বাড়িছাড়া : পূরবী বসু

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

বাড়িছাড়া-১

সালটা দু’হাজার চৌদ্দ

মাসটা জানুয়ারি

জায়গাটা অভয়নগর,

জেলা যশোহর।

(ক)

অভয়নগরের মানুষ সেদিন খুব ভয় পেয়েছিল।

বাড়ি ছেড়ে মা ও শিশু ভৈরবে ঝাঁপ দিয়েছিল।

সঙ্গে নিয়েছিল দু’মুঠো চাল আঁচলের গিঁটে বেঁধে

ওপারে যদি যেতে পারো, লাগিবে ভীষণ খিদে!

সে কথা জানা ছিল তার পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে।

(খ)

শূন্যঘর; বেদিতে দাঁড়ানো দেবতার মুণ্ডুহীন ধর।

উঠোনে গড়াগড়ি খায় মাটির খণ্ডিত মস্তক

সুডৌল মুখমণ্ডল; সতেজ রঙের প্রলেপ,

হাতে আঁকা মনোরম চোখ, মুখ ঠোঁট।

সব কিছু মুছে গেলে, ভেঙে গেলে

ভেতরের খড়কুটো কৌত‚হল ভরে

কেবল বাইরে উঁকিঝুঁকি মারে।

(গ)

সব হারানোর ব্যথা বুক-চেরা দীর্ঘশ্বাস হয়ে

গলা বেয়ে উঠে আসে কণ্ঠনালী দিয়ে।

বিশ্বাস, সম্ভ্রম, কৃষ্টি কিছুই আহত হয় না।

কারণ সে স্বভূমির নিম্নবর্গীয় একজনা।

সুখ তার কখনো সয় না।

আর সাধের বসতবাড়ি!

রয় না, রয় না, রয় না।

বাড়িছাড়া-২

সালটা দু’হাজার ষোল

মাসটা এপ্রিল।

জায়গাটা বাড়িখালি

জেলা যশোহর।

যশোহরের বাড়িখালি।

তিরিশ জনের বাড়ি খালি

কিন্তু ক্যান?

শাহীন চেয়ারম্যান।

ঘর ছেড়ে সব বনে গেছে ভাই

বাড়ি খালির তিরিশ বাড়ি খালি আছে তাই।

বাড়িছাড়া-৩

(শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের “অবনী বাড়ি আছো” অবলম্বনে)

দুয়ার খুলে পালিয়ে গেছে তারা

তবু শুনি রাতের কড়ানাড়া

‘অবনী, বাড়ি আছো?’

এখানে বৃষ্টি পড়ে বারোমাস

মেঘেরা এখানে দানবের মতো চরে

ভিটে সাপ, কোলাব্যাঙ আর বালিহাঁস

বাড়ি খালির দুয়ার চেপে ধরে-

‘অবনী, তুমি যেয়ো না।’

আধেক লীন হৃদয়ে দূরগামী

ব্যথার মাঝে জেগে থাকি আমি

বাড়ি খালি; তবু শুনি রাতের কড়ানাড়া

‘অবনী, বাড়ি আছো?’

বাড়িছাড়া-৪

(শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের “অবনী বাড়ি আছো” ও শহীদ কাদরীর “অগ্রজের উত্তর” পড়ে)

অজানা শহর, কিছুই তেমন চিনি না,

তবুও পেয়েছি অবনীর নয়া ঠিকানা।

“অবনী বাড়ি আছো?

অবনী বাড়ি আছো।?”

অবনী ঘরেই আছে।

মিলেছে উত্তর।

শহীদ কাদরী বাড়ি আছো?

“শহীদ কাদরী বাড়ি নেই।” অগ্রজের উত্তর।

“জানি না কোথায় যায়, কী করে, কেমন করে দিনরাত কাটে।

…না, না তার কথা আর নয়।”

বাড়ি খালি করে যারা চলে গেছে,

এবার তাদের ডাকি নাম ধরে।

“তিরিশ বাড়ি-খালি! তোমরা কোথায়?”

“মরণ ছাড়া আর যেখানে গেলে কেউ ফেরে না,

আমরা সেখানে সেই জায়গায়।”

সন্ধ্যা নামে; ধীরে ধীরে রাত্রি যৌবনবতী হয়

শেয়াল কিংবা তক্ষক ডাকে আশেপাশে;

ভূতুম প্যাঁচারা ঝিমোয় ডালে বসে।

অনড় বাড়িখালি নিঝুম দাঁড়িয়ে রয়।

জোনাকী পোকারা জ্বলে আবছা অন্ধকারে

শূন্যঘরের খোলা দরজায় বাতাস কড়া নাড়ে,

অস্পষ্ট এক গোঙানির শব্দ কানে ভেসে আসে,

“আমরা এখানে ছিলাম।। বিতাড়িত গত মাসে।”

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj