বিকেলের ছবি : আশরাফ আলী

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

পদ্মা পার হয়ে যখন ওপারের বালুর ওপর পা পড়ল তখন মনের ভেতর এক অন্য রকম অনুভূতি কাজ করছে। দুই পাশে বাদাম ক্ষেত, মাঝখান দিয়ে হাঁটা পথ। পেছন থেকে পা এনে সামনে পা ফেলবার প্রতি পদক্ষেপে বালু আর ধুলো উড়ছে। নদী পার হওয়ার আগেও বাদাম ক্ষেত ছিল। কিন্ত এখন ভাল লাগছে। এই ভালো লাগাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবে শিমুল। পেছনে বিশাল পদ্মা। এরই পারে পারে পদ্মা পারের কৃষকের বাড়ি। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনের তুলির আঁচড়ে সেটা একটা সবুজ রেখা মনে হবে। এটা গ্রাম। বাংলার নদী পারের গ্রাম। দূর থেকে দেখলে সবুজ রেখা মনে হলেও সবুজের জন্য যে বৃক্ষ সারির প্রয়োজন এখানে তা অত্যাল্প পরিমাণে আছে। এখানে আছে কলা গাছ, বাবনা, ভেন্না আর স্থানে স্থানে শিমুল গাছ। অর সব লতা গুল্ম। তবুও সবুজ। শুধুই কলা গাছ আর লতা গুল্মে ঘেরা ছনের চালের বাড়ি। স্থানে স্থানে একটা-দুটা টিনের চালের বাড়ি। সেই সবুজ দেখতে দেখতে শিমুল পথ চলে। কাধে একটি ব্যাগ-সেই ব্যাগটিকে ভারী মনে হয়। কিন্তু পরোয়া নেই। পেছনের গ্রাম পার হলে সামনের গ্রাম, সরু পথ পার হয়ে বিশাল মাঠ, ফসলের ক্ষেত একই চিত্র। যেন একটা ছবির উপর দিয়ে বাস্তব মানুষ হেঁটে চলছে। সেও ছবি হতে পারত কিন্তু তার শরীরের ঘাম পথ চলার ক্লান্তি তাকে বাস্তব মানুষে পরিণত করেছে। এই বাস্তব মানুষটি একটি উঠানের সামনে এসে দাঁড়াল।

এখানে চারপাশে বড় বড় কাঠের গাছ দেখে এখন আর কেউ একে গ্রাম মনে করবে না। তবে কি শহর? তা নয়। এটা সাবেক অঞ্চল। নদী পারের গ্রামগুলো থেকে আলাদা। তাহলে চরাঞ্চল ছাড়িয়ে সে এখন সাবেক অঞ্চলে এসেছে। সামনের পুকুরটি চেনা। পুকুরের একপারে বড় বড় দেবদারু আর আম গাছ। আম গাছের মোটা মোটা শিকড় পুকুরের পাড় ছাড়িয়ে একেবারে পুকুর পর্যন্ত পৌঁছেছে। সেই সব গাছের সামনে পুকুর ঘাট আর পেছনে একটি বাড়ি। প্রথমেই জোড়া দুটো পুরনো দালান। তাতে বিচিত্র লতা আর গুল্ম জড়ানো যেন সবুজের আস্তানা। মনে হয় কোনো পোড়ো বাড়ি। এ দালানদ্বয়কে পোড়ো বললেও বাড়িটিকে পোড়ো বলা চলে না। দালানদ্বয় বাসের অযোগ্য বলে সামনে টিনের দুটি বড় ঘর। এই দুই দালানের মাঝখানে একটা চিকন পথ সোজা বাড়িটির উঠানে গিয়ে পৌঁছেছে। শিমুল এখন সেই উঠানে দাঁড়িয়ে।

একজন বলল, শিমুল এসেছে।

যেই একজন মিষ্টি মেয়েলী কণ্ঠে চোখ বিস্ফারিত করে নিজের আনন্দ প্রকাশ করে শিমুলের আগমন বার্তা ঘোষণা করল সে এখনো বের হননি। তার হাতের গুরুত্বপূর্ণ আনাজ যা দুপুরে রান্না হবে তা একটা পাত্রে রেখে তারপর মাটির একটা একপাশ ভাঙা ঢাকুন দিয়ে ঢেকে বেরিয়ে আসার আগেই বের হলেন দুজন।

দেশি তাঁত টাঙ্গাইল কাপড়ে জড়ানো ত্রিশোর্ধ রমণী ফর্সা মুখ হাসিখুশিভাবে আমন্ত্রণ জানালো। তার হাতে একটা যাতা। এই মাত্র তিনি যাতা দিয়ে পান খাওয়ার জন্য প্রস্ততি নিতে গিয়ে সুপারি কাটা নেই দেখে সুপারি চেরাই করছিল এবং শিমুলের আগমনের কথা শুনে বেরিয়ে এসেছে। অনেকদিন তার বোনকে দেখে না। শিমুলের অগমনের কথা শুনে সে ধরেই নিয়েছে তার আদরের ছোট বোন শিমুলের সাথে এসেছে। তাই দেখার আগ্রহটা একটু বেশি হওয়ায় হাতের জাঁতি রেখে আসার কথা ভুলে গেছেন। সে আঁচল টানতে টানতে এগিয়ে এসে নিজের বোনকে দেখতে না পেয়ে জিজ্ঞেস করল, আর কে এসেছে?

শিমুলের কাঁধের ওপর দিয়ে কাউকে খোঁজার মনোভাব নিয়ে সামনে তাকানো খালাকে বলল, আমি একা এসেছি।

মুখটা কালো হলো না কেননা স্নেহের শিমুল সামনে এই যেন একটা পাওয়া তবুও মনটা হতাশ। সেই হতাশা নিয়ে বলল, তোর মা এলো না?

শিমুল একটা আশা জাগিয়ে তুলে বলল, না, সে বর্ষায় আসবে।

শিমুলদের বাড়ি থেকে এ বাড়িতে আসার কোনো ভালো যানবাহন নেই। একমাত্র বর্ষায় যখন চারপাশে পানি থাকে এমন কি নদী ছাপিয়ে চারপাশের মাঠ, ফসলের ক্ষেত ডুবে গ্রামে পানি ঢুকে যায় তখন নৌকায় এখানে আসা অনেকটা সহজ হয়। তাই বর্ষায় আসার সম্ভাবনার কথা জানাল।

খালা মরিয়া হয়ে একটা অনুযোগের সাথে বলল, নিয়ে এলেই পারতি। আয় ঘরে আয়।

তারপর উপন্থিত মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, কত দূর থেকে এসেছে ছেলেটা, না জানি কত কষ্ট হয়েছে, আহা! সারা মুখে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে, তুই ব্যাগটা ধর। একটু জিরোতে দে। চিনি দিয়ে সরবত করে দে। এই গরমে চিনির সরবত বেশ আরাম দিবে।

যাকে উদ্দেশ্য করে এই কথাগুলো বলা হলো তার পরিচয় পূর্বেই পাওয়া গেছে। এই সেই বার্তাবাহক যিনি শিমুলের আগমনের খবরটি প্রথম দিয়েছেন এবং ইতোমধ্যে অনাজ ঢেকে রেখে এখানে উপস্থিত হয়েছেন। ওর নাম পারুল। একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। বয়স পনের। মায়ের এতগুলো কথা শুনে টানা টানা চোখ দুটি একবার তুলেই নিচে নামিয়ে নিল।

-কিরে পারুল কেমন আছিস?

-ভালো।

যেন উচ্চারণটুকুই করতে পারল। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ব্যাগটা নিয়ে চলে গেল।

শিমুল খালার পেছনে ঘরে প্রবেশ করল। ভেতরে একটি খাট পাতা। সামনে দাড়াতেই স্টিল আলমারির কাছে নিজের ছবি দেখতে পেল। দীর্ঘ পথ হাঁটায় চুল রুক্ষ সূ² হয়ে আছে। আঙুল চালিয়ে দিল কিঞ্চিত লম্বা অবাধ্য চুলগুলোর ভিতর। তারপর বসে পড়ল খাটে। নিজের কাছেই অস্বস্তি বোধ হলো।

পারুল ফ্যান ছেড়ে দিল। তার আর কিছু বলার বা করার নেই। শিমুল পায়ের জুতোর ফিতে খুলতে খুলতে মনে করল দুই বছর আগের একটি চিত্র। একই খাটে দুজন পাশাপাশি বসা। খাটে বসে পা দুলিয়ে সেকি কথার ফুলঝুরি। একটা ঝগড়ার সম্পর্ক ছিল তাদের। আজও বসেছে খাটের অন্য প্রান্তে মুখে রা নেই। দুই বছরে কত পরিবর্তন। শিমুল নিজেকে বুঝাল মেয়েরা বড় হলে শান্ত হয়ে যায়। সত্যিই কি শান্ত হয়ে যায়? মানব স্বভাব সে সাক্ষ্য দেয় না। সে হয়তো একটা অভিমানে অশান্তই হয়ে আছে অথবা দীর্ঘদিন পরে সাক্ষাৎ হওয়ায় মানবিক জড়তা এসে ভর করেছে কিছুক্ষণ পরে হয়তো তা কেটে যাবে।

দেয়ালে কতগুলো ছবি টানানো। রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-শরৎচন্দ্র। এ দেখেই বোঝাযায় এ পরিবার সংস্কৃতমনা। শিমুল এ পরিবার থেকেই সাহিত্যের পাঠ নেয়। শিমুলের যখন সাহিত্য সম্পর্কে ধারণা ছিল না তখন কবি আর শিল্পীদের এক কথাতেই বাদ দিয়ে দিত। তার কাছে কবিরা অন্ন ধ্বংস করে আর কবিতা লিখে। শিল্পকে তো আরো জটিল কিছু মনে হতো তার। এখন শিমুলও একজন কবি। হঠাৎ একটি স্কেচে চোখ আটকে গেল। শিমুল উঠে দাঁড়াল-খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। ছবিটা বেশ স্বচ্ছ-একপাশে পাহাড়, একটা ঝর্ণা বয়ে গেছে ঠিক পাহারের সবুজ ঘাসের মাঝখান দিয়ে সাদা একটা পথ করে করে। সেই পথের পাশে একটি মেয়ে- সম্পূর্ণ একা-পিঠে খোলা চুল। বেখেয়ালে সে চেয়ে আছে দূরে আর একটি পাহাড়ের পানে। রঙ্গিন ছবিতে হালকা নীল সালোয়রে অপরূপ দেখাচ্ছিল। পিছনে অস্তায়মান সূর্যকে দেখে মনে হয় বিকেলের তোলা এক জীবন্ত ছবি। ছবিটা জীবন্ত হলে খাটে বসা এই মেয়েটি সেই জীবন্ত প্রতিমূর্তি। শিমুল সেই প্রতিমূর্তির দিকে ঘুরে গেল। কয়েক মুহ‚র্ত একজোড়া চোখ ঘিরে ধরল মেয়েটিকে। কিন্তু সে চাহনী যেন সহ্য করতে পারছে না পারুল। শত সূর্যের আলো একসাথে ঠিকরে পরছে পারুলের চোখে মুখে গ্রীবায় আর চিবুকে। শিমুল এ বাড়িতে অনেক বেড়াতে এসেছে- মার সাথে এক মাস-দেড় মাস পর্যন্ত বেড়িয়েছে। বছরে দুবার না হলেও একবার এমন আতিথিয়েতা নিয়েছে। সে হিসেবে বলা যায় শিমুল আর পারুল ছোটবেলা থেকেই একসাথে বড় হয়েছে। একসাথে কত রকম খেলেছে-তর্ক করেছে। সেই শিমুলের এক মুহ‚র্তের দৃষ্টি তার কাছে অচেনা মনে হলো। লজ্জায় এক থোক রক্ত এসে সাদা সুন্দর মুখখানি আরো লাল হয়ে গেল।

শিমুল পারুলের লজ্জাকে না দেখে পারুলকে দেখেই বলল, পারুল তুমি এ কোথা দিয়ে হাটছ? তোমাদের পুকুর পারে তো কোনো পাহাড়ও নেই পাহাড়ি ঝর্ণাও নেই।

কি বলবে পারুল। এক মাস আগে তাদের স্কুল থেকে সিলেটের জাফলং গিয়েছিল শিক্ষা সফরে। পায়ের নিচে কি রকম নরম সবুজ ঘাস। তাই ইচ্ছে হচ্ছিল জুতো খুলে এ পথে হাঁটতে। প্রধান শিক্ষকের করা নির্দেশ অমান্য করে সে জুতো খুলেছিল। সে সময়ের তোলা ছবি।

এসব কথা পারুল বলল না। বলল, সিলেটে আমাদের শিক্ষা সফর ছিল।

-তোমার যে চিঠিতে তেরটি বানান ভুল ছিল এবং আমাকে আসতে বলেছিলে সেই চিঠিতে তো বলোনি তোমার শিক্ষা সফরের কথা।

-আমার সফরটি তারও পরে ছিল।

শিমুল তার চিঠির তারিখ আর তার আসবার ব্যবধান বিয়োগ করে দিনক্ষন নির্ধারণ করে কোন এক কল্পিত দুই দিয়ে ভাগ করে দুই মাস বের করে পারুলের মুখের দিকে চাইল।

পারুল অবাক হলো। কি করে বলতে পারল। শিমুরের বুদ্ধির তারিফ সে বরাবরই করে আসছে।

শিমুল আবার বলল, বাহঃ দুই মাস আগে ছবি হয়ে এসেছ । আঃ কি দারুণ, আচানক সুন্দর। আমি ওখানে উপস্থিত থাকলে ঠিক জড়িয়ে ধরতাম।

আর এক খণ্ড রক্ত এসে পারুলের মুখে জমল, সারা গণ্ডদ্বয় লাল হয়ে গেল। সে প্রতিবাদ করে বলল, আঃ কি বলছ এসব।

-কি বলছি শুনতে পাওনি?

পারুল নিজেকে যেন ফিরে পেল। দীর্ঘদিন পরের দেখা হওয়ায় বরফ একটু একটু করে ভাঙতে লাগল। পারুল আবার বলল, তুমি সভ্যতা ভুলছ?

-আমি কি অসভ্যতা করলাম?

-তো কি বলা হলো একটু আগে?

-আবার বলব?

শিমুল আবার বলার জন্য মুখ খুলতেই পারুল ছটফট করে উঠল। না, না মাফ চাইছি আর শুনতে চাই না।

-মাফ করলাম। আমাকে এক গøাস পানি দাও।

-মা শরবত করতে বলেছেন তার আদরের বোনপোর গলা ঠাণ্ডা করার জন্য।

-আগে পানিই চাই।

দুপুরের ঘুম ভেঙে যখন ঘরির দিকে তাকাল তখন বিকেল চারটে বাজে। দুহাতে চোখ কচলে বিছানায় উঠে বসল। প্রথম ঘুম ভাঙলে যে ভাব হয় সে ভাবটি ধীরে ধীরে কাটার আগে পুকুর ঘাটে চলে গেল। একটা দেবদারু গাছে হাত দিয়ে সামনের পুকুরে একটা জেগে ওঠা মাছের মাথা দেখে মনে করতে চেষ্টা করল তার দুপুরের খাওয়া হয়েছে কিনা। মাছটা ডুববার আগেই মনে পরে গেল হ্যাঁ দুপুরে সে সাদা ভাত আর মুরগির মাংস দিয়ে চমৎকার একটি মধ্যাহ্ন ভোজন করেছে।

সে ভোজনের স্বাদ যেমনই হোক দীর্ঘ পথ হাঁটার ক্লান্তি শেষে তার কাছে অমৃতই মনে হয়েছে। খালা এত দ্রুত রান্না শেষ করলো কেমন করে? পারুল কি সাহায্য করেছে? পারুলের চরিত্রে স্থৈর্যতা কম। সে সাহায্য করবে এমনটা আশা করা যায় না। সেই ছেলেবেলাকার কথা মনে পরল। সংসারে কাজ করার চেয়ে তার কৃত্তিম সংসারের প্রতি ঝোক বেশি। আমতলাতে তার মূল বাড়ি তৈরি হয়ে গেছে। বাঁশের মোটা কঞ্চি কেটে যে দালানের স্তম্ভ বা থাম উঠে গেছে তার ছাদ হলো কলাপাতার। কয়েকজনে মিলে যে গৃহটি রচনা করা হলো তার গাঁথুনী খুবই মজবুত। গৃহের আনুষঙ্গিক অনেক কিছু গড়ে উঠেছে। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বাজার গড়ে তোলা। বাজারটি মনোপলির মতো। তিনজন মাত্র নগড়বাসী সুতরাং দোকান একটির বেশি হওয়া সম্ভব নয়। পারুলই সেই দোকানের একমাত্র অপহুজুর। তিনিই একমাত্র খাদ্য সরবরাহকারী। তার কাছে আইনটি খুব করা। কোনো রকম ব্যতিক্রম হলে তিনি সওদা বিক্রি করবেন না। কত রকম সওদা থরে থরে সাজানো আছে কিন্তু কোনো গরিব দুঃখীর সেখানে প্রবেশ অধিকার নেই। টাকা ছাড়া এ দোকানি কোনো সওদা দিতে রাজি নন। টাকাও যে দুষ্প্রাপ্য তা নয়। দেবদারু গাছের লম্বা চিকন পাতাই একমাত্র মুদ্রা ব্যবস্থা। একটু অদূরে সেই গাছ। হাত বাড়ালেই যে দেবদারু পাতা পাওয়া যায় সে পাতা না ছিঁড়ে বুদ্ধির আশ্রয় নেয়াই ছিল শিমুলের কাজ। শিমুল একটি ব্যাগ হাতে চলে এসেছে দোকানে। বাড়িতে চাল নেই, ডাল নেই, মাছ নেই।

-টাকা দাও?

-টাকা তো নেই, এ জন্য কি না খেয়ে থাকব?

ব্যবসায় সে খুবই পাকা। টাকা ছাড়া সে মাল খালাস করবে না। তখন শিমুল তাকে বুঝাতে লেগে যেত। বাকিতে বিক্রি করলে কি কি লাভ। নগদ যে দ্রব্য দশ টাকায় বিক্রি করা যায় বাকিতে তা পনের টাকা এমন অনেক তথ্য দিয়ে তাকে প্রতারণা করা হতো। তারপর এক সময় সে তার ছোট ঝুড়িতে রাখা বালু হতে মন মন বালু মেপে দিত। এই বাল কিন্তু অত সহজলভ্য ছিল না। এটা সাবেক অঞ্চল। এখানে কোনো বালু নেই। বালু আনতে হয় মজুমদার বাড়ির মজা পুকুর যেখানে কোনো পানি নেই তার তলদেলে কেবলমাত্র এক স্থানে বেলে দোআঁশ মাটি পাওয়া যায় সেই বেলে দোআঁশ মাটিই এখানের চাল হিসেবে বিক্রি হয়। বাকিতে কিনে এত পরিশ্রমের সেই বাল বাইরে এনে ফেলে দিত শিমুল। ধরা পরতেই সে বেকে বসল আর দেবে না। তখন খেলা যেত ভেঙে।

সময় বদলে দেয় সব। সেই বিদ্রোহী পারুল এখন অনেক শান্ত। সে মায়ের সাথে কাজ করে ঘর গোছায়। চাপল্য ভাবের স্থানে একটা লজ্জানম্র ভাব জন্ম নিয়েছে। এখন সে আগের মতো শিমুলের সাথে মিশে না। পদ্মা পার হয়ে প্রথম বালুতে পা রেখে একটা অন্যরকম অনুভূতি মাথাচারা দিয়ে উঠেছিল তা ধীরে ধীরে বিস্ময়ে পরিণত হলো।

শিমুল পুকুরে নেমে গেল। টিউবয়েলের পরিবর্তে পুকুরে হাত মুখ ধোয়া তার পছন্দ। এটা তার অনেক দিনের অভ্যাস। ডান হাতের কনুই ভিজিয়ে যখন মখমণ্ডলে দুই আজল ভর্তি পানি ছুড়ে মারল তখনই মনে পড়ল তোয়ালে আনা হয়নি। তোয়ালে খাটেই ছিল শেষ বার খাট থেকে নামার সময় কাধে ফেলে আনলেই হতো। বড় আমগাছটার পাশে ছিল বলে পারুলকে দেখতে পায়নি শিমুল। ঢালু পার বেয়ে উঠে আসতেই পারুলকে দেখতে পেল। হাতে একটা তোয়ালে যেটা তার খাটের পাশেই স্বযতেœ রক্ষিত ছিল। সেই পারুলের পরিবর্তন টা আবার ফুটে উঠল। কোনো কিছুতেই তার খেয়াল ছিল না। শিমুলের বিষয়ে সে ছিল হিংসাত্মক প্রায়। যেটা শিমুল নিত সেটাই যেন তার প্রয়োজন হয়ে পড়ত।

শিমুল চেচিয়ে উঠল, দে তাড়াতাড়ি দে।

-কি?

-বুঝতে পারছিস না তোয়ালে চাইছি।

-নিয়ে আসলেই পারো?

-তুই আছিস কি করতে?

-আহা, আমি যেন উনার চাকরি করি।

-তুই অন্য কারো চাকরি করগে যা আমার প্রয়োজন নেই।

শিমুল না নেবার ভান করে তার পরনের লুঙ্গির আঁচলে হাত দিল। পারুল পরাজিত হলো। পারুল মনে মনে চেয়েছিল সে তাকে আরো অনুরোধ করুক। কাছে এসে জোর করে নিক। সেটা যখন হলো না শিমুল যখন পারুলের মনটা বুঝতে পারল না তখন পারুল স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করল। বলল, আঃ আমি হার মানছি। অ্যা নোংরা। ও নোংরা কাপর দিয়ে মুখ মুছলে আমি এ তোয়ালে পানিতে ফেলে দেব।

-তাহলে কেউ আমার জন্যই তোয়ালেটা এনেছে।

-এখানে তো আর কেউ নেই যে তার জন্য আনব। মানুষেরা বুঝলেই পারে।

-তাহলে আমার চাকরি করতে কোনো অসুবিধা নেই।

এর মধ্যে অনেক সূ² বিষয় লুকিয়ে আছে। সেটা পারুলের মনের আরো গহীনে লুকায়িত। খুব ছোট বেলা হতেই তো চাকরিটা নিয়ে বসে আছে। সে। চাকরিটা জীবন পর্যন্তু লম্বিত হোক তা তো পারুল কায়মনোবাক্যেই চায়। কিন্তু পারুল মুখ ফুটে সে কথা বলবে কি করে। শিমুল কি বোঝে না? তবুও সূ² কথার উত্তর সে সূ²তা দিয়েই দিল, এক কথায় যার চাকরি চলে যায় ওরকম মনিবের চাকরি করা কি সহজ কথা।

শিমুলতো আর অন্তঃযামী নয় এ কথাতে পারুল কি বলতে চায় কিছু বুঝল কিছু বুঝল না। সে বলল, কর্মচারীটি আমার পছন্দ হয়েছে। চাকরি তোমার পাকা। এ কথা বলে শিমুল হাসতে হাসতে পারুলের সামনে চলে এলো। তারপর হাত পেতে তোয়ালেটি তুলে নিল। হাত মুখ মুছেই ফিরিয়ে দিল। যদিও কথাটি রূপক কিন্তু একপক্ষ কথাটি মনের অন্তস্তল থেকে গ্রহণ করল।

লম্বা দেবদারু গাছ, বৃহৎ আম গাছ বিকেলের ছায়া ফেলে পুকুরের পার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। আম গাছের মোটা যে শিকড়টি পার থেকে পুকুর পর্যন্ত চলে গেছে সেই শিকড়ের ওপর বসল।

পারুল বসল তার পাশঘেঁষে। তবুও তাদের মধ্যে একটা ব্যবধান তৈরি হয়ে গেছে। যে ব্যবধান বয়সের সে ব্যবধান মনেরও। অভিমানও জমেছিল মনে। শিমুল যদি কথা না বলে তবে পারুলও কথা বলবে না। শিমুলই প্রথম কথা বলেছিল। এইভাবে দুজন অনেকক্ষণ বসে থাকল। অনেক চিন্তা করল পারুল। কোনো চিন্তাই সে সমন্বয় করতে পারছে না। শিমুল কি তার শুধুই বন্ধু। নিজের কাছ হতে নিজেকে মুক্ত করার জন্য পারুল কথা বলে উঠল।

-কিছু বলছ না যে?

-কত কিছুই তো বলা হলো।

-কত কিছু ! কখন?

পারুল ভাবল সে যখন জ্ঞানশূন্য হয়ে কেবল চিন্তার সাগরে ডুবে ছিল তখন শিমুল কি কিছু বলেছে? না তা কি করে হয়। শিমুল কিছু বললে নিশ্চয়ই শুনতে পেত। তাই একটা চঞ্চল সতর্কভাব চোখে মুখে ফুটিয়ে তুলে অনেক ব্যাগ্রতা নিয়ে বড় একটা প্রশ্নবোধক চিহৃ চোখে নিয়ে শিমুলের দিকে তাকাল। সে তাকানোর মধ্যে অনেক কিছু ছিল! তুমি বলেছ আর আমি শুনতে পাইনি । কি বলেছিলে? কি দুর্লভ সেই কথা? আমি যা ভাবছি তা কি? নাকি অন্য কথা। এমন অনেক প্রশ্ন ছিল সেই চাহনিতে।

শিমুল ঘার কাত করে একবার পারুলকে দেখে নিয়ে বলল, এই যে দুজন পাশাপাশি বসে আছি। দুজনের মন দুজনকেই ছুঁয়ে গেছে। ভেবে দেখ তুমি যা ভেবেছ সেখানে আমি কি ছিলাম না আবার আমি যা ভেবেছি সেখানেও তুমি ছিলে। মুখের সামান্য কথা বলাবলির চেয়ে সে কি বেশি নয়?

-তবুও কিছু বলা উচিত।

-আমি যা বলব তা তুমি সহ্য করতে পারবে না।

আবার চিন্তুায় ডুবে গেল পারুল। কি এমন কথা যা আমি সহ্য করতে পারব না। শিমুল তুমি জান না আমি তোমার সব কথা শোনরা জন্যই প্রস্তুত। আমাদের সর্বশেষ কথা তো ভালোবাসা। সে কথাটি যদি তুমি মুখ ফুটে বলে ফেল তবে এই বিকেলের আলোতে আমিই বেশি খুশি হব। কিন্তু যে কথাটি বললে পারুল খুশি হতে পারত সে কথাটি বলল না। শিমুল বলল অন্য কথা।

-তুমি বেশ সুন্দর হয়েছ।

একজন মেয়েকে সুন্দর বললে তার মুখ লাল হবেই। রাশি রাশি লজ্জা যেন একত্রিত হয়ে পারুলের মুখের ওপর ঠিকরে পড়ল। পারুল সুন্দরী বটে এবং এ কথাটি সে প্রায়ই শুনে থাকে কিন্তু তার সবচেয়ে চেনা মানুষের মুখ থেকে এ কথা শুনে সে খুশিই হলো। খুশি হলেও মুখে স্বীকার করল না।

-ছাই হয়েছি। তোমার চোখে ছাতা পড়েছে তাছাড়া এমন কালো মেয়েকে।

কেউ সুন্দর বলে না।

-তুমি আরো সুন্দরী হলে আমি কথাই বলতে পারতাম না।

-এখনই বলতে পারছ কোথায়? চুপ করে তো বসেই আছো।

তারপর হলো অতি সাধারণ কথা। স্কুলের কথা, স্কুলের বন্ধুদের কথা, আনন্দের কথা, টেলিভিশনের ছবির কথা। এক সময় সন্ধ্যা হয়ে এলো। প্রথম সন্ধ্যার আলো যখন তাদের ঢেকে ফেলল তখন ওরা উঠল।

শিমুল গ্রীষ্মের ছুটিতে বেড়াতে এসেছি। ছুটি ছিল পনের দিন। এভাবে দুজনে গল্প, আমোদ হাসি আর তামাশা করতে করতে যখন পনেরতম দিনে এসে পৌঁছে গেল পরদিন প্রথম সকালে শিমুল আবার তার ব্যাগ কাঁধে নিল। সেই ব্যাগ কাঁধে যখন বাইরে বেরিয়ে এলো তখন খালা বিদায় দিল কিন্তু আশ্চর্য পারুলকে কোথাও পাওয়া গেল না। খালা নিশেধ করল। আজ থেকে যাও- পারুল আসুক-কাল যেও। শিমুলের মনে হলো একটা দিন থেকেই যাই। একদিনের জন্য কতই বা ক্ষতি হবে। তারপর মনে হলো- কালও তো শেষ হবে। কালও হয়তো পারুল চোখে পানি নিয়ে বারান্দার খুঁটিটি ধরে দাঁড়িয়ে থাকবে কিংবা দূরে গিয়ে এদিনের মতো শুধু চোখের পানিই ফেলবে। কালও তো যেতে হবে। সুতরাং শিমুল রওয়ানা হলো। এ যাত্রায় পারুলের সাথে তার দেখা হলো না।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj