ইট কাঠের শহর : নজরুল ইসলাম

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

বিকালের আকাশটা পরিষ্কার। হালকা বাতাস বইছিল। ফার্মগেট পুলিশ বক্স পর্যন্ত আসতেই হঠাৎ বেরসিক বৃষ্টির হানা। ভিজতেই হলো অপুর। রাস্তার পাশের গাছগুলো বৃষ্টিতে জবুথুবু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিতুর আসার কোনো খবর নেই। ফোনটা কেন জানি অফ। কাছেই মহিলা হোস্টেলে থাকে। অপু একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে। আধঘণ্টা পর এলো। কথা ছিল টিএসসিতে সারা বিকেল আড্ডা দিয়ে রাতে বাইরে খাবে। কিন্তু রাস্তায় জ্যামের যে অবস্থা, মোটেই সম্ভব হবে না। ঢাকা শহরে সামান্য বৃষ্টি হলেই কেন জানি রাস্তায় গাড়ি নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায়। নিতুর ছোট্ট ছাতা নিয়ে চন্দ্রিমা উদ্যানের দিকে হাঁটতে লাগলো। বৃষ্টির মধ্যে জড়াজড়ি করে হাঁটা। কিছুটা উষ্ণতা অনুভব। অনেক দিন বৃষ্টিতে এভাবে হাঁটা হয় না।

নিতু, ‘চাকরিটা কেমন এনজয় করছ?’

অপু, ‘ভালোই, পরিবেশটাও বেশ চমৎকার।’

নিতু, ‘বাবার শরীরটা খুব একটা ভালো না। তাছাড়া মামাতো ভাইটা বিদেশ থেকে আসছে। সে তো বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। ও আমাকে ছোটবেলা থেকেই পছন্দ করে। তুমি তো আগে থেকেই সব জানো।’

অপু, ‘আর কটা দিন ম্যানেজ কর।’

নিতু, ‘দেখ কি করা যায়। আমি আর প্রেসার নিতে পারছি না’।

আজ অপুর মনটা ভীষণ খারাপ। মিথ্যা অভিযোগে চাকরিটা চলে গেলো। সকালে খুব ফুরফুরে মেজাজে অফিসে গিয়েছিল। অফিস শেষে সন্ধ্যায় নিতুর সাথে দেখা হবে। আজ তারা বিয়ের বিষয়ে কথা বলবে। পড়াশোনা শেষে বছর খানেক বেকার। মাস ছয়েক হলো চাকরিটা হয়েছে। চাকরির জন্য বিয়েটা করছিল না। ইন্সুরেন্স কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ে চাকরি। শুরুতে ভালোই বেতন দিচ্ছে। এর মাঝে সংসার শুরুর পূর্ব প্রস্তুতিটা সেরে নিয়েছে। কিন্তু বিকালে ডিপার্টমেন্টের প্রধান ডেকে নিয়ে হাতে একটি খাম ধরিয়ে দিলো। বলল, হিসাব বিভাগ থেকে পাওনা বুঝে নাও। কেন তার চাকরিটা গেলো সেটাও বলল না। চাকরিটা তখনো স্থায়ী হয়নি। তাই আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগও পেলো না।

অফিস থেকে বের হওয়ার আগে এক সহকর্মীর কাছে জানল অপরাধটা। সে ডিরেক্টর সাহেবের মেয়ের সাথে খারাপ ব্যবহার করেছে। কথাটা ডাহা মিথ্যা। মেয়েটা তাকে পছন্দ করেছিল। বড় লোকের বখে যাওয়া সন্তান। তাকে নিয়ে লং ড্রাইভে যেতে চেয়েছিল। অপু এড়িয়ে গিয়েছে। তাই তার প্রতিহিংসার শিকার হতে হলো। এতটাই সংবেদনশীল বিষয় যে এ নিয়ে কারো সাথে কথাও বলা যাবে না। মন খারাপ করে মাথা নিচু করে অফিস থেকে চলে আসতে হলো।

অপু লম্বায় ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি। গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যামলা। শরীরের গঠন সুন্দর। কথাবার্তাতেও স্মার্ট। চালচলনে ব্যক্তিত্বের একটা ছোঁয়া আছে। এসবের কারণেই হয়তো ডাইরেক্টর সাহেবের মেয়ের নজরে পড়েছিল। মেয়েটি মাত্র আমেরিকা থেকে পড়াশুনা শেষে দেশে এসেছিল। দেখতে অনিন্দ সুন্দরী। কিন্তু চাল-চলনে অনেকটা বেপরোয়া।

বিকাল পাঁচটা। অফিস থেকে ফুটপাতে নেমে অপু কিছুক্ষণ অফিস বিল্ডিংয়ের দিকে থাকিয়ে থাকল। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে হাঁটতে লাগল। মতিঝিলের এই অফিসে তার গত ছয়টা মাস কি ভালোভাবেই না কাটল। জিএম সাহেব তাকে খুব পছন্দ করতো। গত ছয় মাসে সে ছিল সবচেয়ে ভালো পারফর্মারদের একজন। ডিরেক্টর সাহেবও খুব পছন্দ করতো। একদিন ডিরেক্টর সাহেবের রুমেই তাঁর মেয়ের সাথে অপুর দেখা। সে মেয়েটার কারণেই আজ বিদায় নিতে হলো।

আজ আর নিতুর সাথে দেখা করা যাবে না। তাকে গিয়ে কি বলবে। নিতু কত আশা নিয়ে আজ তার সাথে দেখা করতে আসবে। বিয়ের পর্বটা কিভাবে করা যায় সে নিয়ে কথা বলবে। অপু আগেই তাকে বলে রেখেছিল। মোবাইলটা অফ করে ফুটপাতে হাঁটছে। বাসে উঠতে ইচ্ছে করছে না। বাসা তেজগাঁও নাখালপাড়ায়। দুই রুমের ছোট্ট বাসা নিয়ে মাকে নিয়ে থাকে। চাকরি হওয়ার পর মাকে ঢাকায় এনেছিল। বাবা মারা গেছেন অনেক আগে। অনেক কষ্টে ছেলেকে মানুষ করেছেন। মা অসুস্থ। ঢাকায় রেখে চিকিৎসা চলছে।

ফুটপাত ধরে ধীর পায়ে ফার্মগেটের পথে হাঁটতে লাগলো। হাঁটতে হাঁটতে নানা কথা ভাবছে। বাসায় গিয়ে মাকে কি বলবে। অনেক কষ্টে চাকরিটা পেয়েছি। চাকরির আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকতো। দুএকটা টিউশনি করে চলে যেতো। এখন বাসা ভাড়া, বাসার খরচ, মায়ের চিকিৎসা সব মিলে কিভাবে চলবে। এই মুহ‚র্তে বিয়ে কিভাবে করবে? ভাবতে ভাবতে মাথাব্যথা শুরু হয়ে গেলো।

সারা রাস্তায় জ্যাম। বাংলামোটর থেকে হাইকোর্ট পর্যন্ত গাড়ির কোনো নড়াচড়া নেই। শিশুপার্কের সামনে আসতেই হঠাৎ লোকজনের চিৎকার আর গালাগালি শুনে অপু এগিয়ে গেলো। দেখল নিয়ম ভেঙে উল্টো পথে রংওয়েতে এক ভিআইপির গাড়ি চলে যাচ্ছে শাহবাগের দিকে। ভিআইপির গাড়ির সামনে পুলিশের গাড়ি। জ্যামে বসে থাকা লোকজন মুখে যা আসছে তাই বলে গালি দিচ্ছে। অবশ্য তাদের এসব শোনার কথাও না। শুনলেও এ ধরনের ভিআইপিরা এসব কানে নেয়ার মানুষও না। তারা তাদের সুবিধার জন্য যে কোনো আইন ভাঙতে পারে। এতে সাধারণ জনগণ কি বলল তাতে তাদের কিছুই আসে যায় না। অথচ ভোটের সময় এরাই সাধারণ জনগণের কথা বলে ভোট চায়।

অপু আবার ফুটপাত দিয়ে হাঁটছে। হাঁটতে হাঁটতে ভাবছে নিতুকে সে কি বলবে। আর এখন তো নিতু তার জন্য বসুন্ধরা শপিং মলের একটি রেস্টুরেন্টে অপেক্ষা করছে। কতক্ষণ তার জন্য অপেক্ষা করবে। সে কি তার সাথে আজ দেখা করবে নাকি করবে না। শাহবাগ মোড় পার হতেই মাগরিবের আজান ভেসে আসলো। নিয়মিত নামাজ পড়ে। কিন্তু আজ নামাজ পড়তেও ইচ্ছে করছে না। নিজের ওপর অনেক অভিমান হচ্ছে। আল্লাহ তাকে এ কষ্টের মাঝে কেন ফেললেন!

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় নিতুর সাথে পরিচয়। গ্রাম থেকে আসা সহজ সরল মেয়েটি ভর্তির দিন তার পাশে বসেই ফরম পূরণ করছিল। ফর্সা মাঝারি উচ্চতার একটি মেয়ে। চেহারা অনেক সুন্দর। তবে গ্রাম থেকে আসা মেয়েদের মতো এখনো সহজ সরল। কথা প্রসঙ্গে জানল একই এলাকার মেয়ে। সে থেকে পরিচয়। বিষয়টা শেষ পর্যন্ত প্রেমেই গড়িয়েছে। ভর্তি হয়ে নিতু হলে থাকত। গ্রাম থেকে বাবা টাকাপয়সাও তেমন দিতে পারতো না। দুএকটা টিউশনি করত। কষ্টেশিষ্টে শিক্ষা জীবন শেষ করল। থার্ড ইয়ার থেকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে। নানা কথা বলে এড়িয়ে যাচ্ছে। মাস্টার্স শেষ করে একটা বেসরকারি কলেজে অধ্যাপনা করছে। বেতনের বড় অংশ গ্রামে বাবা-মায়ের জন্য পাঠায়। বাকিটা দিয়ে ফার্মগেটে কর্মজীবী হোস্টেলে থাকে।

আজ অপুর সাথে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা নিয়ে সিদ্ধান্ত হবে। আর হোস্টেল জীবন থেকে মুক্তি নিয়ে বাসায় উঠবে। অনেকক্ষণ পর্যন্ত রেস্টুরেন্টে বসে আছে। অপু আসছে না। মোবাইলও অফ। মনটা খারাপ হয়ে গেলো। তার কোনো অসুবিধা হয়নি তো!

বাড়িওয়ার কঠোর নির্দেশ। রাত দশটার মধ্যে হোস্টেলে ঢুকতে হবে। নতুবা থাকা যাবে না। এই শহরে ব্যাচেলর মেয়েদের যে কত যন্ত্রণার মাঝে থাকতে হয়। অবশ্য বাড়িওয়ালাদের দোষ দিয়েও লাভ নেই। গুটিকতক মেয়েদের নোংরামির কারণে সাধারণ মেয়েদের নানা কঠিন নিয়মের মাঝে থাকতে হচ্ছে। তাছাড়া খুব কম সংখ্যক বাড়িওয়ালাই মেয়েদের ভাড়া দিয়ে চায়। কেউই ঝামেলা চায় না। কেউ কেউ যে এখনো ভাড়া দেয় এই বা কম কি। অবশ্য হোস্টেলের বাধাধরা নিয়ম দেখলে মাঝে মাঝে মনে হয় মেয়েরা কোনো জেলখানায় থাকে।

সন্ধ্যা হয়ে গেছে। শেরাটন মোড়ে আসতে দেখে কোট পরা এক লোক রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে ট্রাফিক পুলিশের মতো গাড়ি কন্ট্রোলের চেষ্টা করছে। এক পুলিশ এগিয়ে গিয়ে তাকে টেনে রাস্তার পাশে নিয়ে আসল। কৌত‚হল নিয়ে তাকালে বুঝল মাতাল লোক। পাশেই একটি মদের বার রয়েছে। মনে হয় ওখান থেকে মদ খেয়ে নিচে এসে মাতলামি করছে। রাস্তায় গাড়ি মুভমেন্ট প্রায় বন্ধই। জ্যামে ঢাকা শহরটা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। রাজনীতিবিদরা নির্বাচনের আগে কত কি ওয়াদা করেন। কেউ কি ঢাকাকে জ্যামমুক্ত করবে এই ওয়াদা করেছিল? আর ওয়াদা করলে তার বাস্তবায়ন হয় না কেন। জ্যাম দূর করা কি আসলেই অসম্ভব।

বাংলামোটর পার হতে রাস্তার জ্যাম কিছুটা কমেছে। ফার্মগেট আসতে আসতে সাতটা। ফার্মগেটে শুধু মানুষ আর মানুষ। গাড়ির প্রতিক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে। আনন্দ সিনেমা হলের সামনে আসতেই দেখে কয়েকটা মেয়ে কড়া মেকআপ করে খদ্দেরের অপেক্ষায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কেউ দরাদরি করে খদ্দেরের সাথে চলে যাচ্ছে। আবার কেউ শিনা উঁচু করে খদ্দেরের অপেক্ষায় আছে। অদূরেই পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এসব দেখেও তারা নির্লিপ্ত। চুপ থাকবেই না কেন! হয়তো এসব ইনকামের একটা অংশ তাদের পকেটেও যায়।

বাসায় যেতে ইচ্ছে করছে না অপুর। ফার্মগেটে পার্কের একটি বেঞ্চিতে হেলান দিয়ে বসে থাকল। পার্কের উল্টো পাশেই নিতুর হোস্টেল। হোস্টেলের দিকে মুখ করে বসেছে। নিতু এখন কোথায়? এখনও কি রেস্টুরেস্টে তার জন্য অপেক্ষা করছে নাকি হোস্টেলে চলে এসেছে। কখন যে রাত দশটা বেজে গেলো খেয়ালই করলো না। হঠাৎ হোস্টেলের সামনের রাস্তায় লোকজনের শোরগোলে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। কোনো এক অজানা আশঙ্কা বুকটা ধড়পড়িয়ে উঠল। ঐদিকে এগুলো।

কেউ একটা ল্যাম্পপোস্টের কাছে রাস্তায় পড়ে আছে। রাস্তা পার হওয়ার সময় বাসের নিচে পড়ে যায় মেয়েটি। লোকজন ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটিকে ঘিরে। অপু ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেল। দেখল নিতুর নিথর দেহ রাস্তায় পড়ে আছে। বাকরুদ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকলো। পুলিশ লাশটি ভ্যানে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। ডান হাতটা নিচের দিকে ঝুলছে। অপুর মনে হচ্ছে নিতু তাকে হাত বাড়িয়ে ডাকছে।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj