্তাগফিরুল্লাহ বলে আবার শুরু থেকে অজু শুরু করে সুবর্ণ চরের ধনী চাষি মতি মিয়া। ভাবে জীবনের সবকিছুই যদি এভাবে বারে বারে নতুন করে শুরু করা যেত তাহলে কতই না ভালো হতো। তবে তার সব চাওয়া যে সত্য হবে না এটাও বুঝতে বাকি থাকে না তার। সন্তুষ্ট থাক, নিজেকেই নিজে বুঝ দেন। আল্লাহর রহমতে তার অনেক কিছুই আছে। ধন-সম্পদ, পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব। অথচ ছোটবেলায় কী ভয়ঙ্কর জীবনটাই না কাটিয়েছেন মতি মিয়া। তার বাবা ছিলেন খুচরা ব্যবসায়ী, সবজি বিক্রেতা। মঙ্গার মওসুমে শহরে যেয়ে ভ্যান চালাতো, অন্যের ক্ষেতে মজুর দিত। তাদের সময় মঙ্গা নিয়ে মানুষের চিন্তার শেষ ছিল না। ভরা মওসুমে মানুষ খেয়ে পড়ে চলতে পারত, কিন্তু মরা মওসুমে হাহাকার, নির্যাতন। জমির ওপর, মানুষের ওপর। সেইসব দিনের কথা মনে পড়লে মতি মিয়ার পশম খাড়া হয়ে যায়। তিনি ভুলেও সেইসব দিনের কথা ভাবতে না চাইলেও ঘুরে ফিরে বারবার সেইসব দিনে ফিরে যায় তার অবচেতন মন।

দুই.

মতি মিয়ার মা তখন অন্যের বাড়িতে কাজ করত। ধান মাড়াই, ঘরের কাজ, রান্নাবান্না। মতি মিয়াকেও মাঝে মাঝেই তার মায়ের সাথে যেতে হতো সেই বাড়ি। বাড়ির মালিকের বয়স ছিল ষাটের ওপর। শক্তপোক্ত মানুষ। তার মুখের জবান ছিল মাখনের মতো মোলায়েম। নজর ছিল শকুনের চাইতেও প্রখর। সবকিছু এখন আর পরিষ্কার মনে পড়ে না মতি মিয়ার। তার মনে পড়ে প্রতি সন্ধ্যায় মাগরেবের আজান পড়লে ঘরের সব কাজ শেষ করে হারিকেন জ্বালিয়ে, ধুপের ধোঁয়ায় বাড়ি পবিত্র করে, একটা গামলা ভর্তি ভাত আর তরকারি নিয়ে তার মা বাড়ি ফিরত। একহাতে গামলা ভর্তি ভাত; অন্য হাতে মতি মিয়া। গরম ভাতে গন্ধ থাকে অন্যরকম, নেশা নেশা। মাঝে মাঝে মায়ের বের হতে দেরি হয়ে যেত বেশ। বাড়ির মালিকের ঘরে গেলে জানালার কবাট বন্ধ হয়ে আসত। দরজাও আস্তে করে লাগিয়ে দিতেন মুরব্বি। দরজার লাগানোর আগে মতি মিয়াকেও মাঝে মাঝে কাছে ডাকতেন।

‘মতি রে, ও মতি, এদিক আয়।’

‘ক্যা?’

‘আরে আয় না মাতারির পুত, ব্যাটাছেলের আবার ডর কীয়ের!’

মতি মিয়ার ডর করত না, তবে ঘেন্না করত। কেন করত কে জানে!

মুরব্বি অবশ্য কাছে গেলে তার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করত, পয়সা দিত।

‘এইটা নে, ধর। লজেন্স খাইস।’

মতি মিয়া তাকিয়ে দেখতেন একটা আধুলি। মনটা ভরতে গিয়েও ভরত না তার। চোখে পড়ত ঘরের ভেতর, সেখানে তার মা শাড়ি খোলে আস্তে আস্তে, আঁচলটা খসে পড়ে তার বুকের জমিন ঘেঁষে। মুরব্বিরও সেদিকে চোখ গেলে তাড়াতাড়ি মতি মিয়াকে ছেড়ে ঘরে ঢুকে যেত সে।

মতি মিয়াকে কেউ কিছু বলত না, কিন্তু সে বুঝত ভেতরে নিষিদ্ধ কিছু হয়। সেখানে মতি মিয়ার যাওয়া বারণ। আধঘণ্টা পর, কোনো কোনো দিন তারও আগে, কিংবা পরে মতি মিয়ার মা বের হয়ে আসতেন ওই ঘর থেকে। মতি মিয়ার সব পরিষ্কার মনে আছে। মাঝে মাঝে মাকে খুব ক্লান্ত দেখাতো, মাঝে মাঝে খুশি। মতি মিয়া তখনও বুঝতেন না, কোনটার কারণ কী!

সুবর্ণচরের নারকেল বাগানের ভেতর যে পরীর আবির্ভাব হয়, তাকে এইসব কথা খুলে বলে মতি মিয়া।

‘মাকে বড্ড ঘেন্না হইত বুঝলা পরীবিবি? মানে যখন এলেম হইল, বুঝলাম তারা কী করত।’

‘হুম।’

‘বড্ড ঘেন্না হইত। মনে হইত মা নিজের জন্যই সব করছে। তার শরীরের ক্ষুধা মিটাইছে। ট্যাকাও কামাইছে। বড় হইতে হইতে সেই ঘেন্না আর থাকে নাই। মনে হইছে, মায়েরও কী করার ছিল! বাপ নাই, সংসার চালাইতো ক্যামনে, আমারেও বা খাওয়াইতো কী যদি ওই বদ মুরব্বির লগে শুইতে না যাইত! তয় আবার রাগও হয়, মাঝে মাঝে মনে হয় মা মনের ইচ্ছায় যাইত। আমার মা সুন্দর আছিল। তার শরীরেও নিশ্চয় ক্ষুধা আছিল, সেই ক্ষুধা মিটাইতেই হয়ত যাইত।’

পরীবিবি এই কথার উত্তর আর দেয় না। তবু পরীবিবিকে বড় ভালো লাগে মতি মিয়ার। পরীবিবি তার পরিবারের বিষয়-আশয়ে তেমন নাক গলায় না, কথাও বলে না! মতি মিয়া তার কাছে সব খুলে বলে। মতি মিয়া তার সবচেয়ে প্রিয় আর পুরনো বন্ধুকে পরী মিয়ার কথা খুলে বলেছিল একবার। কিন্তু সে ব্যাপারটাকে তেমন আমলে নেয় নাই! বলে মতি মিয়ার ছোটবেলার পাপবোধের দায় নিতেই পরীবিবির উত্থান! মতি মিয়ার মেজাজ খারাপ হয় এ কথা শুনে, সে আর কারও কাছে তাই পরীবিবির কথা বলে নাই কখনো।

অথচ মতি মিয়া জানে পরীবিবি কি ভয়ঙ্কর সত্য। তার পেখমের মতো পাতলা, নরম চুলে তো আর কেউ হাত বোলায় নাই। নারিকেল বাগানের ভেতর একটা গোপন ঘর, সেখানে তারা দুইজনে ভাব-ভালোবাসা করে। পরীবিবির শরীরে অদ্ভুত ঘ্রাণ। পুরনো চালের মধ্যে জাফরান আর দুধ মিশিয়ে পায়েস রাঁধলে যেমন গন্ধ হয় ঠিক তেমনটা! তার চিবুকের ঠিক নিচ থেকে বাম স্তনের ওপর পর্যন্ত তীর্যকভাবে বাস করে তিন তিন-খান তিল। তিলগুলান বড্ড ভালো লাগে মতি মিয়ার। সুখ-দুঃখের গল্প করতে করতে ওগুলাতে হাত বোলান তিনি। পরীবিবিও মাঝে মাঝে অনেক গল্প করে তার সাথে। এমন একদিনেই তাদের মাথার ওপর দিয়ে একটা ভয়ঙ্কর বিশাল উড়োডিঙ্গি উড়ে যায় খুব নিচ দিয়ে, পরীবিবি বলে বিশাল পাখি! মতি মিয়া ভেবেছিল ওইটা তার স্বপ্নে কিংবা দুঃস্বপ্নে দেখা; না হলে এই মরার দ্বীপের ওপর উড়োডিঙ্গি আসবে কোথা থেকে। সেই ৮৮’র বন্যাতে একটা হেলিকপ্টারে কিছু রিলিফ এসেছিল, তারপর এই দ্বীপে আর কখনও নৌকা-ট্রলার ছাড়া কিছু আসে নাই। পরীবিবি তাকে বলে এই উড়োডিঙ্গি করেই এই সুবর্ণ চরে নেমে আসবে অভিশাপের কাল। ইহুদি-নাসারাদের উত্থানের কারণেই সুবর্ণচরের অবিশ্বাসী মানুষদের শিক্ষা দিতে আসে এই ইঙ্গিত, মতি মিয়া ধরতে পারে। শুধু সুবর্ণচর না, এমন সব জায়গায় আস্তে আস্তে অভিশাপের নাও নামবে, যুগে যুগে তাই হয়ে আসছে এই পৃথিবীতে। এইসব কথা শুনে বড় ভয় লাগে মতি মিয়ার। পরীবিবির আরও কাছাকাছি চলে আসে মতি মিয়া, তিল থেকে সরে এসে ঠোঁট লাগায় বুকের মধ্যেখানে।

তিন.

অজু নামাজ শেষে আঙুল গুনে মতি মিয়া হিসাব করে পরীবিবির আসার আর কয়দিন বাকি! অমাবস্যা কিংবা পূর্ণিমার রাতেই কেবল সে আসে। এরপরের পূর্ণিমার এখনও ঢের বাকি, এদিকে মতি মিয়ার শরীরটা কেমন ম্যাজ-ম্যাজ করে। কাকে যেন কাছে পেতে মন চায়। বারবার ঘুরে ফিরে আক্কাস মিয়ার মেয়েটার বুকের কথা মনে পড়ে। আক্কাস মিয়ার আর্থিক অবস্থাও ভালো না। মেয়েটাকে লেখাপড়া করাতে তার বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। আক্কাস মিয়ার বউ মানুষের বাসায় ঝি-গিরি করে দুই বেলা। নাহ, এই পরিবারের কষ্ট আর সহ্য হয় না তার। ভাবে মতি মিয়া, এবার একটু আগাতে হবে বিষয়টা নিয়ে। আক্কাসের বউকে তার বাসায় কাজ করতে বলা যায়। বেলা শেষে নিশ্চয় মেয়েও আসবে সাথে। তখন কিছু একটা ভেবে বের করা যাবে। ভাবতে ভাবতে ভালো লাগে মতি মিয়ার। শীত শীত সন্ধ্যায় জীবনটাকে স্বপ্নীল মনে হয়। আক্কাস মিয়ার বাড়ির দিকে হাঁটা ধরে মতি মিয়া।

চার.

নারকেল বাগানের ভেতর মতি মিয়া পরীবিবির সাথে বসে বসে ভাব-ভালোবাসা করে। কুটুর কুটুর কথাও বলে দুইজনে।

‘পরী, ও পরী’

‘কও’

‘দুইন্নার মধ্যে এত মানুষ থাকতে তুমি আমারেই কেন ভালোবাসলা?’

‘এইটা কী কও! তুমি ছাড়া আমারে আর কেডা মনে মনে ডাইক্যা এই নাইরকেল বনে আনছে, পিরিত করছে? তুমি না ডাকলে আমি শুধু মাইনশের মনের মধ্যেই থাকি আর দুষ্টু মাইনশে আমারে নিয়ে মনে মনে কত কিছু ভাবে, লুঙ্গি নষ্ট করে!’

‘এটা তুমি কী কও? তোমারে ডাকার কী আর মাইনশের অভাব হয়?’

‘হয় হয়!’

মতি মিয়া মুগ্ধ হয়ে পরীবিবিকে দেখে। তার কাছে পরীবিবির সবকিছুই ভালো লাগে। নাক-চোখ-মুখ। সবচেয়ে ভালো লাগে পরীবিবির বুক। ছোটকাল থেকে বড় বুক দেখলেই মাথা আউলা হতো মতি মিয়ার। সেইজন্যই বোধহয় তার কপালে পরীবিবি ছিল। খোদা যাকে দেন, আসলেই খুশি করে দেন পুরোপুরি।

মতি মিয়া এই ঘরটা বেঁধেছে একেবারে সমুদ্রতীর ঘেঁষে। পারতপক্ষে এদিকে কেউ আসে না। এমনিতেও এই জায়গাটা নিয়ে মানুষের মধ্যে নানান কথা প্রচলিত আছে। এই জায়গায় এনাদের-তেনাদের বাস বলে মানে এই এলাকার মানুষ। গত দুই যুগে কম করে হলেও পাঁচ-ছয়টা লাশ তো ভেসে এসেছে সমুদ্রের এই তীরটাতেই। লাশগুলা বাইরের কারও না, এই এলাকারই। আশ্চর্য হলেও সত্য সবগুলোই মেয়ে মানুষের লাশ। অল্পবয়স্ক মেয়েদের লাশ। কানাঘুষা আছে সবগুলা মেয়েকেই খুন করে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে, প্রত্যেকেই খুনের আগে ধর্ষিত হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কেউ কোনো কথা বলে না। এই বিষয়ে কথা বলে কেউ বিপদেও পড়তে চায় না।

লোকজন যত কানাঘুষাই করুক না কেন, মতি মিয়ার উদারতার কোনো শেষ নাই বলেই আপাতদৃষ্টিতে মনে হয়। সে আগ বাড়িয়ে মরা মেয়েগুলার বাপ-মাকে সাহায্য করে। কাজ দেয়, টাকা দেয়। এলাকার মেম্বার-মাতব্বররা তার প্রশংসা করে, জুম্মার নামাজে তার জন্য দোয়াও হয়। মতি মিয়া এইসব প্রচার পছন্দ করে না। লাজুক হেসে লোকজনকে বলে,

‘মাইনশের উপকার করাই আমার ধর্ম। ছোটকাল থেইক্কা কষ্ট করে বড় হইছি, বুঝলা না! বুঝি, মাইনশের কষ্ট, তোমগো কষ্ট আমি বুঝি। আমি করব, আমার ক্ষেমতায় যা আছে আমি করব তোমগো জন্য।’

মতি মিয়া মুখে একটা পান গুঁজে দেয়। আরাম করে পানটা চাবায়। একবার বাঁ-চোয়ালে তো আরেকবার ডান-চোয়ালে নিয়ে। মাঝে মাঝে চুন ঠেসে দেয় দাঁতের ফাঁকে। কথা বলার চেষ্টাও করে, তবে ঠোঁট গলিয়ে গড়িয়ে পড়ে পানের পিক। মতি মিয়া সময় নেয়। এলাকার গণ্যমান্য মানুষেরা তার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে, মতি মিয়া সবাইকে অপেক্ষায় রাখে। পানটা চিবিয়ে নেয় ধীরে-সুস্থে, আরাম করে খায়। পিচিক করে পিক ফেলে ডান দিকে ঘুরে, তারপর সাদা পাঞ্জাবির হাতা দিয়ে মুখ মোছে। সবার দিকে একবার তাকায়। সবার চোখ দিয়ে ঢুকে মগজের মধ্যে দিয়ে যেন ঘুরে আসে মতি মিয়া। আস্তে ধীরে মুখ খোলে।

‘তয় মিয়ারা একটা কথা কিন্তু আমার কওনের আছে।’

‘কী কথা?’

চেয়ারম্যানের চোখের দিকে তাকায় একটা হাসি দেয় মতি মিয়া।

‘কথাটা কব কিনা তা বুঝতে পারি না। তোমাদের এলাকার অনেক উন্নতি হইছে। মাইনশে আর আল্লাহ-খোদায় ডর করে না। নাটক-সিনেমা করে। যেসব মেয়ে স্কুলে যায় তাদের দিকে চোউখ তুলে তাকান যায় না। শরমের মাথা খাইছে সবতে মিল্লা।’

এতটুকু বলে থামে। পাবলিকের ভাও বোঝে।

‘তোমরা জানো আমার কিছু ক্ষমতা আছে। বহু বছরের সাধনায় আমি আধ্যাত্মিক কিছু ক্ষমতা অর্জন করছি। এলাকার মাইনশের ভালো-খারাপ বুঝবার জন্য তেনারা আমারে নানা বুদ্ধি পরামর্শ দেয়। এইটা তো তোমরা জানো, মানো না কি?’

মতি মিয়া সবার চোখের দিকে তাকায়। কারও মুখে কোনো কথা নাই। কেমন একটা ভয় ভয় ভাব, লোকজন তাকে আসলে ভয় পায়; শ্রদ্ধা করে না এটা জানে মতি মিয়া। তাতে তার কিছু যায় আসে না। শ্রদ্ধা কিনতে পাওয়া যায়, মতি মিয়া ছোটকালেই বুঝে গেছে মান-সম্মান নিয়ে অত কিছু চিন্তা করার নাই। পয়সা থাকলে মান-সম্মান পায়ের কাছে ঘোরে। মান-সম্মান যে তার পায়ের চপ্পলের কাছে শুয়ে আছে নিজের চোখেই তা সে দেখতে পায়। আস্তে আস্তে মান-সম্মানের মাথায় হাত বোলাতে থাকে মতি মিয়া আর বয়ান শুরু করে,

‘শোনো মিয়ারা, সামনে দুর্দিন আসতেছে। অভিশাপ লাগছে, অভিশাপ। শুনছ সেদিন রাতে আকাশ ভাইঙ্গা ঠাডার মতো শব্দ কইরা কী একখান উইড়া গেলো নারকেল বাগানের উপর দিয়া, শুনছ? দেখছ? কথা কও না কেন?’

মতি মিয়া খেয়াল করে, সবাই সভয়ে মাথা নাড়ে। মনে হয় যেন সবাই দেখেছে, কী দেখেছে যদিও কেউ তা নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারে না।

‘ওইটা ছিল অভিশাপের খেয়াযান, বুঝলা মিয়ারা? অভিশাপের খেয়াযান। সময় আসছে, আমাকে সতর্ক করা হইছে। আমি তোমাদের বললাম। সামনে খারাপ সময়। এইসব টিভি, রেডিও বন্ধ করতে হবে। মেয়ে মাইনশের পর্দা করতে হবে। মেয়ে মানুষ হইতেছে ভোগের জিনিস। ক্ষেত-খামারে যেমন বেড়া দিতে হয় গরু-ছাগলে যাতে চারা সবজিতে মুখ দিতে না পারে, তেমনেই মেয়ে মাইনশেরও থাকতে হয় বেড়ার মধ্যে, পর্দার মধ্যে। না হলে গজব নামবে, গজব।’

মতি মিয়া সামনে তাকায়। সবার চোয়াল শক্ত। সবাই মতি মিয়ার সাথে একমত। তারা থাকতে এই গ্রামে অভিশাপ আসা চলবে না। বন্যা-দুর্ভিক্ষ আসতে দেয়া চলবে না। বন্যা-দুর্ভিক্ষের কষ্ট তারা অনেক পেয়েছে আর না!

‘গত দুই যুগে আমরা আমগো গ্রামেই অনেক মেয়ে মাইনশের মৃত্যু দেখছি, তাদের লাশ খাইছে কুত্তা-শেয়ালে, ভাইসা গেছে সমুদ্রের জোয়ারে। এমনটা আর হইতে দেয়া যায় না। এলাকায় ঢাকঢোল বাজলে, রং-ঢং হইলে মিছিল, মুখোশের শোভাযাত্রা হইলে আবার এই ঘটনা হবে। ফসল হবে না, মহামারী হবে। আমি থাকতে এই ক্ষতি আমি হইতে দিবার পারি না। আমি জানি তোমরাও দিবা না।’

গ্রামের মানুষ দূরের আকাশে তাকায়। সেখানে কীসের যেন অশনি সংকেত। মেঘগুলোকে মনে হয় খানিকটা অপ্রকৃতস্থ, সমুদ্রের পানিও যেন ডাঙায় উঠতে চেয়ে উঠতে পারে না, নারকেল বাগানের দিক থেকে ভেসে আসে কার যেন কান্নার শব্দ। সুবর্ণচরের মানুষরা ভয় পায়। অদ্ভুত ইঙ্গিত যে আসে তাতে তাদের কোনো সন্দেহ থাকে না। গ্রামের মানুষ ঘরে ফেরে তাড়াতাড়ি। বাতি নেভে, আগুন নেভে, সাথে সাথে নিভতে থাকে ছেলেমেয়েদের চোখে ফুটে উঠতে থাকা জ্ঞানের আলো!

কীসের কী! আগে জান বাঁচানো ফরজ। এলেম শক্ত করতে হবে। তারপর অন্যসব!

পাঁচ.

আক্কাসের বউ ঘরের বাইরে অপেক্ষায় ছিল। তার একটু তন্দ্রা মতো হয়। সে দুঃস্বপ্ন দেখে, গ্রামে যেন এক ভয়ঙ্কর জন্তু হামলা করেছে। নারকেল বাগানের ভেতর থেকে বের হয়ে সেই জন্তু গ্রামের অল্প বয়স্ক মেয়েদের হামলে কামড়ে নিয়ে যায়। ছিঁড়ে-কুড়ে খায়। রক্তাক্ত লাশ পড়ে থাকে সমুদ্রের তীরে। আক্কাসের বউ লাশগুলো দূর থেকে দেখতে থাকে, একটা লাশ তার চেনা লাগে, মুখ চোখ যেন ঠিক তার মেয়ের মতো। কিন্তু মেয়েটার চোখ বের করে নেয়া, স্তন খুবলে ছিঁড়ে ফেলা! চিৎকার করে ওঠে আক্কাসের বউ, তার ঘুম ভেঙে যায়।

মতি মিয়া ঘরের দরজা খোলে। লুঙ্গির কোঁচা ঠিক করে নেয় আলতো করে। খালি গাটা ঘামে জবজব করে। মতি মিয়ার মুখে পরিতৃপ্তির হাসি। তার পেছন থেকে আক্কাসের মেয়ে বের হয়ে আসে মাথা নিচু করে, ওড়নাটা টেনেটুনে ঠিক করে বসায় বুকের ওপর। মতি মিয়া আক্কাসের বউয়ের হাতে হাজার টাকার একটা নোট গুঁজে দেয়। বলে, ‘মেয়েরে নিয়ে কাল আসিস কিন্তু আবার!’

‘কাইল-ই আবার? মিন মিন করে বলে আক্কাসের বউ!’

মতি মিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে অবশ্য কিছু বলে না। এক হাতে ভাতের গামলা আর অন্য হাতে মেয়েকে নিয়ে বাড়ির দিকে হাঁটা দেয়। দূরে আকাশে মেঘ করেছে। ঝড় আসবে। মেঘটার অবয়ব কেমন আজব ঠেকে আক্কাশের বউয়ের। মেয়ের দিকে তাকায়। চোখের পানি সরিয়ে মেয়েও তাকায় মায়ের দিকে। মেঘের আকৃতিটা ঠিক যেন তাদের ধান কাটার পুরনো নাড়ানিটার মতো।

মা-মেয়ে একজন আরেকজনের দিকে তাকায়, বোঝে, অদ্ভুত ইঙ্গিত আসে ঈশ্বর থেকে!

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj