রহস্যে ঘেরা অ্যাজটেক সভ্যতা : আলী ইমাম

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

ফরাসি নৃতত্ত্ববিদ জাঁক সুস্তেল সন্ধান দিয়েছেন মেক্সিকোর প্রাচীন অ্যাজটেক সভ্যতার। ধ্বংসস্ত‚পের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে এই সভ্যতার নিদর্শন। ১৬ শতকের দ্বিতীয় দশকে নৃশংস স্পেনীয় বাহিনীর আক্রমণের ফলে অ্যাজটেক সভ্যতার অকাল মৃত্যু ঘটেছিল। পুরাতাত্তি¡ক অভিযানের দরুন জানা গেছে এই বিচিত্র ও উজ্জ্বল সভ্যতার কথা।

নৃ-বিজ্ঞানী সুস্তেলের মতে, এই সভ্যতার সমৃদ্ধ পরিণতির যে সুস্পষ্ট প্রতিশ্রæতির স্বাক্ষর দেখা যায় তার সমূল উৎপাটন মানবসভ্যতার এক অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচিত হবে। ইতিহাস থেকে জেনেছি কিভাবে গথ, ভ্যান্ডালদের বর্বর আক্রমণে সমৃদ্ধ রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটেছিল। ১৬ শতকে স্পেনীয় আক্রমণকারীরা অ্যাজটেক সংস্কৃতি পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছিল।

জাঁক সুস্তেল এই সভ্যতার খোঁজে মেক্সিকোর দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে অভিযানে গেছেন। তিনি বিস্ময়করভাবে কিছু অ্যাজটেক পুঁথির সন্ধান পেলেন। সেই পুুঁথিতে লিপিবদ্ধ বিবরণগুলো ছিল অ্যাজটেকদের প্রাচীন সমাজের ধারা সম্পর্কে জানবার জন্য অন্যতম উপাদান। সুস্তেল অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে সেই প্রাচীন পুঁথিগুলোর পাঠোদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিলেন। যার ফলে তার পক্ষে অ্যাজটেক জীবনের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে আলোকপাত করা সম্ভবপর হলো।

উপাসনার জন্য তারা নির্মাণ করেছিল মন্দির। পরিকল্পিতভাবে নৌপথ করেছিল। নদী থেকে নগরীতে পানি সরবরাহের সুব্যবস্থা ছিল। অ্যাজটেক তাঁতিরা কুশলতার সাথে বস্ত্র বয়ন করত। দামি পাথর দিয়ে বানাত অলঙ্কার। ফিরোজা ছিল তাদের প্রিয় পাথর। পালকসজ্জাকে তারা যথেষ্ট গুরুত্ব দিত। বিচিত্র বর্ণের পালকের বিন্যাস ছিল সুকুমার শিল্পের অংশ। তাদের মাঝে পুষ্পপ্রীতি ছিল। প্রতি গৃহস্থ বাড়িতে ছিল উদ্যান।

অ্যাজটেক সমাজে সাধারণ শ্রমিক শ্রেণির প্রধান খাবার ছিল ভুট্টা। অ্যাজটেকদের পৌরাণিক কল্পনায় ছিল, প্রতিদিনের অবসানে রাতের অন্ধকার থেকে নতুন দিনের সম্ভাবনা সূচিত হয়। প্রতিটি ঊষা যেন একটি নতুন জন্ম। একটি আকাশের তারকামণ্ডলীতে তারা কল্পনা করেছিল বিনাশী অসুরবৃন্দের। যারা রয়েছে অস্তাকাশের পর্দার আড়ালে। জগতের কোনো অসতর্ক মুহূর্তে তারা ঝাঁপিয়ে পড়বে সৃষ্টির ওপর। সমস্ত কিছুকে লণ্ডভণ্ড করে দেবে।

অ্যাজটেক পুরাণ কাহিনী বর্ণিত হয়েছে, এক শাশ্বত ঐশ্বরিক দম্পতি থেকে জন্ম হয় দেবতাদের। এই দেবতারা আবার সৃষ্টি করেন জগতকে। সেই সৃষ্টির মধ্যে সূর্য হচ্ছে প্রধানতম। রক্ত ও আত্মবলিদান থেকেই জন্ম হয়েছে সূর্যের। খর্বাকৃতির এক দেবতা আগুনে আত্মসমর্পণ করেন। সূর্য হয়ে আগুন থেকে নবজন্ম লাভ করেন। কিন্তু তখনো সে গতিহীন। তখন একে একে অন্য দেবতারা আত্মাহুতি দেয়। তাদের রক্ত থেকে প্রাণসঞ্চার করে সূর্য তার আকাশ পরিক্রমা করে। সেই আদিকাল থেকেই শুরু হেয় মহাজাগতিক নাটকের।

সূর্যের জন্য জীবনীশক্তি জোগাতে হবে। নৃতত্ত্ববিদরা অ্যাজটেক সভ্যতার ধ্বংসস্ত‚প থেকে উদ্ধার করলেন বিস্ময়কর সব উপাখ্যান। পুরাণ কাহিনী। তাদের বিশ্বাসে ছিল রাত্রির অবসানে প্রভাত হবে। শীতের শেষে বসন্ত আসবে। পাতা ঝরে যাবার পর নতুন কচি পাতা গজাবে বৃক্ষশালায়।

৩০০ খ্রিস্টাব্দের গোড়ার দিকে অ্যাজটেক সভ্যতায় দেবরাজ কুয়েটজালকোটল এর পূজা হতো। এই দেবতা ছিল পালকঅলা সাপ। এই সাপ মানুষকে রুপার নানারকম শৈল্পিক জিনিস তৈরি করতে শিখিয়েছে। অলঙ্কারে দামি পাথর বসানোর কাজ শিখিয়েছে। বর্ণমালা সাজিয়ে বই লেখার কাজও শিখিয়েছে। কৃষিকাজে মানুষকে ভুট্টা চাষ শিখিয়েছে। গ্রহ-নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করে সময়ের হিসাব রাখতে শিখিয়েছে। মানুষ এক সময় শুধু গাছগাছড়ার শিকড় খেত। এক পাহাড়ি গর্তে ভুট্টা লুকানো ছিল। কুয়েটজালকোটল তখন একটি কালো পিঁপড়ে হয়ে সেই গর্তে ঢুকে পড়ে।

সেখান থেকে আনে ভুট্টার দানা। গ্রামবাসীদের শেখায় ভুট্টাচাষের পদ্ধতি। অ্যাজটেক পুরাণ কাহিনীগুলোর সংকলিত পুঁথির নাম পোপোলভু। এতে বর্ণিত আছে দেবতারা প্রথমে এই পৃথিবীকে সৃষ্টি করেন। তারপর মাটি আর পানি সৃষ্টি করেন। মাটিকে উদ্ভিদজগৎ দিয়ে আবৃত করে দেন। সূর্য তখনো ছিল না। পানির ভিতর থেকে অলৌকিক শক্তি এসে পৃথিবীকে আলোকিত করত। অ্যাজটেক সভ্যতায় ছিল নানা ধরনের বিচিত্র আচার অনুষ্ঠান। সূর্য দেবতার উদ্দেশে নরবলি দেয়ার প্রথা ছিল। তাদের অনেক ক্রিয়াকর্মকে রহস্যময় বলে মনে হয়।

রহস্য নগরী চিচেন-ইতজা

মেক্সিকোর উউক্যাটন স্টেটের রাজধানী মিরিডা থেকে ৭৫ মাইল দূরে পবিত্র নগরী ইতজা অবস্থিত। মায়া ভাষায় এটা চিচেন ইতজা নামে পরিচিত। ১৯৮৮ সালে ইউনেস্কো চিচেন ইতজার ধ্বংসাবশেষকে বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণা দিয়েছে। একসময় এখানে পাথর ও কাদার তৈরি শত শত দালানকোঠা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। আজো গোটা ত্রিশেক ভবন টিকে আছে। এখানকার ধ্বংসাবশেষ দুটো ভাগে বিভক্ত। একভাগ মায়া সভ্যতার উৎকর্ষ যুগের। মায়া সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ এখানে রয়েছে। এসব বিধ্বস্ত ভবন ও স্থাপনা ৭০০ শতক থেকে ১০০০ শতকে নির্মিত হয়েছিল। বাকি ধ্বংসাবশেষগুলো মায়া-টুলটেক যুগের। দশম শতাব্দী থেকে ত্রয়োদশ শতাব্দী পর্যন্ত এই যুগের ব্যাপ্তি ছিল। ঐতিহাসিক ‘পবিত্র ক‚প’ ইতজা এলাকায় অবস্থিত। এটা একটি অসাধারণ ধ্বংসাবশেষ। এক সময় এখানে কৃষিকাজই ছিল বসতি স্থাপনের মূল আকর্ষণ। ৬২৫ সাল থেকে ৮০০ সালের মধ্যে এখানে শিল্পকলা ও বিজ্ঞানের উন্মেষ ঘটে। পাশাপাশি চিচেন ইতজার ধর্মীয় গুরুত্ব বেড়ে যায়। এখানকার লালবাড়ি, হরিণবাড়ি, মঠশালা, গির্জা আকাব জিব, তিন দরজার মন্দির ও ফাল্লি বাড়ি তাই প্রমাণ। দশম শতকে সভ্যতার গাঁথুনি দুর্বল হয়ে যায় আর মায়া লোকজন ইতজা ছেড়ে চলে যায়। তবে একাংশ জনগণ এখানে প্রার্থনা আর লাশ সমাহিত করতে আসত। আর ইতজা জনগণ সপ্তম শতকের প্রথম দিকে এ নগরী পরিত্যাগ করে এবং দশম শতাব্দীতে আবার এখানে ফিরে আসে। ১০০০ সালের দিকে ‘জিও’ ও ‘কুকর্ন’ জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়। এরা ইতজা জনগণের পক্ষে প্রায় দশ বছর ছিল। এ সময় আবার চিচেন ইতজার উন্নতি ঘটে ও শত শত স্থাপনা গড়ে ওঠে। টুলটেক শিল্পকলার ভবনসংলগ্ন ছাদযুক্ত প্রবেশপথ, গ্যালারি, দেয়ালে সাপ, পালি আর মেক্সিকান দেবতাদের খোদিত ছবি ধ্বংসাবশেষ আজো রয়ে গেছে। ইতজা জনগণের ওপর টুলটেক জনগণের ব্যাপক প্রভাব ছিল। তারা ইতজাদের ওপর ধর্মীয় বিধান চাপিয়ে দেয়। মায়াপান ও উক্সামল জাতির সঙ্গে সন্ধি করে টুলটেক জাতি চিচেন ইতজা সা¤্রাজ্যের রাজনৈতিক সীমানা বৃদ্ধি করে। তারাই মানমন্দির, কুকুলক্যানের পিরামিড, যোদ্ধা মন্দির, বল কোর্ট, হাজারস্তম্ভের দালান তৈরি করে। যোদ্ধা মন্দিরের ভেতরের অলংকরণ ও রঙ আজো প্রায় অবিকৃত রয়েছে। ১১৯৪ সালে মায়াপান জাতি সন্ধি ভঙ্গ করে এবং চিচেন ও উক্সামল জাতিকে পরাজিত করে। আর তখন থেকেই এ নগরী ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত হয়।

প্রতœতাত্তি¡ক আবিষ্কারে মেক্সিকোর প্রাচীন মায়া নগরী চিচেন ইতজার এক ভয়ঙ্কর নিষ্ঠুর প্রথার কথা জানা গেছে। অনাবৃষ্টির সময় আকাশের দেবতাকে তুষ্ট করার জন্য কুকুলকান নামের বেদিতে নরবলি দেয়া হতো। ১৯০১ সালে একদল অভিযাত্রী গিয়ে ছিল চেচেন ইতজাতে। তারা সেখানকার পবিত্র কুয়া বলে পরিচিত কেনোট থেকে উদ্ধার করে মানুষের প্রচুর হাড়গোড়। বৃষ্টি দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা মানুষের হাড়গোড় ছিল সেগুলো। চিচেন ইতজা ছিল মায়াদের একটি সংরক্ষিত শহর। ৮০০ থেকে ১২০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সেখানে মায়া সভ্যতা বিস্তার লাভ করেছিল। যুদ্ধবাজ উনকা গোত্র ইতজা জনগোষ্ঠী শাসন করতো নগরীটি। কুকুলকান পিরামিড এর নির্মাণ রীতিতে টলটেকদের স্থাপত্যশৈলীর প্রভাব রয়েছে। মধ্য আমেরিকায় ছিল টলটেকদের মূল আবাস। তাদের রাজধানী টুলা ছিল মায়া শাসনের অধীনে। এ কারণে টুলা আর চিচেন ইতজার ভবনসমূহের মাঝে স্থাপত্য কৌশলের বিনিময় ঘটে। কুকুলকান পিরামিড ছিল ৮০ ফুট উঁচু। এর চার প্রান্তে ৯১টি করে ধাপ ছিল। এর সাথে ওপরে মেঝেকে একটি ধাপ হিসেবে ভাবা হলে মোট ধাপের সংখ্যা ৩৬৫। এটা বছরের ৩৬৫ দিনকে নির্দেশ করে। মায়ারা জ্যোতির্বিদ্যায় আগ্রহী ছিল। কুকুলকান এর স্থাপতিক বিন্যাসে তার প্রভাব রয়েছে। শরৎ বিষুব আর বসন্ত বিষুবের সময় কুকুলকানের সিঁড়ির ওপর সূর্যের ছায়া এমনভাবে ঢেউ তোলে যা দেখে মনে হয় পবিত্র কুয়ার দিক থেকে বিশাল আকৃতির একটা সাপ ধীরে ধীরে পিরামিডে উঠে আসছে। পিরামিডের চূড়ার মন্দিরে বৃষ্টি দেবতা চাক আর সর্পদেবতা কুয়েটাজাকোটের মূর্তি খোদাই করা আছে। জাগুয়ারের মূর্তি রয়েছে মন্দিরে। শরীর লাল রঙের। ঘন সবুজ পাথরের চোখ। দেবতার উদ্দেশ্যে পবিত্র কুয়াতে অলঙ্কার পরা মানুষদের নিক্ষেপ করা হতো।

এল তেজিন

এল তেজিন মেক্সিকোর ভিয়াক্রুজ প্রদেশে অবস্থিত। ১৯৯১ সালে ঐতিহাসিক নগরী বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। প্রথমে ধারণা করা হতো, যীশুখ্রিস্টের জন্মের ১০০ বছর আগে থেকে ১২০০ শতক পর্যন্ত তিন দফায় এখানে বসতি গড়ে ওঠে। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, এখানে আটশ শতক থেকে ১২শ শতকের মধ্যে এক দফায় বসতি গড়ে উঠেছিল। তিয়ুতিহুয়াকানসহ সমসাময়িক মায়াসভ্যতার টুলা জোচিক্যালকো, উশ্রামল ও চিচেন ইতজা নগরীর সঙ্গে এল তেজিন নগরীও পরিত্যক্ত হয়। অবশ্য ১২০০ সালে এল তেজিন মেক্সিকোর শক্তিশালী রাজ্য টিনোকটিটল্যান রাজ্যের শাসনাধীন আসার পর আংশিক ধ্বংসস্ত‚পে পরিণত হয় এবং নগরীটি পরিত্যক্ত হওয়ার সূচনা এখানেই।

এ নগরীর বসতি তিনটি অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। তেজিন এলাকার খোলা চত্বরটি ছিল আয়তক্ষেত্রাকার। আর তেজিন চিকো এলাকার নগর চত্বর ছিল ষড়ভুজ আকৃতির। তেজিন কমপ্লেক্স দুটো নদী ও পূর্ব-পশ্চিমের দেয়াল দিয়ে ঘেরা ছিল। বাকি তিনটি অঞ্চলের মধ্যে এল তেজিনই ছিল সবচেয়ে নিচু। এখানকার চারপাশে পিরামিডাকৃতির স্মারকস্তম্ভ ছিল। সবচেয়ে আকর্ষণীয় পিরামিডের নাম ‘নিচেস’। এ পিরামিডের উল্লেখ ১৭৮৫ সালের একটি দলিলে রয়েছে। এর ভিত্তিভূমি ৩৬ মিটার বর্গাকৃতির। সাত মিটার উঁচু, ৩০০ মিটার প্রশস্ত ও ১৫০০ মিটার দীর্ঘ একটি সড়কের মাধ্যমে এল তেজিন ও তেজিন চিকো সংযুক্ত ছিল। এল তেজিন নগরীর মতো আজো তেজিন চিকো অঞ্চলের পুরাকীর্তি খননকাজ সম্পন্ন হয়নি। তবে প্লাজা ডেল তেজি চিকোর খোলা চত্বর খনন করে আকর্ষণীয় ধ্বংসাবশেষের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এখানে অত্যন্ত অলঙ্কারবহুল একটি দালানের সন্ধান পাওয়া গেছে।

তৃতীয় অঞ্চলটি তেজিন চিকোর উপরে অবস্থিত ছিল। তেজিন চিকোর সঙ্গের সড়কপথে এই অঞ্চল সংযুক্ত ছিল। এখানেও নানা ধরনের পিরামিডাকৃতির অলঙ্কারবহুল স্থাপনা রয়েছে। দীর্ঘ ৫০০ বছর এ নগরী পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। এ সময় এখানে কোনো নির্মাণকার্য হয়নি। এল তেজিন নগরীর ৯৫৯ হেক্টর এলাকা জুড়ে ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। ১৯৭৬ সালে ৬০০ হেক্টর এলাকা সংরক্ষণের আওতায় আনা হয়। এর মধ্যে ৮০ হেক্টর প্রতœতাত্তি¡ক জোন ঘোষিত হয়েছিল। তবে ১৯৯১ সালে প্রতœতাত্তি¡ক জোনের আওতায় ২৪০ হেক্টর ভূমি আনা হয়। এই বিশ্ব ঐতিহ্যের সব অংশের মালিক সরকার নয়, ব্যক্তি মালিকানাও রয়েছে। তবে দীর্ঘ ৪০ বছরের নিরলস খনন কার্যের পর অনেক নিদর্শন আবিষ্কার করে তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ১৯৯২ সালে এখানে একটি জাদুঘরও খোলা হয়েছে।

অ্যাজটেক ঐতিহ্য

মেক্সিকোর ওজাকা নগরী, মন্টে অ্যালবান ও কুইলাপান প্রতœতাত্তি¡ক নিদর্শন ১৯৮৬ সালে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে মনোনয়ন পায়। এটা বিশ্বের অমূল্য সাংস্কৃতিক সম্পত্তি। ওজাকা উপত্যকায় তিনটি বিশ্ব ঐতিহ্য অবস্থিত। ১৫২৯ সালে স্পেনিশ উপনিবেশবাদীরা এই নগরীর কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে। নগরীর ৪ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে স্পেনিশদের প্রতিষ্ঠিত মন্টে অ্যালবান অবস্থিত। আর কুইলাপান গ্রামটির দূরত্ব ওজাকা থেকে ১২ কিলোমিটার। এখানে স্পেনিশরা একটি বিশাল মঠ নির্মাণ করেন। ১৫৭০ সালে এ মঠ নির্মাণের কাজ স্থগিত হয়ে যায়।

মন্টে অ্যালবানের অনুষ্ঠান কেন্দ্রের প্রধান আকর্ষণ ছিল ৩০০ মিটার লম্বা একটি ঘোড় দৌড়ের মাঠ। এ মাঠের উভয় প্রান্তে রয়েছে মঞ্চ। এ মাঠ যিশুখ্রিস্টের জন্মের তিনশ বছর আগে নির্মিত হয়ে থাকতে পারে। পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এই এলাকায় প্রাচীনকালেই বাঁধ ও পয়ঃনিষ্কাশনের জন্য নর্দমা নির্মিত হয়। ৮০০ শতকের দিকে এখানে প্রায় ৫০০ হাজার লোক বাস করত। ২০০ শতকেই জেপোটেকস উপজাতি তিয়ুতিহুয়াকানান সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসে। তারা অতিপ্রাকৃতিক ও বিমূর্ত চেতনায় উন্মুক্ত স্থানে স্থাপনা তৈরি করত। ৮০০ শতকের দিকে মিক্সটেকস উপজাতি পাহাড় থেকে সমতলে নেমে এসে জেপোটেকস জাতির ওপর ভয়াবহ হামলা চালায়। ১৯৩২ সালে মন্টে অ্যালবানের ৭ নম্বর সমাধি খনন করা হয় এবং ৫০০ মূল্যবান নিদর্শন পাওয়া যায়। স্পেনিশ উপনিবেশবাদী ওজাকা অঞ্চলে দখলদারিত্ব কায়েমের আগে তা অ্যাজটেক সভ্যতার প্রভাব ছিল।

মেক্সিকোর ক্যামপিচি রাজ্যের স্মৃতিস্তম্ভ ও নগর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনা ১৯৯৮ সালে বিশ্ব-ঐতিহ্য বলে ঘোষিত হয়েছে। ইউরোপের অলংকাবহুল বারোক শিল্পরীতির আদলে নগরীটি গড়ে তোলা হয়েছে। মেক্সিকোর ক্যারাবিয়ান উপক‚লে যে দুটি শহরকে পর্তুগিজরা সুরক্ষিত নগরী হিসেবে ব্যাপক পরিকল্পনার ভিত্তিতে গড়ে তুলেছিল, ক্যামপিচি তাদের একটি।

১৫৪০ সালে মেক্সিকোর মায়া অঞ্চল আহকিন পিচের দক্ষিণ-পশ্চিমে ফ্রান্সিস্কো মুনটিজো এল মুজু এই শহর প্রতিষ্ঠা করেন। ১৫১৭ সালেই স্প্যানিশ উপনিবেশবাদীরা আহকিন পিচ এলাকা তাদের প্রভাবে আওতায় নিয়ে আসে।

ক্যামপিচি মূলত একটি বন্দরনগরী। মেক্সিকোর ইউক্যাটান উপদ্বীপ ও গুয়াতেমালার পিটিন অঞ্চলে অভিযান চালানোর জন্য এই বন্দর স্প্যানিশ অভিযাত্রীদের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল।

মেক্সিকোর ঐতিহাসিক গুয়ানাজুয়াতো স্মৃতিস্তম্ভ ও এটির নিকটবর্তী খনি অঞ্চল ১৯৮৮ সালে সাংস্কৃতিক সম্পত্তির ক্যাটাগরিতে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ১৫২৯ সালে স্পেনিশরা মেক্সিকোর গুযানাজুয়াতো অঞ্চলে বসতি স্থাপন শুরু করে। এখনকার কুয়ান্যাক্সহুয়াতা পাহাড়ে তারা ১৫২৯ সালে রৌপ্য কণার সন্ধান পায়। টেরাসকো ভাষায় ‘কুয়ান্যাক্সহুয়াতা’ মানে ‘ফ্রগাইল’ বা ব্যাঙ পাহাড়। পাহাড়টির অর্থনৈতিক গুরুত্ব বুঝতে পেরে তারা সুযোগ সন্ধানী, খনিবিদ ও স্থানীয় অধিবাসীদের আগ্রাসন থেকে এ পাহাড়টিকে নিজেদের কব্জায় রাখতে মারফিল, টিপিটাপা, সান্তা আনা ও সিরো ডেল কিউয়াতো এলাকায় চারটি সুরক্ষিত দুর্গ নির্মাণ করে। গুয়ানাজুয়াতো শহর রক্ষায় বিশেষ মনোযোগ দেয়।

লাতিন আমেরিকার দেশ পেরুর আরিকিউপা প্রদেশের আরিকিউপা নগরীর কেন্দ্র ২০০০ সালে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে মনোনীত হয়। ১৫৪০ সালের ১৫ আগস্ট বেশ কিছুসংখ্যক স্প্যানিশ অভিযাত্রী এই নগরী প্রতিষ্ঠা করেন। পাহাড়ি উপত্যকায় অবস্থিত এই নগরীর আশপাশে অনেক মানব বসতি ছিল। স্যান লাজারো জেলায় বিশ্ব ঐতিহ্যের এই নগর কেন্দ্রটি অবস্থিত। ভয়াবহ ভূমিকম্পে আরিকিউপা নগরীর স্থাপত্যবিদ্যার বিকাশে বারবার বাধা সৃষ্টি করেছে। তাই এই নগরীর স্থাপতত্যবিদ্যার উন্নয়ন পাঁচটি ধাপে সম্পন্ন হয়েছে। ১৫৪০ থেকে ১৫৮২ সাল পর্যন্ত আরিকিউপা মূলত একটি গ্রাম হিসেবে যাত্রা শুরু করে। ১৫৮২ থেকে ১৭৪৮ সাল পর্যন্ত এখানে ইউরোপের বারোক শিল্পরীতির আলোকে দালানকোঠা নির্মিত হয়। ১৭৮৪ থেকে ১৮৬৮ সাল পর্যন্ত এখানে রুকুকু ও নিওক্ল্যাসিজিম শিল্পরীতির চর্চা চলে। ১৮৮৬ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত এখানে অভিজ্ঞতাবাদ ও নিওক্ল্যাসিকাল ফ্যাশনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলে। সমসাময়িক স্থাপত্যরীতির বিকাশও এ সময় সংঘটিত হয়। দক্ষিণ আন্দিজ এলাকায় এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক জোন। পেরু প্রজাতন্ত্র গঠিত হওয়ার পেছনে এই নগরীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পেরুর অনেক আন্দোলনের পথিকৃৎ এই নগরী। দেশটির অনেক বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক নেতা ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এই নগরীতে জন্মেছেন।

কাদা ও খড়কুটা মিশ্রিত রোদে পোড়ানো ইট আর পাথর দিয়ে এই নগরীতে প্রথম ভবন নির্মাণ শুরু হয়। স্যান লাজারো জেলার এ জাতীয় কিছু ভবনের অস্তিত্ব আজো দেখা যায়। সান্টা ক্যাটালিনার চার্চ এলাকায়ও তার প্রমাণ রয়েছে। ১৫৮২ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর থেকে দালানকোঠা তৈরিতে স্থানীয় আগ্নেয়শিলা ব্যবহৃত হয়। সাদা ও গোলাপি রঙের এ আগ্নেয় পাথর স্থানীয় ভাষায় ‘সিলার’ নামে পরিচিত। বর্তমানে বিশ্ব-ঐতিহ্যের আওতায় রয়েছে আরিকিউপা নগরীর স্প্যানিশ লেআউটের ৪৯টি আদিম ¤øক।

আনাসাজি

হাজার বছর আগে গড়ে উঠেছিল তাদের সভ্যতা। আনাসাজিরা বাস করত পাহাড়ের গায়ে গড়ে ওঠা বসতিগুলোতে।

১৩ শতকের শেষদিকে আনাসাজিদের পৃথিবী ধ্বংস হতে থাকে। এই সভ্যতার বিলুপ্তি হওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়, মারাত্মক খরার প্রকোপ। এই প্রচণ্ড খরা আক্রান্ত করে বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে। খরার পরে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ।

আনাসাজিরা পানি ও কাঠের মতো স্থানীয় প্রাকৃতিক সম্পদগুলোকে বেপরোয়াভাবে বিনষ্ট করে ফেলেছিল।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পর্বতমালার পাদদেশে রয়েছে আনাসাজির সভ্যতার নিদর্শন। এখনকার মরুভূমি এলাকায় যেসব উঁচু পাহাড় রয়েছে তার নিচেই রয়েছে উপত্যকা। সেখানে বাস করত সূর্য উপাসক আনাসাজি সম্প্রদায়। এসব অধিত্যকাকে বলা হতো মেসা ভার্দে। লোকালয়ের কাছাকাছি অঞ্চলে কোনো নদী প্রবাহিত হচ্ছে কিনা তা আনাসাজির বিবেচনা করত না। তারা বরং সূর্যের নৈকট্য লাভের প্রত্যাশী ছিল।

৭ম শতাব্দীর শুরুতে ঐসব রুক্ষ অঞ্চলে আনাসাজিরা গড়ে তোলে গোলাক ধাঁধাময় শহর। শত শত বছর ধরে আনাসাজিরা পাহাড়ের ওপার আকাশের ঠিকানায় নির্মিত এসব নগরীতে বাস করার জন্য চলে আসে। এক সময় বাসস্থানের সংকটের কারণে মেসা ভার্দের বহু অধিবাসী নগরী ছেড়ে পাহাড়ি গুহা কন্দরে বসবাস করতে শুরু করে। তাদের এসব পাহাড়ি এলাকার ভুবনকে বলা হয় সবচাইতে সুরক্ষিত পুরাতাত্তি¡ক নিদর্শনগুলোর অন্যতম।

মেক্সিকো ও গুয়েতেমালার মায়া সভ্যতার স্থাপত্য নিদর্শনগুলোর সাথে এগুলোর তুলনা করা যেতে পারে। মেসা ভার্দে নগরীর আয়তন এ সময় সম্প্রসারিত হয়ে দাঁড়ায় প্রায় ৫০ হাজার একর।

তেরো শতাব্দীর শেষদিকে নগরীটি পরিত্যক্ত হয়। তখন সেখানকার পানির উৎস শুকিয়ে গেছে। তাপমাত্রা গেছে প্রচণ্ডভাবে বেড়ে।

কলারোডোর ডুরাঙ্গো শহরের ৩০ মাইল পশ্চিমে মেসা ভার্দে জাতীয় উদগানের শুরু। মেসা ভার্দের ওপর দাঁড়িয়ে দেখা যায় মরু এলাকার সরু সরু উপত্যকা। লাল মাটির বিস্তীর্ণ এলাকায় রয়েছে ১৫ মাইলের এক গিরি সংকট। সেখানে রয়েছে আমেরিকার বেশ কয়েকটি প্রাগৈতিহাসিক বড় বড় শহরের ধ্বংসাবশেষ।

আনাসাজি সংস্কৃতির চরম উন্নতির এক নিদর্শন হচ্ছে চাকো সংস্কৃতি। সেখানে আছে পুয়েবলো বেনিটো। এটি প্রায় ৪ তলার সমান উঁচু। এতে রয়েছে ৬০০টি কক্ষ। ৪০টির মতো ভূগর্ভস্থ অনুষ্ঠান ঘর। সেখানে ছিল পিতলের ঘণ্টা, টিয়া পাখির পালক, প্রশান্ত মহাসাগরীয় শাঁখ, নীলকান্ত মণি।

এসবের অনেকগুলো জিনিস আনা হয়েছিল দূর-দূরান্ত থেকে। এ থেকে প্রমাণিত হয় আনাসাজি সভ্যতার অধিবাসীদের সাথে দূরতম অঞ্চলের বহুমুখী বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল।

১২ শতাব্দীতে চাকো ক্যানিয়নের সভ্যতা পরিত্যক্ত হয়। ষোড়শ শতাব্দীতে আশপাশের এলাকা থেকে নাভোহো ইন্ডিয়ানরা সেখানে গিয়ে বসবাস শুরু করে। চাকোর ধ্বংসাবশেষকে বলা হয় এক সুবিশাল সাংস্কৃতিক ভাণ্ডার।

সেখানকার গিরি সংকটের মাঝ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে চিনলি নদী। বনাঞ্চলে রয়েছে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী ও পাখি।

কাহোকিয়ারের দুর্গম অঞ্চলে ভ্রমণকারীদের একটি দল হঠাৎ করে সন্ধান পেলেন রহস্যময় কয়েকটি ঢিবির। প্রতিটি ঢিবির উচ্চতা এবং প্রস্থ ছিল একই মাপের। ঢিবির ভেতরে খুব শক্ত ও জমাট বাঁধা এক ধরনের পাথর পাওয়া গেছে। মাটির ভেতরে পুরো ঢিবিই এই পাথর দিয়ে তৈরি। ধারণা করা হচ্ছে, কোনো কিছু সুরক্ষার জন্য তার ওপরে এভাবে ঢিবির আকৃতিতে ঢালাই দেয়া হয়েছে। ঢিবির রহস্য এখনো উদ্ঘাটন করা যায়নি।

মেক্সিকোর ভেরাক্রুজ প্রদেশে টিলেকোটালপ্যান পুরাকীর্তি জোন অবস্থিত। ১৯৯৭ সালে এটি বিশ্ব ঐতিহ্য স্বীকৃতি পায়। মেক্সিকো উপসাগরের উপক‚লে অবস্থিত টিলেকোটালপ্যান মূলত একটি নদী বন্দর। ক্যারিবীয় অঞ্চলে এটি বিশেষ স্থাপত্যরীতির শহর হিসেবে বিবেচিত। প্যাপালোয়াপ্যান নদীযোগে এ শহরে প্রবেশ করা হয়।

টিলেকোটালপ্যানের উত্তর ও উত্তর-পূর্বে হিস্পানিক বসতি গড়ার আগ থেকে একটি উপগোষ্ঠী বাস করত। কিন্তু এদের উৎপত্তি সম্পর্কে সর্বশেষ সিদ্ধান্তে আজো উপনীত হওয়া সম্ভব হয়নি। কিন্তু প্যাপালোয়াপ্যান নদী (প্রজাপতি নদী) ও নাহুএটল নামক বসতি এটাই প্রমাণ করছে। এ এলাকা এক সময় অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের শাসনাধীনে ছিল।

স্প্যানিশ ভাষায় ‘টিলেকোটালপ্যান’ শব্দের অর্থ দুই নদীর মধ্যবর্তী ভূমি। ১৫৫৮ সালে স্প্যানিশ অভিযাত্রী জুয়ান দ্য গ্রিজালবা প্যাপলোয়াপ্যান নদীর উৎসমুখ আবিষ্কার করেন। ১৫২১ সালে স্প্যানিশ সেনাপতি করটিস এ এলাকায় স্বর্ণের সন্ধানে গনজেলো দ্য স্যান্ডাভেলকে প্রেরণ করেন।

১৫৫০ সালে স্পেনের রাজ্য প্যাপালোয়াপ্যান নদীর পূর্ব তীরকে দ্বীপটির মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে মাটিচাপা দিয়ে সংযোগ করার নির্দেশ দেন এবং এই নতুন ভূমিতে তিনি গবাদিপশু খামার গড়ে তোলেন। রাজার বিরোধিতা সত্ত্বেও বর্তমান টিলেকোটালপ্যান শহরের কাছেই একটি জেলে গ্রাম গড়ে ওঠে। রাজ্য তাদের শাস্তি দেননি। তবে ‘লা ভার্জিন দ্য লা ক্যান্ডেলারিষা’ নামের একটি খ্রিস্টান উপাসনালয় নির্মাণে বাধ্য করেন। এখানে স্প্যানিশ বসতি অত্যন্ত ধীরগতিতে গড়ে ওঠে। ১৫৪৪ সালে এখানে মাত্র ১২ জন স্প্যানিশ ছিলেন। ১৭৭৭ সালে এখানে স্প্যানিশদের সংখ্যা মাত্র ৩২০-এ উন্নীত হয়। অথচ ১৮০৮ সালে এখানে ১১৫৬ জন ইন্ডিয়ান ও ১৬১৬ জন পারডা (ইন্ডিয়ান ও কৃষ্ণাঙ্গদের মিলনে উদ্ভূত জাতি) বাস করত।

১৬৯৮, ১৭৮৮ ও ১৭৯০ সালে এ শহরটি আগুনে প্রায় ভস্মীভূত হয়ে যায়। ফলে স্থানীয় কর্র্তৃপক্ষ এ শহরের পরিকল্পনা নিয়ে তেমন কোনো মাথা ঘামাননি। তবে টাইলসযুক্ত ছাদ নির্মাণের আদেশ দেন। শুধু তাই নয়, নামেমাত্র মূল্যে এ শহরের প্লট বিক্রি করে। ফলে ১৮শ শতকে এখানে ফ্রেঞ্চ, জার্মান ও ইতালিয়ান অভিবাসীরা প্লট কিনে বসতি গড়ে তোলে। ১৮২১ সালের পর এ শহরের অর্থনৈতিক শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। ১৮৪৯ সালে একানে নিজাহুয়াকুয়েলি থিয়েটার মিউনিসিপ্যাল প্যালেস, নিউ মার্কেট, স্কুল ও হোটেল নির্মিত হয়। এখানকার স্থাপত্য শিল্পে স্প্যানিশ এবং ক্যারিবীয় ঐতিহ্যের স্বাক্ষর রয়েছে।

অ্যাজটেক সভ্যতার রাজধানী টিনোটিটলানকে স্প্যানিশ উপনিবেশবাদী ষোল শতকে ধ্বংস করে দেয়। এ ধ্বংসাবশেষের ওপরই গড়ে ওঠে বর্তমানের মেক্সিকো সিটি, মেক্সিকোর রাজধানী। বিশ্বের জনবহুল নগরীগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। প্রতœতত্ত্ববিদরা এখানে অ্যাজটেক সভ্যতার পাঁচটি বিখ্যাত মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের শনাক্ত করেছেন। এগুলোর মাঝে একটি বিখ্যাত মন্দিরের পাশাপাশি ঊনবিংশ ও বিংশ শতকে নির্মিত বিছু ভবন ও মেক্সিকো সিটির ২৮ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত জোচিমিলকোর ধ্বংসাবশেষকে সাংস্কৃতিক মূল্যের মানদণ্ডে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের সম্মান দিয়েছে। প্রতিক‚ল পরিবেশের কারণে অ্যাজটেক জনগণ কৃত্রিম খাল ও কৃত্রিম দ্বীপের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা ব্যুহ গড়ে তুলত। এ কারণে অ্যাজটেক সভ্যতার নগর ও গ্রামীণ অবকাঠামো ছিল ব্যতিক্রমধর্মী। এসব ব্যতিক্রমী অবকাঠামো সংরক্ষণের জন্য ইউনেস্কোর উদ্যেগ প্রশংসিতও হয়েছে। মেক্সিকো ব-দ্বীপে ২২৫০ মিটার উচ্চতায় বর্তমানের মেক্সিকো সিটি অবস্থিত। ২৫০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে অ্যাজটেক সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। স্পেনিশরা ১৫৩৭ সালে অ্যাজটেক রাজধানী টিনোকটিটলান দখল করার সময় এর জনসংখ্যা ছিল ৫ লাখ।

উপনিবেশবাদী অর্থনীতির নির্মম জাঁতাকলে পড়ে আইমারা জনগণ ও তাদের সংস্কৃতি স্বকীয়তা বজায় রাখতে পারেনি। এসব উপজাতি বিভিন্ন খনিতে কাজ করত। গৃহভৃত্য হিসেবেও এদের ব্যাপক চাহিদা ছিল। কোকো চাষেও এদের ব্যাপকভাবে কাজে লাগানো হতো। তবে খনির অভ্যন্তরে কঠোর কায়িক পরিশ্রমে এদের বাধ্য করা হতো। নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় ‘পোটেসি’ ও ‘ক্যারাবায়া’ খনিতে হাজার হাজার ‘আইমারা’ উপজাতি অকাতরে প্রাণ হারায়। ফলে ১৭৪০ সালে তারা স্প্যানিশ উপনিবেশবাদীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু করে এবং ১৮২১ সালে পেরুর স্বাধীনতা লাভের আগ পর্যন্ত তাদের বিদ্রোহ চলে। কিন্তু ততদিনে নির্যাতিত আইমারাদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষা মৃতপ্রায় হয়ে ওঠে। এদের কেউ কেউ চিলি ও আর্জেন্টিনায় চলে যান।

এটা ঠিক যে, ‘আইমারা’ জনগণ দক্ষিণ আমেরিকার প্রাচীন জনগোষ্ঠী। এদের ইতিহাস অনেক জটিল। তাই এদের সংস্কৃতি সম্পর্কে সভ্য জগত আজো পুরোপুরি ধারণা নিতে পারেনি। শুধু এতটুকু জানা যায়, ৪০০ সাল থেকে ১০০০ সাল পর্যন্ত আন্দিজ পর্বতমালার সুউচ্চ মালভূমিতে আইমারাদের বিশাল এক সাম্রাজ্য ছিল। এ সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল তিয়াহুয়ানকো এলাকায়। এদের এলাকায় ‘আলপাকা’ (মেঘ জাতীয় লোমবহুল প্রাণী) ও ‘লামা’র (দক্ষিণ আমেরিকান প্রাণী বিশেষ) অবাধ বিচরণ রয়েছে। এরা আজো প্রতীকের সাহায্যে অতীতের নানা ঘটনা ব্যাখ্যা করে। তবে এদের লেখ্য ভাষা নেই। অবশ্য লাতিন বর্ণে এদের ভাষা বর্তমানে চালু হয়েছে।

কালাকমুল

প্রাচীন অ্যাজটেক সভ্যতার গৌরব ও সমৃদ্ধির প্রতীক ছিল কালাকমুল। এক বলা হতো ‘তিন পাথরের শহর’। মেক্সিকোর দুর্ভেদ্য জঙ্গলের মাঝে এর ধ্বংসাবশেষের সন্ধান পাওয়া গেছে। কালাকমুল নগরীর প্রতীক ছিল ফণা উদ্যত সাপ। যে কারণে একে সাপের সাম্রাজ্য হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। প্রতœতত্ত্ববিদরা সে অঞ্চলের মাটি খুঁড়ে ছয় হাজারের অধিক স্থাপনার সন্ধান পেয়েছেন। যার সবগুলোই ছিল বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। সেগুলোর মধ্যে ছিল মন্দির, সমাধিসৌধ ও পিরামিড। সেখানে প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য ছিল। ধারণা করা হয়ে থাকে তৎকালীন অধিবাসীরা নিজেদের অস্তিত্বকে গোপনে রাখার জন্য বসতি স্থাপন করেছিল দুর্ভেদ্য জঙ্গলের ভেতরে। মাটির নিচের ধাতব সম্পদ আকৃষ্ট করেছিল অ্যাজটেকদের। তারা দলবদ্ধভাবে বাস করত। নিজেদের সমাজের গণ্ডির ভেতরেই চলাফেরা করত। গোপনীয়তা রক্ষা করা ছিল তাদের প্রধান লক্ষ।

বহু অ্যাজটেক জনপদ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল বিভিন্ন রোগের আক্রমণে।

অ্যাজটেকরা তাদের বাগানে নাশপাতি, আপেল ও পেঁপের চাষ করত। খরার সময়ে বুনো ফল খাওয়ার অভ্যেস রপ্ত করেছিল। পোষা কুকুরকে কেটে দেবতাদের উদ্দেশ্যে বলি দিত। মধু উৎপাদনের জন্য মৌমাছি পালন করত। ছিদ্র বিশিষ্ট বাঁশের টুকরোর একটা দিক বন্ধ করে মৌমাছির জন্য কৃত্রিম চাক তৈরি করত। বিশেষ পদ্ধতিতে সেই চাক থেকে মধু বের করত। পানীয় হিসেবে অ্যাজটেক পরিবারে মধুর চল ছিল। বল্লমের সাহায্যে জঙ্গলের শূকর শিকার করত।

অ্যাজটেক সাম্রাজ্যের গহিন জঙ্গলের মাঝে রয়েছে এক রহস্যময় নগরী। দুর্ভেদ্য জঙ্গলের মাঝে সেই নগরী হারিয়ে গেছে। সেই বিচিত্র শহরের পথঘাট, ঘরবাড়ি সবকিছু নাকি সোনার তৈরি। রূপকথার মতো শোনা যায় সেই নগরীর কাহিনী। এই শহরকে নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা কিংবদন্তি। স্প্যানিশ ভাষায় সেই স্বর্ণনগরীর নাম হচ্ছে ‘এল ডোরাডো’। দীর্ঘদিন থেকে সেই সোনায় মোড়া শহরের খোঁজে অভিযান চলছে। দুঃসাহসী অভিযাত্রীরা পেরুর দুর্ভেদ্য গহিন অরণ্যে অভিযান করেছে। তবে আজ পর্যন্ত কেউই অবশ্য খুঁজে পায়নি সেই সোনার শহরকে। হারিয়ে যাওয়া এই শহরটি বহুকাল ধরে অভিযাত্রীদের হাতছানি দিয়ে আসছে। মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে সেই রহস্যময় শহরের সন্ধানে গিয়েছে পর্যটকরা। কিংবদন্তিতে বর্ণিত দুর্গম পথের অনুসন্ধান করেছে নকশা দেখে।

কিংবদন্তি বলে, অনেক কাল আগে পাহাড় জঙ্গলে ঘেরা জায়গাটিতে ইনকারা তাদের সভ্যতা গড়ে তুলেছিল। ইনকারা ছিল প্রভূত ধনসম্পদের মালিক। তাদের নেতা ছিলেন আতাহুয়ালপা। কীভাবে যেন উনকাদের সেই বিশাল স্বর্ণসম্পত্তির খবর পেীঁছে গেল স্পেনীয়দের কাছে। তারা তখন মূল্যবান সোনার লোভে হানা দিল ইনকা সাম্রাজ্যে। আতাহুয়ালপা বুঝতে পারলেন স্পেনের বিপুল সেনাবহিনীর সামনে তারা নিতান্তই অসহায়। তার নির্দেশে সমস্ত ‘পাইতিতি’ অর্থাৎ স্বর্ণভাণ্ডার রাতারাতি লুকিয়ে ফেলল ইনকারা। স্পেনীয়রা ব্যাপক অনুসন্ধান করেও আর সেই স্বর্ণভাণ্ডারের কোনো হদিস পেল না। স্পেনীয়দের কাছ থেকে সেই সোনার শহরের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। নানা রহস্যময় বর্ণনার মিশেলে কাহিনীটি ক্রমশ পল্লবিত হয়ে উঠল। সৃষ্টি হলো ঔৎসুক্য। কৌত‚হল দক্ষিণ আমেরকিার এক উপজাতীয় রাজার কাহিনী থেকে আরেকটি কিংবদন্তি সৃষ্টি হয়। শোনা যায়, গোত্রপ্রধান নিজের সমস্ত শরীর স্বর্ণরেণুতে মুড়ে পাহাড়ি হ্রদে ঝাঁপ দিয়েছিলেন। সে ছিল সোনার এক ঝলমলে দেশ। রাজা একদিন স্বপ্ন দেখলেন যে তিনি একটি সোনার হ্রদ তৈরি করেছেন। আর সেই হ্রদের পানিতে স্নান করার সাথে সাথে স্বর্ণের প্রভুতে রূপান্তরিত হয়েছেন। রাজা এই স্বপ্নকে নিয়ে গভীর চিন্তাভাবনা করলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন যে, তিনি গোপনে একটি সোনার হ্রদ তৈরি করবেন। তার সেই আকাক্সক্ষাকে বাস্তবায়িত করার জন্য তিনি তখন গোপনে এক হ্রদ খুঁড়লেন। সেখানে প্রচুর পরিমাণে স্বর্ণ চূর্ণ ঢেলে দিলেন। সেই হ্রদে স্নান করলেন। তার সমস্ত শরীর সোনার পাতে মুড়ে দিলেন। রাজা সেই দেশটির নামকরণ করলেন এল ডোরাডো। জায়গাটি ছিল দক্ষিণ আমেরিকার পার্পত্য দেশ কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোটার নিকটবর্তী গুয়াটাভিটা হ্রদ থেকে কিছুটা দূরে। কিংবদন্তি শুরু হয় আন্দিজ নগরী থেকে ১৫৩০ সালে। যা আজকের দিনের কলম্বিয়া। তৎকালীন শাসক কুয়েসাদা মুইসকা নামের এক উপজাতির অস্তিত্ব আবিষ্কার করেন। যারা বসবাস করত পাহাড়ি উচ্চভূমি বোগোতায়। সেখানে সেনাপতি সেবাস্তিয়ানের নির্দেশে রহস্যময় সোনার শহরের সন্ধানে খনন কাজ চালানো হয়েছিল। তখন থেকেই এল ডোরাডোর কথা চারদিকে ছড়িয়ে যায়। কিংবদন্তিতে বলে, এল ডোরাডো হচ্ছে সোনার রাজার রাজ্য।

বিশাল আন্দিজের পর্বতাঞ্চল তখন শাসন করত ইনকা, অ্যাজটেক ও চিবকা সভ্যতা। চিবকা স¤প্রদায়ের লোকেরা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭,৫০০ ফুট উপরের উচ্চ ভূমিতে বাস করত। বোগোতার মাঝ দিয়ে প্রবাহিত নদী ও হ্রদগুলোর চারপাশে ছিল সুউচ্চ পাহাড়ের সারি। গুয়াটাভিটা হ্রদের উপক‚লে ছিল চিবকাদের রাজধানী। গুজব ছিল, হ্রদের পানিতে ডুবে মারা গিয়েছিল তাদের পূর্বতন কোনো রাজার স্ত্রী। তাকে স্থানীয়রা ‘হ্রদের দেবী’ হিসেবে ভাবত। চিবকাদের উপাখ্যানে বর্ণিত হয়েছে, তাদের কোনো এক রাজা শরীরে প্রচুর পরিমাণে সোনার অলঙ্কার পরিধান করে একাকী নৌকায় চেপে গভীর হ্রদে গিয়েছিলেন। হ্রদের মাঝে গিয়ে রাজা তার শরীর থেকে সমস্ত স্বর্ণালঙ্কার খুলে পানিতে ফেলে দিয়েছিলেন। আদিবাসী ইন্ডিয়ানদের কাছে অবশ্য স্বর্ণধাতুর কোনোরূপ মূল্য ছিল না। তারা আনায়াসে, নিতান্ত অবহেলায় ব্যবহার করত সেসব সোনার অলঙ্কার। সোনার তৈরি বর্শা ব্যবহার করত। সোনার পাতকে টুকরো করে তারা তাদের বাড়ির সামনে ঝুলিয়ে রাখত। সূর্যের সোনালি আলোতে তা ঝিকমিক করত। সোনাকে তারা অতি সাধারাণ দ্রব্য বলে মনে করত।

রহস্যময় সোনার শহরের প্রতি অভিযাত্রী দল আর ভ্রমণকারীদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি হয়। ১৫১০ সালে দুঃসাহসী অভিযাত্রী বালাবোরা প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ি দিয়ে চিবকা সভ্যতার কাছে চলে আসেন। বালাবোরা সে সময় পরিচিত হন এক আদিবাসী ইন্ডিয়ানের সাথে। তাকে তখন এক বিচিত্র তথ্য জানানো হয়। আদিবাসী বালাবোরাকে বলে যে সে তাকে এমন একটি অদ্ভুত দেশের সন্ধান জানাতে পারে যেখানে সোনা হচ্ছে খুবই সহজলভ্য।

সেখানকার আধবাসীরা সাধারণত খাওয়া দাওয়া করে থাকে সোনার থালা বাসনে। পানি পান করে সোনার পাত্রে। সেখানে সোনার মূল্য পিতলের চাইতেও অনেক কম।

সেবাস্তিতয়ান নিকারাগুয়া জয় করেন। তাকে ইকুয়েডরের প্রশাসক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। তার ঝোঁক ছিল এল ডোরাডোর সেই গুপ্তধনের প্রতি। এক বৃদ্ধ ইন্ডিয়ানের কাছ থেকে সেবাস্তিয়ান আকস্মিকভাবে সন্ধান পেয়ে যান সোনার শহরের। সেই বৃদ্ধটি ছিল সর্বশেষ ব্যক্তি যে গুয়াটাভিটার হ্রদের কাছে চিবকাদের উৎসবটিকে দেখেছিলেন। সেখানকার আদিবাসীরা কিংবদন্তির লোকগাথার ওপর ভিত্তি করে লোক উৎসব পালন করত। আদিবাসী বৃদ্ধ সেবাস্তিয়ানকে অবহিত করেছিল যে তাদের অবস্থান থেকে বোগোতা বার দিনের দূরত্বে উত্তর দিকে অবস্থিত। এই পথ নির্দেশ অনুযায়ী ১৫৭০ সালে দুর্গম পথ ধরে সেখানে অভিযান করেন সেবাস্তিয়ান। কিন্তু তার সেই কষ্টকর অভিযান অবশ্য সাফল্যের মুুখ দেখেনি।

১৫৪১ সালে দুঃসাহসী সেনাপতি গঞ্জালেস পিঁজারো স্বর্ণনগরীর খোঁজে অভিযান করেন। বিশাল এক অভিযাত্রী দলকে সাথে নিয়ে তিনি গিয়েছিলেন। তার দলে কয়েকজন লামা অভিযাত্রী অন্তর্ভুক্ত ছিল। দুর্গম আন্দিজ পাহাড় অতিক্রম করার ক্ষেত্রে তারা খুবই দক্ষ ছিল। সেটি ছিল এক বিপদসঙ্কুল পথে যাত্রা। সেই পথটি ছিল অভিযাত্রীদের রক্তে ভেজা। যেখানে পদে পদে রয়েছে অনিশ্চয়তা। এই অভিযানেও পিঁজারো স্বর্ণনগরীর সন্ধান পেতে আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। জার্মানির অধিবাসী নিকোলাস ভেনেজুয়েলা থেকে একটি অভিযান শুরু করেন। ওয়েলসার নামক একটি প্রতিষ্ঠান তাকে এক্ষেত্রে সহযোগিতা করে। একটি মরণব্যাধির নব উদ্ভাবিত ভেষজ ওষুধ সংগ্রহ করার জন্য তাকে সেখানে প্রেরণ করা হয়েছিল। এই অভিযানে গিয়ে নিকোলাসের যথেষ্ট করুণ অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়। তিনি সেখানে বহু স্বর্ণলোভী ইউরোপীয়দের দেখা পান। যারা ভয়ানক দুর্দশার মাঝে পতিত হয়েছিল। বহু অনুসন্ধানে আর রহস্যময় এল ডোরাডোর কোনো সন্ধান পাওয়া গেল না। অনেক অভিযাত্রী দল সে সমস্ত অঞ্চল তন্ন তন্ন করে চষে বেরিয়েছিল। ধারণা করা হলো যে চিবকারা সম্ভবত পরবর্তীকালে তাদের স্বর্ণসম্পদকে নিম্নভূমিতে নিয়ে গিয়েছিল।

১৫৯৫ সালে ত্রিনিদাদ শাসক ডোমিঙ্গো স্পেনের সম্রাটকে এল ডোরাডোর বিষয়ে অভিহিত করেন। স্যার ওয়াল্টার র‌্যলে অভিযানের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। রাজা প্রথম জেমসের আনুক‚ল্যে অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করেন দক্ষিণ আমেরিকার মানোয়া এবং ওমাগুয়াতে তিনি অভিযান পরিচালনা করেন। লোকগাথায় উল্লিখিত আরো দুটি সোনার শহরের কথা জানা যায়। প্যারাগুয়ের পাইতিতি এবং চিলির সিসারে। ফ্রান্সিসকো পিঁজারো (১৪৭৮-১৫৪১) হুয়াসকারানে কতকগুলো পাথরচাপা গুহামুখ আবিষ্কার করেছিলেন। স্পেনীয়দের সন্দেহ হয়েছিল তাদের ভেতর বুঝি ইনকারা রতœভাণ্ডার রেখেছিল।

১৬১৭ সালে স্যার ওয়াল্টার র‌্যালে এক দুঃসাহসিক অভিযানে বের হয়েছিলেন। কিন্তু তার সেই অভিযান অবশেষে চূড়ান্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো। ১৬১৮ সালে তিনি শূন্য জাহাজ নিয়ে ইংল্যান্ডে প্রত্যাবর্তন করেন। র‌্যালের এ ধরনের ব্যর্থতায় সম্রাট প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হন। শাস্তি হিসেবে তার শিরñেদের ঘোষণা দেয়া হয়।

সোনার শহর এল ডোরাডোকে নিয়ে বহু আকর্ষণীয় উপাখ্যান রচিত হতে থাকে। সতের শতকের কোনো কোনো মানচিত্রে এর অবস্থান দেখানো হতো।

কালের বিবর্তনে অবশ্য এর অবস্থান পরিবর্তিত হয়েছে। এক সময় এল ডোরাডোর অবস্থানকে দেখানো হতো কলম্বিয়ার পূর্বদিকে। সেখান থেকে এর অবস্থান ব্রাজিলে আমাজান নদীর উপক‚ল থেকে গায়ানার গভীর জঙ্গলে আসে।

কিছু ইউরোপীয় অভিযাত্রী এল ডোরাডোর খোঁজে লবণ হ্রদে ভাসমান জাদুর দ্বীপে অভিযান করেছিল। ঐ লবণ হ্রদে রয়েছে সোনার তৈরি বহু রকমের সামগ্রী। আশ্চর্য দ্বীপ হিসেবে তার পরিচিতি রয়েছে। এই দ্বীপের আনুমানিক অবস্থান হচ্ছে দক্ষিণ সুরিনাম, দক্ষিণ-পূর্ব ভেনেজুয়েলা এবং ব্রাজিলের ম্যাটো গ্রোসো। সেখানে অভিযান করেছিলেন কর্নেল পার্সি ফাওসেট। স্বাভাবিকভাবেই স্বর্ণনগরীর সন্ধানে অভিযাত্রীরা প্রচণ্ড বিভ্রান্তিতে পড়ে যায়।

১৬০১ সালে স্প্যানিশ ভূগোলবিদ হেরোরা তার তিক্ত অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে মন্তব্য করেছিলেন, ‘এল ডোরাডো নামের কোনো শহরের অস্তিত্ব খোঁজা হচ্ছে পাগলামি ছাড়া আর কিছুই না।’

১৬৩৭ সালে ফ্রান্সিসকো আন্দিজ পর্বতমালার পূর্বদিকে এক সোনার সূর্য মন্দিরের খোঁজে অভিযান করেন। ঐ বছর পর্তুগিজ অভিযাত্রীরা ব্রাজিল থেকে তাদের অভিযাত্রা শুরু করে। ১৭১৪ সালে ওলন্দাজ অভিযাত্রীরা পারিমা হ্রদের কাছে অভিযান চালায়।

১৭৯৯ সালে পেরুর বিখ্যাত ভূগোলবিদ, প্রকৃতিবিজ্ঞানী হ্যামবোল্ট এক দুঃসাহসিক অভিযান করেন। তীব্র খরস্রোতা ওরিনিকো নদী পাড়ি দেন। দুর্গম অঞ্চলে তাঁবু খাটিয়ে থাকেন। ১৮০১ সালে ৪৫ দিন দুর্গম পথ অতিক্রম করে পৌঁছতে সক্ষম হন রিও ম্যাগদালেনাতে। এই স্থানের খোঁজে বহু অভিযাত্রী দীর্ঘকাল ধরে হন্যে হয়ে ঘুরছিল।

১৫৩০ সালে অভিযাত্রী কুয়েসাদা গুয়াটাভিটা হ্রদের পানি সেচে চার হাজার সোনার টুকরো পেয়েছিলেন। ধারণা করা হলো, প্রতি বছর উৎসবের সময় আদিবাসী ইন্ডিয়ানরা হ্রদে প্রথানুযায়ী সোনার তাল নিক্ষেপ করত। এই সোনার টুকরোর লোভে বহু অঞ্চল থেকে লোকেরা এসেছে। অভিযাত্রী দলটি প্রচুর পরিশ্রম করে হ্রদের তলদেশে জোয়ারের সময়ে অনুসন্ধান চালিয়েছে। অনেকেই এভাবে সোনার টুকরো সংগ্রহ করেছে।

ব্রিটিশ অভিযাত্রী পার্সি ফাওসেট ১৯২৫ সালে সেখানে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে একটি অভিযান করেন। তিনি ব্রাজিলের ম্যাটো গ্রাসোর গহিন অরণ্যে রহস্যজনকভাবে হারিয়ে যান। এল ডোরাডো যেন চির রহস্যের আবরণেই ঢাকা রইল।

গবেষকরা এক পর্যায়ে এমন ধারণা করলেন যে, চিরকালের জীবনযাত্রা সম্পর্কে হয়তো বা ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। তাদের কাছে স্বর্ণধাতু ছিল একেবারেই মূল্যহীন। সোনার পরিবর্তে তারা শস্যদানাকে অধিকতর মূল্যবান বলে মনে করত। কলম্বিয়ার উঁচু ভূমিতে তাপমাত্রা কখনো ৫০ ডিগ্রির নিচে নামত না। যার দরুন সেখানে শস্য ফলানো ছিল অত্যন্ত কষ্টকর। চিবকাদের কাছে তাই সোনার চাইতে আলুর মূল্য অনেক বেশি ছিল।

দুঃসাহসী অভিযাত্রীরা এতগুলো ব্যর্থ অভিযানের পরেও কিন্তু হতাশ হয়নি। তারা বিভিন্ন সময়ে নব উদ্যমে স্বর্ণনগরীর খোঁজ করেছে। অভিযান করেছে কলম্বিয়া, ব্রাজিল ও গায়ানার গহিন অরণ্যে। এখনো অভিযান সংঘটিত হয়। অভিযাত্রী দলের মনে অসীম আশা। কোনো একদিন হয়তো হারিয়ে যাওয়া স্বর্ণনগরী এল ডোরাডোর সন্ধান পাওয়া যাবে। এই রহস্যময় নগরীকে খুুুঁজে পাওয়ার জন্য অনেক অভিযানকারীকে করুণভাবে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে। তারা অতিক্রম করেছে অত্যন্ত বিপজ্জনক পথ। এই পথ তাদের অনেকের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। বলা হতো, ঐ পথটি হচ্ছে রক্তে ভেজা।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj