ইসলামি বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ : মুহাম্মদ নিযামুদ্দীন

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

ইসলামের দৃষ্টিতে দেশপ্রেম হচ্ছে ইমানের অঙ্গ। এই দেশপ্রেম বলতে শুধু দেশের মানচিত্রের প্রতি প্রেমকেই বোঝায় না, মানুষের প্রতি প্রেমকেও বোঝায়। তার শেখ মুজিবকে ছাড়িয়ে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠাই প্রমাণ করে তিনি কত বড় দেশপ্রেমিক ছিলেন। ‘বঙ্গবন্ধু’ এই শব্দটির মধ্যেই তার ব্যাখ্যা বা জবাব মিলবে। এক কথায় বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ যে অবিচ্ছেদ্য বা অবিচ্ছিন্ন, তাও অভিধাটি থেকে অনুধাবন করা যাবে।

বললেই তো কেউ বন্ধু বা প্রেমিক হয়ে যায় না, পরীক্ষাও প্রদান করতে হয়। বিপদে বন্ধুর পরীক্ষা হয় বলে বাংলাতে একটি বচনও চালু আছে। একথা সত্য যে, সুসময়ে সুহৃদের বেশে বহুজনকে দেখা যায় কিন্তু সংকটকালে সবাই পালায়। সে-ই তো সত্যিকার সুহৃদ, যে শুধু সুসময়েই নয়, সংকটকালেও সঙ্গে থাকে।

এক সময় বাংলাদেশেও সেই সংকট বা দুঃসময় দেখা দিয়েছিল। সংকটটা সৃষ্টি করেছিল সে সময়কার পশ্চিম পাকিস্তানি হায়েনা-হানাদার শাসক গোষ্ঠীরা। তারা মুখে ইসলামের কথা বললেও বাংলাদেশের বেলায় শোষণ ও শঠতাই ছিল তাদের শাসননীতি। তখন সেই জুলুমের বিরুদ্ধে জিহাদ করা জরুরি হয়ে পড়েছিল। ইসলামেও জুলুমের বিরুদ্ধে জিহাদ করার জন্য জোর তাগিদ দেয়া হয়েছে। শেখ মুজিব সেই জিহাদের জাদুমন্ত্রে গোটা জাতিকে জাগ্রত করেছিলেন এবং সেই সঙ্গে নিজে হয়ে উঠেছিলেন জাতির অবিসংবাদিত নেতা। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে নভেম্বরে জাতির উদ্দেশে তিনি যে ঐতিহাসিক বেতার ভাষণ দিয়েছিলেন, তাতে বজ্রকণ্ঠে বলেছিলেন, ‘আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হচ্ছে যে, আমরা ইসলামে বিশ্বাসী নই। বস্তুত আমরা বিশ্বাসী ইনসাফের ইসলামে। আমাদের ইসলাম মহানবী (সা.)-এর ইসলাম, যে ইসলাম জগৎবাসীকে শিক্ষা দিয়েছে ন্যায় ও সুবিচারের অমোঘ মন্ত্র। ইসলামের প্রবক্তা সেজে পাকিস্তানের মাটিতে বারবার যারা অন্যায়-অত্যাচার, শোষণ-বঞ্চনার পৃষ্ঠপোষকতা করে এসেছে আমাদের সংগ্রাম সেসব মোনাফেকদের বিরুদ্ধে। যে দেশের শতকরা ৯৫ জন মুসলমান, সে দেশে ইসলাম বিরোধী আইন পাসের সম্ভাবনা ভাবতে পারেন তারাই। ইসলামকে তারা ব্যবহার করেন দুনিয়াটা শায়েস্তা করার জন্য।’

বঙ্গবন্ধুর ইসলামি বিশ্বাস যে কত পাকা ও পরিশুদ্ধ ছিল তা ক্বারি মোহাম্মদ ইসহাক সাহেবের স্মৃতিচারণ থেকে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। স্বাধীনতা লাভের আগে ১৯৭০-৭১ সালের দিকে তিনি কুরআন তিলাওয়াত করতেন পাকিস্তান রেডিওতে এবং পাকিস্তানেই থাকতেন। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবিকে সমর্থন করতেন বলে পাকিস্তান থেকে বিতাড়িত হন। পরে সে সুবাদেই বাংলাদেশ বেতারে স্টাফ আর্টিস্ট হিসেবে তার চাকরি হয় এবং বেতারে তিনি নিয়মিত কুরআন তেলাওয়াত করতেন। বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর একদিন তার সঙ্গে দেখা করতে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে যান ক্বারি সাহেব। তাকে দূর থেকে দেখেই বঙ্গবন্ধু বললেন ক্বারি সাহেব! আমি মুসলমান, আমি হিন্দু হইনি, বিশ্বাস না হয় আপনার সামনেই আবার কালেমা পড়ছি। এই বলে গড় গড় করে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মদুর রাসুলুল্লাহ’ পুরো কালেমা তাইয়্যেবাহ পড়লেন। (ইসলামি কর্মকাণ্ডে বঙ্গবন্ধু, অবদান, মাওলানা ইসহাক ওবায়দী, দৈনিক যুগান্তর, ১৭ আগস্ট ২০০১)।

১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আওয়ামী লীগ সংবিধান কমিটি ৬ দফা ভিত্তিক যে খসড়া সংবিধান প্রণয়ন করেছিল, তাতে ইসলাম ধর্মকে দেয়া হয়েছিল আলাদা মর্যাদা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ, দলিলপত্র ২য় খণ্ডের ৭৯৩ পৃষ্ঠায় বিষয়টি বর্ণিত হয়েছে এভাবে-

ক. ৩য় ভাগ-নির্দেশমূলক রাষ্ট্রীয় মূলনীতি

১. ইসলাম

১. পবিত্র কুরআন এবং সুন্নাহর আজ্ঞাসমূহের খেলাফ কোনো আইন প্রণয়ন করা হবে না।

২. পাকিস্তানের মুসলমানদের পবিত্র কুরআন ও ইসলামিয়াত শিক্ষার সর্ব সুযোগ প্রদান করতে হবে।

৩. পাকিস্তানের মুসলমানদের ধর্মীয় কর্মগুলো পালনে নৈতিক মান উন্নয়ন সাধন করতে হবে।

এছাড়া ১৯৭২-এর সংবিধান যে গণপরিষদ অনুমোদন দিয়েছিল, সেই গণপরিষদের সদস্যরা নির্বাচিত হয়েছিলেন পাকিস্তানের জন্য ইসলামি আদর্শ ও মূলনীতি সংবলিত একটি সংবিধান প্রণয়নের জন্য।

বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধ, দলিলপত্রের ২য় ও ৩য় খণ্ডে উল্লেখ করা হয়েছে- পাকিস্তানের তদানীন্তন সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া খান প্রণীত ১৯৭০ সালের আইনগত কাঠামোর (এলএফও) ভিত্তিতে পাকিস্তানের জন্য ইসলামি আদর্শ ও মূলনীতি সংবলিত একটি সংবিধান প্রণয়নের উদ্দেশ্যে ১৯৭০-এর ১৯ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭১-এর ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়েছিল নিখিল পাকিস্তানব্যাপী সাধারণ নির্বাচন। নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টি আসনের মধ্যে ১৬৭টি আসনেই নির্বাচিত হয়েছিলেন আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা। জাতীয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান গণপরিষদে লাভ করলেন নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। ইসলামি আদর্শভিত্তিক একটি খসড়া সংবিধানও তৈরি করেছিলেন আওয়ামী লীগ সাংবিধানিক কমিটি।

বঙ্গবন্ধু ১৯৭১-এর ৭ মার্চ যে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন তাতেও ছিল মহান স্রষ্টার স্মরণ। ঐতিহাসিক সেই ভাষণটির একস্থানে বুলন্দ আওয়াজে তিনি বলেছিলেন, ‘এ দেশকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশা আল্লাহ’। এই আত্মপ্রত্যয়ের পেছনে আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থাই যে কাজ করেছিল, তা সহজেই অনুধাবন করা যায়। তারপর আসে মুক্তিযুদ্ধের মতো ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ। সেই মুক্তিযুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছিল ইমানের বলে বলীয়ান বীর বাঙালিরা। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম তার এক লেখার শুরুতে লিখেছেন, ‘দেশপ্রেম ইমানের অংশ। নষ্ট-ভ্রষ্টরা কখনো মুক্তিযুদ্ধ করে না। পৃথিবীর সর্বত্র সর্বকালে দেশপ্রেমিক ইমানদাররা মুক্তিযুদ্ধ করেছে।’ (দৈনিক আমার দেশ, ১৮ মার্চ ২০১৩)। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা এস আই এম নূরুন্নবী খান বীর বিক্রম তার ‘রাধা নগরের যুদ্ধ’ শীর্ষক স্মৃতিচারণার এক স্থানে মুক্তিযুদ্ধের সময় তার উদ্দীপনার উৎস সম্পর্কে লিখতে গিয়ে লিখেছেন, ‘আমাদের ভরসা ছিল মহান আল্লাহ তা’য়ালা … মুক্তিযোদ্ধারা ‘আল্লাহু আকবার’ আর ‘জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে বাংকার টু বাংকার ফাইট করে সামনে এগিয়ে যান।’ (দৈনিক প্রথম আলো, ২৬ মার্চ ২০১৩)। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের প্রশিক্ষণ শিবির পরিদর্শনের স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে জ্যোতি সেনগুপ্ত তার বইয়ের এক স্থানে লিখেছেন, ‘মুক্তিযোদ্ধারা যখন বাংলাদেশ থেকে সংগৃহীত মাটি, কুরআন (বাইবেল বা গীতা) এবং বাংলাদেশের পতাকা হাতে নিয়ে শপথ গ্রহণ করত, তখন তাদের অনেকে শিশুর মতো কেঁদে ফেলত।’ (হিস্ট্রি অব ফ্রিডম মুভমেন্ট ইন বাংলাদেশ, ১৯৪৭-১৯৭৩, সাম ইনভল্বমেন্ট, নয়া প্রকাশ, কলকাতা ১৯৭৪, পৃ. ৪০০)। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মুসা সাদিক লিখেছেন, ‘রাত ৮-২০ মিনিটের দিকে হানাদারদের মুখোমুখি থেকে ওয়্যারলেসে সুবেদার মেজর ফজলুর রহমান জানালেন যে, তিনি নিজ বাংকারে আহত হয়েছেন। আমাদের স্বাধীন করে যাবে। ওয়্যারলেসে সুবেদার মেজর ফজলুর রহমানের কণ্ঠস্বর থেমে গেলে পুনরায় ওয়্যারলেসে তার নাম ধরে ডেকে কয়েকবার কালেমা শরিফ শোনান হলো। শেষবারের মতো ওয়্যারলেসে তার জড়ানো কণ্ঠস্বর ভেসে এলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ…’ এরপর থেমে গেল তার স্বর।’ (দৈনিক ইত্তেফাক, ১৫ ডিসেম্বর ১৯৯৬)। যারা দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছেন, তারা শহীদ হিসেবে শ্রদ্ধা শ্লাঘার পাত্র সবার কাছে। এই যে ‘শহীদ’ শব্দটি, সেটিও তো ইসলামের দান। কিংবা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে যে ‘সালাম’ নিবেদন করা হয়, সেটিও ইসলামি সংস্কৃতি-জাত একটি শব্দ। আবদুল জাব্বারের গাওয়া একটি বিখ্যাত গানও তো আছে ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ নামে। কবি শামসুর রাহমান স্বাধীনতাকে সুদর্শন করেছেন এই বলে, ‘স্বাধীনতা তুমি মায়ের কোমল জায়নামাজের উদার জমিন।’ বোঝাই যাচ্ছে, ইসলামি সংস্কৃতি ও বিশ্বাস কীভাবে মিশে আছে এ দেশের মানুষের মনে ও মননে। বাংলাদেশে ইসলামের প্রভাব বিষয়ে বলতে গিয়ে জেমস জে. নোভাক তার বইতে লিখেছেন, ‘ইসলাম ছাড়া বাংলাদেশকে ভাবা যায় না। ইসলামের মূল্যবোধ থেকে সামাজিক নির্ভরশীলতার চেতনা এসেছে মানুষের মধ্যে।… বাংলাদেশের ধর্ম যে ইসলাম, এটা বাংলাদেশের জন্য একটা বড় প্রাপ্তি; কেননা ইসলাম এমন ধর্ম, স্বভাবের দিক থেকে যা আন্তর্জাতিক এবং চরিত্রগতভাবে বহির্মুখী। ইসলাম বর্ণবাদ বিরোধী এবং ইসলাম যথার্থই আন্তর্জাতিক ধর্ম।’ (বাংলাদেশ জলে যার প্রতিবিম্ব,- জেমস জে. নোভাক, বাংলা অনুবাদ ১৯৯৫, ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা, পৃ. ৯০-৯২)।

মিথ্যার মেঘ সত্যের সূর্যকে আড়াল করার যতই অপচেষ্টা করুক না কেন, আদতে তা অসম্ভব। কেননা সত্য তার স্বমহিমায় সমুজ্জ্বল। সব অপচেষ্টার অন্ধকার ভেদ করে সত্য নামক সূর্যের আলো এক সময় ঠিকই হেসে ভেসে ওঠে পৃথিবীর প্রান্তরে। এই উজ্জ্বল সত্যিটি উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন ভারতের সাবেক সেনা প্রধান ফিল্ড মার্শাল মানেকশ’ও। তিনি বলেছেন, ‘যদি বাংলাদেশকে একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করা হয় তাহলে ভারতের আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। যেদিন আমার সৈনিকরা বাংলাদেশকে মুক্ত করে সেদিনই আমি একথা উপলব্ধি করি।’ (স্টেটসম্যান, ২৯ এপ্রিল ১৯৮৮, কলকাতা)।

বাংলাদেশ স্বাধীন হলে বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসেন এবং ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলার ইতিহাসের বৃহত্তম জনসমাবেশে ভাষণ দেন। সেই সমাবেশে তিনি দৃপ্ত কণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘বাংলাদেশ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম অধ্যুষিত দেশ। ইন্দোনেশিয়ার পরেই এর স্থান। মুসলিম জনসংখ্যার দিক দিয়ে ভারতের স্থান তৃতীয় এবং পাকিস্তানের স্থান চতুর্থ। কিন্তু অদৃষ্টের পরিহাস। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ইসলামের নামে এদেশের মুসলমানদের হত্যা করেছে, আমাদের নারীদের বেইজ্জত করেছে। ইসলামের অবমাননা আমি চাই না।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমি মুসলমান, মুসলমান একবারই মরে, বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র।’ তার এই ভাষণটি বহু বিভ্রান্তির অবসান করেছিল। বিখ্যাত রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ লিখেছেন, ‘চিন্তার বিভ্রান্তি এভাবে দূর হওয়ার অল্পদিনের মধ্যে কাজের বিভ্রান্তির অবসান করলেন মুজিব নেতৃত্ব। রেডিও-টেলিভিশনে কুরআন তেলাওয়াত, আসসালামু আলাইকুম, খোদা হাফেজ বহাল হলো। ‘ধর্ম ও জীবন’ সম্পর্কে কুরআন-হাদিস ভিত্তিক সাপ্তাহিক আলোচনা আবার শুরু হলো। সরকারি ফাংশনেও মিলাদ মাহফিল হতে লাগল। জনগণ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।’ (আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, পৃ. ৭৭২)। এ প্রসঙ্গে ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব জে এন দীক্ষিতের পুস্তকের কিছু পর্যবেক্ষণ পেশ করা যেতে পারে। তিনি তার খরনবৎধঃরড়হ ধহফ ইবুড়হফ, উযধশধ (টচখ, ১৯৯৯) পুস্তকের চবৎংড়হ ড়ভ ঝযবরশয গঁলরনঁৎ জধযসধহ অধ্যায়ের এক স্থানে লিখেছেন, ‘তিনি অনুধাবন করেন যে, এভাবেই বাংলার মুসলমানরা এক সম্মানজনক অবস্থানের অধিকারী হতে পারবেন। ধর্মীয়ভাবে তিনি গোঁড়া ছিলেন না বটে কিন্তু তার স্থির বিশ্বাস জন্মেছিল, বাংলার মুসলমানদের ইসলামি স্বাতন্ত্র্যই শুধুমাত্র হিন্দু প্রধান ভারতের কাছ থেকে তাদের যথার্থ দাবি আদায়ে সক্ষম হবে।’ [ঐব ভবষঃ ঃযধঃ রঃ ধিং ঃযব ড়হষু ধিু রহ যিরপয সঁংষরসং ড়ভ ইবহমধষ পড়ঁষফ ববংঁৎব ভড়ৎ ঃযবসংবষাং ধ ঢ়ষধপব ঁহফবৎ ঃযব ংঁহ. ঐব ধিং হড়ঃ ধ ৎবষরমরড়ঁং বীঃৎবসরংঃ নঁঃ ধিং ফববঢ়ষু পড়হাৎবপবফ ড়ভ ঃযব ংধহপঃরষু ধহফ ৎবষবাড়হপর ড়ভ ঃযব রংষধসরপ রফবহঃরঃু ড়ভ ইবহমধষর গঁংষরসং যিড় যব ভবষঃ ড়িৎষফ হড়ঃ মবঃ ধ ভধরৎ ফবধষ ভৎড়স ঐরহফঁ ফড়সরহধঃবফ ওহফরধ. চ.২২০]

মুসলিম প্রধান দেশ হলেও বাংলাদেশকে তিনি বৈষম্যহীন দেশ বানাবার, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির স্বর্গভূমি রচনার স্বপ্ন দেখেছিলেন। ১৯৭২ সালের ৭ জুন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ভাষণদানকালে স্পষ্ট ভাষায় তিনি বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে মুসলমান মুসলমানের ধর্ম পালন করবে, হিন্দু তার ধর্ম পালন করবে, খ্রিস্টান তার ধর্ম পালন করবে, বৌদ্ধও তার নিজের ধর্ম পালন করবে। এ দেশের মাটিতে ধর্মহীনতা নাই।’ (উদ্ধৃতি : ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা, অক্টোবর-ডিসেম্বর ২০১০, পৃ. ১০)।

লোভ লোকদের লক্ষ্যচ্যুত করে। সে জন্যই সম্ভবত নীতিবাক্য হিসেবে উপদেশ দেয়া হয়- ‘শঠের প্রলোভনে মুগ্ধ হইও না।’ বাংলাদেশ সে রকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েও সত্যের সংকল্পে অটল ছিল। সময়টা ছিল ১৯৭১ সাল। ইসরায়েল মুক্তিযোদ্ধা ও শরণার্থীদের জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পথ্য, পোশাক ও খাবার পাঠিয়েছিল। কেবল তাই নয়, ১৯৭২ সালের এপ্রিলে ইসরায়েল বাংলাদেশকে স্বীকৃতিও প্রদান করেছিল। উভয় ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রতারণার ফাঁদে পা না দিয়ে প্রবলভাবে প্রত্যাখ্যান করে ছিল। বঙ্গবন্ধু যেহেতু একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন, সেহেতু সুহৃদের বেশে সাহায্য-সমর্থনের হাত নিয়ে এলেও দুশমন চিনতে তার দেরি হয়নি। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরব বিশ্বের; বিশেষ করে ফিলিস্তিনিদের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন তিনি অব্যাহত রাখেন। তারই প্রমাণ মেলে ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে। যুদ্ধ করার জন্য পাঠিয়েছিলেন ৫ হাজার সদস্যবিশিষ্ট একটি বাহিনী। যুদ্ধের গুরুদায়িত্ব বহনকারী মিসরের জন্য পাঠানো হয়েছিল এক লাখ পাউন্ড চা আর আরবদের জন্য শুভেচ্ছার নিদর্শনস্বরূপ পাঠিয়েছিলেন ২৮ সদস্যের একটি ডাক্তার প্রতিনিধি দল।

তার একটি দুঃসাহসিকতার ও দূরদর্শিতার দৃষ্টান্ত হলো ১৯৭৪ সালে লাহোরে অনুষ্ঠিত ওআইসির শীর্ষ সম্মেলনে তার যোগদান। দুঃসাহসিক এই অর্থে যে, দোস্ত দেশ ভারতকে পাশ কাটিয়ে তিনি ওই সম্মেলনে যোগদান করেছিলেন। অপরদিকে দূরদর্শী এই অর্থে যে, মুসলিম মিল্লাতের সঙ্গে সেই সম্পর্ক আগামীর জন্য আত্মিক-অর্থনৈতিকসহ সব প্রকার সমৃদ্ধির সেতু রচনা করে। সেই সম্মেলনে তিনি যে ভাষণ প্রদান করেছিলেন তা মুসলিম বিশ্বে বাংলাদেশের সম্মান বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছিল। ভাষণে তিনি বলেন, ‘মানুষ এখন বস্তুগত দিক থেকে বৃহত্তর শক্তি অর্জন করেছে। আমরা যুদ্ধের জন্য শক্তি অপব্যবহার করতে দেখেছি, জনগণকে নিপীড়ন করতে দেখেছি। আমরা তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার অস্বীকার করতে দেখেছি। অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মধ্যে তাদের ঠেলে দিতেও দেখেছি। আর এসব অকথ্য যাতনার চূড়ান্ত নিদর্শন হয়ে আছেন আমাদের ফিলিস্তিনি ভাইয়েরা। আর এ জন্যই অতীতের তুলনায় আজ এই শক্তিকে প্রজ্ঞার সঙ্গে কাজে লাগানোর প্রয়োজন বেশি। ধ্বংস নয় সৃষ্টি, যুদ্ধ নয় শান্তি, দুর্ভোগ নয় মানুষের কল্যাণে আমাদের কাজ করতে হবে। আমরা যদি মহানবী (স.) প্রচারিত মানব প্রেম ও মানব মর্যাদার শাশ্বত মূল্যবোধ আমাদের মধ্যে সঞ্চারিত করতে পারি, তা থেকে বর্তমানকালের সমস্যা সমাধানে মুসলিম জনসাধারণ সুস্পষ্ট অবদান রাখতে সক্ষম হবে। এসব মূল্যবোধে উদ্দীপ্ত হয়ে শান্তি ও ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে আমরা একটি নতুন আন্তর্জাতিক ঐতিহ্য গড়ে তুলতে পারি। … আরব ভাইদের ওপর যে নিদারুণ অবিচার হয়েছে অবশ্যই তার অবসান ঘটতে হবে। অন্যায়ভাবে দখলকৃত আরবভূমি অবশ্যই ছাড়তে হবে। আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে জেরুসালেমের ওপর। আল্লাহর কৃপায় আমরা এখন আমাদের সম্পদ ও শক্তি এমনভাবে সুসংহত করতে পারি, যাতে আমাদের সবার জন্য শান্তি ও ন্যায়বিচার অর্জন করা যায়। এই সাফল্য অর্জনের জন্য বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষ সম্ভাব্য সব প্রকার সাহায্য করতে প্রতিশ্রæতিবদ্ধ। সর্বশক্তিমান আল্লাহ আমাদের সবার যৌথ প্রচেষ্টা সফল করুন।’ (ঐ, পৃ-১৪-১৫)

এর আগে ১৯৭২ সালে সৌদি আরবে একটি হজ প্রতিনিধিদল প্রেরণ করেন তিনি। প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ। তা ছাড়া সেবার ৬ সহস্রাধিক বাংলাদেশি মুসলমান হজ পালন করে। এরই ফলে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সুপ্রভাত সূচিত হয়। এরপর ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ বেতারের বহির্বিশ্ব কার্যক্রম থেকে আরবদের জন্য আরবি অনুষ্ঠান প্রচার ছিল তার দূরদর্শিতার আরেকটি দৃষ্টান্ত। ১৯৭৪ সালের অক্টোবরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে গেলে নিউইয়র্কে সৌদি বাদশা ফয়সালের সঙ্গে তার এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। একই সালের ডিসেম্বরে সৌদি আরবে একটি হজ প্রতিনিধিদল প্রেরণ করেন তিনি। প্রতিনিধিদলকে সহায়তা করার জন্য মিসরের তৎকালীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আতাউর রহমানকে সৌদি আরব আসার নির্দেশ দেন। সেখানে তারা আরো ৪০টির মতো মুসলিম দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। ওই প্রতিনিধিদলই সর্বপ্রথম সৌদি বেতারে হজের সময় বাংলা অনুষ্ঠান প্রচারের ব্যবস্থা করে। প্রতিনিধিদলটি ফিরে আসার অল্পদিন পরই তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন সৌদি আরব সফর করেন। তার সফরকালেই বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালে হজে যাওয়ার বিষয়টি নির্ধারিত হয়। তার আগে বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করে সৌদি আরব। সৌদি আরব স্বীকৃতি দিয়েছিল ঠিকই কিন্তু তার আর হজে যাওয়া হয়নি। তার আগেই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে ঘাকতদের হাতে নির্মমভাবে তিনি নিহত হন।

বেঁচে থাকাকালে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য কাজ; যেগুলো ছিল ইসলামের পক্ষে ইতিবাচক- করে যান তিনি। এসবের প্রথমটি হলো ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা। এর আগে বাজারে বাংলায় লেখা ইসলামি বই তেমন একটা পাওয়া যেত না। ব্যক্তির চেষ্টায় বিচ্ছিন্নভাবে যে দু’একটা বই বেরুতো, সেগুলো কী প্রাজ্ঞতার দিক থেকে, কী প্রকাশনার দিক থেকে ছিল পিছিয়ে। বলা বাহুল্য ইসলামের বুনিয়াদি বিষয়ে লেখা বেশির ভাগ বই-ই ছিল বিদেশি ভাষা তথা আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষায় লেখা। অনুবাদের অভাবে আমজনতার কাছে তার অধিকাংশই অজানা ছিল। ফলে ইসলামি বিদ্যা বলতে যা বুঝায়, তা ছিল আলেম শ্রেণির আয়ত্তে ও একচেটিয়া। ফলে তারা ভুল বলুক কিংবা ভালো বলুক, সেটাই মেনে নিতে হতো সাধারণ মানুষকে। পাঠের প্রবল পিপাসা থাকলেও প্রয়োজনীয় ইসলামি পুস্তকের অভাবে এক ধরনের অন্ধকারে থাকা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না আমজনতার। সেই অন্ধকারে আলোর উৎসব নিয়ে এল ইসলামি ফাউন্ডেশন। ইসলামি বিষয়ে বহু মূল্যবান ও বিশেষায়িত বিদেশি বই অনুবাদের আনুক‚ল্যে তারা প্রকাশ করতে থাকল একে একে। বিদেশি বা বিশেষায়িত ইসলামি বই ছাড়াও বাংলায় লেখা প্রয়োজনীয় বহু ইসলামি বই বের করার মাধ্যমে পাঠকদের পিপাসাকে পূরণ করতে থাকল প্রতিষ্ঠানটি। এর দেখাদেখি বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানও এগিয়ে আসে ইসলামি বই-পুস্তক প্রকাশের ক্ষেত্রে। বলা যায়, ইসলামি বই প্রকাশের ক্ষেত্রে বিপ্লব সাধিত হয়। সে হিসেবে সে সময় বঙ্গবন্ধু কর্তৃক ইসলামিক ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠা একটি যুগান্তকারী ঘটনা।

স্বাধীনতার পর এমন শোনা গিয়েছিল যে, মাদ্রাসা শিক্ষা বন্ধ করে দেয়া হবে। বন্ধ করে দেয়া মানে ইসলামি শিক্ষা শূন্যে নিয়ে আসা। কিন্তু সেটা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। বঙ্গবন্ধু কর্তৃক মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড পুনর্গঠন ছিল সেই শূন্যের বিরুদ্ধে পুণ্যের কাজ। আলিয়া মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড পুনর্গঠনের পর ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার বার্ষিক সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে তিনি এক ভাষণ প্রদান করেছিলেন। সে সম্পর্কে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সাবেক জাতীয় অধ্যাপক ও কবি সৈয়দ আলী আহসান লিখেছেন, ‘আলিয়া মাদ্রাসার অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি একটি অনন্য সাধারণ ভাষণ বলে আমার মনে হয়েছিল। তিনি তার ভাষণের এক পর্যায়ে বলেছিলেন, আমাদের দেশে পাকিস্তান আমলেই ইসলাম বিরোধী বহু কাজ হয়েছে। রেসের নামে জুয়াখেলা রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত ছিল, আপনারা আলেম সমাজ কোনো দিন এর প্রতিবাদ করেননি। ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় পুলিশের সাহায্যে প্রকাশ্যে জুয়াখেলা চলত, এগুলো বন্ধ করার কোনো আন্দোলন আপনারা করেননি। কিন্তু ইসলামি রাষ্ট্র কায়েম করার কথা বারবার বলছেন। ইসলামি রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনায় জুয়া এবং মদকে যে হারাম ঘোষণা করতে হয় সেটা আপনারা জানতেন কিন্তু আপনারা এগুলোর বিরুদ্ধে কিছু বলেননি। আমি ক্ষমতায় এসে প্রথমেই ঘোড় দৌড় বন্ধ করে দিয়েছি, পুলিশকে তৎপর হতে বলেছি শহরের আনাচে-কানাচে জুয়াড়িদের আড্ডা ভেঙে দিতে। আমি ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা বলি কিন্তু ধর্ম নিরপেক্ষতা ধর্ম বিরোধিতা নয়। আমি মুসলমান, আমি ইসলামকে ভালোবাসি। আপনারা আমাকে সাহায্য করুন, দেখবেন, এ দেশে ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড হবে না।’ (বঙ্গবন্ধু : যে রকম দেখেছি, বার্ড পাবলিকেশন্স, ঢাকা, ১৯৯৬, পৃ.১৬)।

সেসব ছাড়াও বেতার-টিভিতে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত প্রচারের নির্দেশ, কাকরাইল মসজিদের জন্য অতিরিক্ত জায়গা প্রদান, টঙ্গিতে বিশ্ব ইজতেমার জন্য স্থান নির্ধারণ ও স্থায়ী বন্দোবস্ত হিসেবে তুরাগ তীরবর্তী জায়গাটি প্রদান, পবিত্র হজযাত্রীদের জন্য ভ্রমণ কর রহিতকরণ, জাতীয় পর্যায়ে সিরাত মজলিস ও ঈদে মিলাদুন্নবি, শবেকদর ও শবেবরাত উপলক্ষে সরকারি ছুটি ঘোষণা, মদ-জুয়া নিষিদ্ধকরণ- প্রভৃতির মাধ্যমে তিনি যে দ্বীনি দায়িত্ব পালন করে গেছেন, তা দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

ইসলাম তো বটেই, ইসলামি ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তার সানুরাগ সম্পর্ক রাখার উদাহরণও আছে। তাদের একজন হলেন বাংলার বিখ্যাত বুজুর্গানে দ্বীন মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ.)। বঙ্গবন্ধুর জীবনে এই বুজুর্গানে দ্বীনের বহু অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার রাজনীতির সূচনাকালে দুরূহ সংকটে সময়-অসময় না ভেবে সোজা চলে আসতেন লালবাগ মাদ্রাসায় এবং হুজুরের কাছ থেকে সমাধান নিয়ে সন্তুষ্ট মনে ফিরে যেতেন নিজের রাজনৈতিক অঙ্গনে। (উপাত্ত উৎস : ইসলামি কর্মকাণ্ডে বঙ্গবন্ধুর অবদান শীর্ষক রচনা, দৈনিক যুগান্তর, ১৭ আগস্ট ২০০১)। কেবল জীবিত ইসলামি ব্যক্তিত্বের সঙ্গেই নয়, জাগতিক জীবন ছেড়ে চলে যাওয়া ইসলামি ব্যক্তিকেও যে তিনি কত ভক্তি ও ভালোবাসার নজরে দেখতেন তার নজিরও আছে। সেই ইসলামি ব্যক্তিত্ব আর কেউ নন, বিশ্ববিখ্যাত কবি আল্লামা ইকবাল। বঙ্গবন্ধু স্বয়ং লিখেছেন, “খাজা আবদুর রহিম পূর্বে আইসিএস ছিলেন (তখন ওকালতি করেন), খুব ভদ্রলোক। আমাকে তার কাছে রাখলেন, ‘জাভেদ মঞ্জিলে’। তিনি জাভেদ মঞ্জিলে থাকতেন। ‘জাবেদ মঞ্জিল’ কবি আল্লামা ইকবালের বাড়ি। কবি এখানে বসেই পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখেছিলেন। আল্লামা শুধু কবি ছিলেন না, একজন দার্শনিকও ছিলেন। আমি প্রথমে তার মাজার জিয়ারত করতে গেলাম এবং নিজকে ধন্য মনে করলাম। আল্লামা যেখানে বসে সাধনা করেছেন সেখানে থাকার সুযোগ পেয়েছি।” (অসমাপ্ত আত্মজীবনী শেখ মুজিবুর রহমান, দ্বিতীয় মুদ্রণ : সেপ্টেম্বর ২০১২, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা, পৃ.২১৭)।

তার সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে সাবেক জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক লিখেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু একজন ভালো মুসলমান অনেক ক্ষেত্রে প্রায় গোঁড়া মুসলমান ছিলেন। প্রথম জীবনে তিনি মুসলিম লীগের একজন অনুগত সদস্য ও পাকিস্তান সৃষ্টির ধারণার সমর্থক ছিলেন এবং এই ধারণাকে বাস্তবায়িত করতে অংশগ্রহণ করেছিলেন।’ ‘বাংলাদেশ জাতির অবস্থা;- অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক পুনর্মুদ্রণ : দৈনিক সংবাদ, ২ ডিসেম্বর ১৯৯৯)। রাজনৈতিক উত্তরণের সঙ্গে সঙ্গে তিনি হয়ে ওঠেন উদারতার উজ্জ্বল উদাহরণ এবং তার বুক হয়ে ওঠে বাংলাদেশ।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj