একজন বিশুদ্ধ রাজাকারের আত্মজবানী : হারুন হাবীব

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

আমার মতো একজনকে যে কোনো একদিন আত্মজবানী লিখিতে হইবে তাহা ধারণারও অতীত ছিল। অবশ্য লিখিতে হইতেছে এই কারণে যে, জীবন সায়াহ্নে আমার মতো একজনের জীবনকাহিনীও যদি অলিখিত থাকিয়া যায়- তাহা হইলে সমাজের বেশির ভাগ মানুষের কাছেই জগত-জীবনের অনেক কিছু অজানা রহিয়া যাইবে। যাহা হইবে দেশ ও জাতির প্রতি আমার গোনাহ’র শামিল। আর এই গোনাহ এতই কঠিন যে, খোদাতালা আমাকে অবশ্যই দোযখে পাঠাইবেন- যেখানে আমি কস্মিনকালেও যাইতে রাজি নই।

বড় কথা- এই জীবনে আমি যে অনন্য অভিজ্ঞতা ও সাফল্য অর্জন করিয়াছি তাহার মূল কথাটি আগামী প্রজন্ম, অর্থাৎ আমার নবীন রাজাকার ভাইদের কাছে অজানা থাকিয়া যাইবে। তাহা হইবে দেশ ও জাতির অপূরণীয় ক্ষতি।

শুধু ইহাই নহে, আমি বৃদ্ধ হইয়াছি, হয়তো আল্লাহতালা আমাকে আর বেশিদিন এ দুনিয়াতে রাখিবেন না। সেই কারণে, আমার অবর্তমানেও, এই মাটিতে যাহাতে সাচ্চা রাজাকারের জন্ম হইতে পারে, নতুনেরা যাহাতে জ্ঞান লাভ করিতে পারে, সেই দায়িত্ববোধটিও আমার মধ্যে বর্তমান। খাঁটি রাজাকার হইতে হইলে সে সমস্ত গুণাবলী অতি-আবশ্যক, আমার জীবন কাহিনী হইতে তোমরা তাহা জানিয়া লইতে পারিবে।

ইত্যাকার নানাবিধ কারণেই এই আত্মজবানী লিখিবার তাগিদ বোধ করিয়াছি।

তোমরা সকলেই অবশ্য অবশ্য ১৯৭১ সালের গণ্ডগোলের কথা শুনিয়া থাকিবে। যাহাদের বয়স বেশি হইয়াছে তাহারা কেউ কেউ দেখিয়াও থাকিবে। সেই সব দিনকালের কথা- যে বছর সাধের পাকিস্তান দুই টুকরা হইয়া গিয়াছে। বলিয়া রাখি, সভা-সমিতিতে ‘গণ্ডগোল’ শব্দটি উচ্চারণ করিয়া এই বান্দাকে এন্তার নাজেহালে পড়িতে হইয়াছে। আমি বলি ‘গণ্ডগোল’ আর তিনারা গলা ফাটাইয়া বলেন ‘মুক্তিযুদ্ধ’। হঠাৎ লাফাইয়া আসিয়া একদল পোলাপান আমাকে এমন বেধড়ক মার মারিলো যে আধা ঘণ্টার মতো আমি চোখে অন্ধকার দেখিলাম।

প্রথমবার যৎসামান্য কিলঘুষি খাইয়া কোনোরকমে দৌড়াইয়া বাঁচিলাম। কিন্তু পরের বার তর্ক করিতে গিয়া বিপদ বাড়াইয়া ফেলিলাম। এমন কয়েকটা মারাত্মক থাপ্পড় আর কিলঘুষি শির, নাক ও কানে আসিয়া পড়িলো যে, আমি বেহুঁশ হইলাম। এক সময় দেখিলাম, আমার ডান কানটার অস্তিত্ব রহিত হইয়াছে। আমি বুক ফাটিয়া রোদন করিলাম। কিন্তু ‘রিয়েলিটি’-কে মানিয়া নেওয়া ছাড়া উপায় রহিলো না ।

যাহা হউক, দুঃখজনক এই ঘটনার পর হইতে অবশ্য আমাকে কাপড় দিয়া মাথা ঢাকিয়া রাখিতে হইয়াছে। ইংরেজিতে যাহাকে ‘ক্যামফেজ’ বলে, মোটকথা তাহাই করিয়াছি- যাহাতে কান ছিঁড়িয়া গিয়াছে বলিয়া কেহই ঠাট্টা-তামাশা করিতে না পারে। মাশাআল্লাহ, প্রথমদিকে কিছু দুষ্টলোকে বিরক্ত করিলেও এখন কেউ কানকাটা রাজাকার বলিবার প্রয়োজনবোধ করে না।

নতুন রাজাকার ভাইয়েরা, মনে রাখিবে, বাঙালি জাতির একটা বড় গুণ যে তাহারা অতি সহজেই অতীত ভুলিয়া যায়, যাহা অন্য কোনো জাতির কাছে পাইবে না। আমার সফলতার ইহাও এমন এক কারণ- যাহা তোমাদের জানিয়া রাখা উচিত।

যাহা হউক, প্রতিজ্ঞা করিয়াছি- আর কখনই সভা-সমিতিতে মুক্তিযুদ্ধকে ‘গণ্ডগোল’ বলিয়া আখ্যায়িত করিব না। ইহাতে যে মুসিবত তাহা আমার জানা হইয়াছে। মনে যাহাই থাকুক, অন্তত মুখে বলিব না। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা হইতে ইহাই জ্ঞান হইয়াছে যে, দেশবাসী এই কথাটাকে কোনোদিনও মানিয়া লইবে না। তাহারা নানা কিছিমের দল ও পার্টি করিবে, নিজেরা মারামারি কাটাকাটি করিবে, কিন্তু এই ব্যাপারে ‘কমপ্রমাইস’ করিবে বলিয়া মনে হইতেছে না।

হবু রাজাকার ভাইদের বলিতেছি যে, আমার জীবনের এই অভিজ্ঞতাটি মনে না রাখিলে তোমাদেরও কান হারাইতে হইবে। অতএব আগে হইতে সাবধান থাকিও!

তবে আমি বুলন্দ কণ্ঠে বলিতে চাহি যে, সাধের পাকিস্তানকে যে বা যাহারা দুই ভাগ করিয়াছে, সেই দুশমনদের আমি আজিকেও মাফ করিতে পারি নাই। কোনেদিন পারিবোও না। কারণ আমাদের পাকিস্তানি বড়ভাইদের (যাহারা দুঃখজনকভাবে আজ আমাদের মাঝে উপস্থিত নাই) কথা এতদিন পরও আমি শয়নে-স্বপনে স্মরণ করি।

অনেকে হয়তো বিশ্বাস করিবে না, অথচ ইহা অতীব খাঁটি কথা যে- আমার শয়নকক্ষের দেওয়ালে আজও একজোড়া বুটজুতা ঝুলন্ত রহিয়াছে। ঘুমাইতে যাইবার আগে এবং ঘুম হইতে উঠিয়া দুই নয়ন ভরিয়া সেইগুলি আমি দেখিয়া থাকি।

এই বস্তুগুলি কাহার? কিসের স্মৃতিচিহ্ন বহন করিয়া এত বৎসর ধরিয়া সেই গুলিকে নিজের মাথার উপর সযতনে রাখিয়া দিয়াছি? তোমাদের আগ্রহ দমাইবার জন্য বলিতেছি- ওই বুটজুতা দুইখানি একজন পাকিস্তানি সৈন্য ভাই সাহেবের- যাহাকে এক রাত্রিতে নিজের বাড়িতে দাওয়াত করিয়া আনিয়া পারিয়া আমি ধন্য হইয়াছিলাম।

কিন্তু আল্লাহর কী বিচার- শেষ পর্যন্ত সেই মেহমানকে বজ্জাত মুক্তি- বিচ্ছুদের হাতে পড়িয়া বেইজ্জত হইতে হইয়াছে। কেবল তাহাই নহে, আমার কথায় নিজের আপন শালী যখন তাহাকে সোহাগ করিয়া মুখে পান দিতে যাইতেছিল, ঠিক তখনোই আজরাইলের মতো জনাকয়েক দরজা ভাঙিয়া ঘরে ঢুকিয়া রাইফেল ও স্টেনগান বাগাইয়া কহিল, শালা পাকি – তোর খেল খতম।

সেই ভয়ঙ্কর ঘটনাটা মনে পড়িলে আজও চোখের পানি আটকাইয়া রাখিতে পারি না। কী যে মার সেদিন খাইয়াছিলাম বাকি জীবনে তাহা ভুলিবার নয়। আমি স্বদেশি বলিয়া তাহারা আমাকে জানে বাঁচাইয়া দিয়াছে। কিন্তু আমার মেহমানকে টানিয়া-হিঁচড়াইয়া কোথায় যে নিয়া গিয়াছে তাহা আর কখনোও জানিতে পারি নাই। সেই দিন হইতেই ঘরের মেঝেতে পড়িয়া থাকা বুটজুতা দুইখানি স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে রাখিয়া দিয়াছি।

তোমরা যাহারা নব্য রাজাকার হইতে মনোস্থির করিয়াছ, তোমাদের কাছে নসিহত এই যে- নিজ নিজ ঘরে তোমরাও ১৯৭১-এর পরাজয়ের কোনো না কোনো চিহ্ন টানাইয়া রাখিও। তাহা না হইলে খাঁটি রাজাকার হইবার খায়েস পূরণ হইবে না।

আরও কিছু কথা বলা উচিত। কখনও-সখনও পাকিস্তানি বড় ভাইয়েরা লাথি-গুতিও মারিতো বটে। কিন্তু তাহাতে আমরা কদাচিৎ অপমান বোধ করিয়াছি। বিলক্ষণ জানিও, খাঁটি রাজাকার হইতে হইলে অপমানবোধ নামক বস্তুকে শিকায় তুলিয়া রাখিতে হইবে। রাজাকার হইবে এবং আত্মসম্মান রাখিবে- ইহা কখনোই হইবার নহে।

আরও একটি বিশেষ কারণে আজিকেও আমি পাকিস্তানি নওজোয়ান ভাইদের সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করি। মুক্তিবাহিনীর ভয়ে আমরা যখন টিকিতে পারি নাই, তাহারা আমাদের রক্ষা করিয়াছে। যতদিন তাহারা এই মাটিতে উপস্থিত ছিলেন, ততদিন আমরা বিপদ-আপদ হইতে বাঁচিয়া গিয়াছি। লাথি-গুতিও তাহারা মারিত বটে, কিন্তু সাধের পাকিস্তানের কথা মনে করিয়া আমরা হজম করিয়া নিয়াছি। অবশ্যই মনে রাখিও, অপমান হজম করিবার এই যোগ্যতাটি খাঁটি রাজাকার হইবার অন্যতম প্রধান শর্ত বটে।

আমি আমার মনখোলা মোবারকবাদ আর সেলাম জানাই ক্যান্টনমেন্টের সেইসব জেনারেল স্যারদের যাহারা ক্ষমতা দখল করিয়া ‘মুক্তিযুদ্ধ’ শব্দটার প্রায় বারোটা বাজাইয়া দিয়াছিলেন। বলিয়া রাখি, আমাদের রাজাকারকুল সেই সময় জেনারেল স্যারদের জন্য প্রতিদিন নফল নামাজ পড়িয়াছি। কারণ উনিশশ’ একাত্তর সালে আমরা পুরোদস্তুর ফেল করিয়াছিলাম, পরবর্তীকালেও খুব একটা পাস করিতে পারি নাই, কিন্তু ‘বাঙালি’ হইতে ‘বাংলাদেশি’ বানাইয়া ক্যান্টনমেন্টের জেনারেল স্যারগন আমাদের স্বপ্ন পূরণ করিয়াছেন। আমরা মহা-আনন্দে দেখিয়াছি, নিজেরা যাহা করিতে পারি নাই তাহাই আপছে-আপ হইয়া যাইতেছে। বাংলাদেশে বসবাস করিয়াও আমরা পাকিস্তানে থাকিবার শান্তি লাভ করিয়াছি। সেই কারণে মাথা হেট করিয়া আমরা অন্তত দুই জন জেনারেল স্যারকে আমি স্যালুট করি।

তোমাদেরকে বলি, যখনই দেখিবে নিজেরা কিছু করিতে পারিতেছ না, তখনই অন্যের ঘাড়ে বন্দুক রাখিয়া তাহা বাস্তবায়ন করিবার চেষ্টা করিবে। মনে রাখিবে, কৌশলই বড়। ধর্ম নয়, ধর্মের লেবাস পরিয়াই ‘সাইলেন্ট মেজরিটিকে’ দলে টানিতে হইবে। আর যদি এই পাপটি করিতে গিয়া নিজের দীলে কখনও পাপবোধ জাগিয়া ওঠে, তাহা হইলে আল্লাহর কাছে পানা চাহিও।

অতীব দুর্ভাগ্য ও পরিতাপের বিষয় এই যে, সেই সব জেনারেল স্যারগণ শত চেষ্টার পরও দেশটাকে শেষ পর্যন্ত নব্য-পাকিস্তান বানাইয়া যাইতে পারেন নাই। তবে তাহাদের প্রতি আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা এই কারণে যে, তাহারাই এই দেশে রাজাকারীকে পরিপূর্ণ মর্যাদা দিয়া পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করিয়াছেন- যাহা ভুলিবার নয়।

এই ক্ষেত্রে একজন জেনারেলের নাম মনে করিতে পারি, যিনি একাত্তর সালে আমাদের বিরুদ্ধে মাঠে-ময়দানে থাকিয়াও পরবর্তীতে আমাদের সম্মান রক্ষা করিয়াছেন। জেল হইতে রাজাকারকুলকে মুক্ত করিয়া তিনি আমাদের অশেষ কৃতজ্ঞতার পাশে আবদ্ধ করিয়াছেন।

কিন্তু দুর্ভাগ্য যে তিনি হঠাৎ করিয়া ইহধাম ত্যাগ করিলেন। বলাই বাহুল্য, তিনি অশেষ চেষ্টা করিয়াছেন সমাজ ও সংসারে আমাদের পুনর্বাসিত করিতে। আমির এ আলা ছাহেবকে প্রবাস হইতে ফিরাইয়া আনিয়াছেন। তোমাদের জানার জন্য ইহাও বলিতে চাহি যে, আল্লাহ যদি প্রথম জেনারেল স্যারকে দুনিয়া হইতে অসময়ে তুলিয়া না লইতেন তাহা হইলে এতদিনে আমরা আরও বেশি প্রতিষ্ঠিত হইতে পারিতাম।

আমাদের দ্বিতীয় দুর্ভাগ্য হইতেছে, শেষের জেনারেল সাহেবকেও আমরা শেষ পর্যন্ত টিকাইয়া রাখিতে পারি নাই। তিনার নীতি ছিল দুইমুখী। বেশির ভাগ সময় তিনি মুক্তিযুদ্ধের কথা বলিতেন, কিন্তু কাজ করিতেন বিপরীত। ইহাতে লাভ বই ক্ষতি হয় নাই। তবে তাহাকেও অকালে হারাইতে হইয়াছে। নারী-বাড়ি-গাড়ি, টাকা-পয়সা ইত্যাদি নানান কিছিমের বজ্জাতি করিতে গিয়া তিনি এমন স্থানে আসিয়া পৌঁছাইলেন যে কেহই তাহাকে আর রক্ষা করিতে পারিল না!

এই প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলিয়া রাখি। যখনই দেখিবে নিজেরা কিছু করিতে পারিতেছ না তখনই সরকারবিরোধীদের সাথে নিজেদের এক করিয়া ফেলিবে। ইহাতে দল যেমন কর্মময় থাকিবে, গ্রহণযোগ্যতা বাড়িবে। আমরা খাঁটি রাজাকাররা দ্বিতীয় জেনারেলের শেষের দিকে তেমনই নীতিই অবলম্বন করিয়াছিলাম। ইহাতে লাভ বৈ ক্ষতি হয় নাই।

কেউ আবার ভাবিয়া বসিও না যে, আত্মজবানী লিখিতে বসিয়া নানান প্রসঙ্গের অবতারণা করিয়া আসল কথা হইতে আমি সরিয়া গিয়াছি। তাহা মোটেও সত্য নহে। এই যাবৎ একটা মুখবন্ধ করিলাম মাত্র। কারণ, সকলেই অবশ্য অবশ্য মানিবে যে, এই বাংলাদেশ আজ এমন একটি জায়গায় আসিয়া দাঁড়াইয়াছে যে, আমাদের মতো খাঁটি রাজাকারদেরও হয়তো তেমন কিছু করিবার নাই। রাজাকারকুলের জন্য ইহা একটি বড় দুর্ভাগ্যের কাল। আল্লাহর কসম খাইয়া বলিতেছি, এই দেশের নতুন জেনারেশন শত চেষ্টার পরও রাজাকারি ‘ফিলোসফিতে’ প্রলুব্ধ হইতেছে না। তাহারা একদিকে ইউরোপ-আমেরিকা-ইন্ডিয়া যাইতেছে, জ্ঞানবিজ্ঞান শিখিতেছে, এমন কি যুক্তিতর্ক দিয়া আমাদের ধর্মব্যবসা লাটে তুলিবার ব্যবস্থা করিতেছে। কাজেই সাবধান হওয়া বাঞ্ছনীয় বটে। উপদেশ যে, যতটা সম্ভব জ্ঞান-বিজ্ঞান হইতে নতুন জেনারেশনকে দূরে সরাইয়া রাখিবে, তাহাতে আখেরে লাভ বৈ লোকশান হইবে না।

তবে জানেপেহচান নব্য-রাজাকার ভাইয়েরা, উপরিউক্ত কথাবার্তা শুনিয়া কখনও ঘাবড়াইবে না। খোদার কসম খাইয়া বলিতে চাহি যে, এই দেশে রাজাকারির ভবিষ্যৎ আজিও পুরাপুরি রহিত হয় নাই। আমরা রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করিতে পারি নাই ঠিক, অনেকবারই মার খাইয়াছি, কিন্তু বিশাল অর্থক্ষমতা আমাদেরই হাতে রহিয়াছে। ইহা আল্লাহর বিশেষ নেয়ামত। নেয়ামত আরও যে, এই দেশেরই একটি বড় দল আমাদের ইয়ার-বন্ধু হইয়াছে; এবং তোমরা দেখিবে- একদিন মুসলিম লীগকে আমরা যেই ভাবে উদরে পুরিয়াছি একই ভাবে এই দলটিকেও আমরা অচীরেই উদরস্থ করিতে সক্ষম হইবো ইনশাআল্লাহ।

শুনিয়া রাখ, নানা বিপদ-আপদের পরও তোমরা একাত্তরের পরাজয়ের শোধ লইবার বাসনা মন হইতে রহিত করিও না। মনে রাখিও- বেশ কিছু মুরব্বি রাষ্ট্র আমাদের প্রতিনিয়ত খোঁজখবর রাখিতেছে। তাহারা ব্যাংক-বীমা, হাসপাতাল, স্কুল-কলেজসহ নানা কিছিমের ব্যবসা-বাণিজ্য করিবার সুযোগ করিয়া দিয়াছে। তবে সত্যি কথা ইহাই যে, ইত্যকার সুযোগ-সুবিধার পরও খুব একটা সুবিধা হইতেছে বলিয়া মনে হইতেছে না। কেন এরূপ হইতেছে তাহা নিশ্চয়ই তোমরা বিশ্লেষণ করিও।

বলিয়া রাখি, বহুৎ বেজ্জতির পরও জীবনে যথেষ্টই আমি ‘সাইন’ করিয়াছি। মান-মর্যাদা খোয়াইয়াছি কিছু- অস্বীকার করিব না। কিন্তু রাজাকার হইবো, আবার মান-মর্যাদাও রাখিবো- তাহা হইতে পারে না। অনুগ্রহ করিয়া আমার শেষোক্ত উদ্ধৃতিটির দিকে নবীন রাজাকার ভাইয়েরা খেয়াল রাখিবে।

তবে দুঃখ যে, নব্য রাজাকার ভাইদের জন্য আমাদের কালের সুবর্ণ সুযোগটি হয়তো আর আসিবে না। আহা, উহা ছিল রাজাকারকুলের জন্য ঐতিহাসিক সময়। মুক্তিবাহিনীর ভয়ে সদা-সর্বদাই কাঁপিয়াছি, ইহা অস্বীকার করিবো না। পুল পাহারা দিতে যাইয়া, পাকি ভাইদের জন্য এবাড়ি-ওবাড়ি হইতে মেয়ে মানুষ জোগাড় করিতে যাইয়া, নানান জায়গায় লুটপাট করিতে যাইয়া গ্রামবাসীদের হাতে ক্ষতিসাধনও আমাদের কম হয় নাই। বিশ্বাস কর- প্রতি মুহূর্তে আমরা ভয়ে কাঁপিয়াছি- কখন মুক্তি আসিয়া পড়ে। যখনই ভয় হইয়াছে তখনই দৌড়াইয়া গিয়া বড় ভাইদের ক্যাম্পে প্রবেশ করিয়াছি।

ইহাও শুনিয়া রাখো যে, রাগ বা ত্যাক্তবিরক্ত হইয়া পাকিস্তানি ভাইয়েরা কখনো-সখনো আমাদের লাথি-গুঁতা মারিয়া বাহিরও করিয়া দিয়াছে। কিন্তু ইসলাম ও পাকিস্তান রক্ষার নামে টুঁ শব্দটিও আমরা উচ্চারণ করি নাই। আশা করিবো, আমাদের পরে যাহারা রাজাকার হইতে চাহ তাহারা পূর্বপুরুষদের এই সহনশীল চরিত্রটি ধারণ করিবে।

ইহাও জানিয়া রাখা মঙ্গল যে, পাকিস্তান ভাঙিলেও আমাদের বহু প্রিয়জন দেশে রহিয়া গিয়াছে। ইহার একটি বড় কারণ এই যে, বাঙালিরা এমনই জাতি যাহারা বড়ই ধর্মপ্রাণ ও দয়াপ্রবণ। যতই তুমি আকাম-কুকাম কর না কেন একবার মসজিদে ঢুকিয়া পড়িলে কেউই তোমাকে ‘টাস’ করিবে না! অন্যথায়, ১৬ ডিসেম্বরের পর হইতে যে ধরনের দুরবস্থা হইয়াছিল তাহাতে অস্তিত্ব বিপন্ন হইতে পারিত।

আরেকটি বিষয়ও জানিয়া রাখা ভালো। যুদ্ধশেষে বাঙালি জাতীয়তাবাদীরা ধরিয়াই নিয়াছিল যে আমরা পরাজিত হইয়াছি, অতএব শেষ হইয়া গিয়াছি। এই যে ভয়ঙ্কর ভুলটি তাহারা করিয়া বসিলো, সেই ভুলের সুবাদেই এক-দুই বছর নানান নিরাপদ জায়গায় পালাইয়া রহিলাম। এমন ভাব দেখাইলাম যে, আল্লাহতালার নামে জীবন উৎসর্গ করিয়া পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিতেছি। আদপে উহা ছিল আমাদের ভেক্- যাহা রাজাকার হইবার অন্যতম প্রধান শর্ত।

নব্য রাজাকার হইতে ইচ্ছুক ভাইয়েরা, তোমরা ইহা হইতে একটি বৃহৎ দৃষ্টান্ত গ্রহণ করিতে পারো। যখনই বিপদের সম্মুখীন হইবে তখনই ভেক্ ধরিবে। দেখিবে, শত্রুগণ পিছাইয়া পড়িবে এবং আসল ও নকল পৃথক করিতে পারিবে না। বাঙালি জাতির গর্বধারী জনগোষ্ঠীর এই দুর্বলতাখানি যদি তোমরা অনুধাবণ করিতে পারো- তাহা হইলে আল্লাহর রহমতে তোমরা একদিন মঞ্জিল-মকসুদ লাভ করিবে।

আগামী দিনের রাজাকার ভাইয়েরা, বাংলাদেশে রাজাকারির দিন একেবারে শেষ হইয়াছে বলিয়া আমি অন্তত মনে করি না। একাত্তরের পর বহুযুগ চলিয়া গেলেও ‘সেক্যুলার পলিটিশিয়ানদের’ চরিত্রটি আজিকেও সম্পূর্ণ বদল হইয়াছে বলিয়া মনে করিবার কারণ নাই। তাহারা একে অপরের পাছায় আঙুল দিয়া (খারাপ শব্দ প্রয়োগ করিবার জন্য মাফ চাহিতেছি) প্রত্যেকে প্রত্যেকের ক্ষতিসাধন করিতেছে। ক্ষুদ্র ও ছোটরা বড়দের বড় হইবার কৌশল এবং যোগ্যতা বুঝিতে ব্যর্থ হইয়া ঈর্ষায় মরিতেছে, বৃহৎ বা বড়রা ছোটদের অতি ক্ষুদ্র ভাবিয়া মজা দেখিতেছে। আসলে তাহারা একে অন্যকে আঘাত করিয়া নিজেরাই নিজেদের মৌলিক লক্ষ্য হইতে সরিয়া পড়িতেছে।

আর ইহাই আমাদের বড় লাভ। অনুগ্রহ করিয়া তাহাদের ভাগাভাগির ব্যাপারটা তোমরা জিয়াইয়া রাখিও। প্রয়োজনে কৌশল অবলম্বন করিও।

এই আত্মজবানী হইতে অবশ্যই তোমাদের এই শিখিতে হইবে যে, ধর্মের লেবাস না পরিয়া, বক-ধার্মিক না সাজিয়া খাঁটি রাজাকার হওয়া সম্ভব নয়। কারণ জ্ঞানবিজ্ঞানের যেভাবে বিস্তার ঘটিতেছে, নারীজাতি যেই ভাবে ঘরের বাহির হইতেছে, বাংলা ও ইংরেজি শিক্ষা যেইভাবে বিস্তার লাভ করিতেছে, তাহাতে রাজাকারি ক্রমশই আগের চাইতে কঠিন হইয়া পড়িতেছে।

ইহার পরও তোমরা ঘাবড়াইবে না। মনে রাখিও, রাজাকার হইবার জন্য ধর্মপ্রাণ হইবার প্রয়োজন নাই। প্রয়োজন লেবাসের। ইহাও মনে রাখিও, বেশিরভাগ বাঙালি মুসলমান আজিকেও লেবাসকেই ধর্ম বলিয়া মানিয়া লয়। ইহারা অতিশয় সহজ ও ধার্মিক। তবে তোমাদের জন্য সাবধান বাণীও রাখিতে চাহি- এই অতি সাধারণরাই কখনও কখনও আবার অতিশয় ক্ষেপিয়া ওঠে। সেই দিকে অতিশয় নজর রাখিও।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj