ভয় : বিভুরঞ্জন সরকার

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

সম্প্রতি আমার স্ত্রীর মধ্যে একটি ভয় কাজ করছে। দরোজা খোলার ভয়। ডোরবেল বেজে উঠলেই আমার স্ত্রী আজকাল আতঙ্কবোধ করেন। তার আশঙ্কা, দরোজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে হয়তো কোনো আততায়ী তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে অথবা তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়ে ভেতরে ঢুকবে, খুঁজতে থাকবে আমাকে এবং তারপর কখন আমাকে নাগালের মধ্যে পাবে তখন এলোপাতাড়ি কুপিয়ে আমার রক্তাক্ত দেহটা ফেলে রেখে বীরদর্পে বের হয়ে যাবে। আমি আমার স্ত্রীকে বোঝানোর চেষ্টা করছি, যদিও আজকাল এটা জোর দিয়ে বলা যায় না, কোন গোপন আততায়ী কখন কার ওপর হামলে পড়বে, তারপরও এখনো আমার নিশ্চিত বিশ্বাস আমার ক্ষেত্রে এরকম মৃত্যু হবে না। আমি আমার স্ত্রীকে তার মন থেকে ভয় দূর করার জন্য বলি : তুমি শুধু শুধু আতঙ্কবোধ করছো। ভয়কে জয় করতে শেখো। না হলে বেঁচে থেকেও এক সময় মরার মতো হয়ে যাবে। আর সব থেকে বড় কথা আমাকে কেউ কেন মারতে আসবে?

আমার স্ত্রী বলে, কেন দেখছো না, সব নির্দোষ মানুষগুলোকে কেমন টপাটপ মেরে ফেলছে? তুমি রাজনীতি বিষয়ে লেখালেখি করো। তোমার লেখা যাদের পছন্দ হবে না তারাই তো তোমাকে মেরে ফেলতে পারে। মানুষ মারা এখন কোনো ব্যাপার না। কাউকে মারলে কারো কিছু হয় না, হচ্ছে না।

স্ত্রীকে ভরসা দিয়ে বলি, দেশে সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু গুপ্তহত্যার ঘটনা ঘটেছে ঠিকই। কিন্তু তার একটিও রাজনৈতিক বিষয়ে লেখালেখির কারণে নয়। আমি দীর্ঘ দিন ধরেই রাজনীতি বিষয়ে লিখছি। আমার লেখা অবশ্যই কারোর পক্ষে যায়, আবার কখনো কারো বিপক্ষে। যেহেতু আমাদের দেশ এখন রাজনৈতিকভাবে চরমরকম বিভক্ত, তাই রাজনীতি নিয়ে লিখে সব পক্ষকে এক সঙ্গে সমানভাবে খুশি করা সম্ভব নয়। রাজনীতিবিদদের মধ্যেও ধৈর্য, সংযম, সহনশীলতার মাত্রা যেমন দিন দিন কমছে, তেমনি তাদের সমর্থকদের মধ্যেও সেটা সংক্রমিত হচ্ছে। এক পক্ষ আরেক পক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে, রক্ত ঝরছে। অনেকেই যুক্তির জোর দেখানোর চাইতে জোরের যুক্তি দেখাতেই বেশি পছন্দ করছে। কিন্তু তারপরও লক্ষণীয় এটাই যে, দেশের অসংখ্য গণমাধ্যমে প্রতিদিন অনেক রাজনৈতিক লেখা ছাপা হচ্ছে। এসব লেখাই হয় কারো পক্ষে অথবা বিপক্ষে যাচ্ছে। মতামত দেয়ার কারণে কারো ওপর আজ পর্যন্ত কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি কিংবা এ জন্য কাউকে হত্যারও শিকার হতে হয়নি। কাজেই আমার কোনো বিপদ আমি অন্তত দেখছি না।

আমি যতো বোঝাতে চেষ্টা করি, আমার স্ত্রী ততো অবুঝ হওয়ার চেষ্টা করে। তার ধারণা, লেখালেখি ছাড়া অন্য কারণেও তো আজকাল বাসায় ঢুকে মানুষ খুনের ঘটনা ঘটছে। আমাদের বাসায়ও যদি তেমন কিছু ঘটে। কেউ যদি চুরি-ডাকাতির মতলবে এসে তারপর…

আমার স্ত্রীর এই আশঙ্কাটাও আমি উড়িয়ে দেই এই যুক্তিতে যে, আমাদের বাসায় চোর-ডাকাত আসার সম্ভাবনাও কম। আমার ধারণা, যাদের বাসায় সাধারণত চুটি বা ডাকাতির ঘটনা ঘটে তাদের প্রচুর স্বর্ণালঙ্কার কিংবা নগদ অর্থ অথবা অন্য দামি সম্পদ থাকে বলেই চোর-ডাকাত খোঁজখবর নিয়ে হানা দেয়। যাদের ঘরে দামি মালামাল কিংবা টাকা-পয়সা জমা নেই তাদের বাড়ি চোর-ডাকাত ঢুকবে কোন দুঃখে? আগাম তথ্য না থাকলে চোর-ডাকাতরা কোনো বাসায় মেহমান হয় না। সময়ের দাম আছে না! আজ পর্যন্ত এমন খবর কি শোনা গেছে যে, চুরি কিংবা ডাকাতি হয়েছে অথচ সম্পদ লুট হয়নি? তো, আমার স্ত্রীকে বলি, আমাদের বাসায় চোর-ডাকাত আসবে কি আমাদের সঙ্গে খোশগল্প করার জন্য? আমাদের ঘরে না পাবে নগদ টাকা, না পাবে সোনাদানা।

ভুল তথ্যের ভিত্তিতে বাসায় এসে সোনাদানা না পেয়ে ডাকাতদল ক্ষিপ্ত হয়ে যদি ঘাড়ে বসিয়ে দেয় চাপাতির কোপ কিংবা হাতে থাকা আগ্নেয়াস্ত্রের একটি গুলিতে ফুটো করে দেয় বুক? উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জানতে চায় স্ত্রী। এমন যে ঘটতে পারে না তা নয়। বিষয়টি আমাকেও ভাবায়। তবে পরিস্থিতি হালকা করার জন্য প্রসঙ্গান্তরে যাওয়ার কথা ভাবতেই মনে পড়ে যায় প্রখ্যাত সাংবাদিক শফিক রেহমানের লেখায় ব্যবহৃত একটি জোকস। শফিক রেহমান মনে করেন, বাঙালির আগ্রহের দুটি জায়গা হলো রাজনীতি এবং সেক্স। সেজন্য তার লেখায় এই দুই উপাদানের ব্যবহার আছে। সিরিয়াস রাজনৈতিক আলোচনার সঙ্গে একটু ‘পরকীয়ার’ মিশেল ঘটলে বাঙালির আড্ডা একেবারে জমে ক্ষীর। শফিক রেহমানের কৌতুকটা এরকম :

একদিন ভোরবেলা এক বয়স্ক ভদ্র লোক ও ভদ্র মহিলা প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন। ছিনতাইকারীরা ভদ্র মহিলার দিকে পিস্তল উঁচিয়ে বলে, সোনাদানা যা আছে দিয়ে দিন। ভদ্র মহিলা ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে সামনের ভদ্র লোককে দেখিয়ে বলেন, আমার কাছে সোনাদানা কিছু নেই বাবা। ওর কাছে একটি সোনা, দুটো দানা আছে। ওগুলো এখন আমার কাজে লাগে না।

স্ত্রীকে এই জোকস শুনিয়ে বললাম, তুমিও ডাকাতদের আমাকে দেখিয়ে বলে দেবে, সোনাদানা তোমার কাছে নয়, আমার কাছে আছে। ওরা আমাকে ধরবে, তুমি বেঁচে যাবে। আমার এই জোকস শুনে স্ত্রী খুশি না হয়ে বরং বিরক্ত হলো। বললো, তোমার এসব রসিকতা আমার ভালো লাগে না। কিছুক্ষণ মুখ গোমড়া করে থেকে বললো, জানো, তোমার কিছু হয়ে গেল আমাদের কী হবে?

কী হবে তোমাদের?

আমরা তো একেবারে পথে বসবো। ছেলেমেয়ে নিয়ে সংসার চালাবো কীভাবে?

স্ত্রীর উদ্বেগের কারণটা আরো স্পষ্ট হলো। সংসারে যেহেতু আমি একমাত্র উপার্জন করা মানুষ, তাই আমি এখনই মারা গেলে কিংবা আমাকে কেউ মেরে ফেললে আমার উপার্জনের ওপর যারা নির্ভরশীল তাদের চলবে কী করে?

স্ত্রীকে সান্ত¡না দিয়ে বলি, এই ব্যাপার! আমার মৃত্যু নয়, মৃত্যু-পরবর্তী অনিশ্চয়তা নিয়েই তোমার ভয়? আরে এসব নিয়ে একদম ভাববে না। পৃথিবীটা এক অদ্ভুত জায়গা। এখানে কারো জন্য কিছু পড়ে থাকে না, থেমে থাকে না। এখন মনে হচ্ছে, এই মানুষটা না থাকলে চলবে না। কিন্তু সত্যি যখন মানুষটি থাকে না, তখন সাময়িক একটু সমস্যা হলেও সেটা একসময় কোনো না কোনোভাবে কেটে যায়। কাজেই আমি না থাকলে কী হবে এটা নিয়ে দুশ্চিন্তা একেবারেই অর্থহীন। তাছাড়া জানোই তো, কথায় আছে, মুখ দিয়েছেন যিনি, আহার দেবেন তিনি। বাংলাদেশ এখন আর গরিব দেশ নয়। এখন কোনো মানুষের পক্ষেই আর ইচ্ছে থাকলেও অনাহারে মরে যাওয়া সহজ নয়। না খেয়ে মরার একটি খবরও যদি গণমাধ্যমে প্রচার করা হয়, তাহলে সরকারের ইজ্জত থাকবে না। সরকার তার সম্মান রক্ষার জন্যই সবার মুখে খাবার তুলে দিতে বাধ্য। তাছাড়া এখনকার বাংলাদেশ এক ভিন্ন বাংলাদেশ। যারা এক সময় বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে উপহাস করতো তারাই এখন আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রগতি-সমৃদ্ধিতে বিস্ময় প্রকাশ করছে। তাছাড়া আমাদের দেশে এমন অনেক নজির অতীতে আছে যাতে দেখা যায়, সন্তান ‘উপযুক্ত’ হওয়ার আগে পিতৃহীন হয়েও তারা ঠিকই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। পিতা-মাতা সন্তানদের সহায় এটা ঠিক, কিন্তু তার মানে এই নয় যে, পিতৃহীন সন্তানরা সবাই পথহারা হয়েছে। কাজেই আমি না থাকলে আমার ছেলেমেয়ে অথৈ সাগরে পড়বে না। একটা না একটা উপায় অবশ্যই হয়ে যাবে।

মুখ ঝামটা দিয়ে স্ত্রী বলে, রাখো তোমার লেকচার। আর কোনো ক্ষমতা না থাকলেও কথা বলার ক্ষমতাটা ভালোই রপ্ত করছো।

এবার আমরা অবস্থা জোঁকের মুখে নুনের ছিটা পড়ার মতো। আমার অক্ষমতা সম্পর্কে আমার স্ত্রীর থেকে আর ভালো কারো জানার কথা নয়। আমার যে কোনো সঞ্চয় নেই, আজ চোখ বন্ধ করলে, কাল আমার ওপর নির্ভরশীল সদস্যরা যে অথৈ পানিতে পড়বে (কারণ ওরা কেউ এখনো আয় উপার্জন করে না) এটা বাইরের কারো পক্ষে জানা সম্ভব নয়। বাইরের কেউ হাঁড়ির খবর রাখে না, রাখে স্ত্রী। আমি যে জীবনে কিছু করতে পারলাম না তা নিয়ে প্রায় তিন দশক ধরেই স্ত্রীর খোটা শুনে আসছি। আমার বন্ধুরা প্রায় সবাই গাড়িবাড়ির মালিক হয়েছে অথচ চালচুলোহীন আছি আমি।

আমি বন্ধুদের সাফল্যে মোটেও ঈর্ষাবোধ করি না। বরং ভালো লাগে তাদের সাফল্য দেখে। আমি যে জীবনে কিছু করতে পারলাম না, সেটা নিয়েও আমার নিজের তেমন কোনো হতাশা নেই। আমি হিসাব করে বলি, আমার বন্ধুর সংখ্যা যদি হয় একশজন, তাহলে গাড়িবাড়ি হয়েছে খুব জোর ত্রিশ জনের। সত্তর জনেরই হয়নি। অর্থাৎ বেশিরভাগই আমার দলে। কিন্তু আমার স্ত্রীর চোখ যায় শুধু যাদের হয়েছে, তাদের দিকে। যাদের হয়নি তাদের দিকে তাকাতেই চায় না। পৃথিবীর বেশিরভাগ সম্পত্তির মালিক গুটিকয়েক মানুষ। বেশিরভাগ মানুষই তো সম্পদহীন। সম্পদের ওপর এই বৈষম্যপূর্ণ অধিকারের কারণেই তো পৃথিবীতে এতো অশান্তি। সম্পদের যাতে সুষম বণ্টন নিশ্চিত হয়, সব মানুষ যাতে নিজ নিজ প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পদের মালিকানা পেতে পারে সেজন্য সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন নিয়েই তো এক সময় কমিউনিস্ট পার্টি করেছি। কিন্তু আমাদের সে স্বপ্ন পূরণ হয়নি। এ জন্যও আমার কোনো দুঃখ নেই। আমার বন্ধুদের সবাই না হলেও কেউ কেউ যে কিছুটা সম্পদের অধিকারী হয়েছে, এটাকেও আমি আমার নিজের এক ধরনের প্রাপ্তি বলে মনে করি।

আমার স্ত্রী অবশ্য তা করে না। আমার বুঝ এবং তার বুঝ এক রকম নয়। সেটা হওয়ারও কথা নয়। সে সংসার চালায়। আমি চাকরি করি। সে করে না। চাকরি করে টাকা রোজগার করা যেমন কঠিন তেমনি রোজগারের সেই নির্দিষ্ট টাকা দিয়ে সংসার চালানোও কঠিন কাজই বটে। সংসারটা স্বপ্ন বিলাসের জায়গা নয়। তাকে প্রতিদিন বাজারে যেতে হয়, সংসারের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে হয়। বাজার দরের উত্তাপটা সরাসরি তার হাতে লাগে। কেনার জন্য টাকা লাগে। আমার রোজগার কম, আমার সঞ্চয় নেই, সেজন্য বাজারে কোনো জিনিস আমার জন্য কম দামে বিক্রির ব্যবস্থা নেই। আমার বিত্তবান বন্ধুর স্ত্রীকে যে দামে জিনিস কিনতে হয়, আমার স্ত্রীকেও সে দামেই কিনতে হয়।

কোন প্রসঙ্গ থেকে কোন প্রসঙ্গে চলে এসেছি। হ্যাঁ বলছিলাম, আমার মৃত্যু ভয় নিয়ে স্ত্রীর উৎকণ্ঠার কথা। যেভাবে বাড়িতে ঢুকে আজকাল মানুষকে মেরে ফেলা হচ্ছে তাতে আমার স্ত্রীর এই আশঙ্কা জোরদার হচ্ছে যে আমাকেও কেউ হয়তো ওভাবেই খুন করবে। কাজেই ডোরবেল বাজলে কিংবা কড়া নাড়ার শব্দ শুনলেই সে আঁতকে ওঠে। দরোজায় লাগানো ‘চোখ’ দিয়ে ভালো করে দেখে কিংবা আগন্তুকের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার আগে দরোজা খুলতে চায় না। আমি বাসায় থাকলে সাধারণত আমিই দরোজা খুলে দেই এবং আগন্তুক কে সেটা না জেনেই। আগেই বলেছি, কোনো ঘাতকের হাতে আমার মৃত্যু হবে- এটা কখনো আমার মনে হয় না। আমি এটা জানি যে, আমার কোনো ব্যক্তিগত শত্রু নেই। শত্রু তৈরির জন্য যে যোগ্যতা লাগে সেটাও আমার নেই। কারো সঙ্গে জ্ঞানত আমি দুর্ব্যবহার করি না, করিনি। কড়া কথা বলিনি কাউকে। যদিও কখনো কারো সঙ্গে মনোমালিন্য হয়ে থাকে, সেটা এতোই স্বল্প সময়ের যে তা মনে রাখার মতো নয়।

আমি আমার স্ত্রীকে এটা অনেক দিন বলেছি যে, আততায়ীর হাতে আমার মৃত্যু হওয়ার আশঙ্কা নেই। মরতে একদিন হবেই কিন্তু ঘাতকের হাতে না। মানুষের সঙ্গে মানুষের শত্রুতা তৈরির মোটা দাগের দুটি কারণ হচ্ছে, এক. কারো উপকার করা এবং দুই. কারো অপকার করা। এই দুটির একটি করার ক্ষমতাও আমার নেই। আমি না পারি কারো উপকার করতে, না পারি কারো অপকার করতে। উপকার এবং অপকার দুটি করার জন্যই হিম্মত থাকতে হয়, বুকের পাটা থাকতে হয়, যোগ্যতা থাকতে হয়। আমার তা নেই। কেউ হয়তো প্রশ্ন তুলতে পারেন, কারো উপকার করলে আবার শত্রুতা তৈরি হবে কেন? মানুষের উপকার করা তো ভালো। যারা এটা বলেন, তারা কি শোনেননি ‘উপকারীকে বাঘে খায়’? উপকার করে বিপদে পড়ার ঘটনা তো ঈশপের গল্পেও পাওয়া যায়। তাছাড়া ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সেই কথা কি ভুলে যাওয়ার মতো? একবার একজন বিদ্যাসাগরকে গিয়ে বললেন, অমুকে আপনার নিন্দা-মন্দ করছে। ব্যাপারটা কি? একটু ভেবে বিদ্যাসাগর জবাব দেন, হ্যাঁ ‘অমুক’ সেটা করতেই পারে। আমি যে ওর বিপদের সময় টাকা ধার দিয়ে উপকার করেছিলাম!

কারো উপকার করলে দুই ভাবেই শত্রু তৈরি হতে পারে। এক. যার উপকার করা হলো, সে মনে মনে ভাববে, বেশি করার ক্ষমতা থাকতেও এতো কম উপকার করলো কেন? কম উপকার করেও তো আসলে আমার অপকারই করলো। দুই. যে উপকার বঞ্চিত হলো সে রাগ করবে এটা ভেবে যে, তার উপকার না করে অন্যজনের উপকার কেন করা হলো, যে কিনা আমার অপছন্দের তালিকায়। অন্যদিকে, অপকার করার ক্ষমতা বা শক্তি থাকলে যে শত্রু তৈরি হয় সেটা আর ব্যাখ্যা করে বলার দরকার নেই। অন্যকে খালে ফেলতে গেলে নিজেরও খালে পড়ার আশঙ্কা থাকেই। খাল কেটে কুমির আনার কথা আমরা কে না জানি। তবে আমি যেমন কারো উপকার করতেও পারি না, তেমনি ইচ্ছা করলেও কারো অপকার করতেও পারি না। কাজেই আমার মতো অযোগ্য, অপদার্থ একজন মানুষ কেন কারো দ্বারা মৃত্যু ভয়ে ভীত থাকবো?

আমার মৃত্যু ভয় নিয়ে আতঙ্কে থাকা স্ত্রীকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে গত কয়েক দিনে কিছুটা আশ্বস্ত করতে সক্ষম হয়েছি। কিন্তু এর মধ্যে দেখা দিয়েছে নতুন বিপত্তি। আমার ছেলেমেয়ে দুইজনই গত কয়েক দিন ধরে মনে করছে যে, ভয়াবহ ভূমিকম্পে আমাদের সবারই মৃত্যু হবে। চোর-ডাকাত বা গুপ্তঘাতক, জঙ্গি-সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাতে না হলেও আমাদের পুরো পরিবার মারা পড়বে ভূমিকম্পে। আগামী কিছু দিনের মধ্যে বাংলাদেশে এমন শক্তিশালী ভূমিকম্প হবে যাতে ঢাকা শহর তছনছ হয়ে যাবে। আমার মেয়ে সদ্য ডাক্তারি পাস করেছে। ছেলে বুয়েটে পড়–য়া। দুজনেই মেধাবী। মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সবগুলো মেডিকেলের মধ্যে এমবিবিএস পরীক্ষায় চতুর্থ স্থান অধিকার করেছে। ভিকারুননেসা নূন স্কুলে সে ফার্স্ট গার্ল ছিল। আমার ছেলেও বুয়েটে ভর্তি হওয়ার সুযোগ যেহেতু পেয়েছে, তাই তাকেও খারাপ ছাত্র বলা যাচ্ছে না। আমাদের দেশে তো এখন মেধা যাচাইয়ের সহজ মাপকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে কে, কোথায়, কোন বিষয়ে পড়ছে সেটা। ছেলেমেয়ে দুজনেরই পড়াশোনার আগ্রহ প্রবল।

ভূমিকম্প নিয়ে সম্প্রতি ‘প্রথম আলো’তে অধ্যাপক আসিফ নজরুলের একটি লেখা পড়ে আমার ছেলেমেয়ের মৃত্যু আতঙ্ক বেড়ে গেছে। ৩১ এপ্রিল ২০১৬ আসিফ নজরুল লিখেছেন : ১৮৮৫ সালে রিখটার স্কেলে প্রায় সাড়ে ৭ মাত্রায় যে ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছিল বাংলা অঞ্চলে, তার এপি সেন্টার ছিল মানিকগঞ্জে। এছাড়া ১৭৬২ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গল বা কিশোরগঞ্জ অঞ্চলে আরো দুটো বড় মাপের ভূমিকম্প হয়েছিল। ১৮৯৭ সালে বহুল আলোচিত আসাম ভূমিকম্পেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এই অঞ্চল। এরপর অধ্যাপক নজরুল লিখছেন : বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভয়াবহ ভূমিকম্প প্রতি ১৩০-১৩৫ বছরের মধ্যে পুনরায় হওয়ার কথা। সেই হিসাবে ১৯৮৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের কথা বিবেচনা করলে ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ঢাকার আশপাশে বিশাল একটি ভূমিকম্প হওয়ার আশঙ্কা মোটেও অবাস্তব নয়। আমরা কতজন জানি তা? কতজনকে জানিয়েছে সরকার?

আসিফ নজরুল আরো লিখেছেন : একই মাত্রায় ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি সব জায়গায় এক রকম হয় না। ক্ষয়ক্ষতি কতটুকু হবে, তা নির্ভর করে জনসংখ্যার ঘনত্ব, বিল্ডিং, রাস্তাঘাট ও অবকাঠামোর মান, নগরায়ন কতটুকু পরিকল্পিত, উদ্ধার ও ত্রাণ কাজে প্রস্তুতি ও অভিজ্ঞতা ইত্যাদির ওপর। এসব বিবেচনায় ঢাকা পৃথিবীতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শহরগুলোর একটি। ৮ স্কেল ভূমিকম্পে তাই জাপানে যে ক্ষতি হয়, ঢাকায় হবে তার শতগুণে বেশি। এমনকি ইকুয়েডরে সাম্প্রতিক ভূমিকম্পে যে ক্ষতি হয়েছে, একই মাত্রায় ভূমিকম্পে ঢাকায় ক্ষতি হবে অনেক অনেক বেশি। অধ্যাপক নজরুল আরো লিখছেন : আমার বুকের রক্ত হিম হয়ে যায় বড় ভূমিকম্পের পরিণতির কথা ভাবলে। ঢাকার ঘিঞ্জি অঞ্চল, জলাভূমি ভরাট করে বানানো বিভিন্ন উঁচু বিল্ডিং, নামকাওয়াস্তে ডিজাইন দিয়ে নিম্নমানের ও অপর্যাপ্ত সামগ্রী দিয়ে বানোনো বিল্ডিং- এগুলো গুঁড়ো হয়ে যাওয়ার কথা বড় ভূমিকম্পে। যে ভবন ভূমিকম্প সামলাতে পারবে, তা হেলে পড়বে পাশের ভবনের ধাক্কায়, যে রাস্তা এমনিতে ফেটে যাবে না, তা দুমড়ে-মুচড়ে যাবে দুর্বল উড়াল সড়কের পতনে। যে মানুষ বেঁচে থাকবে, তাকে সাহায্য করতে এগুতে পারবে না অন্য কোনো মানুষ। যে মানুষ ভাঙা বিল্ডিংয়ে যন্ত্রণা কাতর হয়ে আর্তনাদ করবে, তাকে সাহায্য করার উপায় জানবে না পাশের অক্ষত মানুষ। যাদের কোনোভাবে হাসপাতালে নেয়া যাবে, তারা ধুঁকে মরবে বিনা চিকিৎসায়।

এই বর্ণনা পাঠেই শরীর শীতল হয়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে দু’একটি ভূমিকম্পের প্রেক্ষাপটে আসিফ নজরুলের এই লেখা পড়ার পর স্বাভাবিকভাবেই আমার ছেলেমেয়ের ভূমিকম্প আতঙ্ক বেড়ে গেছে। আমি ওদের সাহস দেয়ার চেষ্টা করে বলি, আমরা যে বাসায় থাকি তা জলাভূমি ভরাট করে তৈরি হয়নি। আমাদের ভবনটিও খুব বেশি উঁচু নয়, মাত্র তিন তলা। বাড়িঅলা নিজে যেহেতু এই বাসায় থাকেন কাজেই বাড়ি বানাতে খুব নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করেছেন বলেও মনে হয় না। তাই ভবন চাপা পড়ে আমাদের মৃত্যুভয় কম। কিন্তু ছেলেমেয়েরা বলে, পাশের উঁচু বিল্ডিং যদি এদিকেই হেলে পড়ে, আমরা যদি বেরুতে না পারি, কেউ যদি আমাদের সাহায্যে এগিয়ে আসতে না পারে… এতো যদির উত্তর আমার জানা নেই। তারপরও ওদের বলি, মামির যদি গোঁফ হয়, তাহলে তিনি আর মামি থাকবেন না। কিন্তু মামির কি কখনো গোঁফ হয়েছে?

ছেলেমেয়ের ভূমিকম্প আতঙ্ক আমার মধ্যে সংক্রামিত না হলেও এ নিয়ে পড়াশোনার আগ্রহ একটু বেড়েছে। পুরনো পত্রিকা ঘাটতে গিয়ে ২০১৫ সালের ৮ মে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, জনপ্রিয় লেখক এবং বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ হিসেবে সবার কাছে পরিচিত মুহম্মদ জাফর ইকবালের লেখা পেয়ে সেটা ছেলেমেয়েকে পড়তে বলি। সে সময় লেখাটি কেন আমার নজর এড়িয়ে গেছে বুঝতে পারিনি। মুহম্মদ জাফর ইকবাল লিখেছেন : ঠিক কী কারণ জানা নেই, ভূমিকম্প নিয়ে মানুষের ভেতরে এক ধরনের রহস্যময় আতঙ্ক কাজ করে। ভূমিকম্প শুরু হলেই মানুষ পাগলের মতো ছোটাছুটি শুরু করে। ২৮ এপ্রিল (২০১৫) নেপালের ভূমিকম্পের কারণে আমরা দেশে যে কম্পন অনুভব করছি, সেই কারণে দেশের অনেক মানুষ দিগি¦দিক জ্ঞান হারিয়ে ছোটাছুটি করে আহত হয়েছে, কেউ কেউ মারাও গেছে। ভূমিকম্পের খুঁটিনাটি জানার আগে আমি নিজেও একে যথেষ্ট ভয় পেতাম, এখন ভয় কমে গেছে; কৌত‚হল বেড়েছে অনেক বেশি। দেশের সবার অন্তত দুটি জিনিস জানা উচিত, একটি হচ্ছে, যখন এখানে ভূমিকম্প হয় তখন সবারই ধারণা হয় তাদের পায়ের নিচে যে মাটি সেই মাটিতে ভয়ঙ্কর অশুভ একটি কিছু শুরু হয়েছে, এর থেকে বুঝি আর কোনো রক্ষা নেই। মূল ব্যাপারটা মোটেও সেরকম নয়, প্রায় সব ক্ষেত্রেই ভূমিকম্পের কেন্দ্রটি বহু দূরে। সেখানকার ভূমিকম্পের ছোট একটা রেশ আমরা অনুভব করছি। ভয় না পেয়ে ঠাণ্ডা মাথায় এটা ঘটে যেতে দিলে কিছুক্ষণের মধ্যেই থেমে যাবে।

জাফর ইকবাল তথ্য উল্লেখ করে লিখেছেন : পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভূমিকম্পটি হয়েছিল চিলিতে ১৯৬০ সালে। রিখটার স্কেলে সেটি ছিল বিস্ময়কর ৯.৫। সেই ভূমিকম্পের প্রায় ছয় হাজার মানুষ মারা গিয়েছিল। দেশটি তখন রীতিমতো পরিকল্পনা করে তাদের দেশের বিল্ডিংয়ের নিয়ম মেনে ভূমিকম্প সহনীয়ভাবে তৈরি করতে শুরু করে। ২০১৪ সালে তাদের দেশে যখন ভয়ঙ্কর ৮.২ মাত্রায় ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে তখন তাদের দেশে মারা গিয়েছে মাত্র ছয় জন। নিয়ম মেনে বিল্ডিং তৈরি করলে কী লাভ হয় এটি তার একটি চমৎকার উদাহরণ। এর থেকে প্রায় ষাটগুণ ছোট ৭ মাত্রায় একটা ভূমিকম্পের কারণে ২০১০ সালে হাইতিতে মানুষ মারা গিয়েছে প্রায় তিন লাখ। দরিদ্র দেশে নিয়মনীতি না মেনে মিগজ বাক্সের মতো দুর্বল বিল্ডিং তৈরি করলে তার ফলাফল কী হতে পারে এটা তার একটা খুব করুণ উদাহরণ। কাজেই ভূমিকম্প নিয়ে কেউ যদি আমাকে একটা মাত্র মন্তব্যও করতে বলে তাহলে কোনো রকম বিশেষজ্ঞ না হয়েও আমি খুব জোর গলায় বলতে পারবো যে, ঘনবসতি এলাকাগুলোতে আমাদের বিল্ডিংগুলো নিয়মনীতি মেনে তৈরি করতে হবে।

সবশেষে জাফর ইকবাল লিখেছেন : ভূমিকম্প নিয়ে এখনো অনেক রহস্য অজানা। ভয় পেয়ে সেই রহস্যকে দূরে সরিয়ে না রেখে সবাই মিলে তার রহস্য ভেদ করাটাই কি বেশি অর্থপূর্ণ কাজ নয়? বাংলাদেশের মানুষ সব রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ সামলে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকতে পারে। এই ভূমিকম্পকে কেন শুধু শুধু ভয় পাবো? প্রয়োজনে অবশ্যই আমরা এর মুখোমুখি হতে পারবো।

আমার প্রতি না থাকলেও জাফর ইকবালের প্রতি আমার ছেলেমেয়ের আস্থা-ভরসা আছে। কাজেই তার লেখা পড়ে ওরা বুঝি একটু নির্ভয় হতে পেরেছে। ভূমিকম্পের অজানা রহস্যভেদের জন্যও আগ্রহী হয়ে উঠেছে। তবে আমি এখন ভাবছি, মৃত্যুকে নিয়ে আমাদের কেন এত ভয়। মানুষ প্রতিনিয়ত নিত্যনতুন জ্ঞানে সমৃদ্ধ হচ্ছে। অজানাকে জানছে। তবে এটা সত্য, মৃত্যুকে জয় করার সক্ষমতা মানুষ এখনো অর্জন করতে পারেনি। জন্ম নিলে মৃত্যুবরণ করতেই হবে। এতো নিশ্চিত এবং স্বাভাবিক একটি বিষয় নিয়ে অকারণ দুর্ভাবনা থেকে মানুষ কখনো মুক্ত হতে পারছে না। আমাদের ভয়কে জয় করতে শিখতে হবে। ভয় দূর হলেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj