গল্পের নাম ‘শর্তপূরণ’ : রণজিৎ বিশ্বাস

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

শৈশবে তারুণ্যে একটি প্রাণীর মাংস আমি খুব খেতাম। রাঁধতেও পারতাম। রান্নাটি শিখিয়েছিলেন একজন শিক্ষক। জীবনের প্রথম ও সেরা শিক্ষক, চৌদ্দ বছরে লেখাপড়া শুরু করা ও ১৯২৪ সালে পঁচিশ বছর বয়সে ম্যাট্রিক পাস করা ও সে বছরই বিয়ে করে ফেলা অপর্ণাচরণ বিশ্বাস।

এই শিক্ষকটির কারণে আমার ইংরেজি ও বাংলা হস্তাক্ষর স্পষ্ট এবং আমার ভেতর ব্যাকরণবাতিক বড় বেশি বর্তমান। তাঁর স্ত্রী স্নেহলতা বিশ্বাসের আপত্তির মুখেও তিনি এই প্রাণিজ-প্রোটিন, পাঁঠার মাংস উপাদেয় করার রন্ধনশৈলী আমাকে বড় মনোযোগে আর শ্রমনিবিড়তায় শিখিয়ে গেছেন। ভোজনে তিনি বড় পারঙ্গম ও রসিক ছিলেন। দেহটাও ছিল তাঁর বিশাল, তখনকার দিনের দারোগার মতো।

শ্রাবণের একেবারে প্রান্তিক দিনে দেবী মনসার উদ্দেশ্যে নিরীহ ও চতুষ্পদ প্রাণীটির বলিদানের পর থেকেই রান্নার কাজগুলো শুরু হতো। তার আগে কুটোবাছার কাজেও আমি বেশ হাত লাগাতাম।

স্মৃতির দুসরা পার্ট হচ্ছে, পাড়ার ঘরে ঘরে রান্না টেস্ট করার পর আমাকে সার্টিফিকেট দিতে হতো। আমার জিভের ওপর সবার আস্থা ছিল প্রচণ্ড। এতটাই প্রচণ্ড যে নিজেদের জিভের ওপরও ততটা ছিল না। জিভের দুটো কাজ ভোজন ও বাচন, দুটোই আমাকে খুব বিশ্বস্ততার সঙ্গে করতে হতো। না করলেও ওরা মনে করতো আমি ওদের আস্থার প্রতি সুবিচার করছি।

একবার ইচ্ছে করেই অসৎ হয়েছিলাম। এক বাড়ির রান্না ভালো না হওয়ার পরও ওদের ফার্স্ট ডিভিশন মার্কস দিয়েছিলাম। মাংসের বাটিটি এগিয়ে দিয়েছিল জেঠতুত ভাইয়ের ‘সিস্টার-ইন-ল’, কান্তিময়তা ও তনুময়তায় যে ছিল সাধারণের মাপ কেটে অনেকদূর বেরিয়ে আসা। আমার হাতে বাটিটি তুলে দেয়ার সময় ওর হাতটি বেশ ভালোভাবেই আমার হাতে লেগে গিয়েছিল।

ইচ্ছে হয়েছিল হাতটা কয়েকদিন ধোব না, কয়েকদিন স্নান করবো না। কিন্তু পারিনি। কিছুক্ষণ পর হাত ধোয়ার পানির ঘটিটিও সে-ই এনে দিয়েছিল। দ্বিতীয়বার স্পর্শের ব্যাপারে আমার আগ্রহ যতটা ছিল, ওর সাবধানতা ছিল তারচেয়ে অনেক বেশি। ব্যাটের সঙ্গে বলের যোগ প্রথমবার বিনিচেষ্টাতেই হয়েছিল, দ্বিতীয়বার অনেক চেষ্টায়ও হলো না। একজন কোনো কারণে কয়েক মিনিটের মধ্যে দু’বার কেঁপে উঠতে চেয়েছিল, আরেকজন একবারের বেশি চায়নি।

অথবা, এমনও হতে পারে- হি-গৌট-এর প্রোটিন-প্রোটিন আঁশ চিবুনো একই প্রকৃতির আরেকটি প্রাণীকে সে পাঁঠা বলি করতে চায়নি।

মুক্তিযুদ্ধের দিনে নিজেদের বাড়িতে থাকতে না পেরে ভিন গ্রামে পালিয়ে পালিয়ে বাঁচার সময় সর্বনাশা মেয়েটি আমাকে বড় উপদ্রবে রেখেছিল।

সে আমাকে কখনো শব্দহীন শব্দে বোঝায়নি- কখন মানুষ বলে ‘আমি সকল নিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায়’, কিন্তু অর্থবাসা দৃষ্টিতে ও স্রস্তবিস্রস্ত সে সবকিছু কেড়ে নেয়ার জন্য চোখের সামনে এসে পড়তো।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ওর দরিদ্র পিতা, স্কুলশিক্ষক হওয়ার পরও, বই খাতা কলমের ব্যবহার বেশিদিন ওকে করতে দেননি। ঝোপের ভেতর ঘাপটি মেরে পড়ে থাকা দেশি নেকড়েদের তিনি বড় বেশি ভয় পেয়েছিলেন। মেয়েটিকে কোনো ‘বলি’র হাতে বলি দিয়ে হলেও তিনি নিরাপদ হতে চেয়েছিলেন। ভদ্রলোকের আরো দু’টি মেয়ে ছিল এবং তারা তুই বাড়িস কি আমি বাড়ি স্টাইলে বেড়ে উঠছিল। অনেকটা ভেজামাটিতে শেকড় পাওয়া রম্ভার মতো। প্রকৃতি তার স্বাভাবিকতা নিয়ে মানুষকে সব সময় বড় অসময়ে ফেলে দেয়।

বিয়ের এক মাসের মধ্যে সে তার দিদির বাড়িতে নাইয়র এসেছিল। তখন ওর সঙ্গে দু’মিনিট আমার কথা হয়েছিল, নিরলে ও বিরলে। ততদিনে অনেক সাহসী হয়ে ওঠা নিজেই সে জানতে চাইলো-

: আসেননি কেন সেদিন?

: কোনদিন? কোথায়?

: বিয়ের দিন! আমাদের বাড়িতে!

: কেমন করে কেমন করে দিনটা যেন খুব দ্রুতই পেরিয়ে গেলো!

: আমি জানতাম।

: কী জানতেন?

: দিনটা যে খুব দ্রুই পেরিয়ে যাবে, আমি জানতাম।

: যাবো যাবো ভেবেছিলাম। যাবার আমার ইচ্ছেও ছিল।

: তবু, কেমন করে যেন যাওয়া হয়নি। জানতাম এমনই হওয়ার ছিল। এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক ছিল।

: আরেকবার যাবো।

: হাসাবেন না। একটা কাজ করবেন?

: কী কাজ? বলুন, এক্ষুনি করে দিচ্ছি!

: মিথ্যেও আপনার আসে না। ওটি বলার চেষ্টা না করাই ভালো।

: আসবে না কেন?

: আসে না। না জানেন মিথ্যে বলতে না পারেন সত্য চিনতে।

: এবার কাজটা বলুন।

: খুব সহজ কাজটা। তাও আবার করতে হবে শর্তসাপেক্ষে।

: কী শর্ত?

: ছোট শর্ত কিন্তু খুব কঠিন শর্ত। কাজটি বিনা প্রশ্নে করতে হবে।

: বলেই দেখুন না পারি কিনা।

: আপনাকে কামড়ে ধরা এই লাল জামাটি আমার কাছে হারাতে হবে। এখনই।

: কেন?

: বলেছিলাম, কোনো প্রশ্ন করা যাবে না।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj