বাংলাদেশের কিশোর কবিতা : চর্চা ও অগ্রগতি : রাশেদ রউফ

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

ড. হায়াৎ মামুদ বলেছেন, ‘প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথকে দিয়েই যেন শিশুসাহিত্যের বিকাশ পর্ব শুরু এবং এতে কোনো সন্দেহ নেই যে বাঙালি বিদ্বৎসমাজকে তিনিই প্রথম বোঝাবার চেষ্টা করেছিলেন যে, শিশুসাহিত্য ব্যাপারটি উপক্ষেণীয় বিষয় নয়ই, বরং গুরুতর অভিনিবেশ দাবি করে।’

সমগ্র বাংলা সাহিত্যের বিশাল বনম্পতি হলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বড়দের পাশাপাশি ছোটদের মন ও মননকে গভীরভাবে অনুশীলনের মাধ্যমে শিশুসাহিত্যকেও পুষ্প-পত্রে পল্লবিত করেছেন তিনি। রচনা করেছেন উৎকৃষ্ট ছড়া-কবিতা-গল্প-নাটক-উপন্যাস প্রভৃতি। বিষয়-বৈচিত্র্যের চমৎকারিত্ব, ভাবের ব্যঞ্জনা, শব্দের দ্যোতনা ও কিশোর মনের কষ্ট-আবেগের অভিনব উপস্থাপনার মাধ্যমে তিনি সাজিয়েছেন কিশোরকবিতার মায়াময় ভুবন। সাহিত্যের অপরাপর শাখার মতো কিশোরকবিতাকেও প্রাণদান করে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। যদিও সে সময়ে রচিত কবিতাগুলোকে ‘ছোটাদের কবিতা’ হিসেবে বলা হতো ঢালাওভাবে।

রবীন্দ্রনাথের আগে কি কিশোরকবিতার চর্চা ছিল না? শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেন বলেন, ‘বাংলাসাহিত্যের এই বিশিষ্ট ধারা অর্থাৎ কিশোরকবিতার সৃজন প্রয়াস প্রথম লক্ষগোচর হয় উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে। বিদ্যাসাগর ও ঈশ্বর গুপ্তের সময়কালে এর বিক্ষিপ্ত রূপটি স্বাভাবিকভাবে ঔজ্জ্বল্যে দীপ্তিমান না হলেও, পদ্যের সার্বিক সীমাবৃত্তে স্থিত এর গর্ভ থেকেই ভবিষ্যৎ কিশোরকবিতার ভ্রণটিকে অবলোকন করা গিয়েছিল।…নিছক উপদেশবাণী আর বিদ্যায়তনিক পদ্যের একঘেয়ে যে ধারাটি রবীন্দ্র-পূর্বকালে বাংলার শিশু-কিশোরদের প্রায় নিত্য চঞ্চু সঙ্গী ছিল, তাঁর জাদুকরি সৃজনশীল হাতের স্পর্শে তার সমূল পালাবদল ঘটে। সে পালাবদল মূলত ছন্দে নয়, ভাষায়, ভাবে-বিষয়ে, কল্পনার দৌরাত্ম্যে আর ছোটোদের মনস্তত্ত্ব সংলগ্নতার নিবিড়তায়- তাদের স্বাভাবিক-অস্বাভাবিক নানা প্রশ্ন আর জিজ্ঞাসা, আনন্দ আর বেদনা, সাহস ও দুঃসাহসের পরম চিত্র ও কাব্য-ভাষিতায়’।

কিন্তু শিশুসাহিত্যিক সুজন বড়–য়া বলেন, ‘বাংলা কবিতায় আদি যে কাব্যধারা সেটাই কিশোরকবিতার প্রেরণা। প্রাচীন, মধ্য ও আধুনিক যুগের স্বদেশপ্রেমমূলক, নৈসর্গিক সৌন্দর্যমণ্ডিত, জীবনমুখী আদর্শ চেতনা সমৃদ্ধ ও নির্মল, রস প্রধান গীতিধর্মী সহজ-সরল কাব্যধারাই কিশোর কবিতার ভিত্তি রচনা করে দিয়েছে। কথাটি আবার অন্যভাবেও বলা যায়, বাংলা কবিতার উৎস থেকেই কিশোরকবিতার উৎপত্তি। বাংলা কবিতার গৌরবময় অগ্রগতিই কিশোর কবিতা সৃষ্টির কারণ।’

তাই বলা যায়, সেই সময় থেকে যুগের পর যুগ পেরিয়ে কিশোর কবিতা এখন সাহিত্যের জনপ্রিয় মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

কিন্তু ‘কিশোরকবিতা’ অভিধাটি মাত্র চার দশক আগে সম্ভাবনার বর্ণিল আকাশে তার ডানা মেলেছিল, গত শতকের সত্তরের দশকের শেষদিকে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত কিশোরকবিতার প্রথম সংকলন ‘ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে’র মাধ্যমে। সংকলনের সম্পাদনায় ছিলেন তিন কবি : অজয় দাশগুপ্ত, ওমর কায়সার ও উত্তম সেন। সেখানে স্থান পায় ১৮টি কিশোর কবিতা। এই কবিতাগুলোর উপজীব্য বিষয় ছিল কৈশোরের স্মৃতিকাতরতা, কিশোর মনের চাওয়া-পাওয়া, স্বদেশ প্রেম, সমকালীনতা ও বয়ঃসন্ধিক্ষণের উন্মাতাল পর্ব। তখন থেকে বাংলাদেশে শুরু হয় ‘কিশোরকবিতা’ নাম নিয়ে ছোটোদের কবিতা লেখার দলবদ্ধ প্রয়াস। এরপরে ১৯৮২ সালে চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত হয় কিশোরকবিতার দ্বিতীয় সংকলন ‘জুঁই চামেলী ফুলের বোঁটা’। এটির সম্পাদনায় ছিলেন কবি সুজন বড়–য়া। এতে ১৫টি কবিতা স্থান পায়। এছাড়া কিশোরকবিতা বিষয়ক একটি প্রবন্ধও এখানে প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধটি লিখেছিলেন কবি-প্রাবন্ধিক অজয় দাশগুপ্ত।

সংকলনটি প্রকাশের পর বাংলাদেশের কিশোরকবিতা চর্চায় আসে নতুন গতি। যাঁরা নিয়মিত ছড়াচর্চা করেন, তাঁদেরও দু’একজন কিশোরকবিতা চর্চায় নিবেদিত হয়ে পড়েন। তাঁরা নতুন নতুন চিন্তা এবং নতুন নতুন ধারণা নিয়ে সাহিত্যের এ ধারাকে আরো বেগবান করার চেষ্টা করেন। কিশোর মনের কল্লোলিত কল্পনা, আবেগ, আনন্দ ও কষ্টকে স্বতন্ত্র মহিমায় উদ্ভাসিত করার প্রয়াস পান তাঁদের রচনায়। নতুন ভাবনা, অপার বিস্ময় ও স্বপ্ন নিয়ে কিশোরকবিতার ডিঙি ভাসিয়ে তাঁরা উচ্ছ¡সিত করেন তাঁদের সতীর্থ ও পাঠকদের। কিশোরকবিতার স্নিগ্ধ কোমল ও কমনীয় রূপের সঙ্গে কবিতার রচয়িতাদের গভীর অনুরাগ মনকে উদ্বেলিত করে তোলে। সে সময় যাঁরা প্রবলভাবে আলোড়িত করেন আমাদের, তাঁরা হলেন কবি আবু হাসান শাহরিয়ার, সৈয়দ আল ফারুক, আনওয়ারুল কবীর বুলু, তুষার কর, রোকেয়া খাতুন রুবী, সুজন বড়–য়া প্রমুখ। কৈশোরের সরলতা, উচ্ছ¡াস, স্বপ্ন ও কল্পনাকে তাঁরা এত চমৎকারভাবে তুলে ধরেছেন তাঁদের কিশোরকবিতায়, তাতে সমকালীন লেখকরা অনুপ্রাণিত না হয়ে পারেননি। ১৯৮৫ সালে প্রকাশিত হয় সুজন বড়–য়ার প্রথম গ্রন্থ ‘বাড়ির সঙ্গে আড়ি’। একে আমরা দেশের প্রথম একক নির্ভেজাল কিশোরকাব্য হিসেবে বিবেচনা করি। কেননা, এর আগে প্রকাশিত সবকটি কিশোর কবিতার বইয়ে ‘ছড়াকেও’ স্থান দেয়া হয়েছিল গুরুত্বের সঙ্গে। এ গ্রন্থটিকে গবেষকরা ‘কিশোরকবিতা’ চর্চায় মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বিষয়-বৈচিত্র্যে, ছন্দ-নৈপুণ্যে, শব্দকুশলতায়, উপমায় কিংবা চিত্রকল্পে এ বইয়ের কবিতাগুলো অসাধারণ। কবিতাগুলো পড়ার পর মনের ভিতর সৃষ্টি হয় অনন্য ভাবমণ্ডল, যেখানে একটি আদিম অপূর্বতা রয়েছে, আছে অপরূপ আচ্ছন্নতা।

এরপর বাংলাদেশের কিশোরকবিতা চর্চায় আসে নতুন মাত্রা। যাঁরা ছড়া লেখেন, তাঁদের অনেকের হাতে ফুটতে থাকে কিশোরকবিতার অপূর্ব ফুল। উপরে উল্লিখিত কবি ছাড়াও কিশোর কবিতা রচনায় আরো বেশি মনোনিবেশ করেন অগ্রজ শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেন, আলী ইমাম, মাহমুদউল্লাহ প্রমুখ। সঙ্গে ছিলেন সিকদার নাজমুল হক, মিহির মুসাকী, মাসুদ আনোয়ার, আবুল কালাম বেলাল, আজিজ রাহমান, রমজান আলী মামুন, রহমান হাবীবসহ একঝাঁক তরুণ কবিকর্মী। ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত চলে নিরবচ্ছিন্ন চর্চা। বাংলাদেশের কয়েকটি পত্রিকার ছোটদের পাতা বের করে কিশোরকবিতা সংখ্যা। সৃষ্টি হয় প্রাণের জোয়ার। সেই জোয়ারকে গতিময় করে তুলতে ১৯৮৯ সালের ২২ ডিসেম্বর আমরা আয়োজন করি বাংলাদেশের ‘প্রথম কিশোরকবিতা সম্মেলন’। এর আগে একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হয় আখতার হুসেন ও সুজন বড়–য়ার সম্পাদনায় অপূর্ব সংকলন ‘ছোটদের প্রিয় কবিতা’। সম্পাদনায় কিশোরকবিতার দুই বিশিষ্ট, সক্রিয় ও নিষ্ঠাবান কারুকর্মী থাকা সত্ত্বেও সংকলনের নামকরণে ‘কিশোরকবিতা’ না থাকায় সেময় কেউ কেউ কিছুটা হতাশ হয়েছিলেন। যদিও গ্রন্থভুক্ত সবকটি লেখা অনবদ্য কিশোরকবিতা। সেই সংকলনের মুখবন্ধে লেখা হয়েছিল : ‘একক কারুর কোনো কবিতার বই প্রকাশিত হলেও তাকে ছড়ার বই আখ্যা দেয়া হয়েছে। এই প্রচলিত ভুলের অবসান ঘটানো এবং ছোটদের কবিতার স্তিমিতপ্রায় ধারাটিকে আবার বেগবান ও সুসংহত করার তাগিদ-তাড়না থেকেই আমাদের এই সংকলনের জন্ম।’ সংকলনটি কিশোরকবিতা চর্চার স্রোতে বেগ প্রদানে বেশ ভূমিকা রাখে। এই দুই সম্পাদকই দু’বছর পর প্রকাশ করেন নতুন সংকলন। এতে তাঁদের সঙ্গে সম্পাদক হিসেবে যুক্ত করেন কবি রহীম শাহকেও। দু’বছর আগের হতাশাকে ছাপিয়ে সংকলনের নাম দেন ‘বাংলাদেশের বাছাই কিশোর কবিতা’। সেই সংকলনের ভূমিকায় বলা হয়, ‘এখনো কবিরা পাঠকের অনুভূতিকে রঞ্জিত করার জন্য ফুল-পাখি-নদীর কাছে ছুটে যান নির্ভাবনায়। নৈসর্গিক উপাদানকেই করেন কবিতার কেন্দ্রানুষঙ্গ। এই এককেন্দ্রিক চর্চাকে আমরা আজ কিশোরকবিতার সীমাবদ্ধতা হিসেবে শনাক্ত করতে চাই এবং ভাঙতে চাই সীমাবদ্ধতার এই দেয়াল। নৈসর্গিক বৃত্ত থেকে মুক্ত করে কবিতাকে আজ আধুনিক বিজ্ঞান প্রযুক্তির উত্তরণ এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সমকালিক ঘটনা প্রবাহের সঙ্গে যুক্ত করা প্রয়োজন। প্রয়োজন কিশোর মানসের সঙ্গে আধুনিক জীবনের বহুমাত্রিক অভিনব বিষয়ের মেলবন্ধন ঘটানো। কিশোর কবিতা কি আধুনিক কবিতার মতো সর্বগ্রাহী বা সর্বাভিসারী হতে পারে না?’ কিশোর কবিতাকে সর্বগ্রাহী ও আধুনিক কবিতার কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার জন্য কবিতার কারুকর্মীরা তখন থেকে শ্রম দিয়ে চলেছেন। সনিষ্ঠ আন্তরিকতায় কাজ করে যাচ্ছেন। এই সংকলন কিশোরকবিতা চর্চায় গতি সঞ্চারের ক্ষেত্রে অপরিসীম ভূমিকা রাখে- তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যদিও এর আগে ১৯৯০ সালে ‘বাংলাসাহিত্যের নির্বাচিত কিশোর কবিতা’ সংকলন প্রকাশ করে অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। সংকলন সম্পাদনায় ছিলেন কবি শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেন।

এমন সময় সংকলনটির প্রকাশ হয়, ‘কিশোরকবিতা’ অভিধা নিয়ে তর্ক-বিতর্কের তখনো অবসান হয়নি। তবে সেই তর্ক-বিতর্ক ছিল আড্ডায় সীমাবদ্ধ। মৌখিক। লিখিত নয়। এ তর্কের আভাস পাওয়া যায় ‘বাংলাসাহিত্যের নির্বাচিত কিশোরকবিতা প্রথম খণ্ড’-এর ভূমিকায়। এতে বলা হয়, ‘কিশোর বা ছোটদের কবিতা- সে কি কোনো পৃথক বা সার্বভৌম কাব্য-সত্তা? অথবা সাহিত্যের ভিন্ন কোনো শাখা? এমন প্রশ্নের যে জবাব বা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ পাওয়া যায়, সেখানেও এ সম্পর্কে কোনো অভিন্ন অভিমত-প্রতিক্রিয়া আভাসিত নয়। নানা মুনির নানা মতের সমাহারে জিজ্ঞাসু মন সহজে তৃপ্ত হয় না। স্বতই সিদ্ধান্তহীনতায় থমকে দাঁড়াতে হয় তর্ক ও বিতর্কের জটাজালে।

এক দলের অভিমত, বাল্য থেকে কৈশোরকাল পর্যন্ত বিস্তৃত সময় পরিধিতে একজন মানুষের স্বাভাবিক অস্বাভাবিক কিছু ভাবনা-কল্পনা, জগৎ পরিপার্শ্ব সম্পর্কে তার পর্যবেক্ষণজাত চেতনা অবচেতনের বিবরণ ইত্যাদিকেই কবি যখন ধারণ ও তাঁর স্বীয় অভিজ্ঞতার মিশেলে উপর্যুক্ত বিবরণকে কাব্য-শক্তিতে রূপান্তরিত করে শিল্পীত বিন্যাসে অক্ষর বন্দি করেন, তারই একটি দিব্যরূপ-কিশোরকবিতা।

আর একদল বলেন, কিশোরকবিতা বলে পৃথক কিছুই নেই। তার নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা নেই। গণ্ডি নেই। যে কোনো বিষয়কে ধারণ করেই এ জাতীয় কবিতা সৃষ্ট হতে পারে। কবিতা কবিতাই। তার জাত, রূপ বা বর্ণভেদ নিরর্থক। তবে এ অভিমত বা সংজ্ঞার যাঁরা বিরোধী, তাঁরা বলেন, কিশোর বা ছোটদের কবিতা যদি সাহিত্যের পৃথক ধারা বা শাখার অভিধায় চিহ্নিত হবার গৌরবী না হবে, তাহলে তার রচনারীতি, তার পরতে-পঙ্ক্তিতে চিত শব্দরাজি, সর্বোপরি, তার প্রকাশভঙ্গি এতটা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হবে কেন? উপর্যুক্ত স্পষ্ট বৈশিষ্ট্যসমূহের মিত্র ও মিশ্রতায় কবিতার যে পৃথক ধারা, অন্তিমে তা-ই কিশোর কবিতা’।

আসলে সুস্পষ্ট বিষয়-বৈচিত্র্যে, নরম নকশামেদুর শব্দ বিন্যাসে এবং মনস্তত্ত্বের নিবিড়তম সংলগ্নতায় কৈশোরিক অনুভূতি স্নিগ্ধ কবিতাই ‘কিশোরকবিতা’। তার মানে কিশোরকবিতা কিশোর কর্তৃক রচিত বা শুধুমাত্র শিশু-কিশোর পাঠকের জন্য রচিত কবিতা নয়। আমরা জানি-‘শিশুসাহিত্য স্বতন্ত্র কোনো পদার্থ নয়, কেননা তা সত্যিকার সাহিত্য হলে বড়রাও তাতে আনন্দ পান…।’ বুদ্ধদেব বসুর এই উক্তি আজ কিশোর বা শিশুসাহিত্যের লেখক ও পাঠকের বয়স সীমা, বিষয়ক বির্তকের অবসান ঘটিয়েছে। তাই কিশোরকবিতা একটি পোশাকি পরিচয় মাত্র। যে কোন বয়সের লেখক এই শ্রেণির কবিতা লিখতে পারেন, তেমনি যে কোনো বয়সের পাঠক তার রস আস্বাদন করতে পারেন। তবে রচনরীতি যতই সহজ-সরল হোক, কবিতার অপরিহার্য সব শর্ত পূরণ না হলে সেই রচনা কখনো কিশোরকবিতা হবে না। সুতরাং কিশোরকবিতাকে প্রথমেই হতে হবে কবিতা, তারপর কিশোরকবিতা।

কিশোরকবিতা বিষয়ে এই তর্ক-বিতর্ক যখন চলছিল নানা আড্ডায়, তখন আমাদের সামনে আসে ওপার বাংলা থেকে প্রকাশিত কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ও সরল দে সম্পাদিত চমৎকার সংকলন ‘পাঁচশ বছরের কিশোরকবিতা’। এ সংকলন তর্ক অবসানে বড় সহায়তা প্রদান করে।

এছাড়া অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, শিশুসাহিত্যিক লুৎফর রহমান রিটন, আমীরুল ইসলাম ও আহমাদ মাযহার কিশোরকবিতার এই অভিধাকে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ‘লুৎফর রহমান রিটনের সেরা কিশোরকবিতা,’ লুৎফর রহমান রিটন ‘জসীম উদ্দীনের সেরা কিশোরকবিতা,’ আমীরুল ইসলাম ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেরা কিশোরকবিতা’ এবং আহমাদ মাযহার ‘নজরুল ইসলামের নির্বাচিত কিশোরকবিতা’ গ্রন্থ সম্পাদনা করে কিশোরকবিতার অবস্থান পাকাপোক্ত করেন। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ছড়াশিল্পী লুৎফর রহমান রিটনের কিশোরকবিতাকে আমাদের সময়ে সেরা উপহার হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমার অনুভূতি এ রকম যে সাতচল্লিশোত্তর বাংলাদেশের শিশুকবিতার ধারায় তিনি (লুৎফর রহমান রিটন) সবচেয়ে সফল কবি এবং বাংলা ভাষার শিশুসাহিত্যের উল্লেখযোগ্য কবিদের একজন।’ তবে এখানে কিশোরকবিতার নিজস্ব ভুবন তৈরিতে আমাদের দুই প্রধান কবির ভালোবাসা ও অসাধারণ রচনার কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করতে চাই। সেই দুই কবি হলেন আহসান হাবীব ও আল মাহমুদ। ১৯৭৮ সালে প্রকাশিত হয় আহসান হাবীবের ‘ছুটির দিন দুপুরে’ এবং ১৯৮০ সালে প্রকাশ পায় আল মাহমুদের ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে’। ছড়া অন্তর্ভুক্ত থাকলেও বই দু’টি কিশোরকবিতার অনন্য গ্রন্থ হিসেবে আমাদের অন্তরে স্থান করে নিয়েছে তখনই। কবি আল মাহমুদ যদিও তাঁর আধুনিক কবিতা রচনার মতোই কিশোরকবিতাকে দেখতে পছন্দ করেন। আশির দশকের শেষদিকে দৈনিক দেশ-এর ছোটদের পাতার কিশোরকবিতা সংখ্যায় এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন: তাঁর নোলক কবিতাটা একাধারে শ্রেষ্ঠ কিশোরকবিতা এবং শ্রেষ্ঠ আধুনিক কবিতা। আবার ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত ‘ছড়া পত্রিকায়’ অন্য এক সাক্ষাৎকারে আল মাহমুদ বলেন, ‘কিশোরকবিতা আধুনিক কবিতারই অংশ। কিশোর মানস গঠনের জন্য। এ ক্ষেত্রে চিন্তাটা কিছুটা নমনীয় হতে হবে’। আসলে তিনি যথার্থই বলেছেন। কিশোরকবিতাকে হতে হবে প্রথমে কবিতা এবং হতে হবে আধুনিকও।

চার দশক ধরে কিশোরকবিতার চর্চা চলছে আড়ম্বরভাবে। বাংলা কবিতার হাজার বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে এবং আবহমান ধারাকে অক্ষুণœ রেখে আমাদের কবি কর্মীরা সীমাহীন প্রজ্ঞা ও পরিচর্যায় কিশোরকবিতাকে আরো মর্যাদাবান করে তুলছেন। এ পর্যন্ত অনেকগুলো এককগ্রন্থ বেরিয়েছে, যেগুলো নবীন প্রজন্মের বুকে কিশোরকবিতা রচনার স্বপ্ন বুনে দিতে সক্ষম। এ ছাড়া ‘নির্বাচিত কিশোরকবিতা’, ‘কিশোরকবিতা সমগ্র’, ‘শ্রেষ্ঠ কিশোরকবিতা’ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে অনেকেরই।

২০০২ সালে প্রকাশিত হয় আলী ইমামের কিশোরকবিতা সমগ্র। বলা যায়, কিশোরকবিতার ‘সমগ্র’ প্রকাশনার ক্ষেত্রে এটি সৃষ্টি করলো অনন্য ইতিহাস। এরপর ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হয় আমার ‘নির্বাচিত কিশোরকবিতা’, একই সময়ে প্রকাশিত হয় রহীম শাহ’র ‘নির্বাচিত কিশোরকবিতা’, ২০০৭ সালে প্রকাশিত হয় সুজন বড়–য়ার ‘কিশোর কবিতাসমগ্র’, ২০১১ সালে প্রকাশিত হয় অরুণ শীলের ‘নির্বাচিত কিশোরকবিতা’, ২০১২ সালে প্রকাশিত হয় সুজন বড়–য়ার ‘শ্রেষ্ঠ কিশোরকবিতা’, ২০১৪ সালে বের হয় তাঁর ‘আবৃত্তিযোগ্য কিশোরকবিতা’, ২০১৬ সালে প্রকাশিত হয় শফী সুমনের ‘নির্বাচিত কিশোরকবিতা’ এবং অরুণ শীল ও সাজিদ মোহনের ‘কিশোরকবিতা : প্রতিচিন্তা’।

‘কিশোরকবিতা : রূপ ও রূপান্তর’ শিরোনামে একটি প্রবন্ধের বইও উপহার দিয়েছেন সুজন বড়–য়া ২০১৪ সালে। কিশোরকবিতার ইতিবৃত্ত, আদি-অন্ত, ক্রমবিকাশ, সীমাবদ্ধতা ও প্রকরণ বিষয়ে চমৎকারভাবে আলোচনা করা হয়েছে এ গ্রন্থে। এটি কিশোরকবিতা অনুরাগীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হবে নিঃসন্দেহে।

এ বছর ২০১৬ সালে বইমেলায় প্রকাশিত হয় ২২ লেখকের কিশোরকবিতার বই। এ যাবৎ এ সংখ্যাই সর্বাধিক। আমাদের হিসাব মতে, এর আগে একসঙ্গে এতগুলো কিশোরকবিতার বই বাংলাদেশে প্রকাশিত হয়নি। এই ২২ জনের মধ্যে বর্তমান কিশোরকবিতার চর্চায় কয়েকজন পুরোধা ব্যক্তিত্বের বই যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে নবীন-তরুণদের বই। আমরা মনে করি, এটি ইতিবাচক দিক। রচনা-প্রাবল্যে যেভাবে আমরা অগ্রসর হয়েছি, তেমনি রচনার মানগত চর্চায়ও ধীরে ধীরে অগ্রসর হতে চাই। সক্রেটিস বলেছিলেন, ‘কবিতা রচনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন অনুপ্রেরণা’। আমরা মনে করি, কবিদের কবিতার সঠিক মূল্যায়নই হবে যথার্থ অনুপ্রেরণা। তাহলে তাঁরা আগামীতে আরো ভালো কবিতা উপহার দেবেন- সে প্রত্যশা অনায়াসে করা যায়।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj