গুপ্ত গর্ভে : দ্বিত্ব শুভ্রা

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

জেগে থাকা উপশহর তার বারোয়ারি আলোর অনেক আলো নিভিয়ে ফেলেছে। দোকানপাট, বাড়িঘরের দেয়ালগুলোয় আবছা অন্ধকার, ল্যাম্পপোস্টের নিচে ছেঁড়া কাগজের জঞ্জালের ওপর কালো মলিন আলো। মুদি দোকান, ওষুধপত্তরের দোকানের ঝাপগুলো দোকানদারের মুখের মতো পাণ্ডুর, নিষ্প্রভ। সে শুয়ে শুয়ে টের পায় রাস্তায় কোনো একটা গাড়ি শোঁ শোঁ করে চলে যাচ্ছে, চালক যেন তার মাথার ভেতর দিয়ে শাঁ শাঁ করে পার হচ্ছে, চালকের সাথে তার মাথাটাও চলে যাচ্ছে দূরে-বহুদূরে। সে বিছানায় শুয়ে আচ্ছন্নভাবে দেখতে পায় মাথাটি চলে গেছে রাস্তার একেবারে শেষ মাথায়। তারপর বামে বাঁক নিচ্ছে, এরপর ডানে, এবার সোজা, একেবারে নাক বরাবর চলে যাচ্ছে। এভাবে কিছু দূর যাবার পর হঠাৎ করেই মনে হলো সে জানে এরপর সে কোথায় যাচ্ছে। তখন নিজেকে ধরে টেনে আনে বিছানায়। তার ঘুমহীন কান টের পায় বালিশের সাথে মাথার ঘর্ষণের খসখস শব্দ, পায়ের টানে চাদরের উঠে আসা, ঘুমিয়ে থাকা স্ত্রীর নিঃশ্বাসের ওঠানামা। ঐ নিঃশ্বাস দ্রুত আর গভীর, গভীর আর অন্ধকার। ঘোরের মাঝে সে মাথাকে প্রবেশ করিয়ে দেয় স্ত্রীর নাকের ভেতর, লোমগুলোকে কাঁপিয়ে নাকছিদ্র দিয়ে চলে যায় মুখ গহŸরের ছোট্ট আলজিভটার কাছে। সে কিছুক্ষণ আলজিভটা লক্ষ করে, ওটা মৃদু নড়ছে। ‘একেকটা মিথ্যুক আলজিভ!’ ক্ষেপে ওঠে হঠাৎ। তখনই তার ইচ্ছে হয় ঐ জঘন্য জিভটার তলা দিয়ে লাফ দেয় মানুষটার বুকের ভেতর। খাদ্যনালীর পথ দিয়ে উঁকি দেয় সোজা ভেতরের দিকে যেন ও পথে তাকালেই হৃদয় দেখা যাবে। সে মনে মনে লাফ দেয় আর মাথার ভেতর শোনে ঠন করে পড়ার ফাঁকা শব্দ। তখনই যেন একটা পেতলের থালা পড়ে যায় টেবিল থেকে। থালাটা মেঝেতে পড়েই লাফিয়ে ওঠে ঝনর ঝনন আওয়াজ তুলে। পেতলের থালাটা বোঁ বোঁ করে ঘুরতে থাকে, ঘুরতে ঘুরতে কাত হয় আর শেষে দুম করে থেমে যায়। হুমায়ুন কবিরও এখন কিছু শুনছে না। অনেকক্ষণ ধরে হাই ইন্সট্রুমেন্টাল মিউজিক শোনার পর বাজনা থেমে গেলে পিলপিল করে লোকজন চলে যায় যে যার দিকে। বোঝাই যায় না অনেকক্ষণ ধরে ঝাঁঝরা হচ্ছিল নিঃশব্দতা, সেই নিঃশব্দতা তখন জাঁকালো হয়ে বসে পড়ে মঞ্চে। পেতলের থালা থেমে যাবার পর হুমায়ুন কবিরের মাথাতেও এখন তেমন নিঃশব্দতা। তবে নিঃশব্দতার আরেক বোঁ বোঁ গোঙানি তালগোল পাকায় মাথার চারপাশে। অন্ধকারের মাঝে সে ডানে-বায়ে ঘুরে দেখার চেষ্টা করে আশপাশে সত্যি সত্যিই অমন ধ্বনি তোলার মতো কোনো ভ্রমর আছে কিনা। ভ্রমর সে তো সে কতকাল দেখেনি। কোন সেই বালক বয়সে টিনের ঘরে কাঠের জানালা দিয়ে ভ্রমর ঢুকে পড়তো। ঢুকে বেরোনার পথ বুঝে উঠতে না পেরে বোঁ বোঁ করে গোঙাতো আর সে অথবা তার বাবা সেটাকে তালপাখা দিয়ে ঝেটিয়ে মারার চেষ্টা করতো। ওটা মরে গেলেও বা চলে গেলেও ঘরময় কিছু সময় ধরে ঘুরতো সেই বিশ্রি বোঁ বোঁ, বোঁ বোঁ। সেও এই ঘরে আটকা পড়েছে, সেও শুনতে পাচ্ছে একটানা তাললয়হীন শব্দ বোঁ বোঁ, বোঁ বোঁ।

পাশে স্ত্রী নড়াচড়া করে, সেও তখন ঐ অনাবশ্যক শব্দ থেকে ফিরে আসে পুরোনো তুলার বালিশে। হুমায়ুন কবির না দেখেই বুঝতে পারে স্ত্রীর গালের নিচে এক হাত, আরেক হাত বুকের কাছে গুটিয়ে রাখা। তার ঘুমন্ত স্ত্রীর মুখ দেখতে ইচ্ছে হয় না। তবে এই ঘরের কার মুখ দেখতে ইচ্ছে হয়? একে একে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের মুখ- বাবা, মা, দুই ভাই, এক বোনের চেহারা মনে করে এবং ভ্রæ কুঁচকে ফেলে। একটা মশা ঢুকেছে। মশাটা পায়ে বসেছিল, এখন পা চুলকাচ্ছে। হুমায়ুন কবির পা দিয়ে পা ঘষে। নাইলনের সুতোর ঘরে সে, বউ আর মশা। কিন্তু মশা কেবল তাকে খাচ্ছে। আলো জ্বালিয়ে ওটাকে মেরে ফেলা দরকার। সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন করে, বাকিদেরও কি মেরে ফেলা দরকার? ঘ্যান ঘ্যান করছে মশাটা। এবার একটা মশা না, অনেকগুলো, শত শত, হাজারে হাজারে মশা একসাথে ঘ্যানর ঘ্যানর করছে চারপাশে। একটা মশা ডাক দিয়ে যেন লক্ষ লক্ষ মশা নিয়ে এসেছে। একযোগে সবকটা তার হাত, পা, মুখে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। হুমায়ুন কবির হাত ভাঁজ করে মুখ বাঁচাতে চায়, মুখ বাঁচাতে গিয়ে সে শেষবারের মতো চোখ খোলে। মশাগুলোর যেন চেহারা ফুটেছে। ওগুলো ক্রমশ আদল নিচ্ছে আর সে ঐ সকল চেহারা চিনতে পারছে। ঘরের এই পরিচিত মশারা গুনগুন করে না, কেবল ঘ্যান ঘ্যান করে যায় দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। হুমায়ুন কবির হাত-পা ছেড়ে দেয়। মশাটাকে মেরে ফেলার ইচ্ছে দমন করতেই মশাটা গুনগুন করে মশারির অন্যপাশে সরে যায়।

ঘেমে উঠেছে পিঠ, মাথার ওপর ঘুরতে থাকা ফ্যানের বাতাস মশারির ছিদ্র দিয়ে অস্থির মাথাতে প্রবেশ করছে সামান্যই। গরমে হাঁফ ধরে। উঠে গিয়ে এক গøাস পানি খেয়ে আসতে পারে সে। বালতির এক মগ পানি মাথায় ঢেলে ভেজা গামছা দিয়ে গা মুছলে হয়তো আরাম হয় তার। কিন্তু এসব করতে বাতি জ্বালাতে হবে, বাতি জ্বালালে ঘুমন্ত কারো না কারো ঘুম ভেঙে যাবে বিশেষ করে বাবা-মার। বুড়ো বয়সে হালকা ঘুম হয় কি না কে জানে কিন্তু আলো জ্বালালেই তাদের ঘুম ভেঙে যায়। বুড়ো মানুষের মতো তার ঘুমও হালকা অথবা সে বুড়োই হয়ে গেছে। সে সংসারের বড় আর বড় হতে হতে সে শেষ পর্যন্ত বুড়ো হয়েছে। বাতি জ্বালানোর ইচ্ছেটা হুমায়ুন কবির বাদ দেয়। আস্তে আস্তে মশারির পাশ তুলে মেঝেতে পা রাখে, শেষমেশ কোনো কারণ ছাড়াই ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে এক জায়গায় কয়েক মিনিট। শেষ সিদ্ধান্ত হয়ে যাবার পর প্রথম কাজে নামবার আগের মুহূর্ত, সময় থেমে যাবার মতো একটা ক্ষণ। পাশের কক্ষে বাবার নাক ডাকার উৎকট ঘড়র ঘড়র শোনা যায়। লোকটা কি তাকে কখনই শান্তিতে থাকতে দেবে না? না দিনে, না রাতে? কোনো না কোনোভাবে তাকে যন্ত্রণা দিতেই থাকবে! তার ঘাড়ে চাপাতেই থাকবে! হুমায়ুন কবির কথা খুব কম বলে, হাসিঠাট্টা তেমন পছন্দ করে না, প্রতিদিন বেসরকারি একটা কলেজে পড়াতে যায়, ফিরে আসে বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়ে। বেগুনটা বাসি, দুটো পেঁয়াজ পচা পাওয়া গেছে বলে তোলপাড় করা বিশাল দুর্ঘটনার দায়ও তাকে স্বীকার করতে হয়।

সে প্রতিদিন কোথাও না কোথাও যায়, কোথাও না কোথাও তাকে যেতেই হয়, আর যেখানেই যাক না কেন তাকে ফিরে আসতে হয় এই ঘরে। অন্ধকারে সে পায়চারি করে। এখন যদি কেউ জেগে যায় তবে দেখতে পাবে, একটা কালো ছায়া ঘরের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করছে। ছায়াটা পায়ে পায়ে ঘর বদলায়। রান্নাঘরে ইঁদুরের খচখচ, কিছু তেলাপোকা বিনবিন করছে এ মেঝে, ও মেঝে। এক কক্ষে একজনের নাক ডাকার ঘড়র ঘড়র, আরেক কক্ষে ছোট বোনের সাথে শুয়ে থাকা মায়ের শ্বাস বা দীর্ঘশ্বাস, পাশের কক্ষে দুই কুলাঙ্গারের ফোঁস ফোঁস। হুমায়ুন কবিরের মাথা দুলতে থাকে। সে শুনতে পায় ঘরের মধ্যে বীণ বাজছে। বীণ বাজাচ্ছে তারই পিতা, অদূরে চুপচাপ খেলা দেখছে মা আর বোন, বীণের নাচুনিতে ফণা তুলে ডানে-বায়ে হেলছে দুটো অজগর, অজগরের সামনে ছুটোছুটি করছে একটা তাড়া খাওয়া ইঁদুর- সে।

আবার খচখচ। নাহ! এবার কচকচ! ইঁদুর কুচকুচ করে তার মগজ কাটছে আর অজগর দুটো পরম শান্তিতে ফোঁস ফোঁস করে ঘুমাচ্ছে বিছানায়। কেবল তারই ঘুম নেই; অস্থিরতা শুধু তারই মাথার ভেতর অথচ মুখ সব সময় নির্বিকার। বড় ছেলে হবার দায়িত্ব বা দায় সে মেনে নিয়েছে, স্কুল শিক্ষক পিতার বাকি তিন সন্তানের শিক্ষার ব্যবস্থা করেছে, সংসারের ভরণপোষণ, নিত্যনৈমিত্তিক চাহিদাগুলো মেটাতে ছেটে ফেলেছে নিজের চাহিদা। তার কোনো শখ নেই বা শখ আছে কিনা কেউ জিজ্ঞেস করেনি। হুমায়ুন কবির গম্ভীর। কলেজ টিচাররা যেন গম্ভীরই হয়, ভাইবোনরা দূরত্ব মেপে চলে। মাঝে মাঝে মা আসে তবে সে জানে সে আসে ছেলে-মেয়ে-স্বামীর প্রয়োজনে। কখনও কখনও পিতাও আসে, যখন মায়ের আর্জি বা চাহিদার ফর্দে তাকে না বলতেই হয়, তখন পিতার আগমন ঘটে এবং হুমায়ুন কবিরকে প্রথমে না বলা আর্জিতে হ্যাঁ বলতে হয়। ফলাফলস্বরূপ সে নিজের জন্য রাখা ফর্দ ছেঁটে দেয়। এইভাবে সে ছাঁটতে ছাঁটতে এসেছে। ছাঁটতে ছাঁটতে তার ঘুমও ছেঁটে গেছে, দীর্ঘদিন ধরে ভুগছে অনিদ্রায়। ফার্মেসিতে ঘুরে কয়েক রাত ঘুমের ওষুধও খেয়েছে। আজকাল ঘুমের ওষুধও কাজ করে না। না ঘুমালে সে বিছানায় শুয়ে থাকতে পারে না, উঠে নিজের ঘর আর খাবার ঘরের মধ্যে পায়চারি করে।

নিদ্রাহীন মাথার ভেতর একটা থেঁতলানো যন্ত্রণা ধাক্কা দিতে শুরু করেছে, নাক ডাকার সুরের মতো আঘাত করছে লাগাতার। ঘড় ঘড়, দুম দুম, ঘড় ঘড়, দুম দুম। শব্দটা বাড়তে থাকে নিজ থেকেই। ভোঁতা শব্দটা চাপ দেয় কান লাগোয়া কপালের শিরায়। ব্যথায় ফুলে গেছে দুটো সরু শিরা, কাঁপছে তিরতির। ভোঁতা শব্দটা তীক্ষè হয়ে প্রবেশ করে মগজের ভেতর। যন্ত্রণায় হুমায়ুন কবির মাথা চেপে বসে পড়ে মেঝেয়।

বসবার সাথে সাথে হুমায়ুন কবির ভাবনায় শিশু হয়ে যায়। সে যেন হামাগুড়ি দিচ্ছে মেঝেতে, তারপর সামান্য বড় হয়ে চেয়ারের পা ধরে দাঁড়ায়। তার শিশু পা কাঁপে। কাঁপতে কাঁপতে এক চেয়ার থেকে আরেক চেয়ার পার করে। শিশু বয়সে সে খেলতো একা একা। উঠোনের কোণে পড়ে থাকা মরা নারকেল পাতার খোল টেনে, কখনও একটা প্লাস্টিকের গাড়ি সঙ্গে নিয়ে, যে গাড়ির সব কয়টি চাকার হদিস কখনও পাওয়া যায়নি। রান্নাঘরে মাটির চুলার পাশে পাটখড়ি দিয়ে দাগ টানতো আর সেই চিত্রবিচিত্র দাগের মর্মার্থ উদ্ধার করতে নিবিষ্ট থাকতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অনেকক্ষণ বসে থাকায় তার জীর্ণ প্যান্টের তলায় লেগে থাকতো মাটির গম্ভীর ছাপ। তার কাপড়-চোপড়গুলো যতই জরাজীর্ণ পাণ্ডুর চেহারা নিতো না কেন, সেই মলিন কাপড়-চোপড়ে মানিয়ে নেয়াটা সে রপ্ত করে নিয়েছিল। ক্লাসে পড়ার জন্য স্কুলের বড় ভাইদের পুরোনো বইগুলো সংগ্রহ করে মোটা সুই দিয়ে সেলাই করে দিতো যাতে কোনো পৃষ্ঠা খুলে না পড়ে। আঠা দিয়ে লাগিয়ে নিতো বাধাইর পাশটা। পুরোনো ক্যালেন্ডারের পাতা ছিঁড়ে মলাট দেয়ার পর বইগুলো ঝকঝক করে উঠতো। সাজানো পুরোনো বইগুলোকে সে এমনভাবে ভালোবাসতো যেন ওগুলো চকচকে সাদা পৃষ্ঠার নতুন বই, ও থেকে বেরুচ্ছে নতুন বইয়ের গন্ধ। চোখ মুদলেই ঐ পুরোনো কাগজের ভেতরে খুঁজে পেতো নতুন কাগজের ঘ্রাণ, সেই ঘ্রাণ তার ক্ষুদ্র জানালা থেকে বেরিয়ে ছড়িয়ে যেত অনেক দূরে কোথাও। যখন মেঝো ও সেঝো জোরে গলায় পড়তো, সে পড়তো নিঃশব্দে, ঘাড় গুঁজে; যেন ঐ সময় থেকেই তার ঘাড় বহু কিছু বহন করার জন্য তৈরি হচ্ছিল। সারা জীবনে কারো কাছে কিছু চেয়েছে হুমায়ুন কবির মনে করতে পারে না। তার অন্য ভাইবোনরা তার মতো করে অত শত বুঝতে যায়নি। প্রয়োজনমতো ওরা চাইতে জানতো আর কখনওই যে কিছু মেলেনি এমনও নয়। যতটা দৈন্য তার থেকে চেয়ে না পাবার দৈন্য হুমায়ন কবিরকে আরো বেশি আঘাত করতে পারে সেজন্য না চাওয়াটাই হয়ে উঠলো অভ্যস্ততা। তাকে কিছু দেয়া দরকার, কিছু পাবার ইচ্ছে তারও হতে পারে এমন ভাবনা পরিবারের সদস্যরা ভুলে যেতে লাগলো। বাবা-মা জেনেছিলেন, তাদের বড় ছেলের কোনো চাহিদা নেই। অতঃপর নেই হতে হতে সে ক্রমশ নাই হয়ে গেলো।

রাত বাড়ছে, হুমায়ুন কবির বাথরুমের দরজা খোলে। অন্ধকারে অনেকক্ষণ থাকতে চোখ সয়ে গেছে, আবছা আলোয় দেখতে পায় স্যাঁতসেঁতে বাথরুম, ঠিকমতো এঁটে দেয়া হয়নি কল। ভালোভাবে এঁটে সে আবার এঘর ওঘর করে। এভাবে কত রাত ঘুমহীন থাকা যায়? একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। দীর্ঘশ্বাসটা ঝুলে থাকা পর্দাটা দুলিয়ে ঘুমন্ত বোনের মুখের ওপর স্থির হয়ে বসে থাকে অনেকক্ষণ। মেয়েটির শীর্ণকায় হাত দুটো চাদরে পড়ে আছে মৃতপ্রায়। সে যত না কালো তার চেয়েও অতি কৃশকায় শরীরে কেবল রংটাই ধরা পড়ে প্রকট হয়ে। একটা গোছানো সংসারের আকাক্সক্ষা তার স্তন উঁচু করে আছে। দীর্ঘশ্বাসটা জানে, এই মেয়ের বিয়ে দেবার যাবতীয় দায়দায়িত্ব তার। হুমায়ুন কবির স্থান পাল্টায়, পাশের ঘরে আরো দু’ভাই। একটা বিএ পর্যন্ত পড়ে তিন বছর যাবৎ ঘুরে বেড়াচ্ছে এদিক সেদিক, কোনো কাজকম্ম নেই। ঢাকায় গিয়ে চাকরি পাওয়া যেন নেহাতই চেনা লোক আর টাকার ব্যাপার। অন্ধকারে তার মুখ আরও কালো দেখায়। পিতা ব্যাংকে জমানো দুটো টাকাও বার কয়েক চেয়ে গেছে।

সর সর করে ইঁদুর বা ছুঁচো রান্নাঘর থেকে কিছু টেনে নিচ্ছে, হুমায়ুন কবিরের দেখা উচিত ওখানে কি হলো কিন্তু সে যায় না। দাঁড়িয়ে থাকে ভাইদের রুমের সামনে, সেখানে ঘুমিয়ে আছে আরেকজন। এ বাড়ির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ, সব ক্ষমতার অধিকারী, সব দখলে নেবার অধিকারী। হুমায়ুন কবিরের খাটো, মোটা শরীরটা মুহূর্তে কয়লার স্ত‚পে পরিণত হয়, কোনো একটা আগুন তার ভেতর জ্বালিয়ে দেয়। চুলে, জুলফিতে এমনকি তার ঠাণ্ডা বুকের লোমগুলোর মধ্যেও জমতে থাকে সুপ্ত ঘাম। গোঁফের পাশে বড় বড় ঘামের রোয়া ভারী হয়ে ঠোঁটের ধার বেয়ে নামার সময় শিরশিরে অনুভূতি ছড়িয়ে যায়। হুমায়ুন কবির টের পায় যেন নাকের পাশ দিয়ে কতগুলো শুঁড় বেরোচ্ছে। শুঁড়গুলো নড়াচড়া করে, কোনো এক দিকে গন্ধ পেয়ে টানটান হয়ে থাকে, ভাবতেই ঘরের প্রতিটা মানুষের গায়ের গন্ধ নাকে লাগে তার। স্ত্রীর শরীরের ঘ্রাণ ছাড়া আর কারো গায়ের গন্ধ পাবার কথা নয় কিন্তু সে টের পায়। ছোটনের গায়ের টকটক গন্ধ, ঘাড়ের কাছে জমা ঘাম, টি-শার্টের গন্ধ, ব্যবহৃত ডিওডোরেন্টের ঘ্রাণ, ক্রিকেট গøাভস, হ্যাট, পড়ে থাকা জুতোর গন্ধ, ফেলে রাখা প্যান্ট, এককোণে ঝোলা একটা শার্ট। হুমায়ুন কবির মাঝরাতে ভেজানো দরজার এইপাশ থেকেও জানে কোনটা কোথায় আছে। কারণ ওগুলো ছোটন ওভাবেই রাখে। সে যেভাবেই রাখুক মা সেগুলো গুছিয়ে রাখবে। সে যেটাই চাইবে পিতা সেই আবদার মেটাবে বা মেটাতে বলবে। এই ঘরে ছোটনের জন্য কোনো না-বাচক শব্দ নাই, তার প্রতি অদরকারি আবেগের সীমা নেই, তার কোনো কিছুতে নজরদারি নেই। তার জন্য সবকিছু নতুন, তার চাহিদার কাছে অভাব পাত্তা পায় না। ছোটনের প্রতি বাবা-মার আছে মাত্রাতিরিক্ত আবেগ কারণ তারা তাকে বড় করে যেতে পারবে না। ছোটন তাদের ঘরে হঠাৎ করেই এসেছে, বুঝতে না পারা অসময়ে চলে এসেছে। ছোটনের বয়স মাত্র দশ। ওতে হুমায়ুন কবিরের কিছু আসতো-যেতো না। ছোট পুত্রের জন্য পিতার বড় টান। যতটুকু জমিজমা আছে তার অর্ধেক বাপ লিখে দেবে এই পুত্রকে!

যা এতদিন হয়নি, বছরের পর বছর নিজেকে নিয়ন্ত্রিত রাখা হুমায়ুন কবির জ্বলে যায়। সুপ্ত আগ্নেয়গিরির মাঝে জ্বলন্ত লাভার মতো বলকে বলকে ফুঁসে উঠতে থাকে অবদমন। ভেতরে ভেতরে ছোটন হয়ে ওঠে চরম প্রতিপক্ষ। ছোটন যখন ক্রিকেট ব্যাট হাতে বেরিয়ে যায়, তখন হুমায়ুন কবির নিজেকে খুঁজে পায় একটা বিশাল মাঠের বাইরে। ভেতরে কতগুলো বালক ফুটবল খেলছে আর সে শূন্য চোখে তাকিয়ে আছে না পাওয়া ফুটবলটার দিকে। ছোটনের হাতে থাকে যখন একটা আপেল, হুমায়ুন কবির ভাবে ঐ সময় সে কামড়াতো কষটে আমলকী। বাবা যখন ছোটনকে বুকে নেয়, তখন দেখতে পায় দুধের কলসি নিয়ে সে যাচ্ছে বাজারের দিকে, বিক্রি করতে। এতকিছু পাওয়ার পরও ছোটন পেয়ে যাচ্ছে জমিজমার অর্ধেকটা! পরিবারের দৈন্যদশার সময় এই ছেলেটার জন্ম হয়নি। এখন যা একটু ভালো আছে তাতে কোথা থেকে এসে পাওনার অনেক বেশি নিয়ে নিচ্ছে! এত স্বার্থপর মানুষ! সে জীবনের সব স্বার্থ ছেড়ে তবে কি পেলো?

বাবার মুখে ও কথা শোনার পর হুমায়ুন কবির কোনো কথা বলেনি। বেশি কথা সে কোনোকালেই বলতো না, চাইলেও পারে না। কথা ফুরিয়ে যায়, দম বন্ধ হয়ে আসে তার। তবে সে একলা একলা কথা বলে। উপশহরের গলি ধরে হাঁটার সময়, কলেজ হতে বেরিয়ে আসবার সময় মাটির দিকে ঝুঁকে ঝুঁকে কথা বলে। দীর্ঘদিন মাথা নামিয়ে কথা বলতে বলতে তার ঘাড় কুঁজো। কথা বলতে বলতে হাঁটে বলে হাঁটেও আস্তে আস্তে, শরীরটা ক’বছর যাবৎ তাই বেশ ভারী। চামড়ায় যে রং নিয়ে জন্মেছিল সেটা দেখতে অনেকখানি ছাইয়ের মতো। হুমায়ুন কবিরের মনে হয় সে একটা মহিষ। সে পুরুষ কিন্তু পুরুষের মতো তীব্রতা নেই, পুরুষ হয়েও তার শিংগুলো মহিষের মতো বাঁকা।

হুমায়ুন কবিরের ঘরটা তখনই পরিণত হয় কাদা ভর্তি মহিষের এক বিশাল ডোবায়। সে সেখানে পুঁতে আছে আর তার গলা অব্দি শুধু পচানো কাদা। সে কাদার পাঁক থেকে নড়তে চায়, পারে না। মাটি কামড়ে ওপরে আসতে চায় কিন্তু বারবার পিছলে যায়, চোরকাদা তাকে পেঁচিয়ে অতল গহŸরে টেনে চলছে যেন!

গর্তে পুরোপুরি ডুবে যাবার আগ মুহূর্তে কোনো এক সিদ্ধান্তে হুমায়ুন কবিরের চোখ জ্বলে ওঠে হঠাৎ। শিকারির হিংস্রতায় খামচে ধরে শক্ত মাটি, পাশের রুমের ঘড়র ঘড়র থেমে যায়।

পরদিন সকালে হুমায়ুন কবিরের বাবাকে মৃত পাওয়া যায়।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj