ঘোমটা : মাসুম মাহমুদ

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

মুখের ওপর ঘোমটা দেখেই রুবীনাকে নাদের আলীর মনে ধরে। নাদের আলী জানে না ঘোমটার ভেতরে মেয়েটার মুখের কি রং, কেমন সে দেখতে? তবুও অদ্ভুত সুন্দর করে দেয়া ওই ঘোমটা ম্যাড়ম্যাড়ে নাদের আলীকে মুহ‚র্তের মধ্যেই চাঙ্গা করে তোলে। সে সিদ্ধান্ত নেয় রুবীনাকেই বিয়ে করবে। সিদ্ধান্ত নেয়ার পরক্ষণেই মন ছটফট করে তার, হবু বউয়ের মুখ দেখার ইচ্ছেটা একেবারে পঙ্খিরাজের মতো ওড়ে। তার একটু বাদেই চাচাতো ভাইয়ের বউ ছালমা ভাবীর মধ্যস্থতায় ঘোমটার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে রুবীনার মুখ। নাদের আলীর ইচ্ছে পূরণ হয়, সে হতভম্ব হয়ে যায়! মেয়েটাকে ছুঁয়ে দেখার সাধ বহু কষ্টে দমন করে নাদের আলী মনে মনে বলে, ‘মাশআল্লাহ।’ তার বুঝতে অসুবিধে হয় না সিদ্ধান্ত নিতে কতো পটু সে।

এর কিছুদিন পরেই রুবীনার সাথে নাদের আলীর বিয়ে হয়ে যায়। রুবীনাকে অনেক বেশি পছন্দ হওয়ায় মেয়ের বাড়ির কোনো আবদারই সে অপূর্ণ রাখেনি। মেয়ের বাবার বায়না ছিল পাক্কা এক ভরি স্বর্ণের, নাদের আলী দুই ভরি দেয়। বরযাত্রী পঞ্চাশের বেশি হলে মেয়ে পক্ষের আপত্তি, নাদের আলী চল্লিশ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে। গেটে দাঁড়ানো ছেলে-পুলেদের পাঁচ হাজার টাকার দাবি দশটা কচকচে পাঁচশ টাকার নোট বের করে মিটিয়ে দেয় নাদের আলী। বউকে কলেজে পড়াবে বলে শ্বশুরের হাত ধরে যে ওয়াদা করেছিল, সেটাও ভঙ্গ করেনি। বিয়ের এক মাসের মধ্যে রুবীনাকে গ্রামের কলেজে ভর্তি করে দেয়। এতকিছুর মূলে রুবীনার মুখের ওই ঘোমটা। এমন একটা মেয়েই চেয়েছিল সে। পর্দাশীল, শান্ত, সাদাসিধে। যেমনটা বোঝাবে ঠিক তাই বুঝবে। এই নিয়ে নাদের আলীর মনে খুব আফসোস ছিল। কষ্টও কম ছিল না কিছু। এত দেখে-শুনে বিয়ে করেও মৌসুমীকে টিকাতে পারলো না। মৌসুমী তার সাবেক স্ত্রী। নাদের আলীর মুখে মুখে তর্ক, কথা না শোনা, এমনকি সামান্য পর্দা করারও বালাই ছিল না মেয়েটার। এখানেই নাদের আলীর অভিযোগ। স্ত্রীর এমন বেপর্দা জীবন-যাপনের হিসাব মরার পরতো তাকেও দিতে হবে? এসব ভেবে ভেবে ঘুম হতো না নাদের আলীর। সেই থেকে অশান্তির শুরু। আস্তে আস্তে দূরত্ব তৈরি, প্রথমে মানসিকভাবে সরে আসলেও পরবর্তীতে ডিভোর্স । প্রাক্তন স্ত্রীকে ছেড়ে দেয়ার দীর্ঘদিন পরেও নতুন করে সে আর পাত্রী খুঁজে পায়নি। এক-দুটো পছন্দ হলেও সব শুনে মেয়ে পক্ষের হুঁশিয়ারি, ‘বিবাহিত ছেলের কাছে মেয়ে দেবো না।’ বাকি মেয়েদের বেলায় নাদের আলী নিজেই খুঁত ধরে বেড়ায়। ব্যতিক্রম রুবীনা, কোনো রকম ঝামেলা ছাড়াই রুবীনাকে নাদের আলীর ভালো লাগে। এমন সুযোগ হাত ছাড়া করবে না বলে ঝটপট বিয়েটাও সেরে নেয়।

যে ঘোমটা দেখে রুবীনাকে মনে ধরে, বিয়ের এক বছর পর এখন সেই ঘোমটাটাই নাদের আলীর যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রথম প্রথম অসুবিধে হতো না। কদিন ধরে যন্ত্রণার মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। বউ কিছুতেই ঘোমটা পরিহার করছে না। ঘরে ঘোমটা, বাইরে ঘোমটা, খেতে ঘোমটা, শুতে ঘোমটা। সবকিছুতেই এই ঘোমটা ঘোমটা ব্যাপারটা নাদের আলীকে অস্থির করে তুলেছে। নাদের আলীর এই অস্থিরতা জীবনকে সহজ করে দেখা রুবীনার মনে একটুও দাগ কাটে না। অকারণ বিষয় নিয়ে নাদের আলী যখন জীবনের হিসাব মিলাতে ব্যস্ত, রুবীনার তখন অফুরন্ত অবসাদ। জীবনকে তখনো সে তার সারল্যের ভেতর দিয়ে উপভোগ করে।

রুবীনা উপশহরে বেড়ে ওঠা মেয়ে। নিজ এলাকার স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করেই মানুষ। ধর্মটা অতো বুঝে না, বিশেষ কোনো দিন না থাকলে নিয়ম করে নামাজ পড়া হয় না। তার ধর্মে কিভাবে মেয়েদের পর্দা করতে বলা হয়েছে সে সম্বন্ধেও ভালো জানা নেই। কিন্তু ঘোমটা দিতে সে ভীষণ ভালোবাসে। যতœ করে ঘোমটা দেয়ার মধ্যে নিখাদ আনন্দ পায়। বুঝতে শেখার পর থেকেই ঘোমটা পরিহিত জীবন তার। ওড়না-স্কার্ফ-শাড়ি সবকিছুতেই সবার আগে ঘোমটা টেনে নেয়। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে ঘোমটার ধরনটা কেবল বদলায়। জীবনের কোথাও ঘোমটার সাথে আপস করতে পারেনি। বাসর রাতে স্বামী নাদের আলী বলেছিল, ‘ঘোমটাটা সরাবে, ভালো করে একটু দেখবো তোমায়।’

আদর পাওয়ার গোপন বাসনায় নিঃসঙ্কোচ রুবীনা ঘোমটা মুখেই উত্তর দেয়, ‘ওটা সরাতে পারবো না। ওর ভিতর দিয়েই দেখুন।’

সহজ-সরল-নির্মেদ মনের রুবীনার ভেতরের সৌন্দর্য সেদিন বুঝেনি নাদের, তার রাগ হয়। রাগান্বিত মনেই সে রুবীনার ঘোমটা সরায়, আদর করে। স্বামীর সোহাগের স্পর্শে ভালোবাসার বদলে যৌনতা টের পেয়ে রাগ হয় রুবীনারও। বুঝে না নাদের আলী। বউয়ের নিথর, নিরাবেগ শরীরের সাথে নাদের আলীর রসায়ন বিপরীত স্রোতে রূপ নেয়। তার মনের মধ্যে অশান্তির পোকা বাসা বাঁধে। তারপর বহুদিন সে পোকা রুবীনার ঘরে আঘাত আনে না, কুড়ে কুড়ে খায় নাদের আলীর ভেতরটা।

এভাবেই চলছে তাদের জীবন সংসার। খাওয়া ঘুম কাজ সবই নিয়ম করে হয়, কোথাও প্রাণ খুঁজে পায় না নাদের আলী। তার অস্থির মন কথা রাখে না। রুবীনার কলেজ বন্ধ করে দেয়। বিয়েতে দেয়া স্বর্ণগুলো ব্যবসার নাম করে ফিরিয়ে নেয়। তাতে কিচ্ছু অসুবিধে হয় না রুবীনার। কিছুই প্রতিবাদ করে না সে। নাদের আলীর আরো রাগ হয়। এমন অনুভূতিহীন মেয়ে সে চায়নি। তার অস্থির মনের কোণে প্রাক্তন বউয়ের গন্ধ। মনে মনে জপে সে, ‘আগেরটাই ভালো ছিল, অন্তত রাগটা দেখাতো। প্রতিবাদ করতো।’ সে জপতেই থাকে, ‘তাহলে রুবীনার সমস্যাটা কোথায়?’ নিজের করা প্রশ্নে নিজেই জর্জরিত হয়। খুঁজে অবসানের পথ। এই মোহ-মায়ার সংসারে সে পথ খুঁজে পাওয়া কতো কঠিন তা নাদের আলীর করুণ চোখ দুটোর নিচের কালো আভাটুকুই বলে দেয়।

আজ সন্ধ্যেবেলা হঠাৎ করেই বাড়ি ফিরে আসে নাদের। হাত-পা ধুয়ে বিছানায় বসতেই চা হাতে রুবীনা হাজির। স্বামীর কোল ঘেঁষা টি টেবিলের ওপর কাপ রাখতেই চুড়ির ঝনঝন শব্দ। নিজের হাতের ওপর কারো অস্তিত্ব টের পায় রুবীনা। পরিচিত স্পর্শটা তার ভেতরে আলাদা তেজ আনে না, তবুও খুশি খুশি মনে জানতে চায়, ‘কিছু বলবেন?’

‘আজতো পবিত্র রাত, নামাজ পড়বে না?’

পুরনো সময়ের মতোই নিস্তেজ হয়ে যায় রুবীনার শরীর, মুখে নেমে আসে আশা ভঙ্গের মেঘ। তার আকাশ নিকষ কালো অন্ধকারে ঢেকে যাওয়ার আগেই সে উত্তর দেয়, ‘আমার শরীর ভালো নেই।’

‘শরীর ভালো থাকলেও তোমায় নামাজ পড়তে দেখি না কখনো।’ মেজাজি ঢঙে বলে নাদের।

‘ঠিক আছে পড়বো।’ রুবীনা চলে যেতে চায়, আবারো শক্ত করে টেনে ধরে, ‘একটা কথা বলবে আমায়?’

নাদেরের গলায় নিস্তব্ধতার সুর। রুবীনার মনের আকাশে আবার আলোর ফোয়ারা। আশাবাদী কণ্ঠে জবাব দেয়, ‘বলুন কি শুনতে চান?’

‘মুখের মধ্যে সব সময় ও রকম ঘোমটা দিয়ে রাখো কেন? পর্দা করার জন্যই যদি ঘোমটা দেবে তাহলে স্বামীর সঙ্গে কিসের পর্দা?’

রুবীনা হাসে। ক্ষণিকের জন্য তৈরি হওয়া তার ভেতরের স্নিগ্ধতা মুহ‚র্তেই রোদের ঝলকানিতে ঝলসে যায়। স্বামীর পাগলামির বাহুতে জড়ানোর ইচ্ছে বরাবরের মতো আজো অপূর্ণ। ক্রোধটা স্বভাব-সুলভ আনন্দে গুলিয়ে ফেলে সে। হাসি হাসি মুখে উত্তর দেয়, ‘মা একা রান্না ঘরে, পায়েশ রান্না করছে। যাই গিয়ে মাকে একটু হেল্প করি।’

রুবীনা চলে যায়। মেজাজ খারাপ হতে থাকে নাদেরের। তার এত বছরের জীবনে এমন বিকারহীন মেয়ে সে দেখেনি। নাদেরের ভেতরে অস্থিরতার দানা বাড়তেই থাকে। তার যন্ত্রণা মাত্রারিক্ত জ্বালাচ্ছে তাকে। এই যন্ত্রণার কি কারণ বহুবার নিজের সাথে বসেও তার আপস করতে পারেনি সে, বুঝতে পারছে না বউয়ের ওই ঘোমটা কেন তার ঘুম কেড়ে নিয়েছে। ঘোমটা রহস্য উদঘাটনের জিদ তার বাড়তেই থাকে। হঠাৎ মাকে খুব মনে পড়ে নাদের আলীর।

বউকে নিজের রুমে যেতে বলে মায়ের পাশে সে বসে। বহুদিন পর এমনি করে ছেলেকে কাছে পেয়ে খুশিতে গদ গদ নাদের আলীর মা, ‘কিছু বলবি বাবা?’

‘রুবীনার ব্যাপার স্যাপারটা কি মা বলতো? তুমি জানো কিছু?’

‘কিসের ব্যাপার? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।’

‘মেয়েটার নামাজ কালাম কিছু নেই সারাক্ষণ ঘোমটা দিয়ে ঘুরে। আমার ভালোলাগে না এসব।’

‘ভালোলাগে না বললে হবে বাবা? মৌসুমী তাও মাঝেমধ্যে নামাজ কালাম পড়তো। কিন্তু পর্দা করতো না বলে তুই তাকে রাখতে পারলি না। এই বউটা পর্দা করে, এখন বলছিস একেও তোর ভালো লাগে না। এরকম বললে হয়!’

‘এটা কেমন পর্দা মা? ধর্মেতো আরো কাজ আছে, সেগুলো করলে না হয় বুঝতাম।’

শাড়ির আঁচলে হাত দুটো মুছে নাদেরের মা। ছেলের হাত দুটো মুঠোয় নিয়ে বলে, ‘ধর্ম কি চোখে দেখা যায় বাবা? মাকে ভালোবাসা ছেলের ধর্ম, এই যে তুই আমাকে এত ভালোবাসিস সেটা কি কখনো কেউ বুঝে? রুবীনা ছোট মানুষ, পর্দা করে সেই বেশি। আরেকটু বয়স হোক তারপর হয়তো ধর্ম-কর্মও করবে। এ নিয়ে এত অস্থির হওয়ার কিছু নেই।’

পাশের ঘরে নিজের মতো করে বসে আছে রুবীনা। মা-ছেলেতে কি আলাপ সেদিকে কোনো উৎসাহ নেই তার। সে গুণ গুণ করে গান গায়, তার সাজতে ইচ্ছে করে। ঘোমটার ভেতরে একটা টিপ, একটু লিপস্টিক, মুখে আলতো করে মাখা সামান্য ক্রিমে মাঝে মাঝেই বাড়তি আনন্দ পায় রুবীনা। স্বামীকে মনের মতো করে না পাওয়ার অভিমান আজ হঠাৎ করেই তাকে আলাদা করে তুলে। বিছানা ছেড়ে সে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ায়। ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড রোমান্টিক রুবীনা তার ঘোমটার কপালে একটা টিপ পড়ে। দেখে নাদের আলীকে। নাদের আলতো করে তার গাল ছুঁয়ে দেয়, স্বামীর আঙুলের কারুকার্যে খেলা করে রুবীনার ঠোঁট। তার ভেতরে তুমুল সুখের সঞ্চার। নিজের অজান্তেই মুখ থেকে ঘোমটা সরিয়ে নেয় রুবীনা। নাদের তার গাল চেপে ধরে কপালে চুমু খায়। চোখ বন্ধ হয়ে আসে, শরীর কাঁপে। সে টের পায় বহুদিন পর নাদের তার ঠোঁট কামড়ে ধরে।

চোখ খুলে হাঁপাতে থাকে রুবীনা। মুখের ওপর তাকাতেই দেখে ঘোমটা নেই। লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে। চট জলদি টেনে দেয় আয়নার উপরের পর্দা। ততক্ষণে নিজের স্বভাব-সুলভ ঘোমটা দিতে একটুও ভুল হয়নি তার।

এরপর থেকেই রুবীনার মন ব্যাকুল হয়ে আছে। গত রাত ঘুম হয়নি ভালো। সকালে সে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। তার বারান্দা থেকে বাহিরটা চমৎকার হয়ে ওঠে। যখনই ঘরের সৌন্দর্যে মন ভরে না, নিমেষেই সে প্রকৃতির দ্বারস্থ হয়। নিজেকে ভাসিয়ে দেয় নিদারুণ সেই সৌন্দর্যে। আজ বারান্দায় দাঁড়াতেই সে দেখে লাল ফিতেয় বেণী করা দুটো স্কুল পড়–য়া মেয়ে, মেঘ মেঘ আকাশে বৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কায় কেমন ছটফট করছে ওরা। ওদের বুকের ওপর চেপে ধরা বইগুলোকে বাঁচানোর অভিনব চেষ্টা রুবীনার চোখ ছুঁয়ে যায়। সে নিজেও এমনি করে বুকের ওপর বই আগলে ধরে স্কুলে যেত। বড় হতে হতে বুকের মধ্যে বই চেপে ধরলে কখনো টের পেতো সে যৌবনে পা রেখেছে। নিজেই লজ্জা পেতো রুবীনা। লজ্জা ঢাকতে নিজের অজান্তেই সামান্য ওড়না টেনে দিতো খুব সতর্কভাবে। আকাশ কালো হয়ে এসেছে। তুমুল বৃষ্টি হওয়ার হাতছানি আজ রুবীনার মনের কোণে পুরনো প্রেমকে এনে জায়গা করে দেয়।

তখন ক্লাস নাইনে পড়ে সে। একদিন বইয়ের পাতা উল্টাতে গিয়ে দেখে চিরকুট। তাতে লেখা,

ঘোমটা দেওয়া পরী

দেখবো বলে আশায় আশায়

সারাক্ষণই মরি

লেখাটা পড়ে রুবীনার সেদিন রাগ লাগেনি। বরং মানুষটাকে দেখার জন্য মন আনচান করতে লাগলো। ঘোমটার আড়ালে তার চোখ মানুষটাকে খুঁজে বেড়াত, খুঁজে বেড়াত চিরকুট। রুবীনা বুঝে গেল সে প্রেমে পড়েছে। অদেখা সেই প্রেমিকের জন্য তার আনন্দ হতো, অভিমান হতো, কখনো কখনো রাগও। চিরকুটটা খুব যতœ করে রেখে দেয় সে। রোজ ঘুম থেকে উঠে একবার দেখে। ঘুমুতে যাওয়ার আগে আরেকবার। চিরকুটের সঙ্গে কথাও বলতো। খাওয়ার আগে বলে যেত, ‘আমি গেলাম খেতে, তুমি খেয়ে নিও।’ কখনো সে নিজেই খাইয়ে দিতো। এরকম চলতে চলতেই রুবীনার নাইন শেষ হয়। তার অপেক্ষা থামে না, ভালোলাগাও বদলে যায় না বয়সের ভারে। টেন পাস করে কলেজে ওঠে। তখনো রুবীনার মনের মধ্যে চিরকুটওয়ালা। নিয়ম করে তখনো সে ঘোমটার আড়ালে মানুষটাকে খুঁজে বেড়ায়। কলেজ শুরুর দিকে একদিন পেয়েও যায়। ক্লাস শেষ করে কেবল বেরিয়েছে। উজ্জ্বল রোদে গা পুড়িয়ে বাড়ি ফিরছে সে। হঠাৎ শুনতে পায় পেছন থেকে কেউ বলছে, ‘এই যে ঘোমটা দেওয়া পরী, একটু শোনো না।’

রুবীনার তখন হার্টবিট বেড়ে যায়, গলা শুকিয়ে আসে। ঘোমটাটা আরো ভালো করে টেনে জোরে হাঁটে সে। কিছুটা সামনের দিকে এগিয়ে একবার পিছন ফিরে তাকিয়ে বলেছিল, ‘ওমা! এ যে দেখছি আমাদের লাল্টু।’ লাল্টু রুবীনার স্কুলের সব থেকে দুষ্ট ছেলেটা। সেদিন দুষ্ট ছেলেটার জন্য রুবীনার মন আনন্দে ভরে যায় কিন্তু বাড়ি গিয়ে লাল্টুকে নিয়ে আলাদা করে ভাবার আর সুযোগ পায় না। মা কানের এসে বলেছিল, রেডি হয়ে নে, ছেলের বাড়ির লোক আসবে তোকে দেখতে।

সেই ছেলেটি নাদের আলী রুবীনাকে সারা জীবনের জন্য লাল্টুর কাছ থেকে কেড়ে নেয়। অনেকদিন পর লাল্টুর কথা মনে পড়তেই রুবীনা হেসে দেয়। তুমুল হাসিতে মাতোয়ারা দূরের ওই মেয়ে দুটো দৌড়াচ্ছে বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে।

পরদিন বিকেলবেলা। রুবীনা বাপের বাড়ি যাওয়ার জন্য তৈরি হয়। নাদের বলে দিয়েছে তাকে আর সহ্য হচ্ছে না। কদিন গিয়ে বাপের বাড়ি থেকে আসতে। শুনে রুবীনার মন খুশি হয়ে ওঠে। কতোদিন পর বাপের বাড়ি! উঠোনে মাটির চুলোয় বসে মায়ের হাতে বানানো গরম পিঠা, আয় আয় আয় বলে হাঁসগুলোকে খোঁয়াড়ে পাঠানো, বাবার পুরনো পাঞ্জাবির বুতোম লাগিয়ে দেয়া। তার চোখে কতো কি ভাসে। রুবীনা বিড় বিড় করে বলে, ‘উফ!’

আয়নার সামনে বসে থাকা নাদের আলীর বুকের ভেতরটায় কেমন করে লাগে। সে বড় বড় চোখে বউয়ের দিকে তাকায়, রুবীনার তাতে সায় নেই। আপন মনে নিজের ব্যাগ গুছিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ নাদেরের কণ্ঠ, ‘ফেরার সময় ঘোমটাটা বাপের বাড়িতে রেখে এসো।’

ঘোমটাটা আলতো করে টেনে উত্তর দেয় রুবীনা, ‘জ্বি আচ্ছা।’

‘তা কিভাবে রেখে আসবে শুনি?’

‘তাতো জানি না।’ রুবীনার মোলায়েম কণ্ঠের উত্তর।

‘জানো না তাহলে বলছো কেন জ্বি আচ্ছা? তুমি কি আমার সাথে ফাইজলামি করো?’

এবার রুবীনা চিৎকার করে উঠে, ‘আপনি আমার সাথে এতো খারাপ ব্যাবহার কেন করেন? কি দোষ আমার? আমার ভালোলাগে তাই আমি ঘোমটা দিই, পারবো না ওটা ছাড়তে। তাতে আপনার ভালোলাগলে আমায় রাখেন, নইলে ছেড়ে দিন। কিন্তু আজকের পর আর কখনো আমার সাথে খারাপ ব্যাবহার করবেন না বলে দিচ্ছি।’

আয়নার ওপর স্থির হয়ে থাকা নিজের মুখটার দিকে তাকায় নাদের আলী। গভীর দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ তাকিয়ে দেখে সে নিজেও একটা ঘোমটা পড়ে আছে। এই ঘোমটার আড়ালে সে বহুগামী, এই ঘোমটার আড়ালে সে ঠক, জুয়াড়ি, মিথ্যেবাদী। নিজের এতদিনের লুকোনো ঘোমটা উন্মোচনে নাদের আলীর শরীর অষাঢ় হয়ে আসে, দম বন্ধ লাগে তার। চোখের পাতায় ভিড় করে আমাবস্যার অন্ধকার। তার হাত কাঁপে, গলা ভিজে যায়। জোর করে নিঃশ্বাস টানতে গিয়ে নাদের আলী দেখে আয়নার উপারে বিছানায় বসে আছে রুবীনা।

রুবীনার মুখে কোনো ঘোমটা নেই।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj