সুশাসনের জন্য প্রয়োজন নৈতিক ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ : ড. মনওয়ার সাগর

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

মানব সমাজে সভ্যতার ক্রমবিকাশে শুভবুদ্ধি ও কল্যাণকামী মানুষের বড় ভূমিকা ছিল। ধর্ম-অধর্ম, ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যা আর কল্যাণ-অকল্যাণের নিরন্তর অন্তর্ঘাতে শুভবুদ্ধি কিংবা সুচিন্তা শান্তিকামীদের তাড়িত করত। ধর্মীয় অনুশাসন ও প্রগতিশীল নির্দেশাবলী শুদ্ধাচারের চেতনাবোধকে আরও বহুমাত্রায় বেগবান করেছে। সব ধর্মেই শুভবুদ্ধি ও সুচিন্তার মতো মূল্যবোধকে শান্তি ও কল্যাণের শক্তিশালী মাপকাঠি সাব্যস্ত করা হয়েছে। বুদ্ধিবৃত্তি সম্পন্ন চিন্তাশীল মানুষের শুভবুদ্ধি ও সুবিবেচনার মতো বিষয়গুলোকে কাজে লাগিয়েই সচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আইনের শাসন এর যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, অর্থনৈতিক মূল্যবোধ, সামাজিক মূল্যবোধ, নান্দনিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় মূল্যবোধ, আদর্শিক ও নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে সভ্য সমাজের মানদণ্ড হলো আইনের শাসন, জাতীয় উন্নতির চাবিকাঠি হচ্ছে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, গণতন্ত্র থেকে উৎসারিত যে মূল্যবোধ তাকেই আমরা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বলতে পারি, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এর মাধ্যমেই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে প্রয়োজন সহনশীলতা। মানুষ আজন্ম পরিচিত যে মূল্যবোধের সাথে এবং সামাজিক যে সব রীতিনীতি ও আচরণ কালক্রমে নৈতিক ও সামাজিক নিয়মে পরিণত হয় সেগুলোই সামাজিক মূল্যবোধ। যেমন বড়দের শ্রদ্ধা ও ছোটদের স্নেহ করার পাশাপাশি সামাজিক বন্ধন অটুট রাখা। মানব মনের সুকোমল বৃত্তি প্রকাশের মূল্যবোধকেও সামাজিক মূল্যবোধ বলা যায়, সুকুমার বৃত্তির সমষ্টি, সাম্য, ভ্রাতৃত্ববোধ, মমত্ববোধ প্রভৃতি গুণের বিকাশে ভূমিকা রাখে সামাজিক মূল্যবোধ, সামাজিক মূল্যবোধের ভিত্তি হলো শিষ্টাচার, সততা ও ন্যায়পরায়ণতা। মানুষের মনোজগতকে নিয়ন্ত্রণ করে নৈতিকতা। বিবেক, চিন্তা, বুদ্ধি ও ন্যায়পরায়ণতা হচ্ছে নৈতিকতার উৎস, নৈতিকতা পরিচালিত হয় সামাজিক বিবেকের দ্বারা। মানুষের কাজের মানদণ্ড- মূল্যবোধ, মানুষের আচার-আচরণকে পরিমাপ ও নিয়ন্ত্রণ করে মূল্যবোধ, যিনি সততার সাথে দায়িত্ব পালনে ব্রত থাকেন তাকে মূল্যবোধ সম্পন্ন মানুষ বলে। মূল্যবোধ নির্ধারিত হয় নৈতিকতার দ্বারা, নৈতিকতা একটি মানসিক বিষয়, নৈতিকতা ও নীতিবোধের বিকাশ ঘটায়- ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, উচিত-অনুচিত বোধ। নৈতিকতা বিকাশের লালনক্ষেত্র হচ্ছে সমাজ।

মূল্যবোধ হতে পারে- নৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক রাষ্ট্রীয় প্রভৃতি। ধর্মীয় জীবনযাপনের দিক থেকে যেসব মূল্যবোধ- যেমন বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসরত ভিন্ন ভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা নিজ ধর্ম পালন করে অপরের ধর্ম পালনকে বাধাগ্রস্ত করে না, অর্থাৎ “ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার” নীতি মেনে চলে, এটি একটি মূল্যবোধ। আবার, যখন এই মূল্যবোধের অবক্ষয় দেখা দেবে, তখনি ধর্মীয় ও সা¤প্রদায়িক সহিংসতা দেখা দেবে, ধর্মও কিছু কিছু মূল্যবোধের নির্দেশনা প্রদান করে, সেগুলোও ধর্মীয় মূল্যবোধ। যেমন : বাবা-মার সেবা করা, কারো কুৎসা রটনা না করে, অভাবগ্রস্তকে সহায়তা করা প্রভৃতি। রাষ্ট্রের আইনকানুন ও পরিচালনা ব্যবস্থা তথা সংবিধানের নির্দেশনার আলোকে যেসব মূল্যবোধ গড়ে ওঠে সেগুলোই রাষ্ট্রীয় মূল্যবোধ। যেমন- পরমতসহিষ্ণুতা, অন্যের অধিকারে হস্তক্ষেপ না করা, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ ও নাগরিক দায়িত্ব পালন প্রভৃতি। রাজনৈতিক মূল্যবোধ বলতে কিছু রাজনৈতিক আচরণকে বোঝায়, যেগুলো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে রাজনীতি চর্চাকে স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করে। সবার সমানাধিকার তথা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং রাজনীতিকে দেশের জন্য ও মানুষের জন্য কল্যাণকর করে তোলা, দেশের স্বার্থকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়া তথা “ব্যক্তির চেয়ে দল বড় দলের চেয়ে দেশ বড়” নীতি অবলম্বন, দেশের সার্বভৌমত্ব, ইতিহাস ঐতিহ্য (বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন-মুক্তিযুদ্ধ) প্রভৃতিকে ধারণ-লালন ও বিস্তৃতি ঘটানো প্রভৃতি।

মূল্যবোধ গড়ে ওঠার পেছনে যেসব সহায়ক কাজ করে তাহলো- পরিবার, ধর্ম, সামাজিক রীতিনীতি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আইনকানুন, সংবিধান, সংস্কৃতি, নীতিবোধের চর্চা, সংগঠন ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান, সভা-সমিতি, সামাজিক ন্যায়বিচার, আইনের শাসন, সামাজিক অনুষ্ঠান, নাগরিক চেতনা, সুষ্ঠু রাজনীতি চর্চা, সামাজিক শিক্ষা।

মূল্যবোধের উপাদানগুলো হলো- নীতি ও ঔচিত্যবোধ, সামাজিক ন্যায়বিচার, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, পরমতসহিষ্ণুতা, শ্রমের মর্যাদা, দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ, রাষ্ট্রীয় আনুগত্য, আইনের শাসন, নৈতিকতা ইত্যাদি। নৈতিকতা (গড়ৎধষরঃু) তাহলে কি? যে গুণ মানুষকে অন্যায় হতে বিরত রাখে এবং ন্যায় কাজে নিয়োজিত করে, তাই নৈতিকতা। নৈতিকতার ইংরেজি প্রতিশব্দ ল্যাটিন শব্দ গড়ৎধষরঃধং থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘সঠিক আচরণ’ বা চরিত্র। নীতিবিদ ম্যূর বলেন, ‘শুভ’র প্রতি অনুরাগ ও ‘অশুভ’র প্রতি বিরাগই হচ্ছে নৈতিকতা, প্লেটোর মতে- ‘নৈতিকত হলো- প্রত্যেকের নিজ দায়িত্ব- কর্তব্য পালন করা এবং অন্যের কর্তব্য পালনে বাধা সৃষ্টি না করা’। নৈতিকতা সামাজিকভাবে স্বীকৃত গুণ, তবে নৈতিকতা বাধ্যবাধকতা আরোপযোগ্য নয়, নৈতিকতাকে আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। এসব মূল্যবোধসমূহ বাস্তবায়ন করতে হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য : নৈতিক ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ।

সুশাসন একটি আধুনিক ধারণা। জনগণের অংশগ্রহণমূলক প্রতিষ্ঠিত আইনের শাসন ও অবাধ তথ্যপ্রবাহের সাথে সাথে জনগণের উন্নত সেবা পাওয়ার অধিকার হলো সুশাসন। প্রশাসনের জবাবদিহিতা, বৈধতা, স্বচ্ছতা অংশগ্রহণের সুযোগ, উন্মুক্ত, বাকস্বাধীনতাসহ সকল রাজনৈতিক স্বাধীনতা, সুরক্ষিত ও স্বাধীন বিচার বিভাগ, আইনের শাসনের উপস্থিতি, আইনসভার নিকট শাসন বিভাগের জবাবদিহিতার নীতি কার্যকর থাকলে সে শাসন ব্যবস্থাকে সুশাসন বলা যায়। সুশাসনের অন্যতম শর্ত-শাসক ও শাসিতের মধ্যে সুসম্পর্ক, স্বাধীন বিচার বিভাগ ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা, সরকারের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং অংশগ্রহণের ভিত্তিতে পরিচালিত শাসন ব্যবস্থা। ম্যাককরনী’র মতে, ‘সুশাসন বলতে রাষ্ট্রের সাথে সুশীল সমাজের, সরকারের সাথে শাসিত জনগণের, শাসকের সাথে শাসিতের সম্পর্ককে বোঝায়। সুশাসনের মূল লক্ষ্য আইন, বিচার ও শাসন বিভাগের মধ্যে সমন্বয় সাধন এবং শাসক ও শাসিতের সম্পর্ককে ভারসাম্যপূর্ণ ও কল্যাণকর করা।

সুশাসন এর ইংরেজি প্রতিশব্দ এড়ড়ফ মড়াবৎহধহপব. যার অর্থ নির্ভুল, দক্ষ ও কার্যকরী শাসন। সুশাসনের বৈশিষ্ট্যগুলো হচ্ছে- স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা, স্বাধীন প্রচার মাধ্যমে, দুর্নীতিমুক্ত অংশগ্রহণমূলক, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, জনবান্ধব প্রশাসন, জীবন ঘনিষ্ঠ ও কল্যাণমূলক, সমতা, জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা, দক্ষতা।

বিবর্তনের বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণার সাথে সুশাসন ধারণাটি বিস্তৃতি লাভ করেছে। কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে-রাষ্ট্র জনগণের বন্ধু ও পরিচালকে পরিণত হয়েছে। এখন রাষ্ট্রের মুখ্য লক্ষ্য হয় জনগণের কল্যাণসাধন। এজন্য প্রয়োজন হয় সুশাসনের। সুশাসন হলো শাসন ব্যবস্থার উন্নতর ধারণা ও নবতর সংস্করণ। ১৯৮৯ সালে বিশ্বব্যাংক শাসন শব্দের পূর্বে সু-প্রত্যয় যোগ করে সুশাসন ধারণার উদ্ভব ঘটায়, যার অর্থ- নির্ভুল, দক্ষ ও কার্যকরী শাসন। ২০০০ সালে বিশ্বব্যাংক সুশাসনের চারটি স্তরের কথা উল্লেখ করে। যথা- ১. দায়িত্বশীলতা; ২. স্বচ্ছতা; ৩. আইন কাঠামো ও ৪. অংশগ্রহণ।

আধুনিক কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে সামাজিক ও জাতীয় আদর্শ গঠন এবং ব্যক্তিগত ও নাগরিক জীবনে সুশাসনের গুরুত্ব অপরিসীম। আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নয়ন এবং জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য সুশাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়নশীল দেশসমূহে দীর্ঘদিনের উপনিবেশিক শোষণ, স্বৈরশাসন, সামরিক শাসন প্রভৃতি হতে পরিত্রাণের উদ্দেশ্যে সুশাসনের বিকল্প নেই। জনগণকে ন্যায্য অধিকার প্রদান সমাজে সাম্য, ন্যায়বিচার, জীবন ঘনিষ্ঠ ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সুশাসন অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে সুশাসনের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুশাসনের মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা যায়। উৎকৃষ্ট নাগরিক জীবন গঠন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সুশাসন কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। সুশাসনের প্রভাবেই নাগরিক সততা ও সতর্কতার সাথে ভোটদান ও প্রার্থী বাছাই করতে পারে যা রাষ্ট্রীয় উন্নতির বুনিয়াদ হিসেবে কাজ করে। জাতীয় ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে জনগণ অংশগ্রহণ করতে পরে যা রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সৃষ্টি করে। ফলে জাতীয় উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা সম্ভব হয়।

সুশাসন রাষ্ট্র ও সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে। সুশাসনের বেশ কিছু সুফল রয়েছে যেমন : সুশাসন সমাজ ও রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা দূর করতে সাহায্য করে, সামাজিক স¤প্রীতি গড়ে তোলে, জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নিশ্চয়তা প্রদান করতে পারে, রাষ্ট্রের শাসক, শাসিত ও সুশীল সমাজের মধ্যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে, জাতীয় জীবনে সমৃদ্ধি আনয়ন করে, নাগরিক অধিকারকে অধিক গুরুত্ব দেয় এবং কোনো কারণেই যেন অধিকার খর্ব না হয় সেদিকে দৃষ্টি রাখে। সুশাসন দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও জনগণকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সম্পৃক্ত করে। সুশাসন জনগণকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্পৃক্ত করে, জাতীয় উন্নতিকে বাধামুক্ত রাখতে সহায়তা করে। সুশাসনের প্রভাবে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন, জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়।

অন্যদিকে সুশাসনের অভাব দেশের মেধা সম্পদের অপচয় ঘটায় ও জাতীয় উন্নয়নে বাধার সৃষ্টি করে। সুশাসনের অভাবকে জিইয়ে রেখে ব্যক্তিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তথা জাতীয় উন্নয়ন সম্ভব নয়। সামাজিক স¤প্রীতি গড়ে তোলা ও বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। সন্তান-সন্তুতিকে শিক্ষা প্রদান, রুচিশীল ও সংস্কৃতিমনা করে গড়ে তোলা সম্ভব হয় না। সমাজ ও রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয় না। নাগরিক অধিকার ভোগে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয় ও প্রার্থী সততা ও সততার সাথে ভোটাধিকার প্রয়োগ ও প্রার্থী বাছাই করতে পারে না। জনগণ ও প্রার্থী বাছাই করতে পারে না। জনগণ স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে পারে না। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনষ্টের সাথে সাথে অর্থনৈতিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। মানুষের মনোবল ভেঙে যায়, হতোদ্যম ও নিরাশ হয়ে পড়ে। সুশাসনের বড় অন্তরায় দুর্নীতি, রাষ্ট্রের প্রাণশক্তিতে নিঃশেষ করছে দুর্নীতির রাহুগ্রাস, সম্পদের অপচয় হয়, বণ্টনে অসমতা সৃষ্টি এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে দুর্নীতির কারণে, রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করে।

এতোক্ষণ ধরে সুশাসন নিয়ে আলোচনা করলাম, সুশাসনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলোও আলোচনা করলাম। আমি মনে করি সুশাসনের জন্য প্রয়োজন নৈতিক ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করা এবং সামাজিক ও গণমাধ্যমের যৌক্তিক স্বাধীনতা। ‘যৌক্তিক স্বাধীনতা’ এজন্য বললাম যে, অবাধ স্বাধীনতায় অনেক সময় স্বেচ্ছাচারিতা এসে যায়। যা ব্যক্তি, জনগণ, সমাজ, রাষ্ট্র সকলের জন্য ক্ষতিকর। তবে আমাদের মনে রাখা দরকার এ যৌক্তিক স্বাধীনতা বা সরকারের পক্ষে যৌক্তিক বাধানিষেধের যদি সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা না থাকে তাহলে যখন যে সরকার আসবে সে সরকার তাদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা দিয়ে নিবর্তনমূলক আইনের মতো প্রয়োগ ঘটাবে, আবার এও মনে রাখতে হবে যে, এ যৌক্তিক স্বাধীনতা যেন আমাদের সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়। এ জন্য যে কোনো সরকারের উচিত এ সংক্রান্ত কোনো আইন বা নীতিমালা অনুমোদনের আগে সংবিধান বিশেষজ্ঞ, মিডিয়া সংশ্লিষ্ট ও সচেতন নাগরিকদের মতামত গ্রহণ করা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, মিডিয়া সংশ্লিষ্ট ও সচেতন নাগরিকদের প্রবল আপত্তির মুখেও ৭ আগস্ট জাতীয় স¤প্রচার নীতিমালা ২০১৪ অনুমোদন লাভ করেছে। সরকার পক্ষ থেকে এর সমর্থনে যেমন বিভিন্ন যুক্তি হাজির করা হয়েছে, তেমনি নাগরিকদের পক্ষ থেকেও এর ক্ষতিকারক দিকগুলো নিয়ে পত্রিকায়, সভায় ও আলোচনা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, এখনো সময় আছে সরকারকে এর পরিবর্তন বা সংশোধন নিয়ে প্রস্তাবনা দেয়ার। টিআইবির পক্ষ থেকে এই নীতিমালার সমালোচনার পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাবনাও দেয়া হয়েছে। কিন্তু আইনের সংশোধনী প্রকাশের পর, তাতে মিডিয়া, সচেতন নাগরিক ও টিআইবির প্রস্তাবনার কোনোকিছুই সংযোজন করা হয়নি।

অথচ কল্যাণমূলক রাষ্ট্রের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক নির্ধারণে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে আমূল পরিবর্তন এসেছে। আমাদের সরকারও বিগত সময়গুলোয় বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে, তারা জনগণের কল্যাণের সরকার। এ কথার সূত্র ধরে বলা যায়, নব্বই-পরবর্তী সরকারগুলোর আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও পরিবর্তন এসেছে। কিন্তু ক্ষমতা দখলের রাজনীতিতে মাঝেমধ্যেই এর ব্যতিক্রম চোখে পড়ে। অতিরিক্ত ক্ষমতা কুক্ষিগত হলে কোনো সরকারই সমালোচনা সহ্য করতে পারে না। এ কারণে সরকার নিবর্তনমূলক আইনের মাধ্যমে প্রথমে খড়গহস্ত হয় নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর। তেমনই সা¤প্রতিক একটি আইন হলো, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬, যার পুনঃপুনঃ অপ্রয়োগ দৃষ্টিকটুভাবে দৃশ্যমান। জাতীয় স¤প্রচার নীতিমালা ২০১৪ তেমনই স্রোতের বিপরীতে যাওয়া অপরাপর নিবর্তনমূলক আইনে নতুন সংযোজন মাত্র। ২০১৩ সালে আমরা দেখেছি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬-এর কতিপয় ধারা সংশোধন করে এটিকে আরো দুর্বিষহ একটি আইনে পরিণত করা হয়েছে। সেই আইনের ৫৭ ধারার একটি কালো ছায়া যেন এই স¤প্রচার নীতিমালায়ও পড়েছে। ৫৭ ধারায় অনেক বিষয়কে একসঙ্গে সংযুক্ত করতে গিয়ে এটিকে তালগোল পাকিয়ে ফেলা হয়েছে।

আমাদের দেশে আইন প্রণয়ন যতটা না নাগরিকের মৌলিক অধিকার বিকাশের উদ্দেশ্যে করা হয়, তার চেয়েও বেশি হলো নিয়ন্ত্রণের জন্য। ফলে নাগরিকদের মধ্যেও আইন মেনে চলার সংস্কৃতি সেভাবে বিকাশ ঘটছে না। নব্বই-পরবর্তী নৈর্বাচনিক স্বৈরতন্ত্র চালু থাকার কারণে নাগরিকের মতপ্রকাশের অধিকার ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়েছে, যা মূলত বিভিন্নভাবে স্বৈরতন্ত্র বিকাশের সহায়ক হয়েছে। আমাদের নিবর্তনমূলক আইনের বিপরীতে একমাত্র রক্ষাকবচ হলো সংবিধান। কিন্তু স¤প্রচার নীতিমালায় খুব কৌশলে এমন সব ব্যাখ্যা হাজির করা হয়েছে, যার মাধ্যমে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা প্রতিপালনের ব্যর্থ চেষ্টা পরিলক্ষিত হয়। আমাদের অবস্থা এখন পুলিশের হাতে মার খেয়ে পুলিশের কাছে নিরাপত্তা চাওয়ার মতো। স্বয়ং সংবিধান যেখানে ক্ষেত্রবিশেষে পরিষ্কার ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ, সেখানে সংবিধানে আশ্রয় খোঁজা কতটুকু কার্যকর হবে তা সহজেই অনুমেয়। বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করা যাক, সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ আমাদের চিন্তা, বিবেক ও বাকস্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে। স¤প্রচার নীতিমালার বিভিন্ন অনুচ্ছেদে এর হুবহু প্রয়োগ দেখা যায়। ৩৯ অনুচ্ছেদ থেকে দেখা যায়, বাকস্বাধীনতা কোনো অবারিত স্বাধীনতা নয়, এখানে কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে আইন দ্বারা যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ আরোপের সুযোগ রাখা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, এই যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ কে নির্ধারণ করবে? যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকবে, সেই সরকারের কাছে যা যুক্তিসঙ্গত মনে হবে, সেইমতে বাধা-নিষেধ আরোপ করা হবে। এখানেই ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এবং এই সুযোগে নতুন নতুন নিবর্তনমূলক আইন প্রণয়নের পথ তৈরি হয়েছে। স¤প্রচার নীতিমালায় যেসব বিধি-নিষেধ আরোপ করা হয়েছে, তা আদৌ যুক্তিসঙ্গত কিনা, সে প্রশ্ন থেকেই যায়। তাছাড়া রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সব সময়ই নিবর্তনমূলক আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে একটি মোক্ষম হাতিয়ার। এ যাবৎকালে ব্যক্তিমালিকানাধীন টেলিভিশন চ্যানেলগুলো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, সে রকম কোনো কাজে লিপ্ত ছিল না বা তাদের বিরুদ্ধে এ অভিযোগে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে শোনা যায়নি।

নীতিমালার শুরুতে এর পটভূমি ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যাতে বলা হয়েছে- অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে একটি স্বাধীন, বহুমুখী, দায়বদ্ধ ও দায়িত্বশীল স¤প্রচার ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং বাংলাদেশের স¤প্রচার মাধ্যমগুলোকে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় আনার জন্য এ নীতিমালা প্রণীত হয়েছে। অথচ এই নীতিমালা অনুমোদন পাওয়ার পর থেকে অংশীজনদের প্রতিবাদ শোনা যাচ্ছে সবচেয়ে বেশি।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে স¤প্রচার নীতিমালা আছে, কিন্তু সেখানে স¤প্রচারের বিষয় নিয়ন্ত্রণের কোনো বিধান নেই। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের স¤প্রচার নীতিমালার কথা ধরা যাক, কমিউনিকেশন এক্টের ৩২৬ নং ধারায় বলা হয়েছে, সরকার স¤প্রচারের বিষয়াদিতে কোনো নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে পারবে না এবং স¤প্রচারের স্বাধীনতা ক্ষুণœ করতে পারবে না। যুক্তরাজ্যের আইনেও একই রকম নীতির প্রতিফলন দেখা যায়। ক্ষেত্রবিশেষে কোনো বিশেষ বিষয়ের স¤প্রচারে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও স¤প্রচার মাধ্যম কী স¤প্রচার করবে, সে সম্পর্কে কোনো বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়নি। স¤প্রচার মাধ্যম সরকারি ভাষ্যের পাশাপাশি বিকল্প তথ্যসূত্র হিসেবে কাজ করে। এই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা যে কোনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি, অন্যথায় একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। ‘বোবার শত্রু থাকে না’ প্রবাদটির মধ্যে এক ধরনের সত্যতা আছে। কিন্তু স¤প্রচার কিংবা সংবাদ মাধ্যমের যদি শত্রুবিহীন পথ চলার ব্যবস্থা করতে হয় তাহলে তাদের স¤প্রচার বন্ধ করাই হবে একমাত্র পথ। অন্যথায় তাদের স¤প্রচারের কারণে কেউ না কেউ মনোক্ষুণœ হবেন- এটি নিশ্চিত। আমরা আশা করব, যে কোনো সরকার জাতীয় পর্যায়ে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করার নীতিমালা থেকে সরে আসবে এবং গণতন্ত্র বিকাশের পথে হাঁটবে।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা এবং পেশাদার বিবেচনার সাথে বৃহত্তর জনমতের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ নিশ্চিত করা যে কোনো উন্নয়নকামী সমাজের উদ্দেশ্য। লক্ষণীয় যে প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণে কতটা কার্যকর হবে তা সমাজের ভূমিকার ওপর বহুলাংশে নির্ভর করে। যতœবান না হলে প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণ সাধন না করে ক্ষতির কারণও হতে পারে। ফলে জ্ঞানচর্চায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিবর্গের কঠোর পরিশ্রমের সুফল সমাজের কাছে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে বৃহত্তর পরিসরে প্রযুক্তিকে মূল্যায়ন করার প্রয়োজন পড়ে। একই সাথে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা যাতে করে সমাজ থেকে অণুপ্রেরণা গ্রহণ করতে পারে সেটাও নিশ্চিত হওয়া দরকার।

জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা এবং পেশাদার বিবেচনার সাথে বৃহত্তর জনমতের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ নিশ্চিত করা যে কোনো উন্নয়নকামী সমাজের উদ্দেশ্য। লক্ষণীয় যে প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণে কতটা কার্যকর হবে তা সমাজের ভূমিকার ওপর বহুলাংশে নির্ভর করে। যতœবান না হলে প্রযুক্তি মানুষের কল্যাণ সাধন না করে ক্ষতির কারণও হতে পারে। ফলে জ্ঞানচর্চায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তিবর্গের কঠোর পরিশ্রমের সুফল সমাজের কাছে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে বৃৃহত্তর পরিসরে বাংলাদেশ ডিজিটাল বাংলাদেশ হওয়ার পথে অনেকদূর এগিয়েছে বলে আমি মনে করি। এখানে মতের ভিন্নতা থাকতেই পারে। কিন্তু এ কথা মানতে হবে যে, দেশের শিক্ষিত যুব সমাজের একটি বৃৃহৎ অংশ কম্পিউটারকে তাদের জীবনের সঙ্গী করে নিয়েছে। সহজে বহনযোগ্য হিসেবে ল্যাপটপের ব্যবহারই সবচেয়ে বেশি। কেউবা কিনছেন প্রয়োজনে আর কেউবা শখের বশে। ফেসবুক, টুইটার কিংবা অন্য কোনো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে উঠছে আগের যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর বিকল্প ব্যবস্থা।

তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে তাবত দুনিয়ায় গড়ে ওঠা তথ্য ভাণ্ডার সবার নাগালের মধ্যে আসার পাশাপাশি ভার্চুয়াল জগতে তৈরি হয়েছে নতুন ধরনের সাইবার অপরাধ। আর্থিকভাবে উন্নত দেশগুলোতে প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে এই অপরাধ সংঘটনের পরিমাণ যেমন বেশি তেমনি এর ধরনও দেশ ভেদে ভিন্ন। উল্লেখযোগ্য, অপরাধগুলোর মধ্যে শিশু পর্নোগ্রাফি, ম্যালওয়ার বা স্পাই ওয়ারের মাধ্যমে কারো ব্যক্তিগত তথ্য চুরির মাধ্যমে ব্যাংক একাউন্ট থেকে টাকা চুরি, অন্যান্য আর্থিক দুর্নীতি, তথ্য চুরি ইত্যাদি অন্যতম। বিশ্বের কোনো কোনো দেশে পরিণত বয়স্কদের জন্য পর্নোগ্রাফি আইনসিদ্ধ হলেও এমন একটি দেশও পাওয়া যাবে না যেখানে শিশু পর্নোগ্রাফিকে আইনি স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত তথ্যপ্রযুক্তিতে উৎকর্ষতা লাভের পরিপ্রেক্ষিতে সেখানে এর মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কঠোর ধারা সংযুক্ত করে তথ্যপ্রযুক্তি আইন পাস হয়েছে। সে আইনের কোনো কোনো ধারা অতি মাত্রায় কঠোর হওয়ার কারণে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টকে হস্তক্ষেপও করতে হয়েছে। আমাদের দেশে এরকম একটি আইন প্রণীত হয় ২০০৬ সালের শেষ ভাগে। ২০০৬ সালে এই আইন পাস হওয়ার পর থেকে এই আইনের প্রয়োগ কিংবা এ নিয়ে তেমন আলোচনাও হয়নি। কিন্তু আস্তিনের তলায় লুকিয়ে থাকা সাপ এক সময় না এক সময় ছোবল মারবেই- এত জানা কথা। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ১৬ ধারায় কাউকে হেয় করে রিপোর্ট প্রকাশের দায়ে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ডের বিধান ছিল যা বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদের সরকারের আমলে বাতিল করা হয়। অনেকের মতে ২০০৬ সালে এর চাইতে অনেক বেশি কঠোর এই নতুন আইনের মাধ্যমে সাইবার অপরাধ প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ নয় বরং বিরুদ্ধ মতের কণ্ঠরোধ করার মানসেই করা হয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তি ও যোগাযোগ আইন ২০০৬ এর ৯০টি ধারার মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারকারীদের বা প্রযুক্তি নির্ভর পেশাজীবীদের যে অংশটির সবচেয়ে বেশি অসুবিধা হওয়ার কথা ছিল বা প্রতিবাদ হওয়ার কথা ছিল তা কিন্তু হয়নি। বরং লেখক, শিল্পী, সাহিত্যক, সাংবাদিকরা সোচ্চার হয়েছেন একটি নির্দিষ্ট ধারার বিরুদ্ধে। তাঁদের দাবি- ৫৭ ধারা যদি প্রচলিত থাকে তাহলে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে পছন্দ না হলে যে কাউকে দমনপীড়ন চালানো যাবে। এতে মুক্তচিন্তার প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হবে এবং সবার মাঝে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করবে। এই আতঙ্কে থাকলে আর যাই হোক চিন্তার স্বাধীনতা থাকে না। যা আমাদের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। এই অনুচ্ছেদে দেশের সকল নাগরিকের চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কতিপয় শর্ত সাপেক্ষে নাগরিকের বাকস্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। আইনবিজ্ঞানের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে শাস্তি প্রদানের পেছনে যে যুক্তি তা হলো সামাজিক সমতা বিধান এবং অপরাধীকে কারাগারে রেখে সংশোধনের মাধ্যমে সমাজে পুনর্বাসন। বিচার যেহেতু একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া তাই সেখানে একটি দেশের জাতীয় রাজনীতির প্রতিফলন থাকবে এটাই স্বাভাবিক।

প্রযুক্তিকে মূল্যায়ন করার প্রয়োজন পড়ে। একই সাথে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা যাতে করে সমাজ থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করতে পারে সেটাও নিশ্চিত হওয়া দরকার।

পরিশেষে বলবো- বিচার বিভাগ কাগজে কলমে স্বাধীন হওয়ার পূর্বে ম্যাজিস্ট্রেসি প্রশাসনের অংশ থাকায় এতে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের কারণে আইনের প্রায়োগিক ভিন্নতা বেশ প্রকট এবং দৃষ্টিকটুভাবেই উপস্থিত ছিল। বিচার বিভাগ স্বাধীন হওয়ার পর বর্তমান অবস্থা কি তা কেবলমাত্র ভুক্তভোগীরাই বলতে পারবেন। আজকাল সংবাদ মাধ্যমগুলো অদৃশ্য বা অজ্ঞাত কারণে সব রিপোর্ট করে না বিধায় সাধারণের জানার বাইরে থেকে যায় প্রতিনিয়ত বিচারের নামে কি পরিমাণ আইনের ব্যত্যয় ঘটছে। ঔপনিবেশিক সময়ের আইনগুলো বিদ্যমান সময়ের সমস্যা সমাধানে কতটুকু কার্যকর তা নিয়েও আমাদের ভাবা দরকার। কারণ ঔপনিবেশিক আমলে শাসকরা কেবল সাম্রাজ্য বিস্তার ও শোষণের যে ভাবনা নিয়ে অসম যেসব আইন প্রণয়ন করেছিলেন, তাতে আমাদের নাগরিক হিসেবে কতটুকু মর্যাদা দেয়া হয়েছিল তা আর নতুন করে বোঝাবার দরকার নেই। কিন্তু একটি প্রশ্ন নতুন করে তোলা দরকার সেটা হলো, আমাদের দেশের সকল নাগরিকের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি আদৌ পাল্টেছে কি? যদিও বাংলাদেশের সংবিধান বলছে, আইনের চোখে সকল নাগরিক সমান। কিন্তু আসলেই কি তাই? আমরা কি সত্যিকার অর্থেই ভাবতে শিখেছি আমাদের দেশের সকল শ্রেণিপেশার মানুষের অধিকার সমান? আমাদের আইন ও আদালত কি সত্যিকার অর্থেই সমভাবে প্রতিকার দিচ্ছে সকল নাগরিককে? সত্যি কি সুশাসন আমরা পাচ্ছি? এ সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সরকারের একার দায়িত্ব নয়, আর সেটা সম্ভবও নয়, নাগরিক হিসেবে আমরাও এর দায় এড়াতে পারি না। সুশাসন প্রতিষ্ঠার আগে আমাদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, অর্থনৈতিক মূল্যবোধ, রাজনৈতিক মূল্যবোধ, তথ্য প্রবাহের মূল্যবোধ, সামাজিক মূল্যবোধ, নান্দনিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় মূল্যবোধ, আদর্শিক ও নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj