রাবেয়া খাতুন : তাঁর উপন্যাসে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়কালীন ঢাকার পরিবেশ-প্রতিবেশ : গোলাম কিবরিয়া পিনু

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

রাবেয়া খাতুনের জন্ম ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর তৎকালীন ঢাকা জেলার বিক্রমপুরে মামার বাড়ি পাউসন্নে। পুরান ঢাকার রায় সাহেব বাজারের অলি-গলির দুর্বান্ন অন্বেষণেই কেটেছে শৈশবকাল। রাবেয়া খাতুন রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের সদস্য হওয়ায়- লেখাপড়ায় আগ্রহ থাকার পরও স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে কলেজে যেতে পারেননি। সেই সময়কালে স্কুলেও মুসলমান ছাত্রীদের সংখ্যা ছিল খুবই কম। মুসলমানদের সামাজিক অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মুসলমান মেয়েরা লেখাপড়ার জন্য স্কুলে প্রবেশ করতে পারেনি- সে সময়, উল্লেখযোগ্যভাবে।

এক সময় শিক্ষকতা করেছেন তিনি। সাংবাদিকতাও করেছেন- ইত্তেফাক, সিনেমা ও খাওয়াতীন পত্রিকায়, এছাড়াও পঞ্চাশ দশকে বের হতো তাঁর সম্পদনায় অঙ্গনা নামের একটি মহিলা মাসিক পত্রিকা। সাংবাদিকতায় আসা প্রসঙ্গে রাবেয়া খাতুন বলেন-

‘আমি যখন সাংবাদিকতায় আসি তখন পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন হাতেগোনা কয়েকজন। ফজলুল হক, কাইয়ুম চৌধুরী, জহির রায়হান ও আমি। তোমরা এখন যেমন সাক্ষাৎকার নিতে আসো, আমিও সে সময় সাক্ষাৎকার নিতে যেতাম লায়লা আরজুমান্দ বানু, আব্বাসউদ্দিনের, এখন তো সময় অনেক পরিবর্তন হয়েছে মেয়েরা ইচ্ছে করলেই আসতে পারছে। কাজ করার সুযোগ পাচ্ছে।’

রাবেয়া খাতুনের বিয়ে হয় ১৯৫২ সালের ২৩ জুলাই, স্বামী এ টি এম ফজলুল হক, তিনি সাংবাদিকতার পাশাপাশি চিত্রপরিচালকও ছিলেন। চার সন্তানের জননী রাবেয়া খাতুন। বিয়ে প্রসঙ্গে রাবেয়া খাতুনের ভাষ্য-

‘জাহানারা ইমামের পত্রিকা খাওয়াতীন এ কাজ করতাম। এটি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম মহিলা পত্রিকা। জাহান আপার সঙ্গে প্রেস শো দেখতে গিয়ে দূর থেকে দেখেছি সম্পাদক ফজলুল হককে। বাসার পরিস্থিতি খুব খারাপ। বিয়ের কারণে আমার ওপর পরিবার রীতিমতো বিরক্ত। কোনো পাত্রই পছন্দ হয় না। আত্মীয় পরিজনরা হাসাহাসি করে, বলাবলি করে ও হবে এ দেশের বড় লেখিকা। আর ওর জন্য আকাশ থেকে আসবে রাজপুত্র। সত্যি এলো রাজপুত্র, তবে আকাশ থেকে নয়, জমিন থেকে ফজলুল হক আর কাইয়ুম চৌধুরী (এখন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী)। তখন জুটি হিসেবে সাইকেলে ঘোরাফেরা করে। প্রথমজন চালক আর দ্বিতীয়জন রডে বসা আরোহী। কাইয়ুম আমার বাড়ি চেনে। এক বিকেলে দু’জন এসে বাবার সঙ্গে আলাপ করে গেল। বাসা থেকে আমার ওপর এলো প্রবল চাপ। এরা কেনো এলো। আমি তো আসলেই কিছু জানি না। চিন্তাও করিনি এমন দুঃসাহস। জাহানারা ইমামের সঙ্গে প্রেস শো দেখতে গেছি প্রবোধ স্যান্নালের ‘মহাপ্রস্থানের পথে’ মায়া সিনেমা হলে। এক ফাঁকে ফজলুল হক আমার সঙ্গে কথা বলতে এলো। প্রস্তাব রাখল আমি যদি রাজি থাকি তবে বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসবে তার আত্মীয়স্বজন। টল, স্মার্ট, সুদর্শন এবং সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত যুবক। আপত্তি নেই জানিয়েছিলাম। দু’সপ্তাহের মধ্যে কাবিন হয়ে গেল। বাবা-কাকার মত ছিল না। চেনা জানা নেই, দূরদেশ (?) বগুড়ার ছেলে। কিন্তু ভীষণ খুশি হলো আমার মা। হকের বাড়িতে এর বাবা ভাইবোন সবাই বেজায় খুশি। বেজার শুধু ওর মা কারণ তিনি স্থানীয় ধনী কন্যাকে ঠিক করে রেখেছিলেন। বায়ান্ন সালের তেইশে জুলাই আমাদের বিয়ে হয়। ঢাকার সিক্কাটুলীতে বাসা নেয়া হলো। আমার বয়স তখন উনিশ, রান্নাবান্নাও জানি না। অবশেষে বাবুর্চি এলো। দশটায় খেয়েদেয়ে দু’জনে অফিসে চলে যাই। কোর্ট হাউস স্ট্রিটের একটা বিশাল বাড়ির দোতলায় সিনেমা পত্রিকার অফিস। পত্রিকা চালায় মূলত তিনজন। ফজলুল হক। ওর ছোট ভাই ফজলুল করীম (এখন বিশ্ববিখ্যাত ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ) ও কাইয়ুম চৌধুরী। ওদের সাথে যুক্ত হলাম আমি। পরিচিত হতে লাগলাম উদীয়মান সাহিত্য প্রতিভাদের সঙ্গে। এক কথায় সাহিত্যাঙ্গনের স্বপ্নের মানুষদের সঙ্গে।’

উল্লিখিত ভাষ্য থেকে বোঝা যায়- রাবেয়া খাতুন অনেকটা উদার পরিবেশে নিজের স্বাধীনতা নিয়ে শুধু বেড়ে ওঠেননি, তৎকালীন মুসলিম সমাজের একজন নারী হিসেবে অগ্রসরমান থেকে শিল্প-সাহিত্যের জগতে প্রবেশ করেছেন বেশ আগ্রহ সহকারে। তাঁর বিয়েও হয়ে উঠেছে লেখালেখির ক্ষেত্রে পরিপূরক।

রাবেয়া খাতুন ১২-১৩ বছর বয়স থেকেই লেখালেখি শুরু করেন। ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম প্রগতিশীল সাপ্তাহিক ‘যুগের দাবী’তে ছাপা হয় ছোটগল্প প্রশ্ন। ১৯৬৩ সালের ১ জুলাইতে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম বই মধুমতী। রাবেয়া খাতুনের প্রকাশিত গ্রন্থ- উপন্যাস : মধুমতী (১৯৬৩), অনন্ত অন্বেষা (১৯৬৭), মন এক শ্বেত কপোতী (১৯৬৭), রাজবিনো শালিমার বাগ (১৯৬৯), সাহেব বাজার (১৯৬৯), ফেরারী সূর্য (১৯৭৪), অনেক জনের একজন (১৯৭৫), জীবনের আর এক নাম (১৯৭৬), দিবস রজনী (১৯৮১), নীল নিশীথ (১৯৮৩), বায়ান্ন গলির এক গলি (১৯৮৪), মোহর আলী (১৯৮৫), হানিফের ঘোড়া ও নীল পাহাড়ের কাছাকাছি (১৯৮৫), সেই এক বসন্তে (১৯৮৬) ইত্যাদি। ছোটগল্প গ্রন্থ : আমার এগারটি গল্প (১৯৮৬), মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী (১৯৮৬), সুমন ও মিঠুর গল্প (১৯৭৮), লাল সবুজ পাথরের মানুষ (১৯৮১), তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা (১৯৮৪) ইত্যাদি। একাত্তরের নয় মাস ও স্বপ্নের শহর ঢাকা নামের দুটি স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ রয়েছে তাঁর। রাবেয়া খাতুন অনেক ভ্রমণ কাহিনী লিখেছেন, এগুলো হলো- হে বিদেশী ভোর, মোহময়ী ব্যাংকক, টেমস থেকে নায়েগ্রা, কুমারী মাটির দেশে, হিমালয় থেকে আরব সাগরে, কিছুদিনের কানাডা, চেন্নি ফোঁটার দিনে জাপানে, মমি উপত্যকা, ভূস্বর্গ সুইজারল্যান্ড ইত্যাদি। তাঁর গবেষণাধর্মী লেখা- জীবন ও সাহিত্য, পাবনা মানসিক হাসপাতাল, স্মৃতির জ্যোতির্ময় আলোকে যাদের দেখেছি। এছাড়া তিনি শিশু-কিশোরদের জন্য ছোটগল্প ও উপন্যাস লিখেছেন। রাবেয়া খাতুনের উপন্যাস অবলম্বনে বেশ কটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে, এসব চলচ্চিত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি ও মেঘের পর মেঘ, এছাড়া তার কাহিনী নিয়ে ১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে প্রথম কিশোর চলচ্চিত্র তৈরি করা হয়। রেডিও ও টিভি থেকে প্রচারিত হয়েছে তাঁর রচিত অসংখ্য নাটক।

রাবেয়া খাতুন ভ্রমণ করেছেন বহুদেশ, এগুলো হলো- ইংল্যান্ড, আমেরিকা, ফ্রান্স, অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, সুইডেন, জাপান, নেপাল, ভারত, সিকিম, পাকিস্তান, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মিসর, দুবাই, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, তাসখন্দ, মারিশাস, মালদ্বীপ ও ইত্যাদি। এছাড়াও টরেন্টো ইউনিভার্সিটি বাংলা বিভাগের আমন্ত্রণে ঘুরে এসেছেন কানাডা।

কথাসাহিত্যিক ও লেখক হিসেবে রাবেয়া খাতুন বহু পুরস্কার অর্জন করেন, এসব পুরস্কার হচ্ছে- বাংলা একডেমি পুরস্কার (১৯৭৩), হুমায়ুন কাদির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৮৯), একুশে পদক (১৯৯৩), নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক (১৯৯৫), জসীমউদ্দীন পুরস্কার (১৯৯৬), শেরে বাংলা পুরস্কার স্বর্ণপদক (১৯৯৬), শাপলা দোয়েল পুরস্কার (১৯৯৬), টেনাশিনাস পুরস্কার (১৯৯৭), ঋষিজ সাহিত্য পদক (১৯৯৮), অতীশ দীপঙ্কর পুরস্কার (১৯৯৮), লায়লা সামাদ পুরস্কার (১৯৯৯), অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯৯), মিলেনিয়াম অ্যাওয়ার্ড (২০০০), টেলিভিশিন রিপোটার্স অ্যাওয়ার্ড (২০০১), বাংলাদেশ কালচারাল রিপোর্টার্স অ্যাওয়ার্ড (২০০২), শেলটক পদক (২০০২), মাইকেল মধুসূদন পুরস্কার (২০০৫), বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি পুরস্কার (২০০৫) ইত্যাদি। রাবেয়া খাতুনের গল্প ইংরেজি, উর্দু, হিন্দি ও ইরানি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

রাবেয়া খাতুন যে সময়ে লেখালেখি শুরু করেন, সেই সময়ে মুসলিম মহিলাদের শিক্ষার হার কম শুধু ছিল না, লেখক হিসেবে নিজের প্রতিভার বিকাশ ঘটানোর বিষয়টি ছিল আরও প্রতিক‚লতায় ঘেরা, এ প্রসঙ্গে তাঁর মতামত-

‘সামাজিক বাধাবিপত্তি অতীতে ছিলো, এখনো আছে। এ দেশের মহিলা সাহিত্যিকদের চলার পথ নানা কারণে দুর্গম। শিল্পের ক্ষেত্রে শিল্পীর অবদানের চেয়ে বিবেচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়ায় তিনি পুরুষ কি স্ত্রীলোক। বর্তমান সমাজের বিভিন্ন শ্রেণী ও স্তরের প্রকৃত নগ্ন চিত্র যদি উন্মোচিত হয় একজন পুরুষের হাত দিয়ে গর্বের সঙ্গে তখন জাহির করা হয় অভিজ্ঞতার সুফসল বলে। মহিলাদের ক্ষেত্রে তা দেখা হয় সম্পূর্ণ ভিন্ন বিরূপদৃষ্টিতে।

লেখালেখির ক্ষেত্রে পরিবার থেকে উৎসাহের বদলে পেয়েছি অবহেলা এবং সামাজিকভাবে চোখ রাঙানি। তখনকার বেশকটি পত্রিকায় নিয়মিত গল্প প্রকাশ হচ্ছিল। বিষয়টা বড় বোনের শ্বশুরবাড়িতে জানাজানি হলে তারা ইয়া লম্বা চিঠি পাঠালেন বাবার কাছে, যে লাইনগুলি এখনো ভুলিনি, আপনার পরিবারের একটি কন্যার হস্তাক্ষর বাইরের পর পুরুষেরা দেখিতেছে। উভয় খানদানের জন্য ইহা অত্যন্ত অসম্মান এবং লজ্জার ব্যাপার। বিষয়টির প্রতি আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করা যাইতেছে-।’

রাবেয়া খাতুনের প্রতিভারও সবচেয়ে উজ্জ্বল ও জ্বলন্ত অধ্যায় হচ্ছে উপন্যাসগুলো। রাবেয়া খাতুনের বিপুল, অজস্র, বহুমুখী রচনা সম্ভারের সামনে দাঁড়ালে বিস্মিত হতে হয়। ক্লান্তিহীন, নিরন্তর তিনি সৃষ্টি সাধনায় মগ্ন থেকেছেন।

২.

রাবেয়া খাতুন লিখিত সাহেব বাজার উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে, প্রকাশক- ওসমানিয়া বুক ডিপো।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ সময়কালীন ঢাকা নগরের মূল এলাকার পরিবেশ-প্রতিবেশের ওপর ভিত্তি করে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের চালচিত্র নিয়ে এই উপন্যাসের কাহিনী গড়ে উঠেছে। এদের কেউ ঘোড়াগাড়ির চালক, বাসাবাড়িতে কাজ করে খাওয়া শ্রমজীবী মহিলা, কেউ চোরাকারবারী। আছে গ্রাম থেকে আসা পড়ালেখার জন্য বালক।

গ্রাম থেকে ঢাকা নগরে আসে পিতৃহীন ছেলে আলো, তার খালার বাসায় এসে পড়ালেখা করে, খালা অন্যের বাসায় কাজ করে সংসার চালায়। সৈয়দ আলী বয়সে বৃদ্ধ, ঘোড়া গাড়ির চালক ছিলেন, সালমা সৈয়দ আলীর মেয়ে। কাজেম সৈয়দ আলীর নাতী, চোরাকারবারী করে থাকে। এদের জীবন সংগ্রাম, দ্ব›দ্ব ও জীবনবোধের বিভিন্ন ছবি নিয়ে এই উপন্যাসের খণ্ড খণ্ড কাহিনী গড়ে উঠেছে। একক কোনো চরিত্র এই উপন্যাসে মুখ্য হয়ে উঠেনি। এসব চরিত্রের মধ্যে দিয়ে ঢাকার তৎকালীন পরিবেশ, মানুষের অবস্থা, সেই সময়ের রাজনৈতিক ঘটনা-সংঘাত ও বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস এই উপন্যাসে কাহিনী বিন্যাসের মধ্যে দিয়ে প্রতিভাত হয়েছে। ঔপন্যাসিক এই উপন্যাসে রোমান্টিক আবহ তৈরির বদলে জীবন সংগ্রামের ধূসর বাস্তবতাকে অনেকটা স্থান দিয়েছেন, যার ফলে এই উপন্যাসটি হয়ে উঠেছে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের চালচিত্র।

উপন্যাস যে সময় লেখক রচনা করেছেন, তখন ঢাকা শহর গড়ে উঠছিল, আধুনিক হয়ে উঠেনি, শহরের সুযোগ-সুবিধেও তখন সেভাবে বিকশিত হয়নি, এমন সময়কালের ঢাকা শহরের বাস্তব চালচিত্র এভাবে এসেছে-

‘দু’ঘরের মাঝে যে দু-হাত জায়গা তা এক সঙ্গে উঠোন, বারান্দা, গোসলখানা- রাত্রি বেলার পেশাবখানারও কাজ করে। তাও আবার দু সংসার মানুষের। সংখ্যায় তারা যত কমই হোক, ভাবতেও অবাক লাগে আলোর। ঐ দুহাত জায়গার পরই দরজা। তার লাগালাগি আজেবাজে গাছে ভর্তি একটা জঙ্গল। ওপাশের খোলা বড় নর্দমার মুখ থেকে বিশ্রী বিকট গন্ধ আসছে। মিউনিসিপ্যালিটির দোষ নেই। ঢাকনী ছিলো এককালে। তার দু-এক টুকরো ভাঙ্গা অংশ এদিক ওদিক পড়ে আছে। বাকিগুলি উধাও। বাচ্চাদের পায়খানা করার ভয়ানক অসুবিধে তাহলে। এ পারে নর্দমা নেই কিন্তু ডাষ্টবিন আছে একটা। সেটার আগাগোড়া ভরাট রাজ্যের যত আবর্জনা দিয়ে। ছোট মাছি, রাঙামাছি, খোরমা মাছির নিশ্চিন্ত রাজ্য বিস্তার আর শাসনের তুমুল শব্দ সেখানে।’

উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে- দোলাইখালের, সেই খাল কী রকম ছিল এক সময়, তার বর্ণনা এ উপন্যাসে রয়েছে-

‘বোশেখের সেই অবিশ্রাম ধারাই যেন সেবারে বর্ষা ডেকে নিয়ে এলো তাড়াতাড়ি। দোলাইখালে পানি বাড়ছে। —-সারা বছর শুকিয়ে থাকা এক গাছি সুতোর মত দোলাই খালের শীর্ণ দেহ একটু একটু করে খোলা পানিতে ভরতে শুরু করে। ফুলে, ফেঁপে উপচে ওঠে এক সময়। —-বুড়িগঙ্গার সঙ্গে এ খালের যোগ যে ‘কাজলা ঝুলির’ মধ্যে দিয়ে, সেই পথ দিয়ে পঞ্চাশ ষাট মণী চালানী নৌকা আসে এ সময়। গজারী, বাঁশ, আম-কাঁঠাল, মিষ্টি কুমড়ো, মেটে হাঁড়ি কলসীর নৌকোই আসে সাধারণত, আর আসে বেদে নৌকো।’

এই উপন্যাসে সা¤প্রদায়িক দাঙ্গার চিত্র এসেছে, যে দাঙ্গার ফলে এই উপমহাদেশে সাধারণ মানুষেরা জীবন হারিয়েছে, বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হয়েছে, এমন করুণ পরিণতির মুখোমুখি হয়ে মানুষ হয়ে পড়েছে বিহŸল ও মূক, এমন ঘটনার বর্ণনা আমরা এ উপন্যাসে খুঁজে পাই-

‘পানির ট্যাঙ্কের কাছে সার্ট-প্যান্ট পরা একটি রক্তাক্ত কিশোরকে চোখে পড়লো। ধূলোর সঙ্গে লুটিয়ে আছে ছেলেটি, পারপাশে ছড়ানো খাতা, পেন্সিল বই। গীর্জার পেছনে বড় মানুষের লাশ একটা।’

কিংবা-

‘এ শহরে দাঙ্গার আগুন এই প্রথম জ্বলেনি। এই তো একচল্লিশ সালেও একবার তা ঘটে-মিটে গেল। আরও কতবার কত ক্ষুদ্র কারণকে কেন্দ্র করেই ঘটেছে আগে। কিন্তু এবারের কারণ এ শহরের মানুষেরা নয়। সারা ভারতে যে রুদ্র তাণ্ডব নেচে নেচে বেড়াচ্ছে, তারই একটা হুল্কা নগরের দিক দিগন্ত ভরে তুলেছে ‘আল্লাহু আকবর’ ধ্বনীতে। মার মার কাট কাট সর্বগ্রাসী সারাক্ষণী আতঙ্ক একটা।’

এই উপন্যাসে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ঘটনার বিবরণ এসেছে, রাশিয়া, জার্মান ও হিটলারের কথা এসেছে, এভাবে-

‘ওদিকে আবার আক্রান্ত হয়েছে রাশিয়া। কিন্তু এবারে আর দৈবের সাহায্য নয় নব বলে বলিয়ান রুশ পরাক্রমের কাছে স্টালিনগ্রাদে সাংঘাতিকভাবে মার খেয়েছে জার্মানী। এদিকে জাপানের পার্ল হার্বার আক্রমণের ফলে আমেরিকা নির্লীপ্তের ভূমিকা ছেড়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা একদল পাঠিয়েছে জাপানী বিক্রম ভাঙ্গতে, অন্যান্য দল এগিয়েছে ইংরেজ সহযোগিতায় উত্তর আফ্রিকার দিকে।’

কিংবা-

‘গোটা পৃথিবী কিছুতেই যেন নিশ্চিন্ত নয় সেই মানুষটির মৃত্যু সম্পর্কে যার হাঁ করা মুখের ছবি কিছুদিন আগেও বেরিয়েছে ‘দুনিয়া গ্রাসী হিটলার’ বলে। মৃত্যুর দশদিন আগেও বুঙ্কারে বসে যে হাসিমুখে মিত্রজনদের সঙ্গে পালন করে গেছে নিজের জন্মদিন।’

পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গিজাত মনোভাবে নারীকে বিভিন্নভাবে দেখা হতো, তেমনি উদাহরণ-

‘মিয়া চাঁদের সঙ্গে আগাগোড়া সম্পর্ক ছিলো তার মারেরই, আদরের নয়। স্বামী তাকে দেখতে পারতো না ছোটবেলা থেকেই। বলতো, বৌ হবে ছোটখাটো বাঁধনের। যে কোনও বয়সেই মাথায় একটা বড় ঘোমটা থাকলেই যাকে বৌ বৌ দেখাবে। তা নয় কোত্থেকে ধরে নিয়ে এলো এক তালগাছ। অমন বড় গড়নের মেয়েরা এক স্বামীতে সন্তুষ্ট থাকে না কখনও।’

এই উপন্যাসের ভাষা সহজ ও সাবলীল, বর্ণনামূলক ভাষ্য এই উপন্যাসের নির্মাণে মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। এই উপন্যাসের পাতায় পাতায় অনেক প্রবচন ব্যবহার করা হয়েছে। চরিত্র ও কাহিনীর প্রয়োজনে এসব প্রবচন পরিপূরক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে-

‘থাকতে রেখে খাও

দিন থাকতে হেঁটে যাও।’

বা

‘লাল বিবির জুতা পায়

চলো বিবি ঢাকায় যাই

ঢাকায় গিয়ে ফল খাই

ফলের বটু নাই

ডিমের মতো দেখতে তাই।’ হ

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj