হঠাৎ দেখা : কাইয়ুম নিজামী

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

অবাক হয় জিনিয়া। মাথায় রক্ত উঠে যায়। শরীরের শিরা-উপশিরাগুলো যন্ত্রণায় টনটন করে ওঠে। শাকিলের মন এত নোংরা হতে পারে, এত ছোট হতে পারে তার হৃদয়, সে কখনো কল্পনা করেনি। শাকিল খুব সুন্দর করে কবিতা আবৃত্তি করতে পারে। গানের গলাও আছে তার। যে কণ্ঠে সে সুকান্তের কবিতা আবৃত্তি করেছে, যে কণ্ঠে একদিন ভালোবাসার প্রচুর গান গেয়েছে, সে কণ্ঠ এত জঘন্য হলো কি করে? শাকিলের মাথা ঠাণ্ডা হয়নি। চায়ের কাপ রেখে দিয়ে উঠে যায়। আলমারি খোলে। নতুন দু’টা শার্ট বের করে আনে। বারান্দায় স্ত‚প করে রাখে।

অতঃপর গ্যাস লাইট দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। নতুন দু’টা শার্টে আগুন ধরে। কয়েক মিনিটের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। জিনিয়া শুধু চেয়ে থাকে। শার্টগুলো পোড়া শেষ হলে শাকিল দুই হাতে ছাইগুলোকে বাইরে নিয়ে যায়। মাত্র চারদিন আগে শার্টগুলো ফ্যাশন হাউস থেকে বানিয়ে এনেছে। একদিনও ব্যবহার করেনি। সুন্দর ঝকঝকে দু’টা ফুল শার্ট মুুহ‚র্তে পুড়ে ছাই হয়ে গেল। জিনিয়া ভেবে পায় না মানুষ এমন পশুর মতো আচরণ করে কিভাবে? জিনিয়া বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকে। বাসার সামনে খালি জায়গায় কুকুর হাঁটছে। কুকুরটির একটি পা বাঁকা। খেয়াল করে দেখে জিনিয়া। সম্ভবত মায়ের গর্ভের। অর্থাৎ জন্মের সময়ই এমনটি ছিল।

কাপড় পোড়া ছাইগুলো বাইরে ফেলে শাকিল হনহন করে ঘরে প্রবেশ করার সময় জিনিয়া মুখোমুখি দাঁড়ায়। শক্ত করে তাকে কিছু বলা দরকার। এভাবে জীবন চলে না। চলতে পারে না। চলতে দেয়া যায় না। মানুষের অভদ্রতারও একটা সীমা আছে। তাছাড়া মুখ বুজে নীরবে সব সহ্য করলে তাকে হয়তো কঠিন মূল্য দিতে হবে। নদীর জলে ভেসে আসেনি সে। সে শাকিলের বিয়ে করা স্ত্রী এবং সে বিয়ে তাদের দীর্ঘদিনের ভালোবাসার বহু আকাক্সক্ষার ফসল। অনেক বেশি দাম দিয়ে কেনা।

শাকিল।

বলো।

শার্টগুলো পুড়ে ফেললে?

আজকাল চোখে কম দেখো নাকি?

কৈ না তো।

তাহলে প্রশ্ন করলে কেন? গ্যাস লাইটারের আগুনে তোমার চোখের সামনেই তো পুড়িয়ে ছাই করে ফেললাম।

দেখলাম। একজন ভদ্রলোকের অভদ্র আচরণ চেয়ে চেয়ে দেখলাম। কিন্তু সুন্দর শার্টগুলোর তো দোষ ছিল না। শুধু শুধু নিরপরাধ জামাগুলো পুড়ে ছাই করলে কেন?

শুধু জামা নয়, ইচ্ছে হয়েছিল বাসাটা সুদ্ধ জ্বালিয়ে দিই। শুধু বাড়িটা আমার নিজের না এ জন্যই-

আর বাড়ির ভেতরের মানুষ?

মানুষ সুদ্ধ জ্বালিয়ে দিতাম। ভয় কাকে বলে শাকিল জানে না। জেল, ফাঁসি পুরুষের জন্য এমন কিছু না।

তাহলে গলা টিপে মেরে ফেলো আমাকে। বাড়ি শুধু জ্বালাতে হবে না।

স্বামী তার স্ত্রীকে গলা টিপে হত্যা করছে এটা তো আর এমন নতুন কিছু নয়। যৌতুকের জন্যে, কাজের মেয়ের সাথে অবৈধ সম্পর্ক বজায় রাখার জন্যে, যারা একের পর এক স্ত্রীদের হত্যা করে চলেছে, গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লগিয়ে আত্মহত্যার নামে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে তারা তোমার মতোই পুরুষ। ইচ্ছে করলে তুমিও আমাকে গলা টিপে মেরে ফেলতে পারো, যদি ভাবো আমার মৃত্যুই তোমার সকল সমস্যার সমাধান করতে পারে।

প্রয়োজনে তাই করতে হবে।

কি বললে? খুন করবে আমাকে? এত নিষ্ঠুর তুমি হতে পারবে? হাতটা একবারও কেঁপে উঠবে না?

না একবারও কেঁপে উঠবে না। এখন আমি ঠিকই বুঝতে পারছি মানুষ তার নিজের স্ত্রীকে খুন করে কেন?

কেন খুন করে?

যখন স্ত্রীর আচার, ব্যবহারে স্বামী অস্থির হয়ে ওঠে। দুশ্চিন্তায় টেনশন করতে করতে স্বামী যখন রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে কাটায়, স্ত্রীর ব্যবহার স্বামীর ধৈর্যের সকল সীমা যখন অতিক্রম করে, তখন নিজের জীবনের প্রতি মানুষের কোনো মায়া থাকে না। স্ত্রী কেন, গুষ্ঠিসুদ্ধ খুন করতেও মানুষ তখন সংকোচ করে না।

আমি এমন কি করেছি যে সারারাত তুমি টেনশন করবে। ঘুমের ওষুধ খেয়েও ঘুমাতে পারবে না?

কি করেছো তুমি ভালো করেই জানো। তুমি তো আর কচি খুকি নও যে এ টু জেড পর্যন্ত সব হাতের আঙুল ধরে বুঝিয়ে বলতে হবে। কোনো কিছু জেনেও না জানার ভান করা আমার একদম সহ্য হয় না। পথ ছাড়ো আমি বাইরে যাবো।

এত রাতে বাইরে যাবে?

হ্যাঁ- যাবো।

কোথায় যাবে?

জাহান্নামে।

বাসায় আমি একা। চারদিকে চুরি ডাকাতি হচ্ছে।

কোনো অসুবিধা নেই তুমি একাই যথেষ্ট।

এত রাতে তুমি বাইরে যেতে পারবে না।

আমি যাবোই তুমি পথ ছাড়ো।

যদি পথ না ছাড়ি?

পথ তুমি ছাড়বে না তোমার বাপ ছাড়বে।

ছিঃ শাকিল তুমি এমন করে বলতে পারলে? তোমার আমার সংসারে অনেক কিছু হবে কিন্তু এর মধ্যে আমার বাবাকে টেনে আনলে? বাবা বেঁচে থাকলে আমি হয়তো দুঃখ পেতাম না।

শাকিল এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকায় জিনিয়ার দিকে। তারপর ঘর থেকে জোর করে বেরিয়ে যায়। জিনিয়া অবাক হয়। তবে বাধা দেয় না। সে জানে বাধা দিয়ে শাকিলকে থামানো যাবে না। জিনিয়া সোফায় শরীরটাকে এলিয়ে দিয়ে বসে। মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে যায়। অতীতের অনেক কথাই মনে পড়ে তার। একবার বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক ক্রীড়ানুষ্ঠানে মনের মতো সাজে অংশ নিয়েছিল। রাধাকৃষ্ণ সেজেছিল তারা দু’জন। হাতে-মুখে নীল রং মাখতে প্রথমে আপত্তি করেছিল শাকিল। তুমি চমৎকারভাবে সাজবে আর আমার মুখ নীল রং। জিনিয়া খোঁপায় গাঁদা ফুলের মালা পরেছিল। গলায় ওর ছিল তাজা ফুলের মালা। লাল টকটকে একখানা আমেরিকান জর্জেট শাড়ি পরেছিল জিনিয়া। রাধার হাতে ছিল সেই বিখ্যাত হৃদয় হরণ করা বাঁশি। শাকিল আদৌ বাঁশি বাজাতে জানতো না। শুধু বাঁশি বাজাবার ভান করেছিল মাত্র। রাধাকৃষ্ণ সেজে অনেকক্ষণ মাঠের মধ্যে ঘুরে বেরিয়েছে তারা পাশাপাশি। শাকিলের বন্ধু সোহেল এক ফাঁকে ছবি তুলে নিয়েছিল। পরে ছবি দেখে অবাক হয়েছে জিনিয়া এবং শাকিল দু’জনই। চমৎকার মানিয়েছিল তাদের দু’জনকে। তখন জিনিয়ার মনে হয়েছিল অনুষ্ঠান যদি আরো দীর্ঘ হতো। তারা রাধাকৃষ্ণ হয়ে যদি আরো কয়েক ঘণ্টা পাশাপাশি হাতে হাত রেখে আরো কিছুটা সময় কাটানো যেতো তবে মন্দ হতো না। পরের দিন জিনিয়ার চোখে চোখ রেখে শাকিল বলেছিল কালকে আমার কি ইচ্ছে করছিল জানো? আমি কি করে জানবো? হাসি হাসি মুখে জবাব দিয়েছে জিনিয়া। শাকিল তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলেছে ইচ্ছে হচ্ছিল তোমাকে জড়িয়ে ধরি। জিনিয়া আবারও হেসে বলেছিল জড়িয়ে ধরলেই তো পারতে। কারো তো আর জানবার বাকি নেই।

শাকিলের পুড়ে ফেলা শার্টের কথা মনে পড়ে জিনিয়ার। কাপড়টা ওর মামাতো ভাই শামীম সিঙ্গাপুর থেকে এনেছিল। তাকে দিয়ে বলেছিল, জিনিয়া ম্যাক্সি বানিয়ে নিস, তোর গায়ের রংয়ের সাথে মিলিয়ে এনেছি। জিনিয়া হেসে ধন্যবাদ জানিয়েছে। কাপড়টা পছন্দ হয় তার। মনে মনে স্থির করে ম্যাক্সি বানাবে। কিন্তু শাকিল কাপড়টা দেখার পর হঠাৎ বলে ওঠে সুন্দর তো! শার্ট বানালে কেমন হয়? জিনিয়া বলেছে তোমাকে মানাবে ভালো। তারপর নিজেই শাকিলকে নিয়ে টেইলরের দোকানে গিয়েছে। শার্ট সেলাই করা হলে নিজে এনে আলমারিতে রেখেছে। জিনিয়া শাকিলকে প্রেজেন্ট করেছে শুধু এ অপরাধেই শার্ট দুটো পুড়ে ছাই হয়ে গেলো কয়েক মুুহ‚র্তে। জিনিয়া চেয়ে চেয়ে শুধু দেখলো তার বলার কিছুই থাকলো না। যেমন করে যুদ্ধের সময় তার মার চোখের সামনে তাদের বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু কারো কিছু বলার ছিল না।

জিনিয়া তার মায়ের মুখে শুনেছে সে ভয়াবহ দিনটির কথা। সে কথা মনে হলে আজো তার বুকখানা কেঁপে কেঁপে ওঠে। মানুষ কিভাবে এমন নির্মম হতে পারে। মা বলেছে সেদিন ছিল সোমবার। সকালে চা খেয়ে মা মাত্র বারান্দায় বসেছে। সুন্দর সোনালি রোদে ভরে গেছে উঠান। মাথার ওপর দিয়ে একটা চিল হঠাৎ উড়ে গেলো, উঠানের অনেকগুলো মুরগি চোখের পলকে এদিক ওদিক ছুটে পালিয়ে গেলো। কিন্তু বাচ্চাওয়ালা মুরগিটা কোথাও ছুটে গেলো না। ডানা ছেড়ে বসে রইলো আর বাচ্চাগুলো মায়ের টকটক শব্দ শুনে মুহ‚র্তে মায়ের পাখার নিচে ঢুকে গেলো যেন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈনিক বিপদের সংকেত পেয়ে বাঙ্কারে আশ্রয় নিলো। ঠিক তখনই ধুপধাপ পা ফেলে দশ বারোজন পাকিস্তানি সৈন্য বাড়িতে প্রবেশ করে। সাথে সাহায্যকারী কয়েকজন বাঙালি। তাদের কাঁধেও অস্ত্র। মা অনুমান করে নেয় ওরা রাজাকার। পথ দেখিয়ে নিয়ে এসেছে। রাজাকারের দলনেতা মার কাছে এসে বিকৃত কণ্ঠে প্রশ্ন করে এই বেটি তোর স্বামী কোথায়? মার ইচ্ছে করছিল চিৎকার করে বলতে যুদ্ধে গেছে। ট্রেনিং নিতে গেছে। তোদের ধ্বংস করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু বলতে পারেনি। যুদ্ধের সময় কৌশল অবলম্বন করা বুদ্ধিমানের কাজ।

পাঞ্জাবি হানাদার বাহিনীর আগমনের সাথে সাথে বাড়ির লোকজন যে যার ইচ্ছেমতো পথ বাছাই করে ছুটে পালিয়েছে কিন্তু মা পালাতে পারেনি। কারণ বাবা যুদ্ধে যাবার সময় পঙ্গু দাদিকে মার হাতে তুলে দিয়ে গেছে। বলেছে, শাহানা আমি যাচ্ছি যুদ্ধ করতে। দেশের এমন দুর্দিনে ঘরে বসে থাকা মানায় না। আমি আমার দায়িত্ব পালন করতে যাচ্ছি। তোমার দায়িত্ব হলো আমার পঙ্গু মাকে দেখাশোনা করা। তার যতœ নিও।

কবে আসবে?

জানিনে।

তবে কি আর দেখা হবে না?

হয়তো অনেকবার দেখা হবে। হয়তো জীবনে আর কখনো দেখা হবে না।

একজন সৈনিক এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে পারে না।

কিন্তু……..।

কোনো কিন্তু নয় শাহানা। আমার দেশের অসংখ্য নিরপরাধ লোককে হানাদার বাহিনী কুকুরের মতো গুলি করে হত্যা করছে। নিরীহ এই লোকগুলোর বুকের তাজা রক্তে সিক্ত হচ্ছে গ্রামবাংলার নরম মাটি। আমি এই নিরপরাধ মানুষ হত্যার বদলা নিতে যাচ্ছি। হয়তো তাদের বুকের তাজা রক্তে রাঙাবো দু’হাত নয়তো তাদের বুলেট বুকে নিয়ে মাতৃভূমির ঋণ শোধ করবো। তাই বলছিলাম কি হয়তো দেখা হবে বারবার অনেকবার। নয়তো এ জীবনে আর কখনো দেখা হবে না। দেশ যখন স্বাধীন হবে দেশের মানুষ যখন শৃঙ্খলমুক্ত হবে, শোষণমুক্ত হবে তখন শিমুলের লাল ফুলে কৃষ্ণচূড়ার রক্ত রাঙা ফুলে তুমি আমাকে দেখতে পাবে।

তবুও বুকে কষ্ট লাগা স্বাভাবিক। কিন্তু তোমাদের শক্ত হতে হবে। তুমি যদি তোমার যুবক স্বামীকে বুকে ধরে রাখতে চাও, কোনো মা যদি তার বলিষ্ঠ সন্তানকে যুদ্ধে যেতে অনুমতি না দেয় তবে দেশ স্বাধীন হবে কিভাবে?

জিনিয়া থাকলো তোমার কাছে একজন মুক্তিযোদ্ধার প্রেমের ফসল হয়ে। যুদ্ধে যদি আমি মারা না যাই তবে আমার মুখে সে স্বাধীনতার গল্প শুনবে। আর আমি যদি ফিরে না আসি তবে তুমি তাকে মুক্তিযুদ্ধের গল্প শোনাবে।

আমার একমাত্র সন্তানের চোখে আমি স্বাধীন বাংলাদেশের ছবি দেখবো।

গাছে গাছে ফোটা ফুল দেখবো। ফসলে ফসলে ভরা সোনালি মাঠ দেখবো। স্বাধীনতার ইতিহাস যখন লেখা হবে তখন তুমি হবে একজন বীর শহীদের স্ত্রী আর জিনিয়া হবে তার কন্যা। বলো এর চেয়ে মূল্যবান কোনো পদবী পৃথিবীতে কেউ কি কখনো পেয়েছে? এ জন্যে বাড়ির সব লোক যখন ভয়ে পালিয়েছে তখন মা পালাতে পারেনি। ঘরে পঙ্গু শাশুড়ি। পাক হানাদার বাহিনী পাউডার ছিটিয়ে ঘরগুলো জ্বালিয়ে দেয়ার আয়োজন করছে দেখে মা কোনো প্রকারে দাদিকে নিয়ে ঘরের পাশের আম গাছটার নিচে সরে গেলো। বাড়িতে আগুন দিলো রাজাকার। চোখের সামনে সবগুলো ঘর জ্বলে জ্বলে ধসে গেলো। আর অনেক কিছু বলার থাকলেও কিছু বলতে পারেনি সেদিন। শাকিলও আজ সে রকম ঘটনা ঘটালো রাগ করে শুধু শার্ট পুড়ে ছাই করলো না, সে সাথে পুড়ে ছাই করলো জিনিয়ার হৃদয়।

দুই.

জিনিয়ার সাথে শাকিলের পরিচয় ঘটে নাটকীয়ভাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে হঠাৎ খুন হলো মুনসুর। যেন ভূমিকম্পের মতো হঠাৎ কেঁপে কেঁপে উঠলো বিশ্ববিদ্যালয়। মিছিলে মিছিলে মুখরিত হলো সমগ্র এলাকা।

এখানে ওখানে প্রচণ্ড শব্দে ফাটলো বোমা। একটা জীবনের প্রতিশোধ নিতে অসংখ্য জীবন লাশের আশঙ্কা দেখা দিলো। নিরীহ ছাত্রছাত্রীদের মুখ শুকিয়ে গেলো ভয়ে। যে কোনো মুহ‚র্তে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। রক্তে লাল হয়ে যেতে পারে ভার্সিটির সবুজ চত্বর। মুনসুরের খুনের বদলা এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে সাময়িকভাবে মুক্তি পাবার জন্যে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করলো। দুর্ঘটনায় আহত রোগীকে ফার্স্ট এইড দিয়ে ছেড়ে দেয়ার মতো। ছাত্রছাত্রীদের চব্বিশ ঘণ।টার মধ্যে হল ছেড়ে দিয়ে নিজ নিজ আশ্রয় স্থানে চলে যেতে নির্দেশ দিলো। আরেকটা খুন যাতে না হয় সে জন্যে তৎপর হলো সবাই। কিন্তু যে খুনটা হয়ে গেলো তা না হবার জন্যে কেউ তৎপর ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা ছাত্র মুনসুর চলে গেলো মায়ের কোলে। তার লাশের জানাজার নামাজ হলো। বড় বড় নেতারা জানাজার নামাজের অংশ নিলেন। পত্রিকায় ছবি ছাপা হলো বড় করে। ওর মৃত্যু যেন আসল নয়। ওর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করাই যেন মুখ্য হয়ে দাঁড়ালো। কয়েকদিন থেকে জ্বরে ভুগছিল জিনিয়া। নিজে নিজে ডাক্তারি করতে গিয়ে এমনটি হয়েছে। এটা ওটা ট্যাবলেট কিনে খেয়েছে। ভেবেছে সেরে যাবে। কিন্তু সারেনি। শেষ পর্যন্ত ডাক্তারের কাছে যেতেই হলো। মাঝখানে শরীরটা অসম্ভব দুর্বল হয়েছে। ডাক্তার বলেছেন এভাবে কখনো নিজে নিজে ওষুধ খাবেন না। ডাক্তার সাহেব ভীষণ বিরক্ত হয়েছেন। আপন মনে ভন ভন করে বললেন কেন যে আপনারা লেখাপড়া শিখছেন। জিনিয়া চুপ করে ছিল। কথা বাড়িয়ে কোনো লাভ নেই। সবাই হল ছেড়ে চলে গেছে। জিনিয়া দুর্বল শরীরে একটু গুছিয়ে নিতে সময় নিলো। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যায়। গুলি খাওয়া পাখির মতো যে যত তাড়াতাড়ি পারে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বেরিয়ে গেছে। ক্যাম্পাস অনেকটা ফাঁকা। বুটের শব্দ। পুলিশের আনাগোনা। অথচ কয়েক ঘণ্টা আগেও ক্যাম্পাস ছিল হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর কলকাকলিতে ভরা। মনটা খারাপ হয়ে যায় জিনিয়ার। ভার্সিটি একবার বন্ধ হলে সহজে আর খোলে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যেন খুনোখুনির সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নিয়েছে। একটা খুন হলে কয়েকদিন বন্ধ থাকার পর ভার্সিটি আবার খুলে দেয়া হয়। কিন্তু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সহজে খোলার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। পরীক্ষা শুরু হয়েছিল আবার কখন শুরু হবে ঠিক নেই। দুর্বল শরীরটাকে কোনো প্রকারে টেনে টেনে হোস্টেল ত্যাগ করে জিনিয়া। কদমতলী থেকে এসে যখন বাসে উঠে তখন বেলা প্রায় শেষ। তবু কোনো চিন্তা করে না জিনিয়া। পারাপার কাউন্টার থেকে টিকেট কিনে বাসে উঠে চুপচাপ বসে থাকে। রাস্তা ভালো। ননস্টপ বাস। তিন ঘণ্টার মধ্যে কুমিল্লা পৌঁছে যাবে। হঠাৎ একটা হকার উঠে বক্তৃতা শুরু করে। একশত একজন হেকিম দীর্ঘদিন ধরে নিরলস পরীক্ষা করে আল্লাহর সৃষ্টি মাটির নিচে বসবাসকারী কেঁচোর ওপর গবেষণা করে এই তেলটি আবিষ্কার করেছেন। মানুষের শরীর একাশি রকমের বাতে আক্রান্ত হয়। এই কেঁচোর তেল তিন ফোঁটা গরম করে শরীরের হাতে আক্রান্ত স্থানে লাগিয়ে কয়েকবার মালিশ করলেই রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যাবে। বাতটা কি জঘন্য তা বুঝতে হলে পান পাতা বা আপন পাতার ওপর পরিষ্কার তেল লাগিয়ে বাতে আক্রান্ত স্থ’ানে কেঁচোর তেল মালিশ করে সেই স্থানে পাতা বেঁধে দিলে সঙ্গে সঙ্গে পাতা কালো হয়ে যাবে, অর্থাৎ বুঝতে হবে বাতের কিছুটা অংশ পান পাতায় উঠে এসেছে। দুই নম্বরে এই তেলটা কাজ করে আর একটা কঠিন রোগের। দুর্ভাগ্যবশত যারা স্ত্রীর কাছে যেতে পারেন না। নিজের স্ত্রীকে দেখলে অসহায় অসহায় ভাব ফুটে ওঠে চোখে-মুখে। অতীতের কোনো খারাপ অভ্যাসের কারণে পেনিস বাঁকা হয়ে গেছে তাদের সত্যিকারের বন্ধু এই কেঁচোর তেল। মাত্র তিন ফোঁটা তেল গরম করে লাগিয়ে গোড়া থেকে মালিশ করতে হবে। কয়েকদিন ব্যবহার করার পর দেখবেন লোহার রডের মতো আপনার অঙ্গ শক্ত হয়ে গেছে। আপনি বাঘের মতো মাথা উঁচু করে হাঁটতে পারবেন। এবার লোকটা বাম হাতে একটা আঙুলকে উঁচু করে ডান হাত দিয়ে মালিশ করে দেখিয়ে দিচ্ছে কিভাবে তেল লাগাতে হবে। অসহ্য লাগে জিনিয়ার। ব্যাগ থেকে যায়যায়দিন পত্রিকাটি নিয়ে চোখ বুলাতে থাকে এ দেশে যার যা খুশি বলছে যার যা খুশি করছে সরকার বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কারো মাথা ঘামাবার যেন কিছুই নেই। লোকটা তখন বলছে আপনার টাকা আমার পকেটে জমা থাকবে। বিফলে মূল্য ফেরত। শুধু খালি কৌটাটা নিয়ে এলেই হলো। অসহ্য লাগে জিনিয়ার। চারদিকে শুধু প্রতারণা। যেভাবেই হোক দু’টো পয়সা হাতিয়ে নিতে পারলেই হলো। শত শত প্লাস্টিকের কৌটায় হাজার রকমের ওষুধ। মানুষের জীবন নিয়ে খেলতে একটুও কষ্ট হয় না তাদের। এই দুর্বিষহ অবস্থা থেকে জিনিয়াকে মুক্তি দিলো বাসের ড্রাইভার। বাস ছেড়ে দিলো। হকার অনেকটা চলন্ত অবস্থায় বাস থেকে নেমে গেলো। একটা ভালো লক্ষণ হলো তেলটা কেউ কিনলো না। আবার বাস ভর্তি কতগুলো মানুষ প্রতিবাদ করে কেউ কিছু বললোও না। বাস ভাটিয়ারী অতিক্রম করার পর জিনিয়া দেখলো লাল থালার মতো সূর্যটা সমুদ্রের ওপারে পানির নিচে ডুবে যাচ্ছে। সে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। অসংখ্য নৌকা ভাসছে সাগরে। দুলছে ঢেউয়ের আঘাতে আঘাতে। ঐ ক্ষুদ্র নৌকাটির মতো নিজেকে অসহায় মনে হয় তার। অসুখ-বিসুখ হলে মানুষের মন এমনিতে দুর্বল হয়ে পড়ে।

মাথাটা ঝিমঝিম করে জিনিয়ার। শরীরটা অসম্ভব দুর্বল। মনে হচ্ছে যেন বুকের ভেতরটা শুকিয়ে যাচ্ছে। নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট। খুব খারাপ লাগে তার। মানুষের শরীরের সাথে মনের কি গভীর সম্পর্ক। শরীর অসুস্থ হলে মানুষ ধীরে ধীরে মনের জোর হারিয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। সাহস কমে যায়। কয়েকদিন আগে বিটিভিতে দি সোর্ড অব টিপু সুলতানের সিরিজ দেখছিল। যুদ্ধে আহত টিপু সুলতান। আহত হবার সাথে সাথে মনোবলও তার একদম কমে গেলো। ব্যাঘ্রের মতো আর গর্জন করে উঠলেন না। বিশ্বাসঘাতক মীর সাদিকের ষড়যন্ত্রমূলক সকল কথাই যেন বিশ্বাস করলেন। যুদ্ধে অসম চুক্তি মেনে নিলেন। হৃদয়ের টুকরো দুই শাহজাদাকেও যুদ্ধের ক্ষতিপূরণের টাকা জামানত হিসেবে ইংরেজ দরবারে পাঠাতে দ্বিধা করলেন না। শরীর সুস্থ থাকলে কিছুতেই তা করতেন না।

মনের এই দুর্বল মুহ‚র্তে অনেকদিন পর হঠাৎ আজ বাবার কথা মনে পড়লো জিনিয়ার। বাবাকে সে দেখেছে কিন্তু বাবার চেহারা ঠিকভাবে মনে পড়ে না। তখন সে অনেক ছোট ছিল। মার অ্যালবামে বাবার একটা ছবি রাখা আছে তাও ঝাপসা হয়ে গেছে। কপালের দিকটা মোটেই বোঝা যায় না। আমাদের দেশে তোলা সাদাকালো ছবি বেশিদিন টেকে না। কাগজ ভালো না। কেমিক্যালও হয়তো ঠিকমতো ব্যবহার করে না। অধিক লাভের প্রত্যাশায় সর্বত্র ভেজাল। জিনিয়ার খুব ইচ্ছে করে একটিবার বাবার কবরটা দেখতে। ইচ্ছে করে বাবার কবরের কাছে দাঁড়িয়ে ফাতেহা পাঠ করতে। কিন্তু এ ইচ্ছে তার কখনো পূরণ হবে না। বাবার কবরের ঠিকানা তার জানা নেই। বাবার লাশ কবরের মাটি পেয়েছে কি পায়নি তার সে জানে না। সে মার মুখে শুনেছে বাবা বাঙালি হত্যার পাল্টা নিতে যে যুদ্ধে গেছে আর ফিরে আসেনি। জিনিয়া জানে তার বাবা যুদ্ধে শহীদ হয়েছে। দেশের জন্যে বুকর তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছে। মা বলেছে শত্রু হননের তীব্র নেশা ছিল বাবার চোখে-মুখে। কোথায় কখন কিভাবে বাবা মারা গেলো সে কথা কেউ বলে দিতে পারেনি। তার ভীষণভাবে জানতে ইচ্ছে করে বাবা কোথায় কিভাবে মারা গেলো। শত্রু দেখে গেরিলাযুদ্ধের নিয়মকানুন ভুলে বাবা হয়তো পাগলের মতো সামনের দিকে ছুটে গেছে। শত্রুপক্ষের একটা বুলেটে বাবার বুক বিদীর্ণ করে হয়তো পেছনের দিকে বেরিয়ে গেছে। অথবা এমনও হতে পারে শত্রুর আগমনের অপেক্ষায় ছিল বাবা কোনো বাঙ্কারে বসে। হাতে রাইফেল বা মেশিনগান। কয়েক রাত ঘুমাতে পারেনি। হানাদারদের একটি দল এই পথ ক্রস করার কথা। খবর এসেছে ঘুমালে চলবে না। শিকার হাত ছাড়া হয়ে যাবার সম্ভাবনা আছে। ঠিক সেই মুহ‚র্তে হয়তো একটা মর্টারের গোলা এসে পড়েছে বাঙ্কারে। তাদের তো অনেক আছে। মর্টারের গুলিতে তছনছ হয়ে গেছে বাবার দেহ। ঠিক তখনই শুরু হয়েছে যুদ্ধ। অনেকক্ষণ চলেছে। হয়তো গেরিলারা কৌশল অবলম্বন করে পিছু হটে গেছে। বাবার ছিন্ন ভিন্ন দেহ আর খুঁজে নিতে পারেনি। অথবা এমন হতে পারে শত্রুদের হাতে পড়েছে বাবার ক্ষত-বিক্ষত লাশ। হানাদার বাহিনী বাবার লাশকে রাইফেলের বেয়নেটের খোঁচা দিতে দিতে উল্লাসে ফেটে পড়েছে। তারপর ফেলে দিয়েছে আশপাশে, শৃগাল, কুকুর টেনে টেনে খেয়েছে। জিনিয়ার খুব ইচ্ছে করে বাবার মৃত্যুবার্ষিকী পালন করতে। কিন্তু সে দিনটা তো তার জানা নেই যেদিন বাবার বুকের তাজা রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল বাংলার শ্যামল মাটি। জিনিয়াদের বাড়ির পেছন দিয়ে একটা মেঠোপথ সোজা উত্তর দিকে চলে গেছে। জিনিয়া অনেকদিন দেখেছে মা সে পথের দিকে তাকিয়ে নীরবে চোখের পানি ফেলছে। সে পেছন দিক থেকে মাকে কাঁদতে দেখে নীরবে সরে এসেছে ওখান থেকে। মারধ্যান ভঙ্গ করেনি। কখনো প্রশ্ন করেনি ও পথের দিকে তাকিয়ে মা অমন করে কাঁদে কেন? তবে অনেক ভেবে সে স্থির করেছে বাবা যুদ্ধে যাবার সময় বাড়ি থেকে পেছনের মেঠোপথ ধরেই বেরিয়ে গিয়েছিল। কেননা সামনের বড় রাস্তা তখন হানাদার বাহিনীর দখলে ছিল। যে কোনো লোককে সন্দেহ হলেই দাঁড় করিয়ে চেক করতো। অনেককেই সরাসরি গুলি করে হত্যা করেছে। প্রচণ্ড একটা যুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হলো।

রক্তে ভেসে গেলো পদ্মা, মেঘনা, যমুনা। মা ভাবলো বাবা ফিরে আসবে বিজয়ের গর্ব বুকে নিয়ে। বুকভরা ভালোবাসা নিয়ে মা-বাবার আগমনের অপেক্ষায় থাকলো। হাজারবার গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো বাড়ির সামনের রাস্তার মাথায় গিয়ে। এখন ওখানে গোলচক্করের কাছে আর হানাদার নেই। রাজাকার নেই। সদর রাস্তা দিয়ে চলাচলের ভয় নেই। দেশ এখন হানাদার মুক্ত। স্বাধীন দেশের পতাকা উড়ছে পতপত করে। মা অপেক্ষায় থাকে। তার প্রিয় মানুষটি যার ঘামের গন্ধে স্বদেশের মুক্তির আনন্দ খুঁজেছে সে এই এলো বলে। কিন্তু না, বাবা এলো না। সদর রাস্তায় তাকাতে তাকাতে সম্পূর্ণভাবে হতাশ হয়ে অতঃপর মা এবার পথ চেয়ে থাকতো বাড়ির পেছনের রাস্তায়। মাকে চমক লাগিয়ে দেবার জন্য বাবা হয়তো আসবে পেছনের মেঠোপথ ধরে। অথবা বাবা ভেবেছে যে পথে সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে সে পথেই সে বাড়ি এসে ঢুকবে বিজয়ের পতাকা বহন করে। মার ভরসা ছিল যুদ্ধে বাঙালি জিতবেই। হানাদার বাহিনী বেশিদিন টিকে থাকতে পারবে না। একদিন না একদিন দেশ স্বাধীন হবে তবে এ জন্যে অনেক রক্তের প্রয়োজন হবে। অনেক মায়ের কোল, বোনের বুক খালি হবে। কিন্তু মায়ের অবচেতন মনে শহীদদের তালিকায় বাবার নামটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। মা ভেবেছে যুদ্ধ শেষ হবার সাথে সাথেই বাবা ফিরে আসবে। বাবা খেজুরের রস দিয়ে পিঠা খেতে নাকি খুব পছন্দ করতো। তাই উঠানের বাম কোণের বলিষ্ঠ খেজুরের গাছটাকে পরিষ্কার করে ঠিকঠাক করে রেখে দিলো। বাবা এলেই কাটতে বলবে প্রথম খেজুরের রস। পুরো এক কলসি খেজুরের রস পাওয়া যায় ঐ গাছটা থেকে। সেই খেজুরের গাছটা আর কখনো রসের জন্য কাটা হলো না। পাশের বাড়ির আলমগীরের বাপ কত করে বললো চাচি বর্গা দাও আমাকে অর্ধেক রস তুমি পাবে কি বলিষ্ঠ গাছ। মা বলেছে না থাক ওটা কাটতে হবে না। রসের দরকার নেই। কখনো বা আপন মনে বলেছে ঐ গাছ কাটতে গেলে রস তো বের হবে না শুধু বের হবে আমার বুকের রক্ত। আশা খুব সাংঘাতিক জিনিস। মানুষ সহজে আশা ত্যাগ করে না। মার বেলায়ও ব্যতিক্রম হলো না। মা আশা ছাড়লো না। তার ধারণা ছিল বাবা আসবে। একদিন না একদিন বাবা আসবে। হয়তো কোথাও আটকা পড়ে আছে অসুখ-বিসুখ কিছু একটা হয়ে। এমনও তো হতে পারে আহত হয়ে কোনো হাসপাতালে আছে। বুলেটের আঘাত তাই সারতে সময় লাগছে একটু বেশি। শহীদ হলে তো তালিকায় নাম থাকতো।

না বাবা ফিরে এলো না। মা যখন বুঝতে পারলো যে বাবার ফিরে আসার আর কোনো সম্ভাবনা সত্যি নেই তখন থেকে মা যেন কেমন হয়ে গেলো। শরীরটা ক্রমশ ভেঙে যেতে লাগলো। কুমিল্লা শহরের নামকরা অনেক ডাক্তার দেখলো। সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ করে ডাক্তার জানালেন এর কোনো রোগ নেই। শরীর সম্পূর্ণ সুস্থ। তবে মানসিক কোনো অশান্তি থাকতে পারে। শুকিয়ে শুকিয়ে মা এক সময় বিছানা নিলো। খাওয়া দাওয়া বন্ধ হলো। সবাই বলাবলি করতে লাগলো বাবা ফিরে না আসায় দিলে চোট লেগেছে হয়তো বেশিদিন বাঁচবে না। চোখ মুখ হলদে হয়ে গেছে। ডাক্তাররা যখন কিছুই করতে পারলেন না তখন আর কি করা, স্বপ্নে পাওয়া ওষুধ জন্ডিসের চিকিৎসা করা হলো। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। মা আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলতে বলতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো। সেদিন ছিল সোমবার। মোয়াজ্জিন ভোরের আজান শেষ করেছে মাত্র। মা জিনিয়ার হাতখানাকে বুকের মধ্যে চেপে ধরে মুখের দিকে শুধু তাকিয়ে থাকলো। মুখে কোনো কথা বললো না বটে কিন্তু চোখের পাতায় ভেসে উঠলো হাজার প্রশ্ন। জিনিয়া মার চোখের ভাষা কিছু বুঝলো কিছু বুঝলো না। মার নিঃশ্বাস বন্ধ হলো চিরতরে। জিনিয়া ভাবতে লাগলো এত বিরাট পৃথিবীতে সে ভীষণ একা। আচমকা ব্রেক কষলো ড্রাইভার। অল্পের জন্য সামনের সিটের সাথে ধাক্কা খেলো না জিনিয়া। ইচ্ছেমতো বাস ট্রাক চালায় ড্রাইভাররা। গতকাল বিলাস হুল গ্রিন লাইন কোচ কুমিল্লায় একটি ট্রাককে ওভার টেক করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ে। চালকসহ তিনজন মারা গেলো। ভয় হয় জিনিয়ার। ছোট একটা গরুর বাছুরকে রক্ষা করতে গিয়ে বাস দুর্ঘটনায় পড়তো। মিনিট পাঁচ কি সাত চলার পর বাসটি থেমে গেলো। সামনে বিরাট জ্যাম। কোনো একটি জুট মিলের কর্মচারীদের বেতন দেয়া হয়নি। তারা রাস্তায় গাছের টুকরো ফেলে পথ বন্ধ করে দিয়েছে। সূর্য ততক্ষণে ডুবে গেছে। জিনিয়া ভাবে তাহলে উপায়? মাথাটা ঝিমঝিম করে। শরীরে একটু একটু জ্বরও আছে।

তিন.

কি হয়েছে কি হয়েছে বলে হুড়হুড় করে বাসের সকল যাত্রী বাস থেকে নেমে গেলো। দেখি কি হয় এই ভেবে জিনিয়া বাসের মধ্যে বসে রইলো। দুর্বল শরীর। মাথা তুলতে কষ্ট হচ্ছে। জুট মিলের কর্মচারীদের বেতন দেয়া হয়নি ঠিকমতো। অনেকদিনের বকেয়া পড়েছে তা বাবা মালিকের বাড়ি ঘেরাও কর। তা না করে রাস্তা বন্ধ করে দিলে। হাজার হাজার নিরীহ পথচারী পড়লো বিপদে যাদের সাথে কারখানার কোনো সম্পর্ক নেই। কয়েক মিনিটের মধ্যে জিনিয়াদের বাসের পেছনে অসংখ্য বাস ট্রাক জমা হয়ে গেলো। প্রাইভেট কারের মালিক ভাবলো আমার ছোট গাড়ি পাশ কেটে চলে যেতে পারবে। পাশ কেটে এলো বলে কিন্তু যাওয়া আর হলো না। রাস্তার মাঝখানেই দাঁড়িয়ে থাকলো। রিকশা এবং ট্যাক্সি ড্রাইভার ভেবেছে আমরা তো কোনো প্রকারে যেতে পারবো, আসলে কারো যাওয়া হলো না। শুধু রাস্তা বন্ধ হলো শক্তভাবে। আগে পিছে কোথাও যাবার আর কোনো সম্ভাবনা থাকলো না। ড্রাইভার নেমে কোথায় চলে গেছে। পয়সা ফেরত নেবার জন্যে কয়েকজন যাত্রী কন্ট্রাক্টরকে খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে গালমন্দ করছে। জিনিয়া এবার ভাবনায় পড়লো। তাহলে যাবে না বাস? এই অন্ধকারে কোথায় যাবে? টাউনে ফেরত যাবারও তো কোনো ব্যবস্থা আছে বলে তো মনে হয় না। এমন সময় বাসের খোলা দরজা দিয়ে একজন যুবক এগিয়ে এলো। মাথা ভর্তি ঝাঁকড়া চুল। হাসি হাসি চেহারা। চেনাচেনা মনে হচ্ছে তাকে। বাসে একা বসে আছেন যে?

কে আপনি?

আমার নাম শাকিল।

কোথায় যেন দেখেছি।

আমি ভার্সিটিতে পড়ি। হঠাৎ হল ত্যাগ করার নির্দেশ হলো তাই বাড়ি ফিরে যাচ্ছি। বিশ্ববিদ্যালয় কখন খুলবে তার কোনো ঠিক নেই।

আপনার ডিপার্টমেন্ট কি?

ইকনোমিক্স। আপনি?

আমিও ভার্সিটিতে আছি। অনেক আগেই বেরিয়ে যাবার কথা ছিল। কিন্তু সেশন জটের জন্য পারলাম কই!

আমারও তো একই অবস্থা। বোর লাগছে। ভেবেছিলাম পরীক্ষাটা হয়ে যাবে কিন্তু হলো আর কই।

এরপর নেমে যাচ্ছিল শাকিল। জিনিয়ার নিজের বিপদের কথা মনে পড়ে।

পেছন থেকে ডাক দেয়।

চলে যাচ্ছেন?

না।

তবে?

সামনে পেছনে হেঁটে দেখি সত্যিকারের সমস্যাটা কতটুকু। রাস্তা খোলার আদৌ কোনো সম্ভাবনা আছে কিনা। আপনিও যাবেন নাকি আমার সাথে? সমস্যা নিজের চোখেই দেখলেন। যেতাম কিন্তু আমার শরীর খুব খারাপ।

তাই নাকি?

জ্বর ছিল একটানা অনেকদিন। শরীর খুব দুর্বল। মনে হচ্ছে বাস থেকে নামতে গেলেই মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যাবো।

ঠিক আছে অপেক্ষা করুন। বেশি দেরি করবো না। আমি আসল ব্যাপারটা বোঝা হয়ে গেলেই ফিরে আসবো।

শাকিল নেমে যায়।

দূরে ভীষণ হৈচে হয়।

মনে হচ্ছে বিরাট ঘটনা।

সমবেত মানুষের কণ্ঠস্বর।

কি হলো? কি হলো?

সম্ভবত পকেটমার ধরা পড়েছে।

মানুষের দুঃখের সময়ই তারা এসব করে।

জিনিয়া কান খাড়া রাখে। ভয় করে তার। একা একজন মেয়ে মানুষ।

অনেকক্ষণ পরেই শাকিল ফিরে আসে।

কি খবর?

খবর ভালো না।

খুলে বলুন প্লিজ।

সামনে পেছনে চার মাইল ধরে রাস্তা বন্ধ। কারখানার সামনে শ্রমিকরা মারমুখো হয়ে বসে আছে। তাছাড়া শ্রমিকরা চলে গেলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রাস্তা ক্লিয়ার হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। বাস, ট্রাক, ট্যাক্সি, রিকশা এলোপাতাড়ি রেখে রাস্তা দারুণভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। তাছাড়া আমার মনে হচ্ছে একটা দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

কেমন সেটা?

রোড ক্লিয়ার করার জন্য সরকার যদি, রিজার্ভ পুলিশ বা বিডিআর কল করে আর এদিকে শ্রমিকরা মরিয়া হয়ে প্রতিরোধ করে তবে নির্ঘাত গোলাগুলি হবে। গুলি হওয়া মানে মানুষ মরা। মানুষ মরা মানে পরিস্থিতি আরো জটিল হওয়া। সাথে সাথে স্লোগান হবে, মিছিল হবে। পরিবেশ পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হবে। শ্রমিকরা সরে গেলেই পারে। কিভাবে সরবে। ওরা ক্ষুধার্ত। মালিকরা রুগ্ণ শিল্পকে সুস্থ করার নামে কোটি কোটি টাকা সরকার থেকে ঋণ নেবে, সে টাকায় বাড়ি বানাবে নতুন মডেলের গাড়ি হাঁকাবে আর শ্রমিকরা পেটে পাথর বেঁধে থাকবে দিনের পর দিন। তা তো হতে পারে না।

তাই বলে রাস্তা বন্ধ করবে? মালিকের বাড়ি ঘেরাও করলেই পারে।

রাস্তা বন্ধ তারা নিরুপায় হয়ে করেছে। এটা সর্বশেষ প্রচেষ্টা। দেশের লোক জানলো তারা না খেয়ে আছে। প্রশাসন জানলো ব্যাংকের টাকার সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না। ঠেকায় পড়ে সরকারও ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করবে। তাহলে এখন কি করবো? লোকজন পায়ে হেঁটে চার পাঁচ মাইল অতিক্রম করছে। তারপর থেকে আবার যথারীতি বাস চলাচল করছে। শিশু এবং মহিলাদের ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। ব্যারিকেড এমনভাবে দেয়া হয়েছে যে রিকশা পর্যন্ত চলতে পারছে না।

ভীষণ বিপদের কথা!

আমার হাত ধরে আস্তে আস্তে হেঁটে যেতে পারবেন না?

অসম্ভব, পাঁচ মাইল তো দূরের কথা, আমি একমাইলও হেঁটে যেতে পারব না। শরীর কাঁপছে। মনে হচ্ছে জ্বর আসবে আমার। শাকিল কপালের ওপর হাত রাখলো।

কি বুঝলেন?

জ্বর আসছে তবে বেশি না।

এভাবে আসে আবার কিছুক্ষণ পর ছেড়ে যায়।

এখন তাহলে কি করবেন?

কি আর করবো এ বাসেই বসে থাকবো। আপনি তো সুস্থ আছেন সামনের রাস্তাটা হেঁটে চলে যেতে পারবেন।

বাসের মধ্যে একা থাকাটা আপনার জন্যে নিরাপদ নয়। এরকম পরিস্থিতিতে লুটপাট হয়। তাছাড়া আপনি মেয়ে মানুষ, সাথে কেউ নেই। একই ভার্সিটিতে পড়ি। একই এলাকায় বাড়ি, পরিচয় না হলে সে অন্য কথা ছিল, এভাবে একা ছেড়ে তো যেতে পারি না।

আপনার বাড়ি?

চৌদ্দগ্রাম। ট্রাংক রোড থেকে বেশি দূরে নয়।

তাহলে আপনিই বলুন কি করবো?

চলুন আশপাশে কোনো বাড়িতে আশ্রয় নিই।

অসুবিধা হবে না?

হবে না এমন কথা তো বলা যায় না। তবে যেভাবেই হোক আপনার বিশ্রামের প্রয়োজন। অবশ্য আমার সাথে যেতে যদি আপনার কোনো আপত্তি না থাকে।

জিনিয়া একটু হাসে।

হাসছেন যে?

আপত্তি থাকলেও এখন বিকল্প কোনো রাস্তা নেই। এখন থেকে আপনার ওপর ভরসা করতে হবে, আপনার সাহায্যই নিতে হবে। চলুন কোথায় যেতে হবে। যেভাবেই হোক বিপদের রাতটা তো কাটাতে হবে।

তবে একটি কথা।

বলুন।

আপনি কথা বলবেন না। যা বলার আমিই বলবো। প্রয়োজনে মিথ্যা কথা বলতে হবে। প্রাণ বাঁচানোর জন্যে সবই করা সম্ভব।

কিন্তু……।

এমন কিছু বলবো না যাতে আপনার অসুবিধা হতে পারে।

ঠিক আছে চলুন। আমার জন্যে আপনাকেও কষ্ট করতে হচ্ছে।

মানুষ তো মানুষের জন্যেই।

জিনিয়া উঠে দাঁড়ায়।

ব্যাগটা হাতে নেয়।

ওটা কি খুব ভারী?

না তেমন কিছু নেই। জামাকাপড় এবং কয়েকটা মাত্র বই।

ওটা আমাকে দিন।

ধন্যবাদ।

শাকিল এবং জিনিয়া হাঁটতে থাকে। সামান্য একটু উত্তর পাশে যেতেই পশ্চিম দিকে একটা ইট বিছানো রাস্তা গ্রামের দিকে চলে গেছে। সে রাস্তা ধরেই এগিয়ে যায়। মানুষের ঘরবাড়িতে আলো দেখা যাচ্ছে। কোথাও না কোথাও একটা আশ্রয় জুটে যাবে। একটা রাতই তো মাত্র। জিনিয়ার পা চলছে না। হাঁটতে তার আসলেই কষ্ট হচ্ছে।

আপনার হাঁটতে কি অসুবিধা হচ্ছে?

পা কাঁপছে যেন।

আমার হাত ধরুন।

জিনিয়া হাতখানা বাড়িয়ে দেয়।

শাকিল হাত ধরে।

তার হাত ঈষৎ উষ্ণ।

জ্বরের জন্যে।

আঙুলগুলো বেশ নরম।

ছেলেবেলা থেকে হাতের কাজ করেনি বোঝা যাচ্ছে।

ভীষণ অন্ধকার। রাস্তার পাশে একটা কুকুর শুয়েছিল। তার পিঠের ওপর শাকিলের পা পড়াতে হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে। ভয় পেয়ে যায় জিনিয়া। কুকুরের কামড় খুব সাংঘাতিক। জলাতঙ্ক রোগ হলে মানুষ বাঁচে না।

কামড় দিয়েছে কি?

না। ভাগ্য ভালো।

কুকুরটা পাগল না। দুর্বল। রাস্তার পাশে শুয়েছিল। শুধুমাত্র পাগলা কুকুরে কামড় দিলেই জলাতঙ্ক রোগ হয়। এই রোগ হলে মানুষকে আর বাঁচানো যায় না। আমার এক বন্ধু মারা গেছে।

কি করে বুঝবেন যে কুকুরটা পাগল না? পাগলা কুকুর এভাবে আরাম করে রাস্তার পাশে শুয়ে থাকে না। সারাক্ষণ দৌড়াদৌড়িতে থাকে। গরু, ছাগল, মানুষ গাছপালা সামনে যা পায় কামড়াতে থাকে। পাগলা কুকুরের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত সে অস্থির থাকে। মানুষের মধ্যে এখন অনেকটা সচেতনতা এসেছে। কুকুর পাগল হয়েছে বুঝতে পারলে কেউ না কেউ মেরে ফেলবেই। সুতরাং ভয় নেই।

আপনি তো অনেক কিছুই জানেন দেখছি।

এসব জটিল কোনো ব্যাপার না এমনিতে জানা যায়।

অতঃপর নীরবতা।

কেউ কোনো কথা বলে না।

ধীর পায়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায়।

একটু যেতেই না যেতেই একটা বাড়ির উঠানে গিয়ে হাজির হয়। খুব বিত্তবান কারো বাড়ি নয়। এ বাড়িতে বিদ্যুৎ নেই। অথচ দূরে গ্রামের একদম ভেতর থেকে বিদ্যুতের আলো দেখা যাচ্ছে। বাড়িতে মানুষজনের তেমন কোনো আনাগোনা নেই। শাকিল একটু এগিয়ে যায়। জিনিয়া পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে। ঘরের ভেতর থেকে হারিকেনের আলো আসছে জানালা দিয়ে।

শাকিল গলা খাঁকে।

কে?

ভেতর থেকে নারী কণ্ঠ ভেসে আসে।

আমরা বিদেশি একটু বাইরে আসবেন কি দয়া করে।

কে আবার এলো?

ভদ্রমহিলা জানালা দিয়ে হারিকেন উঁচু করে।

জি, চাচি আমরা।

তোমরা কারা?

জি দয়া করে দরজা খুলুন। আমরা খুব বিপদে পড়েছি। ভয় পাবেন না।

আমরা ডাকাত টাকাত কেউ নই ভদ্রলোকের ছেলে।

সত্যি বলছো তো?

জি চাচি সত্যি বলছি।

দরজা খুলবো?

জি খুলুন।

এসো, ডাকাত টাকাত হলেও আমার কোনো ভয় নেই। আমরা গরিব মানুষ। ঘরে ডাকাতের নেয়ার মতো কিছুই নেই।

মহিলা দরজা খোলে।

হারিকেনের আলো শাকিলের মুখের ওপর রাখে।

তোমরা কারা বাবা?

আমাদের বাড়ি কুমিল্লা। গিয়েছিলাম কক্সবাজার। কয়েকদিন থেকে বাড়ি ফিরে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ দেখি রাস্তায় ব্যারিকেড। গাড়ি আর যাচ্ছে না। এখন কি করি, কোথায় যাই! ওর শরীরটা ভালো নেই। গায়ে জ্বর। নইলে হেঁটে হেঁটে এগিয়ে যেতে পারতাম। দয়া করে যদি রাতটা কোনো প্রকারে শেষ করার জন্য আশ্রয় দিতেন।

এসো ঘরের ভেতরে এসো।

শাকিল ঘরের ভেতরে প্রবেশ করে।

একটা মোড়ার ওপরে বসে।

জিনিয়াকে একটা মোড়া এগিয়ে দেয়।

রাতটা কোনো প্রকারে কাটিয়ে ভোর হতে না হতেই আমরা চলে যাবো চাচি। আপনি অন্য কিছু মনে করবেন না। এখন তো নানা ছলে নানা বেশে ডাকাতি হয় তাই কেউ কাউকে বিপদেও সাহায্য করতে চায় না।

তা বাবা কক্সবাজার কেন গিয়েছিলে?

বেড়াতে।

নতুন বিয়ে করেছো তুমি?

জি।

কিন্তু বৌয়ের গায়ে তো কোনো সোনার গহনা নেই।

স্বর্ণালঙ্কার দিতে পারিনি।

কেন? দিতে পারোনি কেন? গরিব ধনী যাই হোক কমবেশি অলঙ্কার ছাড়া বিয়ে হয় নাকি?

না মানে বিয়েটা কোর্টে হয়েছে কিনা।

ও বুঝতে পেরেছি।

মা-বাবা রাজি ছিল না। ওর মা-বাবার দোষ নেই। আসলে আমার মা সাংঘাতিক গরম মেজাজের। কোনো কিছু একবার মুখে একবার না বলেছেন তো আর হ্যাঁ হবে না। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো ভালোবাসা আমি বুঝি না। তুই আমার একমাত্র ছেলে, আমি দেখেশুনে মেয়ে ঘরে আনবো তোর কথা মতো কোথাকার কোন মেয়েকে ঘরে আনতে পারি না। একটু সাহস সঞ্চয় করে বললাম তবে কি আমার জীবনের কোনো দাম নেই। মা স্বাভাবিকভাবেই আমার চোখে চোখ রেখে বললো তোমার জীবনের কোনো ক্ষতি হবে না। ভালোবাসার মেয়েটিকে বিয়ে করতে না পেরে কোনো পুরুষ আত্মহত্যা করেছে এ কথা আমার জানা নেই। সুন্দরী বউ পেলে অতীতকে সাদা কাগজের মতো মনে হবে।

তারপর? তারপর আর কি করবো চাচি বলুন। কোর্টে গিয়ে বিয়ে করি। বিয়ের পরেই কক্সবাজার বেড়াতে যাই।

এখন তবে যাচ্ছো কোথায়?

ওর খালার বাসায়। কুমিল্লা শহরে। আমার মাকে তো আমি ভালো করেই চিনি। কিছুদিন গেলেই বলবে ঠিক আছে বিয়ে যখন করে ফেলেছিস তখন পরের বাড়িতে ফকিরের মতো থেকে কি লাভ। বৌ বাড়িতে নিয়ে আয়। তবে তাকে বলে দিব আমার কথামতো চলতে হবে। তখন আমি বলবো তুমি দেখে নিও মা সে তোমার কথার বাইরে এক পাও দেবে না।

ও বুঝতে পেরেছি চুরি করে বিয়ে করেছো তাই বৌয়ের হাতে মেহেদি পর্যন্ত দেয়া হয়নি। তুমিও তো দাওনি।

জি চাচি। কোর্ট বিল্ডিংয়ে মেহেদি পাবো কোথায়? কিন্তু চাচি বাড়িতে তো অন্য কাউকে দেখছিনে। সে কথা আর বলো না বাবা আমি এক দুঃখী মানুষ। একমাত্র ছেলেটি মানুষ হলো না।

কেন কি হয়েছে তার?

ওর আট বছর বয়সের সময় ওর বাবা মারা যায় ফকির হাটে বাস এক্সিডেন্টে। আমি বেঁচে থাকি একমাত্র ছেলেটির মুকের দিকে তাকিয়ে। আমার মা-বাবা আমার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আমার জন্যে বিয়ের পাত্র খুঁজতে লাগলো। আমি রাজি হলাম না। কপালে যা আছে তা হবে। ছেলেটি যদি একজন মানুষের মতো মানুষ হয় তবে আর দুঃখ কি।

কিন্তু সে তো মানুষ হলো না।

কি করে সে?

নেশা করে। মদ খায়। আমার দোষ নেই। অনেক করে চাইলাম লেখাপড়া শিখুক। কিন্তু লেখাপড়া করলো না। গার্জেন না থাকলে যা হয়, রাস্তায় ওাস্তায় টো টো করে। নেশা করে। বাপের জায়গাজমি সব বিক্রি করে খেয়েছে। এখন এই বাড়িঘর ছাড়া আর কিছুই নেই।

বিয়ে করেনি? করেছিল। ভালো বংশ জেনে মেয়ের বাবা জিনিসপত্র দিয়ে সম্পর্ক করলো। কিন্তু ছয় মাসের মাথায় মেয়েটি চলে গেলো। নেশা করে রাত বারোটায় বাড়ি আসে। কারণে অকারণে বউয়ের গায়ে হাত তোলে। বাপ দাদা চৌদ্দগোষ্ঠী ধরে গালমন্দ করে। পরের মেয়ে কত সহ্য করবে। একদিন রাতে কাঁদতে কাঁদতে তাদের বাড়ি চলে গেলো। আমিও বাধা দিইনি। এত অত্যাচারের মধ্যে মানুষ বাস করতে পারে নাকি ! আমার নিজের পেটের মেয়ে হলে কি করতাম। ছেলে বৌ নিয়ে এই কামরায় থাকতো। আজ তোমরা এখানে থাকো সে এলে আমার সাথে থাকবে। আবার মাঝে মাঝে বাড়িতেও আসে না। মদ খেয়ে পড়ে থাকে কোথাও। আমি আগে চিন্তা করতাম এখন আর করি না। গা সহ্য হয়ে গেছে। ভালো কথা তোমরা তো কিছুই খাওনি?

না চাচি কিছু খাবো না। ওর তো এমনিতেই জ্বর। আমি শেষ বেলায় খেয়েছি। এখন কোনো প্রকারে রাতটা কাটাতে পারলেই হলো।

ঠিক আছে বাবা জোর করে খাওয়ানোর মতো তেমন আয়োজনও নেই। চকির ওপর বিছানা পাতা আছে তোমরা বিশ্রাম করো। বাড়ির দক্ষিণ পাশে পায়খানা প্রস্রাবের জায়গা আছে। একটু বামদিকে গেলেই পুকুর ঘাট। একটু সাবধানে যেও ঘাট ঠিকঠাক নেই। কে করবে ছন্নছাড়া বাড়ি। কোনো অসুবিধা হলে আমাকে ডাক দিও। আমি পাশের কামরায় থাকবো। হারিকেন একেবারে নিভিয়ে দিও না। আমি তাহলে গেলাম বাবা।

আপনাকে কষ্ট দিলাম চাচি।

না বাবা এমন আর কিই বা করলাম।

মহিলা চলে যায়।

জিনিয়া এতক্ষণ চুপচাপ মুখ খোলেনি।

শাকিল কথা না বলতে বলেছে।

এবার চকির ওপর গিয়ে বসে।

শাকিল মোড়ার ওপর থেকে নড়লো না।

জিনিয়া বললো-

কাজটা কি ঠিক হলো?

কোন কাজটা?

ঐ যে বললেন আমরা গোপনে বিয়ে করেছি।

এ কথা বলা ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। স্বামী-স্ত্রী তাও সদ্য বিবাহিত বিপদে পড়েছে জানলে গ্রামের অনেকেই আশ্রয় দিতে এগিয়ে আসবে। কিন্তু যদি বলি বিয়েথা করিনি এমনিতে দু’জন ঘুরে বেড়াচ্ছি তবে ঝাটা নিয়ে মারতে আসবে।

ঘরে তো একটামাত্র চকি।

তাতে কি হয়েছে?

দু’জন থাকবো কিভাবে?

কেন পাশাপাশি।

তা কি করে সম্ভব?

অসম্ভবের কিছুই নেই- ঘুমের মধ্যে আমি একদম নড়াচড়া করি না। সন্ধ্যায় যে কাতে শুই ভোরে সে কাতেই উঠি।

কিন্তু আমি তো নড়াচড়া করি।

অসুবিধা হবে না।

আমার পাশে কেউ থাকলে রাতে ঘুমের মধ্যে আমি তার গায়ের ওপর ঠ্যাং তুলে দিই। একবার খালার নাকের সাথে আবার লাথি লাগে। ঘুমের মধ্যে আমি উল্টো ঘুরে গিয়েছিলাম। সকালবেলা কতবার করে খালার কাছে মাফ চাইলাম। খালা বললেন তুই একদম ছেলেমানুষ জিনি। আমার কাছে মাপ চাইতে হবে না। তার মানে?

মানে সহজ- ঘুমের মধ্যে ভুলক্রমে আপনি যদি আবার গায়ের ওপর আপনার ঠ্যাং তুলে দেন আমি কিছু মনে করবো না।

বলেন কি?

সত্য বলছি।

তার মানে তবু একসাথে থাকবেন?

অন্য কোথাও থাকার তো কোনো ব্যবস্থা নেই। ছোটবেলা থেকে আবার একটা বদ অভ্যাস রয়েছে।

কি ওটা?

না ঘুমিয়ে একদম রাত কাটাতে পারি না।

এক রাতও না?

না। একরাতও না। এজন্যে জীবনে আমার যাত্রা দেখা হয়নি অথচ যাত্রা দেখা আমার খুব শখ।

একদিন যাত্রা দেখা স্টার্ট করলেই পারতেন নিশ্চয়। ঘুম আসতো না। জেগে থাকার ইচ্ছা করলেও জেগে থাকাটা কঠিন ব্যাপার নয়। এর জন্য শুধু একটু মনের জোর থাকা চাই।

ঘুমের ব্যাপারে আমার একদম মনের জোর নেই।

জিনিয়া কি যেন বলতে যাচ্ছিল হঠাৎ দরজার ওপর থেকে ধপ করে একটা বিরাট ইঁদুর মাটিতে পড়ে। সাথে সাথে লাফ দিয়ে পড়ে একটা মাদি বিড়াল। বিড়ালের ভয়ে ইঁদুরটি পালাচ্ছিল কিন্তু শেষ রক্ষা পেলো না। মাটিতে লাফিয়ে পড়ে বিড়াল ইঁদুরটি ধরে মুহ‚র্ত মেরে রক্তাক্ত করে দিলো। ভয় পেয়ে যায় জিনিয়া। অনেক মেয়েই ছোটখাটো প্রাণীকে ভীষণ ভয় পায়।

জিনিয়া নড়েচড়ে ওঠে।

শাকিলের মুখের দিকে তাকায়।

কি করে বলি।

বলুন।

আমি বাথরুমে যাবো।

তাই নাকি?

হঠাৎ ভয় পেলে আমার এমন হয়। ঘন ঘন বাথরুমে যেতে হয়। কয়েকবার গেলে আবার তারপর ঠিক হয়। কি একটা বিশ্রি অভ্যাস। এরকম অন্য কারো হয় নাকি? আপনার হয়?

না আমার হয় না। তবে আমার এক বন্ধু আছে শাহ এমরান। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে শেষ বর্ষে পড়ে। হলের আশপাশে একটা ককটেল ফাটলেই দেখি এমরানকে আর দেখা যাচ্ছে না। কিছুক্ষণ পর দেখবো সে বাথরুম থেকে আসছে। এসে বলে শালার একটু টেনশন হলেই আমার পাতলা পায়খানা হয়। কি একটা জঘন্য অভ্যেস কি করি বলতো দোস্ত। বাথরুমের ব্যবস্থা কোন দিকে বললো?

বাড়ির দক্ষিণ পাশে।

ওখানে তো লাইট নেই।

হারিকেন নিয়ে যান। বামদিকে একটু গেলেই পুকুরের ঘাট।

আরো কি যেন বলেছিল।

ঘাটখানা নড়বড়ে। সাবধানে পানি নেবেন।

আমি তো একা যেতে পারবো না।

কেন?

এমন ঘুটঘুটে অন্ধকারে একা তো বের হইনি।

তাহলে উপায়?

আপনাকেও সাথে যেতে হবে।

আমাকেও?

হ্যাঁ।

আমি কি করবো ওখানে?

দূরে একটু দাঁড়াবেন। আচ্ছা আর একটা কথা-

বলুন।

যদি সাপ থাকে?

থাকবে না।

কি করে বুঝলেন?

সবসময় চলাফেরার রাস্তায় সাপ থাকে না।

হবে হয়তো।

চলুন।

জিনিয়া চকি থেকে নামে।

শাকিল হারিকেনটা এগিয়ে দেয়।

দু’জন ঘর থেকে বের হয়।

জিনিয়া আগে আগে হাঁটে। শাকিল পিছু পিছু হাঁটে। হঠাৎ বকবক করে পাশে কি একটা গাছ থেকে হুতুম ডেকে ওঠে। ইয়া আল্লাহ বলে থমকে দাঁড়ায় জিনিয়া।

শাকিল পেছন থেকে সাহস দেয়- ও কিছু না পাখির ডাক

কি পাখি?

হুতুম।

আবার ডাকবে না তো?

আমি কি করে বলবো?

এত বড় শব্দ করে ডাকে কেন?

হুতুমের ডাক ওরকমই।

আমাদের কুমিল্লাতে আছে?

নিশ্চয়ই আছে।

আমি দেখিনি।

আমি দেখেছি। বাথরুমে যাবেন?

যাবো। আমি এখানে দাঁড়ালাম। আপনি এগিয়ে যান। ঐ যে বেড়া দেখছেন ঐ জায়গাটাই। একটু বাম দিকে গিয়ে পানি নিবেন।

সাপ যদি থাকে?

হৈচৈ না করে দাঁড়িয়ে থাকবেন। আমি পেছন থেকে এক আঘাতেই মেরে ফেলবো। সাপকে এক আঘাতে মারতে পারলেই সুবিধা। নইলে সাপে আক্রমণ করার ভয় থাকে। এজন্যে সব লোকের দ্বারা সাপ মারা সম্ভব হয় না।

আপনি অনেক কিছুই জানেন

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj