দ্বিতীয় ও শেষ চিঠি : নাহিদা আশরাফী

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

এক.

ছোটবেলায় স্কুলে যাবার সময় মা সবার আগে চুল বাঁধতে বসতেন চাঁদনীর। চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ ফুটিয়ে তুললেও মনে মনে খুশিই হতেন। আর পাড়া-প্রতিবেশীরা যখন মেয়ের চুলের প্রশংসা করতো তখন তো বেশ গর্বই অনুভব করতেন। সত্যিই তো এমন চুল দু-দশ গ্রামে দেখা যায় না। পিঠময় এমন ঘন কালো আর একহারা চুল দেখে এ যুগের কতজন রোমিওরা যে জীবনানন্দ হতে চেয়েছে তার লিস্ট দিতে গেলে কয়েক দিস্তা কাগজ লাগবে। বেণি গাথা চুল ঘাড়ের দুপাশে ফেলে চাঁদনী যতক্ষণে কলেজে পৌঁছাত ততক্ষণে দশ বিশ জোড়া চোখের আকুল ব্যাকুল চাহনি দেখে ওর কি যে হাসি পেত। গত দুদিন আগে এক প্রেমপত্র পেয়েছে চাঁদনী। ওর সাথে পড়ে সুফিয়া। তার বড় ভাই দিয়েছে। এই হাবলাকে ও মোটেই সহ্য করতে পারে না। ওদের কলেজেই ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। বিশাল একটা শরীর। হাত-পা ছোট ছোট। আর সবচেয়ে বিরক্তি লাগে চোখ দুটার দিকে তাকালে। মনে হয় ওরে বানাতে গিয়ে সব মাটি শরীরে দেবার পর হঠাৎই বিধাতার মনে হয়েছে, আরে! চোখই তো করা হয় নাই। তখন এদিক সেদিক খুঁজে একটু মাটি পেয়ে তাই দিয়ে চোখ করে রেখেছেন। এমন হোঁদলকুতকুতে টাইপের চোখ দেখলে গা জ্বলে যায় ওর। আর ওর মাথায় দেবার মতো মগজের সাপ্লাইও সম্ভবত পর্যাপ্ত ছিল না। শেষমেশ কিছু খড়কুটো ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। সেই দোদুল চিঠি লিখেছে কলেজের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েকে। চিঠিটা মাত্র দুই লাইনের। চিঠি পড়ার পর থেকে চাঁদনীর মাথা খারাপের মতন অবস্থা। কপাল ভালো দোদুলের। চিঠি পাঠিয়ে কলেজেই আসেনি। সামনে পেলে আজ সব বন্ধুদের লেলিয়ে দিতো ওর পেছনে। তবে লাভ কিছু হতো না। দোদুল নির্বিকারই থাকতো। ওকে থাপ্পড় দিলেও ঘুরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করবে না কেন থাপ্পড় খেলো। ওদিকে সুফিয়াকে যে একচোট নেবে তার উপায় নেই। সেরের ওপর যেমন সোয়াসের থাকে তেমনি চাঁদনীর এক ধাপ ওপরে সুফিয়া। টাসটাস করে মুখের ওপরে এমন কিছু কথা চাঁদনীকে বলবে যে চাঁদনী পালাবার পথ পাবে না। চাঁদনী ভেবে পায় না অমন ভাইয়ের বোন এমন হয় কি করে। আচ্ছা চিঠিটা ওর খাতায় ঢুকিয়ে রেখে গেল কে? সুফিয়া নিশ্চয়ই তার ভাইয়ের চিঠি নিজে বহন করে আনবে না। আবার আনতেও পারে। কিন্তু ওকে জিজ্ঞেস করার সাহসই তো নাই।

অফ পিরিয়ডে চাঁদনী কমনরুমে এলো। সবাই আড্ডা খেলায় মগ্ন। কোণার দিকে শরীফ, বাবলুরা গোল হয়ে বসে। হিন্দি গানের সাথে সমানে চলছে একে ওকে টিপ্পনি কাটা।

-শরীফ। শরীফ শুনেও না শোনার ভান করলো।

-কি রে ডাকছি শুনতে পাচ্ছিস না? নাকি শুনেও না শোনার ভান করছিস?

– কি বলবি বল না।

– ইয়ে, আমার খাতার ভেতরে একটা চিঠি।

-তো?

-কে রেখেছে বলতে পারিস?

-তুই কি আমাকে তোর বইখাতার পাহারাদার বানিয়েছিস?

শরীফের কথায় বাকি সব হো হো করে হেসে উঠলো। রাগে প্রায় কেঁদেই ফেলতো চাঁদনী। কোনোরকম নিজেকে সামলে সরে গেল। লাভলি আর রুম্পাকে পথেই পেল। চাঁদনীকে দেখে হই হই করে উঠলো। -কি রে সুন্দরী? মুখ কালো কেন? এই মুখে গ্রহণ মানায় না।

– আর বলিস না। মেজাজ এম্নিতেই খারাপ তার ওপর শরীফ বাবলুদের কথা শুনে আরও মেজাজ চড়ে গেছে।

– হয়েছে কি?

-খুলে বলছি তোদের বিষয়টা?

রুম্পা ওর কানের কাছে মুখ নামিয়ে আস্তে করে বলল,‘দোস্ত এটা কি ঠিক হবে?’

-কোনটা?

– অই যে বললি। খুলে বলবি। কলেজে খোলা যাবে? নাকি নতুন নিয়ম করেছে খোলার ব্যাপারে?

দুটো মিলে এমন হো হো করে হেসে উঠলো যে চাঁদনী হাঁ হয়ে রইলো। এখানে আর দাঁড়ানোর মানে হয় না। হন হন করে হেঁটে ক্লাসরুমে গেল। সবাই এমন কেন করছে ওর সাথে? কই সে ভেবে রেখেছে শরীফ, রুম্পা ওদেরকে দিয়ে টাইট দেবে অই হাবলাটাকে। আর ওরা কিনা। ব্যাগটার ওপর মাথা রেখে এক প্রস্থ কেঁদে নিলো চাঁদনী।

দুই.

মুন আয়নার সামনে দাঁড়াতে মনে হলো আয়নাটাই লজ্জা পেল।

– কি গো আয়নামতি? লজ্জা পেলে মনে হয়?

– না কখনও তো এত সময় নিয়ে দাঁড়াও না আমার সামনে। সবচেয়ে অবহেলা করো আমাকে। আমার সামনে দাঁড়াতে গেলেই তোমার রাজ্যের কাজ মনে পড়ে।

– অভিমান করে না সোনা। অভিমান ভুলে আজ আমাকে সাজতে হেল্প করো।

– তুমি সাজবে! বলো কি! কে এই অসাধ্য সাধন করলো?

আয়নার কথায় জবাব না দিয়ে মুচকি হাসলো মুন। নিজেকে সাজাতে লাগলো মনের মাধুরী মিশিয়ে। মুনের এই অভ্যেস নতুন নয়। খুব ছোটবেলা থেকে। মাই শিখিয়ে দিয়েছিল। মা অফিসে যেতো, বাবা তো ব্যবসার কাজে সব সময় হিল্লি-দিল্লি করে বেড়াচ্ছেন। একা একা আর কাহাতক থাকা যায়?

– যখন তোমার খুব একা লাগবে। কিছুই ভালো লাগবে না তুমি ঘরের প্রিয় জিনিসগুলোর সাথে কথা বলবে। মুন অবাক হয়ে জানতে চাইতো, ‘ওরাও কি আমার সাথে কথা বলবে মা?’

– না। তা বলবে না। তবে খুব মনোযোগ দিয়ে তোমার কথা শুনবে। ওরা খুব মনোযোগী শ্রোতা।

তুমি প্র্যাক্টিস করে দেখো। একটা সময় মনে হবে তুমি ওদের কথা বুঝতে পারছো, আর ওরা তোমার কথা।

সেই থেকে এটা একটা দারুণ খেলা মুনের জন্যে।

ঠিক দশটা পনেরো তে কম্পাউন্ডে পা রাখলো মুন। যাক পাঁচ মিনিট সময় পাওয়া গেল। আর একবার কি নিজেকে দেখে নেবে আয়নায়? নাহ থাক একটু কেয়ারফুলি কেয়ারলেস থাকা ভালো। শাড়ির রংটা ওকে মানিয়েছে কিনা কে জানে। জীবনে প্রথম ও একা একা শাড়ি পরলো। না পরে উপায় কি? অস্ট্রেলিয়ার এই রংচটা একলা জীবনে শাড়ি পরাবার জন্যে চাইলেই কাউকে চট করে খুঁজে পাওয়া যাবে না- এটা নিশ্চিত। এখানে একটা মুহূর্ত কেউ নষ্ট করে না। ওর পাশের রুমে থাকে যাবিদা। সেই কোন ভোরে উঠে কাজে চলে গেছে। আর যাবিদা থাকলেই বা কি হতো? বরং না থেকে উপকার হয়েছে। আফগান এই মেয়েটার সব কিছুই ভালো একটা বিষয় ছাড়া। প্রতিটা বিষয়ে সে অতি উৎসাহী। মুনের যা চরম অপছন্দ। তবু কিছু করার নেই। এই শহরে সাবলেট জোগাড় করার মতন ঝক্কি আর কিছুতেই নেই। হ্যাঁ ছেলেমেয়ে বাছবিচার না করলে অনেককেই পাওয়া যায়। ওর অনেক বন্ধুরা ওভাবেই আছে। ও পারেনি। শুরুতে তাই কিছুদিন একা ছিল। দুরুমের একটা ছোট্ট বাড়ি ক্যাম্পাসের কাছাকাছি বলে অনেক ভাড়া গুনতে হতো। তাছাড়া একা থাকারও কিছু ঝামেলাও আছে। তাই খুব প্রাণপণে একজন মেয়ে পার্টনার খুঁজছিল। অবশেষে অনেক কষ্টে এই আফগান মেয়েকে ও খুঁজে পেয়েছে।

হঠাৎই লম্বা করিডোরের শেষ মাথায় ও স্যারকে দেখতে পেল। আর সঙ্গে সঙ্গেই টের পেলো ওর হার্টবিট বেড়ে যাচ্ছে, হাত-পা ঘামছে, কপালেও বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। তবু প্রাণপণ চেষ্টা করলো নিজেকে সামলে নেবার। আজ দীর্ঘ ছয়মাস অনেক দোটানায় ভুগেছে। নিজের সাথে যুদ্ধ করেছে। কিন্তু সিদ্ধান্তে আসতে পারছিল না। অবশেষে কাল রাতে সিদ্ধান্তে আসতে পেরে কি যে হালকা লাগছে ওর। আজ সে কারণেই মুনের এই সাজ। আর দেরি নয়। আজ ও বলবেই ওর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি।

তিন.

বাড়ি ফিরে চাঁদনী দোদুলের চিঠিটা নিয়ে বসলো। আজ আর রুম্পার সাথে ফেরেনি। অন্যদিন ও আর রুম্পা একসাথে ফেরে কলেজ থেকে। আজ রুম্পার ওপর চরম মেজাজ খারাপ হয়েছে। তাই ক্লাস শেষ হবার আগেই মাথাব্যথার বাহানায় বাড়ি চলে এসেছে। তাছাড়া ছুটির পর রুম্পার সাথে না ফিরলে মায়ের হাজারো প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। একা ফিরলি কেন? রুম্পার সাথে ঝগড়া হয়েছে? আরও কত যে প্রশ্ন করবে। পেট থেকে কথা বের করেই ছাড়বে। চাঁদনী মাঝে মাঝে খুব অবাক হয়। মায়েরা এত টেকনিক কোথা থেকে শেখে। নাকি মা হবার সাথে সাথে এইসব ট্রেনিংও এরা আধ্যাত্মিকভাবে পেয়ে যায়? খুব ছোট্ট চিঠি। দুই লাইনও গুছিয়ে লিখতে পারেনি হাদারাম। তার ওপর হাতের লেখারও কি ছিরি! চাঁদনী ভেবে পায় না চিঠি লেখার মতন সাহস ও জোগাল কি করে। এমনি তো সামনে পড়লে পালাবার পথ পায় না। এ পর্যন্ত চাঁদনীর সাথে কথা বলেছে মাত্র দুদিন। যে পরিমাণ তোতলানো শুরু করেছিল তাতে এই হাদারামের স্বাভাবিক কথা না শুনলে চাঁদনী ধরেই নিতো ও জন্ম থেকেই তোতলা। এহ কি চিঠির ভাষা! ‘চাঁদনী তুমি সুন্দর। তোমার জন্যে কাঁদে আমার অন্তর।’- এ কোনো চিঠি হলো? আবার কাব্য করার চেষ্টাও করেছেন। সাহস কত! কবি হবার সাধ জাগছে। ‘অই আহাম্মক তোরে কবি হইতে কে কইছে? আর তুই তো জানিসই না অন্তর কোথায় থাকে। তোরে প্রেম কি জিজ্ঞেস করলে তো বইয়ের পাতা উল্টাবি। সেই ক্লাস থ্রি থেকে তোর মতন হাদারামের সাথে এক স্কুল, এক কলেজে পড়তেছি। পুঁথিগত বিদ্যা ছাড়া তোর মগজে কিছু আছে? জীবনেও যে একটা সাংস্কৃতিক বা খেলাধুলার মতো কোনো কিছুতে অংশগ্রহণ করিস নাই, পিকনিকের দিন ঘরে খিল এঁটে বসে থাকিস, বন্ধুরা আড্ডায় ডাকলে তোর জ্বর ওঠে, দলবেঁধে সিনেমা বা কোনো বন্ধুর জন্মদিনে যাওয়ার কথা বললে এমনভাবে তাকাস মনে হয় কেউ তোরে সুন্দরবন গিয়ে বাঘের সাথে ঘুমাইতে বলছে সেই তুই আবার প্রেমপত্র লেখোস। গাধা, উল্লুক।’ চাঁদনী রাগে একা একাই গজগজ করতে থাকে। দোদুলকে সামনে পেলে কয়েকটা চড় থাপ্পড় দিতে পারলে সম্ভবত শান্তি পেত চাঁদনী। চিঠি লেখার শখ হইছে লেখ না। কিন্তু চাঁদনীকে কেন? যে এই ছোট্ট শহরের বসরাই গোলাপ। যার জন্যে দোদুলের চেয়ে একশো গুণ যোগ্য ছেলেরা মৃত মাছের মুখের মতো হাঁ করে আছে। সেই সময় মুখে মাছি ঢুকলেও তারা টের পায় না। চাঁদনী একবার কৃপা করে তাকালে তারা ধন্য হয়ে যায়। আর চাঁদনী কারো দিকে তাকিয়ে হাসলে সে তো নিজেকে অমিতাভ বচ্চন ভাবা শুরু করে। তো সেই চাঁদনী চিঠি প্রাপ্তির এগারো দিনের মাথায় দোদুলকে পেল বড় খালের পাশে বসে থাকা অবস্থায়। সাথে ছোট বোন আর এক চাচাতো ভাই। চাঁদনী সোজা দোদুলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো আর সজোরে একটা চড় কষিয়ে দিলো। এরপর থেকে দোদুলকে আর এলাকায় খুঁজে পাওয়া যায়নি।

চার.

মা তুমি ভালো আছো?

– হ্যাঁ রে। আমার কথা বাদ দে। তোর কথা বল। কেমন আছিস? ফোন করেছিস কেন? স্কাইপেতে আয়। দেখি তোকে। কতদিন দেখি না।

-কি যে বলো মা। মাত্র তিনদিন আগেই তোমার সাথে স্কাইপে কথা হয়েছে।

– এত গুনে রাখিস কি করে? আমার তো মনে হয় তিনযুগ হয়েছে।

-মা। আমি বড় হয়েছি।

– কে বলেছে তোকে বড় হতে?

-হা….হা। তুমি না মা। আচ্ছা মা শোন কি রান্না করেছো আজ?

– তুই কি সিরিয়াস কিছু বলবি আমায়? আমার ধারণা তুই খুব গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিষয় নিয়ে আমার সাথে আলোচনা করতে চাস।

মুন জানে আর লুকিয়ে লাভ নেই। মা ধরে ফেলেছে। মায়েরা ধরে ফেলে।

– মা। ক্যাম্নে কি? সব আগে ভাগেই বুঝে ফেল। মা শোন আমি যখন মা হবো তুমি তোমার এই টেকনিকটা আমাকেও শিখিয়ে দিও তো।

– কোন টেকনিক?

-এই যে সব কিছু আগে ভাগেই বুঝে ফেল সব কিছু।

– হুম। তোকে একটা গল্প বলবো। কিন্তু তার আগে তুই বল কি বলতে চাস। কোনো ভনিতা করবি না। সূচনা বাদ। ডিরেক্ট বক্তব্যে যাবি। প্রায় এক মিনিটের কাছাকাছি ওপাশ থেকে কোনো শব্দ না পেয়ে মুনের মা ভাবলো লাইন বুঝি কেটে গেল।

– হ্যালো…হ্যালো। মুন কথা বল। ওকে স্কাইপে আয়।

– না মা।যা বলতে চাই তা তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলা সম্ভব না।

-তাহলে চোখ বন্ধ করে বলিস।

– তাও সম্ভব না মা। চোখ বন্ধ করে তোমাকে আমি বেশি দেখতে পাই। তার চেয়ে এভাবেই বলি।

-বল।

– মা আমি…. (আবার নীরবতা)

– কাউকে ভালোবেসেছিস?

– ও মাই গড। আমি জানতাম। তুমি আন্দাজ করে ফেলবে। আমিও তাই চাইছিলাম। আমাকে আর কষ্ট করে বলতে হবে না।

– কংগ্রেটস। এবার বল ছেলেটা কি করে? কোথায় থাকে? কিভাবে পরিচয়? ফিরিঙ্গি পছন্দ করে ফেললি নাকি শেষে?

-মা। এত প্রশ্ন শুনে তো ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছি। আমি সব বলবো। আমি নিশ্চিত তোমার পছন্দ হবে। শুধু…

– শুধু কি?

– শুধু একটা বিষয় তোমাকে কষ্ট দেবে জানি। আমি জানি তুমি অনেক স্মার্ট একটা মা। বিষয়টা আমায় যেহেতু এতটুকু ভাবাচ্ছে না সেহেতু তুমিও প্লিজ আপত্তি করো না। প্লিজ মা…

– আচ্ছা বল। সব শুনি তো।

– মা ছেলেটা দারুণ ব্রিলিয়ান্ট, অসম্ভব হ্যান্ডসাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এপ্লাইড ক্যামেস্ট্রিতে ফার্স্টক্লাস পেয়েছে। এরপর অস্ট্রেলিয়া সরকারের স্কলারশিপ নিয়ে মেলবোর্ন আরএমআইটিতে পিএইচডি করেছে পলিমার ক্যামেস্ট্রিতে। এখন আরএমআইটিতেই কাজ করছে।

– হুম। তো সমস্যা কোথায়। অন্য ধর্মীয়?

-না মা।

– মুন…সমস্যাটা বল।

-মা বললাম তো এমন কোনো সমস্যা না। তুমি প্লিজ যে পর্যন্ত শুনলে তা থেকেই বলো না।

– আমি কি বলবো? হ্যাঁ যা শুনলাম তাতে যথেষ্ট ভালোই মনে হয়। সাধারণত বাবা-মা যেমন খোঁজেন- শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত। তেমনি তো হয়েছে। এখন দেখতে কেমন আর মনমানসিকতা কেমন। সে তো তুমি যাচাই করবে।

– এগজ্যাক্টলি মা। এসবে আমি স্যাটিসফাইড।

– দেখ মুন আমি আর দশটা টিপিকাল মায়েদের মতন নই। সে তুই ভালো করেই জানিস। ছোটবেলা থেকেই তোকে আর দশজনের চেয়ে আলাদা করেই বুঝতে শিখিয়েছি। জানতে শিখিয়েছি। তোর অমতে আমি যাচ্ছি না। কিন্তু কেন যেন মনে হচ্ছে তুই কোথাও কিছু লুকাচ্ছিস। তাই একটাই অনুরোধ ভাবাবেগে যেমন জীবন চলে না। তেমনি আবেগহীন জীবন বয়ে বেড়ানোর চেয়ে দশ মন পাথর বয়ে বেড়ানো অনেক সহজ। সে নিশ্চয়ই আমাকে দেখেই বুঝেছিস। তাই যাই করিস বুঝে শুনে করিস।

– ডোন্ট ওরি মা। আমি তোমার কষ্টটা বুঝি। আর বুঝি বলেই একই ভুল আর করতে চাই না। আমি যেন তোমার মতো বুঝতে এত দেরি করে না ফেলি মা।

– তুই কি ওকে সব জানিয়েছিস?

-না মা। কিছুই জানাইনি। আমি যে ওকে এতটা ভালোবাসি সেটা বুঝতেই তো আমার ছয়মাস লেগে গেল। তোমার মেয়ে না? সব কিছু একটু দেরিতেই বুঝি।

– এই মেয়ে, মায়ের সাথে ফাজলামো? বলেই মা মেয়ে দুজনেই হেসে উঠলো

-ওর সাথে কফিশপে মিট করতে চাচ্ছি মা। ভাবছি আর দেরি না ওকে সব জানাবো। কি বলো মা?

– হ্যাঁ। তবে বলার আগে তার মনোভাবটা বুঝে নিলে ভালো হতো না? আর না হয় তাকে বলার সুযোগ দাও।

-মা সে আমাকে অনেক পছন্দ করে। রোজ আমার জন্যে ফুল, চকোলেট নিয়ে আসে। আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওর ল্যাবে বসে আড্ডা দেই। উইকেন্ডে দুজন বেড়াতে বের হই। শপিং করি। গত দুদিন আমাকে রান্না করে খাইয়েছে জানো। তুমি খেলে খুব খুশি হতে। সব খাবারগুলোই তোমার খুব প্রিয়। সেদিন কি করেছে জানো? তোমার আর আমার একটা ছবি ফেসবুক থেকে নামিয়ে বাধাই করে তার পড়ার রুমে রেখে দিয়েছে। আরও অনেক কাণ্ড করে। মনে হয় আমি একটা বাচ্চা মেয়ে তার কাছে। খুব কেয়ারিং। এরপরও কি আমার দেরি করা উচিত মা?

– ঠিক আছে মা যা ভালো মনে হয় কর। এক মিনিট ধর তো ফোনটা। দরজায় কলিং বেলের আওয়াজ শুনছি।

আর ধরা যাবে না মা এখন রাখবো। তুমি দেখো কে এলো। পরে আবার কথা হবে। ও হ্যাঁ কি একটা গল্প বলবে বলেছিলে।

– আজ থাক। আর একদিন শুনিস।

– ওকে বাই মা। ইউ আর সো সুইট। এত্ত গুলা ভালোবাসা পাখিটা আমার।

– হ্যালো শোন…ওপাশ থেকে ফোন রেখে দিতেই তার মনে হলো, ‘আরে! ছেলেটার নামই তো জিজ্ঞেস করা হয়নি।’

পাঁচ.

এইচএসসির পরে চাঁদনীর খুব ইচ্ছে ছিল ঢাকায় ভর্তি হবে। বাবার জোর আপত্তির কাছে টিকলো না। একমাত্র মেয়েকে এত তাড়াতাড়ি তিনি কাছ ছাড়া করতে চান না। তবু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির চেষ্টা যে করেনি তা নয়। চাঁদনী ভেবেছিল কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে একবার চান্স পেয়ে গেলে বাবা আর না করবেন না। চান্স না পাওয়ায় সে আশায় গুড়ে বালি। বাবাকে আর কিছুতেই রাজি করানো গেল না। অগত্যা উপায়ন্ত না দেখে শহরের বিশ্ববিদ্যালয় কলেজেই অর্থনীতিতে ভর্তি হতে হলো। অবশ্য ভর্তি হয়েই এক দুর্দান্ত হ্যান্ডসাম লেকচারারের প্রেমে হাবুডুবু খেলো চাঁদনী। টানা এক বছর কি ভীষণ রোমান্টিক সময় কাটিয়েছে অই নব্য প্রভাষকের সাথে। কিন্তু একটা ব্যাপারে খুব অবাক হতো ও। প্রভাষকের সাথে খুব ঘনিষ্ঠ সময়গুলোতে ওর হঠাৎই দোদুলের কথা এক ঝলক মনে ভেসে উঠতো। আবার হঠাৎ কোনো ভরদুপুরে একা বৈঠকখানার সিঁড়িতে বসে ঘুঘুর ডাক শুনতে গিয়ে ধুম করে অযাচিতভাবেই দোদুলের কথা মনে পড়ে যেত। এ কথা ঠিক যে দোদুলকে চড় মারার পর প্রথম কদিন মনে হয়েছে ও ঠিক কাজই করেছে। কিন্তু যতই দিন যেতে লাগলো ততই চাঁদনীর ভেতরে অপরাধবোধ ওর হৃদয় বিদীর্ণ করে বেড়ে উঠছিল ঠিক যেমন ক্যাকটাস সব পাথর আর শুকনো মাটি ঠেলে বড় হতে থাকে ঠিক তেমনি। দোদুল চড় খেয়েও খুব শান্ত চোখে চেয়েছিল ওর দিকে। কোনো প্রতিবাদ নয়, কোনো প্রতিহিংসা নয়। বরং নিজেই সরে গিয়ে চাঁদনীকে এক অন্যরকম শাস্তি দিয়ে গেল যেন। আরও কতশত চিঠিই তো পেয়েছে। কই সবাইকে কি চড় মারতে গেছে ও? কতবার ভেবেছে বন্ধুদের কাছে দোদুলের কথা জানতে চাইবে। কি এক সঙ্কোচে, দ্বিধায় বারবার জিজ্ঞেস করতে গিয়েও থমকে গেছে। বিষয়টা দোদুল বা চাঁদনী কারো বন্ধুরাই স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনি। ইদানীং খুব দেখতে ইচ্ছে করে দোদুলকে। যাই হোক ওদের প্রেমকাহিনী যখন সবার মুখে মুখে ঠিক তখনই প্রভাষক সাহেব হঠাৎই নিরুদ্দেশ হলেন। চাঁদনীকে প্রায় একমাসে বিশ্বাসই করানো গেল না যে প্রভাষক চাকরি ছেড়ে চলে গেছে। শুধু তাই নয় ঠিক একমাস দশ দিনের মাথায় আরও জানা গেল প্রভাষক বিবাহিত এবং তার একটি ছয় বছরের ছেলেও আছে। চাঁদনী তখন খুব অদ্ভুতভাবে আবিষ্কার করলো প্রথম প্রেম হারানোর কষ্ট ওকে তেমনভাবে গ্রাস করছে না যেমনটি করা উচিত ছিল। বরং একটা মিথ্যাবাদী বাটপার লোকের হাত থেকে ও বেঁচে গেছে এই স্বস্তিটাই ওকে ঘিরে আছে। অই সময়টাতে প্রায়ই মনে হতো দোদুলকে খুঁজে বের করতে পারলে মন্দ হতো না। দোদুল কই? কেমন আছে? একা একাই প্রশ্নগুলোতে নিজেই ঘুরেফিরে আসতো। কারো কাছে যে জিজ্ঞেস করবে সে উপায় তো ও নিজেই রাখেনি। আর ওর বন্ধুরাও এমন যে ওর সামনে কখনই দোদুলের কোনো প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপ করে না। প্রভাষকের সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হবার ঠিক সাড়ে চার মাসের মাথায় চাঁদনীর বিয়ে হয়ে গেল জনৈক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর সাথে। সম্পূর্ণ পারিবারিকভাবে আয়োজিত এ বিয়েতে চাঁদনী তার বরকে দেখলো একেবারে বিয়ের দিনে।

ছয়.

মুনের মা দরজাটা খুলতেই ডাকপিয়ন একটা চিঠি ধরিয়ে দিলো হাতে। বিদেশ থেকে এসেছে। চিঠির বা পাশের গোট গোটা অক্ষর জানান দিলো চিঠিটা সুদূর অস্ট্রেলিয়া থেকে এসেছে। ভুরু কুঁচকে গেল মুনের মায়ের। আজকাল কেউ তো তাকে চিঠি লেখে না। আর চিঠি লেখার কারণও নাই। ডিজিটাল যুগে যোগাযোগের মাধ্যম এত যে সবচেয়ে পুরাতন এই মাধ্যমটি এখন ডাক হরকরার মতোই ধুঁকে ধুঁকে মরছে। তবু চিঠির আবেদন এখনও প্রথম প্রেমের অনুভূতির মতন। মন থেকে এর স্মৃতি কখনই হারায় না। চিঠিটা ডাকপিয়নের হাত থেকে নিয়ে দরজা বন্ধ করে নিজের রুমে এলো মুনের মা। ড্রেসিংটেবিলের ওপর রেখে ভাবলো লাঞ্চ শেষে আয়েশ করে চিঠি নিয়ে বসবে। কাজের মেয়েটা এরই মধ্যে দুবার তাগাদা দিয়ে গেছে। কিন্তু এই কৌত‚হল জাগানিয়া চিঠি রেখে খাওয়াও সম্ভব নয়। সত্যি খুব অবাক হচ্ছে মুনের মা। অস্ট্রেলিয়া থেকে চিঠি লিখবার মতন কাউকে খুঁজতে ভাবনার সাগরে ডুবসাতার দিয়েও কোনো ক‚লকিনারা করতে পারলো না। এক দূর সম্পর্কের চাচাতো বোন থাকে পার্থে। কালেভদ্রে কথা হয়। সে তো চিঠি লিখবেই না। আর তো থাকে মুন। মুন নিশ্চয়ই তাকে চিঠি লিখবে না। প্রায় প্রতিদিনই যেখানে মেয়ের সাথে কথা হয় সে কেন মাকে চিঠি লিখবে। নাকি মুনই মজা করে চিঠি লিখেছে। নাকি মুন যা বলতে গিয়েও বলতে পারছে না তা জানাতেই এই চিঠির আশ্রয় নেয়া? নাহ চিঠি রেখে সে কিছুতেই যেতে পারবে না। আর একটা চিঠি পড়তে কতটুকুই বা সময় লাগবে। পড়েই খেতে যাবে। কাজের মেয়েটাকে খেয়ে নিতে বলে মুনের মা চিঠি নিয়ে বসলো। টাইপ করে খুব যতœ নিয়ে তার নাম ঠিকানা লেখা। মুনের মাও খুব সতর্কভাবে খামটা খুললো। সম্বোধনহীন একটা চিঠি।

‘কেমন আছো? অনেক দিন পরে চিঠি লিখতে বসলাম। আমার সম্পর্কে বিশেষ কিছু না জানলেও একটা বিষয় তুমি খুব ভালো করেই জানো। আমি চিঠি লিখতে পারি না। অনেক কথা জমিয়ে রাখি। কিন্তু লিখতে বসে সব জট পাকিয়ে এমন অবস্থা হয় যে জট খুলতে গিয়ে আরও জট পাকাই। শেষে হতাশ হয়ে হাত-পা ছড়িয়ে চুপ করে বসে থাকি। আসলে সবাইকে দিয়ে সব কিছু কি সম্ভব, বলো? তুমি এত শুকিয়েছো কেন বলতো? তোমার কথা ভাবলে আমার মান্না বাবুর সুজাতার কথা মনে পড়ে। তোমার তো সবচেয়ে সুখে থাকবার কথা। গাড়ি-বাড়ি, হিরে-জহরত সব কিছু তোমার দামি হবার কথা। শুনেছি সব কিছু তোমার ভীষণ রকম যতেœ থাকে।

ইদানীং চোখে আর কাজল পরো না। তাই না? মেয়েদের সাজসজ্জার কি সব নতুন আর রকমারি জিনিস বের হয়েছে। তবু বলি তুমি কাজলেই সুন্দর। যখন খুব মন দিয়ে কিছু পড়তে তখন তোমার চোখ নিবিষ্ট থাকতো বই বা কাগজের পাতায়। আমি ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকতাম কখন তুমি চোখ তুলবে। অই হঠাৎ চোখ তুলে তাকানোর সময়টাতে কি ভীষণ রকম মায়াবী মনে হতো তোমাকে। মনে হতো সকালের সব নরম আলো আর সন্ধ্যের রহস্যঘন রং শরতের শুভ্র মেঘের সাথে মিশেছে। আর এসবের মিশেলে তৈরি এক প্রতিমা, তুমি চোখ তোলা মাত্রই নড়েচড়ে উঠলো। আচ্ছা তোমার পায়ের কনে আঙুলের নখে একটা কালচে দাগ ছিল। ফেসবুকে তোমার অনেক ছবি। কিন্তু কোনো ছবিতেই পা দেখা যায় না। তাই মনে হলো দাগটা এখনও যায়নি। এই দাগটা নিয়ে তোমার মনে অনেক কষ্ট ছিল। এখনও কি রাত জেগে কবিতা পড়ো নাকি অনেক অভিজাত্যের নিচে এই শখটুকুও চাপা পড়েছে? চিঠিটা পড়তে তোমার অনেক কষ্ট হবে জানি। সব এলোমেলো কথা। কোথা দিয়ে শুরু কোথা দিয়ে শেষ তার কোনো নিশানা নেই। পথহারা পথিকের মতন চিঠিখানার অবস্থা।

আমি এক জীবনে একটাই লক্ষ্যস্থির করতে পেরেছি- তোমাকে ভালোবাসা। এ ছাড়া আমার আর কোনো গন্তব্য কোনোকালেই ছিল না রে। আজ যেটুকু এসেছি তাও তোমার কারণেই। যা কিছু পেয়েছি তাও তোমার করুণায়। আমার মতো হাদারামের এক জীবন তোমার মতো দেবীর দানে ও করুণায় দিব্যি চলে যায়। তাই চলছিল। বেশ ছিলাম তোমার দেয়া বেদনা আর আঘাত নিয়ে। তোমার সাথে কোনো সুখস্মৃতি নেই এটা বললে মিথ্যে বলা হবে। হয়তো তুমি দাওনি। তাতে কি? আমি তো তুলে নিয়েছি তোমার অনুভবের বাগান থেকেই। অপরাজিতা অনেক প্রিয় ফুল তোমার। যেদিন তুমি তোমার জানালার কাছে একটা অপরাজিতার গাছ দেখতে পেলে তুমি আনন্দে আত্মহারা হলে। ভাবলে আপনা আপনি বীজ মাটিতে পড়ে হয়েছে। না রে তা হয়নি। গাছটা আমিই লাগিয়েছিলাম তোমার জন্যে। ওটা লাগাতে গিয়ে ধরা পড়ি তোমার সবচেয়ে কাছের বান্ধবীর কাছে। আমি হাতজোড় করে ওকে অনুরোধ করলাম ও যেন কাউকে কিছু না বলে। তোমার বান্ধবীটি আমার দিকে গভীর বিস্ময়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুধু বলেছিল, ‘এত ভালোবাসিস ওকে?’ আমি কিচ্ছু বলতে পারিনি। ভালোবাসা কি আমি তখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি যে।।

গাছটা দিন দিন বড় হতে লাগলো তোমার হাতের আদর আর যতেœ। আমার তখন অদ্ভুত এক আনন্দ হতো জানো। মনে হতো অপরাজিতা নয় তোমার হাতের ছোঁয়া পাচ্ছি আমি। এক বিকেলে গাছটা জড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিলে। তোমার সমস্ত শরীর নির্ভার দাঁড়িয়ে ছিল গাছটার গায়ে। সেদিনই আমি প্রথম নিজেকে পুরুষ ভাবতে শুরু করলাম। এই সুখের দৃশ্যগুলো আমি চুরি করেছি তোমার থেকে। চলে আসবার আগে তুমি সমেত গাছটার একটা ছবি নিয়ে আসি। সেই ছবিখানির জন্যে আমি তোমার বন্ধুটির কাছে কৃতজ্ঞ। আমি চলে আসবার দিন ওরা অনেক কেঁদেছে। খুব করে চাইছিল তোমার সাথে আমার একটা কিছু হোক। হা…হা। দেখেছো এতকাল পরেও প্রেম শব্দটা বলতে দ্বিধায় ভুগছি। আসলে তুমি তো ছিলে আমার দেবী। তেমনি তো জেনেছি ও মেনেছি। দেবীর তো পূজারী হওয়া চলে। প্রেমিক নয়। ওহ সেই ছবিটা ছাড়াও আরও কিছু টুকরো সুখ আছে আমার কাছে। রিকশা দিয়ে যাবার সময় একবার তোমার রুমাল পড়ে গেল রাস্তায়। আমি দৌড়ে গিয়ে কুড়িয়ে নিলাম। ভাবলাম পরদিন তোমার বান্ধবীকে দিয়ে পাঠিয়ে দেবো। সারা রাত রুমালটা বালিশের পাশে রেখে দিলাম। সকালে রুমালটা হাতে নিতেই কি এক গভীর বেদনায় বুকটা ভরে গেল। মনে হলো আমি রুমাল নয় তোমাকেই আমার থেকে আলাদা করছি। পুরো রুমাল তোমার গায়ের মিষ্টি গন্ধে ভরে ছিল। আজ অবধি রুমালটা তেমনি রয়ে গেছে। তুমি শুনলে হাসবে জানি। তবুও বলি কখনই চকোলেট র‌্যাপারগুলো তুমি হাত দিয়ে খুলতে না। দাঁত দিয়ে কামড়ে খুলতে। একবার একটা কলম ভাগ্যগুণে পেয়ে গেলাম। কলমের বিপরীত প্রান্ত তুমি আনমনেই মুখে পুরে দিতে। তোমার ঠোটের স্পর্শ লাগা সেই কলম আর চকোলেট র‌্যাপারগুলো এখনও আমার দিবারাত্রির সঙ্গী। আর সবচেয়ে প্রিয় সুখ, যেদিন তুমি আমায় স্পর্শ করলে। তোমার দেয়া স্পর্শটুকুই আমার একমাত্র সতেজ অনুভূতি যা প্রতিটা মুহূর্তে আমি বয়ে বেড়াতে পারি। তোমায় ধন্যবাদ। তুমি কি ভেবেছিলে আমি জানি না। কিন্তু আমার অই সময়ে মনে হয়েছিলো, ‘আম পাইলাম। তাহাকে সম্পূর্ণ রূপে পাইলাম।’ কি সব ছেলেমানুষি লেখা লিখছি, তাই না?

এই চিঠিটাও হয়তো তোমার ঠোঁটের কোণে উপেক্ষার হাসি জন্ম দেবে। কিন্তু কি করবো বলো? না লিখে যে আর পথ ছিল না। তুমি যতই উপেক্ষা করো তোমার কাছেই নত হওয়া ছাড়া আমার যে আর কোনো রাস্তা জানা নেই। তোমার সেই গাছটা জড়িয়ে ধরার দৃশ্য যেমন আমার ভেতরে এক প্রেমিক পুরুষের জন্ম দিয়েছিল ঠিক তেমনি তোমার দেয়া থাপ্পড়ই আমাকে এক যোদ্ধা পুরুষে রূপ দিলো। আমি বুঝলাম আমাকে তৈরি হতে হবে। আর যতদিন তৈরি না হবো ততদিন আর তোমার সামনে যাবো না। মাকে বুঝিয়ে অনেক কষ্টে ঢাকায় ভর্তি হলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ চান্স পেয়ে অনার্সে কেমন কেমন করে আমি এপ্লাইড ক্যমেস্ট্রিতে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হলাম। মাস্টার্সেও অনুরূপ ফলাফলে আমার ডিপার্টমেন্টাল হেড আমাকে স্কলারশিপের জন্যে আবেদন করতে বললেন। ততদিনে বিশ্ববিদ্যালয় এ জয়েন করেছি। দুবছরের মাথায় স্কলারশিপ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় চলে এলাম পলিমার ক্যামেস্ট্রিতে পিএইচডি করতে। এখন তুমি ভাবতে পারো তোমার জন্যেই যদি প্রস্তুতি নেয়া তবে চাকরি পেয়ে তোমার সামনে দাঁড়াইনি কেন। কি করে দাঁড়াই বলো? ততদিনে প্রভাষকের সাথে প্রেমের পর্ব সেড়ে তুমি প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর ঘরণী। তুমি স্বস্তিতে আর সুখে থাকবে এটাই তো আমার কাম্য ছিল। যতদূর জেনেছি তুমি ভুলেও কখনও আমার কথা মনে করোনি। কখনও কোন বন্ধুর কাছে জানতে চাওনি, আমার বোন তোমার সাথেই পড়তো তাকেও জিজ্ঞেস করোনি। তার মানে আমি বুঝে গেলাম আমি তোমার কোথাও নেই। ছিলামও না কোনোদিন। তোমার মনে আছে খুব ছোটবেলায় খেলতে পারতাম না বলে তুমি সব সময় আমাকে খেলার দুধ-ভাত করে রাখতে। আমিও পরম উৎসাহে দুধ-ভাত হতাম স্রেফ তুমি বলতে বলে। আমি আজও তোমার জীবনে দুধ-ভাত হয়েই রইলাম রে।

অস্ট্রেলিয়া আসার পর ভাবলাম তোমার থেকে কিছুটা দূরে এসে ভালোই হলো। নিয়তি সেদিন মুচকি হেসেছিল বোধকরি। প্রথমদিকটায় রিসার্চ, সেমিনার, ক্লাস এসব নিয়ে দারুণ ব্যস্ততায় গেছে। পিএইচডি কমপ্লিট করে আবার ঢাকা ফিরে এলাম। চার বছরের মাথায় আবার অস্ট্রেলিয়া। আরএমআইটিতেই জয়েন করলাম। তুমি কি জানো তোমার সবচেয়ে কাছের বান্ধবীটি ওর স্বামী সন্তানসহ সিডনিতেই থাকে? মাঝে মাঝে অবসর মিললে ওর ওখানে যাই। তোমার কথা সেই আড্ডায় অনিবার্য। ঘরে ফিরে আবার সেই, ‘নিরালা নিঝুম অন্ধকার।’ তবু তুমিহীন তুমিময় এ জীবনেই আমি অভ্যস্ত হয়ে উঠলাম। কারো দিকে যে তাকাইনি এমন বললে সত্য লুকানো হবে। তাকিয়েছি। তোমার ছায়ার আকারও যদি কোথাও দেখেছি চমকে উঠে তার পিছু নিয়েছি। কাছাকাছি হতেই বুঝেছি আমি যা খুঁজি তা এ নয়। আমি গোলাপের বুকে ভেজা মাটিতে গা এলিয়ে দেয়া বকুলের ঘ্রাণ খুঁজি। এমন ভুল আমায় ক্লান্ত করে, অসার করে। ভুলের প্রতিও তাই একসময় আগ্রহ হারাই। আমার দিন মাস বছরের রোদ জল বৃষ্টিতে ছায়াবৃক্ষ তুমি। খেটেখুটে ক্লান্ত শরীর রুমালে তোমার শরীরী ঘ্রাণ খোঁজে, বিধ্বস্ত মন অপরাজিতায় আশ্রয় নেয়। এ নিয়েই বেশ ছিলাম জানো।

ক্লাস শেষ করে বরাবর রসায়ন ভবনের পিছনের রাস্তাটা নিতাম। এক বাগান ভর্তি হিবিসকাসে আমি অপরাজিতার ছায়া খুঁজতাম। সেদিন যেতে গিয়ে থমকে গেলাম। চমকে উঠলাম। এ আমার মনের ভ্রান্তি নয় তো!!! সিডনির ঠাণ্ডা বায়ু এই মধ্য দুপুর কোন জাদুবলে তোমার ঘ্রাণ নিয়ে এলো। উতলা মন আমার ইচ্ছে অনিচ্ছের থোরাই কেয়ার করে গতি বদলে দিলো। গুণদার কবিতায় পড়েছিলাম, ‘তোমার খোঁপার মতন সুন্দর আর কোন ফুলদানী নেই।’ আমারও তেমনি বলতে ইচ্ছে করে, ‘তোমার শরীরী ঘ্রাণের মতন জাদুকরী আর কোনো সুগন্ধি নেই।’ অবশেষে খুঁজে পেলাম সেই ঘ্রাণ। খুব আশ্চর্য হলাম জেনে মেয়েটি আমাদের ডিপার্টমেন্টেরই। ওর চলন-বলন, কথন, অভিব্যক্তি আমাকে আর এক তুমির সামনে অযাচিতভাবেই দাঁড় করিয়ে দিলো। আমি অসহায় হয়ে পড়লাম। এই ছায়া তুমি যে পুরোপুরিভাবে আমাকে গ্রাস করছে তা বুঝতে দেরি হলো না। আমি পালাতে চাইলাম। ছায়া-তুমি আমায় পালাতে দিলো না। দিন দিন আমার প্রতি তার অমোঘ আকর্ষণকে সে অনিবার্য করে তুললো। কয়েকদিন এড়িয়ে চলতেই একদিন না বলে কয়ে আমার বাসায় এসে হাজির। আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে বোবা কান্নায় ভাসালো। তোমায় ছেড়ে আসার পর আমার পোড় খাওয়া শক্ত বুকের জমিন কোনো বর্ষণেই আর এমন করে সিক্ত হয়নি। বুঝলাম মেয়েটি তার সিদ্ধান্ত যা নেবার নিয়ে ফেলেছে। কিন্তু আমি কেন শক্ত হতে পারছি না? তবে আমিও কি…কিন্তু আমি তো আমায় জানি। ওকে সরাসরি আঘাতে ফিরিয়ে দিলে যে কোনো দুর্ঘটনা অবশ্যম্ভাবী। তাই ধীর প্রক্রিয়া অবলম্বন করতে হলো। এরই মাঝে একদিন বয়সের ব্যবধান তুলতেই ও আরও মরিয়া হয়ে উঠলো। জানালো ওর মা অনেক প্রগ্রেসিভ। বোঝানোর সব রকম পথ সে একটা একটা করে বন্ধ করে দিলো।

এরই মাঝে একটা বিকেল হঠাৎই আশীর্বাদ হয়ে এলো। মাউন্টেনে ঘুরতে ঘুরতে ও হঠাৎই ফেসবুকে মা-মেয়ের ছবি দেখালো। আমার পৃথিবী দুলে উঠলো। মনে হলো পুরো মাউন্টেইন যদি আমার চোখের সামনে হেলে পরতো তাতেও আমি এতটা আশ্চর্য হতাম না। ও তোমার মেয়ে! এও কি সম্ভব! প্রকৃতির এই অদ্ভুত খেয়াল কার জন্যে? তোমার, আমার নাকি ওর জন্যে? যে তুমি আমায় সহ্যই করতে পারতে না সেই তোমার আত্মজা আমার জন্যে মরিয়া হয়ে উঠেছে? সমাজ, বয়স সব কিছু উপেক্ষা করছে এই আমার জন্যে? নাকি ও তোমার ভেতরের রূপ যা তোমার বাইরের শক্ত খোলসে আটকা পড়েছিল। আমি উদভ্রান্তের মতো ভাবছি আমার কি করা উচিত। ওর দিকে তাকালে একবার তোমাকে দেখি একবার আমার ভেতরের পিতৃত্বকে দেখি। আমি দিশেহারা হয়ে গেলাম। আস্তে আস্তে ওর কাছ থেকেই তোমার যত ছবি দেখলাম, ঠিকানা জানলাম। জানলাম তোমার জীবনের অজানা অনেক অধ্যায়। আর দেরি করা ঠিক নয় ভেবে সিদ্ধান্তে স্থির হলাম। ভেবে দেখলাম সব কিছু তুমি যদি ওকে জানাও ও তোমাকে ভুল বুঝবে, আমি নিজ থেকে জানালে হয়তো তুমি ওকে হারিয়ে ফেলবে। সব দায় তাই নিজ কাঁধে তুলে নিলাম। তাই তো নিয়ে এসেছি রে সারা জীবন। তোমার কোনো অনিষ্ট যে আমার সইবে না। সিদ্ধান্ত নিলাম যে করেই হোক আমাকে সরে যেতে হবে। অনেক অনেক দূরে। যেমন করে একদিন সরে গিয়েছিলাম তোমার জীবন থেকে।

তুমি যত দ্রুত পারো অস্ট্রেলিয়া এসো। ওর এখন খুব প্রয়োজন হবে তোমাকে। আমার প্রতি তীব্র ঘৃণা থেকে ও যেন বেরিয়ে আসতে পারে তার জন্যে তোমার সাহায্য ওর বড্ড প্রয়োজন। ভেবো না। অল্প বয়সের মোহ খুব দ্রুত কেটে যায়। তোমরা ভালো থেকো।

তোমায় চাঁদনী লিখবো না মুনের মা অনেক ভেবেও স্থির করতে পারিনি। তাই সম্বোধনহীন এই চিঠি। তুমি তোমার ইচ্ছে মতন লিখে নিও। এক জীবনে তোমায় নিয়ে বাঁচা হলো না। এক চিঠিতে দুজন না হয় থাকলাম অনন্তের সাক্ষী হয়ে।

তোমার হাদারাম

দোদুল।।

বিঃ দ্রঃ- প্রেশারের ওষুধটা ঠিক মতন খেও। মুনের জন্যে তোমায় বাঁচতে হবে আরও কিছু কাল। ও হ্যাঁ তোমাদের কিছু ছবি ওর কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছি আর তোমার কিছু ছবি ওর ওয়াল থেকে চুরি করেছি। শুধু তোমার ছবি ওর কাছে চাই কি করে বলো? এটুকু নিশ্চয়ই ক্ষমা করবে? তোমার মূল্যবান সময়ের অনেকটা নিয়ে নিলাম। ভয় নেই তোমায় লেখা এটাই আমার দ্বিতীয় ও শেষ চিঠি।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj