শালুক : মানজুর মুহাম্মদ

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

ঝিঁঝিঁ পোকা একটানা ডেকে যাচ্ছে। মেঘের আকাশ আলোকিত করে হঠাৎ চাঁদ ভেসে উঠেছে। কিছুক্ষণ আগে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। টিনের চালে বৃষ্টির ঝমঝম শব্দে শালুকের ঘুম ভেঙে গেছে। শিমুলডাঙ্গার শালুকদের বাড়িটা থেকে পাকা সড়ক সহজেই দেখা যায়। রাতের বেলা বাড়ির উঠোন থেকেই সড়কে চলমান গাড়ির লাল, হলুদ, সাদা আলোর ধাপাধাপি উপভোগ করা যায়। খোলা জানালা দিয়ে শালুক শুয়ে শুয়ে চাঁদের নির্মল আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে আনমনে। আকাশে কালো সাদা কখনো বাদামি মেঘ দূরন্ত বেগে ছুটে যাচ্ছে, যেন মেঘগুলো কোথাও পালাচ্ছে। কখনো মেঘের বুকে চাঁদ হারিয়ে যাচ্ছে। শালুক ভাবছে আহা মেঘের মতো যদি পালিয়ে যাওয়া যেত এই ঘর হতে, এই গ্রাম হতে, পরিচিত সকল হতে। বাইরে থেকে হঠাৎ দমকা হাওয়া এসে জানালার একটি কপাট সশব্দে বন্ধ করে দিল। শালুক কেঁপে উঠল। তার দুই চোখের পাতা ভিজে উঠেছে। বুক চুরমার করে ভেতর থেকে হু হু করে কান্নার প্রবল জোয়ার আসছে। খুব কষ্ট করে সে নিজেকে সামলে নিল। পাশে বড় আপা ঝিনুক ঘুমের ঘোরে নাক ডাকছে। শালুক নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করল। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এই গভীর রাতে কান্নার আওয়াজে সব কিছু ফাঁস হয়ে যাবে। সন্তর্পণে সে চোখের কোণের পানি মুছে নিল।

ঝিনুক শালুকের দুই বছরের বড়। কাল ঝিনুকের বিয়ে। সে মাত্র উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে। ছেলেবেলা থেকেই ঝিনুক পড়ালেখায় তেমন মনোযোগী ছিল না। ক্লাস সিক্স থেকে সে বিয়ের স্বপ্নে বিভোর থাকত। অষ্টম শ্রেণিতে তো একবার মাকে বলেই বসে- মা আমাকে বিয়ে দিয়ে দাও। আমি আর পড়ালেখা করব না। শালুক আর ঝিনুকের বাবা মতি মিয়া শিমুলডাঙ্গা প্রাইমারি স্কুলের সহকারী শিক্ষক ছিলেন। দুই কন্যা আর স্ত্রী সুফিয়াকে নিয়ে মতি মিয়ার সংসার ছিল সুখের। এই আষাঢ়ে মতি মিয়ার মৃত্যুর এক বছর পূর্র্ণ হবে। গত আষাঢ় মাসে বাড়ি ফেরার পথে স্কুলের মেয়েদের উত্ত্যক্ত করার প্রতিবাদ করতে গেলে মতিমিয়াকে পাড়ার কয়েকজন বখাটে কিশোর পাশের রূপসী খালে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। খরস্রোতা খালের পানিতে মতিমিয়া ভেসে যায়। পরদিন পাশের গ্রামের জারুলহাটের ঘাটে মতিমিয়ার লাশ ভেসে ওঠে। স্বামী মারা যাওয়ার পর মেয়ে দু’টোকে শিক্ষিত ও উপযুক্ত করে তোলার সংগ্রামে সুফিয়া নিরলস পরিশ্রম করে চলেছে। স্বামীর রেখে যাওয়া চাষের জমি জিরাত দিয়ে কোনো রকম সুফিয়ার স্বামীহীন সংসার চলে। শালুক ছোটবেলা থেকেই মায়ের খুব বাধ্য মেয়ে। সুফিয়া দুই মেয়েকেই সবসময় বলে- আমার কোনো ছেলে নাই, তোরাই আমার ছেলে। তোরা অনেক বড় হবি। লেখাপড়া শিখে আমার আর তোদের বাবার নাম রোশন করবি। মায়ের স্বপ্ন পূরণে শালুক শৈশব থেকে ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখে। শালুর এই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে ভালো স্কুলে পড়ানোর জন্য শালুককে সুফিয়া একদিন সহোদর বোন নিলুর চট্টগ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়।

মা ও খালার আগ্রহে ক্লাস সেভেনে শালুক সবুজ শালিকের সুখের গ্রাম শিমুলডাঙ্গা ছেড়ে চট্টগ্রামে চলে আসে। নিলু খালা শালুককে নিজের মেয়ের মতোই ভালোবাসে। তাকে শহরের নামকরা একটি স্কুলে ভর্তি করে দেয়। শালুক শহরের স্কুলে ভর্তি হয়ে মায়ের স্বপ্ন পূরণে দিন রাত পড়ালেখায় খাটাখাটুনি করতে থাকে। নিলু খালা তাকে রাতে জোর করে বিছানায় না নিয়ে গেলে সে গভীর রাত অবধি পড়ার টেবিলে বই নিয়ে জেগে থাকে। শালুকের নিষ্ঠা ও অধ্যবসায়ের কারণে সপ্তম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বরাবরই সে প্রথম স্থান অধিকার করেছে।

আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেছে। বাইরে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। দমকা বাতাসে বৃষ্টির জলজ কণা উড়ে এসে শালুকের শরীর ভিজিয়ে দিচ্ছে। বাইরে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আকাশও গর্জন করছে খুব। শালুকের চোখে ভেসে উঠছে তার স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক সজল স্যারের স্ত্রী রীনা ভাবি আর তাদের আদরের নিষ্পাপ শিশু কন্যা অন্তরার মুখ। রীনা শালুককে নিজের বোনের মতো ভালোবাসে। সজল স্যারের বাসায় প্রাইভেট পড়তে গিয়ে রীনার সাথে শালুকের পরিচয় ঘটে। রীনা শালুককে সবসময় বলে- বোন তুমি একদিন অনেক বড় হবে। প্রাইভেট শেষে শালুক রীনার সাথে প্রতিদিনই কিছুক্ষণ গল্প করে। আর রীনাও সে সুযোগে শালুককে এটা ওটা রান্না করে খাওয়ায়। রীনা প্রায়শই তাদের বিয়ে পূর্ব প্রেম ও বিবাহোত্তর ভালোবাসার কেননা কোনো ঘটনা গল্পের ছলে টেনে আনে। রীনার ছোট্ট মেয়ে অন্তরাও শালুক বলতে অজ্ঞান। শালুককে তার খুব পছন্দ। রীনা ভাবির জন্য শালুকের খুব মায়া হচ্ছে। অন্তরার জন্যও তার বুক ফেটে যাচ্ছে। বৃষ্টির তেজ আরো বাড়ছে। শালুক কান্না আর চেপে রাখতে পারল না। হু হু করে কেঁদে ফেলল। বৃষ্টির আওয়াজের সাথে কান্নার আওয়াজ মিশে গেল। ঝিনুক আগের মতোই ঘুমে নাক ডাকছে।

আগামী মাসেই শালুর এসএসসি ফাইনাল পরীক্ষা। তাই পড়ার রিভিশনে দিনের পুরোটা সময়ই চলে যায়। পরীক্ষার পড়া রিভিশনের জন্য গত একমাস শালুক প্রাইভেটে যায়নি। আজ সকালে সজল স্যার নিলু খালার মোবাইলে ফোন করে জানায়- শালুক যেন তার বাসায় আসে, পরীক্ষার বিষয়ে ইম্পর্টেন্ট কিছু আলাপ আছে। নিলু খালার মুখে স্যারের ডাক শুনে শালুক দুপুরে নেয়ে খেয়ে সজল স্যারের বাসায় যায়। স্যারের বাসায় গিয়ে দেখে রীনা ভাবি ও অন্তরা নেই। স্যারকে জিজ্ঞেস করে জানল তারা শপিংয়ে গেছে। বাইরে তখন বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। বাতাসও জোরে বইছে। শালুক নির্দিষ্ট পড়ার টেবিলে বসতে বসতে বলল- ‘স্যার আমাকে কেন আসতে বলেছেন।’ স্যার কোনো উত্তর না দিয়ে শালুকের কাঁধে হাত রাখল। হাতটি ক্রমশ গলা হয়ে বুকের দিকে নামছে। স্যার মিট মিট করে হাসছে। শালুক ভয়ে থর থর করে কাঁপতে লাগল। চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরুল না। একটু পরেই স্যার তাকে ঝাপটে ধরে শোবার ঘরের দিকে ছেঁচড়ে নিয়ে গেল। শালুক সর্বশক্তি দিয়ে বাধা দিতে চাইল, পারল না। যে খাটে বসে শালুক রীনা ভাবির সাথে দিনের পর দিন গল্প করেছে সে খাটে নিয়ে তাকে ফেলল। শালুক চোখে ঝাপসা দেখতে লাগল। তারপর পুরোপুরি হুঁশ হারাল।

জ্ঞান ফেরার পর শালুকের মাথাটা ফাঁকা অনুভব হলো। ধীরে ধীরে জ্ঞান হারানোর আগের সবকিছু তার মনে পড়ল। খাটে উঠে বসতে গিয়ে একবার পড়ে গেল। পুরো শরীর ব্যথায় টন টন করছে। তলপেটে প্রচণ্ড মোচড় অনুভব করল। শক্ত হাতে খাটের প্রান্ত ধরে শালুক উঠে বসল। দেখল সালোয়ার রক্তে ভেসে যাচ্ছে। বাইরে প্রচণ্ড বর্ষণ হচ্ছে। শালুক এলোমেলো পা ফেলে বৃষ্টিতে নেমে পড়ল। আকাশের জলে সে নিজেকে খুলে ধরল। বুক ফেটে কান্না পেল। বৃষ্টির সাথে সাথে চিৎকার করে প্রাণভরে কাঁদল।

সূর্য ডোবার অনেক আগেই অসুস্থ শরীর নিয়ে শালুক নিলু খালার বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। বাস স্টেশনে এসে খালাকে ফোন করে বলে দিল- সে শিমুলডাঙ্গা যাচ্ছে। নিলু খালা কিছু বলার আগেই সে ফোন কেটে দিল। শালুক যখন শিমুলডাঙ্গায় নিজ বাড়ির উঠোনে পৌঁছল তখন দেখল- ঝিনুকের বান্ধবীরা উঠোনের মাঝখানে ডালিম গাছের নিচে কুপি জ্বালিয়ে ঝিনুকের হাতে মেহেদি লাগাচ্ছে আর মাঝে মাঝে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে। শালুক নীরবে অনেকক্ষণ দূর থেকে এই দৃশ্য দেখল। পেছন থেকে মায়ের ডাক শুনে শালুক নড়ে উঠল। মা সুফিয়া খাতুন চাঁদের আলোয় ঠিকই শালুককে দূর থেকে চিনে নিয়েছে। শালু এসেছে, আমার শালু এসেছে বলতে বলতে সুফিয়া দৌড়ে এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বলল- ‘কিরে সোনা তুই এত রাতে কার সাথে এলি।’ শালু শক্ত কণ্ঠে বলল- ‘মা আমি একা এসেছি।’ ঝিনুর বিয়ে খেতে এসেছি। ততক্ষণে ঝিনুক আর তার বান্ধবীরা এসে শালুককে জড়িয়ে ধরল। সুফিয়া বলল- ‘তুই না গতকাল মোবাইল করে জানালি পরীক্ষার জন্য ঝিনুর বিয়েতে আসবি না। আসলে তোর পড়ালেখার ক্ষতি হয়ে যাবে।’ শালু এর উত্তরে কিছু বলল না। সুফিয়া মেয়েকে পেয়ে যেন আকাশের চাঁদ পেল।

ঝিনুক আগের মতোই নাক ডেকে ঘুমুচ্ছে। শালুর বিষণœতা দেখে রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে শালুককে ঝিনুক অনেক প্রশ্ন করেছে। শালুক অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রশ্ন এড়িয়ে গেছে। শালুকের আচরণে ঝিনুক খুশি হতে পারেনি। তবে তার বিয়েতে আসায় ঝিনুক শালুককে দু’বার জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়েছে। বৃষ্টি থেমে গেছে অনেকক্ষণ। ঝিনুক এখনো নাক ডাকছে। নিষ্পাপ মুখের ওপর একগোছা চুল পড়ে আছে। শালুকের বাবার কথা মনে পড়ল। বাবার লাশ আনতে আষাঢ়ের বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে গ্রামের মানুষের সাথে শালুকও পাশের গ্রামের জারুলহাটের ঘাটে গিয়েছিল। বাবার মৃত চেহারা দেখে শালুকের প্রথমে মনে হয়েছিল -বাবা মরেনি। চোখ দুটো বন্ধ করে আছে কেবল। বাবা শালুককে এক্ষুনি কোনো গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবে। বাবা সবসময় কোনো গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার আগে চোখ দু’টো বন্ধ করে ফেলে। শালুক সেদিন তার মৃত বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে নীরবে শুনে নিয়েছিল তার বাবার শেষ গুরুত্বপূর্ণ কথা। শালুকের এখনো মনে আছে বাবা যেন সেদিন জারুলহাটের ঘাটে চোখ দু’টো বন্ধ করে তাকে বলছিল- ‘মারে এই দেশে তোদের অনেক সংগ্রাম করে বড় হতে হবে।’

ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। দু’একটি উড়ন্ত পাখির শিস্ কানে আসছে। শালুক সন্তর্পণে খাট থেকে নেমে ঘরের বাইরে এল। দেখল- কুয়ো থেকে মা অজুর পানি তুলছে। ধীর পায়ে শালুক কুয়োর দিকে এগিয়ে গেল। সুফিয়া শালুককে জড়িয়ে ধরে বলল- ‘নে মা মুখ ধুয়ে নে। ভালোই হলো সকাল সকাল উঠেছিস। ঘরে আজ প্রচুর কাজ।’ শালুক সুবোধ বালিকার মতো কুয়ো থেকে পানি তুলল, কুয়োর ঠাণ্ডা পনিতে মুখ ধুয়ে নিল। পানির সাথে আবারও তার চোখের দু’ক‚ল ভাসল। মুখ ধুয়ে উঠোন মাড়িয়ে ঘরে যাওয়ার পথে উঠোনের মাঝখানে শৈশবের স্মৃতি জড়িত ডালিম গাছটির নিচে সে দাঁড়িয়ে পড়ল। পুবাকাশের ফুটন্ত কোমল আলোর দিকে তাকিয়ে শালুক বিড় বিড় করে বলল- হে প্রভু তুমি আমাকে আমার মায়ের স্বপ্ন পূরণে শক্তি দাও। চোখ দুটো আবার জলে ভরে উঠলো। কিরে মা ঘরে আয়। মায়ের ডাকে শালুক ঘরের দিকে পা বাড়াল। জারুল গাছে আলো আঁধারি থেকে দুটি চেনা পাখির ডাক শোনা গেল। উঠোনের দক্ষিণ দিকের বেলীর বাগান থেকে বেলীর ঘ্রাণ চারিদিকে ম ম করছে। আজ ঝিনুকের বিয়ে। নিজের মনকে শালুক শক্ত রাখার প্রতিজ্ঞা করল। কিছুতেই কাউকে কিছু বুঝতে দেয়া যাবে না। মুখটা জোর করে হলেও আনন্দে ভরে রাখতে হবে। আত্মীয়রা সবসময়ের মতো আজও আদর করে বলবে- আমাদের শালু অনেক বড় ডাক্তার হবে। আমাদের শালু শিমুলডাঙ্গার মুখ উজ্জ্বল করবে ইত্যাদি। সবার সামনে আগের মতোই স্বাভাবিক থাকতে হবে। শালুকের বুক কেঁপে উঠল। সে আগের মতো হাস্যোজ্জ্বল স্বাভাবিক থাকতে পারবে তো। উঠোন থেকে ঘরে পা রাখার সময় একটি অচেনা পাখির ডাক শালুকের কানে এল। কান খাড়া করে শুনল- দূরে কোনো এক দুঃখী পাখি করুণ সুরে একটানা ডেকে যাচ্ছে। তলপেটটা ব্যথায় আবারও টন টন করে উঠল।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj