বাংলা সাহিত্যে রেল : দীপংকর গৌতম

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

জেমস ওয়াটের বাষ্পীয় ইঞ্জিনের আবিষ্কার আমাদের সম্ভাবনার যে দ্বার খুলে দিয়েছিল তার নাম রেলওয়ে। যাতায়াত ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সারা বিশ্বে রেলওয়ে অর্থনীতিতে একটা বিপ্লব এনেছে। স¤প্রতি ফ্রান্সের আবিষ্কারকরণ রেল সবচেয়ে দ্রুত গতিসম্পন্ন রেল। এটা তারা আজ গর্ব করে বলে কারণ গর্ব করার মতো বিষয় এটি। ফ্রান্সের অর্থনীতি বদলে দিতে এটি বিশেষ অবদান রাখবে।

শুধু ফান্স কেন রেলওয়ে ব্যবস্থার উন্নয়নের কারণে জাপান তার কৃষি অর্থনীতিকে পুরো বদলে দিয়েছে। আর আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের রেল উন্নয়ন ঈর্ষণীয় অবস্থায় চলে গেছে। ব্যয়-সাশ্রয়ী, মালামাল পরিবহনে সুবিধা এবং সাধারণ মানুষের পরিবহন যা চলেও দ্রুত সব মিলিয়ে রেল বদলে দিয়েছে সারা বিশ্বের অর্থনীতি। এখানে বিভিন্ন দাদাদের পরামর্শে বাংলাদেশের রেল ধসের পথে। এ চিত্র দূরে নয়। তবে কাহিনীটিা একটু জেনে রাখা ভালো। রেলওয়ে এই উপমহাদেশের একটি অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশে রেলওয়ে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। প্রায় ১৪৫ বছর পূর্বে এর জন্ম হয় ব্রিটিশ আমলে। সর্বপ্রথম ১৮৬২ সালের ১৫ই নভেম্বর কুষ্টিয়া জেলার দর্শনা-জগতী মধ্যবর্তী সেকশনে ৫৩.১১ কিলোমিটার ব্রডগেজ লাইন উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে এর যাত্রা শুরু হয়। ঐ সময়ে ব্রিটেনে গঠিত রেলওয়ে কোম্পানিগুলোই এ অঞ্চলের রেল লাইনের নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনার কাজে নিয়জিত ছিল। দর্শনা-জগতি লাইন নির্মাণ করেছিল ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে। পহেলা জানুয়ারি ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ এ লাইনটি গোয়ালন্দ পর্যন্ত স¤প্রসারিত হয়েছিল। ১৮৭৪-১৮৭৯ সময়ে সারা চিলাহাটি, পার্বতীপুর-দিনাজপুর এবং পার্বতীপুর-কাউনিয়া মিটার গেজ লাইন এবং দামুকদিয়া-পোড়াদহ ব্রডগেজ লাইন নির্মিত হয়। ১৮৮২-১৮৮৪ সময়ে বেঙ্গল সেন্ট্রাল রেলওয়ে কোম্পানি নামের অন্য একটি কোম্পানি বেনাপোল-খুলনা ব্রডগেজ লাইনটি নির্মাণ করে। প্রথমদিকে অবশ্য সাম্রাজ্যবাদীরা শুধুমাত্র তাদের বাণিজিক প্রয়োজনেই এ অঞ্চলে রেল লাইন নির্মাণ শুরু করে। কিন্তু পরবর্তীতে সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার তাদের সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থে ১৮৮৪ সালের ১-লা জালাইন ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ৪ঠা জানুয়ারি ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দে ১৪.৯৮ কি.মি. দৈর্ঘ্য ঢাকা নারায়ণগঞ্জ মিটার হেজ লাইন নির্মাণ করে ঢাকা স্টেট রেলওয়ে যা পরবর্তীতে ইস্টার্ন স্টেট রেলওয়ের সাথে অঙ্গীভূত হয়।

১৮৮৫ সালেই ঢাকা স্টেট রেলওয়ে ঢাকা-ময়মনসিংহ লাইনটি নির্মাণ সম্পন্ন হয়। ১লা এপ্রিল ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দে ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে নর্দার্ন বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ের সাথে একীভূত হয়। ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ সরকারের সহায়তায় আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের সাথে নির্মাণের কাজ করা শুরু হয় যার দায়িত্ব পরবর্তীতে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি গ্রহণ করে। ১লা জুলাই ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম-কুমিল্লা (১৪৯.৮৯ কি.মি.) এবং লাকসাম-চাঁদপুর মিটার গেজ লাইন দুটি ট্রেন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। এ লাইন দুটি নির্মাণ করে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে। ৩রা নভেম্বর ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম-”ট্টগ্রাম বন্দর লাইনটি নির্মিত হয় এবং ১৯৯৬ সালে কুমিল্লা-আখাউড়া এবং আখাউড়া-করিমগঞ্জ লাইন দুটি ট্রেন চলাচলের জন্যে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।

১৮৯৭ সালে দর্শনা-পোড়াদহ সিঙ্গেল লাইনটিকে ডাবল লাইনে রূপান্তরিত করা হয়। ১৮৯৮-১৮৯৯ সময়ে ময়মনসিংহ-জগন্নাথগঞ্জ মিটারগেজ লাইনের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। ১৮৯৯-১৯০০ সময়ে ব্রহ্মপুত্র-সুলতানপুর রেলওয়ে কোম্পানি কর্তৃক সান্তাহার-ফুলছড়ি লাইনটি নির্মিত হয়। আর নোয়াখালী (বেঙ্গল) রেলওয়ে কোম্পানি ১৯০৩ সালে নির্মাণ করে লাকসাম-নোয়াখালী লাইনটি। ১লা এপ্রিল ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে সরকারি কোম্পানি ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে ও আর দুটি কোম্পানি (বেঙ্গল সেন্ট্রাল রেলওয়ে কোম্পানি ও ব্রহ্মপুত্র-সুলতানপুর রেলওয়ে কোম্পানি) মালিকানা অধিগ্রহণ করে। পরবর্তী বছর অর্থাৎ ১৯০৫ সালে সরকার আরও একটি কোম্পানি (নোয়াখালী বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি) কিনে নেয়। এ বছরই কাউনিয়া-বোনার পাড়া মিটার গেজ লাইনটি ট্রেন চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। ১লা জানুয়ারি ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে নোয়াখালী বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের সঙ্গে একীভূত হয়। ১৯০৯ সালে পোড়াদহ-ভেড়ামাড়া সিঙ্গল লাইনটি ডাবল লাইনে রূপান্তরিত হয়।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে পাকিস্তান ইস্টার্ন রেলওয়েকে বাংলাদেশ রেলওয়ে : নামকরণ করা হয়। এ নামেই এখনও পর্যন্ত চলছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

প্রথমদিকে অবশ্য সাম্রাজ্যবাদীরা শুধুমাত্র তাদের বাণিজ্যিক প্রয়োজনেই এ অঞ্চলের রেল লাইন নির্মাণ শুরু করে। কিন্তু পরবর্তীতে সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সরকার তাদের সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থে ১৮৮৪ সালের ১লা জুলাই ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ের ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।

১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের ফলে রেলওয়ে বিভক্ত হয়ে পড়ে অনিবার্যভাবে। বেঙ্গল আসাম রেলওয়ের যে অংশটুকু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সীমারেখার মধ্যে পড়ে তাকে নতুনভাবে নামকরণ করা হয় ‘ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়ে’। কিন্তু পাকিস্তানে নব্য ঔপনিবেশিকতার আশ্রয় নেয় এবং এর নিয়ন্ত্রণবার কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে রেখে দেয়। ১৯৪৮-১৯৪৯ সময়ে পাকিস্তানি নব্য উপনিবেশবাদী সরকার ময়মনসিংহ-ভৈরববাজার রেলওয়ে কোম্পানি এবং রূপশা-বাগেরহাট ব্রাঞ্চ লাইন কোম্পানির মালিকানা অধিগ্রহণ করে নেয়। ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দর ২১ শে এপ্রিল যশোর-দর্শনা ট্রেন লাইনটি চলাচলের জন্যে উন্মুক্ত করে দেয়া হয় এবং ১৯৫৪ সালের অক্টোবর নাগাদ সিলেট-ছাতকবাজার লাইনটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। নব্য উপনিবেশবাদী পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ১৯৬১ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়েকে পুনঃনামকরণ করে একে ‘পাকিস্তান ইস্টার্ন রেলওয়ে’। ১৯৬২ সালে একটি রেলওয়ে বোর্ড গঠন করা হয় এবং রেলওয়ের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব প্রাদেশিক সরকারের ওপর ন্যস্ত করে।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে পাকিস্তান ইস্টার্ন রেলওয়েকে ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে : নামকরণ করা হয়। এ নামেই এখনও পর্যন্ত চলছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। স্বাধীন বাংলাদেশের ৩৩ বছরে একমাত্র জামতৈল-বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব পর্যন্ত ব্রডগেজ লাইনের স¤প্রসারণ কাজটি সম্পন্ন হয় বিগত ২৩ শে জুন ১৯৯৮ সালে। পরবর্তীতে অবশ্য জয়দেবপুর পর্যন্ত এ লাইনটি স¤প্রসারিত হয় এবং পূর্ব রেলপথের সাথে যুক্ত হয় (২০০৪ সালে)। বাংলাদেশ রেলওয়ের আবির্ভাবের এ শানে নজুলটুকুর আলোকে আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি যে, আমাদের ভূ-খণ্ডে রেললাইন যেটুকু গড়ে উঠেছে তা প্রধানত সাম্রাজ্যবাদী ঔপনিবেশক ব্রিটিশ আমলেই হয়েছে। নব্য উপনিবেশবাদী পাকিস্তানি আমলে এর উল্লেখ করার মতো কোনো স¤প্রসারণ বা উন্নতি হয়নি। অথচ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পশ্চিম পাকিস্তানের রেলপথের স¤প্রসারণ করে প্রায় দ্বিগুণে উন্নতি করে। স্বাধীন বাংলাদেশের ৩৩ বছরের জীবনে রেলপথের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধির বদলে আরও হ্রাস পেয়েছে। শুধু লাইনের দৈর্ঘ্য কমেছে তাই-ই নয়, বাংলাদেশের রেলওয়ের সার্বিক অধঃপতন ঘটেছে এ সময়ে।

স¤প্রতি যমুনা নদীর পশ্চিমে ৮৬০ কিলোমিটার ব্রডগেজ ও ৫৪২ কিলোমিটার মিটার গেজ, রূপসা নদীর দক্ষিণে ২৫ কিলোমিটার ব্রডগেজ এবং যমুনা নদীর পূর্বে ১২৭৯ কিলোমিটার মিটার গেজ এই ৪টি খণ্ডিত অংশ নিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের নেটওয়ার্ক গঠিত ছিল। পরবর্তীতে রূপসা-বাগেরহাট রেললাইন বন্ধ করে দেয়া এবং জামতৈল হতে জয়দেবপুর পর্যন্ত ৯৯ কিলোমিটার দ্বৈত গেজ লাইন নির্মাণের ফলে রেল উত্তর ও দক্ষিণ বঙ্গে সাথে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হয়েছে।

বাংলাদেশে রেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে মন্তব্য করা অনুচিত হবে। বর্তমান আদৌ উপভোগ্য নয়। তবে অতীতের দিনগুলো অন্তত গত শতকের পাঁচের দশক পর্যন্ত সত্যিই ছিল রোমাঞ্চকর। নানাবিধ শিহরণ, উত্তেজনা এবং রোমাঞ্চে ভূতপূর্ব ছিল বাঙালির রেল জীবন। রেলে রোমাঞ্চও ছিল। কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, সিনেমায় তার প্রমাণ মেলে।

বাংলাদেশে রেলগাড়ির যাত্রা শুরু হয় উনিশ শতকের পাঁচের দশকে। রেলগাড়ি দেখে এক তর্কালঙ্কার পণ্ডিত মন্তুব্য করেছিলিন, অগ্নিদেবের এই রথে অতিরিক্ত ভ্রমণে ফল আশু মৃত্যু। রেলভ্রমণ অবশ্য তাতে ঠেকানো যায়নি। তবে রেল নিয়ে বিস্ময় দূর হতে সময় লেগেছিল।

বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের গোড়ার দিকের বিখ্যাত যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞানমনস্ক প্রাবন্ধিক অক্ষয় কুমার দত্তের নাম বিস্মৃত হওয়ার নয়। বিজ্ঞানের অনেক পারিভাষিক শব্দও তিনি তৈরি করেছিলেন। তাঁর তৈরি উপন্যাস কুমেরু, সুমেরু, প্রবালদ্বীপ, মানমন্দির, অনুবীক্ষণ যন্ত্র, দূরবীক্ষণ যন্ত্র, প্রাণিবিদ্যা ইত্যাদি অনেক পারিভাষিক শব্দেরই পরে আর কোনো বিকল্প খুঁজতে হয়নি। অক্ষয় কুমার দত্তের বিখ্যাত সব প্রবন্ধ গ্রন্থের ভিড়ে চাপা পড়া বিস্মৃত এক ছোট গ্রন্থের নাম বাষ্পীয় রথারোহীদিগের প্রতি উপদেশ বাষ্পীয় রথারোহণসিধি। এই বইটি থেকে রেলগাড়ি নিয়ে তৎকালীন বাঙালির নানাবিধ আনন্দ ও সংকটের পরিচয় পাওয়া যায়।

সংকট মোচনের বিধি ইংরেজি গ্রন্থ হইতে সংকলন করিয়া বাতলে দিয়েছিলেন অক্ষয় কুমার দত্ত। রেলগাড়ি সম্পর্কে বিস্ময় তার নিজেরও ছিল। তিনি লিখছেন বাষ্পীয় রথ পরমদূত বস্তু। উহা দ্বারা এক মাসের পথ এক দিবসে ভ্রমণ করিয়া অক্লেশে অশেষ বিষয়ের বাসনা সুসিদ্ধ করা যায়। উহার দ্বারা, দূরদেশীয় পণ্য সামগ্রী সকল অনায়াসে অবিলম্বে নানা স্থানে নীত হইয়া লোকের ভোগতৃজ্ঞা চরিতার্থ করিতে পারেম স্বদেশ দর্শনোৎসুক দূর প্রবাসী ব্যক্তিরা বারম্বার স্বদেশ প্রত্যাগমনপূর্বক পরম স্নেহভাজন স্বজন বর্গের মখারলোকন করিয়া পকিত হইতে পারেন এবং নৈসর্গিক শেভাপ্রিয় সহৃদয় মহশয়ের অল্পকালের মধ্যে অবলীলাক্রমে …বিশ্লেষণে ও স্থান বিশেষের শোভা সদর্শন করিয়া… বিকশিত করিতে পারেন।

রেলগাড়ি সম্পর্কে অনেক কথা লিখলেও রেলের কামরায় বসে থাকা মানুষের চোখে দিনচক্রাকাল ফেকিভাবে আবর্তিত হয়। শিশুমন বিহŸলকারী সেই তথ্য অক্ষয় কুমার দত্ত অবশ্য দেননি। এ প্রলোভন তিনি কিভাবে পরিত্যাগ করেন তা বলা মুশকিল। যদিও বাষ্পীয় রথে কিভাবে উঠতে হয় কিভাবে বসতে হয় এরকম বিশদ বিবরণ তিনি প্রদান করেছেন ১৩টি নিয়ম বর্ণনা করে। এসব নিয়ম অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে তিনি রথারোহীদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানিয়ে ছিলেন। কারণ তিনি জেনেছিলেন সে সকল নিয়ম অবহেলন করাতে অন্যান্য দেশে অনেক লোকে অঙ্গভঙ্গ ও প্রাণ সংহার হইয়াছে।

আমরা সংক্ষেপে কতিপয় নিয়মের বর্ণনা তুলে ধরছি :

প্রথম নিয়মে তিনি বলেছেন যে সময় বাষ্পীয় রথ গমন করিতে থাকে সে সময় তাহাতে আরোহণ ও তাহার হইতে অবতরণ করা কর্তব্য নহে। অবতরণ করলে কি হয় উদাহরণ সহযোগে তিনি তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। এমন উদাহরণ প্রতিটি নিয়মের সঙ্গে তিনি তুলে ধরেছেন। স্টেশনে কিভাবে বসে থাকতে হবে তার নিয়মও তিনি বাতলে দিয়েছেন ৬ষ্ঠ নিয়মে তিনি বলছেন যে সকল ব্যক্তি বাষ্পীয় রথে আরোহণ করিবার বাসনায় কোনো আড্ডায় গিয়া প্রতীক্ষা করিয়া থাকে তাহাদিগের অতি সাবধানে বিশিষ্ট রূপ সতর্ক হইয়া থাকা অবশ্যক। নতুবা হঠাৎ গাড়ি আসিয়া মারা পরিবার সম্ভাবনা। ইংল্যান্ডে অনেক অনেক ব্যক্তি এরূপ স্থানে অনবহিত ও নিদ্রিত থাকাতে রথ চক্রে আহত হইয়া হত হইয়াছে।

অক্ষয় কুমার দত্ত যুগ বাংলা গদ্যকে সুঠাম ভিত্তির ওপর গড়ে তোলার যুগ উনিশ শতকের সেই ইংরেজ রাজত্বের সময় বাঙালি লেখকেরা তাদের চেতনায় সহজে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করতেন না। খুঁজতেন বাংলা প্রতিশব্দ অথবা বাংলা পারিভাষিক শব্দ। ইংরেজি শব্দ অযথা ব্যবহারের বাহানা খুঁজতেন না। অক্ষয় কুমার দত্তের যুগে রেলগাড়ি বাংলা হয়েছিল বাষ্পীয় রথ, বাষ্পীয় শকট। রেললাইন ছিল লৌহবম্ম। অক্ষয় কুমার দত্ত স্টেশনের বাংলা করেছিলেন আড্ডা।

রেলগাড়িতে প্রথম ওঠার চাঞ্চল্য ও সতর্কতা বহুদিন বিদ্যমান ছিল। রবীন্দ্রনাথ রেলগাড়িতে প্রথম ওঠেন নিতান্ত বালক বয়সে- সত্য বলিয়াছিল, বিশেষ দক্ষতা না থাকিলে রেলগাড়িতে চড়া এক ভয়ঙ্কর সংকট, পা ফসকাইয়া গেলেই আর রক্ষা নাই। তারপর গাড়ি যখন চলিতে আরম্ভ করে, তখন শরীরের সমস্ত শক্তিকে আশ্রয় করিয়া খুব জোর করিয়া বসা চাই, নহিলে এমন ধাক্কা দেয় যে মানুষকে কোথায় ছিটকাইয়া পড়ে তাহার ঠিকানা পাওয়া যায় না।

বলাবাহুল্য, সত্যপ্রসাদও তখন বালক। অক্ষয় কুমার দত্তের বইটি সম্ভবত তার পড়া ছিল। সে জন্যই বর্ণনায় তার কোনো ঘাটতি ছিল না বরং বেশিই ছিল। তবে রবীন্দ্রনাথ জানিয়েছেন, স্টেশনে পৌঁছিয়া মনের মধ্যে বেশ একটু ভয় ভয় করিতেছিল। কিন্তু গাড়িতে এত সহজেই উঠিলাম যে মনে সন্দেহ হইল, এখনো হয়তো, গাড়ি অঙ্গটাই বাকি আছে। তাহার পরে যখন অত্যন্ত সহজে গাড়ি ছাড়িয়া দিল তখন কোথাও বিপদের… মনটা বিমর্ষ ইইয়া গেল।

কোনো অঘটন ঘটল না দেখে রবীন্দ্রনাথ রেলগাড়িতে চড়ার সতর্কতা সম্পর্কে মনমরা হয়েছিল, কিন্তু নিরাসক্ত হননি। চাঞ্চল্য ঠিক সময়েই জেগেছিল। তিনি লিখেছিলেন, বোলপুরের উদ্দেশ্য রেলগাড়িতে চড়িলাম, এ আমার প্রথম রেলে চড়া। গাছপালা, মাঠ, মাঝে মাঝে গ্রামের কুটিরগুলি যখন দুইটি শ্যামল প্রবাহ আকারে গাড়ির দুই ধার দিয়া মরীচিকার বন্যার মতো ছুটিয়া যাইতে লাগিল তখন পিতার কাছে সম্ভ্রমে সংযত হইয়া বসিয়া থাকা আমার পক্ষে বড়ই কঠিন হইয়া উঠিল।

রেলগাড়ির রোমাঞ্চ ও রোমান্সের দিনগুলো অবসিত হয় কয়লার ইঞ্জিন উঠে গিয়ে ডিজেল ইঞ্জিন চালু হওয়ার পর। আমেরিকায় ডিজেল ইঞ্জিনচালিত রেলগাড়ি চালু হওয়ার কিছুদিন পর এক মার্কিন বিজ্ঞানী দুঃখ করে বলেছিলেন, প্রথম সাক্ষাতের নীরব প্রেম এবং প্রিয়জনকে বিদায় জানানোর মাধুর্য কয়লার ইঞ্জিন উঠে যাওয়ায় নষ্ট হয়ে গেল কারণ, ডিজেল ইঞ্জিনে বাড়লো গাড়ির গতি। বাড়লো মানুষের ব্যস্ততা।

এখন যারা বৃদ্ধ অথবা পৌঢ় কথাটা অন্যভাবে ঘুরিয়ে বললে গত শতকের তিন চার অথবা পাঁচের দশকে যারা ছিলেন তরুণ তাদেরও অনেকেরই স্মৃতিপটে রেল রোমান্সের অনেক চিত্র এখনও বিদ্যমান। আগের দিনে তো বটেই অন্তত সেই সময়টাতে বিশেষত যারা ছিলেন গ্রামের তরুণ। নিজেরদের চাচাতো, মামাতো, ফুপাতো বোনদের বাইরে জীবনের প্রথম তারা অনাত্মীয়, অচেনা কোনো তরুণের সঙ্গে শিহরণ জাগা নিয়া সাক্ষাৎ লাভ করতেন রেলস্টেশন, রেলগাড়িতে, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় তো অনেক পরের ব্যাপার।

ঘটনাচক্রে এসব তরুণের প্রাথমিক প্রেমজীবন কিন্তু শুরু হতো বিরহ দিয়ে। সিনেমা আর গ্রামোফোন রেকর্ডের কল্যাণে বিরহের গানের তখন বেশ রমরমা ছিল। পরে যুক্ত হয়েছিল যাযাবর রচিত দৃষ্টিপাত। বিরহ বিলাসী কারো কণ্ঠে বিরহের গান অথবা দৃষ্টিপাতের বিরহ ঘন পঙ্ক্তিগুলোর আকস্মিক আবির্ভাব ঘটলে অভিজ্ঞরা বুঝে নিতেন বালকের সঙ্গে রেলস্টেশন অথবা রেলগাড়িতে কোনো এক বালিকার চোখাচোখি হয়েছিল একবার নয় সম্ভবত বেশ কয়েকবার। তাতেই ঝলকের এই বিরহ দশা। এ অবস্থা ছয়ের দশকের প্রথমাধ্যের তরুণ বয়সীদের মধ্যেও বিদ্যমান ছিল।

রেলের রোমান্সকে সর্বপ্রথম সাহিত্যে ঠাই দিয়েছিলেন সম্ভবত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রেলগাড়ি এমনিতেই তার প্রিয় ছিল। রেলগাড়ির প্রসঙ্গত অনুষঙ্গ তাই বারবার এসেছে তার রচনায়। প্রবন্ধেও তিনি রেলগাড়িকে উপমা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। শিক্ষার বিকিরণ প্রবন্ধে এক জায়গায় তিনি বলেছেন, এই শিক্ষাবিধি রেলকামরার দীপের রচনা। কামরার উজ্জ্বল কিন্তু যে যোজন যোজন পথ .. ও গাড়ি …চলছে ছুটে সেটা অন্ধকারে লিপ্ত। কারখানার গাড়ি চাই… সত্য আর প্রাণ বেদনায় পূর্ণ সমস্ত দেশটাই যেন… রেলগাড়ি প্রসঙ্গ অবশ্য বঙ্কিমচন্দ্রের প্রবন্ধতেও রয়েছে। ঐ দেখ লৌহ বর্ম্মে লৌহতুরঙ্গ কোটি উচ্চশব্দ অতিক্রম করিয়া এক মাসের একদিকে যাইতেছে। বঙ্কিমচন্দ্রও দেখেছিলেন তবে তা অন্যভাবে। নরপতিরা স্ত্রীকে নিয়ে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিমচন্দ্র নতুন কর্মস্থলে যোগদান করতে যাচ্ছে। স্টেশনে ট্রেন থেমেছে। স্ত্রী জেনীনা কামরায়। বঙ্কিমচন্দ্র প্লাটফরমে পায়চারি করছেন। হঠাৎ দেখলেন এক তরুণ তার স্ত্রীর কামরার পাশে বারবার ঘুরঘুর করছে। জীবনাকারেরা জানাচ্ছেন, বঙ্কিমচন্দ্র রেল রোমান্সকে কখনো তার রচনার উপজীব্য করেননি। সম্ভবত রেলের প্রতি তার বিতৃজ্ঞা জন্মেছিল।

রেল প্রসঙ্গ এবং রোমান্স এসেছে রবীন্দ্রনাথের কবিতায় নানাভাবে। হঠাৎ দেখা কবিতাটি ব্যর্থ প্রেমিকের নম্র বিরহের অসাধারণ চিত্র-

রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা

ভাবিনি সম্ভব হবে কোনদিন।

… থমকে গেল আমার সমস্ত মনটা

চেনা লোককে দেখলাম অচেনার গাম্ভীর্যে।

রেলগাড়ি ছাড়া এই ঘটনা ঘটানো সম্ভব হতো না। শেষের কথোপকথনে ব্যর্থ হাহাকার-

আমাদের গেছে যে দিন

একেবারেই কি গেছে

কিছুই কি নেই বাকী?

রাতের সব তারাই আছে

দিন কি আলোর গভীরে।

রবীন্দ্রনাথের এই কবিতা থেকে বীজ সংগ্রহ করে সুবোধ… সৃষ্টি করেছিলেন তার বিখ্যাত গল্প জতুগৃহ স্টেশনে ঘটা পর। গল্পের শুরু এভাবে- এত রাতে এটি কোন ট্রেন? এই শীতার্ত বাতাস, অন্ধকার আর ধোঁয়া বৃষ্টির মধ্যে ট্রেনটি যেন হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে ছুটে এসে রাজপুর জংশনের প্লাটফরমের গায়ে লাগলো।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj