পাখির জন্য ভালোবাসা : রহীম শাহ

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

পাখি কে না ভালোবাসে? একটি শিশু- যখন সে দেখতে শেখে, দেখে দেখে উৎফুল্ল হতে শেখে, তখন তার কাছে খুব প্রিয় হয়ে ওঠে পাখি। ঘরের চৌকাঠ পেরুলেই সে দেখতে পায় পাখি। এসব পাখির মধ্যে আছে গৃহপালিত হাঁস-মুরগি, গৃহের আশপাশে থাকা কাক, চড়–ই, শালিক, দোয়েল। শিশুরা মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে পাখিদের দিকে। পাখিদের নানা রং দেখে আশ্চর্য হয়। পাখিদের গান শুনে মুগ্ধ হয়। পাখিদের ওড়াউড়ি দেখে তাদের চাঞ্চল্য বাড়ে। এসব দেখে দেখে সে নিজেকে তৈরি করতে শেখে। পৃথিবীর সুন্দর সম্পর্কে সে অবহিত হয়।

কী যে কাণ্ড পাখির? মনে হয় সারাক্ষণ থাকে সে ব্যস্ত। যখন তখন উড়তে থাকে, যখন তখন নাচতে থাকে। গাইতে থাকে। আবার সময় নেই, অসময় নেই চেঁচামেচি করতে থাকে, কিচিরমিচির করতে থাকে। কোনো কোনো পাখি থাকে জলে বা জলের কাছাকাছি। যারা জলে থাকে, তারা সারাক্ষণ সাঁতরে বেড়ায়। জলডুব খেলে। কখনও কখনও তারা জল ছেড়ে উঠে আসে ডাঙায়। পালক প্রসাধন করে। যারা জলের কাছাকাছির পাখি তারাও থাকে তাদের মতো ব্যস্ত। একমাত্র ব্যস্ততা কম বকের। সুবিধামতো জায়গায় এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে ঠাঁয়। যেন সে ধ্যানে আছে। অবশ্য সবাই জানে, তার এই নট নড়ন-চড়নের মাহাত্ম্য। সে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকে মূলত শিকারের আশায়।

সবচেয়ে সুন্দর ও প্রিয় প্রাণীটির নামও পাখি। ওরা সব সময় থাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে। শরীরে ধুলোময়লা পড়তে দেয় না। সারাক্ষণ ঠোঁট চালিয়ে পালক পরিষ্কার করে। পৃথিবীর আর কোনো প্রাণী পাখিদের মতো শরীরের যতœ নেয় না। অন্য যে কোনো প্রাণীর চাইতে পাখিদের রোগবালাই কম। অবশ্য গৃহপালিত পাখিদের কথা আলাদা।

কোনো কোনো পাখি থাকে জলে। কোনো কোনো পাখি থাকে জলের কাছাকাছি। কোনো কোনো পাখি মাঠে চরে বেড়ায়। কোনো কোনো পাখি থাকে গাছের ডালে ডালে। আবার কোনো কোনো পাখি আছে, যারা জীবনের অধিকাংশ সময় কাটায় আকাশে উড়ে উড়ে।

একটি পাখি সবরকম খাবার খায় না। একেকটি পাখির খাবার একেক রকম। কোনো পাখি আছে, যারা গাছের ফলপাতা খায়। কিছু পাখি আছে মাংসাশী। কোনো কোনো পাখি শুধু পোকামাড়ক ও কীটপতঙ্গেই তুষ্ট থাকে। জলের পাখিরা খায় গুগলি, শামুক, মাছ, ব্যাঙ ইত্যাদি। আবার কিছু পাখি আছে, যারা শুধু মধু খেয়ে জীবনধারণ করে। তবে এ কথা মানতে হবে, একেকটি পাখির প্রধান খাবার একেক রকম হলেও কীটপতঙ্গ ও পোকামাকড় কমবেশি সব পাখিই খায়।

জলে বা জলের কাছাকাছি যেসব পাখি থাকে তাদের সবাইকে জলের পাখি বলা যেতে পারে। জলের পাখিদের মধ্যে আছে- নানা রকম হাঁস, পানকৌড়ি, সাপপাখি, ডাহুক, জলপিপি, জলময়ূর, নানান রকম বক, কালিম, কাদাখোঁচা, গুলিন্দা, বিলের বালুবাটান, পানলৌয়া, ছোট বালুবাটান, গুলিন্দাবাটান, সোনাবাটান, জিরিয়া, বাবুইবাটান নানা জাতের গাঙচিল ইত্যাদি। মাছরাঙা আর শিকারি চিল-ইগলরা জলের মাছ শিকার করলেও ওরা জলের পাখি নয়।

শিকারি পাখির কাজই শিকার করা। ঈগল, বাজ, চিল, কাকরা মাংসাশী পাখি। ময়লা-আবর্জনা, মরা প্রাণী তো খায়ই, যদি এসব খাবারের অভাব হয় তাহলে তারা শিকারে বের হয়। শিকারি পাখির তালিকা অনেক দীর্ঘ। তবে সাধারণভাবে চেনার জন্য কয়েকটি নাম বলা যেতে পারে। যেমন- নানান জাতের মাছরাঙা, আবাবিল, বাতাসি, বেনেবউসহ পোকাখোকো প্রতিটি পাখি।

মাঠের মধ্যে অধিকাংশ সময় থাকে, মাঠেই খাবার খায়, মাঠেই ডিম পাড়ে, বাসা বাঁধে- এসব পাখিকে আমরা বলি মাঠের পাখি। এসব মাঠের পাখির মধ্যে আছে- হট্টিটি, ভরত, ধানটুনি, বাঁশপাতি, মাঠচড়াই, বটের, তিতির, ভাটরি, বনমুরগি, ময়ূর ইত্যাদি।

বাংলাদেশে গায়ক পাখিও আছে প্রচুর। আমরা পাখির যে ডাক সাধারণত শুনি সেসব ডাককে যারা সুরেলা করে তুলতে পারে তাদের বলা যায় গায়ক পাখি। মানুষ পাখিদের ভালোবাসে শুধু রংয়ের জন্য নয়, গানের জন্যও। গানের পাখিদের মধ্যে আছে- দোয়েল, টুনটুনি, ফটিকজল, ঘুঘু, মৌটুসি, শ্যামা, দামা, বর্ণালী, বুলবুলি, বেনেবউ, সোনাবউ, দুধরাজ, লেজনাচুনে, ফুটফুটি, নীল ফুটফুটি, বাঁশপাতি, খঞ্জনা ইত্যাদি।

কোকিলের ডাক শুনে আমরা বসন্তের আগমনী বার্তা শুনি। কিন্তু কোকিলকে গানের পাখি বলা যায় না। কারণ, কোকিল তার স্বর পরিবর্তন করতে পারে না। এ পর্যায়ে কাককে গানের পাখির পর্যায়ে ফেলা যায়। পক্ষীবিজ্ঞানীরা কাকের এ পর্যন্ত ১১ রকম গলার স্বর আবিষ্কার করেছেন।

উড়তে পারা পৃথিবীর সবচেয়ে বড়পাখির নাম অ্যালবাট্রস। ডানা মেলা অবস্থায়, অ্যালবাট্রসের এক ডানার প্রান্ত থেকে অন্য ডানার প্রান্ত পর্যন্ত মেপে দেখা গেছে এগার ফুট। এরা সামুদ্রিক পাখি। হুটহাট আকাশে উড়তে পারে না ওরা। শূন্যে উড়াল দেওয়ার আগে তারা মাটিতে কিছুটা দৌড়ে নেয়। আর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পাখিটির নাম সাদাপিঠ শকুন। তারা লম্বায় হয় ৯০ সেমি বা ৩৬ ইঞ্চি। উড়তে না পারা সবচেয়ে বড় পাখিটির নাম উটপাখি। উটপাখি উচ্চতায় হয় ১৪০ সেমি আর ওজনে হয় প্রায় ১৫০ কেজি। আর মাটিতে সবচেয়ে দ্রুতগতির পাখি হচ্ছে উটপাখি। তারা ঘণ্টায় ৭০ কিলোমিটার বেগে দৌড়াতে পারে।

এই তো গেল বড় পাখির কথা। তাহলে সবচেয়ে ছোট পাখি কোনটি! পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট পাখির নাম হামিংবার্ড। দক্ষিণ আমেরিকার এই পাখিটির প্রায় ১০০টি প্রজাতি আছে। তার মধ্যে সবচেয়ে ছোটটির নাম মৌমাছি-হামিংবার্ড। লেজের প্রান্ত থেকে ঠোঁটের প্রান্ত পর্যন্ত লম্বায় ৫.৫ সেমি। ওজন ২ গ্রাম।

বাংলাদেশে সবচেয়ে ছোট পাখি কোনটি? আমাদের দেশে ছোট পাখিটির নাম লালবুক ফুলঝুরি। লালবুক ফুলঝুরি লম্বায় হয় ৭ সেমি। ওজন ৪ গ্রাম।

কাক এবং শিকারি বাজেরা পোষা হাঁস-মুরগির ছানা নিয়ে যায়। এ ছাড়া পাখি দ্বারা মানুষের কোনো ক্ষতিই নেই। বরং পাখিরা যুগ যুগ ধরে মানুষের উপকার করে আসছে। পাখিরা যদি সাহায্য না করত, তাহলে এই পৃথিবীতে মানুষের বসবাস করাটাই দায় হয়ে পড়ত। খেত-খামারে, বনেজঙ্গলে, ফলফুলের বাগানে অসংখ্য ছোট-বড় নানান জাতের পোকামাকড় আছে। তারা গাছপালা খেয়ে নষ্ট করে ফেলে। অবশ্য পোকামাকড়রা যে শুধু ক্ষতি করে তা নয়, উপকারও করে। কিন্তু তারা সংখ্যায় তাড়াতাড়ি বাড়ে। এভাবে বাড়তে দেওয়া উচিত নয়। এভাবে বাড়তে থাকলে ওরা গাছপালা খেয়ে উজাড় করে দেবে। হারিয়ে যাবে সমস্ত সবুজ। মরুভূমি হয়ে যাবে পুরো পৃথিবী। এসব পোকামাড়ক ও কীটপতঙ্গকে নিয়ন্ত্রণে রাখে পাখিরা। কীটপতঙ্গ শিকার করতে আবাবিল ও বাতাসি পাখির জুড়ি নেই। শূন্যে উড়ে উড়ে বিচিত্র রকম ভঙ্গি করে ওরা উড়ন্ত পোকামাকড় ও কীটপতঙ্গ ধরে ধরে খায়। ওরা অল্প সময়ের মধ্যে অনেক পোকা ধরে খেয়ে ফেলতে পারে। একটি ছোট পাখি ঘণ্টায় প্রায় বারো শত পোকা ধরে খেতে পারে।

কাঠঠোকরারাও পোকাখেকো পাখি। ওরা গাছের ডাল এবং গুঁড়ি থেকে পোকা খুটে খুটে খায়। আবার ঘরের আশপাশে থাকে যেসব বিষধর পোকামাকড় ও কীটপতঙ্গ, তাদের ধরে ধরে খায় চড়–ই এবং দোয়েলরা।

কৃষক যখন জমিতে লাঙল দেয় তখন গোবক, ছোট সাদা বক, গোশালিক, ফিঙে ইত্যাদি পাখি নানাবিধ পোকামাকড় খেয়ে হালের গরুকে পোকার জ্বালাতন থেকে রক্ষা করে। গরু এবং ছাগল মাঠে ঘাস খাওয়ার সময় জোঁকসহ নানাবিধ পোকা আক্রমণ করে। ফিঙে এবং শালিকের দল সে আক্রমণ থেকে রক্ষা করে গরু-ছাগলকে। গরু ও ছাগলের লোমের ভেতর এক ধরনের পোকা বাসা বাঁধে। পাখিরা সেসব পোকাও খুটে খুটে খায়।

চিল, ঈগল, বাজ এবং অন্যান্য শিকারি পাখিকে মানুষ পছন্দ করে না পোষা হাঁস-মুরগির ছানা খেয়ে ফেলে বলে। কিন্তু এ কথাও সত্য, তারা মেঠো ইঁদুর, নেংটি ইঁদুর ইত্যাদি শিকার করে ফসলের ক্ষেতের দারুণ উপকারও করে। পাখির ডিম-বাচ্চা খেয়ে ফেলে এমন সাপ ও অন্যান্য প্রাণীকেও ওরা শিকার করে। ফণাতোলা বিষধর সাপটি যদি নজরে পড়ে ঈগলের, তাহলে রক্ষা নেই সেই সাপের। মশা-মাছি, কীটপতঙ্গ বিষাক্ত জীবাণু ছড়িয়ে দেয় মানুষের মধ্যে। এসব মশা-মাছি ও কীটপতঙ্গের হাত থেকে বিপন্ন মানুষকে রক্ষা করে পাখিরা।

ভুবনচিল, শঙ্খচিল আর কাকেরা শহর পরিচ্ছন্ন রাখে ময়লা খেয়ে। মরা জন্তু ও অন্যান্য ময়লা খেয়ে গ্রামাঞ্চলের পথঘাট আর মাঠ পরিষ্কার রাখে শকুনরা। দেশে দুর্ভিক্ষ হলে, বন্যা হলে শকুন ঝাঁকে ঝাঁকে নেমে আসে নিচে। চারপাশে ছড়ানো মরা জন্তুদের খেয়ে ফেলে অল্প সময়ের মধ্যে। শকুনরা এত তাড়াতাড়ি খাবার গিলতে পারে যে দেখলে চমকে উঠতে হয়।

নানা রংয়ের ফল ও ফুলে ভরা গাছপালায় পাখিরা ভিড় করে সবসময়। কারণ কী? কারণ হচ্ছে খাদ্য সংগ্রহ। ওদের এই খাদ্য সংগ্রহ গাছের এবং মানুষের জন্য বিস্ময়করভাবে উপকারী। পাখিরা পাকা ফল খাওয়ার সময় বীজটিও খেয়ে ফেলে। পরে সেই বীজ তার পায়ুপথ দিয়ে পায়খানা হয়ে বেরিয়ে যায়। এতে দেখা যায়, একটি গাছের বীজ নানা স্থানে গিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। এই বীজগুলো যদি পাখিরা না খেত, তাহলে কী হতো? সমস্ত বীজ বড় গাছের নিচে পড়ত। হাজার হাজার গাছ জন্মাত। এসব গাছ না পেত আলো, না পেত বাতাস, না পেত জল এবং না পেত বেড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজন মতো জায়গা। ফলে শুকিয়ে মরে যেত। বীজ ভালোভাবে ছড়িয়ে দিতে এবং গাছকে ভালোভাবে বড় করে তুলতে পাখিরাই সবচেয়ে যোগ্য। শুধু তাই নয়, অনেক ছোট ছোট বীজ পাখিদের কাদামাখা পায়ে অথবা পালকে আটকে যায়। এভাবে দূর দেশে পাখির সঙ্গে চলে যায় গাছের বীজ। আমাদের দেশে এমন অনেক বিদেশি গাছ আছে, যা অতিথি পাখিরা নিয়ে এসেছিল বীজ অবস্থায়। আমাদের দেশের অনেক গাছের বীজ ওরা নিয়ে গেছে বিদেশে। এভাবে একটি গাছের বীজ শুধু কয়েক মাইলের মধ্যে নয়, কয়েক হাজার মাইল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।

ফুলের পরাগ সংমিশ্রণেও পাখিরা সবচেয়ে সক্রিয়। নানান রকম মৌটুসি, দুর্গা-টুনটুনি, ফুলঝুরি ইত্যাদি পাখি ফুলের ভেতর থেকে মধু বের করে খায়। মধু খাবার সময় ফুলের কিছু রেণু ওদের মাথায় কিংবা পালকে কিংবা ঠোঁটের চারপাশে আটকে যায়। শরীরে রেণুমাখা পাখিটি যখন অন্য ফুলে গিয়ে বসে, তখন তার বয়ে আনা রেণু অন্য ফুলের রেণুর সঙ্গে মিশে ফল ফলাবার কাজে লাগে।

পাখিরা আত্মরক্ষা করে দুভাবে। বর্ণবৈচিত্র্য দিয়ে আর বুদ্ধি দিয়ে। আবার আত্মরক্ষা দুই রকমের। শিকারি শত্রুর হাত থেকে আত্মরক্ষা এবং প্রকৃতির হাত থেকে আত্মরক্ষা।

কাদাখোঁচা পাখিরা সাধারণত বসবাস করে আগাছা, ঘাস আর ঝরাপাতার সমারোহে। এদের পালকে আছে নানা রকম ফুটকি, আঁকাবাঁকা দাগ ও ছিটছোপ। এরা যে জায়গায় থাকে সে জায়গার রং ও কাদাখোঁচার গায়ের রংয়ের যথেষ্ট মিল আছে। তিতির আর বটেররা (কোয়েল) সব সময় মানুষের শিকারে পরিণত হয়। ওদের পালকের রং তামাটে আর গায়ের ওপর আছে কালো ছিট। ওরা ধানের ক্ষেতে যখন চড়ে বেড়ায় তখন খুব কাছ থেকেও এদের দেখা যায় না।

ছোট ছোট পাখিদের মধ্যে ভরত এবং মাঠচড়াইদের পোড়ো জমিতে বা মাঠে দেখা যায়। ওরা নিজেদের শরীরকে পোড়ো জমি ও মাঠের সঙ্গে এমনভাবে মিশিয়ে রাখে যে প্রখর দৃষ্টির অধিকারী বাজ ও ঈগলের চোখকেও ওরা ফাঁকি দিয়ে যায়।

ঘন সবুজ পাতার মধ্যে যেসব পাখি বাস করে তাদের গায়ের রং হয় সাধারণত টকটকে লাল, উজ্জ্বল নীল, হলুদ বা সবুজ। প্রখর রোদের আলোয় শিকারি পাখিরা যখন এদের দেখে, তখন চোখ ধাঁধিয়ে যায় শিকারির। এসব উজ্জ্বল রংয়ের পাখিদের ওপর রোদের আলো পড়লে ঝলমল করে ওঠে চোখ। ফলে ভালোভাবে শিকারকে দেখা মুশকিল হয়ে পড়ে। একে বলা যেতে পারে ‘আত্মরক্ষাকারী বর্ণবৈচিত্র্য’। এসব রঙিন পাখিদের মধ্যে আছে- নানা রকম বসন্তবউরি, ফটিকজল, মৌটুসি, ফুটফুটি, বেনেবউ, নীল ফুটফুটি, আলতাপরী, সহেলি, কাঠঠোকরা, ফুলটুসি, রাজবুলবুল, টুনটুনি, চশমাপাখি, হরবোলা ইত্যাদি।

পেঁচাকে অনেক পাখিই ভয় পায়। কিন্তু পেঁচা কাকে ভয় করে। পেঁচার ভয় সূর্যের আলোকে। সাধারণত পেঁচারা সূর্যের তাপ সহ্য করতে পারে না বলেই রাতের বেলা শিকার করে। দিনে তারা কোনো ঘন ঝোপঝাড়ে বা কোনো ঘন পাতাওয়ালা গাছের ডালে চুপ মেরে বসে থাকে। পেঁচারা দিনটা কাটিয়ে দেয় বড় বড় গাছের কোটরে। লক্ষীপেঁচারা দিন কাটায় কোনো পোড়ো বাড়ির চিলেকোঠার গর্তে বা পরিত্যক্ত বাক্স বা টিনের ভেতর। হুতুমপেঁচা, কণ্ঠিপেঁচা ঝোপওয়ালা গাছে সারাদিন বসে থাকে।

পৃথিবীর প্রতিটি প্রাণীর মতো পাখিরাও শিকার করে। পাখিদের দৃষ্টি, শ্রবণশক্তি এবং ঘ্রাণক্ষমতা প্রখর। দ্রুত উড়ে চলতে স্বচ্ছ ও তীক্ষè দৃষ্টিশক্তি দরকার। দূর থেকে শিকার ভালো করে দেখে তার আকৃতি ও দূরত্ব বুঝতে চাই। পাখির চোখ এ কাজের পক্ষে ঠিক ঠিক উপযোগী। বেশির ভাগ পাখির চোখ মাথার পাশে স্থাপিত। ফলে সামনের দিক অপেক্ষা দুই পাশের বস্তু ভালো করে দেখতে পায়। এরা তাই ঘাড় ফিরিয়ে এদিক ওদিক দেখে নেয়। ঘাড়ের অস্থিগঠন এমন যে, দুই চোখ দিয়ে পৃথকভাবে দেখলেও মাথা এপাশ ওপাশ করে প্রায় ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে নিজের চতুর্দিকে দেখতে পায়। তাছাড়া একই সঙ্গে দূরে যেমন দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে পারে, তেমনি মুহূর্তে একেবারে কাছের বস্তুর ওপরও নজর আনতে পারে।

একটি শালিক জমির ওপর হেঁটে হেঁটে খাবার সন্ধান করছে, মাথা ঘুরিয়ে সে যেমন চারপাশে দেখে নেয়, আবার সঙ্গে সঙ্গে এক চোখ দিয়ে একেবারে পায়ের কাছের ছোট বস্তুটিকেও ভালো করে দেখতে তার অসুবিধা হয় না। পাখির দৃষ্টিশক্তি মানুষের চেয়ে প্রায় ৩ গুণ বেশি। তার চোখের মণির আয়তন মানুষের চোখের তুলনায় প্রায় ৮ গুণ বড়।

নিউজিল্যান্ডের আধাঅন্ধ কিউই পাখির জীবন তার ঘ্রাণশক্তির ওপর নির্ভর করে। গভীর জঙ্গলের বাসিন্দা নিশাচর এই পাখির নাক লম্বা ঠোঁটের মাথায়। নানা রকম কাদামাটি, ময়লা-আবর্জনা এবং ঘাসের মধ্যে ঠোঁট চালিয়ে গন্ধের সাহায্যে এরা কেঁচো ও অন্যান্য ছোট ছোট কীট ধরে। চোখ নয়, নাকই তাদের খাদ্য সংগ্রহের প্রধান অঙ্গ।

কতক পাখির পক্ষে ঠোঁট স্পর্শানুভূতির সহায়ক। কাদাখোঁচা নামে একটি পাখি আছে, সে কাদার মধ্যে লম্বা ঠোঁট ডুবিয়ে কীট সন্ধান করে।

পাখিদের মধ্যে অনেক পাখি আছে মাংসাশী। শকুনের কথা আমরা জানি। যেখানে মরা গরু, যেখানে মড়ক সেখানেই শকুন এসে জড়ো হয়। তাছাড়া চিল, বাজ আর ঈগলের মতো মাংসাশী পাখিও আছে।

আকাশে যারা শিকার করে বেড়ায় তাদের বেশির ভাগের বেলাতেই দৃষ্টিশক্তি সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে। কত ওপরে তারা ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়, কিন্তু অনেক নিচের শিকারও তাদের নজর এড়ায় না।

যত রকমের ঈগল পাখি দেখা যায়, তার মধ্যে সবচেয়ে বলার মতো ঈগল হলো স্বর্ণঈগল। নদীর পাড়ের জঙ্গলে জঙ্গলে, পাহাড়ি অঞ্চলে এদের দেখা যায় বেশি। স্বর্ণঈগল নানা রকমের শিকার ধরে খায়। ছোট ছোট ফড়িং এরা যেমন খেয়ে থাকে, তেমনি তিমির মাংসেও এদের অরুচি নেই। তবে সাধারণভাবে খরগোশ, ইঁদুর, নানা জাতের পাখি শিকার করতে এরা ভালোবাসে।

ডানা মেলে উড়বার সময় ঈগল যখন কোনো শিকার দেখে, মাথা নিচু করে সে খাড়া নিচে নেমে আসে খুব দ্রুত। শিকার কিছু বুঝবার আগেই ঈগল তাকে ধরে ফেলে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ঈগলের দৃষ্টির জোর মানুষের চেয়ে প্রায় আট গুণ বেশি। তাই ১৬ হাজার ৪৪০ ফুট থেকেও সে তার শিকার দেখতে পায়।

এক ধরনের বাজপাখি আছে, ইংরেজিতে যাকে বলা হয় রেডহেডড মার্লিন। স্ত্রী এবং পুরুষভেদে এদের আলাদা আলাদা নামও আছে। তুরমতি (স্ত্রী) ও চেতওয়া (পুরুষ)।

তুরমতি ও চেতওয়া জোড়ায় শিকার করে এবং শিকার খাবার ভাগাভাগি করে খায়। বিশিষ্ট পক্ষিতত্ত্ববিদ ড. সালিম আলী পরপর এক জোড়া তুরমতি-চেতওয়া গুলি করে মারার পর তাদের পাকস্থলিতে দেখেন, একজনের পেটে টটরাঙ্গির ডান পা, অন্য জনের পেটে বাম পা। অন্যান্য অংশের মাংসও সমানভাবে ভাগ করা।

শিকার ধরার জন্য তুরমতি যাচ্ছে শালিকের পেছনে। সে তাকে মাটি ঘেঁষে অতি দ্রুত অনুসরণ করে চলেছে। আর চেতওয়া ওপর দিয়ে উড়ে চলেছে। দুজনেই শালিকের পেছনে চলেছে ঘন ঘন ডানা নেড়ে তীরের মতো সোজা। শিকার ঝোপের ভেতর আত্মগোপন করেছে। দুজনের কেউই ছাড়বে না। চেতওয়া ঝোপের মধ্যে ঢুকে ছোট-বড় যে পাখিকে পাচ্ছে তাড়া করে বের করছে। দুজনের একসঙ্গে শিকার এই একটি মজার সুবিধা।

পেঁচা যেন অনেকটা ডানা লাগানো বেড়ালের মতো। অন্ধকার রাতে যেমন বেড়ালের চোখ জ্বলে তেমনি পেঁচারও। চারদিকে প্রায় কিছু দেখা যাচ্ছে না এমন রাতে পেঁচা ঠিক ভালোভাবে নিজের শিকার ধরতে পারে। অন্ধকারে মানুষ ঠিক যতটা দেখে, পেঁচা তার চেয়ে প্রায় একশত গুণ বেশি দেখতে পায়। পেঁচার শ্রবণশক্তিও প্রখর। মাটিতে কোনো ইঁদুর ঘুরে বেড়ানোর সময় সামান্য শব্দও যদি হয়, সঙ্গে সঙ্গে পেঁচার কানে তা ধরা পড়ে যায়। পেঁচার দুটো কান কিন্তু একই সঙ্গে শব্দটা শুনবে না। যে কানের দিক থেকে শব্দটা আসছে, সে কান শব্দটা আগে পাবে। খুব বেশি আগে শুনতে পাবে তা নয়। শোনার কথাও ওঠে না। কাছের কান শুনতে পাবে সেকেন্ডের সামান্য এক ভগ্নাংশ, মাত্র ৩০ ভাগের ভাগের ১ ভাগ সময় আগে। কিন্তু এই সামান্য সময়ের হেরফের থেকেই পেঁচা বুঝে যায় কোনোদিক থেকে শব্দটা আসছে।

নিশাচর আরেক পাখির নাম রাতচরা। এই পাখিগুলো আকারে অনেকটা ময়নার মতো। ধূসর, বাদামি ও লালচে-হলুদ নরম পালকে ঢাকা শরীর। তার ওপর কালো কালো ছোপ ছোপ দাগ। এই পাঁচ মিশালি রংয়ের জন্য এরা সহজেই গা ঢাকা দিয়ে থাকতে পারে। সন্ধ্যার অন্ধকারে ওরা বাজপাখির মতো ছোঁ মেরে মেরে উড়ন্ত পতঙ্গ ধরে খায়। কীটপতঙ্গ, প্রজাপতি, মথ ইত্যাদি ওদের প্রধান খাদ্য। প্রকাণ্ড বড় হাঁ করে উড়ন্ত অবস্থাতেই ওই সব পতঙ্গকে ওরা মুখে পুরে ফেলে। এরা একেবারে নিঃশব্দে মথ-প্রজাপতির মতো উড়তে পারে। সবচেয়ে দ্রুত ওড়ে না বটে, কিন্তু শিকার ধরার জন্য ওরা উড়তে উড়তে বিদ্যুৎগতিতে মোড় ফিরতে পারে, বাঁক নিতে পারে উল্টোদিকে। শূন্যে ঘুরপাক খেতে পারে অথবা অবলীলাক্রমে ভেসে যেতে পারে যে কোনো দিকে।

পুকুরপাড়ের কোনো গাছে বা ছোটখাটো জলাশয়ের ধারে বাঁশ বা খুঁটির ডগায় মাছরাঙা এসে বসে মাছ ধরার আশায়। ওরা সব সময় মাথাটি ওপর-নিচে বা এদিক-ওদিক নাড়াতে থাকে। সেই সঙ্গে ছোট বেঁটে লেজটিতে এক একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ক্লিক করে একটা চাপা আওয়াজ করে। এভাবে বসে বসে ওরা সারাক্ষণ জলের দিকে তীক্ষè নজর রেখে দেখতে থাকে কখনও কোনো মাছ বা ব্যাঙাচি ভেসে উঠছে কিনা। শিকার দেখতে পেলেই ওরা ঠোঁট বাগিয়ে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে ডুব দেয়।

মুহূর্ত পরেই দেখা যায়, শিকারকে আড়াআড়িভাবে ঠোঁট চেপে ধরে আবার ভেসে উঠেছে। এই মাছরাঙা পাখিরা অনেক সময়েই জলের সামান্য ওপরে ডানা মেলে ভেসে বেড়ায়। শিকার দেখলেই দর্শনীয়ভাবে ডুব দিয়ে শিকারকে তাড়া করে বিদ্যুৎ বেগে। এই সময় ওদের কণ্ঠে চিঁ-চিঁ-চিঁ-চিঁ ডাক শোনা যায়।

মাছরাঙা যখন শিকার ধরে তখন শরীরটাকে টান টান করে। সে মুহূর্তের মধ্যে বাসা ছেড়ে জলের মধ্যে নেমে আসে। জলে ঠিক ঝাঁপানোর সময় ডানা বন্ধ থাকে। কিন্তু, জলের ভেতর আবার খুলে যায়। মাছরাঙা ঠোঁট খোলা রেখে শিকার ধরে। গাছের ডাল বা বাঁশের খুঁটি যদি জলের খুব কাছাকাছি থাকে তা হলে সমস্ত ব্যাপারটা ঘটে যায় চোখের পলক ফেলতে না ফেলতে। ছোট মাছ আর ব্যাঙাচি ছাড়াও এরা জলজ কীটপতঙ্গও খায়।

একটা ছোট মাপের বাজপাখি আছে। এদের নাম শিকরে বাজ। পঙ্গপাল, গিরগিটি, ব্যাঙ, ইঁদুর প্রভৃতি এদের খাদ্য। শিকারকে অতর্কিতে আক্রমণ করাই এদের রীতি। ঝাঁকড়া পাতাওয়ালা গাছের ডালে ওরা সতর্ক সন্ধানী দৃষ্টি মেলে বসে থাকে স্থির হয়ে। তারপর শিকারের দেখা পেলে আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ে। তীক্ষè বাঁকানো নখে শিকারকে গেঁথে তুলে নিয়ে আসে। ছাতারে, বটের, ঘুঘু প্রভৃতি ছোট ছোট পাখিদেরও অনেক সময় এই শিকারি পাখিরা ওইভাবে অতর্কিতে আক্রমণ করে বা বিদ্যুৎবেগে তাড়া করে শিকার করে। হতভাগ্য শিকার এত হঠাৎ আক্রান্ত হয় যে, সাবধান হওয়ার বা আত্মরক্ষার বিন্দুমাত্র সময় পর্যন্ত পায় না।

আসামের কাছাড় জেলার জৈন্তিয়া পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ছোট্ট গ্রাম জাতিংগা। এখানে মূলত উপজাতিদের বাস। এখানে বহুকাল আগে থেকেই প্রতি বছর বিস্তর পাখি এসে আগুনে ঝাঁপ দেয়। এই আগুন কারা দেয়? নভেম্বর মাসে এখানকার উপজাতিরা জঙ্গলের নির্দিষ্ট জায়গায় আগুন ধরিয়ে দেয়। এই আগুন দেখে পাখিরা ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে এসে আত্মাহুতি দেয়। এর কারণ কী? কেউ জানে না।

পাখিরা যখন দলে দলে আগুনে পড়ে তখন স্থানীয় অধিবাসীরা লাঠিপেটা করে পাখিদের মারে। এবং ভোজ উৎসবে মেতে ওঠে সবাই। পাখির আত্মাহুতির কী রহস্য এটা, তার কিনারা করা যায়নি। যেসব পাখি এখানে আত্মহত্যা করতে আসে, তার মধ্যে আছে নিশিবক, হরিয়াল, বাঁশঘুঘু, কালিজ, সাদা বুক মাছরাঙা, লাল মাছরাঙা, দামা, পাহাড়ি তিতির ইত্যাদি।

কিছু পাখি আছে, যারা পুরো শীতকালটা ঘুমিয়ে কাটায়। আমেরিকার এক প্রজাতির নাইটজার (বাংলা নাম রাতচরা বা দিনেকানা) পাহাড়ের গুহায় ঘুমিয়ে শীত কাটায়। একটানা প্রায় আড়াই-তিন মাস ঘুমিয়ে ওরা বসন্তকালে জেগে ওঠে। তখন শুরু হয় সংসার গড়ার কাজ।

ক্যালিফোর্নিয়ার পাইনবনে পাইনের ফল খায় যেসব কাঠঠোকরা, তারা শীতকালের জন্য খাদ্য সঞ্চয় করে রাখে। এসব ওরা কোথায় জমায়? এ আর এক মজার ঘটনা। তারা গাছের বাকলে ঠোঁট দিয়ে ঠুকরিয়ে ছোট ছোট ফুটো করে। সেখানেই তারা পাইনবীজ ঢুকিয়ে রাখে। শীতের সময় যখন পাইনফল থাকে না, তখন তা বের করে করে খায়। আরও মজার ঘটনা হচ্ছে, এক কাঠঠোকরার খাবার অন্য কাঠঠোকরা খায় না। নিজ নিজ গাছ চিহ্নিত করে রাখে নিজেরা। আবার সঞ্চিত খাদ্য রক্ষাও করে তারা। আমেরিকার লালশির কাঠঠোকরা আরও এক ধাপ এগিয়ে। তারা বাকলের ফুটোতে পাইনবীজ রেখে নরম কাঠের ঠুকরো দিয়ে ফুটো বন্ধ করে রাখে।

আমাদের দেশের দাঁড়কাককে চেনে না, এমন কেউ নেই। ওরা খুব বন্ধুপ্রিয়। সারাদিন ওরা দুজন এক সঙ্গে ঘুরোঘুরি করে, এক সঙ্গে খায়, এক সঙ্গে বিশ্রাম নেয়। দাঁড়কাকের কোনো সঙ্গী যদি মারা যায়, অন্যটি কিন্তু আর কারও সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতায় না। সঙ্গীহারাটি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত একাই থাকে। দেখা যায়, দিনের আহার শেষে দুপুরে যখন সে বিশ্রাম নেয়, তখন সে এমনভাবে ডাকে, যেন কাঁদে। এটি আসলেই কান্না। তা মানুষের মনকেও শোকাতুর করে দেয়।

সবচেয়ে বেশি উড়তে পারে কোন পাখি? এর উত্তর খুব সোজা নয়। আর্কটিক টার্ন নামের এক ধরনের সামুদ্রিক পাখি আছে, যার সমকক্ষ কেউ নেই ওড়ার বেলায়। উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরুতে আসতে সে একটানা ৭ হাজার ২০০ মাইল অতিক্রম করে। আবার নিজ বাড়িতে ফেরার সময় সে একই পথ পাড়ি দেয়।

ওয়েলসের একটি বাসা থেকে একটি শেয়ার ওটার (এক ধরনের হাঁস) ধরা হলো। হাঁসটি ধরে নিয়ে যাওয়া হলো আটলান্টিকের ওপারে ম্যাসাচুসেটসে। ওয়েলস থেকে ম্যাসাচুসেটসের দূরত্ব ৩ হাজার ২০০ মাইল। ম্যাসাচুসেটসে এনে ছেড়ে দেওয়া হয় হাঁসটিকে। দেখা যায় ১২ দিন পর হাঁসটি ঠিকই তার নীড়ে ফিরে এসেছে। অথচ সে পথে হাঁসটি কোনোদিন ওড়েনি। আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেওয়ার মতো হাঁসও নয় সে। তবে সে কী করে ফিরে এলো? এ রহস্যেরও কিনারা হয়নি এখনও।

পাখিরা প্রতি বছর দেশভ্রমণ করে। এ আর নতুন কী? জীবজগতে এমন কোনো প্রাণী নেই, দেশভ্রমণে বের হয় না। মানুষও তার ব্যতিক্রম নয়। শুধু তফাৎ হচ্ছে- মানুষ দেশভ্রমণ করে নানা উদ্দেশে। এর মধ্যে মনের খোরাকটি বড় হয়ে দেখা দেয়। কিন্তু পাখিরা দেশভ্রমণে বের হয় কেন? ওরা দেশভ্রমণে বের হয় বেঁচে থাকার জন্য। অনেকটা ঋতুচক্রের আবর্তনের মতোই যুগ যুগ ধরে পাখিরা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে আসা-যাওয়া করে। ওরা নির্দিষ্ট সময়ে যায়, নির্দিষ্ট সময়ে ফেরে। ওদের গমনাগমনের পথও কম নয়, হাজার হাজার মাইল।

মানুষের আবির্ভাবের অনেক আগেই পাখিদের উদ্ভব। পাখিরা কবে থেকে তাদের দেশান্তর যাত্রা শুরু করেছিল তা সঠিকভাবে এখনও জানা যায়নি। অবশ্য জানার উপায়ও নেই। তবে প্রাচীনকালের মানুষেরা যে পাখিদের দেশ ছাড়া বা দেশে পুনরাগমন লক্ষ করেছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায়। আজ থেকে প্রায় ৪০ হাজার বছর আগের প্রাচীন প্রস্তর যুগের মানুষের আঁকা গুহাচিত্রে দেশান্তরী পাখির ছবি পাওয়া গেছে। নানা লোককথা, উপকথা থেকে শুরু করে আধুনিক সাহিত্য পর্যন্ত এ নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে। প্রাচীন গ্রিক কবি হোমারের কবিতায়, ওল্ড টেস্টামেন্টের বাইবেলে এবং এই উপমহাদেশের সংস্কৃত গ্রন্থে বিদেশ থেকে আগত পাখিদের সাময়িক অবস্থানের কথা জানা যায়।

শুরুতেই বলেছি, পাখিরা দেশভ্রমণে বের হয় বেঁচে থাকার জন্য। কেমন বেঁচে থাকা? মূলত আমাদের দেশে আসে সাইবেরিয়া এবং হিমালয় অঞ্চলের পাখিরা। শীতকাল এলে ওই সব দেশের জলাশয়গুলো বরফে ঢেকে যায়। বরফের নিচে চাপা পড়ে যাওয়ায় পাখিরা, বিশেষ করে সেসব দেশের হাঁস, বক ইত্যাদি জলচর পাখিরা প্রয়োজনীয় খাবার পায় না। তখন কী করবে তারা? বেঁচে থাকার জন্য তো খাবার প্রয়োজন। শুরু করে ওরা দেশ ছাড়া। পাড়ি জমায় এমন দেশে, যেখানে হাওর-বাঁওড়, নদীনালার কোনো অভাব নেই। খাবারের সমস্যা নেই। এমন কয়েকটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ও ভারতের নাম উল্লেখযোগ্য। শীতকাল এলেই পাখিদের কলকাকলিতে মুখর হয় আমাদের দেশ। আমাদের দেশের প্রায় প্রতিটি জেলাতেই শীতের অতিথি পাখিদের দেখা যায়।

সম্প্রতি আমি ঘুরে এসেছি গোপালগঞ্জের বর্ণিবাঁওড় এলাকা। সাত্তার মাঝির নৌকায় করে বাঁওড়ে ঘুরতে ঘুরতে মুগ্ধ হয়ে গেল দুটি চোখ। শীতের কী অপরূপ দৃশ্য আমাদের দেশের জলাভূমিতে! সরালী, লেঞ্জা, ভূতি, নীলশির, দীঘর, লালশির ইত্যাদি হাঁস দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। ডানায় কাঁপন তুলে একবার দল বেঁধে উঠে যায় আকাশে, আবার দলবদ্ধ হয়ে নেমে আসে জলাশয়ে। যারা এ দৃশ্য দেখেনি, তাদের বোঝানো যাবে না লেখার ভাষায়। আর তাদের সৌন্দর্যের কথা লেখার ভাষায় প্রকাশ করাও কঠিন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুরেছি হাওরে। সকালের চেয়ে বিকেলের রূপ ছিল আরও মোহময়। মমতায় ভরে উঠল মন। ওদের শরীরের পালক বিকেলের রোদ লেগে যেন আরও মায়াবী হয়ে উঠেছে।

বিশিষ্ট শিশু সাহিত্যিক ও পাখি পর্যবেক্ষক আলী ইমামের সঙ্গে কিছুদিন আগে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার ঘুরে এসেছি। যাওয়ার সময় কুমিল্লার সিঙ্গলা দিঘিরপাড় দেখে চমকে উঠলাম আমরা। হাজার হাজার বক নেমেছে এখানে। গাড়ি থামানোর নির্দেশ দিলেন আলী ইমাম। আমরা গাড়ি থেকে নেমে মুগ্ধ নয়নে দেখেছি বকগুলো। হাজার হাজার বকের মধ্যে দুটি বক আমাদের বিমোহিত করল। বিশাল বড় আকারের দুটি সারস।

এই সারস এখন আর দেখা যায় না বলতে গেলে। কখনও খালি চোখে, কখনও চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে দেখতে লাগলাম। নেশা যেন আর কাটে না। আলী ইমাম বললেন, ছোটকালে কত দেখেছি এসব, আজ থেকে ত্রিশ বছর আগেও বিরল ছিল না।

এলাকার একজন বয়স্ক লোকের সঙ্গে আলাপ হলো। তিনি জানালেন, প্রতি বছর শীতে ওরা আসে। শীত চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে ওরাও চলে যায়। তবে সুখের খবর হচ্ছে- সিঙ্গলা দিঘির পাড়ের বকগুলোকে কেউ মারে না। কেউ জ্বালাতনও করে না। ফলে ওরা এ এলাকায় নিয়মিতই আসে।

শীতের পাখিরা আমাদের দেশের কোথায় কোথায় আসে? শীতের শুরুতেই ওরা নামতে থাকে বরিশালের দুর্গাসাগর দিঘিতে। বিশাল দিঘির মাঝখানে ছোট একটা দ্বীপ। সেটাই ওদের আস্তানা। ওদের দেখা যায় নোয়াখালীর সুধারামের চরমজিদে। কক্সবাজারের সোনাদিয়া দ্বীপে, কুড়িগ্রামের রৌমারির জলাভূমিতে, দিনাজপুরের রামসাগরে। পুরো মুন্সিগঞ্জ, পদ্মার চরাঞ্চলের গ্রামগুলো এবং সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজারের হাওর এলাকাগুলো যেন অতিথি পাখিদের স্বর্গরাজ্য। যেসব জলাভূমিতে দেশান্তরী পাখিদের আগমন বেশি, সেগুলো হচ্ছে- আটাভাঙা বাঁওড়, বর্ণিবাঁওড়, হাইলা, হাকালুকি, বরাম, বাংকা, মাকা, মাকালকান্দি, গুলদুবা, টাঙ্গুয়া, মতিয়ান, পাথার, চানালি, ঝিকর, জিংকর, জামইকাটা, মাহাই, নলুয়া, পারুয়া, দিনসাপোতা, গণেশ্বর, দুবরিয়া, চলনবিল, বউধা, চালচাকতা, চিংড়া, মেদা, কুকড়ি-মুকড়ির চর, চরখিদিরপুর, চরমুশান, চরওসমান, নীল সাগর, দুর্গা সাগর, কাপ্তাই লেক, বগা লেক, বঙ্গোপসাগরের উপক‚লবর্তী এলাকা এবং সুন্দরবনের সমগ্র এলাকা।

ঢাকাবাসী ইচ্ছে করলে ঢাকার খুব কাছে, চিড়িয়াখানা, সিরামিক লেক এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঘুরে আসতে পারে। এখানে ওরা সংখ্যায় কম। কম হলেও বিমোহিত হতে হয় ওদের কলকাকলিতে। ২০০১ সালের ৩০ নভেম্বর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অতিথি পাখিদের আগমন উপলক্ষে ‘পাখি মেলা’ হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এর চল থাকলেও আমাদের দেশে পাখিদের নিয়ে মেলা এই প্রথম। হতাশ হয়েছি কম অতিথি পাখি দেখে। শুধু সরালি এবং জলমুরগিই দেখা গেল। অন্যরা কোথায়? আমাদের দেশের অতিথি পাখি আসা কমেছে বৈকি! এসব অতিথি পাখিদের নির্বিচারে মারে কিছু শৌখিন পাখি শিকারি। বিভিন্ন চরাঞ্চলে গিয়ে তারা হত্যালীলা চালায়। পাখিদের আর্তচিৎকারে বাতাস হয় ভারী। রক্তে লাল হয় রুপোলি জল। এই দৃশ্য বড়ই ভয়ঙ্কর। ফলে কমতে শুরু করেছে অতিথি পাখির দল। এক সময় প্রায় দু’শো প্রজাতির পাখি আসত। এখন তা কমতে কমতে চল্লিশ-পঞ্চাশে নেমেছে। ঢাকা চিড়িয়াখানার লেকে যে কয়েকটি প্যালিকেন আছে, ওরাও ছিল অতিথি পাখি। নিরাপত্তা পেয়ে ওরা থেকে গেছে। এক সময় ওরা সারা দেশে আসত। এখন আসে না। ঘাতকের গুলি ওদের পথ পাল্টে দিয়েছে। পাখি শিকারের বিরুদ্ধে আইন আছে দেশে। কিন্তু প্রয়োগ নেই। আর প্রয়োগ নেই বলেই শিকারিরা জাল পেতে ওদের ধরে এনে ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় বিক্রি করে। এভাবে চলতে থাকলে একদিন বাংলাদেশ পাখিশূন্য হয়ে যাবে। থাকবে না কোনো কলকাকলি। একদিন দেখা যাবে, জলাশয়ে নয়, দুটি সরালি কিংবা লেনজা হাঁস জাদুঘরের কাচের বাক্সে ফ্রিজ হয়ে আছে।

পাখি দেখা চমৎকার একটি শখ। দেশ-বিদেশের মানুষের যে কত বৈচিত্র্যময় শখের সন্ধান পাওয়া গেছে তার কোনো হিসেব-নিকেশ নেই। কয়েন, ডাকটিকিট, ভিউকার্ড জমানোর মতো পাখি দেখার শখ ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত পর্যন্ত। ছুটির দিনগুলোতে বিদেশের পার্কে দেখা যায় উৎসাহী পাখি প্রেমিকদের ভিড়। শুধু বিদেশে কেন? আমাদের দেশে যখন শীতকালীন অতিথি পাখি আসে, তখন চিড়িয়াখানার দর্শনার্থীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে লেকের দিকে। মানুষ উৎসাহ নিয়ে দেখে এসব উড়ন্ত অতিথিদের। যাদের পাখনার ছন্দে, কণ্ঠের ছন্দোময় গানে গানে মুখরিত আমাদের চিড়িয়াখানা, আমাদের বনবনানী, হাওর-বাঁওড়, নদীনালা, বিল আর চরাঞ্চল।

পাখির প্রতি মানুষের আকর্ষণ হাজার হাজার বছর আগের। প্রাচীন মিসরের রহস্যময় পিরামিডের দেয়ালে দেয়ালে পাখি, মোগল চিত্রকলার বিশাল অংশ জুড়ে রয়েছে পাখি, ‘পঞ্চতন্ত্র’-এ রয়েছে অসংখ্য পাখির বর্ণনা, যে বইটি লেখা হয়েছে যিশু খ্রিস্টের জন্মের দুশ বছর আগে।

মানুষের প্রত্যেকটি সৃজনশীল সৃষ্টিই উঠে এসেছে শখ থেকে। স্বাভাবিকভাবেই মানুষের পাখি দেখার শখ ধীরে ধীরে পাখি পর্যবেক্ষণে রূপ নেয়। আর এই পাখি পর্যবেক্ষণের প্রথম ধাপ হলো যে কোনো অঞ্চলের সাধারণ পাখিকে ঠিকমতো চিনতে পারা। অক্ষর পরিচয় ছাড়া যেমন জ্ঞানার্জন সম্ভব নয়, তেমনি পাখি চিনতে না পারলে পাখি দেখার শখ দৃষ্টিনন্দনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।

মানুষ কয়েন বা ডাকটিকিট সংগ্রহ করে দেশ-বিদেশের কৃষ্টি ও আচার-আচরণ সম্পর্কে ধারণা পায়। তেমনিভাবে পাখিতত্ত্বের চর্চাও এগিয়ে যায় নির্ভুলভাবে পাখি চেনার মাধ্যমে। মনে রাখতে হবে, পাখি পর্যবেক্ষণে তিনটি জিনিস অবশ্যই প্রয়োজনীয়। একটি বাইনোকুলার, পাখি চিনতে সাহায্য করবে এমন একটি বই এবং দেখা পাখির তথ্য কিছু টুকে রাখার জন্য একটি খাতা।

যে তিনটি প্রয়োজনীয় জিনিসের কথা উল্লেখ করলাম, পাঠক এবং পাখি প্রেমিকদের সুবিধার জন্য প্রথম দুটি জিনিস সম্পর্কে একটু তথ্য দিয়ে রাখি। ৮ী৩০ অথবা ৭ী৫০ মাপের বাইনোকুলারই পাখি দেখবার জন্য সবচেয়ে উপযোগী। যন্ত্রটি এমন হওয়া দরকার, যাতে পাখির শরীরের খুঁটিনাটি সবকিছু যথেষ্ট বড় আকারে দেখা যায়। আশপাশে যেসব পাখি চোখে পড়ে সেগুলোকে চেনার জন্য একটি ভালো বইয়ের প্রয়োজন। হুইসলারের ‘পপুলার হ্যান্ডসবুক অফ ইন্ডিয়ান বার্ডস’ এবং সালিম আলীর ‘দ্য বুক অভ ইন্ডিয়ান বার্ডস’ বই দুটি এই কাজে বিশেষ উপযোগী। বাংলায় অনুবাদ করা সালিম আলীর ‘সাধারণ পাখি’ বইটি এ ব্যাপারে সবার বিশেষ কাজে লাগতে পারে। সালিম আলীর বইয়ে পাখিদের আকৃতি, বর্ণনা ও বিশেষ বিশেষ লক্ষণীয় বস্তুর ছবি এঁকে তালিকা প্রস্তুত করে দেওয়া হয়েছে। এতে পাখি চেনা বেশ সহজতর হবে। পাখি চেনার জন্য আরও বেশ কয়েকটি বই পাওয়া যায় বাজারে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে অজয় হোমের ‘বাংলার পাখি’ ও ‘চেনা-অচেনা পাখি’।

পাখি দেখার সময় পাখিকে চিনে রাখতে প্রয়োজন পাখির কোনো জিনিসটি সবচেয়ে বেশি নজরে পড়েছে। যেহেতু পাখিরা খুব চঞ্চল, যেহেতু তাকে ভালোভাবে দেখার আগেই উড়ে চলে যেতে পারে। প্রথম দর্শনেই পাখিকে ভালোভাবে দেখা ভীষণ কঠিন। কাজেই পাখির খুঁটিনাটি দেখার চেষ্টা না করে, যা সহজেই চোখে পড়ে তার ওপরই বেশি মনোযোগ রাখা প্রয়োজন। হয়তো দেখা গেছে, একটি কালো দাগঅলা হলুদ পাখি। মনে রাখতে হবে হলুদ পাখিটির কোন অংশে কালো দাগটি রয়েছে। হতে পারে মাথায় বা গলায় বা লেজে। এর সঙ্গে দ্রুত দেখে নেওয়া প্রয়োজন পাখিটির ঠোঁট বা পায়ের রং। হয়তো সব সময় ভরসা করা যায় না স্মরণশক্তির ওপর। কাজেই যা দেখা হয়ে যায় তাই সঙ্গে সঙ্গে লিখে রাখার জন্য খাতা ও কলম অবশ্যই প্রয়োজন।

হাজারও পাখির হাজারও স্বভাব। একেকটি পাখির আচরণ একেক রকম। যেমন- কোনো পাখি ডিম পাড়ে গাছে। আবার কোনোটি মাটিতে। কোনো পাখি বছরের কিছু সময় কাটায় গাছের ডালে ডালে, আবার বিশেষ বিশেষ সময়ে বাসায় ঘুমিয়ে কাটায়। এমন পাখিও দেখা যায়, যারা সারাটি বছর কাটায় গাছের ডালে বা আকাশে উড়ন্ত অবস্থায়। কেবল ডিম পাড়ার সময় নেমে আসে ঘাসে। কোনো কোনো পাখি মাটিতে হাঁটে বেশ সাবলীলভাবে, কোনো পাখি হাঁটে লাফিয়ে লাফিয়ে। একেকটি পাখির ওড়ার ভঙ্গিও একেক রকম। খাবারের রুচিও আলাদা আলাদা।

কোন পাখিকে কোথায় দেখা গেল, মাটির ওপরে না ঘন পাতার ফাঁকে, গাছের গুঁড়ির ওপর না জলের কাছে এবং সেই সময় পাখিটি কেমন করছিল বা কোন্ ধরনের নড়াচড়া করছিল- এসব ভালো করে নজর দেওয়া উচিত। পাখিকে ঠিকমতো চিনবার জন্য এটি একটি বড় সুবিধা।

শুরুতে এই লেখায় যেসব বইয়ের নাম উল্লেখ করেছি, সেসব বইয়ের ছবিতে পাখির রং যদিও নিখুঁতভাবে ছাপানো আছে, তবুও প্রথম প্রথম সবারই কিছু না কিছু অসুবিধা হতে পারে। কিন্তু যখন পাখি দেখা নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হবে তখন কোনো অসুবিধাই থাকবে না। যেমন কেউ হুট করে সংগ্রহ করতে পারে না পৃথিবীর প্রতিটি দেশের ডাকটিকিট, ঠিক তেমনি।

মানুষের মধ্যেও যেমন এক পরিবারভুক্ত লোকদের অনেক সময় দেখলেই চেনা যায়, ঠিক সে রকমই একেবারে অজানা পাখিরও কিছু কিছু ধরন-ধারণ আর অভ্যাস দেখে অনায়াসেই বলে দেওয়া যায় সে কোন গোষ্ঠীভুক্ত। ইগ্রেটগোষ্ঠীর পাখিরা পেছন দিকে ঘাড় হেলিয়ে ওড়ে। মাছরাঙা পাখির ঠোঁট, বাজপাখির মাথা ও ঠোঁট সব এমন একেকটি সুস্পষ্ট চিহ্ন। এই ধরনের বৈশিষ্ট্য যেসব পাখির মধ্যে দেখা যাবে তাদের সঠিক প্রজাতিটির নাম না জানলেও, সে কোন গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত তা বলে দেওয়া কিছুমাত্র কঠিন হবে না। তবে এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘদিনের অভ্যাস ও অভিজ্ঞতা। কোনো একটি পাখির বাসা যদি ভালো করে দেখার সুযোগ এসে যায়, তাহলে সেই পাখিটি সম্বন্ধে প্রচুর জ্ঞান লাভ করা সম্ভব।

এখানে একটি কথা বলে রাখা প্রয়োজন, পাখির ডিম বা বাচ্চাকে হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করা উচিত নয়। আহত পাখিকে শুশ্রƒষা করতে হলে খুব যতেœর সঙ্গে ঠিকভাবে পাখিটিকে নাড়াচাড়া করতে হবে। কোনো কোনো পাখি এতই ক্ষীণজীবী যে, বুকের ওপর সামান্য চাপ পড়লেই মারা যেতে পারে। কোনো পাখিকে ভালো করে পরীক্ষা করে দেখতে হলে তাকে হাতের তালুর ওপর উল্টিয়ে শুইয়ে রাখলে সুবিধে হয়। কারণ, উল্টিয়ে রাখলে পাখিরা একদম নড়াচড়া করতে পারে না। নড়াচড়া করার চেষ্টাও করে না।

পাখিদের ওপর যে কেউ হুট করে কিছু আবিষ্কার করে ফেলতে পারে না। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পাখি দেখতে দেখতে পাখিদের সঙ্গে সত্যিই একটা যেন ঘনিষ্ঠ প্রীতির সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পাখি দেখার শখ যাদের আছে, তারা যে কোনো সময়, যে কোনো অবস্থায় পাখিচর্চার মাধ্যমে প্রচুর আনন্দ লাভ করতে পারে। যেভাবে মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে করে আসছে। আর এ আনন্দ মানুষের জ্ঞানের পরিধিকে সুপরিসরও করবে।

এই সঙ্গে এই কথাটিও বলে রাখা ভালো যে, একটা তথ্যে দেখা গেছে, এ পর্যন্ত পৃথিবীতে যারা প্রাথমিকভাবে পাখি দেখাকে শখ হিসেবে নিয়েছেন, তাদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে পাখি বিশারদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj