এলবাম : মোহীত উল আলম

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

-আমি একটা ঝড় চাই, ঝড়, উড়িয়ে নিয়ে যাক আমার সব কিছু। আমার সংসার, ধন-সম্পত্তি। আমার খ্যাতি। মান-সম্মান।

-কেন ম্যাডাম, আপনি এত উৎক্ষিপ্ত হলেন কেন?

মুনা তাহির তীব্র স্বরে বলে উঠলেন, কেন, তুমি বোঝ না? এ সমাজে মেয়ে মানুষের কোনো নিরাপত্তা আছে? পদে পদে সমস্যা! কাজেই আমি অন্য মানুষ হয়ে যেতে চাই। আমি বিখ্যাত অভিনেত্রী মুনা তাহির নই।

আমি কেউ নই। বুঝলা, আমি কেউ নই। ভোরের শিশির।

জমির তাঁর কালো রঙের ব্রিফকেইসটা খুললেন। তখনো হোটেলের স্যুইটের মুনা তাহিরের রুমটা অগোছালো। তাঁর আসার কথা ছিল দশটায়। কিন্তু তিনি এক ঘণ্টা আগে নয়টায় পৌঁছে গেছেন একটা জরুরি কথা নিয়ে। মুনা তাহির কালকে রাত্রে মধ্যপ্রাচ্যের কোনো একটি দেশের দূতাবাসে নৈশভোজন সমাপন্তে ইস্কাটন গার্ডেন রোডের একজন সচিবের বাসায় খানিকক্ষণ ছিলেন। সামান্য পানাসক্ত হয়ে তিনি নেমেছিলেন, যখন জমির তাঁর বস মুনা তাহিরকে কথাটি বলবেন কি না ভেবে আর বলেননি।

জমির বোঝেন সমস্যাটা কোথায়। মুনা তাহিরের সে যৌবন ছলোছলো শরীরটা আর নেই। তাঁর মুখের তীব্র অভিব্যক্তিপূর্ণ আকর্ষণীয় চেহারাটা এখনো থাকলেও, বর্তমান প্রজন্মের পরিচালকেরা তাঁকে আর রোল দিতে চান না, নায়িকা হিসেবে। যদিও তাদেরই একজন জাতীয় পুরস্কার পাওয়া পরিচালক জমিরকে বলেছেন যে, মুনা আপা ইজ মুনা আপা। সুচিত্রা সেনের পরে বাংলা চলচ্চিত্রে মুনা আপার মতো এত গø্যামার প্লাস প্রতিভা নিয়ে আর কেউ আসেননি। তাঁর কোনো বিকল্প নেই।

জমির খোঁচাটি খেয়ে বললেন, তা হলে তাঁকে বুক করছেন না কেন আপনার “ধর্ষিতা” ছবিতে?

পরিচালকের ঠোঁটের কোণে একটি নতুন অর্জিত চালাকির হাসি ফুটে উঠেছিল। বলেছিলেন, বুঝেন তো আপনি সব। ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি চলে মার্কেটের ওপর। মুনা আপার মার্কেট পড়ন্তির দিকে। এখন সোমদের যুগ। কল্যাণী সোম, জেবা হোসেন, নাগিন খান এদের যুগ।

জমির চটে বলেছিলেন, যাঁর সঙ্গে একটু আগে সুচিত্রা সেনের তুলনা করেছিলেন, তাঁর সঙ্গে আবার কল্যাণী, জেবা বা নাগিনের তুলনা। পয়সার জন্য আপনারা সবকিছু করতে পারেন, তাই না!

পরিচালকটিও তাঁর নতুন অর্জিত জাতীয় পুরস্কারের গৌরববোধের চূড়ায় দাঁড়িয়ে মেজাজের সঙ্গে, কিন্তু কণ্ঠে ভদ্রতার গণ্ডি না পেরিয়ে বললেন, ঠিক, তাও না। তবে, মানি ম্যাটারস।

জমির ফেরত আসার আগে দরজার কাছে তাঁকে এগিয়ে দেবার সময় পরিচালক বলেছিলেন। শুনুন, মুনা আপাকে আমি খুব শ্রদ্ধা করি। তবে . . . তবে . . . তিনি যদি কিছু মনে না করেন, নায়িকার এক বড় বোন আছে স্ক্রিপ্টে, সে রোলটা আমি মুনা আপাকে দিতে চাই। যথেষ্ট বড় রোল। অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝা আছে ঐ বড় বোনটার জীবনে। মুনা আপার খারাপ লাগবে না। . . . গলাটা কেশে আরেকটু পরিষ্কার করে বলেছিলেন, কাদের ব্যানারে নামাচ্ছি ছবিটা জানেন তো।

-হ্যাঁ, অভিযাত্রিক না।

-আরে না, অভিযাত্রিক মানে মাজেদ ভাইদের আর কোমরে জোর আছে নাকি? জঙ্গিদের সঙ্গে টাকা-পয়সার সংশ্রব আছে এমন একটা মামলা দুদক উঠিয়েছে না। সরকার মাজেদ ভাইদের পায়খানা বের করে ছাড়বে। দেখুন না।

-তা হলে কাদের ব্যানারে?

-“ছায়াপথ ফিল্মস,” এক ডাকসাইটে মন্ত্রীর সহোদরের টাকায় নামছে। মুনা আপার জন্য আমি দশ ধরে দিচ্ছি বলবেন।

-কল্যাণীকে কততে চুক্তি করেছেন? আর বাহলুকে?

-সেটা ট্রেড সিক্রেট। আপনাকে বলা যাবে না। তবে এঁদের শিডিউল পাওয়াই কঠিন। সেটা আরেক প্রবেøম।

-তারপরও আপনারা প্রতিষ্ঠিত একজন অভিনেত্রীকে ফেলে আনকোড়া, ডায়লগ থ্রো করতে পর্যন্ত পারে না এরকম মেয়েদেরকে কাজ দেবেন।

জমিরের তপ্ত কণ্ঠ শোনার সময় ঐ তরুণ পরিচালকের ছিল না। তিনি জমিরের পেছনে দরজাটা বন্ধ করলেন। একটু শব্দই হলো বা। যেন তিনি যে জমিরের কথায় খুশি হননি, তার জন্য দরজাটা একটু জোরে লাগলই বা।

* * *

-দশ লক্ষ টাকাটা ব্যাপার না। কিন্তু আমি কি এতটাই গø্যামারবিহীন হয়ে গেলাম যে এ পুচকে ডিরেক্টরগুলো পর্যন্ত নায়িকার রোল দিতে চাইছে না।

জমির সোফার ওপর থেকে মুনা তাহিরের রাত্রের খোলা অগোছালো শাড়িটা এক পাশে সরিয়ে বসলেন। ম্যাডামের সঙ্গে তাঁর প্রায় বিশ বছরের সম্পর্ক। প্রথমদিকে মাবুৎ নামে একজন ছিলেন যিনি মুনা তাহিরের চুক্তিগুলো সই করার দায়িত্বে থাকতেন, এবং সময়মতো পারিশ্রমিকের টাকাটা আদায় করে নিতেন। জমির মুনার গ্রামেরই এক দরিদ্র প্রতিবেশীর কৈশোরোত্তীর্ণ ছেলে। কাজের খোঁজে এসে তাঁকে মুনার কাছে সঁপে দিয়ে যান তাঁরই (মুনারই) দূর সম্পর্কের একজন চাচা। এ সময় আয়কর অফিস থেকে মুনা তাহিরের নামে কর ফাঁকি দেবার এক মামলা হয়। দায়টা যেয়ে পড়ল মাবুতের ওপর। মাবুৎ চাকরি হারান। সে জায়গায় জমিরের ওপর দায়িত্ব এসে পড়ল, এবং বিশ বছর ধরে মুনার উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে জমিরের শ্রম, ঐকান্তিকতা ও নিষ্ঠা চলচ্চিত্র জগতের সব হাউজের কাছে পরিচিতি পায়।

জমিরের শরীরের গড়ন লিকলিকে, অনেকটা ধনুকের ছিলার মতো টানটান। মুনা মনে মনে তাঁকে ডাকেন জোঁক। জোঁক মানে মুনার কোনো দেনা-পাওনার ব্যাপারে পার্টি ফসকে গেছে এটা কখনো হয়নি। জমিরকে কাজে লাগানোর প্রথমদিকে একবার সকালের চা খাবার সময় মুনা জিজ্ঞেস করেছিলেন, জমির তুমি এগুলো কর কী করে! শক্ত শক্ত পার্টির কাছ থেকেও টাকা বের করে নিয়ে আসতে পার। জমির তাঁর কালো মুখ খুলে শক্ত সাদা দাঁতের সারির ঝলক দিয়ে বলেছিলেন, কী যে বলেন ম্যাডাম, এগুলি তো সব আপনার ট্যালেন্ট। আপনার অভিনয়ই তো পয়সা এনে দিচ্ছে ওদের।

মুনা বললেন, না, জমির, তোমার কথাটা পুরোপুরি ঠিক না। দেবী আমার চেয়ে অনেক বড় অভিনেত্রী। কিন্তু সে সেরকম রোল কখনো পায় না। কারণ তার তোমার মতো একজন ম্যানেজার নেই। তুমি যেভাবে আমার জন্য প্রমোটার যোগাড় করে এনেছ যুগ যুগ ধরে, সে সুযোগ দেবীর হয়নি। দেবী কেন, সাহানার কথাও ধর না কেন। ওর মতো সুন্দরী প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এসেছে কী না সন্দেহ। কী কণ্ঠও সাথে। যেন সন্ধ্যা। কিন্তু কী হলো। একটা জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেল সেরা অভিনেত্রীর জন্য “ঝড়” ছবিটার জন্য, তারপরেই হারিয়ে গেল। নিজের চেয়ে ছোট বয়সের পরিচালকের সঙ্গে প্রেমে পড়ে ফিল্মের জগত ছেড়ে এখন গৃহিণী হয়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে বাস করছে। কারণ তারা কেউ পাবলিক রিলেশানসের কথা ভাবেনি। বা, সোজা কথায় বললে, তাদের একজন জমির ছিল না।

তা হলে, ম্যাডাম, ফিল্মের জগৎটা যে একটা কঠিন জগত, এটা আপনি মানেন। বয়সটাও একটা ফ্যাক্টর।

আহত বাঘিনীর গায়ে যেন কেউ কাঠি দিয়ে খোঁচা দিল। মুনা তাহির বসা অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। কী বলতে চাও তুমি?

জমির আমতা আমতা করে। না, মানে, ম্যাডাম বলছিলাম যে ফিল্ম জগতে শুধু এক অবস্থায় টিকে থাকতে হবে এমন তো কোনো কথা নেই। কেন জোহরা আপা তো আপনাদের আগের আগের প্রজন্মের নায়িকা। পাকিস্তান আমলের সাদা-কালো বাংলা ছবির রানী ছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হলো, তিনিও বুড়িয়ে গেলেন। তারপর নায়িকা থেকে খালা-মাসীর রোল, তারপর সে রোল ছেড়ে দিয়ে এখন তিনি দাদী নানীর এ্যাক্টিং দাপটের সঙ্গে করে যাচ্ছেন। কই, তাঁর তো কোনো সমস্যা দেখছি না। মুনা রাগের মুখে একটা গøাস জমিরের মুখের ওপর ছুড়ে মারতে উদ্যত হয়ে অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিলেন। তোমার এই রুচি। এতদিন তুমি আমার ম্যানেজারগিরি করে জোহরা আপার সঙ্গে আমার তুলনা করতে পারলে! ইচ্ছে হচ্ছে থাপ্পড় মেরে তোমার কালো মুখটা আরো কালো করে দিই। শোনো, আমি মুনা তাহির, একবার জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছি সেরা অভিনেত্রী হিসেবে। হ্যাঁ, দেবী না পারলেও সাহানা হয়ত আমাকে হারাতে পারত এ লাইনে। কিন্তু টিকে থাকার যুদ্ধটা আপসহীন। দু’ দু’বার আমি স্বামী ছাড়া হয়েছি। দুর্ভাগ্যক্রমে আমার সন্তানাদি নেই। কিন্তু আমি অভিনয় ভালোবাসি, এবং সেটা নায়িকা হিসেবেই ভালোবাসি। বুঝেছ, এ সাহস তুমি কখনো আর মনের মধ্যে আনবে না যে আমি নায়িকা ছাড়া অন্য কোনো রোলে থাকব।

জমিরের আর সাহস হয় না, নতুন পরিচালকটার সঙ্গে যে আলাপটা হয়েছে সেটা তাঁর ম্যাডামকে বলবার। অন্যভাবে বললেন, কেন, ম্যাডাম, বয়স তো একটা ফ্যাক্টর। জগতের নিয়ম। ধরুন, আমি মনে করি, আপনি হয়ত নায়িকা হিসেবে আরো বছর দুয়েক পার করতে পারবেন। কিন্তু নতুন মেয়েগুলো এত ফষ্টিনষ্টি শিখেছে যে, আর হয়েছে কি ডিজিটাল ক্যামেরার কারণে, যে কেউ একটা ক্যামেরা ধরে রোল করেই হয়ে যাচ্ছে পরিচালক, আর টাকা থাকলে প্রডিউসার। এই ছোকরাগুলো নতুন মেয়েগুলোর জন্য পাগল।

-আমি জানি। ডবি নামে একটা মেয়ে উত্তরা থেকে উঠে এসেছে। এ্যাক্টিংএর ‘এ’ ও জানে না। কিন্তু কী তার শরীরের নাচন। সে নাকি নায়িকার পার্ট পাচ্ছে একটার পর একটা। কল্যাণী, জেবা, নাগিনরাও নাকি হেরে যাচ্ছে ওর কাছে!

জমির জিব দিয়ে ঠোঁটের কোণ মুছল। তাঁর এ ভঙ্গিটি মুনার নিতান্তই অপছন্দ। তিনি অজান্তেই চোখ মুদে নিলেন। মনে মনে বললেন, কি কুৎসিৎ। জমির জিব ঢুকিয়ে নিলে চকাশ করে খুব ছোট একটা শব্দ হলো। মুনা ভাবলেন, আহ্্, মরে যাই।

ডবির একটা বড় গুণ হলো কী জানেন, ম্যাডাম। অসম্ভব পরিশ্রমী। আর খুব পাংকচুয়াল। শুনেছি কোনোদিন শিডিউল এক মিনিটের জন্যও মিস করেন না।

মুনার ভালো লাগল না কথাটা। হুঁ, শিডিউল! ঐ সব আমাদের দেশে চলে নাকি। ঐ কলকাতাতেই ওগুলি চলত। উত্তম-সুচিত্রা দু’জন সম্পর্কেই পড়েছি। উনারা ঘড়ি ধরে সময় মানতেন। আমাদের এখানে শিডিউল মানে হলো আমার যা মর্জি তাই।

এ কথা বলতে যেয়েও মুনা মনের কোথায় যেন একটু খোঁচা খেলেন। সময়জ্ঞানটা তাঁর কখনো ছিল না। কোনো পরিচালকের অভিযোগের সময় বলতেন, সামির ভাই আমাকে নিয়ে কাজ করতে অসুবিধা হলে অন্য কোনো নায়িকা দেখেন, আমি বরঞ্চ যাই।

মুনা এ কথা বলে পরিচালকের মুখের ভাবান্তর কোনা চোখে লক্ষ করতেন। নীল আকাশ যেন দ্রুত কালো মেঘে ঢেকে গেল। একটা পাতাবহুল বৃক্ষ যেন মুহূর্তে নিষ্পত্র হয়ে গেল। সামির ভাই নামে কথিত পরিচালক চোখ মিটমিট করে চোখের মধ্যে একটা কৃত্রিম ঝলক তুলে মুখে কুইনাইন খাওয়া চাহনির বদলে রসাসক্ত হাসি এনে বললেন, পুরো মুডটাই আপসেট করে দিলে মুনা। আমি কী বললাম, আর তুমি কী বললে। তুমি ছাড়া আমার ছবি হবে এটা তুমি মনে আনলে কীভাবে!

জমিরকে তাতানো গলায় বললেন, ঐ সব শিডিউল-ফিডিউল না। অভিনয় জানলেই বাজার। আর . . . ।

কথা শেষ করার আগেই জমির বললেন, আর . . . রূপ।

হ্যাঁ, মানি।

জমির বললেন, ম্যাডাম, আরেকটা কথা। আবার তাঁর গলায় আমতা আমতা ভাব। যাঁর কাছে গেছিলাম, তাঁর আপনার জন্য খুব ভক্তি দেখলাম। শুধু বললেন, আমি যদি আরো আগে পরিচালনায় ঢুকতাম, তা হলে মুনা আপাকে নায়িকা হিসেবে পেতাম। ওহ্্, কী যে একটা হিট ছবি হত সেটা।

আর এখন . . . প্রায় চিৎকার করে বললেন মুনা।

জমির যেন মারা যাচ্ছেন, এভাবে অনুচ্চ স্বরে বললেন, ডবির বড় আপার রোল দিতে চাইছে। দশ লাখ টা . . .।

জমিরের কথা শেষ হতে পারেনি। তার আগেই মুনার ছোড়া গøাসটা তাঁর কপালে এসে লাগে ঠক করে। মাথায় হাত দিয়ে জমির সোফায় এলিয়ে পড়েন। রক্তে ভিজে উঠছে হাতের আঙুল।

২.

গøাস ছোড়ার কায়দাটি মুনা শিখেছিলেন ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে। বড় মেজাজের মানুষ ছিলেন পরিচালক ইশতিয়াক। নিজেরই একটা প্রোডাকশান হাউজ ছিল তাঁর “রূপরঙ্গ” নামে, যেটির ব্যানারে ঢোকার জন্য অভিনেত্রীদের মধ্যে তীব্র বাসনা থাকত। তার আগে পর্যন্ত মুনা মঞ্চে অভিনয় করেছেন। বড় পর্দায় তাঁর ব্রেক থ্রু এনে দিলেন এক অর্থে সত্যজিৎ রায়। পরিচালক হিসেবে ইশতিয়াক সাহেব ছিলেন সত্যজিতের পোকা। অনেকে বলাবলি করতেন, সত্যজিতের স্লো মোশন এ্যাক্টিংএর ধাতটাকে সামান্য ফাস্ট করে দিয়ে ইশতিয়াক তা’তে খানিকটা উরুর নাচন ঢুকিয়ে একটা নতুন মশলা তৈরি করেছেন বলে তাঁর ছবিগুলি আর্টিস্টিক এবং ব্যবসায়ে হিট করে। ইশতিয়াক পথের পাঁচালী নির্মাণকালের সময়টি একজন লেখকের একটি বই পড়ে জেনেছিলেন যে ইন্দুবালা চরিত্রটির সন্ধানে সত্যজিৎ গ্রামে যান এবং একজন বৃদ্ধাকে দেখে নির্বাচন করেন। ঠিক সেরকম মুনার একটি অভিনয় মঞ্চে দেখে ইশতিয়াক তাঁর ম্যানেজারকে দিয়ে যোগাযোগ করেন মুনার সঙ্গে। হাতে চাঁদ নয়, বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জমিদারিটা যেন পেয়ে গেলেন মুনা তাহির। “রূপরঙ্গ”-এর ব্যানারে অভিনয়, তাও আবার নায়িকার চরিত্রে। কী একটা কাগজে যেন সই করলেন, কয়েক লক্ষ টাকার, কিন্তু এসবের তাঁর কিছুই মনে নেই, মনে পড়ল শুধু শিশু বয়সের একটা ঘটনা, যখন তাঁদের দু’বোনকে নিয়ে বাবা-মা গেছিলেন কক্সবাজারে বেড়াতে।

মুনার বয়স তখন সাত। ছোট বোন লামিয়ার বয়স তিন। তাঁদের বাবা-মা’র সংসার জীবনটা ছিল ঝগড়া আর ভালোবাসায় পরিপূর্ণ। কী করে কী করে যেন তারপরও তাঁদের মধ্যে একটা সদ্ভাবের এক পর্যায়ে কক্সবাজারের ট্যুরটা ঠিক হলো। মুনার বাবা খানিকটা চালচুলোহীন লোক ছিলেন। সারাজীবন খেলাধুলা নিয়ে ছিলেন। চাকরি একটার পর একটা বদলেছেন, নিজে ব্যবসা করে মারও খেয়েছেন, চলচ্চিত্রের পরিচালনাও করেছিলেন। তাঁর নাম ছিল জামাতুল তাহির। সবকিছু তাঁকে ছেড়েছে, তিনিও সবকিছু ছেড়েছিলেন, কিন্তু একটা ব্যাপারে তাঁর কোনো কম্প্রোমাইজ ছিল না। সেটা হলো খেলা। ক্রীড়ামহলে সর্বজনে তাঁর পরিচয় ছিল বাবু ভাই বলে। বাবু ভাই ফুটবলের সময় ফুটবল, ক্রিকেটের সময় ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টনের সময় ব্যাডমিন্টন, আর বৌএর সঙ্গে ঝগড়ার সময় ঝগড়া- এসব করতে করতে তিনি চল্লিশে পৌঁছাতে পারেননি, তাঁকে ধরল হাঁটুর ক্যান্সারে, যে ক্যান্সারে তিনি মাত্র আটচল্লিশ বছরে মারা গেলেন, যখন মুনার না-টেকা প্রথম বিয়েটার মাত্র এক বছর পার হয়।

কক্সবাজারে তাঁরা গেছিলেন দল বেঁধে চট্টগ্রামের ক্রীড়া পরিষদের অভ্যন্তরীণ ব্যাডমিন্টন কোর্ট পরিষদের উদ্যোগে। সোহাগ কোম্পানির দু’টো বড় এসি বাসে করে তাঁদের কক্সবাজার যাত্রা। মুনা আর লামিয়া পাশাপাশি দু’টো সিটে, আর আইলের অন্য পাশে তাঁর বাবা-মা পাশাপাশি দু’টো সিটে। ঠিক সামনের সিটে বসেছিলেন হাশেম সাহেব আর তাঁর স্ত্রী। হাশেম সাহেব তাঁর খেলোয়াড়ি জীবনে চট্টগ্রামের ট্র্যাক এন্ড ফিল্ডের রাজা ছিলেন। পাকিস্তান আমলে একবার চট্টগ্রামে অল-পাকিস্তান ট্র্যাক এন্ড ফিল্ডের প্রতিযোগিতা হয়েছিল তিনদিনব্যাপী। সেখানে দশ হাজার মিটার দৌড়ে হাশেম সাহেব স্বর্ণ জিতেছিলেন। বাংলাদেশ হবার পর তিনি কোচিংএর দায়িত্ব পান চট্টগ্রাম জেলা পরিষদ থেকে। যে সময়ে তাঁদের কক্সবাজার যাওয়া হচ্ছিল, তিনি ঐ পদে ছিলেন, আর একদিন সমুদ্র পাড়ে যখন পুরো দলটির অনেকেই হাঁটছিলেন, দৌড়োচ্ছিলেন, পানিতে ঝাঁপাচ্ছিলেন, কিংবা ছবি তুলছিলেন, তখন মুনার বাবা-মা’র সঙ্গে হাঁটছিলেন হাশেম সাহেব আর তাঁর স্ত্রী। লম্বা পাতলা ছিলেন হাশেম সাহেব। বয়স তখন তাঁর চল্লিশ পার হলেও লিকলিকে একটা এ্যাথলেটিক ফিগার ধরে রেখেছিলেন। তিনি সবুজ রঙের ট্র্যাক স্যুট আর স্যান্ডেল পায়ে হাঁটছিলেন। কাঁধে ঝোলানো একটা পলি ব্যাগের ভিতরে সুইমিং ট্রাঙ্ক ও তোয়ালে। মুনা আর লামিয়া ফুট দশেক দূরে সামনে সামনে হাঁটছিলেন। তাঁদের তখন প্রজাপতি বয়স। হাঁটছিলেন না, পায়ে পায়ে নাচছিলেন যেন। ফ্রক পরা দু’টো ফুটফুটে মানব শিশু। দূরের পূর্বের পাহাড়শ্রেণির ওপর দিয়ে সূর্য তখন উঠেছে। পশ্চিমের সমুদ্রের জলে তখনো শেষ রাতের অমানিশা কেটে যায়নি। সূর্যের আলো যখন ফুটল, সমুদ্রের জলে তার আলোকিত রেখা যেন দু’টো প্রাণোচ্ছল বালিকার নির্ভার হাসির মতো ফুটে উঠল।

‘রোখ কে’। হাশেম সাহেব জামাতুলের হাত ধরলেন। ‘বাবু ভাই, এ আমি কী দেখছি!’

‘কী!’ জামাতুল দাঁড়ালেন, সঙ্গে তাঁর স্ত্রী খোশনা হোসেনও দাঁড়ালেন। ‘কী ব্যাপার?’

‘আমি যে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি। আপনার এ মেয়েটি তো বাংলাদেশের জন্য গোল্ড নিয়ে আসবে সার্ক প্রতিযোগিতায়। দেখেছেন কী সুন্দর লম্বা লম্বা এক জোড়া পা। আমাকে দিয়ে দেন আপনার মেয়েটাকে, দেখেন আমি কীভাবে গড়েপিটে তুলি।’

খোশনা গম্ভীর টাইপের মহিলা। হঠাৎ উচ্ছল হেসে উঠে বললেন, হাশেম ভাই আপনি নেবেন কীভাবে, আপনার তো ছেলে নেই।

জামাতুল বিরক্ত হয়ে বললেন, ঐ কথা বলছেন না উনি, ওনার একাডেমির কথা বলছেন। স্প্রিন্টার একাডেমি না কী যেন!

-হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন, স্প্রিন্টার একাডেমি। তবে নাম বদলে দেব। স্প্রিন্টার শব্দটা কেউ বোঝে না। দেব, ম্যারাথন একাডেমি। সবাই বুঝবে।

ঐ সময়ে মুনার বাবার সংসারটা সবচেয়ে বেশি ঝক্কির মধ্যে যাচ্ছিল। এক মাসে এক লাখ দু’লাখ টাকা ঘরে আসছে তো, পরের ছ’মাস প্রায় নিপর্দক অবস্থায় পড়ে যাচ্ছিল সংসার। মুনা হাশেম সাহেবের হাটহাজারীস্থ একাডেমিতে দু’মাস ছিলও। কিন্তু তাঁর বাবা তখন ট্র্যাভেল এজেন্সির ব্যবসাতে মার খেয়ে চলচ্চিত্রের ব্যবসাতে ঢোকার চেষ্টা করছেন। ঢাকায় চলে আসতে মনস্থ করেন সপরিবারে। ফকিরার পুলে ফরিদপুর হাউজে একটি অফিস নেন। ব্যানার নাম নেন, নিজের দু’মেয়ের নামে। মুনা-লামিয়া ফিল্মস।

মাত্র সাত বছর বয়সে মুনা একটা নির্জন জায়গায় দু’মাস ছিলেন বাবা-মা’কে ছেড়ে শুধু দৌড়ের প্র্যাকটিস করতে, সেখানে আরো ছিল বিভিন্ন বয়সের কুড়িটি মেয়ে। হাশেম সাহেবের জমিদারির একটা মাঠ খালি করা ছিল মেয়েদের দৌড়ের প্র্যাকটিস করানোর জন্য। সারা দেশে যেমন, গ্রামেও তাঁর বিপুল সম্মান ছিল। অল-পাকিস্তান সময়কার একমাত্র বাঙ্গালী স্বর্ণপদক বিজয়ী। মেয়েদের থাকা-খাওয়ার জন্য তিনি একটি আধা-পাকা লম্বা টিনের শেড করলেন মাঠের পূর্ব পার্শ্বে। আর একটা ছোট উঁচু চালার ঘর করলেন মেয়েরা যাতে ব্যায়াম করতে পারে। ইলেকট্রিক সংযোগ আনলেন। মেয়েদের দেখাশোনার জন্য গ্রামের দু’জন বয়স্কা মহিলাকে নিয়োগ দিলেন।

মুনা দৌড়াতেন সকাল বিকাল, তাঁদের এক দৌড় শিক্ষকের পেছন পেছন। রবি স্যার। বাংলা ভাষার সঙ্গে চট্টগ্রামের ভাষা মিক্স করে কথা বলতেন। ‘এই আস্তে আস্তে দুরাবা। বেশি দুরাইলে টায়ার্ড হয়ে যাবে। ম্যারাথন দিতে হয় আস্তে আস্তে। লম্বা দৌড়ে বল রাকতে হয় বুকে। ঐকানে দমের জায়গা।’

মুনার দৌড়াতে ভালো লাগতো। তার চেয়েও তার ভালো লাগতো রাত্রে বিছানায় শোবার আগে তাঁর সঙ্গীদের রবি স্যারের কথা অবিকল নকল করে শোনাতে। হাত পায়ের পেশীর সঞ্চালন ঠিক রাখার জন্য হাউজ থেকে একটা তেলের মালিশ সবাইকে বাধ্যগত গায়ে মাখতে হত। যে মহিলা এই তেলের শিশি আর বাটি সবাইকে একে একে বিলি করতেন, সেও ছিল মুনার নকল করার আরেক সাবজেক্ট। মুনা লক্ষ করতেন, মহিলা যেন কথা বলতেন তাঁর মুখ দিয়ে নয়, সারা শরীর দিয়ে। শরীরের এত নাচানি দেখে বালিকাগুলো মুগ্ধ হয়ে যেত। আর মহিলা সে সুযোগটি নিতেন। দু’একজন বালিকাকে পছন্দ করে তাদের আদুল গায়ে তেল মাখাতে যেন ছিল তাঁর পরম প্রাপ্তি। ‘ওমা, ছেমড়ি, তোর গা থেকে তো গোলাপের সুগন্ধী বের হচ্ছে। দেতো একটু শুঁকি।’ তারপর মহিলা মেয়েটির পিঠে নাক ডুবিয়ে পরক্ষণে- পানির তলা থেকে ডুব দিয়ে ওঠার পর শ্বাস ছাড়ার মতো করে- অস্ফুট উচ্চারণ করতেন, আহ্। মুনার মহিলার ঐ দেহঘনিষ্ঠ কাজটি বিরক্ত লাগলেও, তিনি যে গভীর তৃপ্তির সঙ্গে ‘আহ্্’ শব্দটি উচ্চারণ করতেন, সেটিই তাঁর নকল করতে ইচ্ছে করত। যেন শব্দটা গলার ভিতর দিয়ে মুখে আসত না, সমস্ত শরীর নিংড়ে পেটের বিভিন্ন কন্দর এবং স্তর পেরিয়ে গলার স্বরতন্ত্রগুলোকে ভেঙেচুড়ে দিয়ে আলজিবের ছুঁচকে জড়িয়ে নিয়ে বায়ুতাড়িত হয়ে বের হয়ে আসত- ‘আহ’। ভাত খেয়ে একটা ছোট্ট ঢেঁকুর মুনা ইচ্ছা করে তৈরি করতেন। আর সঙ্গীদের শুনিয়ে শব্দ করতেন, ‘আহ্্’। সঙ্গীরা তার এই নকলটা ধরতে পারত না, কারণ তারা ঐ মহিলাকে দেহ মালিশের কাজের বুয়া ছাড়া অন্য চোখে দেখত না। আর মহিলার খলখলে খোলা হাসিটাও মুনা অবিকল অনুসরণ করতে শুরু করে। হয়ত হাসির একটা বিষয় হলো, সবাই হাসল, কিন্তু মুনা এমনভাবে লাগামছাড়া হাসতেন যে সঙ্গীরা অবাক হয়ে যেত ‘বিষয়টা কী, ও এত হাসে কেন?’ বিশালভাবে শরীরকে ছেড়ে দিয়ে হাসির ভঙ্গিটা মুনা এত সুন্দর রপ্ত করলেন যে সেটি তার ছোট বালিকাময়ী সৌন্দর্যের সঙ্গে বেমানান হলেও, ঐ অসঙ্গতিই যেন মুনাকে আরো আকর্ষণীয় করে তুলত।

ঐ একাডেমি ছেড়ে ঢাকায় আসার পর মুনাকে ভর্তি করে দেওয়া হয় একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে। দুর্দান্ত এক স্কুল ছিল সেটি। লামিয়াও একই স্কুলে ভর্তি হয়। সারক্ষণ কেবল ইংলিশ আর ইংলিশ টক। সেখানে এক শিক্ষিকাকে মুনার বালিকা চোখে ভালো লেগে যায়। কী সুন্দর চেহারা! তীব্র টানা চোখ। নাকটা খাড়া। নাকের সঙ্গে সুসঙ্গতি রেখে এক জোড়া কোমল ঠোঁট। আরো সুসঙ্গতি মেনে চাঁদের তলপেটের মতো একখানি চিবুক। চমৎকার সারি বাঁধা এক জোড়া সাদা দাঁতের পাটি। ম্যাডাম যখন কথা বলতেন, মুনা শুধু তিনি কী বলতেন সেটা গিলতেন তা শুধু নয়, কী ভাবে বলতেন সেটিও তিনি মৌমাছি যেভাবে চাকে লেগে থাকে সেভাবে যেন শুঁষে নিতেন। যেন ম্যাডামের ঠোঁটের নড়াচাড়ার ভঙ্গী, ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে পুরো ক্লাসের ওপর নজরদারির করার ব্যাপার, বোর্ডের কাছে গেলে তাঁর মার্কার ধরা হাতের খানিকটা উত্তোলন, হঠাৎ মেঘ-ঢাকা আকাশ ফুড়ে সূর্যের কিরণ দেবার মতো নিষ্কলুষ প্রাণভরানো হাসি, এগুলি যেন দেখার ব্যাপার ছিল না, ছিল শোঁষার। মুনা এই ম্যাডামটার ক্লাস শুঁষতেন।

ম্যাডামও বুঝতেন তাঁর এই ছাত্রীটির তাঁকে পছন্দ করার কথা। বর্ষাকাল শুরু হলো তো একদিন খুব বৃষ্টি পড়ছিল। আমের ভরভরন্তী ফসল হলো। স্কুলের প্রিন্সিপাল তাজিয়া ম্যাডাম ঘোষণা দিলেন ‘ম্যাংগো ডে’ হবে। স্কুলের থার্স ডে মানে হলো, হাফ ওয়ার্ক, হাফ জয়। জয়ের অংশে পড়ল ম্যাংগো পার্টি। ম্যাডামদেরসহ নিয়ে স্কুলের ছাত্রীরা আম খেতে খেতে অস্থির অডিটোরিয়াম হলে। হঠাৎ জেনিফার নামক মেয়েটা মুনার পছন্দ করা ম্যাডামের কাছে যেয়ে বলল, মিস, মুনা হিয়ার ইমিটেইটস ইউ লাইক নোবডি ডাজ।

তিস্তা আখন্দ হচ্ছে মুনার পছন্দ করা ম্যাডামটা। মুনা পাশেই ছিল। তাঁর দিকে সম্রাজ্ঞীর মতো ঘাড় ফিরিয়ে তিস্তা ম্যাডাম মধুরতম কণ্ঠে বললেন, ডু ইউ?

মুনা ততোদিনে তাঁর হাটহাজারীর ম্যারাথন একাডেমির চেয়ে ছয় বছর বেড়ে তেরোতে পড়েছে। ক্লাস এইটে। লম্বায় তির তির করে বেড়ে উঠে প্রায় তিস্তা ম্যাডামকে ছুঁয়েছেন। দৌড়ের অভ্যাস তাঁর দেহকে কৈশোরিক জ্বলজ্বলা স্বাস্থ্যে ভরে তুলেছে। শরীরের বিশেষ বিশেষ অংশে যৌবনের ইঙ্গিত রাতের আঁধার কেটে আদি প্রভাতের মতো ফুটতে শুরু করেছে। সেদিন তাঁর স্কুলের সাদা ইউনিফর্মের জামা, কিন্তু খানিকটা লো-কাট, সেটা পরা ছিল। তাঁর ফর্সা পিঠ, বুকের কাছে জামার তলায় খানিকটা উদ্ভাস। তাঁর লম্বা দীঘল শরীর জামার তলায় যেমন লুকানো ছিল, তেমনি যে লম্বা পা-জোড়া দেখে হাশেম সাহেব তাঁকে সার্ক চ্যাম্পিয়ন বানাবেন ভেবেছিলেন, সে পা দু’খানিও ছিল সাদা রঙের সালোয়ারের ভিতরে। পায়ে ছিল তাঁর স্কুলের রীতি অনুযায়ী সাদা স্নিকার। বস্তুত এ কথা স্কুলে প্রায় সবাই স্বীকার করতে শুরু করেছিল যে মুনা তাহির খানিকটা বদমেজাজী হলেও মেধায় ও সৌন্দর্যে সে অপ্রতিদ্ব›দ্বী।

প্রিন্সিপাল মাডামও ছিলেন আমের ভিড়ে। তিনি আদেশের সুরে বললেন, গৌ, মুনা গৌ, গৌ টু দ্য স্টেইজ এন্ড পারফর্ম।

৩.

হ্যাঁ, তিস্তা ম্যাডাম না তাঁদের পড়াচ্ছেন শেক্সপিয়ারের দ্য মার্চেন্ট অব ভেনিস! “ইন বেলমন্ট ইজ আ লেডি রিচলি লেফ্ট!” বেলমন্ট দ্বীপে একজন ধনাঢ্য কুমারী অপেক্ষা করছে। কার জন্য, কে সে, আসবে কবে? তিস্তা ম্যাডাম বিবাহিতা। তাঁর জন্য কেউ আসবে তেমন না। মুনা পরিষ্কারভাবে জানেন না তিস্তা ম্যাডামের সংসার জীবন কেমন! মেয়েদের মধ্যে বলাবলী আছে, ম্যাডামের স্বামী ঘোরতর কনজারভেটিভ। তিস্তা ম্যাডাম হিজাব কেন পরেন না, এ নিয়ে তাঁর প্রকাশ্য উষ্মা আছে। এ কথা শুনে মুনা আর তাঁর বন্ধুদের মধ্যে একচোট বাদানুবাদ হয়ে গেছে। কেউ কেউ ম্যাডামের হিজাব পরার পক্ষে, কেউ কেউ বিপক্ষে। মুনা বলেছিলেন, হিজাব, ছি!, তিস্তা ম্যাডাম হিজাব পরলে আমার বমি আসবে। অরুণা নামের একটি মেয়ে বলেছিল, হিজাব পরার পক্ষে বা বিপক্ষে আমি না, কিন্তু হিজাব পরবেন যিনি তিনি ঠিক করবেন সেটা, স্বামী বললে পরতে হবে বা হবে না তা নয়। আমি যে কোনো অবস্থাতেই মেয়েদের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপের পক্ষে নয়। কমলা নামের একটা মেয়ে সাংঘাতিক বড়সর শরীরের। সবাই তাকে ডাকে গামলা। তার পেছনে অবশ্য। সে শুনলে পিটুনি একটা দেবেই। সে অরুণাকে ধমকে দিয়ে বলল, তুই আবার এসবে কথা বলিস কেন, এগুলি ওদের ব্যাপার।

স্টেজে উঠতে উঠতে মুনার তিস্তা ম্যাডামের বক্তৃতার একটা অংশ মনে পড়ছিল। ‘শেক্সপিয়ার চরিত্রের মধ্যে একটা কনফ্লিক্ট ঢুকাবেনই। সেই কনফ্লিক্টের নাটকীয় বয়ানই হচ্ছে চরিত্রের প্রাণ। তা হলে তিস্তা ম্যাডামের দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে যে কানাঘুষো আছে সেটাই তো তাঁর চরিত্রের প্রাণ। তইঞ্চাঙ্গা নামে তাঁদের স্কুলে একজন উপজাতি পিয়ন ছিল। সে একটা মার্কার আর একটা বই নিয়ে এল। মুনা সে দু’টো হাতে করে আস্তে আস্তে স্টেইজে উঠলেন। স্টেইজ বলতে বাঁধোনো ইটের খোলা মঞ্চ। মেঝে থেকে আড়াই ফুট উচ্চতায়। অর্ধ চন্দ্রাকৃতির। স্কুলের সকল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান যেমন এই হলে হয়, তেমনি কোনো শিক্ষক বা শিক্ষিকা প্রয়োজন মনে করলে এটাকে ক্লাসরুম হিসেবেও ব্যবহার করতে পারে। সে জন্য স্টেজের পেছনের দেয়ালের ওপর একটি স্থায়ী সিমেন্ট বাঁধানো বোর্ড আছে, যেটাতে মার্কারি দিয়ে লেখা যায়।

মুনা সিঁড়ির ধাপ বেয়ে স্টেজে উঠলেন। উঠতে উঠতে তাঁর মনে হলো তিস্তা ম্যাডামকে নকল করতে যেয়ে বাইরে থেকে শুধু তাঁর অঙ্গভঙ্গির নকল করলে হবে না, তাঁর কথা বলার ভঙ্গি, তাঁর গলার রিনরিনে আওয়াজ নকল করলে হবে না, হিজাব পরা নিয়ে তাঁর স্বামীর সঙ্গে তাঁর যে দ্ব›দ্ব হচ্ছে বলে স্কুলে প্রচার আছে, সে দ্ব›দ্বটাও চরিত্রে ফুটিয়ে তুলতে হবে।

মুনা শুরু করলেন, বোর্ডের একেবারে কাছে দাঁড়িয়ে, যেভাবে তিস্তা ম্যাডাম দাঁড়ান। বক্ষের সামনের দিকটা একটু স্ফীত রাখলেন, কিন্তু এটা ঠিক তিস্তা ম্যাডামের মতো হলো না, বরঞ্চ দ্য মার্চেন্ট অব ভেনিস নামক যে ছবিটি তিস্তা ম্যাডাম তাঁদের দেখিয়েছিলেন, সেখানে পোরশিয়ার চরিত্রের অভিনয়কারী নায়িকা যেমন বক্ষের উচ্ছল সৌন্দর্য সামান্য বুক উঁচিয়ে প্রদর্শন করেছিলেন, মুনাও ঠিক সেভাবে দাঁড়ালেন। ‘লুক, স্টুডেন্টস,’ তিস্তা ম্যাডামকে নকল করে তিনি বলতে লাগলেন, দ্য মার্চেন্ট অব ভেনিস ইজ আ গ্রেইট ট্র্যাজি-কমেডি। একদিকে আছে ভালোবাসার আনন্দ, আরেকদিকে আছে প্রাণ হারানোর ভয়। লাভ এন্ড ডেথ। লাভ, ডেথ। শব্দ দু’টা উচ্চারণের সময় তিনি তিস্তা ম্যাডাম যে ভাবে ‘লাভ’ উচ্চারণ করার সময় গলা উঁচিয়ে এবং ‘ডেথ’ উচ্চারণ করার সময় গলা নামিয়ে বলেন, মুনাও হুবহু তাই করলেন, কিন্তু বাক্যটি বলার সময় হলিউডের সেই অভিনেত্রীর গলার মধ্যে যেমন একটা ট্রিলিং ব্যাপারটা খেলে, সেরকমই গলা কাঁপিয়ে তিনি বললেন, ‘লাভ’ এন্ড ‘ডেথ’, মানবজীবনের দু’টো মৌলিক সত্য। টু ইউনিভার্সাল ট্রুথস- এ বাক্যাংশটি বলার সময় তিনি একেবারে তিস্তা ম্যাডাম বনে গেলেন, শুধু কণ্ঠের আওয়াজে নয়, অঙ্গভঙ্গিতেও। তিস্তা ম্যাডামের মতো হাত খুব আলতো ওপরে তুলে তাঁর হাতের লেখার মতো নকল করে সাদা চকচকে বোর্ডে লিখতে গেলেন ‘লাভ’ এন্ড ‘ডেথ’। কিন্তু মার্কারি দিয়ে তো তাঁর লেখার অভ্যাস নেই। তাঁর অভিনয়টাই মার খেয়ে গেল তখনই যখন মার্কারি দিয়ে লেখাটা তাঁর খুব ছোট হয়ে গেল। তাই হল ভর্তি যে সব মেয়েরা এতক্ষণ আম চোষার সঙ্গে সঙ্গে তিস্তা ম্যাডামকে নকল করার প্রতিটি মুহূর্ত বিপুলভাবে উপভোগ করছিল, আম মাখা হাতেই তালি দিচ্ছিলো, তারা তাঁর হাতের লেখা দেখে ক্যাটকল দেয়া শুরু করল।

-‘শাট আপ’। প্রিন্সিপাল ম্যাডামের গলা। আর কমলার আর্ত চিৎকার শোনা গেল। ‘ও মাই গড। আই এ্যাম হার্ট। আই এ্যাম ডেড।’

-কী হয়েছে, কী হয়েছে।

স্টেজে থেকে তখনো মুনা নেমে যাননি। কিন্তু এর মধ্যে তাঁর হাত থেকে ছোড়া মার্কারি কলমটা তীব্র একটা বুলেটের মতো হিট করেছে কমলার কপালে। এত বড় ঢাউস মেয়েটার চামড়া যেন টিস্যু পেপার দিয়ে তৈরি। সাথে সাথে কপালের বাঁ পাশে চিড়চিড়িয়ে রক্ত বের হয়ে এল।

-ওয়াট হ্যাপেন্ড? হোয়াই ডিড ইয়ু ডু ইট?

তিস্তা ম্যাডামের বিস্ময়মাখা প্রশ্নের উত্তরে মুনা ঋজু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আস্তে আস্তে বললেন। আমি ওকে মারিনি, ওর গায়ে লেগে গেছে। হোয়াই ডিড দে জিয়ার এ্যাট মি?

‘ম্যাঙ্গো ডে’-টা এভাবে শেষ হবে কেউ কল্পনা করেনি। তারপরের দিন প্রিন্সিপাল ডিসিপ্লিনারি কমিটির মিটিংএ মুনাকে ডেকে পাঠালেন।

-তুমি, এভাবে রেগে গেলে কেন?

-আমি অপমান সহ্য করতে পারি না, ম্যাডাম। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ম্যাডামের অর্থাৎ প্রিন্সিপালের চোখে চোখ রেখে বললেন মুনা তাহির। দে শুডনট হ্যাভ জিয়ারড এ্যাট মি।

-দে ডিডন্ট জিয়ার এ্যাট ইউ। বাট ইউ থট দে ডিড।

—আমি তখন যেটা মনে করেছি, ঐ সময়ের জন্য আমি সেটা ঠিকই মনে করেছি।

-ওঞ্চ য়ু থিংক এবাউট দ্য কনসিকুইনসেস ফর ইয়োর এ্যাকশান?

এসিসট্যান্ট হেড টিচার মেহের বাণু বললেন, ওর অত চিন্তা করার তো বয়স হয়নি। সি ইজ টু ইয়াং টু থিংক এবাউট কনসিকুয়েনসেস।

-তাই বলে কলম ছুড়ে মারবে! শিক্ষিকাদের একজন বললেন। আসমা বেগ। তারপর বললেন, মেয়েদেরকে কখনো টিচারদের নকল করতে দেয়া উচিত নয়। এটা বেয়াদপির পর্যায়ে পড়ে।

তিস্তা আকন্দ নড়েচড়ে বসলেন। আসমা বেগমকে তিনি শত্রু মনে করেন, যেরকম আসমা বেগমও তাঁকে শত্রু মনে করেন। প্রথমে মনে মনে বললেন, ‘হুঁ, মুরব্বি ফলাতে এসেছেন। তাঁকে কেউ নকল করছে দেখলে চুপ করে থাকতেন। নিজেরটা করেনি বলে এখন হিংসে হচ্ছে। আর করবেই বা কেন তোকে। না তুই দেখতে ভালো, না পড়াতে পারিস। স্থানীয় এমপি’র দূর-সম্পর্কের ভাগ্নী সে জোরে ইংলিশ স্কুলে পড়াতে এসেছিস। ইংরেজির ই-ও জানিস না, ‘ইউ নো’, ইউ নো’ বলতে বলতে ক্লাস শেষ।’

কিন্তু মুখে এ চিন্তার কিছুই টের পেতে দিলেন না। বললেন, পরিবেশটা এমন অবস্থায় ছিল যে ওখানে আমি ‘না’ করাটা হত অস্বাভাবিক। মেয়েরা আনন্দ করছিল, আমরা আনন্দ করছিলাম, হঠাৎ কে যেন বলল যে মুনা আমাকে বেশ ভালোই নকল করতে পারে। আই মাস্ট বি ওপেন টু দিস মিটিং। আমি বলে না। ঐ সময় যে টিচারের অভিনয় কোন মেয়ে করতে চাইত সে টিচার কি বাধা দিতেন।

শয়তানি হাসি হেসে আসমা বেগম বললেন, তা অবশ্য আমিও দিতাম না। তো আমাদের তো সে রূপও নেই, সে জ্ঞানও নেই, আমাদেরকে মেয়েরা নকল করবে কেন?

প্রিন্সিপাল মুনাকে ইশারায় যেতে বললেন। তারপর সবাইকে লক্ষ করে বললেন, ঘটনায় যেহেতু রক্তপাত হয়েছে, এবং কমলার বাবাও টেলিফোন করে জানতে চেয়েছেন আমরা কি এ্যাকশন নিচ্ছি, সে জন্য আমি বলছি কি মুনার বাবা-মা’কে ডেকে এ ব্যাপারটা জানানো দরকার। যে মেয়ে সামান্য একটুতে কলম ছুড়ে মারতে পারে, সে মেয়ে তো কালক্রমে বেশ ভয়ানক হয়ে উঠতে পারে।

দিতি রায় অংকের টিচার। ক্ষীণাঙ্গী আর কাগজের মতো সাদা গায়ের রঙ। চেহারা ভেঙেচুড়ে পুরোটাই যাবজ্জীবন মাস্টারনির ভাব। গলাটাও খসখসে। তবে, ম্যাডাম কী জানেন, মাইয়াটা এ্যাক্টিং ভালোই দেখাইছে। সুন্দর তো। নায়িকা-টায়িকা হইব মনে হয় একদিন।

-হুঁ, আসমা বেগম বললেন। দিদি, আপনি আর কথা পান না, না? আপনি কমলার নাচ দেখেছিলেন, বিদ্রোহী কবিতা আবৃত্তির সময়?

-ওরিয়েন্টেশন ডে তে?

-হ্যাঁ। ঐটা ব্রিলিয়ান্ট ছিল। দিতি রায় বললেন। তারপর বললেন, হ্যাঁ, আসলে আমাদের স্কুলের সব মেয়েরাই ভালো। এভরি স্টুডেন্ট ইজ গুড।

দিতি রায় যেন প্রিন্সিপালকেই প্রশংসা করলেন। প্রিন্সিপাল তাজিয়ার সারামুখে একটা চোরা পরিতৃপ্তির ভাব ছড়িয়ে পড়ল। তিনি বললেন, দ্যাটস হোয়াই উই হ্যাভ টু বি এক্সট্রা-সেনসিটিভ এবাউট ডিসিপ্লিন।

চিঠিটা নিয়ে মুনা তাঁর বাবার হাতে দিলেন। সেদিনই জামাতুল তাহির একজন টাকার কুমিরের সঙ্গে একটা ছবি বানানোর জন্য ডিল সই করেছেন। ত্রিশ লাখ টাকার ছবি নামাবেন। ছবির নাম, “একালের বংশীবাদক।” ফুরফুরে মেজাজে তিনি নিজেই গাড়ি চালিয়ে দুপুরে বাসায় ফিরেছেন। মনে মনে চিন্তা করছেন, কা’কে নায়ক, কা’কে নায়িকা বানাবেন। এক্সট্রা চরিত্রগুলোও ঠিক করলেন। তাঁর এসিসট্যান্ট দবির মিঞাকে আসতে বললেন।

কিন্তু ঘরে ঢুকেই দেখলেন, তাঁর বড় মেয়ে মুনা হাতে একটা কাগজ ধরে সোফায় বসে কাঁদছে।

-কী হয়েছে রে মা, তুই কাঁদছিস কেন? তোর মা কোথায়?

মুনা বাবার স্নেহ-কাতর গলার আওয়াজে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়ল। জামাতুল মেয়েকে বুকে টেনে নিলেন। তাঁরও গলা আর্দ্র হয়ে উঠল। বললেন, বল না বেটি কী হয়েছে। কাঁদছিস কেন?

এ সময় দবির মিঞাও বাসায় এলেন। পরিস্থিতি বুঝতে না পেরে তিনি ‘ভাবী, ও ভাবী’ বলে ভিতরের ঘরের দিকে গেলেন।

মুনা ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, দে হ্যাভ ডেস্ট্রয়েড মি ফাদার। তারা আমাকে অপমান করেছে। আর তোমাদেরকে বললেন দেখা করতে। আমি আর যাব না বাবা, ঐ স্কুলে। দ্যাটস ফাইন্যাল।

দবির মিঞা ভিতরের ঘর থেকে বের হয়ে মুনার কথাটা শুনতে পেলেন কেবল। বললেন, বাবু ভাই, নো প্রবেøম। আংকেলের জন্য স্কুলের অভাব হবে না। আমাদের ক্লায়েন্ট সগির ভাইতো তাঁর স্ত্রীকে দিয়ে একটা নতুন স্কুল দিয়েছে। একটু এক্সপেনসিভ। কিন্তু চলছে বেশ ভালো। আপনি চান তো, কালকেই ওদের দু’বোনকে ঐ স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়া যাবে। টিসি পরে হবে।

ঢাকায় আসার পর এই দবির মিঞা বাবুর বড় মুশকিল আসান।

মুনা খুশি। তিনি মনে করলেন যাক এই ভাবে স্কুলটাকে একটা শিক্ষা দেওয়া গেল। তাঁর ছোট বোন লামিয়াও খুশি। কারণ নতুন স্কুলটা সে খবর নিয়ে জেনেছে কো-এডুকেশনাল। ছেলে আর মেয়ে এক সাথে পড়ে। তাঁরা দু’বোন সাথে সাথে নিজেদের কামরায় একটা টুইস্ট নেচে নিলেন। চা-চা-চা, চা-চা-চা।

বাপের খুশি নতুন ডিলে, মেয়ে দু’টোর খুশি স্কুল বদলানোর আমেজে, বাসায় ভরভর করে আনন্দ শেষ দুপুরকে ভরে তুলল। খোশনা হোসেন চিকন চালের পোলাও করলেন। একটা মুরগির রোস্ট। খানিকটা আচার, আর সজনে আর ডাল দিয়ে একটা সব্জী। চমৎকার একটা খাওয়া দাওয়ার মধ্যে মুনার মনে পড়ল, তিনি তো আসল কাজটাই করতে ভুলে গেছিল। তিস্তা ম্যাডামের যে দ্ব›দ্বময় জীবন সেটাই না তিনি তাঁকে নকল করার সময় ফোটাতে চেয়েছিলেন। সেটাই তো তিনি ভুলে গেলেন। উফ্্, রাগটা কেন যে এমন হঠাৎ করে এল।

বাসায় একটা আকাই সেট ছিল। টিভির সঙ্গে সংযোগ করে দু’বোন আবার একটা সিনেমা দেখতে লাগলেন। ভিডিও ক্যাসেটটার ওপরে লেখা আছে, দ্য বেস্ট এ্যাক্টিং অব অড্রে হেপবার্ন।

৪.

ইশতিয়াক হোসেন বেঁটে-খাটো মানুষ। শুকনো হাড়গিলা শরীর। গলার স্বরে অস্বাভাবিক কাঠিন্য। গাল ভাঙা। মাথায় চুল কমে এসেছে। এত যে নামসর্বস্ব পরিচালক তাঁকে প্রথম দেখায় সেরকম কিছুই মনে হয় না। কিন্তু সেটে তিনি সম্রাট। মঞ্চে অভিনয়ের সময়ও মুনার এক ধরনের শৃঙ্খলার সঙ্গে পরিচয় ছিল। কিন্তু বড় পর্দার সম্পূর্ণ ব্যাপারটিই যেন আলাদা। পরিচালক যদি সম্রাট হোন, নায়িকা এবং নায়ক কখনো সম্র্রাটের ওপরে কখনো নিচে। ইশতিয়াক প্রথম সারির একজন প্রবীণ পরিচালক তাই তাঁর শুটিংএ সবাই তাঁর অধীন সেরকম একটা পরিবেশ বজায় আছে। মুনা বসেছিলেন আশুলিয়ার একটু ভিতরে একটা শুটিং স্পটে। তিনতলা একটা বিরাট বাড়ি। বাড়ির চারপাশে সুদৃশ্য একটি কৃত্রিম লেইক। ধবল রাজহাঁস সাঁতার কাটছে। লেইকের লাগোয়া বাড়ির পূর্ব পার্শ্বে মোটামুটি আকারের একটা সুইমিং পুল। সুইমিং পুলের পাশে বার-বি-কিউ করার ব্যবস্থা। সিমেন্টের স্থায়ী ছাতা। তাঁর নিচে অস্থায়ী একটা বার। মদের ব্যবস্থা নেই। তবে বাইরে থেকে এনে খাওয়ার ব্যবস্থা আছে। মূল ফটক দিয়ে বাড়িতে ঢুকতে বেশ খানিকটা পথ লাল খোওয়াই দিয়ে বিছানো। রাস্তার দু’পাশে কেয়ারি করা নানা জাতের ফুলের চারা। সীমানা প্রাচীর ঘিরে আকাশমণি আর দেবদারু গাছের সারি। প্রচণ্ড গরমের দিন ছিল তাঁদের শুটিং-এর প্রথমদিনে। ইশতিয়াক নিজের পাজেরো জিপে এলেও মুনা এবং অন্যান্য আর্টিস্টদের আনতে একটা সিভিলিয়ান মাইক্রো গেছিল। আর পরের দু’টো মাইক্রোতে টেকনিক্যাল টিম।

ভোর ছটার মধ্যে তাঁরা পৌঁছে গেলেন শুটিং স্পটে। আটটার মধ্যে নাস্তা দেওয়া হলো বাইরে পাতানো টেবিলে। এ সময় ইশতিয়াক নিজেই একটা হ্যান্ড মাইকে নির্দেশ দিতে লাগলেন, কী কী দৃশ্য হবে তার ধারণা দিলেন। কখন শুটিং ওয়াইন্ড আপ হবে সেটা বললেন। সেট রেডি হলে ক্যামেরা রোল করবে কখন, এবং তার আগে যে যার যার স্ক্রিপ্ট নিয়ে পেপার বয়ের কাছ থেকে সেটা সংগ্রহ করবেন সেটাও বললেন। মুনা আগে দু’টো সিনেমায় সাইড রোলে ছিল। পরিচালকদের নিয়ে তাঁর আগের অভিজ্ঞতার সঙ্গে এ পরিচালকের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা যে সম্পূর্ণ আলাদা হতে যাচ্ছে সেটা তিনি শুরুতেই বুঝতে পারলেন। শুধু চুক্তি হবার দিন জানতে চেয়েছিলেন, ছবিটার নাম “অভিশপ্ত নারী” খুব সনাতন শোনায়। ইশতিয়াক প্রায় গর্জে উঠে জবাব দিয়েছিলেন, ‘পুরো বিশ্বেই মেয়েরা অভিশপ্ত, এবং আমাদের দেশে আরো বেশি। সেজন্য নারীরা আগে, যেমন আমার দাদীরা যেমন অভিশপ্ত ছিল, এখনো তাই।’

মুনার প্রথম দৃশ্যটা ছিল সায়েকের সঙ্গে। সায়েক আকাশচুম্বী নায়ক। তাঁর বিপক্ষে মুনা নিতান্তই আনকোড়া। ছবির গল্পে তাঁরা সদ্য বিবাহিত স্বামী-স্ত্রী। নেপালে হানিমুনে যাবার জন্য সব গোছগাছ চলছে। তখন রুমে রাখা একটা চামড়ার কালো ব্যাগে মুনা একটি এ-ফোর সাইজের এলবাম খুঁজে পাবে। সেখানে পাবে সায়েকের সঙ্গে বিয়ের আগে সম্পর্ক ছিল এমন একটি মেয়ের ছবি ও কিছু চিঠি। সেখান থেকে কলহের সূত্রপাত। ছবিতে দেখানো হবে, কীভাবে এ আবিষ্কারের পর মুনা শারীরিকভাবে ফ্রিজ হয়ে যাবে। আর সায়েক কামের নেশায় উন্মত্ত হয়ে সদ্য বিবাহিতা স্ত্রীকে প্রায় ধর্ষণের পর্যায়ে যেয়ে সেক্স করবে। সেখানে একটা দৃশ্যে আছে মুনাকে টেবিল থেকে একটা গøাস তুলে ছুড়ে মারতে হবে সায়েকের দিকে, এবং সেটা সায়েকের কপালে যেয়ে কাটবে।

কিন্তু শুটিংএর সময় মুনা যেটি আবিষ্কার করলেন আশ্চর্য হয়ে সেটি হলো একটা গøাস ছুড়ে মারা বাস্তব জীবনে যতটা সহজ, শুটিংএ সেটা আদৌ সম্ভবপর হচ্ছে না।

প্রথমে মহড়া দেবার সময় তাঁর হাতে দেয়া হয়েছিল ডিসপোজেবল কাগজের গøাস। ইশতিয়াকের ক্যামেরাম্যান সজিব দস্তগীর লোহার ট্র্যাকের ক্যামেরার ট্রলিটা বারবার ব্যাক এন্ড ফরোয়ার্ড করছিলেন, ঠিকমতো ক্যামেরা রোল করার জন্য। রুমটা রাখা হয়েছে রাতের রোম্যান্টিক পরিবেশকে ফুটিয়ে তুলতে ক্যামেরার জন্য ঠিক যতটুকু আলো লাগবে সে স্ট্যাটাসে। ক্যামেরার এসিসট্যান্ট গুনলেন সেভেন-সিক্স-ফাইভ-ফোর-থ্রি-টু-ওয়ান, রোল ক্যামেরা-এ্যাকশন। সাথে সাথে মুনা হাতের ধৃত কাগজর গøাসটি ছুড়ে মারলেন, আর সায়েক বিদ্যুৎবেগে মাথা একপাশে সরাবেন, তারপরও গøাসটি তাঁর কপালে লাগবে। কিন্তু মুনা ছুড়লেন গøাসটা, সে অনেক পরে, যাতে মনে হচ্ছিল সায়েক যেন গøাসটা কখন ছুটে আসবেন সে জন্য অপেক্ষা করছেন। সাথে সাথে ইশতিয়াকের কণ্ঠ শোনা গেল, কাট।

আবার তৈরি হলো ক্যামেরা। রোল ক্যামেরা-এ্যাকশন। এবারও গøাস ছুড়লেন মুনা, তাও আবার সায়েক স্ট্যান্ড নেবার আগেই। আবার কাট। দু’ঘণ্টা ধরে দশবার টেইক হবার পরও যখন গøাস ছোড়ার দৃশ্যটি স্বাভাবিকতা পেল না, ইশতিয়াক লাঞ্চ ডিক্লেয়ার করলেন। তারপরও তিনি সেট ছাড়লেন না। চিন্তা করলেন, দৃশ্যটি ম্যানাসক্রিপ্ট থেকে ডিলিট করে দেবেন কী না। মুনাকে দেখলেন, মুখ ভার করে একটা চেয়ারে বসে আছেন। সায়েক তাঁর পাশে বড় ভাই সুলভ সান্ত¡না দিয়ে তাঁকে লাঞ্চ খাওয়ানোর জন্য চেষ্টা করছেন। তিনি নিজে একটা প্লাস্টিকের চেয়ার হাতে করে নিয়ে সায়েক আর মুনার সঙ্গে যোগ দিলেন।

মুনার দিকে খানিকটা ঝুঁকে যেন গোপন একটা কথা বলছেন সেভাবে তাঁর মুখের কাছে মুখ নিয়ে গেলেন। তারপর যা বললেন তা জোরেই বললেন, পুরো সেটের লোকজন তো হাসলই, মুনাও সেই মুভিতে দেখা অভিনেত্রীর মতো সমস্ত গা দুলিয়ে হাসলেন।

ইশতিয়াক ঝানু পরিচালক। তাঁর বাড়ি ময়মনসিংহ অঞ্চলে। সেখানকার টান নিয়ে বললেন, আপনের বিবাহ হইছিল না একবার, বলছিলেন।

মুনা হাসি থামিয়ে বললেন, জ্যা, একবার হইছিলো তো।

-তো, স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া-ফ্যাসাদ করেন নাই।

-জ্বী, করছি বলেই তো স্বামী হারা।

-তয়, গøাস-টøাস ছুড়ে মারেন নাই। কখনো হেইতানের কপাল-টপাল ফাটান নাই।

-বহুবার ফাটাইছি, মাইর খাইছি, মাইর দিছি।

-তয়, গøাসটা ছুড়তে পারেন না ক্যা!

-হেয়ান তো স্বামী ব্যাটা ছিল একখান। কাম ছিল একটাই। বৌ পেটানো। হ্যারে গøাস ছুড়ে কপাল ফাটাইতে আমার তো মজাই লাগত। কিন্তু হিয়ান তো একখান ভদ্রলোক, তাঁরে মারি ক্যামনে!

এবার ইশতিয়াক আঞ্চলিকতা ছেড়ে, শুদ্ধ ভাষায় বললেন, ব্যারামটা আমি বুঝতে পারছি। ওষুধও জানা আছে। লও, আগে ভাত খাইয়া সারি।

খাবার পর তিনি তাঁর স্টিল ফটোগ্রাফারকে ডাকলেন। সায়েক আর মুনাকে সেটের মধ্যে সাজানো বিছানা আর ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড় করালেন। তাঁরা এমনভাবে দাঁড়ালেন যেন একদিকে ড্রেসিং টেবিলে তাঁরা নিজেদেরকে দেখতে পান অন্যদিকে যেন ফটোগ্রাফার তাঁর এ্যাঙ্গেল ঠিক রেখে স্ন্যাপ নিতে পারেন।

সায়েক আর মুনা পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়ালেন। দু’জনের মাঝখানে দূরত্ব এক বিঘৎ পরিমাণ। ইশতিয়াক বসেছিলেন সেটের দরজাটা আগলে। কী একটা ঈশারা করলেন। ক্যামেরাম্যান তাঁর ক্যামেরার নোজলটা প্রায় মুনা আর সায়েকের গায়ের ওপর ধরলেন।

ইশতিয়াক বললেন, ইউ টু ক্লোজ আপ।

সায়েক খানিকটা এগোলেও মুনা ক্যামেরার কাছ থেকে একটুও সরলেন না।

ইশতিয়াক উঠে এলেন। দাঁত কিড়মিড় করে বললেন, আমি যা বলছি তা করতে হবে। একটুও অবাধ্যতা বরদাস্ত করা হবে না। কাছে আসেন। এবার দু’জন ঘনিষ্ঠভাবে দাঁড়ান, কোনো ফাঁক রাখবেন না। এবং জড়িয়ে ধরেন পরস্পরকে।

মুনা বললেন, ক্যামেরা রোল করলে সমস্যা হত না। কিন্তু স্টিল ক্যামেরার সামনে সংকোচ লাগছে।

ইশতিয়াকের রাগ একটু কমেনি। বললেন, ইয়াং লেডি, ফিল্ম লাইনে সাইন করতে গেলে প্রথমে ভাংতে হবে সংকোচ। এই পেশায় সবকিছুই অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে করতে হবে, যদিও কোনো ব্যাপারই আসলে আন্তরিক নয়। আপনারা পরস্পর স্বামী-স্ত্রী নন, কিন্তু দর্শক আপনাদেরকে নিতে হবে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে। তারা জানবে যে আপনারা বাস্তব জীবনে স্বামী-স্ত্রী নন, এটাও তারা জানবে যে আপনি মুনা নামক একজন তারকা অভিনেত্রী, এবং সায়েক একজন তারকা অভিনেতা। আপনাদের ফিল্ম দেখার সময়েও তারা সেটা ভুলে যাবে না যে আপনারা পরস্পর স্বামী-স্ত্রী নন, কিন্তু তারপরও আপনার গøাস ছোড়ায় সায়েকের কপাল কাটলে তারা ভাববে যে একজন নিপীড়িত স্ত্রী রাগের মাথায় গøাস ছুড়ে মেরে তার স্বামীর কপাল ফাটিয়েছে। এই ব্যাপারটা সমাজে ঘটছে তারা জানে। তারই একটা রূপক প্রতিফলন ফোটানোই হচ্ছে আপনাদের কাজ। আন্তরিক, কিন্তু আন্তরিক নয়; বাস্তব, কিন্তু বাস্তব নয়। আপনারা আসলে বাস্তবতার একটা প্রতিচ্ছবি দর্শকের মনে তৈরি করে দিচ্ছেন। এই রূপকটা বাস্তবতার চেয়েও শক্তিশালী, কেননা এটা দর্শকের মগজে ঢুকে বাস্তবতার সঙ্গে লেনদেন করে একটা শক্তিশালী রূপ নিয়ে নেয়। এটাই হলো আর্ট। আর্টের সবচেয়ে চলিষ্ণু এবং কমপ্লিট মাধ্যম হচ্ছে চলচ্চিত্র। এ জায়গায় এসেছেন, এটা একটা মহান জায়গা। কাজেই নিজেকে ভাংতে হবে, সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা দিয়ে।

একসময় মুনা অনুভব করলেন সায়েককে জড়িয়ে ধরে তাঁর বুকে মাথা রেখে যখন ক্যামেরার চোখের সামনে তিনি ক্রমশ স্বস্তি লাভ করতে শুরু করেছেন, তখন তাঁর চোখে ভেসে আসছে তাঁর বাবার স্মৃতি, যিনি বছর দুয়েক হলো হাঁটুর ক্যান্সারে ভুগে মারা গেছেন। মুনার চোখ দিয়ে দরদর করে অশ্রæ বইতে লাগল, সায়েকের পাঞ্জাবি ভিজে উঠতে লাগল। কিন্তু সায়েক চমকালেন না, বা মুনাকে দূরেও ঠেলে দিলেন না। মুনা মনে মনে বোধ করতে লাগলেন, সায়েক যেন তাঁর সত্যিকারের স্বামী, এবং চোখ বুজে রইলেন ততক্ষণ যতক্ষণ পর্যন্ত না ইশতিয়াক বলে উঠলেন, ওকে,

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj