চট্টগ্রামে খৃষ্টান মিশনারীদের আদিপর্ব : মুনতাসীর মামুন

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

পূর্ববঙ্গ বা বর্তমান বাংলাদেশে ইংরেজ বা ইউরোপীয় মিশনারিদের নিয়ে ধারাবাহিক কোন ইতিহাস লেখা হয়নি। মিশনারি বলতে সাধারণত আমরা বুঝি ইউরোপ আরো নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে ইংল্যান্ড থেকে যারা খৃষ্টধর্ম প্রচারে এসেছিলেন। আসলে বিষয়টি তেমন সরল নয়। অন্যান্য সব ধর্মের মতো খৃষ্টান ধর্মেও বিভক্তি আছে। মোটা দুই দাগ হলো রোমান ক্যাথলিক এবং প্রটেস্টান্ট। তারাও বহুধা বিভক্ত। প্রত্যেকের নিজ নিজ প্রচারের ক্ষেত্র বা ইতিহাস আছে। বিভক্তি যাই থাকুক উভয় স¤প্রদায় এ দেশে দীর্ঘদিন ধরে, প্রায় ৪০০ বছর ধরে ধর্ম প্রচার করে এসেছেন এবং এক্ষেত্রে যে ব্যর্থ হননি তা বলাই বাহুল্য। বাংলাদেশে বর্তমানে খৃষ্টান স¤প্রদায় তাদের কঠোর পরিশ্রমের ফল। প্রটেস্টান্টদের মধ্যে ব্যাপটিস্টরা তাদের ধারাবাহিক ইতিহাস কিছুটা তৈরি করে গেছেন। ক্যাথলিকদের সে তুলনায় কম। পূর্ববঙ্গে যারা শুরু থেকে কাজ করেছেন তাদের প্রচুর নথিপত্র ইংল্যান্ডের আর্কাইভসে আছে। বছর ত্রিশেক আগে ব্যাপটিস্টদের নিয়ে কিছু লেখার জন্য লন্ডনে তাদের আর্কাইভসে গিয়েছিলাম। কিন্তু সে দিনটি ছিল প্রতিক‚ল। সেদিন বা দু’একদিনের মধ্যে তারা আর্কাইভ সরিয়ে নিচ্ছিলেন। সামান্য সময়ে আমি কিছু কাগজপত্র সংগ্রহ করেছিলাম। সময় পেলে হয়ত মিশনারিদের নিয়ে একটি বই লেখার ইচ্ছে আছে।

কয়েকদিন আগে পুরনো কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে তিন দশক আগে তৈরি কিছু নোট পাই। তার ভিত্তিতে ছোট এই প্রবন্ধ ‘চট্টগ্রামে শ্রীরামপুর মিশন’। আর্কাইভসে রক্ষিত কিছু নথি, গর্ডন সোড্ডির লেখার ‘ব্যাপটিস্ট ইন বাংলাদেশ’, ১৮৩৯ সালে লেখা হাওয়ার্ড ম্যালকমের ‘অ্যান একাউন্ট অব দি বর্মন এম্পায়ার’ প্রভৃতি এই প্রবন্ধের ভিত্তি। উল্লেখ্য, পূর্ববঙ্গে ব্যাপটিস্টদের ইতিহাস নিয়ে কাজ করেছিলেন রেভারেন্ড রবার্ট রবিনসন। ১৮৭১ সালে তার একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল ‘এমন্ড দা মগ’স অর মেমোরিয়ালস অব দি রেভারেন্ড জে.সি. ফিংক’। বইটির কপি কোথাও খুঁজে পাইনি। তবে, লন্ডনের আর্কাইভসে এর ওপর ভিত্তি করে লেখা কয়েক পৃষ্ঠার একটি রিপোর্ট পাই। আরেকটি টাইপ করা রিপোর্ট পাই যার ভিত্তি হলো ১৮১৩ সালের ফেব্রুয়ারি ও ১৮১৩ সালের মার্চে লেখা একটি চিঠি। শেষোক্ত চিঠিতে লিখেছিলেন শ্রীরামপুর মিশনের ড. ওয়ার্ড, ব্যাপটিক্ট মিশনের কর্মকর্তা ড. ফুলারকে। এসব উৎসের ওপর ভিত্তি করে চট্টগ্রামে আদি মিশনারিদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আলোকপাত করব।

ডা. জন টমাস নামে একজন ব্যাপটিস্ট চিকিৎসক ১৭৮৩ সালে কলকাতায় আসেন ইংল্যান্ড থেকে। পেশায় সার্জন হলেও ডা. টমাসের ইচ্ছে ছিল খৃষ্টধর্ম প্রচার। তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের অধিকৃত এলাকায় খৃষ্টধর্ম প্রচারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। এই নিষেধাজ্ঞা ডা. টমাসকে দমাতে পারেনি। তিনি পশ্চিমবঙ্গে প্রচার কাজ শুরু করেলেন। কিন্তু কোন সুবিধা করতে না পেরে ১৭৯২ সালে ইংল্যান্ড ফিরে গেলেন।

এই সময়ই ড. উইলিয়াম কেরিসহ কয়েকজন প্রচারক মিলে গঠন করেন ব্রিটিশ ব্যাপটিস্ট মিশনারি সোসাইটি। এই সংঘের তরফ থেকে ভারতবর্ষে খৃষ্টধর্ম প্রেরণের জন্য উইলিয়াম কেরি ও জন টমাসকে পরের বছর পাঠানো হয়। তারা একটি দিনেমার জাহাজে কলকাতায় পৌঁছান। ডা. কেরি মদনাবাটিতে এক নীলকুঠিতে চাকরি পান। নীলকুঠির মালিক ছিলেন খৃষ্টভক্ত ইউডনী। মদনাবাটি মালদহতে। নীলকুঠির কাজ ছিল বছরের তিন চারমাস। তাই বাকি মাসগুলিতে কেরি ও টমাস প্রচারে বেরুতেন আশপাশের এলাকায়। দিনাজপুরে এ সূত্রে তারা আসা যাওয়া করতেন।

১৭৯৬ সালে কেরি ডা. টমাসের এক জ্ঞাতী ভাই এস. পাওয়েলকে অবগাহিত বা ব্যাপটাইজ করেন। এরপর তারা তিনজন ও আরেকজন খৃষ্ট ধর্মাবলম্বী মিলে পূর্ববঙ্গে প্রথম ব্যাপটিস্ট মণ্ডলী গঠন করেন। দিলীপ পণ্ডিত লিখেছেন “বাংলাদেশে রোমান ক্যাথলিক মণ্ডলীর যাত্রা শুরু হইয়াছিল ষোড়শ শতকে দেশের দক্ষিণ প্রান্তে চট্টগ্রামে, আর প্রটেস্টান্ট মণ্ডলীর গোড়াপত্তন হইল অষ্টাদশ শতকে দেশের উত্তর প্রান্তে দিনাজপুরে”।

ইতোমধ্যে বৃটেন থেকে ব্যাপটিস্ট সোসাইটি ডা. মার্শম্যান, রেভারেন্ড ওয়ার্ড-কে পাঠালেন ভারতবর্ষে। তারা পশ্চিমবঙ্গে দিনেমার শাসিত অঞ্চল শ্রীরামপুর পৌঁছান। দিনেমার কর্তৃপক্ষ তাদের সেখানে মিশন স্থাপনের অনুমতি দেন। ডা. কেরিও তখন মদনাবাটি থেকে শ্রীরামপুর চলে আসেন।

শ্রীরামপুরে কেরি, মার্শম্যান ও ওয়ার্ড যা করেছিলেন তা এক অন্য ইতিহাস। সেখানে তারা বাংলা ভাষা শিখে, মুদ্রণযন্ত্র স্থাপন করে বাইবেল অনুবাদ করেন বাংলা ভাষায়। ‘সুসমাচার’ নামে এই অনুবাদ প্রচারকাজে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও ১৮১৩ সালে বৃটিশ পার্লামেন্টের নির্দেশে খৃষ্টধর্ম প্রচারে নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেয়।

২.

ডা. ওয়ার্ডের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, ১৮০৬ সালে শ্রীরামপুরে শান্তিরাম নামে এক বাঙালিকে অবগাহিত করা হয়। শান্তিরামের বাড়ি ছিল চট্টগ্রামে। ১৮০৯ সালের আরেক প্রতিবেদনে জানা যায়, শ্রীরামপুরে হুরি নামে চট্টগ্রামের আরেজনকে অবগাহিত করা হয়। হুরি ছিলেন একজন মগ।

এ কারণে চাটগাঁর প্রতি নজর পড়ে শ্রীরামপুর মিশনের। সেখানে ছিলেন ডি ব্রুয়ন নামে এক মিশনারি। তার বাবা ছিলেন ফরাসী, মা দেশীয়। ডি ব্রুয়ন শ্রীরামপুর মিশনের হয়ে চাটগাঁ যাবেন বলে ঠিক করলেন। ১৮১২ সালে চাটগাঁয় পৌঁছেন তিনি। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে তিনি ছিলেন প্রথম ব্যাপটিস্ট মিশনারি। ডি ব্রুয়ন তার কাজে সহায়তা করার জন্য এমন একজনকে পেলেন যিনি অনেকদিন চাটগাঁর মগদের সঙ্গে ছিলেন। তাদের ভাষাও জানতেন। ব্রুয়ন ছিলেন তার অভিভাবকের মতো। তাদের সম্পর্ক হয়ে দাঁড়ায় পিতাপুত্রের মতো। তার নাম ছিল ব্রডেরিক। ব্রডেরিকের পিতা খুব সম্ভব ছিলেন পর্তুগিজ বা ফিরিঙ্গি, মা হয়ত বর্মি।

ডি ব্রুয়ন যখন চট্টগ্রামে আসেন তখন আশ্রয় নেয়ার মতো কোন স্থান তার ছিল না। থাকার মতো একটা বাড়ি পেয়েছিলেন বটে কিন্তু আর কোন কিছু তিনি যোগাড় করতে পারেননি। তখন, আশ্চর্য স্থানীয় এক রোমান ক্যাথলিক পাদ্রী তাকে কিছু বেঞ্চ আর চেয়ার টেবিল দিলেন। আর এক ‘সম্ভ্রান্ত’ মহিলা তাকে গির্জা তৈরির জন্য একখণ্ড জমি দিলেন। এভাবে চট্টগ্রাম কেন্দ্র স্থাপিত হলো।

ডি ব্রুয়ন ১৮১৩ (মার্চ) সালে এক চিঠিতে ডা. ওয়ার্ডকে জানিয়েছিলেন, একদিন এক যুবক তার সঙ্গে দেখা করতে আসে। যুবকটি বাঙালি নিশ্চয়। তার হাতে একখণ্ড ‘সুসমাচার’। ডি ব্রুয়ন জিজ্ঞেস করলেন, এই বইটি তিনি কোথায় পেয়েছেন। যুবকটি জানালেন, ঢাকায় দুই সাহেব এসে একবার ‘সুসমাচার’ অনেক বিলি করেছেন। তিনিও এক কপি যোগাড় করেছিলেন। শ্রীরামপুর থেকে নৌকা করে ডা. কেরির দ্বিতীয় পুত্র উইলিয়াম কেরি ম্যুয়র এবং তিনজন দেশীয় খৃষ্টান নিয়ে ঢাকা এসেছিলেন প্রচারের জন্য। দিলীপ পণ্ডিত উল্লেখ করেছেন, ছোট কাটরায় ডা. কেরির নৌকা ভিড়লে প্রচার পুস্তিকার জন্য এত ভিড় হয়েছিল যে নৌকা তীর থেকে দশ বারো হাত দূরে রাখতে হয়েছিল। তবে অনুমান করছি, ভিড় হয়েছিল হয়ত, কিন্তু তা প্রচার পুস্তিকার জন্য নয়। দেশি-বিদেশি খৃষ্টান দেখার জন্য। সম্ভবত তারা ঘণ্টাখানেক প্রচার করেছিলেন। “কিন্তু তাদের ছাড়পত্র না থাকাতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কর্মচারীরা তাহাদিগকে শহর হইতে বাহির করিয়া দিলেন।” সরকারি নথিপত্র অনুযায়ী, মিশনারিদের পদার্পণ ঢাকাবাসীদের উত্তেজিত করে তুলেছিল এবং তাই ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট তাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন ঢাকা ত্যাগ করতে।

যা হোক ঐ যুবকটি জানালেন, ‘সুসমাচারে’র একটি বাক্য তাকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। সেটি হলো, সেখানে লেখা আছে, যিনি অবগাহিত হবেন তিনি রক্ষা পাবেন। যিনি তা বিশ্বাস করেন না তিনি নরকে যাবেন। ডি ব্রুয়ন তাকে নরক থেকে রক্ষার জন্য অবগাহিত করেন।

ডি ব্রুয়নের এই ঘটনা বর্ণনায় খানিকটা অতিরঞ্জন আছে বলে মনে হয়। কেরি ঢাকায় আসেন ১৮০৫ সালে। তার ৮ বছর পর, যুবকটি খৃষ্টান হয়। এই ৮ বছর সুসমাচার পড়ে সে অস্থিরতায় ভুগেছে এবং সুদূর চট্টগ্রামে ডি ব্রুয়নের খোঁজ করে খৃষ্টান হয়েছে- একটু বেশি মনে হয়। যুবকটি খৃষ্টান হয়েছিল তবে নাটকীয়তা আনার জন্য বোধহয় প্রতিবেদনে ঘটনাটি এভাবে বর্ণিত হয়েছে।

যুবকটির নাম জানা যায়নি। তবে, চট্টগ্রামে শান্তারামের পর তিনিই বাঙালি খৃষ্টান। ওয়ার্ডের চিঠিতেই জানা যায়, ডি ব্রুয়ন তখন ভালো একটি জায়গায় উঠেছেন এবং একটি স্কুল খোলার জন্য অনেকেই তাকে অনুরোধ করছিলেন। আরো জানা যায়, চট্টগ্রাম থেকে আট মাইল দূরে এক গ্রামে ঢোলবাদক শান্তারামের খোঁজ তিনি পেয়েছিলেন।

ঐ একই চিঠিতে জানা যায় এক গরিব হিন্দু ডি ব্রুয়নের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সেখানেই তিনি মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি খৃষ্টের আনুগত্য স্বীকার করেছিলেন।

শ্রীরামপুর মিশন থেকে তখন প্রচুর বাংলা পুস্তিকা সরবরাহ করা হতো। খৃষ্টধর্ম সম্পর্কিত। ডি ব্রুয়ন থেকে অনেকেই সেগুলি সংগ্রহ করতেন। ১৮১৩ সালে আরো দুজন খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করে। একজন ফিরিঙ্গি নাম ডোমিঙ্গো রিভিয়রো ও আরেকজন বাঙালি নাম কাশিনাথ। ডোমিঙ্গো ছিলেন আবার রোমান ক্যাথলিক।

জানুয়ারি ১৮১৪ সালে একটি ঘটনার উল্লেখ করেছেন ডি ব্রুয়ন। কোথাও একটি সমাবেশ হয়েছিল। গ্রামে (নাম উল্লেখ করেননি) ১০০ জন গ্রামবাসী এসে অনুরোধ জানান তাদের সুসমাচার শোনাতে। পরদিনও একই কাণ্ড। ডি ব্রুয়নদের খাওয়ার সময় ছিল না। এরি মধ্যে শিশুরাম নামে একজন হিন্দু ও নিজ কন্যা আনাকে অবগাহিত করেন। এতে রোমান ক্যাথলিকরা ক্ষুব্ধ হন এবং রিভিরিয়োকে তারা বাধ্য করেন বেদির সামনে হাঁটু গেড়ে বসতে এবং নিউ টেস্টাসেন্ট না পড়তে। তারা তাকে প্রায়শ্চিত্য করতে বাধ্য করেন।

এ ঘটনাটি অবশ্য অন্য কেউ উল্লেখ করেননি। আমি বিএমএম আর্কাইভে রক্ষিত একটি রিপোর্টের ভিত্তিতে তা উল্লেখ করছি।

১৮১৪ সালের জুলাইয়ে ডি ব্রুয়ন উল্লেখ করেছেন, ১ জুলাই দুইজন মগ তার সঙ্গে দেখা করে বর্মি ভাষায় সুসমাচার চান। শ্রীরামপুর মিশন অবশ্য এ ক্ষেত্রেও কাজ করে রেখেছিল। ১৫ তারিখে ১৫ জন মগ তাদের রাজা বুলিকে নিয়ে ডি ব্রুয়নের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি তাদের পাঁচটি সুসমাচার দেন। এতে তারা দারুণ খুশি হয়।

জুলাই মাসে আরো কিছু হিন্দু ও মুসলমান তার সঙ্গে দেখা করে সুসমাচার শুনতে চান। গভীর আগ্রহ নিয়ে তারা ডি ব্রুয়নের বক্তৃতা শোনেন। নভেম্বরে বিভিন্ন সময় প্রায় ৫০ জন তার প্রচার শুনতে আসেন। তিনজন মগ তাকে জানান রোমাঔর মগ রাজা তার পূজার সব মূর্তি আগুনে ফেলে দিয়েছেন।

প্রতিবেদনগুলিতে ক্ষাণিকটা অতিরঞ্জন থাকলেও অনুমান করা যাচ্ছে, ডি ব্রুয়ন মগদের মধ্যে প্রচারেই সাফল্য অর্র্জন করেছিলেন। কারণ ডিসেম্বরেই দেখা যাচ্ছে তাকে ব্যস্তÍ সময় পার করতে হচ্ছে। প্রথমে যে মগ রাজা মূর্তি আগুনে ফেলে দিয়েছিলেন তাকে ১০টি সুসমাচার পাঠান। তাছাড়া দেখা গেছে তিন ধরনের লোক তার প্রচার শুনতে আগ্রহী। এক বাঙালি। দ্বিতীয় মগ যারা বর্মি ভাষায় পুস্তকের জন্য প্রায়ই ডি ব্রুয়নের কাছে ধরনা দিতেন এবং তিন, ক্যাথলিকরা, যাদের আলাদা গির্জেও ছিল।

১৮১৫ সালের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ডি ব্রুয়ন মগ অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে যাচ্ছেন। মগ রাজা পুষুমের সঙ্গে তিনি দেখা করতে যান বদ্রিকে নিয়ে। বদ্রির মা ছিল মগ ফলে বদ্রির চলাচল ছিল মগদের সঙ্গে। সেখানে গিয়ে দেখেন পুষুম সুসমাচার পড়ছেন। চারদিন তারা রাজার সঙ্গে থাকলেন, তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথাবার্তা বললেন। পুষুম একদিন তার গোত্রের সবাইকে ডেকে আনলেন প্রচার শুনতে। পরপর তিনদিন প্রচার হলো এবং প্রতিদিনই শ্রোতার সংখ্যা বাড়তে লাগল।

১০ মার্চ শ্রীরামপুরে তিনি লিখে পাঠিয়েছিলেন। বেশকিছু মগ ব্যাপ্টাইজও হতে চাচ্ছেন কিন্তু তার শরীর খারাপ থাকায় তা স্থগিত রেখেছেন। তিনি প্রস্তাব করেন মরিয়মনগরে একটি কুটির স্থাপন করে তার ভার বদ্র্রি ও শান্তিরামের ওপর দিতে চান।

মরিয়মনগর চট্টগ্রাম শহরে থেকে মাইল বিশেক দূরে, চন্দ্র্রঘোনা খৃষ্টান হাসপাতাল থেকে পাঁচ মাইল নিচে। সোড্ডি মনে করেন, অঞ্চলটি ঐ সময় ছিল মগ অধ্যুষিত।

১৮১৫ সালের আগেই তিনি ঠিক করলেন পার্বত্য এলাকায় যাবেন। পাহাড়ে প্রথমদিকে তাকে দেখে অনেকে ভয়ে পালিয়ে যান। মাসখানেক পর তাদের ভয় কমে। প্রচারও শুরু করেন। সেপ্টেম্বরে তিনি পাঁচজনকে অবগাহিত করেন।

শ্রীরামপুরে কর্মকর্তাদের জানান, এখানে বাইবেলের চাহিদা এত বেশি যে তিনি সরবরাহ করতে পারছেন না। পরের মাসে আরো ছয়জন মগ খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেন। এরা ছিলেন কাপ্তির অধিবাসী। সোড্ডি বলছেন, এটি বর্তমান কাপ্তাই নয়। এটি হলো কাপ্তাই মুখ। কাপ্তাই নদী যেখানে কর্ণফুলীতে মিশছে; বর্তমান কাপ্তান বাজার হতে পারে। নভেম্বর পর্যন্ত ‘কাপ্তি’তে প্রচারে তিনি অসামান্য সাফল্য লাভ করেন। অনেকে খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করে। তখন স্থানীয় মগ রাজার দেওয়ান দীক্ষিতদের ওপর অত্যাচার শুরু করেন কিন্তু রাণী দেওয়ানের কাজে বাধা দেন। স্থানীয় জজের কাছে অভিযোগ দাখিল করেন ডি ব্রুয়ন। যাদের দ্বারা দীক্ষিতরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জজ তাদের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করেন। সেই সময় পেগু থেকেও ছয়জন বর্মন এসেছিলেন ডি ব্রুয়নের কথা শুনতে। মুখে মুখে তার কথা ছড়িয়ে পড়ছিল পাহাড় থেকে পাহাড়ে।

সোড্ডি মন্তব্য করেছেন, বিভিন্ন এলাকায় অনেকে খৃষ্টান হচ্ছিলেন বটে কিন্তু তারা চার্চের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বা সংলগ্ন ছিলেন না। এটা ছিল দুর্বলতা। কারণ, নতুন এই ধর্মান্তরিতরা বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলেন এবং সে সব জায়গা ছিল দুর্গম। ফলে চার্চ শক্তিশালী হয়নি।

১৮১৬ সালে উইলিয়াম কেরি জুনিয়র চট্টগ্রাম সফর করলেন। প্রচারের ফলাফলে তিনি সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। এ সময় ডি ব্রুয়ন রামু আর কক্সবাজার গিয়ে প্রচার করেছিলেন। বদ্রি ছিলেন তার সঙ্গে। সেই সফরে ২০ জনকে ধর্মান্তরিত করেছিলেন। কেরি চট্টগ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার পর মর্মান্তিক এক দুর্ঘটনা ঘটে। একদিন ডি ব্রুয়ন কী কারণে যেন বদ্রিকে বকাঝকা করেছিলেন। এতে ক্রুদ্ধ হয়ে ডি ব্রুয়নকে ছুরিকাঘাত করেন। এতে ডি ব্রুয়নের মৃত্যু হয়। তিনি মৃত্যুর আগে স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেটকে একটি বার্তা দিয়ে জানান, খুনিকে তিনি ক্ষমা করেছেন।

ডি ব্রুয়ন ৬০/৭০ জন মগকে ধর্মান্তরিত করেছিলেন। তিনি মারা যাওয়ার পর ধর্মান্তরিতরা অসহায় হয়ে পড়েন। কে তাদের আধ্যাত্মিক চাহিদা পূরণ করবেন? কয়েকজন সাহায্যের জন্য ঢাকায় যান। ১৮১৩ সালে ধর্মান্তরিত ডোমিঙ্গো রিভিরিয়ো দায়িত্ব নিজ থেকে কিছুটা নেয়ার চেষ্টা করলেন। এমন সময় শ্রীরামপুরের এক মিশনারি ব্রাদার পিকক স্বেচ্ছায় চট্টগ্রামে যেতে চাইলেন। তাকে চট্টগ্রামে পাঠানো হলো। বলা হলো, পারলে পিকক যেন একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। ব্যাপটিস্টরা শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছিলেন এবং যেখানে যেতেন চেষ্টা করতেন একটি স্কুল খুলতে। পিকক চট্টগ্রামের ভার নেয়ার পর ১৮১৮ সালে শ্রীরামপুর থেকে ওয়ার্ড চট্টগ্রাম আসেন এবং কক্সবাজার পর্যন্ত ভ্রমণ করেন। সেখানে সাতজন মগকে বঙ্গোপসাগরে অবগাহন করিয়ে ধর্মান্তরিত করেন। ওই সময় ওই এলাকায় প্রায় ১০০ জনের মতো ধর্মান্তরিত মগ বসবাস করতেন।

ধর্মতত্ত্ব সম্পর্কে পিককের প্রশিক্ষণ ছিল না। পৌরহিত্য করার সব অধিকারও তার ছিল না। ১৮২০ সালে পিকক ‘চট্টগ্রাম জ্বরে’ (খুব সম্ভব ম্যালেরিয়া) আক্রান্ত হয়ে কলকাতা আসেন এবং সেখানেই মারা যান।

৩.

শ্রীরামপুর মিশন কলকাতায় ক্যালকাটা বেনেভোলেন্ড ইন্সটিটিউশন নামে এক স্কুল চালাতো। সেখানে কাজ করতেন জে-যোহানেস। তিনি পিককের পর চট্টগ্রামে যেতে রাজি হলেন। ১৯২১ সালে সস্ত্রীক তিনি চট্টগ্রামে যান। তারও পৌরহিত্য করার প্রশিক্ষণ ছিল না। কিন্তু যোহানেস প্রায় ৪৩ বছর চট্টগ্রাম ছিলেন। সে সময় রেঙ্গুন থেকে একজন মার্কিন মিশনারি কোলম্যান চট্টগ্রাম এসে চার্চের দায়িত্ব নেন। তখন ধর্মান্তরিতের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৫০ জন।

কোলম্যান ছিলেন আমেরিকান ব্যাপটিস্ট মিশনের সদস্য। রেঙ্গুনে কাজ করার সময় বর্মি শাসকরা বাধ্য করে তাকে রেঙ্গুন ত্যাগে। তিনি আশ্রয় নেন শ্রীরামপুরে। বর্মি ভাষা তিনি কিছুটা শিখেছিলেন। চট্টগ্রামে ধর্মান্তরিত অধিকাংশ ছিলেন যেহেতু মগ সে জন্য কোলম্যানকে চট্টগ্রাম পাঠানো হয়। চট্টগ্রামে পৌঁছার কিছু দিনের মধ্যেই কোলম্যান মারা যান।

কোলম্যানের জায়গা নিলেন রেভারেন্ড জে.সি. ফিংক। নির্দেশ দেয়া হলো, যোহানেস স্কুল পরিচালনা করবেন আর ফিংক প্রচার, পৌরহিত্য বা এক কথায় চার্চের দায়িত্বে থাকবেন। ১৮৪৬ সাল পর্যন্ত ফিংক ছিলেন চাটগাঁয়।

১৮২৪ প্রতিবেদনে জানা যায়, ওই সময় চট্টগ্রাম শহরে চার্চের সাফল্য ছিল স্কুল পরিচালনায়। ১৩০ জন ছাত্র স্কুলে পড়াশোনা করত। ধর্মান্তরিতের সংখ্যা ৫। ৬টি গ্রামে ছিল ১০০ জনের মতো। ৬ জন স্থানীয় সহকারী নিয়ে ফিংক চার্চ পরিচালনা করতেন। এর মধ্যে কাপ্তি বাজারের মগ ‘রাজা’ তার এলাকায় মিশনারিদের আসা বন্ধ করে দিলেন। পরের বছর ১৮২৫ সালে রবিনসনের তথ্য অনুযায়ী ফিংক চট্টগ্রামে পৌঁছায় দুতিন বছরের মধ্যে ১৬৩ জন খৃষ্টান পেয়েছিলেন যাদের মধ্যে ৯৩ জনকে ব্যাপটাইজ করা হয়েছিল। তিনিও লিখেছেন, পাহাড়ের পূর্ব সীমান্তে আছে একটি জায়গা যার নাম কাপ্তাই যেখানে বাস করেন কিছু খৃষ্টান। সেখানকার খৃষ্টানরা মগদের অঞ্চলে যেতে পারে না। মিশনারিরাও না। ফিংক কিন্তু সেই কাপ্তাই নদী ধরেই একটি গ্রামে পৌঁছেছিলেন।

১৮২৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে বার্মার যুদ্ধ বাধলো। বার্মা হেরে গেল। পুরো আরাকান উপক‚ল হলো কোম্পানির অধীন। যে সব মগ আরাকান থেকে আগে চট্টগ্রামে চলে এসেছিলেন এখন তারা আরাকানে ফিরলেন। এদের সঙ্গে ফিংকও।

বার্মা যুদ্ধের ফলটা হলো, ডি ব্রুয়নের সময় থেকে ফিংক পর্যন্ত যে কাজ মিশনারিরা করেছিলেন তা প্রায় ভেস্তে গেল। অনেককে চাটগাঁ চলে আসতে হলো জীবিকার জন্য।

যুদ্ধ শেষ হলে, রবিনসন জানিয়েছেন, যে সব জায়গায় ধর্মান্তরিতরা ছিলেন, ফিংক তাদের খোঁজে বেরিয়ে পড়লেন। সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছেন। অনেকে আরাকান চলে গেলেন তা আগেই উল্লেখ করেছি। মনে হয়, বেশ বড় সংখ্যক নতুন খৃষ্টানরা নিজেদের জন্মভূমিতে ফিরে গিয়েছিলেন। শ্রীরামপুরের অনুমতি নিয়ে ফিংকও চলে গেলেন। ১৮৪৬ সালে ফিংককে আবার ফিরিয়া আনা হয়েছিল শ্রীরামপুরে।

এবার যোহানেসের কথা বলি। শ্রীরামপুর মিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৮২৭ সালে যোহানেস প্রধান যে স্কুলটি শুরু করেছিলেন তার ছাত্র সংখ্যা ছিল ১৪০ এবং এরা সবাই ছিল স্থানীয় ভাষায় ফিরিঙ্গি, মিশনারিদের ভাষায় দেশীয় পর্তুগিজ। এদের বড় সংখ্যা ছিল আবার ক্যাথলিক। স্থানীয় ক্যাথলিকরা আবার ব্যাপটিস্ট চার্চে আসতেন প্রার্থনা করতে।

স্থানীয়দের জন্যও যোহানেস একটি স্কুল খুলেছিলেন যেখানে প্রায় ৬০ জন পড়ত, তিনটি ছাত্রী বিদ্যালয়ের কথাও আছে। কিন্তু, অনুমান করে নিতে পারি, চট্টগ্রামে ঐ ধরনের মেয়েদের স্কুল ঐ সময় খোলা অসম্ভব। এমন হতে পারে, ধর্মান্তরিত বা স্থানীয় ফিরিঙ্গিদের কিছু মেয়ে হয়ত কোথাও মহড়া হতো ও তাদের হয়ত প্রাথমিকভাবে কিছু শিক্ষা দেয়া হতো। যোহানেস স্কুলগুলি চালাতেন, একই সঙ্গে প্রচারও করতেন কারণ ফিংক তখন আরাকানে।

১৮২৭ সালে যোহানেস কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে একটি মেয়েদের স্কুলের কথা বলছেন ফিরিঙ্গি বাজারে, ফিরিঙ্গিদের জন্য যে স্কুল খোলা হয়েছিল তার কাছেই। এছাড়াও যোহানেস মুরাদপুর, কাতলগঞ্জ, বক্সালি, ভাবুয়া দিঘিতে স্কুল স্থাপনের কথা উল্লেখ করেছেন। ইংরেজি স্কুলে দুজন চীনা ছাত্রও ছিল।

প্রচারের কাজে ঐ বছর যোহানেস রাঙ্গুনিয়া গিয়েছিলেন। পাহাড়ি এলাকায়ও গিয়েছিলেন। চারজন সেখানে ধর্মান্তরিত হয়েছিল। বর্মি যুদ্ধের পর কাপ্তাইয়ের খৃষ্টানদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হয়েছিল। তারা চলে গিয়েছিলেন রামু।

১৮২৯ সালের এক সাইক্লোন যোহানেস স্থাপিত স্কুলগুলি ধ্বংস করে দেয়। বইপত্রের যে স্টক ছিল তাও নষ্ট হয়ে যায়। ফিরিঙ্গি বাজারের মেয়েদের স্কুলটি আগেই বন্ধ হয়ে যায় শিক্ষকের অভাবে। এত বিপর্যয়ের পরও যোহানেস দমেননি। ফিরিঙ্গি বাজারের স্কুলটি আবার চালু করেন ইংরেজি স্কুল হিসেবে। ১২০ জন ছাত্র ছিল তখন। কাতলগঞ্জ ও দেওয়ান বাজারে দেশীয়দের জন্য দুটি স্কুল খোলেন। কিন্তু শিক্ষকের অভাবে দুটি স্কুল বন্ধ হয়ে যায়।

৪.

এ প্রসঙ্গে হাওয়ার্ড ম্যালকমের ‘ট্রাভেলস ইন সাউথ ইস্টার্ন এশিয়ার’ উল্লেখ করতে চাই। তার বইয়ে চাটগাঁয় মিশনারিদের নিয়ে সংক্ষিপ্ত একটি বর্ণনা আছে যার আলোচনা ব্যাপটিস্টদের নিয়ে লেখা কোন গ্রন্থে পাইনি। অবশ্য এর কারণ আছে। লন্ডন থেকে ১৮৩৯ সালে বইটি বেরিয়েছিল। এখন দুষ্প্রাপ্য।

রেভারেন্ড হাওয়ার্ড ম্যালকম যুক্তরাষ্ট্রের বস্টনের আমেরিকান মিশনারি সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মিশনারি কর্মকাণ্ড সরেজমিনে দেখার জন্য তিনি বার্মা, চট্টগ্রাম ও আরাকান এসেছিলেন। বার্মাতেই তিনি বেশি সময় কাটিয়েছেন। ১৮৩৬ সালের নভেম্বর মাসে তিনি কলকাতা থেকে চট্টগ্রাম রওনা হন। দু’সপ্তাহ লেগেছিল চট্টগ্রাম পৌঁছতে।

লিখেছেন তিনি, নদীর মুখ থেকে শহরটি প্রায় দশ মাইল দূরে, নদীর ডান তীরে গড়ে উঠেছে। এখানে কোম্পানির একটি রেজিমেন্টের এবং প্রদেশের বেসামরিক প্রশাসনের সদর দফতর। যোহানেস ছিলেন তখন চট্টগ্রামে, তিনিই ম্যালকমকে সাদর অভ্যর্থনা জানান এবং পরে চট্টগ্রাম থেকে যাওয়ার বন্দোবস্ত করে দেন।

চট্টগ্রাম বা ইসলামাবাদ ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ছোট ছোট পাহাড়ের মাঝে, লিখেছেন ম্যালকম পাহাড় চঁ‚ড়োয় ইংরেজদের চমৎকার বাড়িঘর। পাহাড় চঁ‚ড়ো থেকে দেখা যায় সমুদ্র। দেশীয়রা উপত্যকায় বা সমতলে কলা, জলপাই, আম, কমলা আর বাদাম গাছে ঘেরা এলাকায় বসবাস করেন। সুন্দর বাগানও আছে। রাস্তাঘাটের অবস্থা ভালো। বাজারে পর্যাপ্ত পরিমাণে দেশি-বিদেশি পণ্য। শহরের লোকসংখ্যা ১২,০০০। আশেপাশে আছে জনবহুল কয়েকটি গ্রাম। ৪০ থেকে ১০০ টনের প্রায় ৩০০ জাহাজ বন্দরে নিত্য আসা যাওয়া করে। দেশি-বিদেশি সব ধরনের জাহাজই আছে। মালদ্বীপের কয়েকটি জাহাজ নোঙর করে আছে দেখলাম, লিখেছেন ম্যালকম এবং তাদের নির্মাণশৈলীর বর্ণনা করে লিখেছেন, ‘ড়ভ রহফবংপৎরনধনষব পড়হংঃৎঁপঃরড়হ’ জাহাজগুলির ডেক বাঁশের তৈরি।

প্রতি বছর এই চমৎকার আবহাওয়ার দূরদ্বীপ থেকে জাহাজগুলি নিয়ে আসে কড়ি, কাছিমের খোল, নারকেল, নারকেল দড়ি; নিয়ে যায় চাল ও ছোটখাটো পণ্য। এখানকার রপ্তানি পণ্যের মধ্যে প্রধান চাল আর লবণ। ঐ জনবহুল কৌত‚হলোদ্দীপক মানুষজনের কাছে কোন মিশনারি পৌঁছেনি, মন্তব্য করেছেন ম্যালকম।

অনায়াস দক্ষতায় বাংলা ও ইংরেজিতে প্রচার করেন যোহানেস, জানিয়েছেন ম্যালকম। তবে, বেশি সময় কাটান বড় একটি স্কুলে, ১৮১৮ সালে যা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রেভারেন্ড পিকক। গরিব রোমান ক্যাথলিক বালকদের জন্য তা করা হলেও বাঙালি কিছু ছাত্রও পড়াশোনা করে।

এখানকার বেশ কিছু ছাত্র সরকারি চাকরি পেয়েছে, তবে ধর্মান্তরিত হয়েছে মাত্র দুজন।

ম্যালকম যোহানেসের সঙ্গে একদিন বাজারে গেলেন প্রচার করতে। ১০-১৫ জন শ্রোতা পাওয়া গেল। এক মনে তারা শুনলেন, কিছু প্রশ্নও করলেন, কিন্তু মনে হলো তাদের বিশ্বাসে তারা অটল। একজন মুসলমান যোগী সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন, গঙ্গার মাটি ও গোবর দিয়ে তার শরীর লেপা। তার সঙ্গে ম্যালকম কথা বলতে চাইলেন। যোহানেসের মাধ্যমে কিছু কথাবার্তা বললেনও। তিনি জানালেন, তার জীবনের লক্ষ্য যম বা মৃত্যুদূতকে সন্তুষ্ট করা। সৃষ্টির দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বোঝাতে চাইলেন। কিন্তু ভুললেন না। ‘আমাদের ধর্ম আমাদের জন্য ভালো, তাদের ধর্ম তাদের জন্য।’ অনুমান করছি ইনি হিন্দু যোগী হবেন, মুসলমান নয়। মুসলমান ফকিররা গায়ে গোবর-মাটি মাখবেন না। আর গঙ্গার মাটি চট্টগ্রামে আসবে কোথা থেকে?

চট্টগ্রামে পর্তুগিজদের [ফিরিঙ্গি] সংখ্যা হাজার দুয়েক। উপাসনার জায়গা আছে দুটি। তবে পুরোহিত, বাংলা বা ইংরেজি কোনোটাই জানেন না। ল্যাটিনে কাজ চালান। পৌত্তলিকদের ধর্মান্তরিত করার ক্ষেত্রে এদের কোনো উদ্বেগ নেই, এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ‘হিদেন’দের থেকেও এদের নৈতিক মান নিচু।

চট্টগ্রাম থেকে ম্যালকম আকিয়াবগামী ৩০ টন ‘জাহাজে’ রওনা হলেন কক্সবাজার। অস্বস্তিকর পাঁচদিন ভ্রমণের পর পৌঁছলেন সেই জায়গায়।

ম্যালকম লিখেছেন, ‘চট্টগ্রামের খানিকটা দক্ষিণে আমরা ক্রসকুল নদীর মোহনা পেরুলাম। এখানে আছে কক্সবাজারের মগদের গ্রাম। বাড়ির সংখ্যা আনুমানিক ৬০০। এখানেই কোলম্যান কিছুদিন কাজ করে মারা যান। বর্ষার আগে এই জায়গা ত্যাগ না করে পচা বর্ষায় থেকেছেন, দীর্ঘ সময় বিচ্ছিন্ন থেকেছেন আপনজনদের কাছ থেকে এবং কর্তব্যরত অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করেছেন। বিদেশিদের এই লবণাক্ত আর্দ্রতা মেনে নেয়া কঠিন। সমুদ্র এখান থেকে দু’তিন মাইল দূরে, এরি মাঝে আছে ‘শ্বেত পর্বত’ [ডযরঃব পষরভভং], কাছে ধারে জঙ্গল নেই।’

পাহাড়ের চূড়ায়, সমুদ্রের মুখোমুখি কোলম্যানের বাংলো। ম্যালকম মন্তব্য করেছেন-

‘ঞযবৎব ংববসবফ হড় ৎবধংড়হং যিু ধ ঃবসঢ়বৎধঃব ধহফ ঢ়ৎঁফবহঃ সধহ সরমযঃ হড়ঃ ৎবসধরহ ংধভবষু. ইঁঃ ঃযরং যিড়ষব পড়ধংঃ ংববসং ফবধফষু ঃড় ভড়ৎবরমহবৎং.”

ম্যালকম লিখেছেন, তিনি জেনেছেন কোলম্যানের মতো আরো অনেকে এত সব প্রতিক‚লতার মধ্যেও কাজ করে গেছেন এবং এক সময় মৃত্যুবরণ করেছেন। ‘আমি এখন পর্যন্ত কোনো বিলাসী, অলস, আত্মকেন্দ্রিক মিশনারি দেখিনি।’

কোলম্যানের মৃত্যুর পর কক্সবাজারের আর কোনো মিশনারি বসবাস করেননি। মি. ফিংক মাঝে মাঝে এসেছেন, তার দেশীয় সহকারীরা দু’এক মাস থেকেছেন। কোলম্যান আসার আগে ২০ জন খৃষ্টান হয়েছিলেন, যাদের অনেকে আকিয়াব চলে গেছেন। বাকীরা মৃত, অথবা চলে গেছেন বা নিখোঁজ। এখানের জনসংখ্যা ক্রমশ কমছে।

এরপর আকিয়াব ভ্রমণের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন।

৫.

১৮৪০ পর্যন্ত মিশনারিদের কাজ খুব ভালোভাবেই চলছিল। এরপর দেখা গেল, পরিস্থিতি আর অনুক‚ল নয়। আকিয়াবে ১০ বছর ধরে ফিংক ভালোই প্রচার চালাচ্ছিলেন। আর যোহানেস ব্যস্ত ছিলেন স্কুল নিয়ে। ১৮৩৯ সালে ফিংক ফিরে এলেন চট্টগ্রামে। ওই বছর চার্চে দেশি ধর্মান্তরিতের সংখ্যা ছিল মাত্র আট জন। এর পরের কয়েক বছর একজন মগ জমিদারের ধর্মান্তরের খবর পাওয়া যায়। সীতাকুণ্ডেও প্রচারে যাচ্ছিলেন মিশনারিরা। কিন্তু সুবিধা হয়নি। ১৮৪৭-এর দিকে ফিংক অবসর নিলেন। যোহানেস আবার ভার নিলেন পুরো গির্জার।

১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের আগে এবং খানিক পরে যোহানেসই চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত প্রসারিত করেছিলেন তার যাত্রা। সেখানে বরং খানিকটা সফল হয়েছিলেন। তার প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৮৫৩ সালে, দেশি খৃষ্টানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৬৫ জনে, কুমিল্লায় ১৮ জন। কুমিল্লার কালিকাপুরে কাজ করেছিলেন। সেখানে ১৮৫৪ সালে ৪ জনকে ধর্মান্তরিত করতে পেরেছিলেন। চাটগাঁ থেকে কুমিল্লায় কাজ করা দুরূহ ছিল। তাই ১৮৫৫ সালে কুমিল্লার ভার দেয়া হয় ঢাকার রূপার্ট বিয়নকে।

চট্টগ্রামে এ সময় পর পর দুটি সাইক্লোনে ব্যাপক ক্ষতি হয়। যোহানেসের স্কুলটি উড়ে যায়। ইটের তৈরি গির্জা ঘরটিও ভেঙে পড়ে। যোহানেস কিন্তু তাতেও দমেননি। চাটগাঁর পাশে ফটিকছড়ি, হালিশহর আর চান্দগাঁও প্রচার চালিয়ে যান।

যোহানেসের মৃত্যু হয় ১৮৬৪ সালে। ১৮৫৭ সাল থেকে এ সময়টুকু সম্পর্কে খুব বেশি জানা যায় না। খুব সম্ভব প্রচারে আর সুবিধা হচ্ছিল না। ১৮৬৪ সালের পর রেভারেন্ড ম্যাককেনা এসে চট্টগ্রামের ভার নেন। সে অন্য আরেক ইতিহাস। চট্টগ্রামে মিশনারিদের আদিপর্ব ধরে নিতে পারি যোহানেসের মৃত্যু পর্যন্ত।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj