বাংলাদেশ, বাঙালি-আত্মপরিচিতির উৎস সন্ধান : মুস্তাফা নূরউল ইসলাম

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

আপাত বিভাজনে আলোচ্য বিষয়ের দুটি অংশ : বাংলাদেশ এবং বাঙালি। আদপে অবশ্য দুয়ে মিলিয়ে একই সমগ্রতা- একে অপরটির সম্পূরক; এবং পরস্পর আন্তর-আত্মিক ঘনিষ্ঠ। সহজ কথায়- নির্দিষ্ট একটি বিশেষ ভূখণ্ড-জনপদের আধারে ভূমিজ, লালিত, অবয়বপ্রাপ্ত বিশেষ এক মানবগোষ্ঠী। অতএব বলব যে, লগ্ন যোগাযোগ কোনো অন্তরীক্ষ থেকে অকস্মাৎ অবতীর্ণ নয়, অকস্মাৎ সৃজিত নয় ঐ দেশ; এবং দেশের মানুষ। বাস্তবের ভুবনে কখনই এমনটি ঘটে না। এইখানে প্রকৃতি-সত্যের প্রত্যক্ষ-অপ্রত্যক্ষ নিয়মের রাজত্ব।

উল্লেখ বাহুল্য, বর্তমান প্রসঙ্গ-পূর্বোক্ত সেই জনপদ, নাম পরিচিতিতে বাংলাদেশ এবং জনপদবাসী প্রধানতই বাঙালি অভিধায় আখ্যাত। আমাদের মুখ্য উদ্দেশ্য, এমন করে বলা যেতে পারে যে, প্রথমত, বর্ণিত ঐ বাংলাদেশ আবিষ্কার এবং তৎসহ স্বাভাবিকভাবেই ঐ জনপদে বসতকারী বাঙালিজনকে চিহ্নিতকরণ। এখন, এক প্রকারের সরল জিজ্ঞাসার মাধ্যমে বিষয়ের প্রথমাংশের অবতারণা করতে চাই; বাংলাদেশ বলতে কি বুঝি? কবে থেকে বাংলাদেশ? কালবাচক এই প্রশ্নটি নিয়েই আলোচনার গোড়াতে সাধারণত কতিপয় বক্তব্য উপস্থাপিত করে নেব। তেমন নিশ্চিত করে জানা নেই সেই হদিশ-‘কবে থেকে বাংলাদেশ’। মোটামুটিভাবে এমন জবাবের সাথে আমরা পরিচিত-ধূসর দূর অতীতবধি এই ভূখণ্ড; এবং ভূতত্ত্ববিদ-পুরাতত্ত্ববিদ-নৃবিজ্ঞানী গবেষক পণ্ডিতবর্গের মতানুযায়ী হিমযুগের পর থেকেই এতদঞ্চলের অবস্থান। তৎপূর্বেও সে অবস্থানটি থাকবার সম্ভাবনা। সে যা হোক, তবে পণ্ডিতদের আরও ধারণা যে, এই জনপরিষদ কিছু স্বাক্ষর রয়ে গেছে প্রতœ-প্রস্তর যুগাবধি। এখন, তাইই যদি গ্রাহ্য তাহলে বিবেচ্য যে, দূর অতীতের কালসীমা পেছিয়ে যেতে পারে দশ লক্ষ বছর পূর্বে। এবং তার বিস্তার এই প্রান্তে এগিয়ে এসেছে আট হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দের কাছাকাছি। এখন স্বভাবতই প্রশ্ন হবে- আলোচ্য জনপদের এমনতর কালগত অবস্থানের সমর্থনের প্রমাণ সাক্ষ্য কী? সেই অনুসন্ধান অবশ্য দীর্ঘ আলোচনার বিষয়। তবে প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আজকের যে বাংলাদেশাঞ্চল, এইখানে প্রতœ-প্রস্তর যুগের গোটা কয়েক পাথুরে হাতিয়ার আবিষ্কৃত হয়েছে। ধারাবাহিকতায় অতঃপর নব্য প্রস্তর যুগেরও হাতিয়ারের সন্ধান পাওয়া যায়। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থেকে পোড়া কাঠের তৈরি একটি খড়গ কৃপাণ/কুঠার উদ্ধার করা গেছে। এই প্রকারের কিছু কিছু ছড়ানো ছিটানো উপাদানসমূহ দেশ-ভূখণ্ডের অবস্থান-সুপ্রাচীনত্বের নিদর্শন বহন করে আসছে। নৃবিজ্ঞানী পণ্ডিতদের সেই মতো ধারণা। পণ্ডিতি সন্ধানের ক‚ট জটাজাল যদি সরিয়ে রাখি, তবে হয়তো বা এমন করে বলা যেতে পারে যে, জানা-নেই কতো হাজার-লক্ষ বছর আগে একদা প্রকৃতির প্রচণ্ড তাণ্ডবে দক্ষিণ তটশায়ী সুনীল জলধি থেকে উত্থিত হয়েছিল এই ভূখণ্ড-বদ্বীপ; এবং যবে থেকে এতদঞ্চলে জনমানুষের বসবাস তদবধি স্থানটি চিহ্নিত হয়ে রয়েছে। তবে নামকরণ, তা গণনাতীত মহাকালবর্ষ পরের কথা। ফলত কবে থেকে বাংলাদেশ ভূমি, এ জিজ্ঞাস্যের মোদ্দা জবাবটি এই যে, সন-শতাব্দীর মার্কা চিহ্ন দিয়ে তা নির্ধারিত করে দেওয়া মোটে সম্ভব নয়। ইতোমধ্যে উপস্থাপিত সংক্ষিপ্ত আলোচনায় কেবল কিছুটা ধারণা উপস্থাপনের প্রয়াস পাওয়া গেল।

এবারে পূর্বোত্থিত প্রথম প্রশ্নটির অবতারণা করা যাক-‘বাংলাদেশ’ কী বুঝি? এ জবাব-প্রসঙ্গে উল্লেখ করব যে, এখানে মানচিত্র-সীমানার কথা, ভূগোল-প্রকৃতি বৈশিষ্ট্যের কথা একমাত্র নয়। আদপে এতদঞ্চলের অধিবাসী জনমানুষের কাছে মহৎ এক ‘প্রত্যয়ে’র আরেক নাম বাংলাদেশ। অভিজ্ঞতায় এমন করে জানা যে, যখন তা ঔপনিবেশিক পাকিস্তানিত্বের জিন্দানখানায় বন্দি কোটি বাঙালির মুক্তিযুদ্ধসম্ভূত, তখন মূলে কাজ করে গেছে সেইসব মানুষের আর্থ-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক স্বাধিকার অর্জনের অপ্রতিরোধ্য প্রত্যয়।

অতঃপর প্রাসঙ্গিক গুরুত্বের আর আর কথা।

পূর্ববর্ণিত ইতিধর্মী ঐ প্রত্যয়ের রসধমব অন্তরধূত বটে, তৎসহ এখন চিহ্নিত করে নিতে হবে বাস্তবতার ভুবনকে। অতএব প্রথমত, দেশটির ভৌগোলিক পরিচিতি এবং যুগপৎ দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই দেশ ভূখণ্ডের সত্তায় অবস্থান অর্জন।

মোট মিলিয়ে নিয়ে তবে বলবার যে-এই সময়ের সমন্বয়ে নাম পরিচিতিতে আজকের বাংলাদেশ, যা কিনা সার্বভৌম স্বাধীন নতুন এক জাতিরাষ্ট্র (ঘধঃরড়হ ঝঃধঃব),

বিশ্ব মানচিত্রে স্বতন্ত্র করে চিহ্নিত এই বাংলাদেশ এবং বিশ্বসভা জাতিসংঘে আপন স্থান করে নেওয়া এই বাংলাদেশ, -এর বিশেষ ভৌগোলিক সীমানা বেষ্টিত রাষ্ট্রীয় অবয়বটি অবশ্য তেমন পুরাতন নয়। তবে অন্যতম এইক দীর্ঘ জটিল প্রসঙ্গ। এইখানে কেবল দুটি ইতিহাস-ঘটনার উল্লেখ করা যাচ্ছে; এক ছিল ‘রুল ব্রিটানিয়া’র ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্য ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার অন্যতম প্রশাসনিক প্রদেশ বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি;- আর্থ-রাজনৈতিক সাম্রাজ্য স্বার্থের কারণেই ১৯০৫-এ হয়েছিল বঙ্গ বিভাগ চধৎঃরঃরড়হ ড়ভ ইবহমধষ। মোটামুটিভাবে পূর্ববঙ্গ, উত্তরবঙ্গ, পার্বত্য ত্রিপুরা, আসাম নিয়ে এক প্রদেশ-ইউনিট, রাজধানী ঢাকায়। ছয় বছরের মাথায় তা রদ ঘোষিত হয় এবং পুনরায় আগেকার ইবহমধষ/বঙ্গপ্রদেশ। পরের কাল ১৯৪৭-এর আগস্টে অতীব তাৎপর্যবাহী ঐতিহাসিক কর্মকাণ্ড চধৎঃরঃরড়হ ড়ভ ওহফরধ ‘ভারত বিভাগ,’ আর সেই সাথে চধৎঃরঃরড়হ ড়ভ ইবহমধষ ‘বাংলা ভাগ’। এমন করে এক কথায় বিবৃত করা যায়- ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সিদ্ধান্ত মোতাবেক ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেন কার্যকর উদ্যোগটি নিয়েছিলেন, লীগ কংগ্রেসের নেতারা সবাই মিলে ঐকমত্যে স্বাক্ষর করেছিলেন এবং ইংরেজ সাহেব সিরিল র‌্যাডক্লিফ মানচিত্রে দাগ টেনে বিভাজনের ভৌগোলিক সীমানা-পরিধি, সীমানা-রেখা চূড়ান্ত করে দিয়েছিলেন। যদিও ‘ঞড়ি ঘধঃরড়হ’ থিওরির প্রবক্ত মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ আহত চিত্তে বলেছিলেন ‘ঃৎঁহপধঃবফ ধহফ সড়ঃু-বধঃবহ ঢ়ধশরংঃধহ’। যা হোক, তাই থেকে পূর্বে পশ্চিমে উত্তরে দক্ষিণে যে চেহারায় তৎকালীন পূর্ব বাংলা/পূর্ব পাকিস্তান, এবং এই বর্তমানের দেশ ভূখণ্ড বাংলাদেশ, রাষ্ট্রীয় রফবহঃরভরপধঃরড়হ-এর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ-এই দুয়ের ভূগোল-মানচিত্রে ফারাক নেই কোনো।

উপস্থাপিত এইসব তথ্য চলমান ইতিহাস থেকে সরল উদ্ধৃতিকরণের অধিক নয়। প্রধানত রাজনৈতিক ডামাডোলের আচ্ছাদনে এবং ক্ষমতা ও আর্থ-স্বার্থের নানামুখী দ্ব›দ্ব-টানাপড়েনে বর্ণিত রূপায়বটি নির্মিত। এটাই তখনকার সত্য বাস্তবতা। তবে গুরুত্ব আরোপ করি-তাৎক্ষণিকতাতেই কথার ইতি নয়। সেইহেতু অতঃপর প্রস্তাব যে, আমরা হিমশৈলের গভীরের সত্তাটিকে পর্যবেক্ষণ করবার প্রয়াস পাব।

প্রসঙ্গত জিজ্ঞাস্যটির পুনরাবৃত্তি করা যাক-কোথা থেকে কেমন করে বাংলাদেশ? কিছুটা অবতারণা ইতোপূর্বে অবশ্য করা গেছে। এখন কালবাহিতার খানিক সন্ধানের উদ্যোগ। তৎপূর্বে এই সুরাহাটি বুঝে নিতে চাই: নির্দিষ্ট কোনো একটি দেশের ‘হয়ে ওঠা’র পেছনে, একটি রাষ্ট্রনির্মিতর মূলে কী সব উপাদান উপকরণ এবং কার্যকারণ সহায়ক-ভূমিকায় সক্রিয় থাকে। ইতিহাস সাক্ষ্য, তেমন স্পষ্ট করে নির্দিষ্ট একক জবাব চিহ্নিত করা সম্ভব নয়। কখনো কখনো প্রকৃতি-ভূগোল কাজটি কিয়দংশে সাধন করে থাকে, যেমন কিনা কানাডা কিংবা অস্ট্রেলিয়া অথবা জাপান ইত্যাদি দেশ। তবে সদা সর্বত্র তেমন নয়। ইউরোপে এশিয়ায় সে উদাহরণ মেলাই রয়েছে। কখনো ধর্মবিশ্বাসের একতা দেশ-রাষ্ট্রকে গড়েছে। উদাহরণত : এক সময়ে ইউরোপে চধঢ়ধষ ঝঃধঃব ছিল; ইসলামের বন্ধনে দেশ-রাষ্ট্র ছিল-খলিফার ধর্মীয় প্রশাসনিক নেতৃত্বে তুরস্ক থেকে লোহিত সাগর তীরবর্তী আরব উপদ্বীপ পর্যন্ত ব্যাপ্ত। শেষাবধি কিন্তু কোনোটাই টেকেনি। বস্তুত ধর্ম-বিশ্বাস-সংস্কার, এমন কি ভাষা, জাতি গোষ্ঠী-রক্ত সম্পর্ক-উৎস ইত্যাদি উপাদান-উপকরণ স্থান বিশেষে কোথাও কোথাও কখনো বা কার্যকর দৃশ্যমান হলেও সচেতনজন অবগত যে, বহুতর ক্ষেত্রেই স্থায়ী হয়নি সেই অবস্থান। যথা-একদিকে যেমন কখন ঘটে যায় ঁহরঃরপধঃরড়হ ড়ভ ওঃধষু, ঁহরভরপধঃরড়হ ড়ভ এবৎসধহু ইত্যাকার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড; আবার ওদিকে প্রায় সমুদয় সাযুজ্য বৈশিষ্ট্য সত্ত্বেও উত্তর দক্ষিণ দুই কোরিয়া, আর আরব এলাকায় কতো টুকরো টুকরো আমিরাত স্টেট এইসব।

এখন এই প্রেক্ষিতে বিবেচ্য বাংলাদেশ। ইতিহাসপটে লক্ষ করব- প্রকৃতির বৈরী রোষ, সাম্রাজ্য-দখলদার উপনিবেশ-আগ্রাসী শক্তি, এবং মানব কল্যাণের দুশমন জোট বারংবার আঘাত হেনেছে বটে, তবে শেষাবধি ইতিহাসেরই বাস্তবতা যে, আজ গভীরতম শেকড়ে প্রোথিত ‘বাংলাদেশ’ নামের দেশসত্তা। জোরটা কোথায়? বহমানতায়, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যধারায়, এবং প্রধানত এথনিক উত্তরাধিকারের সমন্বিত সংকর সংগঠনে। সমান্তরাল পাশাপাশি প্রায় একই প্রকারের প্রকৃতিলীলার আচ্ছাদান, ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যগত ভূসংস্থান-ইত্যাকার এইসব মিলিয়ে দূর অতীতাবধি অবয়বে-আত্মার এই দেশ-ভূখণ্ড।

কথাগুলো এমন করে বলা গেল বটে, তবে যথার্থ প্রত্যয়জাত দেশচেতনা, তা অবশ্য সা¤প্রতিক কালের। উনিশ শতকের যখন থেকে স্বাদেশিকতার নতুন হাওয়া, তদবধি বঙ্গ, বঙ্গভূমি, বঙ্গদেশ, বাঙ্গালা দেশ, ‘আমার সোনার বাংলা’, ‘বঙ্গ আমার জননী আমার’, ‘বাংলাদেশের হৃদয় হতে’, ‘বাঙালির বাংলা’ এই প্রকারের শব্দপ্রত্যয়, গানের চরণ ইত্যাদির সাথে আমাদের পরিচিতি ঘটতে থাকে। আর ওদিকে প্রশাসনিক পরিচিতি ছিল ইবহমধষ চৎবংরফবহপু অভিধায়।

সে যাইহোক, তখন আমাদের প্রস্তাবিত প্রয়াসে প্রত্যাবর্তন করি। বর্তমানের রাষ্ট্রীয় পরিচিতিতে যে বাংলাদেশ, সেই দেশ-অবস্থানের উৎস সন্ধান।

বলা বাহুল্য, আজকের বাংলাদেশের যে ভূগোল-মানচিত্র, পূর্বকালীন প্রাগৈতিহাসিক-ঐতিহাসিক বাংলাদেশের সীমানা-সরহদ্দ, গঠন-চেহারা নিশ্চিয় তা নয় সম্পূর্ণতা একই প্রকারের। তবে আমাদের বাংলাদেশের ভৌগোলিক যে ঐতিহ্য তা আমাদের আপন সম্পদ, এবং বিভিন্ন নিদর্শন-প্রমাণাদি থেকে যতটা জানা গেছে তা এই রকমের :

ক. বগুড়া, রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর, উত্তরখণ্ডের এই সমুদয় জনপদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল সুপ্রাচীন নাম পরিচিতিতে পুণ্ড্র বা পৌণ্ড্রবর্ধন;

খ. গঙ্গা-ভাগীরথী নদীকে পশ্চিমে রেখে যে অঞ্চল সেই অঞ্চল উল্লিখিত রয়েছে বঙ্গ নামে;

গ. ‘বৃহ সংহিতা’য় কথিত উপবঙ্গ এবং ষোড়শ-সপ্তদশ শতকে আখ্যাত উপবঙ্গ বলতে বোঝনো হতো যশোহর এবং তৎসংলগ্ন কাননময় অঞ্চল;

ঘ. চন্দ্রদ্বীপ হচ্ছে বাকলা পরগনা বা বাখরগঞ্জ (বরিশাল) অঞ্চল এবং

চ. সমতট, বা কিনা সমুদ্রশায়ী নিম্নদেশ-গঙ্গা ভাগীরথীর পূর্ব তীরভূমি থেকে মেঘনার মোহনা পর্যন্ত প্রসারিত সমুদ্রশায়ী ভূখণ্ডকে বলা হতো সমতট। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে বর্ণিত এটাই ভাটি অঞ্চল।

সুপ্রাচীন কালাবধি নানাবিধ রচনায় এই ভৌগোলিক অঞ্চলের উল্লেখ পাওয়া যায়। বঙ্গের উল্লেখ রয়েছে খ্রিস্টপূর্ব দশম-নবম অব্দের বৈদিক রচনায়, পরে রামায়ণে, মহাভারতে। ‘বঙ্গ’ শব্দটি প্রথমে ছিল জন-পরিচয় বাচক; পরবর্তীকালে হলো জনপদবাচক বা দেশবাচক। বঙ্গের প্রাচীনত্ব নিরূপণ প্রসঙ্গে ড. সুকুমার সেন জানাচ্ছেন, ‘বঙ্গ জাতি হইতে দেশবাচক বঙ্গ নামের উৎপত্তি। বঙ্গ জাতি তথা বঙ্গ শব্দের প্রাচীনতম উল্লেখ রহিয়াছে ঐতরেয় আরণ্যকে। সেখানে বলা হইয়াছে যে, তিনটি জাতি নষ্ট হইয়া গিয়াছিল এবং এই তিন জাতি হইতেছে পক্ষী অর্থাৎ পক্ষীসদৃশ যাযাবর বঙ্গ, মগধ এবং চেরপাদ। পূর্বদিকে ক্রমশ হটিতে হটিতে এই যাযাবর বঙ্গ জাতি এখন যে স্থানকে পূর্ববঙ্গ বলা হয় তথায় বাস করিতে থাকে। তাহা হইতে পূর্ববঙ্গের প্রাচীন হয় বঙ্গ।’- (বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস,’ ১৯৫২ পৃ. ৪৯)। এবং এই পূর্ববঙ্গই বর্তমানের বাংলাদেশের অংশ।

বাংলাদেশে আর্যদের প্রথম উপনিবেশ স্থাপনা বরেন্দ্রভূমিতে। বরেন্দ্রী বা বরেন্দ্রভূমিরই প্রাচীন নাম পুণ্ড/পুণ্ড্রবর্ধন। এই ভুক্তির অধিবাসী পুণ্ড্রদের উল্লেখ রয়েছে ‘ঐতরেয় ব্রাহ্মণে’ (খ. পৃ ১০ম-৯ম অব্দ)। বরেন্দ্রভূমির অংশবিশেষের পরবর্তীকালীন নামান্তর গৌড়। ইতিহাসে মধ্যযুগের কালপর্বে গৌড়ভূমি অতিখ্যাত জনপদ।

আর্য উপনিবেশ স্থাপনের প্রাক্কালে এতদঞ্চল আদি অস্ট্রেলীয় গোষ্ঠীর বা অস্ট্রিক গোষ্ঠীর (এ দেশের মধ্যে কোল মুণ্ডা প্রবলতার গোষ্ঠী) মানুষদের দ্বারা অধ্যুষিত ছিল। উত্তর ভারতের আর্যদের দৃষ্টিতে এরা হীন, অন্ত্যজ বলে বিবেচিত হতো। এই হেতু আর্যদের জন্য বহুকাল এ দেশে আগমন নিষিদ্ধ ছিল। আর্যাবর্ত অর্থাৎ উত্তর ভারত থেকে এতদঞ্চলে আগমন করলে তাদের প্রায়শ্চিত্ত করতে হতো। এবং এই দেশে যারা বসতি স্থাপন করত তারা ব্রাতা, নষ্ট বা পতিত বলে বিবেচিত হতো। প্রাচীন বঙ্গদেশে ব্যাপকভাবে আর্য উপনিবেশ মৌর্য যুগে (৩য়-২য় খ্রি.পৃ.)।

প্রতিবেশী মগধাঞ্চল (বর্তমানের বিহার) থেকে প্রথম আগমন যাদের, ধর্মবিশ্বাসে তারা ছিল জৈনমতাবলম্বী। জৈনদের পরে আগমন বৌদ্ধদের। তারপর গুপ্ত শাসনামলে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের। পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে, আর্যদের প্রথম উপনিবেশ স্থাপন বরেন্দ্রভূমিতে। রাঢ় বরেন্দ্র অঞ্চলে উপনিবেশ স্থাপনের পর দীর্ঘ কালব্যবধানে আর্য ভাষা সংস্কৃতির প্রসার অর্থাৎ আর্যীকরণ ঘটে বঙ্গে-দক্ষিণে এবং পূর্ববঙ্গের নিম্নভূমিতে। এই কারণে কালভেদে এই অঞ্চলের সংস্কৃতিতে, আচার-আচরণে, স্বাতন্ত্র্যের সৃষ্টি হয়। ফলত তদঞ্চলের বাসিন্দা সাধারণ প্রাচীন যুগ থেকেই ‘বাঙ্গাল’ অভিধায় চিহ্নিত। সেকালে ‘বঙ্গাল’ সৈন্য ও নৌবলের প্রতাপ ছিল এমন উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘সদুক্তি কর্ণামৃত’ (১২০৬ খ্রি.) গ্রন্থে ‘বঙ্গাল’ কবির কথা পাই।

আর্যীকরণের পরবর্তী পর্বে বহিরাগতদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য আরব বণিক স¤প্রদায়। ত্রয়োদশ শতাব্দীর পূর্ব থেকেই এ দেশে তাদের আগমন অব্যাহত ছিল। সেই সাথে বিশেষ গুরুত্বের সাথেই উল্লেখ্য সুফি দরবেশদের আগমন এবং দেশের অভ্যন্তরে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাদের ছড়িয়ে পড়া। অপরদিকে, ত্রয়োদশ শতাব্দী থেকে এ দেশে মুসলমান সামরিক অভিযানের সূত্রপাত। ইতিহাস পাঠকের জানা রয়েছে, বাণিজ্য-কর্মকাণ্ড, ধর্মের বাণী এবং যুদ্ধবিগ্রহের সাথেই এই সমুদয় প্রক্রিয়ার পরিসমাপ্তি ঘটেনি। আসলে এইভাবে বঙ্গভূমিতে বহিরাগত মুসলমানদের অভিযানের পরিণতিতে ফলস্বরূপ কয়েক শতাব্দীর মধ্যেই তাদের এই দেশে স্থায়ী বসতি স্থাপিত হয়ে যায়। মোগল আমল (১৬শ-১৭শ শতাব্দী) নাগাদ এই দেশের নাম পরিচিতি ‘সুরা বঙ্গাল’। সম্রাট আকবরের সভাসদ ঐতিহাসিক আবুল ফজল তাঁর রচিত ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে ‘বাঙ্গালা’ নামটির ব্যাখ্যা জানিয়েছেন। ‘বঙ্গ’ এই শব্দের সাথে পূর্ববঙ্গীয় আইল (সংস্কৃতমূলে আলি) শব্দের যোজনা করে অতএব নিষ্পন্ন সাধিত শব্দটি ‘বাঙ্গাল’/‘বাঙ্গালা’। এই দেশ ঘোরতর বর্ষাপ্রবণ এবং নদীমাতৃক। তদ্দরুণ সময়কালে জোয়ারের স্রোত এবং বর্ষাপ্লাবন ঠেকাবার বাঁধ বাঁধা এবং কৃষি উৎপাদনের জন্য আল বাঁধার নিতান্ত প্রয়োজন। বর্ষণ প্রাচুর্যের এই দেশ স্বভাবতই তাই আল বহুল।

এই প্রসঙ্গে ড. নীহাররঞ্জন রায় লিখছেন, ‘আমার অনুমান আবুল ফজলের ব্যাখ্যার অর্থ এই : যে- বঙ্গদেশ আল বা আলিবহুল, যে- বঙ্গদেশের উপরিভূমির বৈশিষ্ট্যই হইতেছে আল সেই দেশই বাঙ্গালা বা বাংলাদেশ। এই আলগুলিই আবুল ফজলের সবিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছি, তাঁহার ব্যাখা পড়িলে এই কথাই হয়’। (বাঙালীর ইতিহাস’, ১৯৫২, পৃ. ১৩৪)। সেই সাথে মধ্যযুগ কালপর্বে অপর প্রাসঙ্গিক তথ্য যে, সে সময়ে (১৫৬০-১৭৩০ খ্রি.) এ দেশে আগত ইউরোপীয় পর্যটকদের আঁকা ম্যাপ-নকশাতে এবং তাঁদের রচিত বিবরণীতে এই দেশের পরিচায়ক নাম হিসেবে ‘ইবহমধষধ’ শব্দটির প্রয়োগ লক্ষ করা যাবে; দক্ষিণবিস্তারী সাগরের নাম বলা হচ্ছে এড়ষভড় ফব ইবহমষধষধ/এঁষভ ড়ভ ইবহমষধ। এবং গধৎপড় ঢ়ড়ষড় (১২৩৪-১৩২৪ খ্রি.) তার ভ্রমণকাহিনীতে দেশনামে লিখে গেছেন ‘ইধহমধষধ’.

সবটা মিলিয়ে আমরা তাহলে লক্ষ করতে পারি- পরিচিতিসূচক পরপর দেশনামসমূহ এই দুই প্রকারের : বঙ্গ-বঙ্গালহ ‘ইধহমষধ-ইধহমধষধ’ এবং যখন থেকে ইংরেজ রাজত্ব তদবধি শব্দটি ‘ইবহমধষ/ইবহমধষ ঢ়ৎবংরফবহপু’। ইতোমধ্যে যে ঠিকানায় আমরা উপস্থিত হয়েছি, সেটি অবশ্য প্রাক্-১৯৪৭ অর্থাৎ ভারত বিভাগজন/বঙ্গদেশ-দ্বিখণ্ডীকরণের পূর্বকালীন দেশনামকথা-বিষয়ক। অতঃপর ত’ জানাই রয়েছে আমাদের এ দেশ-ভূখণ্ড কখনো পূর্ব বাংলা, কখনো পূর্ব পাকিস্তান। সে যাই হোক, এখন অবশ্য উল্লেখবাহুল্য মনে করি যে, বর্তমান আলোচনার প্রাসঙ্গিকতা ‘৭১ মুক্তিযুদ্ধের স্বর্ণফসল জাতিরাষ্ট্রের দেশ বাংলাদেশকে নিয়ে।

প্রাগৈতিহাসিক উৎস থেকে অনুসরণের প্রয়াস পাওয়া গেছে- কোথা থেকে এবং কেমন চেহারায় বাংলাদেশ। কোন বাংলাদেশ? এই বর্তমানে আমরা ঝুঝে থাকি, মোটা দাগ ভৌগোলিক সীমানাবেষ্টিত সেই বাংলাদেশ। এবং তৎসহ অবশ্যই অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কিত রাষ্ট্রীয় সত্তা-পরিচিতি। ‘৪৮-৫২-র ভাষা আন্দোলনের সড়ক পাড়ি দিয়ে দিয়ে ক্রমে তাবৎমুখিনতায় বাঙালির মুক্তিযুদ্ধের সীমান্তে উত্তরণ এবং বিজয়-অর্জন। একদার কোনো এক ভূখণ্ড-জনপদ সত্তার সাথে এখন লীন হয়ে গেল উক্ত ‘জাতি-রাষ্ট্রীয়’ মাত্রিকতা।

এইখানে যোগ করব নবীন জাতি রাষ্ট্রের স্থপতি জনক শেখ মুজিবুর রহমান ‘৭১ ডিসেম্বরের দু’বছর আগে সেই ঐতিহাসিক ঘোষণাটি উচ্চারণ করেছিলেন, জনগণের পক্ষ হতে আমি ঘোষণা করছি, আজ থেকে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশটির নাম পূর্ব পাকিস্তানের পরিবর্তে শুধুমাত্র বাংলাদেশ’। সেদিন ছিল ৫ ডিসেম্বর, ১৯৬৯। এবং স্মরণ করছি পরের ‘৭১-এর ২৫ মার্চের রাত্রি মধ্যযাম পেরিয়েছে সেইক্ষণে-আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। অতঃপর ধারাবাহিকতায় ‘৭১ ডিসেম্বর ১৬।

দেশ ভূখণ্ড-বলয়ে ধৃত বাংলাদেশ রাজনৈতিক রাষ্ট্রীয় রহফবহঃরঃু-কে আত্মস্থ করে নিয়ে স্বতন্ত্র এক অখণ্ড সামগ্রিকতায় উত্তরিত হয়ে গেল।

আলোচ্য বিষয়ের প্রথম পর্ব ‘বাংলাদেশ’ প্রসঙ্গে ইতোপূর্বে খানিক আলোচনা করা গেছে। বর্তমান প্রসঙ্গে দ্বিতীয় পর্ব অর্থাৎ বাংলাদেশ নামের ওই ভৌগোলিক ভূখণ্ডের অধিবাসী-সাধারণ, এবং সেই সাথে ঘধঃরড়হ ঝঃধঃব বাংলাদেশের নাগরিক জনমানুষের পরিচিতি নিয়ে কিছু কথা। মোটামুটিভাবে বিষয়-বাংলাদেশ জনপদের বাসিন্দা বাঙালির আত্মপরিচয়।

শাস্ত্রনির্দেশ স্মরণ করি- ‘কহড়ি ঃযুংবষষ’ ‘আত্মনং বিদ্ধি’ নিজেকে জান। আমি কে, আমরা কারা কোন উৎস থেকে জাত, সম্ভূত; এবং মহাকালের সড়ক পেরিয়ে কেমনতার ধারাবাহিকতায় বর্তমানের এই বাঙালিত্বের ঠিকানায় আমাদের উত্তরণ। সহজ বক্তব্য যে, জীবিত জাতির মানুষদের বহমান উত্তরাধিকারের ইতিকথা জানতে হয়। যে জনগোষ্ঠীর তা জানা নেই শেকড়হীন ভাসমান কচুরিপানা তুল্য তারা; এবং যারা আপন উত্তরাধিকার বিষয়ে উৎসুক চেতন নয়, তারা অভিশপ্ত হতভাগ্য।

কিন্তু আমাদের অহঙ্কার ত’ আমাদের হাজার বছরের বাংলা। প্রস্তাবনায় নিবেদন করে রাখতে চাই যে, বর্তমান আলোচনায় আমরা গবেষক পণ্ডিতদের উদ্ধারকৃত তথ্য প্রমাণাদির শরণাপন্ন হয়েছি এবং তদনুসরণে উদ্দিষ্টে উপনীত হওয়ার প্রয়াস পেয়েছি। তবে কথা রয়েই যাবে যে, কাল-হিসেবের অঙ্ক-গণনায় উন্মেষ প্রতœপ্রাচীনত্বকে তেমন নিশ্চিত করে চিহ্নিতকরণ অদ্যাপি সম্ভব হয়ে ওঠেনি। সে যা হোক, প্রাসঙ্গিক জিজ্ঞাসাটি হলো- সেই প্রতœ-আদিমকালে আমাদের এতদঞ্চলে বসবাসকারী যে জনমনুষ, কী তাদের নৃতাত্তি¡ক জনতাত্তি¡ক পরিচয়? বিভিন্ন নৃবিজ্ঞানীর মতামত বিশ্লেষণ করে মোটামুটি এই রকমের সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যেতে পারে- ‘বস্তুত, বাংলাদেশে যে জন ও সংস্কৃতি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরিয়া গড়িয়া উঠিয়াছে, তাহার প্রায় সমগ্র মূল রূপায়ণই প্রধানত অ্যালপাইন ও আদি অস্টেলয়, এই দুইজনের লোকদের কীর্তি।’ (নীহাররঞ্জন রায়, ‘বাঙালীর ইতিহাস’, ১৯৫২, পৃ, ৫১ পৃ. ৪৩)। উদ্ধার করা তথ্য যে, প্রধানত তারা কোল ভীল মুণ্ডা গোষ্ঠীর মানুষ, সাধারণভাবে তারা ‘অনার্য’ নামে আখ্যাত। জাতিতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ নৃবিজ্ঞানীরা এযাবৎকাল যতটা অন্য অন্য উপকরণাদি আহরণে সমর্থ হয়েছেন, তৎসহ বিশেষ করেই যুক্ত হয়েছে তাদের ব্যবহৃত ভাষা। ভাষাবিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন যে, অতি প্রাচীন ঐসব মানুষের নিত্যকার মুখের ভাষা ছিল মুখ্যতই দ্রাবিড় গোষ্ঠীর ভাষা, সাধারণ নামপরিচিতিতে অনার্য ভাষা। প্রসঙ্গত উল্লেখ প্রয়োজন, বিশেষ বিশেষ মানব প্রজাতির উৎস- প্রাচীনত্বের সাক্ষ্য উদ্ধারের কাজে ভাষা-উপকরণ অতীব গুরুত্ববাহী, বহুল পরিমাণে তা পরিচিতি নির্ধারণের কাজ সাধন করে থাকে।

আমরা ইতিহাস পূর্ব কালের চেহারা অবলোকনে উদ্যোগী হব। তখনো কিন্তু উত্তর ভারত থেকে পূর্বাভিমুখে আর্য-আগমন এবং উপনিবেশ স্থাপনা অনাগত-ভবিষ্যৎ। এবং মোটামুটি ধরনের হলেও ভূগোল-সীমানা দিয়ে চিহ্নিত কিংবা বর্ণিত বিশেষ এতদঞ্চলের কোনোই নিশানা পাই না। তদপ্রকারের প্রয়োজনও দেখা হয়নি। আসলে শতাব্দীর পর শতাব্দী অতিক্রমণান্তে সেই জানাটা যে, পূর্ব দক্ষিণ প্রান্ত ছাড়িয়ে রয়েছে আকুল সমুদ্রের বিস্তার, তটে গাঙ্গেয় উপত্যকায় এ ভূখণ্ডাঞ্চল, তার উত্তর শীর্ষে পর্বতমালা হিমালয় এবং নদীমেঘলা প্রকৃতি- বৈচিত্র্যের আশীর্বাদপুষ্ট অতি উর্বর সে দেশভূখণ্ড। বর্তমান আলোচনায় মুখ্য কথাটা বর্ণিত জনপদে অধিবাসী জনমানুষদের প্রসঙ্গে। আগ্রহী আমাদের মোটামুটি জানা হয়েছে, কার্যকারণ বাস্তবতার নানার তাগিদে উত্তরাঞ্চল থেকে যুগ যুগ আর্যপ্রবাহ এসে উত্তরিত হয়েছে এতদঞ্চলে।

আবিষ্কারের অভিযানে নয়; স্বার্থ দ্ব›েদ্ব বিতাড়িত হয়ে কখনো বা নির্বাসিত হয়ে, এবং প্রধানতই জীবিকা সন্ধানের তাড়নায় এতদঞ্চলে আর্য-উপনিবেশ স্থাপনা। অবশ্যই সরলরৈখিক প্রক্রিয়ায় সে কর্মকাণ্ড ঘটেনি। অধিকতর শক্তিধর বহিরাগত তারা ক্রমে গ্রাস করে নিয়েছে। ফলত প্রায় ক্ষেত্রেই উৎখাত হয়েছে মূল আদিম জনগোষ্ঠী; কোথাও কাথাও বা সংঘাত-অন্তে মিশ্রণ সমন্বয়ে মিথষ্ক্রিয়া সাধিত হয়েছে- রক্তে বর্ণে সংস্কৃতিতে। সময়কাল সীমা পেছিয়ে ১৫০০ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ পর্যন্ত অনুমিত হয়ে থাকে। বিষয়টি এখানে সাধারণভাবে বর্ণনা করা গেল। এখন আমরা ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার থেকে উদ্ধৃত করব। মনে করি যে, তা থেকে আদ্যন্ত প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমাদের জানা অধিকতর স্পষ্ট হবে। তিনি এমন বিশেষ করে নির্দেশিত করেছেন- ‘বহু প্রাচীন প্রাগৈতিহাসিক যুগেও যে বাংলায় মনুষ্যের বসতি ছিল প্রতœপ্রস্তর, নব্যপ্রস্তর এবং তাম্রযুগের অস্ত্রশস্ত্র হইতে জানা যায়। সম্ভবত কোল, শবর, পুলিন্দ, হাড়ি, ডোম, চণ্ডাল প্রভৃতি জাতির পূর্বপুরুষরাই ছিল বাংলার আদিম অধিবাসী। ইহাদের সাধারণ সংজ্ঞা নিষাদ জাতি। ইহারা প্রধানত কৃষিকার্য দ্বারা জীবন ধারণ করিত ও গ্রামে বাস করিত। আরও কয়েকটি জাতি বঙ্গদেশে বাস করিত-ইহাদের ভাষা ছিল দ্রাবিড় ও ব্রহ্মতিব্বতীয়। ইহাদের পরে অপেক্ষাকৃত উন্নতর সভ্যতার অধিকারী এক শ্রেণির লোক বাংলাদেশে বাস করে। ইহাদের সহিত পরবর্তীকালে আর্যদেব মিশ্রণের ফলেই বর্তমান বাঙালি জাতির উৎপত্তি হইয়াছে, ইহাই প্রচলিত মত। (‘ভারত কোষ’ পঞ্চম খণ্ড, ১৯৭৩, পৃ. ৪. ৫)।’ এখন তবে প্রশ্ন আসবে-মোটামুটিভাবে কতো প্রাচীন কালাবধি ‘বঙ্গ’ জনের সাক্ষাৎ পাওয়া যায়? সেই জবাবে খ্রিস্টপূর্ব দশম-নবম অব্দ নাগাদ বৈদিক রচনা, রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদির উল্লেখ করব। গোড়াতে ছিল জনপরিচিতি সূচক নামটি বঙ্গজাতি-তাই থেকে জাত তাদের আবাসভূমি দেশবাচক সংজ্ঞা বা বঙ্গদেশ। (পূর্বের আলোচনায় এ প্রসঙ্গে বলা গেছে।) তখনো নয় কিন্তু যথার্থই এতদঞ্চলের মানুষের আর্যীকরণ। তবে প্রাক্কালীন সেইসব বাঙালি মানুষেরা যে সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে মোটেও পশ্চাৎপদ ছিল না ভূগর্ভ-খনন থেকে উদ্ধারকৃত নানান নিদর্শনে সে স্বাক্ষর রয়ে গেছে।

এই গেল জনপরিচিতির আদিপর্ব কথা। আমরা ইতিহাসের ধারা অনুসরণ করছি। সাধারণভাবে আর্যীকরণের এবং মিশ্রণের কর্মকাণ্ড প্রধানত পূর্বাপর খ্রিস্টীয় প্রথম সহস্রাব্দব্যাপী। প্রবাহ এসেছে আর্যাবর্ত উত্তরপথ থেকে, দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক অঞ্চল হোক, পার্শ্ববর্তী মগধ লোক। বহিরাগত জনগোষ্ঠী; তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ধর্ম-সংস্কার ইত্যাদির অনুপ্রবেশ সংঘাতে-বর্জনে-সমন্বয়ে এই বঙ্গদেশের কালবাহিত ভূমিজ তাবৎ উপকরণ উপাদানের সাথে। অতঃপর তাই থেকে একটি সংকর মানব প্রজাতির ‘হয়ে ওঠা’। নাম সংজ্ঞায় আসছে ‘বঙ্গাল’ শব্দপ্রত্যয়। হাজার বছরের পুরাণ বাংলা কবিতার পদে পাচ্ছি-‘বজ্রনৌকায় পাড়ি দিয়ে পদ্মা খালে বাওয়া হল, বঙ্গাল নামের দেশটি লুণ্ঠিত হল; পদকর্তা ভুসুক আরো বলেছেন ‘আজি ভুসুকু বঙ্গালী ভইলী।’

উল্লিখিত ঐ কালপর্বেই অবশ্যই সঙ্গীকরণের ইতিহাসের ইতি ঘটে যায়নি। পরবর্তীকালের ইতিহাস অধিকতর বিচিত্র; এবং জনপদের অন্তর প্রদেশ, প্রত্যন্ত প্রদেশ পর্যন্ত তা স¤প্রসারিত। উপমহাদেশ অঞ্চলের সীমানা ছাড়িয়ে কতো দূর-দূরান্ত থেকে এসেছে কতো না মানবগোষ্ঠী। নৃবৈশিষ্ট্যে, রক্তে, ভাষায়-সংস্কৃতিতে এবং আরো কতো না ভেদে প্রধানত তারা ছিল আরবীয়, আফগান ইরানি তুর্কি। পূর্বেকৃত আলোচনায় বলা গেছে-প্রথমত নৌ-বাণিজ্যের পশরা সাজিয়ে, সেই সাথে যুক্ত হয়েছিল সুফি দরবেশদের মাধ্যমে ইসলাম ধর্মের প্রচার। অতঃপর ক্রয়োদশ শতক থেকে সামরিক অভিযান, রাজ্যাধিকার বিস্তার। প্রথমাবধি প্রাসঙ্গিক প্রক্রিয়ার স্বরূপ সন্ধান দিচ্ছেন ড. মুহম্মদ এনামুল হক-‘খ্রীষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীর দিকে বাঙ্গালীর রক্তে এক নতুন মানব গোষ্ঠীর রক্ত মিশ্রিতে লাগিল। এই সময় হইতে সেমীয় (ংবসবঃরপ) গোত্রের লোক বাংলায় আসিতে থাকে। খলিফা হারুনুর রশীদের (৭৮৬-৮০৯) খ্রি) একটি মুদ্রা রাজশাহী জেলার পাহাড়পুরে আবিষ্কৃত হইয়া এই তথ্য প্রকাশ করিয়া দিতেছে। দেখা যায়, সেমীয় গোত্রের আরবেরা বাংলায় ধর্ম ও পণ্য প্রচার করিয়া বেড়াইতেছেন। আমীর বা সুলতানের অধীনে চট্টগ্রাম অঞ্চলে তাহাদের একটা ক্ষুদ্র শাসন ব্যবস্থাও (ঢ়ৎরহপরঢ়ধষরঃু) স্থাপিত হইয়াছে। সুলতান বায়িজীদ বস্তামী (মৃত্যু) ৮৭৪ খ্রি) মীর সৈয়দ সুলতান মাহমুদ মাহী সৈয়দ সুলতান মাহমুদ মাহী সরওয়ার (১০৪৭ খ্রি.) শাহ মুহম্মদ সুলতান রুমী (১০৫৩ খ্রি.) বাবা আদম শহীদ (১১১৯ খ্রি.) শাহ নিয়ামতুল্লাহ বুৎশিকন প্রভৃতি দরবেশ বাংলাদেশ ধর্ম প্রচার করিতেছেন। সেমীয় গ্রোত্রের লোককে অনুসরণ করিয়া আফ্রিকার নেগ্রিটো রক্তবাহী হাবশীরা অতঃপর এদেশে প্রবেশ করে। … ইহারাও বাঙালী রক্তের সহিত নেগ্রিটে রক্ত মিশাইয়া দিয়াছে।’ (মুসলিম বাঙ্গালা সাহিত্য; ১৯৫৭ খ্রি. ৩. ৪)।

এই অনুসরণে ড. হকের সিদ্ধান্ত যে, ‘নৃতাত্তি¡ক পরিভাষার কথা ছাড়িয়া দিয়া সহজভাবে ভাবিতে গেলে স্বীকার করিতে হয়, আধুনিক বাঙালি অনার্য, আর্য, (চবড়ঢ়ষব) -ঐ.পৃ.ঐ)। প্রক্রিয়ার এইখানেই সমাপ্তি নয়, সমগ্র মধ্যযুগ (১২০১-১৭৫৭ খ্রি.) জুড়েই তুর্কি অধিকারের আমলে, পাঠান আমলে, মোগল আমলে বহিরাগতদের সাথে নানা বাস্তব হেতুতেই বাংলাদেশের মানুষের রক্তের, সংস্কৃতির ধর্মের বিশ্বাস-সংস্কারের সংমিশ্রণ ঘটেছে। এবং প্রতিরোধ গ্রহণ বর্জন সমন্বয়ের ভেতর দিয়ে নতুনতর অবয়বের মানুষ নির্মিত হয়ে উঠেছে। ধারণা করা অসমীচীন নয় যে, এতদব্যতীত কোথাও কোথাও বর্মি, পর্তুগিজ, ডাচ্, আরমেনীয় মিশ্রণও ঘটেছে। এতদঞ্চলের কোনো কোনো জনপদের বাসিন্দা মানুষদের সংস্রবে একদা তাদের বসবাস ছিল অধ্যাবধি বেশ কয়েকটি স্থানের নাম সেই স্বাক্ষর বহন করে আসছে।

প্রশ্নটি কি তবে বিশেষ তাদের নিয়ে? স্বভাবতই জবাব যে, আমাদের বর্তমান উদ্দিষ্ট-সন্ধান শেষোক্ত প্রশ্নকেন্দ্রিক। এইখানে এই মতো করে পাল্টা চ্যালেঞ্জ আসতে পারে- আমরা যারা এক নির্দিষ্ট ভৌগোলিক বাসভূমে শত শত বংশপরম্পরায় শেকড়প্রোথিত অধিবাসী এবং ইতোমধ্যে আরো যারা আমাদের সাথে বিশ্বাসে, রক্তে, ঘনিষ্ঠ বন্ধনে সম্পর্কিত অভিবাসী জনগোষ্ঠী- আমাদের এখন কি তবে আপন পরিচিতির উচ্চকণ্ঠ ঘোষণা বিজ্ঞাপিত করতে হবে? জানা নেই, বিশ্বভুবনের কোথাও তেমন কৈফিয়ত বাধ্যবাধকতা রয়েছে কিনা যে, স্বদেশের জনমানুষকে আপন পরিচয়ের সন্ধান দিতে হয়, ঘটা করে জানান নিনাদিত করতে হয়।

ইতোপূর্বে আমাদের আপন দেশ এবং স্বদেশ রাষ্ট্র সম্পর্কিত বিষয়টির অবতারণা করা গেছে। প্রসঙ্গত পুনরায় বলে নিই, একদা আমাদের পিতৃপুরুষ প্রজন্মকে মাতৃভূমি, মাতৃভাষা, উত্তরাধিকার ইত্যাদি নিয়ে বেজায় বিভ্রান্তির মোকাবেলা করতে হয়েছিল। ইতিহাস পাঠক অবগত, উত্তর পশ্চিম, ভারতবর্ষের ওহাবি গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত আন্দোলিত করেছিল। ওহাবি প্রচারক মোল্লারা ফতোয়া দিয়েছিলেন- ইংরেজ শাসনের অধীনস্ত এই দেশ মুসলমানদের জন্য দারুল ইসলাম নয়, দারুল হরব। অতএব মোমিন মুসলমানের অবশ্য করণীয় দেশত্যাগ হিজরত করে মুসলিম শাসনের দেশ আফগানিস্তান, আরব, ইরান, তুরানে কোথাও চলে যাওয়া। সেই সময় গ্রাম বাংলার বেশ কিছু সংখ্যক মানুষ সরল বিশ্বাসে যথাযথ গৃহত্যাগ করেছিল। তারপর এলো বিশেষ করে নগরাঞ্চলে প্যান ইসলামাবাদের ডাক। উনিশ শতকের কলকাতায় তখন আশ্রয় নিয়েছেন ভারতের নানান কেন্দ্র থেকে আগত ক্ষমতাচ্যুত সাবেক নবাব-বাদশার ক্ষয়িষ্ণু বংশধর, সভাসদ পারিষদবৃন্দ। তাঁদের ভাষা, তাহজিব তমদ্দুন ইত্যাদি সমস্ত কিছুই সর্বাংশে বাঙালিত্বের বিপরীত এবং বিরোধী। শরাফতির দাবিতে তাঁরাই ছিলেন সমাজনেতৃত্বের ধ্বজাধারী। সবটা মিলিয়ে ফল যা হবার তাই হয়েছিল- আমাদের পিতৃপুুরুষের কপালে ঐ বিভ্রান্তির দুর্ভোগ : বাংলাদেশ ভূমি সন্তান বাঙালি মুসলমানের ওয়াতান স্বদেশ ঠিকানা কোথায় কোন পশ্চিমে; বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা কি বাংলা না উর্দু; ধর্মবিশ্বাসে বাঙালি মুসলমান প্রথমত বাঙালি না প্রথমত মুসলমান ইত্যাকার সৃজিত যতসব জটিলতা। ধর্মের পত্রিকার নামে ফতোয়া, উত্তপ্ত বাহাসের জের ছিল বিশ শতকের কয়েক দশক অবধি। সেই দুঃসময়ে সুস্থতার অভিযানে প্রতিরোধের প্রচারক গড়ে তুলেছিলেন মুক্তবুদ্ধির দুঃসাহসী কতিপয়, আমাদের পিতা-পিতামহ। আত্মপরিচয়ের সন্ধানে তাঁরা জনমত সংগঠনের উদ্যোগী হয়েছিলেন। উদ্যোগের মূলে তাঁদের অন্তর-বিশ্বাসের কিছু নিদর্শন এইখানে উদ্ধৃত করা যাচ্ছে :

ক. ‘আমরা বাঙ্গালা দেশের কথা বিশদরূপে বুঝি। বাঙালি বলিয়া নিজেদের পরিচয় দিয়া সস্তুষ্ট হই। সহস্র বৎসর যে দেশে বাস করিয়া আসিতেছি, যাহার শীত, গ্রীষ্ম, সৌভাগ্য দুর্ভাগ্য দুর্ভিক্ষ, সুখ সম্পদ, হর্ষ বিষাদ সমভাবে ভোগ করিয়া আসিতেছি, সে আমার স্বদেশ নহে, তাহার বাহিরে আবার আমার এক নিজের দেশ আছে, এ কথা কথাও কেহ মনে করিতে পারে না।’

-রেয়াজ অল দিন আহমদ, প্রচারক, আষাঢ় ১৩০৭ (১৯০০)

খ. ‘আমাদের মুসলমানদের ধমনীতে বিদেশীর রক্তও আছে, আর এদেশীয় রক্তও আছে; আর্যের রক্তও আছে, আর অনার্সের রক্তও আছে, তথাকথিত উচ্চ জাতীয় হিন্দুর রক্তও আছে, আর তথাকথিত নীচ জাতীয় হিন্দুর রক্তও আছে। এ সবকে নিয়েই আমাদের গৌরব করতে হবে, এখন আমরা হচ্ছি বাঙালি।’

-এস, ওয়াজেদ আলি, ‘বাঙালি মুসলমান’, নোয়খালী মুসলিম ইনস্টিটিউটের বার্ষিক অধিবেশনের সভাপতির ভাষণ, এপ্রিল, ১৯৩০

ঘ. ‘বাঙালিকে, বাঙালীর ছেলেমেয়েকে ছেলেবেলা থেকে শুধু এই এক মন্ত্র শেখাও :

‘এই পবিত্র বাংলাদেশ

বাঙালীর-আমাদের।

বাংলা বাঙালীর হোক। বাংলার জয় হোক।

বাঙালীর জয় হোক।’

-কাজী নজরুল ইসলাম, ‘বাঙালির বাংলা, নবযুগ, ৩ বৈশাখ, ১৩৪৯ (১৯৪২)

ঙ. ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশী সত্য আমরা বাঙালী। এটি কোনও আদর্শের কথা নয়, একটি একটি বাস্তব কথা। মা প্রকৃতি নিজের হাতে আমাদের চেহারায় ও ভাষায় বাঙালিত্বের এমন ছাপ মেরে দিয়েছেন যে, তা মালা-তিলক টিকিতে কিংবা টুপি-লুঙ্গি দাড়িতে ঢাকবার জোটি নেই।’

-মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে মূল সভাপতির ভাষণ, ৩১ ডিসেম্বর, ১৯৪৮।

খেয়ালে আনব উদ্ধৃতিসমূহ বিশ্লেষণ করে আমরা কী কী প্রত্যয়ের সাথে পরিচিত হই-

ক. স্বাদেশিকা, খ. মাতৃভাষা প্রেম, গ. শত সহস্র বর্ষব্যাপী মিশ্রিত রক্তের উত্তরাধিকার, ঘ. অসাম্প্রদায়িকতা এবং সবটা মিলিয়ে বাঙালিত্বের আর বাঙালির জয়।

এইখানে যুগপৎ লক্ষ করতে হবে নজরুল তাঁর আত্মবিশ্বাসের মন্ত্র ‘বাংলার জয় হোক’, ‘বাঙালির জয় হোক’ উচ্চারণ করছেন নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সা¤প্রদায়িক বিভাজনের ভিত্তিতে রচিত ‘লাহের প্রস্তাবে’র (পাকিস্তান প্রস্তাব) দু’বছরের মাথায়’-এবং ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ’র ঘোষণা ‘বেশী সত্য আমরা বাঙালি’ পাকিস্তান কায়েমের পরের বছরেই ডিসেম্বর মাসে। তখনো ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ আওয়াজটি সরকারি মাধ্যমে এবং রাজনৈতিক মুসলিম লীগের তাবৎ কর্মকাণ্ডের উদ্যোগে গগনবিদারী, সর্বত্রসঞ্চারী। কেবল প্রচারণা নয়, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায়, নিত্যকার বৈষয়িক জীবনে, সমাজদেহের রন্ধ্রে পরিকল্পিত মতলবে মস্তিষ্ক-ধোলাইয়ের সর্বগ্রাসী উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। আমাদেরকে বোঝানো হত ‘ঋরাব ঃযড়ঁংধহফ ুবধৎং ড়ভ ঢ়ধশরংঃধহ’ পাকিস্তানি কওমি ইত্তেহাদ, পাকিস্তানি তমদ্দুন-জবানের পবিত্রতা ইত্যাদি। তবে ইতিহাস যে, ঐ ১৯৪৮ থেকেই পূর্ব বাংলায় ভাষা-আন্দোলন দানা বাঁধতে থাকে, এবং বিস্ফোরণ ঘটল ১৯৫২’র ফেব্রুয়ারিতে। সচেতন জন অবগত যে, ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ দাবিটি সারা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া প্রতিবাদী প্রতিরোধী মিছিল-সমাবেশেই আবদ্ধ ছিল না; সহস্র লক্ষ কণ্ঠে বিশ্বাসদীপ্ত স্লোগানেই সবটা নয়, ঐ তিনটি শব্দের সীমানাকে ছাড়িয়ে তৃণমূলে শেকড়- বিস্তারী হচ্ছিল মহৎ এক প্রত্যয়। সেই প্রত্যয় মাতৃভাষার অধিকার চেতনার সাথে স্বতঃস্ফ‚র্ততায় আত্মিক ঘনিষ্ঠ সম্পর্কিত হয়ে উঠেছিল এতদঞ্চলের জন্যে সর্বমাত্রিকতায় স্বাধিকার চেতনা। প্রত্যক্ষত দৃশ্যমান ভাষা আন্দোলন; তবে বান-ডাকা ঐ প্রবাহের ফল্গুগভীরে বহমান ছিল আর্থ-রাজনৈতিক, আপন সাংস্কৃতিক স্বাধিকারবোধের উজ্জীবন। সবটা মিলিয়ে পাকিস্তানিত্বের আগ্রাসনের মোকাবিলায় বাঙালিত্বের উদ্বোধন। ১৯৪৭ আগস্ট ‘৪৭ থেকে ইতিহাস পাঠ করে যাব। পঞ্চাশের দশকের, ষাটের দশকের, এবং ১৯৭১ মার্চ অবধি। তাই থেকে জানা হয়ে যাবে-ভাষা-আন্দোলন, পাশাপাশি রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী উদযাপন, বাংলা সনের পয়লা বৈশাখ অনুষ্ঠান; এবং চট্টগ্রাম (’৫২) কুমিল্লায় (’৫২) সংস্কৃতি সম্মেলন-এইসব কোন সড়কে মোড় নিচ্ছে; আর সেই সাথে স্টাবলিশমেন্ট-বিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন। সব নদী মিশে গেল ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সাথে সঙ্গমে। অতঃপর মুক্তিযুদ্ধ ’৭১, এবং বিজয় ’৭১। স্বাধীন সার্বভৌম নবীন রাষ্ট্রের অভ্যুদয়, নাম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ।

এখন বলতে চাই যে, এ কেবল ঘটনা-পরম্পরায় ধারাবাহিকতায় বর্ণনা মাত্র নয়। বর্ণিত সমুদয় থেকে আবিষ্কার-চিহ্নিত করে নেব মূল কাজ করে গেছে কোন সে আপসহীন, মৃত্যুঞ্জয়ী প্রেরণা-প্রথমাবধিই। আমাদের সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক প্রতিরোধ আন্দোলন এবং শেষ সীমান্তের রণাঙ্গনে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে। মাতৃভূমির সৎ সুসন্তান মাত্রেরই ঈমানে অভিজ্ঞতায় তা জানা। ’৪৮ থেকে ’৭১ দেশ ভূখণ্ড থেকে রাষ্ট্র বাংলাদেশকে সম্ভব করেছে সেই মহৎ প্রত্যয়ে জীবন-উৎসর্গ দীক্ষা, নজরুল উচ্চারিত মন্ত্রটি ‘বাংলা বাঙালির হোক। বাংলার জয় হোক। বাঙালির জয় হোক। আত্মার গভীর থেকে উদগত প্রত্যয়-প্রেরণা শেষাবধি কি সাধন করতে সমর্থ বিশ্ব ইতিহাস থেকে নির্বাচিত তিনটি নজির এখানে উপস্থাপিত কবর: এক. ১৭৭৬-এ মার্কিন দেশে উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ ওহফবঢ়বহফবহপব; দ্বিতীয়, ১৭৮৯ তে ফরাসি দেশে ‘সাম্য মৈত্রী স্বাধীনতা’র ফরাসি বিপ্লব’; এবং তৃতীয়ত, ১৯৪২-এ ভারতবর্ষে মহাত্মা গান্ধীর আগস্ট অভ্যুত্থানের ডাক ‘করেঙ্গে হয়ে মরেঙ্গে’। এই সাথে এখন যোগ করি বাংলাদেশের ইতিহাস-নিয়তির নির্দেশ। ইতোমধ্যে তিনি সাত কোটি মানুষের কণ্ঠস্বর, বঙ্গবন্ধু-প্রতীকে উত্তরিত, শেখ মুজিবুর রহমান উচ্চারণ করলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের মানুষেরা ওংষধসরপ জবঢ়ঁনষরপ ড়ভ চধশরংঃধহ রাষ্ট্রটি মানি না, ধর্মের নামে সৃষ্ট ঐ কৃত্রিম রাষ্ট্রের আনুগত্য ছিন্ন করলাম। আমরা মাতৃভূমি বাংলার জয় ঘোষণা করি।’ এবং আরো-ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার সময় বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা।’ কেন বিস্মৃত হব স্বদেশ মাতৃভূমি নিয়ে, মাতৃভাষা নিয়ে তথা বাঙালিত্বের আত্মচেতনা প্রসঙ্গে পিতা-পিতামহের বিশ্বাস উত্তর-প্রজন্মের কোটি সন্তান প্রতিধ্বনিত করেছিল ঐ প্রতীক-পুরুষের অবলম্বনে।

আমরা আমাদের বাঙালিত্ব আত্মপরিচয়ের গর্বাহঙ্কারকে, এবং দুঃসাহসী দুর্জয় শক্তির শেকড়-মূল চিহ্নিত করতে চাইছি। ধরা যাক যদি না ’৬৯-এ গণঅভ্যুত্থান, যদি না ’৭১-এ মুক্তিযুদ্ধ তবে অন্ত-নাই ভবিষ্যৎ কতো কাল এই দেশের কোটি মানুষের বংশপরম্পরায় পাকিস্তানি বন্দিখানায় দাসের পশুজীবন। মুক্তিযোদ্ধারা ‘জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য চিত্ত ভাবনাহীন’ এই যুদ্ধ লড়েছে; নয় মাসের জাহলিয়াৎ-এর দুঃসময়ে দেশব্যাপী বিজয়ের আশায় বুক বেঁধে জীবনকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। কালের পাতায় উৎকীর্ণ রয়েছে শক্তি প্রেরণার সেই আশার জীয়ৎ মন্ত্র-‘জাগো জগো বাঙালি জাগো’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর/বাংলাদেশ স্বাধীন কর’-এই প্রকারের আরো সব। ইতিহাস যদি ’৭১ মুক্তিযুদ্ধের স্বর্গফসল মুক্ত স্বাধীন বাংলাদেশ, লক্ষ করতেই হবে, মরণপণ শপথ উচ্চারণে বারবার আসছে ‘বাংলাদেশ’ বাঙ্গালি’ এই দুটি প্রত্যয় অঙ্গে-আত্মায় অবিচ্ছেদ্য মেশামেশি হয়ে। এর গণিত শাস্ত্রের অঙ্ক মেলানো কিংবা ন্যায়শাস্ত্রের উপপাদ্য-মীমাংসা নয়। বিশেষ করেই ’৬৯-’৭১-এর দেশকাল অভিজ্ঞতায় প্রত্যাবর্তন করব; তবে জেনে যাব, বাংলাদেশ-বাঙালিত্বের চেতনা কতো গভীরে, কতো বিস্তার ব্যাপকতায় কাজ করে গেছে; এবং তদজাত ইতিহাসের শেষ সাক্ষ্য আগ্রাসী ঔপনিবেশিক পাকিস্তানিত্বকে হটিয়ে মুক্তিযুদ্ধে বাঙালির বিজয়। অতএব স্বাধীন স্বার্বভৌম রাষ্ট্র গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ১৯৭২ সংবিধানে স্বভাবতই নির্দেশিত রয়েছে- ‘বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে; বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে; বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙ্গালি বলিয়া পরিগণিত হইবেন।’ (এক্ষেত্রে ১৯৭৮-এ যে সংশোধন, সামরিক আইন প্রশাসকের ঘোষণাবলে (গধৎরঃরধষ খধি চৎড়পষধসধঃরড়হ) তা করা হয়েছিল। নির্বাচিত গণপ্রতিনিধির সংসদের সম্মতি অনুমোদন নয়।)

এতাবৎকাল ছিল চারিপার্শ্বে বিভাজন-সীমানা বেষ্টিত একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের অধিবাসী সাধারণ, নাম-পরিচিতিতে তারা বাঙালি। এবং অবশ্য হাজার বছরের ঐতিহ্য-বহমানতায়, নানা বংশরক্তের সংমিশ্রণ-ধারাবাহিকতায় আর ভাষা-সংস্কৃতির সংকর উত্তরাধিকারে ঋদ্ধ বিশেষ সেই বাঙালি জনগোষ্ঠী। অতঃপর ’৭১ মুক্তিযুদ্ধে বিজয় থেকে আহৃত, সংযোজিত হলো রাষ্ট্রীয় নাগরিকত্বের পরিচিতি অভিধা ‘বাঙালি’।

ইতোমধ্যে অবশ্য জানা গেছে, ‘বাংলাদেশ’ নামক ভূগোল-প্রতীতী কী ব্যঞ্জনা বহন করে এবং হাজার বছর ধরে বহমান উত্তরাধিকার ঐ জনপদ সন্তানের জন্যে বাঙালিত্বের আত্মপরিচিতি কেমন নিয়তিসিদ্ধ।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj