হারানো উইল রহস্য : মূল গল্প : আগাথা ক্রিস্টি : অনুবাদ : মধুসূদন মিহির চক্রবর্তী

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

[ সর্বকালের সবচেয়ে বেশি বিক্রীত বইয়ের লেখিকা আগাথা ক্রিস্টি। পুরো নাম আগাথা ম্যারি ক্লারিসা ক্রিস্টি। তিনি ১৮৯০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর ইংল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করেন। একই সাথে অপরাধ বিষয়ক অনবদ্য উপন্যাস, ছোট গল্প এবং চিত্রনাট্যের স্রষ্টা হিসেবে তিনি জগৎ বিখ্যাত। মূলত ক্রাইম নভেলিস্ট হিসেবে খ্যাতি পেলেও তিনি ছয়টি রোমান্টিক গল্পও লিখেছেন ম্যারি ওয়েস্টমাকোট ছদ্মনামে। তার লেখা ৬৬টি গোয়েন্দা উপন্যাস এবং ১৪টি ছোটগল্পে অপরাধ, খুন, তদন্ত এবং জটিল মনোবিশ্লেষণের উপস্থিতির কারণে বিশ্ব সাহিত্যের অগণিত পাঠকদের কাছে তুমুল জনপ্রিয়। এছাড়া তার অনেক বেস্ট সেলিং বইয়ের ধারণা নিয়ে তৈরি হয়েছে অনেক টিভি নাটক এবং চলচ্চিত্র। এর মধ্যে ‘অ্যান্ড দেন দেয়ার অয়ার নান’ এবং ‘পার্টনারস ইন ক্রাইম’ উল্লেখযোগ্য। লেখক হিসেবে তিনি এখনো অসংখ্য পাঠকের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে। অনেকেরই প্রশ্ন রয়েছে ব্যক্তি আগাথা ক্রিস্টিকে নিয়ে। কেমন ছিলেন তিনি? তার নির্মিত অনেক কাল্পনিক চরিত্রে যে ধরনের বৈচিত্র্য দেখা যায়, তার নিজের ভেতরে কি তা ছিল? নিশ্চয় ছিল। তা না হলে তিনি এ চরিত্রগুলো তৈরি করলেন কীভাবে! তিনি ১৯৭৬ সালের ১২ জানুয়ারি পঁচাশি বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। গত বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালে ছিল আগাথা ক্রিস্টির ১২৫তম জন্মজয়ন্তী।

‘দ্যা কেস অভ মিসিং উইল’ গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয় ‘দ্যা স্কেচ’ পত্রিকায় ১৯২৩ সালের ৩১ অক্টোবর তারিখে। ]

মিস ভায়োলেট মার্শ আমাদের কাছে যে সমস্যাটি নিয়ে এলেন সেটি আমাদের নিত্যদিনের কাজের ধারার মধ্যে মনোরম একটি পরিবর্তন এনে দিল। সাক্ষাতের নির্ধারিত সময় চেয়ে ভদ্রমহিলা গোয়েন্দা হারকিউল পোয়রোর কাছে একটি মার্জিত চিঠি পাঠিয়েছিলেন। পোয়রোও সে চিঠির জবাবে তাকে পরদিন বেলা এগারোটায় আসার অনুরোধ করে একটি জবাব লিখলেন।

পরদিন যথা সময়ে ভদ্রমহিলা হাজির। লম্বা ও সুদর্শনা এক যুবতী, ছিমছাম অথচ পরিচ্ছন্ন তার পোশাক-পরিচ্ছদ। নিঃসংশয় ও যুৎসই তার আচরণ। মোটকথায় বলতে গেলে বর্তমান পৃথিবীতে চলনসই একজন আধুনিকা নারী তিনি।

-আমার সমস্যাটি একটু আলাদা ধরনের মিস্টার পোয়রো, চেয়ারে বসতে বসতেই তিনি বলতে শুরু করলেন- ‘আমি বরং কাহিনীর একবারে শুরু থেকে শুরু করি এবং সম্পূর্ণ কাহিনীটি আপনাকে জানাই।’

-অবশ্যই মাদামোয়াজেল।

-আমি একজন এতিম। আমার বাবা ছিলেন ডেভেনশায়ারের ছোটখাটো এক কৃষিনির্ভর জমিদার পরিবারের সন্তান। পরিবারে দুই ভাইয়ের মধ্যে বাবা ছিলেন কনিষ্ঠ। আমাদের পারিবারিক খামারটি খুবই দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। আমার বড় কাকা অ্যান্ড্রু মার্শ এক সময় অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান। সেখানে তিনি খুবই সমৃদ্ধি অর্জন করেন। জমিজমার ফটকাবাজি ব্যবসায় সাফল্যের মাধ্যমে তিনি একজন ধনবান ব্যক্তিতে পরিণত হন। ওদিকে কনিষ্ঠ ভাই (আমার বাবা) রজার মার্শের কৃষিকাজের প্রতি তেমন কোনো ঝোঁকই ছিল না। তিনি অল্প বিস্তর লেখাপড়া করেছিলেন এবং সেটুকু বিদ্যের জোরেই একটি প্রতিষ্ঠানে কেরানির চাকরি জুটিয়েছিলেন। আমার মা ছিলেন এক দরিদ্র শিল্পীর কন্যা। আমার বাবা যখন মারা যান তখন আমার বয়স মাত্র ছয় বছর। আর আমার চৌদ্দ বছর বয়সের সময় মা আমাকে ছেড়ে পরলোকে চলে যান। পৃথিবীতে একমাত্র বড় কাকা অ্যান্ড্রু ছাড়া আমার আর কোনো আপনজন জীবিত রইল না। সে সময় বড় কাকা অস্ট্রেলিয়া থেকে ফিরে আসেন এবং তার পৈতৃক বসতির পাশেই ‘ক্র্যাবট্রি ম্যানর’ নামের জমিদার বাড়িটি ক্রয় করেন। তিনি তার ভাইয়ের এতিম কন্যাটির প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ছিলেন। তিনি আমাকে তার নিজের কাছে নিয়ে এলেন এবং নিজের মেয়ের মতো আদরে লালন-পালন করতে লাগলেন।

ক্র্যাবট্রি জমিদার বাড়িটি ছিল এটার নামের মতোই প্রাচীন একটি খামার বাড়ি। আমার বড় কাকার রক্তের মধ্যে ছিল চাষাবাদের প্রবল নেশা। কৃষিকাজের নতুন ও আধুনিক পদ্ধতির পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে তার আগ্রহ ছিল অসাধারণ। আমার প্রতি যদিও তার অপরিসীম মায়া ছিল তবুও সমাজে নারীদের উন্নতি সাধনের ব্যাপারে তার অদ্ভুত কতগুলো ধারণা ছিল। তিনি নিজে ছিলেন অতি অল্প শিক্ষিত। অথবা বলা যেতে পারে শিক্ষা-দীক্ষা তার মধ্যে কিছুই ছিল না। তবে তার বুদ্ধি ছিল প্রখর এবং তীক্ষè। প্রথাগত পড়াশুনার জ্ঞানের ওপর তার মোটেই আস্থা ছিল না। নারী শিক্ষার বিষয়ে তিনি ছিলেন ঘোরতর বিরোধী। মেয়েরা শুধু ঘর-গৃহস্থালি ও গবাদি পশুপালনের কাজকর্ম দেখাশুনা করবে- এটাই ছিল তার অভিমত। তিনি ভাবতেন, মেয়েরা যতটা কম পরিমাণে পুঁথিগত বিদ্যা অর্জন করবে তত বেশি ঘরকন্নার কাজ শিখতে পারবে। তার এই মতামত অনুযায়ী তিনি আমাকে বড় করতে চাইলেন। এর ফলে আমি প্রচণ্ড পরিমাণে নিরাশ হওয়ার সাথে সাথে বিরক্তও হলাম। আর তাই স্পষ্টভাবেই আমি বিদ্রোহ করে বসলাম। আমি জানতাম যে আমার পড়াশুনার মেধা ভালোই কিন্তু ঘরকন্নার কাজে আমি অতটা পটু নই। এ বিষয়ে বড় কাকার সঙ্গে আমার তর্কাতর্কি হলো তবে এতে আমাদের সম্পর্কে তেমন কোনো ব্যাঘাত ঘটলো না। আমরা নিজেদের ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছা অনুযায়ী চলতে থাকলাম। সৌভাগ্যক্রমে আমি একটি স্কলারশিপ পেয়েছিলাম। আর সে কারণেই একটা নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত আমি স্বাধীন পথে বিচরণ করার সাফল্য পেয়ে গেলাম। তবে সংকটটি দেখা দিল তখনই যখন আমি গারটনে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমার নিজস্ব অর্থ-কড়ি বলতে স্বল্প পরিমাণ টাকা ছিল। টাকাগুলো আমি আমার মায়ের কাছ থেকে পেয়েছিলাম। ঈশ্বর আমাকে যে মেধা দিয়েছেন সেটির সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার করার জন্য আমি তখন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বড় কাকার সঙ্গে এ বিষয়ে আমার আবার তর্ক হলো। তিনি আমার কাছে তার নিজের কিছু যুক্তি তুলে ধরলেন। আমি ছাড়া তিনকুলে তার আর কেউ ছিল না। এ কারণেই তিনি তার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী করে যেতে চান আমাকে। আপনাকে আগেই বলেছি, তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধনী ব্যক্তি।

আমি যদি আমার নতুন ভাবনাটিকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চাই, তাহলে সেই বিষয়ে তার কাছ থেকে আমার কোনো কিছুই নেয়ার প্রয়োজন নেই। আমি বিনয়ী ও নম্রভাব দেখালাম তবে আমার দৃঢ়তায় অটুট রইলাম। আমি তাকে বললাম সবসময়ই আমি তার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলবো কিন্তু আমি অবশ্যই আমার নিজের মতো করে বাঁচতে চাই। এই রকম সিদ্ধান্তের পর আমরা পরস্পর হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। ‘তোমার মগজটাকে কাজে লাগিয়ো বাছা’- এই ছিল তার শেষ কথা। ‘আমার পুঁথিগত বিদ্যা না থাকলেও যে কোনো দিন আমি তোমার সমকক্ষ হতে পারি। আমরা যা দেখতে চাই তা-ই আমরা দেখতে পাবো।’

আজ থেকে নয় বছর আগেকার কথা। সেই সময়গুলোতে কোনো কোনো সপ্তাহান্তে আমি তার সঙ্গে থাকতাম। সে সময় আমাদের সম্পর্কটি ছিল খুবই সৌহার্দ্যপূর্ণ তবে তার চিন্তাধারা ছিল বরাবরের মতোই অপরিবর্তিত।

আমি যে ম্যাট্রিক পাস করেছিলাম, সে ব্যাপারে তিনি কোনোরকম মন্তব্যই করতেন না। এমনকি আমার বিএসসি পাস করার পরও তিনি নীরবই থেকেছেন। গত তিন বছর থেকে তার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়ে এবং মাসখানেক আগে তিনি ইহলোকের মায়া ত্যাগ করে চলে যান।

এখন আপনার কাছে কেন এসেছি, সে প্রসঙ্গে আসি। আমার বড়কাকা একটি অতি বিস্ময়কর উইল করে যান। সেই উইলের শর্তগুলো এইরকম- তার মৃত্যুর এক বছরের মধ্যে ক্র্যাবট্রি ম্যানর আর সেখানকার সব কিছু আমার অধিকারে বর্তাবে। ‘যে সময়ে আমার বুদ্ধিমতি ভাইঝি তার বুদ্ধির পরিচয় দিতে সক্ষম হবে’। ঠিক এই কথাগুলোই লেখা আছে তার সেই উইলে। নয়তো এই সময় অতিবাহিত হওয়ার শেষে আমার বড় কাকার বিরাট ঐশ্বর্য বিভিন্ন দাতব্য প্রতিষ্ঠানকে দান করা হবে।

-মাদামোয়াজেল, মিস্টার মার্শের সঙ্গে একমাত্র আপনারই রক্তের সম্পর্ক রয়েছে। আর এ কারণেই মনে হয় যে, আপনার পক্ষে এ কাজ করাটা খুব একটা কঠিন হবে বলে মনে হয় না।

-আমি ওদিকটার কথা ভাবছি না। আমার বড় কাকা মানে অ্যান্ড্রু কাকা বেশ ভালোভাবেই আমাকে সতর্ক করে দিয়েছেন আর আমি আমার নিজস্ব পথ বেছে নিয়েছি। আমি তার ইচ্ছা পূরণ করতে পারব না। তাই তার ইচ্ছে মাফিক যাকে খুশি তার অর্থদান করে যাওয়ার স্বাধীনতা তার আছে।

-আচ্ছা এই উইলটা কি কোনো উকিল তৈরি করেছেন?

-না , ছাপানো উইল ফর্মে ওটা লেখা হয়েছিল। এক দম্পতি এই উইলের সাক্ষী। তারা বড় কাকার বাড়িতেই থাকতো এবং সংসারের কাজকর্ম দেখাশোনা করতো।

-এ ধরনের উইল বদল হবার সম্ভাবনা রয়েছে।

-ওরকম কোনো কাজ আমি করতে যাব না।

-তাহলে আপনার বড় কাকার পক্ষে এটি একটি খেলোয়াড়সুলভ চ্যালেঞ্জ বলে আপনি মনে করেন?

-হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন। আমি এরকমই মনে করি।

-অবশ্যই এর অন্যরকম অর্থ আছে বৈকি, চিন্তিতভাবে বলল পোয়রো। ‘মনে হচ্ছে এই পুরনো এলোমেলো জামিদার বাড়িতে একটি গুপ্ত রহস্য রয়েছে। হয়তো কোথাও কিছু নগদ অর্থ অথবা দ্বিতীয় উইলটি আপনার বড় কাকা লুকিয়ে রেখে গেছেন। আপনার নিজের দক্ষতা দিয়ে সেগুলো খুঁজে বের করতে পারেন কিনা সে জন্য তিনি আপনাকে একটি বছর সময় দিয়ে গেছেন।’

-হ্যাঁ, ঠিক তাই মসিঁয়ে পোয়রো। এ বিষয়ে আমি আপনাকে আগে থেকেই প্রশংসা জানিয়ে রাখছি কারণ আমার চাইতে আপনার উদ্ভাবন কুশলতা অনেক বেশি।

-আহা! সেটা আপনার অতিশয় বিনয়। যাই হোক, আমার মস্তিষ্ক আপনার সেবায় নিয়োজিত করতে চাই। আচ্ছা বলুনতো, আপনি নিজে, কোনোরকম খোঁজ করে দেখেছেন কি?

-সেটা কেবল একবারই, তাও দায়সারা গোছের। তবে আমার বড় কাকার সুনিশ্চিত দক্ষতার ওপর আমার অপরিসীম শ্রদ্ধা আছে বলেই কাজটা খুব সহজ হবে বলে মনে হচ্ছে না।

-সেই উইলটি অথবা সেটার কোনো একটি নকল আপনার কাছে আছে?

টেবিলের ওপর একটি নথি রাখলেন মিস মার্শ। পোয়রো সেটা পড়লেন, তারপর আপন মনেই ঈষৎ মাথা নাড়লেন তিনি।

-তিন বছর আগের তৈরি। তারিখটি ২৫শে মার্চ আর সময়টি লেখা রয়েছে সকাল এগারোটা- সেটাই খুব ব্যঞ্জনাপূর্ণ। এতে করে অনুসন্ধানের কাজটা সহজ হবে। আর একটা উইলের সন্ধান আমাদের করতেই হবে, এটা মোটামুটি নিশ্চিত। এমনকি আধঘণ্টা পরে তৈরি উইলটাও অনেক কিছু ওলট-পালট করে দিতে পারে। জানেন মাদামোয়াজেল আপনার পেশকৃত সমস্যাটি যতখানি রোমাঞ্চকর ঠিক ততখানি দক্ষতার সঙ্গে তার সমাধানের পথ করতে হবে। আপনার জন্য এই সমস্যাটির একটা সুষ্ঠু সমাধানের চেষ্টা করতে পারলে আমি কৃতার্থ হব। আমি স্বীকার করছি আপনার বড় কাকা ছিলেন একজন বিচক্ষণ ব্যক্তি। কিন্তু পাশাপাশি এটাও মনে রাখবেন, তাঁর মগজটি কিন্তু হারকিউল পোয়রোর মতো গুণসম্পন্ন ছিল না।

(সত্যিই পোয়রোর এই দম্ভ চোখে পড়ার মতোই বটে!)

-সৌভাগ্যক্রমে এই মুহূর্তে আমার অন্য কোনো তাড়া নেই। হেস্টিংস এবং আমি আজ রাতেই ক্র্যাবট্রি জমিদার বাড়ীতে যাব। আমি মনে করি, আপনার বড় কাকার দেখাশোনা করতো যে দম্পতি তারা এখনো সেখানেই আছে, তাই না?

-ঠিক ধরেছেন, তাদের নাম বেকার। মিস্টার এবং মিসেস বেকার।

পরবর্তী প্রভাতে ক্র্যাবট্রি জমিদার বাড়িতে শুরু হলো আমাদের সত্য-অনুসন্ধান। আগের দিন গভীর রাতে আমরা সেখানে গিয়ে পৌঁছাই। মিস মার্শের পাঠানো একটা টেলিগ্রাম পেয়ে মিস্টার এবং মিসেস বেকার আমাদের অপেক্ষায় ছিলেন। এক সুখী দম্পতি, বেশ হৃষ্টপুষ্ট গোলগাল দেখতে পুরুষটির মুখাবয়ব এবং তার স্ত্রীকে দেখে মনে হলো ভদ্রমহিলার মুখখানি ডেভনশায়ারের মতো শান্ত-স্নিগ্ধ।

ভ্রমণের ক্লান্তি এবং স্টেশন থেকে এখান পর্যন্ত আট মাইল পথ গাড়িতে এসে পথশ্রমে আমরা তখন খুবই ক্লান্ত। চিকেনের রোস্ট, আপেলের পিঠা এবং ডেভনশায়ারের মাখন খেয়েই আমরা বিছানায় নিজেদের সঁপে দিয়েছিলাম। আর এখন তেমনি চমৎকার একটি প্রাতঃরাশ সেরে একটি কক্ষে অপেক্ষা করছিলাম। কক্ষটি পরলোকগত মিস্টার মার্শের স্টাডি এবং বসবাসের ঘর হিসেবে ব্যবহৃত হতো। আমাদের সামনের দেয়াল ঘেষে একটি ঢাকনাওয়ালা ডেস্ক। তার ওপর বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্নভাবে সাজানো গোছানো কাগজপত্রের স্ত‚প। সামনে একটা বড় আকারের চামড়ার হাতলওয়ালা আরাম কেদারা। চেয়ারটিকে দেখে মনে হচ্ছে এটি তার মালিকের সার্বক্ষণিক বিশ্রাম নেয়ার স্থান ছিল। উল্টোদিকের দেয়ালের জানালা ঘেঁষে একটা রঙচটা সোফা ও পুরনো আমলের গদি-আঁটা আসন।

ক্ষুদ্র একটি সিগারেটে আগুন ধরিয়ে পোয়রো বলল, ‘দেখো হেস্টিংস অনুসন্ধানের জন্য আমাদের অবশ্যই একটা ছক কষা উচিত। ইতোমধ্যে আমি বাড়িটা মোটামুটি ঘুরেফিরে দেখে নিয়েছি। কিন্তু আমার মনে হয় এই ঘরের মধ্যেই কোনো ক্লু পেয়ে যেতে পারি। এবার ডেস্কের ওপরের সমস্ত নথিপত্র যারপরনাই সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করতে হবে। তবে এই সব কাগজপত্রের মধ্যে থেকে তার উইলটা পাওয়ার সম্ভাবনা আমি দেখতে পাচ্ছি না। কিন্তু এমনও হতে পারে যে, এখানে এমন একটা সাধারণ কাগজ রয়েছে যাতে সেই গুপ্তস্থানের একটা সূত্র পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু তার আগে আমাদের একটু খুঁটিনাটি বিষয় জেনে নেয়া প্রয়োজন। আমার অনুরোধ, ঘণ্টাটা একটু বাজাও তো।’

পোয়রোর অনুরোধে আমি ঘণ্টা বাজালাম। আমরা যখন উত্তরের অপেক্ষা করছিলাম তখন ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে করতে আপন মনেই ঘাড় নাড়ছিল পোয়রো। দেখে মনে হচ্ছিল যেন নিজেই নিজেকে সায় দিচ্ছিল।

-মিস্টার মার্শের প্রতিটি কাজকর্মের একটা পদ্ধতি ছিল। দেখো কাগজের প্যাকেটগুলো কেমন সুন্দর করে সাজানো। তারপর দেখো প্রতিটি ড্রয়ারের চাবিতে হাতির দাতের লেবেল লাগানো। দেয়ালের চায়না ক্যাবিনেটের চাবিটাও অনুরূপ। আর দেখো চায়না ক্যাবিনেটটা কেমন যথাযথভাবে সাজানো। দেখে অন্তর বিগলিত হয়, দৃষ্টিও এখানে বিঘ্নিত হয় না।

হঠাৎ নীরব হলো সে। ডেস্কের চাবির ওপর তার চোখ পড়তেই দেখতে পেল যে তাতে একটা খাম আটকানো রয়েছে। সেদিকে তাকিয়েই পোয়রোর কপালে ভাঁজ ফুটে উঠল। সেটা সে তার হাতে তুলে নিল। খামটির ওপর দুর্বোধ্য হাতের লেখায় লেখা আছে ‘ঢাকনাওয়ালা ডেস্কের চাবি’। অন্য চাবিগুলোর ওপরে লেখা নির্দেশিকার সঙ্গে এই লেখাটার ছিল বৈসাদৃশ্য।

-একেবারেই ভিন্নতর একটি লেখা- চিন্তিতভাবে বলল পোয়রো। ‘আমি শপথ নিয়ে বলতেপারি এখানে মিস্টার মার্শের ব্যক্তিত্বের কোনো আলামত খুঁজে পাচ্ছি না। কিন্তু এই বাড়িতে বাইরের আর কে আসতে পারে? আসতে পাওে শুধুমাত্র মিস মার্শ। আর আমার যদি ভুল না হয়ে থাকে এই যুবতীও তার বড় কাকার মতো গুছিয়ে সব কাজ করে থাকে। তার প্রতিটি কাজেই কোনো না কোনো একটা যুক্তির ছাপ থাকাই প্রাসঙ্গিক বটে।’

ইতোমধ্যে ঘণ্টার শব্দের উত্তরে মিস্টার বেকার এসে দাঁড়িয়েছিল সেখানে।

-শোনো বেকার তোমার স্ত্রীকে একটু আসতে বলবে? আমাদের কয়েটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে তোমাদের।

বেকার চলে গেল। কয়েক মিনিটের মধ্যে মিসেস বেকার ভেজা হাত অ্যাপ্রোনে মুছতে মুছতে তার স্বামীর সঙ্গে ঘরে ঢুকল। সংক্ষিপ্ত এবং স্পষ্ট কয়েকটি বাক্যে পোয়রো তার উদ্দেশ্যের কথা জানিয়ে দিল তাদের। সঙ্গে সঙ্গে বেকাররা সহানুভূতি দেখাল।

-মিস ভায়োলেট তার এক্তিয়ারের বাইরে কিছু করতে চাইলে আমরা সেটা মানতে রাজি নই- স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিলেন মিসেস বেকার। ‘তা করলে আমাদের পক্ষে কাজ করাটা খুবই কঠিন হয়ে পড়বে।’

পোয়রো তার পরবর্তী প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। তার বুঝতে বাকি রইল না উইলের সাক্ষী দেয়ার কথা হুবহু মনে রেখেছে মিস্টার এবং মিসেস বেকার। বৃদ্ধ মার্শের নির্দেশেই পার্শ্ববর্তী শহর থেকে দুটি ছাপানো উইলের ফর্ম নিয়ে আসে মিস্টার বেকার।

– দুটি কেন? তীক্ষèস্বরে জিজ্ঞেস করল পোয়রো।

-আজ্ঞে হ্যাঁ স্যার। আমার মনে হয়, সচেতনতার কারণেই হবে হয়তো। একটি ফর্ম যদি কোনো কারণে নষ্ট হয়ে যায় তাই তিনি আরো একটি বাড়তি ফরম আনিয়েছিলেন। তবে প্রথমে আমরা একটা উইলেই সই করেছিলাম

-সেটা ঠিক কোন সময়ে?

মাথা চুলকিয়ে বেকার বোধহয় সময়টা আন্দাজ করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু তার স্ত্রী খুব তড়িঘড়ি তার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলে।

-আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, বেলা এগারোটা নাগাদ হবে। কোকো তৈরি করার জন্য স্টোভের ওপর তখন দুধ চাপিয়েছিলাম। তোমার মনে নেই? -স্বামীর দিকে ফিরে সে বলতে থাকে ‘রান্নাঘরে ফিরে গিয়ে দেখি স্টোভের ওপর সমস্ত দুধ তখন তাপে একেবারে শুকিয়ে তলানিতে ঠেকেছিল।’

-আর তারপর?

-এর প্রায় ঘণ্টাখানেক পর আবার আমাদের যেতে হয়েছিল মিস্টার মার্শের স্টাডিরুমে। আমাদের বৃদ্ধ মালিক তখন বলেন, ‘আমি একটা ভুল করে ফেলেছি, তাই আগের উইলটা ছিড়ে ফেলতে হলো। তোমাদের আবার সই করার জন্য কষ্ট দিচ্ছি’- আর তার কথামতো আমরা আবার সই করলাম। তারপর তিনি সামান্য কিছু টাকা দিলেন আমাদের উভয়কেই। ‘আমার সই করা উইলে আমি তোমাদের কিছুই দিয়ে যাইনি’।

তিনি বললেন ‘তবে আমি যখন থাকব না, প্রতি বছর তোমরা সবাই এর ভালো ফলাফল পাবে।’ এবং আমরা নিশ্চিত যে, সত্যি সত্যি তিনি তার লেখা উইলে তাই করে গেছেন।

তাদের দিকে তাকিয়ে পোয়রো জিজ্ঞেস করলেন, ‘দ্বিতীয়বার তোমরা সই করলে, তারপর মিস্টার মার্শ কি করলেন? সে বিষয়ে কিছু কি জানো তোমরা?’

-গ্রামের একটা বই এর দোকানে চলে গিয়েছিলেন তিনি।

সেটা তেমন কোনো ধর্তব্য বিষয় নয়, তাই আর একটা কৌশল খাটালেন পোয়রো। ডেস্কের চাবিটা হাতে নিয়ে সেই খামটা তাদের সামনে তুলে ধরে জিজ্ঞেস করলেন তিনি ‘দ্যাখো তো এই হাতের লেখাটি কি তোমাদের মনিবের?’

আমি সেরকম কিছু একটাই আন্দাজ করেছিলাম এবং কয়েক সেকেন্ড যেতে না যেতেই জবাবে বেকার বলে উঠল ‘হ্যাঁ স্যার, এটা তারই হাতের লেখা।’

মিথ্যে বলেছে সে আমি ভাবলাম। কিন্তু কেন? কেন সে মিথ্যে বলতে গেল?

-আচ্ছা তোমাদের মনিব কি এ বাড়িটা ভাড়া দিয়েছিলেন? মানে গত তিন বছরে এখানে কোনো আগন্তুক এসেছিল?

-না স্যার।

-কোনো অতিথিও আসেনি?

-শুধুমাত্র মিস ভায়োলেট এসেছেন।

-কোনো আগন্তুক এই ঘরে প্রবেশ করেনি?

-না স্যার।

-জিম, তুমি বোধহয় মিস্ত্রিদের কথা ভুলে গেছ- তার স্ত্রী তাকে স্মরণ করিয়ে দিল।

-মিস্ত্রি? -মিসেস বেকারের দিকে ঘুরে দাঁড়াল পোয়রো। ‘কি ধরনের মিস্ত্রি?’

ভদ্রমহিলা এবার খুলে বলে, প্রায় আড়াই বছর আগে কিছু মেরামতি কাজের জন্য কয়েকজন রাজমিস্ত্রি এ বাড়িতে এসেছিল। ঠিক কি ধরনের মেরামতির কাজ সেটা সঠিকভাবে বলতে পারল না সে। তবে তার ধারণা সম্পূর্ণ বিষয়টিই ছিল তার মনিবের খামখেয়ালিপনার অংশ। সারাটি সময় জুড়ে তারা স্টাডিরুমের ভিতরেই ছিল। কিন্তু তারা সে সময় ঠিক কি ধরনের কাজ করছিল সেটা জানা যায়নি। কারণ কাজ চলার সময় মালিক তাদের ঘরে ঢুকতে দেয়নি এবং এ বিষয়ে কিছু বলেওনি। যে প্রতিষ্ঠান থেকে মিস্ত্রিদের পাঠানো হয়েছিল তার নামটা এখন আর স্মরণ করতে পারছে না তারা। তবে এটুকু তারা বলতে পারে যে, তারা এসেছিল প্লিমাউথ থেকে।

বেকার ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে পর পোয়রো তার হাত ঘষতে ঘষতে বললেন, ‘হেস্টিংস, মনে হয় আমরা খানিকটা দূর এগিয়েছি। আপনমনে রুটির কারিগরদের মতো হাত রগড়াতে রগড়াতে তিনি কক্ষ ত্যাগ করলেন।’ একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেছে যে তিনি অবশ্যই তার দ্বিতীয় উইল লিখে গিয়েছেন এবং উইলটাকে একটা গুপ্ত স্থানে লুকিয়ে রাখবার জন্য প্লিমাউথ থেকে রাজমিস্ত্রি আনিয়েছিলেন। অতএব এই ঘরের মেঝে কিংবা দেয়ালে খোঁড়াখুঁড়ি করে অহেতুক সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না। আমরা বরং প্লিমাউথ যাব, সেই সব মিস্ত্রিদের খোঁজ করে দেখব।

একেবারে অল্প খাটুনিতেই আমরা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়ে গেলাম। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে খোঁজ নেয়ার পরেই এমন একটা প্রতিষ্ঠানের খোঁজ পেলাম। মিস্টার মার্শ তাদেরই কাজে নিয়েছিলেন।

তাদের সকল কর্র্মচারীরাই অনেক দিন ধরে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটিতে। মিস্টার মার্শের নির্দেশে যে দুইজন মিস্ত্রি কাজে গিয়েছিল তাদের সন্ধান খুব সহজেই পাওয়া গেল। সেদিনের কাজটা তারা হুবহু মনে করতে পারল। অন্য আরো সব ছোটখাটো কাজের মধ্যে পুরনো কেতার ফায়ারপ্লেসের একটা ইট সরিয়ে তার নিচে একটা গুপ্ত সুড়ঙ্গ তৈরি করে দিয়েছিল তারা। ইটটা এমন ভাবে কেটে বের করা হয়েছিল যে সেটা জোড়া লাগানোর পর দাগটা দেখা প্রায় অসম্ভব ছিল। দ্বিতীয় ইটের শেষ প্রান্তে চাপ দিলেই সম্পূর্ণ বিষয়টি বেরিয়ে আসবে। বিষয়টি ছিল বেশ জটিল আর এই রকম কাজে বৃদ্ধ ভদ্রলোকটি ছিলেন অত্যান্ত করিৎকর্মা। আমাদের তথ্যদাতা লোকটির নাম ছিল কোঘান। বিরাট লম্বা চওড়া মানুষ, পুরু একজোড়া গোঁফে তাকে বেশ বুদ্ধিদীপ্ত পুরুষ বলেই মনে হচ্ছিল।

বহুগুণ উদ্যম নিয়ে আমরা ফিরে এলাম ক্লাবট্রি জমিদার বাড়িতে। স্টাডিরুমের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে দিয়ে আমরাদের নতুন অর্জিত জ্ঞানটিকে প্রয়োগ করতে এগিয়ে গেলাম। ইটগুলোর ওপর কোনো ধরনের চিহ্নই দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু মিস্ত্রি ভদ্রলোকটির নির্দেশনা অনুসারে একটা ইটের ওপর চাপ দিতেই আলগোছে একটা গভীর গর্ত বেরিয়ে এলো।

অতি উৎসাহী পোয়রো সেই গর্তের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে দিলেন। হঠাৎ তার মুখটা গম্ভীর ও অন্ধকার হয়ে গেল। তার হাতে যে জিনিসটা ঠেকল সেটা একটা দুমড়ানো-মোচড়ানো কাগজের খণ্ডিতাংশ মাত্র। এছাড়া সেই গর্তটা ছিল একেবারেই শূন্য।

-সর্বনাশ! -ক্ষোভে চিৎকার করে উঠলেন পোয়রো। ‘আমাদের আগে অবশ্যই কোনো ব্যক্তি এই গুপ্ত স্থানের সন্ধান পেয়ে গিয়েছে’।

অতিশয় উদ্বিগ্ন অবস্থায় সেই কাগজের টুকরোটি আমরা পরীক্ষা করে দেখলাম। আমরা যেটা অনুসন্ধান করে বেড়াচ্ছিলাম এটা তারই একটি ছেড়া অংশ মাত্র। সেই কাগজের ছেড়া অংশটিতে বেকারের সই এর একটা অংশ চোখে পড়ল কিন্তু সেই উইলের কোনো রকম ভাষ্য তাতে পাওয়া গেল না।

পোয়রোর তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থা। উত্তেজনা সামাল দিতে তিনি মেঝেতে বসে পড়লেন। আমরা যদি সেই পরিস্থিতিটা মোকবিলা করতে না পারতাম তাহলে তার মুখের অভিব্যক্তি রীতিমতো কৌতুককর হয়ে উঠত। ‘আমি এটা বুঝতে পারছি না।’ রাগে উত্তেজনায় চিৎকার করে উঠলেন তিনি। ‘কে বা কারা এটা ধ্বংস করল? আর তাদের উদ্দেশ্যই বা কি ছিল?’

-বেকার পরিবার? আমি আমরার অভিমতের কথা বললাম তাকে।

-উইলে তাদের কারোরই জন্য কোনো সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা ছিল না। জায়গাটা যদি একটি হাসপাতালের সম্পত্তি হয়ে যেতো তাহলে সে ক্ষেত্রে মিস মার্শের পাশেই তাদের থাকা উচিত। কিন্তু উইলটা ধ্বংস করে ফেলার মতো সুযোগ কারই বা হতে পারে?

-সম্ভবত বৃদ্ধ মানুষটির মনের ইচ্ছা বদলে যাওয়ার ফলে নিজেই সেই উইলটা নষ্ট করে ফেলেন তিনি। আমার অনুমানের কথা বললাম তাকে।

-হাঁটু ঝেড়ে উঠে দাঁড়ালেন পোয়রো।

-‘হতে পারে’ স্বীকার করলেন পোয়রো। হেস্টিংস, তোমার কথাটিতে বুদ্ধিমত্তার ছাপ রয়েছে। তাহলে এখন এখানে আমাদের করণীয় আর কিছইু নেই। মরণশীল মানুষেরা যেসব কাজ করতে পারে আমরা তার সবই করেছি। মৃত অ্যান্ড্রু মার্শের প্রতি আমরা আমাদের চিন্তাভাবনা সফলতার সঙ্গে ঠিকমতো প্রয়োগ করতে পেরেছি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের সাময়িক সাফল্যের ক্ষেত্রে তার ভাইঝি কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি।

তখনই আমরা চটজলদি একটি গাড়িতে চড়ে স্টেশনে চলে এলাম। সাথে সাথেই লন্ডনের ট্রেনটা আমরা পেয়ে গেলাম। তবে ওটা দ্রুতগামী কোনো ট্রেন ছিল না। পোয়রোকে বিষণœ এবং অতৃপ্ত দেখা যাচ্ছিল। আমি নিজে তখন অত্যন্ত ক্লান্ত দেহে কামরার এক কোণে পড়ে রইলাম। ট্রেনটি তখন সবেমাত্র টনটন স্টেশন ছেড়ে যেতে উদ্যত এমন সময় আচমকা তীক্ষèস্বরে চেচিয়ে উঠল পোয়রো।

-চলো হেস্টিংস জলদি ট্রেন থেকে লাফাও ! জলদি লাফ দাও!

ভালো করে বুঝে ওঠার আগেই আমি নিজেকে প্লাটফরমের ওপর খালি পায়ে আবিষ্কার করলাম। আমাদের থলে বোঁচকাগুলো নিয়ে ট্রেনটি রাতের আঁধারে মিলিয়ে গেল। আমি তখন খুব ক্ষেপে গেছি। কিন্তু পোয়রোর সে দিকে কোনো মনোযোগ নেই।

-আমি গণ্ডমূর্খ হয়ে গেছি! -চিৎকার করে উঠল সে, ‘তিনগুণ গণ্ডমূর্খ! আমি আর কখনোই আমার বুদ্ধিমত্তার বড়াই করতে পারবো না।’

-যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। কিন্তু এসব কি হচ্ছে বলতে পারেন?- রাগত স্বরে আমি বলে ফেললাম।

পোয়রো যখন তার আপন ভাবনায় মশগুল থাকে তখন আর অন্য কোনো দিকে তার ভ্রƒক্ষেপ থাকে না। এখনো সে আমাকে কোনো পাত্তাই দিল না।

-বইয়ের দোকানিদের বইগুলো- আমি সম্পূর্ণভাবেই মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়েছিলাম। হ্যাঁ, কিন্তু কোথায়? কোথায় সেই সব দোকানগুলো? কিছু মনে করো না, আমার ভুল হতেই পারে না। তাই এক্ষুনি আমাদের ফিরতেই হবে।

বলা যতখানি সহজ করে দেখানো ততটা সহজ নয়। আমরা এক্সেটার যাওয়ার জন্য একটা ধীরগতির ট্রেন পেয়ে গেলাম। সেখান থেকে একটা গাড়ি ভাড়া করল পোয়রো। কাক ডাকা ভোরে আমরা ক্যাবট্রি জমিদার বাড়িতে এসে হাজির হলাম। সাত সকালে আমাদের দেখে হতভম্ব হয়ে থাকা বেকারদের আমরা পার হয়ে এলাম। কোনো দিকে ভ্রƒক্ষেপ না করেই লম্বা পা ফেলে সোজা স্টাডিরুমে গিয়ে ঢুকল পোয়রো।

-বন্ধু আগে তোমাকে বলেছিলাম আমি বোকা ভীষণ বোকা অতুলনীয় বোকা- না আমি তিনগুণ বোকা নই তারও বেশি ছত্রিশগুণ। মন্তব্যটা সে নিজের থেকেই করল। ‘এখন দেখতে পাচ্ছো!’

সোজা ডেস্কের কাছে গিয়ে চাবিটা তুলে নিল সে তার হাতের চাবি থেকে খামটা আলাদা করে ফেললেন। বোকার মতো আমি শুধু তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। এই ছোট্ট একটি খামের ভেতর থেকে কি করেই বা অত বড় একটা উইলের ফর্ম খুঁজে পাব? অতি যতেœর সঙ্গে খামের মুখটা কাটলেন তিনি। তারপর লাইটার জ্বেলে আগুনের শিখার ওপর খোলা খামটা এমন করে তুলে ধরলেন যেন সেটা পুড়ে না যায়। কয়েক মিনিটের মধ্যেই একটা একটা করে সবগুলো লেখা ফুটে উঠতে থাকলো।

-দেখ বন্ধু দেখো! উল্লাসে ফেটে পড়লেন পোয়রো।

তার কথা অনুসরণ করে আমি চোখ রাখলাম সেই কাগজটার ওপর। কতকগুলো অস্পষ্ট শব্দাবলীতে লেখা উইলের শর্তগুলো। সংক্ষেপে যার অর্থ হলো মিস্টার মার্শ তার সব বিষয় সম্পত্তি তার ভাইঝি ভায়োলেট মার্শকে দান করে গেছেন। তারিখ লেখা রয়েছে ২৫ মার্চ দ্বিপ্রহর সাড়ে বারোটা। সেই উইলের সাক্ষী ছিল অ্যালবার্ট পাইক নামের এক কনফেকশনার ও জেসি পাইক নামের বিবাহিতা এক ভদ্রমহিলা।

-কিন্তু বিষয়টি কি আইন সম্মত? আমি আমতা আমতা করে বলে উঠলাম।

-আমি যতদূর জানি অদৃশ্য কালিতে কেই উইল লিখলে সেটা কখনো আইনবিরুদ্ধ হয় না। অতত্রব এর থেকে বৃদ্ধ মিস্টার মার্শের ইচ্ছাটা এখন খুবই স্পষ্ট এবং এর থেকে নির্দিষ্টভাবেই বোঝা যাচ্ছে যে তার সব বিষয় সম্পত্তি ও অর্থের অধিকারিণী হলেন তার একমাত্র জীবিত আত্মীয়া। তার এই কাজের মধ্যে বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি তার দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পেয়েছিলেন এই দ্বিতীয় উইলটার খোঁজ অনেকেই করবে এবং তারা সকলেই তার ভাইঝির প্রতিপক্ষ। তাই সেইসব ব্যক্তিরা তার উইলের বক্তব্য যাতে জানতে না পারে এজন্যই তিনি অদৃশ্য কালি দিয়ে দ্বিতীয় উইলে তার শেষ ইচ্ছাটা লিখে রেখে যান। তিনি দুটি ছাপানো উইল ফর্ম আনিয়েছিলেন এবং গৃহকর্মীদের দিয়ে দুইবার সই করিয়ে নেন সাক্ষী হিসেবে। তারপর সেই নোংরা খামের ভেতরে রাখা অদৃশ্য কালি দিয়ে লেখা দ্বিতীয় উইলটা নিজেই লেখেন তিনি। কোনো একটা অজুহাতে উইলটিতে নিজের স্বাক্ষরের নিচে কনফেকশনার এবং তার স্ত্রীকে দিয়ে যৌথভাবে সই করিয়ে নিয়েছিলেন তিনি। তারপর তিনি সেটা একটা খামে ঢুকিয়ে এই ডেস্কে রেখে দেন ভবিষ্যতের জন্য। বলাবাহুল্য মিস মার্শ এই উইলটি সাদরে গ্রহন করবে বলে তার বিশ্বাস ছিল।

-মিস মার্শ কিন্তু উইলটির সন্ধান পাননি! বৃদ্ধ মার্শের ধারণা ছিল মিস মার্শ যদি সহজেই তার দ্বিতীয় উইলের সন্ধান পেয়ে যায়, তাহলে সে তার উচ্চশিক্ষার পেছনে অনেক টাকা খরচ করে ফেলবে। যাই হোক মিস মার্শ সেই উইলের সন্ধান পাননি, পেয়েছেন কি?- আমি ধীরে ধীরে বললাম, ‘তাই আবার বলছি এটা অনৈতিক। তবে বৃদ্ধ মার্শ এক্ষেত্রে সত্যি সত্যি জয়ীই হয়েছেন।’

-কিন্তু না হেস্টিংস, এটা তোমার বোধশক্তি যা ছাইয়ের সঙ্গে মিশে যাবে। তবে মিস মার্শের বোধশক্তি অনেক বেশি প্রখর। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, বিজ্ঞজনদেরই কাজে নিয়োগ করতে হয়। তিনি এই হারানো উইলের কেসটা আমার হাতে তুলে দিয়ে তার বুদ্ধিমত্তার পরিচয়ই দিয়েছেন। এর ফলে তিনি তার উচ্চশিক্ষার খরচ অনায়াসে চালিয়ে যেতে পারবেন। বড় কাকা অ্যান্ড্রু মার্শের অর্থের ওপর যে তার প্রকৃত অধিকার আছে, তিনি সেটা প্রমাণ করে দিলেন।

তবুও আমি অবাক হয়েছি। আমি অবাক হয়ে ভাবছি বৃদ্ধ অ্যান্ড্রু মার্শ আসলে কি ভেবেছিলেন?

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj