মায়া এবং মরীচিকা : ম্যারিনা নাসরীন

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

বাসায় কাউকে না বলে আকস্মিকভাবে অপুর অফিসে চলে এসেছিল বন্যা। এখন মনে হচ্ছে ফোন না করে আসাটা ঠিক হয়নি। প্রায় আধাঘণ্টা যাবৎ সে অফিস রুমে বসে আছে, কিন্তু অপুর ব্যস্ততা শেষ হচ্ছে না।

ধানমন্ডির এই অফিসে সে আগে দু’একবার এসেছে। পুরো অফিসটাই কর্পোরেট ক্যামোফ্লেজের আবরণে মোড়ানো। এই রুমটি অপুর জন্য নির্ধারিত। সেগুনকাঠের কারুকাজ করা এক্সিকিউটিভ টেবিলের ফাইবারগুলো উজ্জ্বল পলিশে চকচক করছে। টেবিলের এক পাশে ওয়ার্কিং ক্যাবিনেটে ফাইলের ভিড় দেখলে বুঝা যায় তার রিয়েল এস্টেটের ব্যবসায় বসন্ত। বন্যা সোফা ছেড়ে ওঠে। অফ হোয়াইট কালারের ভারী কার্পেট ওর ভারে কোনো শব্দ করে না। সোফার এক পাশে ছোট একটা বুক সেলফ ইংরেজি বইয়ে ঠাসা। বন্যা সেগুলো দেখে না। ওর আকর্ষণ বুকশেলফের ওপরে সাজানো বনসাইয়ে। সম্ভবত বট গাছের বনসাই। এগুলোর দাম সম্পর্কে বন্যার কোনো ধারণা নেই তবে শুনেছে খুব দামি। কি অদ্ভুত সময়! মাঠের বুকে বা নদীর কিনারে যে বটগাছ বিশাল বিশাল শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে তাকে মানুষ চেপেচুপে ছোট্টটি করে ছায়াতে সাজিয়ে রেখেছে। বামন গাছটির শরীরে বন্যা খুব সাবধানে হাত বুলায়। বনসাইয়ের একটু ওপরেই রাফটিক ওয়ালে অপু আর রিপার যুগল ফটোগ্রাফ ঝুলছে। ল্যুভর মিউজিয়ামের সামনে থেকে তোলা। রিপার পরনে ওয়েস্টার্ন পোশাক। এমনিতে রিপার চেহারা খুব ধারালো, কিন্তু এই ছবিতে ওকে অনেক বেশি আকর্ষণীয় লাগছে। কবে গিয়েছিল কে জানে! আগে দেশের বাইরে গেলে অপু একবার বাসায় এসে মায়ের সাথে দেখা করে যেত, এখন আর জানায় না। দেশে এসে অফিসের লোকের হাতে কিছু বিদেশি শ্যাম্পু, লোশন পাঠিয়ে দেয়। ঘরের এজমালি কাবার্ডে সেগুলো ওইভাবে পড়ে থাকে।

বন্যা অপুর দিকে ফিরে তাকায়। সামনে দুজন হোমড়া-চোমড়া চেহারার লোকের সাথে ইংরেজিতে অনর্গল কথা বলছে। চেহারায় ভারিক্কি ভাব চলে এসেছে। আসারই কথা, অপু রায়হান এখন রুহান রিয়েল এস্টেটের তিনজন মালিকের একজন। ওর চিবুকে ব্যবসায়িক রেসপন্সিবল মানুষের জ্বলজ্বলে সাইন। বন্যার বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় এক্সিকিউটিভ টেবিলের ওপাশের এই ছেলেটি একসময় ওদের সাথে সুর করে দুলে দুলে পড়ত,

ও পারেতে বিষ্টি এল ঝাপসা গাছপালা

এপারেতে মেঘের মাথায় একশ মানিকজ্বালা।

বাদলা হাওয়ায় মনে পড়ে ছেলে বেলার গান-

বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, নদেয় এল বান।

বুনাপু আস।

ছোটবেলায় অপু বন্যা নাম উচ্চারণ করতে পারত না। বুনা বলত। সেখান থেকেই বুনাপু।

বন্যা চেয়ার টেনে অপুর সামনে বসে। আয়নার মতো ঝকঝকে টেবিলে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে একটু বিব্রত হয়। নিজেকে এখানে ঠিক মানানসই লাগছে না।

বাবা-মা কেমন আছে?

বাবা ভালোই, মায়ের শরীর খারাপ এজন্য তোর কাছে এলাম। তুই তো আজকাল ফোন করেও খোঁজ নিস না।

এই যে অভিযোগ শুরু করলে। আমার জন্য বসে আছ, ডাক্তার দেখাও নি?

ইন্ডিয়া থেকে বিখ্যাত সাইকিয়াট্রিস্ট প্রফেসর ডক্টর হিমাংশু সরকার এসেছেন। মাকে উনাকে দেখাতে চাচ্ছি, তুই একটা সিরিয়াল নিতে পারিস কিনা দেখ।

বুনাপু, অদ্ভুত কথা বলছ। প্রফেসর ইমতিয়াজ এ দেশের সবচেয়ে ভালো সাইকিয়াট্রিস্ট। তিনি মাকে দেখছেন। বিদেশি ডাক্তারের কি দরকার?

উনি তো অনেকদিন থেকে মায়ের চিকিৎসা করছেন। কিন্তু দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। একে দেখিয়ে যদি কোনো উপকার হয়? তুমি সিরিয়াল নিতে পারবে কিনা সেটা বল।

বন্যা রেগে গেলে অপুকে তুমি বলে সম্বোধন করে।

আমাকে দেখে বুঝতে পারছ না আমি কত বিজি? এসব কাজে আমাকে জড়াও কেন?

তুমি আমাদের কোন কাজে আছ শুনি? গত তিন মাসে তুমি মাকে একবারও দেখতে গিয়েছ? বাবা-মায়ের প্রতি তোমার কোনো দায় নেই?

আমি তো বলেছি তারা আমার সাথে এসে থাকুক। সেটাতে তো রাজি না। ধানমন্ডি থেকে বাড্ডা যেতে কত সময় লাগে তোমার আন্দাজ আছে?

তুমি শ্বশুরবাড়ি থাক, সেখানে তারা কিভাবে থাকবে? তাছাড়া তোমার বৌ তো বলেছে সে পাগল শাশুড়ির সাথে থাকতে পারবে না।

রিপা মিথ্যা কিছু বলেছে? তোমরা শুধু দেখ আমি শ্বশুরবাড়িতে আছি। কিন্তু তারা না থাকলে আমার পায়ের নিচে যে মাটি থাকত না সেটা তোমরা বুঝতে চাও না।

অপুর ফর্সা মুখ রক্তাভ হয়ে উঠেছে। সেটা অভিমানে নাকি রাগে, বন্যা আন্দাজ করতে পারছে না। তবে বন্যার মন ভীষণ খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এরপর চোখ দিয়ে পানি পড়তে শুরু করবে। বন্যা নিরুত্তর থাকে।

আমি বাবাকে বহুবার বলেছি বাড্ডার জায়গাটা আমাকে দিতে। ওখানে আমাদের রিয়েল এস্টেট থেকে একটা এপার্টমেন্ট তৈরি করব কিন্তু বাবা পাত্তাই দিল না।

ওই বাড়িতে তো সবার অংশ আছে। বাবা একা কিভাবে দেবেন? আর তুই তো জানিস ওখানে রবি ভাইয়ের অনেক স্মৃতি। সেটা নষ্ট হলে মা আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পড়বেন।

তোমাদের এই মধ্যম শ্রেণির সেন্টিমেন্ট থেকে কবে বেরুতে পারবে বল তো? যাই হোক আপাতত আমার হাতে সময় নেই। যদি ফ্রি হতে পারি হিমাংশু সরকারের সিরিয়ালের জন্য চেষ্টা করে দেখব। না হলে ডক্টর ইমতিয়াজকে যেভাবে দেখাচ্ছ সেভাবে দেখাতে থাক।

অপুর মুখের ব্যবসায়িক সাইন ক্রমশ গভীর হচ্ছে। এই হিম হিম ঘরের বাইরের ইটপাথর হয়তো ঝাঁ ঝাঁ রোদে তেতে আছে কিন্তু এই মুহূর্তে বন্যার কাছে শীতল এই ঘরের চেয়ে বাইরের ইটপাথরের কাছে ছুটে যেতে ইচ্ছে করছে।

টাকার জন্য চিন্তা করো না। প্রতি মাসের টাকার সাথে এবার আরও দশ হাজার যোগ করে দেব।

অপুর দিকে তাকিয়ে বন্যার মুখ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়। সে উঠে দাঁড়িয়ে কাটা কাটা করে বলে,

তোমার তো অনেক টাকা আছে, সেটা আমরা জানি কিন্তু তুমি তোমার ব্যাংকে খোঁজ নিলে বুঝতে পারবে, এ যাবৎ তুমি যে টাকা পাঠিয়েছ তার সবই তোমার একাউন্টে ফেরত এসেছে। সুতরাং বাড়তি টাকার কোনো প্রশ্ন থাকছে না। আমি যেভাবে পারি মায়ের চিকিৎসা করাব। এ নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। গেলাম।

বন্যা ভাইয়ের অফিস ছেড়ে হন হন করে বেরিয়ে আসছে। ওর চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। অফিসের দুই একজন এমপ্লয়ি অবাক হয়ে মুখের দিকে তাকায়। বাম পাশের লিফট রেখে সে ডান পাশের সিঁড়ি ভেঙে দ্রুত নামতে থাকে। উত্তেজনার বসে সে ভুলে গিয়েছে বারো তলা অনেক উঁচু। ওর চোখের সামনে ফিকে হয়ে আসা একটা দৃশ্য ভেসে ওঠে,

একটা আবছা আলোকিত ঘর, নানা বয়সী পাঁচটি বিস্মিত শিশু, অল্প বয়সী একজন মা। মা’টি বাচ্চাদের মতো দুলছে আর সুর করে পড়ছে,

বাইরে কেবল জলের শব্দ ঝু-প ঝু-প ঝু-প

দস্যি ছেলে গল্প শোনে, একেবারে চুপ।

তারই সাথে মনে পড়ে মেঘলা দিনের গান।

বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, নদেয় এল বান।

দুই

ধানমন্ডির বনেদি পাড়ায় এখন নিঝুম দুপুর। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে বন্যা আকাশের দিকে তাকায়। বাংলা মাসের হিসাব মনে থাকে না। বইয়ে ছয় ঋতুর আবহাওয়া সম্পর্কে যেটুকু জেনেছে তাতে মনে হয় এখন গ্রীষ্মকাল। মাঝে মাঝে কিছু কালো মেঘ সূর্যকে আড়াল করে ফেলছে। কালবৈশাখীর পূর্বাভাস কিনা কে জানে। বন্যার হাঁটার গতি শ্লথ। বাসায় ফিরতে ভালো লাগছে না। ওর পাশাপাশি একজন ভিক্ষুক রাস্তার ওপর গড়াতে গড়াতে সামনে এগোচ্ছে। পা দুটো হাঁটু পর্যন্ত কাটা। দুই হাতের কনুই পর্যন্ত আছে। এলুমিনিয়ামের থালাটিকে সে কনুয়ের ধাক্কায় সামনের দিকে এগিয়ে দিয়ে পরে গড়িয়ে থালার কাছে যাচ্ছে। পথচারীর কেউ খেয়াল করছে কেউবা করছে না। ঢাকার মানুষ এসব দৃশ্যে অভ্যস্ত। লোকটির শরীর চট দিয়ে পেঁচানো। নিশ্চয় এমন কেউ তার আছে যে প্রতিদিন যতœ করে শরীরে চট জড়িয়ে দেয়। স্ত্রী, সন্তান বা অন্য কেউ? বন্যা দশ টাকার একটি নোট থালায় ফেললে ভিক্ষুকটি অনুচ্চ স্বরে কিছু একটা বলল। বন্যা সেটা শুনতে পায়নি।

বিকট শব্দ করে একটা বাইক পাশ কেটে চলে গেল। বাইকে বসা ছেলেটিকে পেছন থেকে একদম রুদ্রের মতো লাগছে। দুইদিন ধরে রুদ্রের ফোন বন্ধ। এটা নতুন নয়। সামান্য কথা কাটাকাটি হলেই সে রেগে কথার মাঝেই ফোন কেটে দেবে তারপর বন্ধ করে রাখবে। আগে বিষয়টি বন্যার কাছে খুব ইনসাল্টিং মনে হতো, রেগে যেত, কাঁদত, এখন কিছু ভাবে না। সময় হলে ও নিজেই ফোন করবে।

গত সপ্তাহে ক্যাফে থার্টি থ্রি থেকে নামার সময় লিফটে রুদ্র বাড়াবাড়ি রকমের পাগলামি করেছে। লিফটের দরজা বন্ধ হতেই তাকে যেভাবে বুকের মধ্যে আটকে ফেলেছিল তাতে ভেবেছিল সে আর কখনও এই বন্ধন মুক্ত করতে পারবে না। ওর নিকোটিন যুক্ত স্পর্শের চিহ্ন এখনও ঠোঁটের কোণে রয়ে গিয়েছে।

বন্যা খুব রেগে গিয়েছিল, কিন্তু রুদ্রকে দোষ দিয়ে কি লাভ? ওই সময়ে তার দেহতন্ত্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে অদ্ভুত শিহরণের যে ঘণ্টি বেজে উঠেছিল, তার আওয়াজ সে নিজেও থামাতে পারেনি। অসম্ভব একটা ভালো লাগা, তবুও কোথায় একটা বাধা, একটা জড়তা। বন্যা ঠিক বুঝতে পারে না। এটা কি ওর জন্মগত সংস্কার, নাকি মধ্যবিত্ত ভাবনা?

অপুর মতো রুদ্রও সেদিন বন্যাকে মিডল ক্লাস সেন্টিমেন্ট থেকে বেরিয়ে আসতে উপদেশ দিয়ে বলেছিল,

প্রেমিক-প্রেমিকাদের মধ্যে এসব একটু আধটু হয়। তুমি সেই শরৎ বাবুর যুগেই রয়ে গেলে।

এরপর যথারীতি ফোন বন্ধ।

আকাশের অবস্থা ভালো নয়। বন্যা বাসায় ফিরে যাবার কথা ভেবে যখন বাসস্ট্যান্ডের দিকে হাঁটা শুরু করে তখন ওর সেলফোন বেজে ওঠে। স্ক্রিনে রুদ্রের নাম ভাসছে। বন্যার মুখে অজানা একটা আলো খেলে যায়! মানুষের মন কত বিচিত্র! যার কাছে যেতে এত আকুলতা সে কাছে আসলে শামুকের মতো মুখ গুটিয়ে ফেলে।

বন্যা তুমি কোথায়? ফোন করে আমি হয়রান হয়ে যাচ্ছি।

কখন করলে? আমি তো তোমার ফোন বন্ধ পাচ্ছি।

কল লিস্ট চেক করে দেখ। আচ্ছা, তুমি কোথায় সেটা আগে বল। জরুরি আলাপ আছে।

আমি ধানমন্ডি। কি জরুরি আলাপ?

ফোনে বলা যাবে না। এক কাজ কর, কফি ওয়ার্ল্ডে চলে আস। আমি ওখানে যাচ্ছি।

কফি ওয়ার্ল্ড এখান থেকে বেশি দূরে নয়। বন্যা কোনার দিকে একটা টেবিল দখল করে বসে। এর আগেও ওরা এখানে কফি খেয়েছে। রুদ্রের জরুরি কি কথা হতে পারে সেটা আন্দাজ করতে পারছে না। মনের মধ্যে অস্বস্তি কাজ করছে। অপুর কথাগুলোর ওজনও ক্রমে ভারী হচ্ছে। মা, অপু, রুদ্র এলোমেলো লাগছে। খুব এলোমেলো।

প্রায় পনের মিনিট পর কাচের দরজা ঠেলে রুদ্রের মুখ উঁকি দিল। ওকে আজ এমন লাগছে কেন? মনে হচ্ছে এ কদিনেই অনেকটা বুড়িয়ে গেছে।

আমার আগেই চলে এসেছ দেখছি।

রুদ্রের কৈফিয়ত দেবার ভঙ্গিতে ক্লান্তি।

তোমার কি হয়েছে? চেহারার এ কি হাল? দুদিন ধরে তোমার ফোনও বন্ধ পাচ্ছি।

রুদ্র দুই হাতে মাথা চেপে বসে আছে। যখন বন্যার দিকে মুখ তুলে তাকাল তখন চোখে রক্তের জালিকা।

মা চারদিন আগে বাসা থেকে রাগ করে বেরিয়ে গেছেন। আমাকে সাত দিন সময় দিয়েছেন, বাকি সব তোমার হাতে।

কোথায় গিয়েছেন? আর আমার হাতে কি?

মা বলে দিয়েছেন আগামী সাত দিনের মধ্যে আমাকে ফাইনাল ডিসিশনে আসতে হবে। হয় তোমার সাথে বিয়ের চূড়ান্ত তারিখ ঠিক করতে হবে, অথবা তাদের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করতে হবে। অন্যথায় মা আর তার ভাইয়ের বাসা থেকে ফিরবেন না। বাবা এসবে খুব ভেঙে পড়েছেন। তোমার অবস্থা তো আমি জানি, এখন তুমি বল, আমি কি করব।

এরকম একটা দিনের জন্য বন্যার মানসিক প্রস্তুতি ছিল। তবুও চোখের সামনের কিছুটা সময় বর্ণহীন হয়ে ঝুলে রইল। সে রুদ্রকে কি বলবে, আরও কিছুদিন অপেক্ষা কর? সেটা খুব স্বার্থপরের মতো শোনাবে। রুদ্র যখন বেকার তখন থেকে তাদের মধ্যে রিলেশন। এখন সে নির্ভরশীলতায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। সমস্যা যত সব বন্যার। ভেবেছিল অপুর বিয়ে হলে মাকে দেখার আর সমস্যা থাকবে না। তখন রুদ্রকে বিয়ে করতে পারবে। কিন্তু সে আশা শেষ। গত তিন বছরে অন্তত পাঁচবার সময় নিয়েছে। আর কত? রুদ্রের বয়স ঊনত্রিশ হতে চলল। বন্যা একটু সময় নিল। তারপর শান্ত ভাবে বলল,

তুমি মাকে ফিরিয়ে নিয়ে এস।

তার আগে আমাদের বিয়ের তারিখ ঠিক করতে হবে তো।

বিয়ের তারিখ ঠিক করতে হবে, তবে আমাদের না, তোমাদের। তোমার সাথে আমার জুটি আল্লাহ লেখেননি।

হোয়াট ডু ইউ মিন বাই লেখেননি? আলবৎ লিখেছে। আমাদের বিয়ে হবে এবং ইট উইল বি ডিসাইডেড অ্যাট দিস ভেরি মোমেন্ট!

রুদ্র টেবিলে সজোরে চাপড় দেয়। আশপাশের টেবিল থেকে অনেকেই ওদের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। এখনই ওকে সামলাতে না পারলে সিনক্রিয়েট করে ফেলবে।

বন্যা নিঃসাড়ে একটি হাত রুদ্রের হাতের ওপর রাখে।

রুদ্র প্লিজ একটু শান্ত হও, আমার দিকে তাকাও।

রুদ্র তাকায় না কিন্তু কিছু বলেও না। মাথা নিচু করে মোবাইল নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। কফির মগ থেকে ধোঁয়া ওঠা বন্ধ হয়ে গেছে।

দীর্ঘ সময় মুখোমুখি দুজন মানুষ চুপচাপ বসে থাকে। আশপাশে থেকে চামচ নাড়ার টুং টাং শব্দ, টুকরো টুকরো কথা হাসি ভেসে আসছে কিন্তু দুজনের বুকের পাঁজর খুঁড়ে বিষাদের যে নদী বয়ে চলেছে সেটার গভীরতা কেউ কাউকে জানান দিতে চাচ্ছে না।

বন্যা হাতের ইশারায় ওয়েটারকে ডেকে বিল পরিশোধ করে। তারপর বলে,

আমার দেরি হচ্ছে। মায়ের শরীর ভালো না। চল উঠি।

আজই কি আমাদের শেষ দেখা? রুদ্র মরিয়া হয়ে ওঠে।

কেন শেষ দেখা হবে? তোমার বিয়েতে আমাকে বলবে না?

বন্যা লঘু হবার চেষ্টা করে, কিন্তু ভেজা কণ্ঠে বিকৃত হয়ে যায়।

আমাদের বিয়ের পর তোমার বাবা-মা যদি আমাদের বাড়িতে এসে একসাথে থাকেন, তাতে সমস্যা কোথায়?

তুমি তোমার বাবা-মাকে নিয়ে আমাদের বাড়িতে থাকতে পারবে?

তোমার ভাইয়ের মতো ঘর জামাই হতে বলছ?

দেখেছ, কেমন লাগে? আচ্ছা যাকগে আমি যাই। এই চার বছরে কতবার কতভাবে তোমাকে কষ্ট দিয়েছি, কিছু মনে রেখ না।

আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে?

পারতে তো হবে। চেষ্টা করব।

আমাদের সকাল, দুপুর, সন্ধ্যাগুলোর জন্য মন খারাপ হবে না?

কাঁদিয়ে দিতে চাও?

বন্যা প্লিজ, যেও না…

রুদ্র কখনও এত অসহায়ভাবে কথা বলে না। ওর এই অসহায়ত্ব বন্যাকে ক্রমশ দুর্বল করে ফেলছে। এখানে আরও কিছুক্ষণ দাঁড়ালে ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাবে। বন্যার মনবাড়ির ভিত নড়বড় করছে, যে কোনো সময় ধসে পড়বে।

তিন

বাতাস থমকে আছে। মেঘের হাঁকডাক শুনে মনে হচ্ছে ঝুম বর্ষা নামবে। ভাবতে না ভাবতেই ঝরঝর করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করে। রিকশাওয়ালা পর্দা দেবার জন্য তাড়াহুড়ো করছে কিন্তু বন্যা রিকশার হুড খুলে দিল। রুদ্র কি এখনও কফি হাউজে আছে? একবার ফোন করবে? আসার সময় ভালোভাবে বিদায় নিয়ে আসতে পারেনি। বুকের মধ্যে বোবা যন্ত্রণা খামছে ধরছে। এরকম অনেকগুলো বর্ষা রুদ্রের সাথে হুড খোলা রিকশায় ঘুরে বেড়িয়েছে। বন্যার মন কাঁদছে, চোখ ভাসছে।

বন্যা যখন বাসায় পৌঁছায়, তখন সন্ধ্যা হয় হয়। দরজা খুলে মা দাঁড়িয়ে আছেন। চোখে ঘোর লাগা দৃষ্টি। বন্যার ভেতরটা নাড়া খায়। মায়ের এই চেহারার সাথে সে খুব ভালোভাবে পরিচিত।

ঘরে ঢুকেই সে একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। দুই দুলাভাই মেঝেতে একগাদা কাগজপত্র নিয়ে কিছু একটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে। সম্ভবত কোনো বাড়ির নকশা।

আরে শ্যালিকা যে! তো ছুটির দিন আজ কোথায় গিয়েছিলে? কোনো অভিসার ছিল বুঝি?

বড় দুলাভাইয়ের খোঁচা দেওয়া কথায় মেজাজ খারাপ হয়।

যেটা আপনি ভাবেন। তো আপনারা হঠাৎ কি মনে করে?

কেন আমরা কি শ্বশুরবাড়ি আসতে পারব না? নাকি সব তুমি একাই ভোগ করবে?

ভোগ করবেন না কেন? সে তো আপনাদের হক। থাকেন, রাতে খেয়ে যাবেন।

বলেই বন্যা হনহন করে নিজের ঘরে ঢোকে। সে শঙ্কিত বোধ করছে। মা যখন অস্বাভাবিক থাকেন তখন এ বাড়িতে তাদের আনাগোনা বেড়ে যায়। সেটা যদি শাশুড়ির প্রতি মেয়ে জামাইয়ের দরদের কারণে হতো তাহলে পরিতৃপ্তি ছিল কিন্তু বন্যা জানে তাদের উৎসাহ অন্য খানে। এই বাড়িটা মায়ের নামে।

বাবা ডাইনিং রুমে মুখ শুকিয়ে বসে আছেন। মায়ের পাগলামি বাড়লে তিনি খুব অসহায় হয়ে পড়েন। বয়স হয়েছে বেশি হাঁটাচলাও করতে পারেন না। বন্যা কাপড় পাল্টে তার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।

দুই জামাই তো এই বাড়ির ভাগ চাচ্ছে। বাবা উদ্বিগ্ন স্বরে যেন বন্যার মত জানতে চাচ্ছেন।

তারা তো কেউ এই বাড়ির অংশীদার নয় বাবা?

তারা না হলে কি হবে? শিলু মিলু তো অংশীদার।

কি করবে?

ওরা আরেকটি প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের হাতে ডেভেলপার আছে তারা সিক্সটি পারসেন্ট ফ্ল্যাট দিতে রাজি হয়েছে আর অগ্রিম দশ লাখ টাকা। অপুকে ফোন করলাম কিন্তু তার আসার সময় নেই। তার কোম্পানিকে এই জমি কেন দেওয়া হচ্ছে না এজন্য খুব রাগ দেখালো। কেউ বুঝতে চায় না বাড়ি ভাঙলে তোর মাকে আর বাঁচানো যাবে না।

বন্যা অপুর অফিসে গিয়েছিল সেটা বাবাকে বলল না। কষ্ট বাড়িয়ে কি লাভ। একটু হেসে বাবাকে সে সান্ত¡না দেয়,

ভাঙতে হবে না বাবা। তোমার যেটা ভালো মনে হয় তাই করবে।

বন্যা আর দাঁড়াল না। সে ডাইনিং রুম থেকে মায়ের ঘরে আসে। ঘরের দেওয়ালে রবির বড় একটা ফটোগ্রাফ ঝুলছে। ছবিটি ওর চৌদ্দতম জন্মদিনে তোলা হয়েছিল। দেখলে মনে হয় মায়ের মুখ কেটে বসানো। চোখগুলো কি গভীর। রবি ওদের পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় ছিল। ওর পরে তিন বোন শিলু, মিলু আর বন্যা। অপু সবার থেকে ছোট। জন্মদিনে সব কেনা হয়েছিল। কেক, বেলুন, কর্কশিট, রাংতা, ঝিলিমিলি, জরির কাগজ কিন্তু মা মোমবাতি কিনতে ভুলে গিয়েছিলেন। রবি বলেছিল,

মা, রাস্তার ওপাশের দোকানে রঙিন মোমবাতি পাওয়া যায়, কিনে আনি?

মা কি একটু ভেবে বললেন আচ্ছা, সাবধানে যাস।

এর আগেও অনেকবার রবি সেখানে গিয়েছে। কিন্তু সেদিন হয়তো জন্মোৎসবের আনন্দে এত খুশি ছিল যে সাবধান হতে মনে ছিল না। রামপুরার সেই রাস্তা রবি আর কখনই পার হতে পারেনি। মাঝপথেই আততায়ী বাস তার জীবনের পথ থামিয়ে দিয়েছিল।

বন্যা ছবির ওপরে মমতার সাথে হাত বুলায়, আর ভাই সোহাগী ছোট্ট বোনটির মতো ঠোঁট ফুলিয়ে বিড়বিড় করে অভিযোগ করে,

কেন চলে গেলে? তুমি থাকলে আজ আর রুদ্রকে ছাড়তে হতো না। আমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দেবে ভাইয়া? আমার যে কষ্ট হচ্ছে, খুব কষ্ট।

বন্যার সমস্ত ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছে। সে মেঝেতে হাঁটু গেড়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। রুদ্রকে সে যতটা ভালোবেসেছিল এতটা ভালো কে কবে কাকে বেসেছে?

চার

বন্যা নামকরা একটা বায়িং হাউজের কো-অর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করে। আজ অফিস থেকে বের হতে বেশ দেরি হয়ে গেল। বাসায় কোনো কাঁচাবাজার নেই। মাকে একা রেখে বাবা বাইরে যেতে পারবেন না। ভেবেছিল একটু আগে আগে বের হয়ে রামপুরা থেকে বাজারটা সেরে নেবে। কিন্তু বের হবার মুহূর্তে জরুরি একটা মিটিং কল করা হলো। সবার হাজির থাকা বাধ্যতামূলক। কর্পোরেট অফিসগুলোতে এই একটা ঝামেলা, কর্তার ইচ্ছায় কর্ম।

মায়ের শরীর কয়েকদিন থেকে খুব খারাপ। ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর করছেন। বাবা আর ছোট কাজের মেয়ে মিলে তাকে সামলাতে পারে না। ডাক্তারের পরামর্শে বেশিরভাগ সময় ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হচ্ছে। বোনেরা বাচ্চাদের পরীক্ষার কারণে আসতে পারে না। অপুর অফিস থেকে আসার পর তার সাথে বন্যা আর কোনো যোগাযোগ করেনি। সেও প্রায় চার মাস হতে চলল।

রবি যখন মারা যায় বন্যার বয়স তখন আট বছর, অপুর ছয়। বন্যার মনে আছে ওদের কেউ রবির বডি দেখতে দেয়নি। শিলু আপু, মিলু আপু চিৎকার করে কাঁদছিল। বাবা হাউমাউ করে বুক চাপড়াচ্ছিলেন কিন্তু মা ঠায় বসেছিলেন- চোখ শুকনা মরুভূমি। সেই থেকে মাকে বন্যা আর কখনও কাঁদতে দেখেনি। দুইদিন পর মা পুরোপুরি উন্মাদ হয়ে গেলেন। চিকিৎসার পর ধীরে ধীরে অনেকটা সুস্থ হয়ে এলেও মাঝে মাঝে আগের অবস্থায় ফিরে যান।

দুটি মুরগি, কিছু সবজি, ডিম আর টুকটাক মসলা কিনে দ্রুত সে বাসায় ফেরে।

মিলু আপা দরজা খুলে দিয়েছে। অনেকদিন পর বোনকে দেখে বন্যা খুশি হয়ে যায় কিন্তু মিলু গম্ভীর গলায় বলল,

কাপড় ছেড়ে আগে বাবার ঘরে আয়।

আজ তাদের বাচ্চারাও এসেছে। ছোট ভাগ্নি অগ্নিলা দৌড়ে বন্যার কোলে চড়ে বসে। ওকে কোলে নিয়ে বন্যা বাবার ঘরের দিকে যায়। মনে আশঙ্কা খচখচ করছে। মায়ের কিছু হলো না তো? বাবার ঘরে সবাই আছে। শিলু আপা, দুই দুলাভাই, বাবা, কিন্তু সবাইকে খুব বিমর্ষ লাগছে। মা জানালার গ্রিলে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিমার মতো স্থির দৃষ্টি এবং অনির্দিষ্ট।

সে বাবার সামনে গিয়ে ভয়ে ভয়ে বলে,

কিছু হয়েছে বাবা?

বাবা কোনো কথা বলেন না।

কি শুনতে চাও? তোমার আদরের ভাইয়ের কেচ্ছা কাহিনী শুনেছ? একেই বলে কুলাঙ্গার পুত্র!

বড় দুলাভাইয়ের গলায় উষ্মা।

কি করেছে অপু?

কি করেছে? তোমার মার কাছেই জিজ্ঞেস কর? উনি পাগলের বেশ ধরে থাকলে কি হবে, স্বার্থের জায়গায় ঠিক আছেন। কথায় বলে না, নিজের ভালো পাগলেও বোঝে। তোমার মা সারাজীবন শুধু ছেলের দিকে ঝোল টেনে গেলেন, মেয়েরা সব শত্রু।

দুলাভাই এসব কি বলছেন?

উনি আমাদের সবার হক নষ্ট করেছেন। আল্লাহ এর বিচার করবেন। আমরা সহজে ছেড়ে দেব ভেবেছ?

আহ! তোমরা থাম তো। আল্লাহ কি করবেন সেটা আল্লাহর ওয়াস্তে ছেড়ে দাও। বন্যা এদিকে আয় মা, বস।

কথা বলতে গিয়ে বাবার শরীর কাঁপছে। বন্যা বাবার পাশে গিয়ে বসে। তিনি খুব ধীরস্থিরভাবে বললেন,

অপুর উকিল নোটিশ পাঠিয়েছে। এই বাসা এই জমি সব তার নামে। সে রুহান রিয়েল এস্টেট থেকে এখানে মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিং তৈরি করবে। ডিজাইন পাস হয়ে গেছে। সামনের সপ্তাহে কাজ শুরু হবে।

কি বলছেন? এই জমি অপুর কিভাবে হলো?

সেটা তোমার মা জানেন। সম্ভবত অপু কোনো একদিন এসে তোমার মায়ের কাছ থেকে লিখে নিয়ে গিয়েছে। তোমার মাকে তো জানো। ছেলে যদি তার প্রাণ দাবি করে তবুও সে দিয়ে দেবে। বাড়ি এবং জমি যে এখন অপুর সে বিষয়ে কোনো ভুল নেই আমি সব কাগজ দেখেছি। তারা এক সপ্তাহ সময় দিয়েছে তার মধ্যে বাসা ছেড়ে দিতে হবে।

তোমার ভাই একটা বাটপার বুঝেছ? কত বড় নেমকহারাম হলে মায়ের পাগলামির সুযোগ নিয়ে বাড়ি লিখে নিতে পারে। শ্বশুরবাড়ির এত পেয়েছে তারপরও এটুকুর লোভ সামলাতে পারল না?

দুলাভাইয়ের কথার প্রতিবাদ না করেই বন্যা নিজের ঘরে চলে আসে। অপু এ ধরনের ঘটনা যে ঘটাতে পারে সেটা বন্যা জানে। সে ভাবছে মা বাবাকে নিয়ে এখন কোথায় যাবে?

রবির মৃত্যুর পর মা অপু ছাড়া কিছু বুঝতে চাইত না। সেরা স্কুল, বাজারের সেরা জিনিস, ভালো ভালো খাবার সব অপুর জন্য নির্ধারিত ছিল। সে সব জোগান দিতে প্রতি মাসে বাবার বেতনে টান পড়ে যেত। মাকে এই নিয়ে বাবা কোনো কিছু বলতে পারতেন না। অপু একদিকে আর দুনিয়া একদিকে। সেই অপু যখন বিয়ের এক মাসের মধ্যে বাসা ছাড়ে তখন মা একটা কথাও বলেননি শুধু ওর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলেন। অপু চলে যাবার পর থেকে মায়ের মস্তিষ্কের বিকৃতি ঘন ঘন হতে শুরু করে।

কবে এ কাজ করলে তুমি? কেন করলে? সারা জীবন তুমি তোমার ইচ্ছা মতো চলেছ, শেষ পর্যন্ত আমাদের সবাইকে রাস্তায় বসিয়ে দিলে?

বাবার চিৎকার শুনে বন্যা দৌড়ে আসে। জানালার গ্রিলে মুখ লাগিয়ে মা চিৎকার করে কাঁদছে।

রবি মারা গিয়ে চোখের যে স্রোতে বাঁধ পড়েছিল, সেই বাঁধ বুঝি আজ অকস্মাৎ ভেঙে গিয়ে জলোচ্ছ¡াসে দুক‚ল ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

বন্যা বাবার হাত ধরে,

বাবা, মা কাঁদছে।

কাঁদুক। যত ইচ্ছা কাঁদুক। অভিমানে বাবার মুখ বিকৃত হয়ে যায়।

পাঁচ

বন্যা আগের অফিস ছেড়ে একটি বেসরকারি ব্যাংকে সিনিয়র অফিসার হিসেবে জয়েন করেছে। মেরুল বাড্ডায় দুই রুমের ছোট্ট একটি বাসা। বাবা সারাদিন বারান্দায় চেয়ারে পাথর হয়ে বসে থাকেন। ব্লুাড সুগার, হাই প্রেসার, তার ওপর স¤প্রতি শ্বাসকষ্ট দেখা দিয়েছে। একজন সদাহাস্যময় মানুষ কিভাবে পাথর চাপা ঘাসের মতো বিবর্ণ হয়ে গেল! মায়ের চেয়ে বাবার জন্য বন্যার কষ্টটা বেশি বাজে।

মা ঢাকার একটি বেসরকারি মানসিক হাসপাতালের স্থায়ী বাসিন্দা। বাবা পেনশন ভেঙে সব টাকা ব্যাংকে ফিক্সড করে রেখেছেন। সেখান থেকে যে ইন্টারেস্ট আসে তাতে মায়ের হাসপাতালের খরচ চলে। প্রতি সপ্তাহের শনিবার ভিজিটরস ডে। বন্যা বাবাকে নিয়ে পনের দিন পর পর মায়ের কাছে যায়। মা তাদের চিনতে পারেন না। বড় ছেলে রবির একটি ফটোগ্রাফ তার বুকে জড়ানো থাকে। সম্ভবত, তিনি মৃত এই ছেলেটিকে ছাড়া আর কারো কথা মনে করতে পারেন না।

হাড্ডিসার শরীরের পাণ্ডুর ছায়া। চোখে বোবা দৃষ্টি। মায়ের দুহাত ধরে বাবা চুপচাপ বসে থাকেন। চোখের কোল বেয়ে দুফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে কিন্তু মায়ের সেদিকে কোনো ভ্রæক্ষেপ নেই। তার শূন্য দৃষ্টিতে একটি মাত্র রং। শুনেছে অপু সেখানে নিয়মিত যায়। বাবার মতো তার চোখের কোণেও হয়তো পানি আসে, কিন্তু মায়ের মনে তার এই প্রিয় সন্তানের কোনো স্মৃতি আর অবশিষ্ট নেই।

বাড্ডার চার রুমের টিনশেড ভেঙে অপুর এগারতলা বিল্ডিং উঠেছে। দুই বোন শিলু মিলুকে সে একটি করে ফ্ল্যাট দিয়েছে। বন্যাকেও দিতে চেয়েছিল, বন্যা নেয়নি। অপু তার ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করেছে। বন্যা এবং বাবাকে তার বাসায় নিতে অনেকবার এই বাসায় এসেছে, কিন্তু তার বাসায় যাওয়া দূরে থাক, সেদিনের ঘটনার পর বাবা ‘অপু’ নামটি মুখে পর্যন্ত আনেন না।

রুদ্র কোথায় আছে বন্যা জানে না। হয়তো মায়ের পছন্দের মেয়েটিকে বিয়ে করেছে বা করেনি। ওর কথা ইদানীং খুব বেশি মনে হয়। বুকের ভেতর চিনচিন করে ওঠে। লিফট দেখলে সেই ঘটনাটি শরীর মনজুড়ে ঘণ্টি বাজায়। বন্যার তর্জনী স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার অধর স্পর্শ করে। রুদ্র কি এখনও তাকে ভাবে?

ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। বন্যা রিকশার হুড তুলে দেয়। রিকশা এখন রামপুরা ব্রিজের ওপরে। নদীর পানি দুক‚ল ছাপিয়ে ফেঁপে উঠেছে। এখন আর বৃষ্টিতে ভিজতে ইচ্ছা হয় না। বন্যার ঝাপসা চোখের সামনে ফিকে হয়ে আসা সেই দৃশ্যটি ভাসছে।

একটা আবছা আলোকিত ঘর, নানা বয়সী পাঁচটি বিস্মিত শিশু, অল্প বয়সী একজন মা। মা’টি বাচ্চাদের মতো দুলছে আর সুর করে পড়ছে,

তিন কন্যা বিয়ে করে কি হলো তার শেষে।

না জানি কোন নদীর ধারে, না জানি কোন দেশে,

কোন ছেলেরে ঘুম পাড়াতে কে গাহিল গান-

বিষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, নদেয় এল বান।

বন্যা মনে মনে আবৃত্তি করে। ঘরটি ক্রমশ আলোকিত হয়ে উঠছে। সে আলোয় সকলের মুখ উদ্ভাসিত।

ওরা এখন কেউ কারো কাছে নেই।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj