দহন : অধরা জ্যোতি

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

জানালার গ্রিল ছুঁয়ে এক টুকরো হলুদ রোদ মেঝেতে খেলা করছে। তন্দ্রা কেটে গেলো। ধরমর করে উঠে বসলাম। আজ শুক্রবার সরকারি ছুটির দিন। দৃষ্টি আটকালো পাশের বালিশে। বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। অজানা আশঙ্কার মেঘ ঘনিয়ে এলো দুচোখে। মাহমুদ এ সপ্তাহেও আসেনি। ভীষণ ক্লান্তি ভর করলো সমস্ত চেতনায়। ডান পাশে মুখ ঘোরাতেই দেয়াল জোড়া আয়নায় চোখ বিদ্ধ। ধীরে ধীরে খুঁটিয়ে দেখছি নিজের প্রতিবিম্ব। হ্যাঁ সমস্ত চেহারাই বিধ্বস্ত। কালবৈশাখীর প্রচণ্ড তাণ্ডবের পরে প্রকৃতি যেমন অগোছালো হয়ে পড়ে সেরকমই। মুখের লালচে আভা আর গোলাপ পাপড়ির কমনীয়তাকে গ্রাস করেছে এক রু² মলিনতা। নির্ঘুম দুচোখের পাতায় কালচে শেড। মাথা ভর্তি কালো রেশম চুলগুলোও পাতলা হয়ে এসেছে। সিঁথির চুল উঠে, তা আরো চওড়া হয়েছে। সবচেয়ে কষ্ট লাগছে শরীরের গঠনের দিকে তাকালে। পেটটা থলথলে, প্রচুর মেদ জমে আগাগোড়াই সমান। সুগঠিত, আকর্ষণীয় চেহারা যা পাগলের মতো আকর্ষণ করতো মাহমুদকে, ক্রমেই সেখানে বাসা বেঁধেছে মধ্যবয়সী ছাপ। অস্থির লাগছে কেন আমার! আজ পঁচিশে আষাঢ় আমাদের পঁচিশতম বিবাহবার্ষিকী। এই দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনের সমস্ত কৃষ্ণচূড়া মুহ‚র্তকে ঢেকে দিয়েছে বন্ধ্যা নামক একটি কালো শব্দের পর্দা। হ্যাঁ-হ্যাঁ আমি বন্ধ্যা, আমার এই গর্ভাশয় কখনও ভ্রƒণ ধরে রাখতে পারে না। পরিপক্কতার পূর্বেই ভ্রƒণ নষ্ট হয়ে রক্তাক্ত করে সমস্ত জরায়ুকে। প্রতি মাসের নির্ধারিত মুহ‚র্তটিকে। প্রতি মাসেই রক্তাক্ত হই মাহমুদের বিষণœ মুখটাকে দেখে। এ মাসেও একটি ভ্রƒণকে ধরে রাখতে পারলো না আমার জরায়ু।

মাহমুদ চেষ্টার ত্রুটি করেনি দেশে-বিদেশে বহুবার নিয়ে গেছে চিকিৎসার জন্য, প্রতিবারই ফলাফল একই। মাহমুদ সবদিক থেকে পারফেক্ট, জটিলতা যা তা আমারই।

লালমনিরহাট জেলা শহরের টগবগে তরুণ মাহমুদ, সমস্ত বাধা আর পারিবারিক প্রতিক‚লতা ছিন্ন করে আমাকে নিয়ে এসে সাজিয়েছিল তার পরিপাটি সংসারের সুসজ্জিত ফ্লাওয়ার ভাসে। অত্যন্ত মেধাবী মাহমুদ একের পর এক ডিপার্টমেন্টাল পরীক্ষা ডিঙিয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের পদটি দখল করলো। তার এই উচ্চাকাক্সক্ষার হাত ধরে আমাকেও হাটিয়ে নিয়ে এসেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ ডিঙিয়ে আমিও এক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। বাইরে থেকে সবাই বলে পারফেক্ট জুটি। কিন্তু দাম্পত্যের অন্তঃসারশূন্যতা প্রতিনিয়ত খনন করে চলেছে সমস্ত চেতনাকে, প্রতিটি মুহ‚র্ত বিদগ্ধ করে চলেছে দুটি হৃদয়কে।

মাহমুদ বদলি হয়ে গেলো টাঙ্গাইল জেলায়। তারপর থেকেই তার আচরণিক পরিবর্তন। আজ আমাদের বিবাহবার্ষিকী। এ দিনটিকে মাহমুদ কি চমৎকারভাবে সেলিব্রেট করত। প্রতিবারই তার প্রিয় হালকা গোলাপি রংয়ের একটি জামদানি শাড়ি আমার কাবার্ডে জমা হতো। কাবার্ড খুললেই এখনো বাইশটি একই রংয়ের জামদানি চোখে পড়ে। এই দিনটিতে সমস্ত কাজ ফেলে ছুটি নিতাম। অথচ গত দু’বছর থেকে সে এই স্বর্ণালী মুহ‚র্তগুলো থেকে দূরে সরে গেছে। প্রিয় রংয়ের প্রিয় জামদানি বাইশ এই সংখ্যাটিতেই থেমে গেছে। তা তেইশ-চব্বিশ থেকে পঁচিশে গড়ালো না। টের পেলাম দুচোখে লোনাজলের স্রোত নামছে।

সবচেয়ে কষ্টকাতর যেটি বিছানায় মাহমুদের শীতলতা। টাঙ্গাইলে যাওয়ার প্রথমদিকে প্রতি সপ্তাহেই আসতো, পুরো এক সপ্তাহের অপূর্ণতা দু’দিনেই পূর্ণ হতো। প্রতিদিন সাত থেকে আটবার ফোন করে খোঁজ নেয়া মানুষ এখন দু’তিন দিনে একবারও ফোন করে না। বারবার ফোন করলে মহাবিরক্ত, মিটিংয়ে আছি, নানা অজুহাত, প্রতি সপ্তাহে বাড়ি ফেরা মানুষটি দু’তিন মাসেও আর আসে না। প্রতি মুহ‚র্তে আমি এক গভীর অন্ধকার আবর্তে তলিয়ে যাচ্ছি। তবে কি মাহমুদ…। অজান্তেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো।

গত বছরের শেষের দিকে বিদ্যালয়ের পারফরমেন্স রিপোর্ট তৈরিতে ব্যস্ত। এ সময় ফোন বেজে উঠলো। তাকিয়ে দেখি স্ক্রিনে অপরিচিত নম্বর। রিসিভ করতেই কষ্টের নীল স্রোত শিরদাঁড়া বেয়ে নিচে নেমে এলো। জানতে পেলাম মাহমুদ বিয়ে করেছে। তার দ্বিতীয় স্ত্রী সিরাজগঞ্জ জেলার মাধ্যমিক জেলা শিক্ষা অফিসার। তাদের দু’বছরের একটি পুত্র সন্তানও আছে।

আমি কি তখন আমাতে ছিলাম। আচমকা সংবাদটির ধাক্কায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। মাহমুদ ছুটে আসে। আমাকে অনেকভাবে বোঝালো তার প্রতিদ্ব›দ্বী কেউ হয়তো আমাদের ভেতর দেয়াল তুলে দেয়ার চেষ্টা করছে। তারপরও ভেঙে পড়া, বিধ্বস্ত, ক্লান্ত এই মানুষটিকে সাথে নিয়ে দু’দিন রাখলো টাঙ্গাইলে। সবকিছু ঘুরিয়ে দেখালো আশ্বস্ত করলো এসব মিথ্যে, ভুয়া সংবাদ। আমি আগেও তোমার ছিলাম, এখনও আছি। শুধুমাত্র কাজের চাপ একটু বেশিই বেড়েছে।

তারপর আবারও মাহমুদের দূরে সরে যাওয়া। আমি আর পারছি না। আজ বিশেষ একটা দিন, গত দু’বছর ধরে সে পুরোপুরিই ভুলে গেছে।

আষাঢ় মাসের শুরু থেকেই আমি মনে মনে কত পরিকল্পনার জাল বুনেছি। গত পরশু অফহোয়াইট একটা চমৎকার পাঞ্জাবি কিনে রেখেছি। সমস্ত বাড়িটাকে মোমবাতিতে সাজাবো, এজন্য চার ডজন মোম এনে রেখেছি। ব্যস্ততার কারণে যদি সময় না পায়, এজন্য নিজেই প্রতিবারের মতো ক্রিম রংয়ের একটি কেক নিয়েছি- যেখানে গোলাপি ক্রিম দিয়ে লেখা ‘অপ্পো-মাহমুদের ২৫তম বিবাহবার্ষিকী’। মাহমুদের পছন্দের সব খাবার, এই বিশেষ দিনটিতে যা সে খেত। দু’রকমের ডাল, পাঁচ রকমের ভর্তা, বিশেষ ভর্তাটি হলো কাঁঠালের বিচি দিয়ে তৈরি যাতে পুরো একটা লেবুর রস থাকবে। আর শোল মাছের শুঁটকি ঝিঙ্গে দিয়ে রান্না করা। সব প্রস্তুতি শেষ এখন শুধু অপেক্ষা, মাহমুদ আসবে হাতে বেলকুঁড়ির একগোছা গাজরা, একটা হলুদ গোলাপের তোড়া, আর প্রিয় সেই গোলাপি জামদানি। দু’দিনের ছুটি নিয়েছি। অনেকদিনের সংশয়ের মেঘটা যদি এই উপলক্ষে সরে যায়। আবার আমার গোছানো ঘর, ঘরের মানুষটিকে পরিপূর্ণভাবে আগের মতো করেই ফিরে পাই। অপেক্ষার শুরু, একে একে প্রহর গেলো, রাত বার’টা এক মিনিটও পার হলো।

আমি বিষণœতার চোরাবালিতে তলিয়ে যেতে যেতে, অজান্তেই ঘুমিয়ে পড়েছি। ধীরে ধীরে আয়নার সামনে থেকে সরে এলাম, রান্নাগুলো সেরে ফেলি। আজ অবশ্যই মাহমুদ আসবে। ফ্রিজের দিকে এগুতে লাগলাম। হঠাৎ ফোন বেজে উঠলো। মেঘ সরিয়ে এক ঝলক রোদ উঁকি দিলো বিষণœ প্রান্তরে ‘এ মাহমুদ’। ফোনটা হাতে নিতেই চোখ দুটো স্থির হয়ে গেলো, স্ক্রিনে সেই অপরিচিত নাম্বার। সংশয়ের দোলা….. রিসিভ করতেই ওপাশে সেই অপরিচিত ভরাট কণ্ঠস্বর। ‘ম্যাডাম গতকাল মাহমুদ সাহেবের দ্বিতীয় সন্তান জন্ম নিয়েছে। এটি কন্যা সন্তান। টাঙ্গাইলের রফিক মেমোরিয়াল হাসপাতালের চতুর্থ তলায়, কেবিন নং-১২৫। সিজারিয়ান বেবি। মাহমুদ সাহেব তার স্ত্রীর পাশে’।

কি হলো আমার। প্রচণ্ড বমি আসছে, দৌড়ে বেসিনে উপুড় হতেই হরহর করে বমি হয়ে গেলো, মাথাটা ঘুরতে লাগলো ক্রমশ সবকিছু অন্ধকার হয়ে আসছে। দেখি বিছানায় শুয়ে। কপালে কার যেন হাত, চোখটা ওপরে উঠে গেলো। পাশ ফিরে মায়ের কোমর জড়িয়ে ধরলাম, মুখটা ডুবিয়ে দিলাম কোলে। চার শ্রাবণের প্রবল বর্ষণ নেমে এলো, মায়ের কোল ভিজে গেলো, হে প্রভু এতটা বর্ষার জল তুমি এই শুকনো খটখটে দুচোখের মেঘে লুকিয়ে রেখেছিলে।

অনেক দূর থেকে মায়ের গলা ভেসে এলো ‘অপ্পো’ টাঙ্গাইলে যাবি। মাথা নেড়ে সায় দিলাম।

সন্ধ্যা সাতটা, বাস থেকে নেমে একটা অটোরিকশা খুঁজছি। কোথা থেকে ঝুপ করে বৃষ্টি নেমে এলো, ভিজে জবজবে। রিকশাওয়ালাকে বললাম, চৌহদ্দির মোড় ‘রফিক মেমোরিয়াল হাসপাতাল’।

তাকিয়ে আছি, বিছানায় ফর্সা, মোটা এক মহিলা শুয়ে মাহমুদের স্ত্রী, পাশে তোয়ালে মোড়ানো ছোট্ট একটি শিশুর শরীর। মাহমুদ সোফায়, কোলে তার তিন বছরের পুত্র সন্তান। মাহমুদের চোখে-মুখে পিতৃত্বের অহংকার। আমি দরজা থেকে হেঁটে এসে মাহমুদের হাতে একটি খাম ধরিয়ে দিলাম। হতচকিত মাহমুদ ছেলেকে নামিয়ে উঠে দাঁড়ালো, চোখে প্রশ্ন। বললাম তোমার মুক্তির সনদ ডিভোর্স লেটার।

এক মুহ‚র্ত দেরি না করেই এগিয়ে গেলাম লিফটের দিকে। একবারও পেছন ফিরে তাকালাম না। পঁচিশ বছরের দাম্পত্য নামক প্রহসনটার চির পরিসমাপ্তি টেনে দিলাম।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj