কটিক : হাশেম খান

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

সবুজ অধ্যায়

আমার নাম কটিক

-কটিক। আমারে নাম কটিক আছে।

নামটা শুনে খানিকটা কৌত‚হল জাগে মনে। পুনরায় নামটা ঠিকমতো জানার জন্য কিছু একটা বলতে যেতেই ছেলেটি হাতের ইশারায় আমাকে থামিয়ে দিয়ে আবারও জানিয়ে দিল- তার নাম ‘কটিক’। আমাকে কথা বলার সুযোগ না দিয়েই বলতে শুরু করল,

-আপনি বলবিন তো- নাইহে তোমার নাম আসলে ‘ফটিক’। আপনার মতো শহরের মানুষরা এর আগে দশবার আমারে এমন কথা বলেছে। তোমার নাম আসলে ‘ফটিক’। বনজঙ্গলের মানুষরা ঠিকমতো বলতে পারে না বলে ফটিক নামটা তোর কটিক হয়ে গেছে। কিন্তু ব্যাপারটা আসিলে তাই মোটে নয়। সত্যি কথা হলো আমার এই ‘কটিক’ নামটাই রেখেছেন আমার জ্যাঠামশাই। জ্যাঠামশাই আমাকে নিজেই গল্প করিছেন। আমি যেদিন মায়ের কোলে আসি, সেদিন আমাদের ঘরের পেছনের বড় কদম গাছটায় একটা কাঠঠোকরা পাখি সারা দিন কট্-কট্, কটর-কট শব্দ করে কদম গাছে ঠোকর দিয়ে একটা গর্ত করিছে। যেটা ওদের বাসা।

একনাগাড়ে অনেকক্ষণ কথা বলে কটিক একটু থামল। আমি অবাক হয়ে এই বনবাসী ছেলেটির কথা শুনছিলাম। কটিক আবার বলতে থাকে,

-জ্যাঠা বলেছে, কাঠঠোকরার ঠোঁটের ওই কট্ কট্ কটাস্ কটিক এসব শব্দ থেকেই জ্যাঠা আমার নাম দিয়েছে কটিক। আরও কিছু কারণ আছে। আমার বড় দুই দিদি আছে। ওদের নাম করুণা ও কমলি। ওদের নামের সঙ্গেও কটিক নামটা মিলি যায়। তিনটি নামই ‘ক’ দিয়ে শুরু হইয়েছে।

অনেকক্ষণ ধরে এতগুলো কথা বলে কটিক খানিকটা লজ্জিত হয়েই ধীরে ধীরে বলল,

-বাবু তোর কোনো খবর না নিয়ে নিজের কথা বলছি। তুই একা কেনে এসেছিস এই বনে? তোর অন্য বন্ধুরা কই?

-আমার বন্ধুদের তুই চিনিস নাকি? কোথায় দেখলি?

-কেন? তোমরা সেই ঢাকা শহর থেইকে এসেছ। চা-বাগানে ঘুরে ঘুরে ছবি আঁকিছ, কুলিদের বস্তিতে গিয়ে ছবি খাঁড়িছ, সে কথা বালিশিরার সবাই জানে। তোমরা থাকিছ কালিঘাট চা-বাগানের বড়বাবুর বাসায়। যাকে আমরা বলি, ‘মুন্ডুচোলা’ বাবু।

বলেই কটিক একটু হেসে ফেলল। আমি বললাম,

-হাসলে কেন?

-না, বড়বাবুর মাথায় চুল নাই তো, যাকে তোমরা বল টাকুমাথা। আমরা চা-বাগানের কুলিরা বলি ‘মুণ্ডুচোলা বাবু’। খুব ভালো মানুষ গো আমাদের এই বড়বাবু।

ছবি আঁকছি শ্রীমঙ্গলে

ছবি আঁকতে গিয়েছি শ্রীমঙ্গলে। সময়টা বর্তমান থেকে বহু বছর আগে। ১৯৫৯ সাল। অক্টোবর মাস। চারুকলার ছাত্রদের এক মাসেরও বেশি ছুটি। এই এক মাস ছুটিতে নিসর্গ থেকে ছবি আঁকা অনুশীলন করব, এই চিন্তা ও অভিলাষ নিয়ে ঢাকা থেকে বেরিয়ে পড়ি আমরা পাঁচ বন্ধু। এরা হলো- গোপেশ মালাকার, আশীষ সেনগুপ্ত, সিরাজুল হক, এডেলিন ডায়াস এবং আমি। আমরা তখন চারুকলার তৃতীয় বর্ষে পা দিয়েছি। আমাদের দলের নেতা গোপেশ মালাকার। সিলেটের ছাতকে তার বাড়ি হলেও সিলেট অঞ্চলের রাজনৈতিক নেতাসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষ তার পরিচিত। মুরারীচাঁদ কলেজে ছাত্র থাকাকালীন (১৯৫২-১৯৫৪) সেই সময়ে বাংলাভাষা আন্দোলন ও রাজনৈতিক আন্দোলনে একজন সক্রিয় কর্মী ছিল। কখনও নেতা। নেতৃত্বের কারণে পাকিস্তান সরকারের রোষানলে পড়ে তিনি গ্রেফতার হয়ে চার বছর জেলে কাটান। ১৯৫৬ সালে ছাড়া পেয়ে আমাদের সঙ্গে চারুকলায় ভর্তি হন।

কালিঘাট চা-বাগানের কর্মকর্তা ফয়জুর রহমান ও আলতাফুর রহমান গোপেশ মালাকারের বন্ধু ও সুহৃদ। সেই সুবাদে গোপেশ আমাদের নিয়ে এসেছে শ্রীমঙ্গলের এই কালিঘাট চা-বাগানে। আমরা চারজন ছেলে বন্ধু থাকি ফয়জুর রহমানের বাড়িতে আর আমাদের মেয়ে সঙ্গী এডেলিন থাকে আলতাফুর রহমানের বাড়িতে।

বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় শ্রীমঙ্গলে শীত বেশি। অক্টোবর মাসে ঢাকায় শীত সামান্যই অনুভূত হয়। কিন্তু কালিঘাট চা-বাগানে তখন প্রচণ্ড শীত, হাড় কাঁপানো। মোটা উলের জাম্পার, উলের মোজা, জুতা, কানটুপি, মাফলার ছাড়া ঘরের বাইরে বের হওয়া মুশকিল। এই হাড়কাঁপা শীতে চা-শ্রমিকদের গায়ে প্রয়োজনীয় কাপড়ের খুবই অভাব।

খুব ভোরে উঠেই আমি একা একা বালিশিরা নদীর ধারে চলে যেতাম। বন্ধুরা এবং ফয়জুর রহমান সাহেব সবাই তখন ঘুমিয়ে থাকেন। কুয়াশার চাদরে ঢাকা গাছপালা, নদী ও কুলিবস্তি প্রায় আবছায়া। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশা ধীরে ধীরে কেটে যায়। সমস্ত প্রকৃতি ধুয়েমুছে ঝকঝকে চেহারা নিয়ে ভেসে ওঠে। মুগ্ধ হয়ে প্রতিদিন ভোরে আমি প্রকৃতির এই রূপ-পরিবর্তন দেখতাম। কুলিবস্তি থেকে মেয়েরা ও পুরুষ শ্রমিকরা চা-পাতা তোলার ঝাঁকা মাথায় নিয়ে কাকভোরেই বেরিয়ে পড়ত। ছোট-বড় নানারকম দলে ওরা যখন সবুজ চা-বাগানের রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যায়, সেটা হয়ে ওঠে দেখার মতো চমৎকার দৃশ্য। আমি স্কেচ খাতায় এরকম অনেক দৃশ্যের স্কেচ করেছি। শীতের সময় বালিশিরা নদীতে পানি অনেক কমে যায়। কিছু জায়গায় প্রায় হাঁটুপানি। শ্রমিকরা এই হাঁটুপানি নদী পার হয়ে যখন চলাচল করে সেটাও দেখার মতো সুন্দর এক ছবি।

আমাদের পাঁচ নবীন শিল্পীর দিনগুলো বেশ ভালোভাবেই কাটছে। বালিশিরা উপত্যকায় কালিঘাটে, রাজঘাটে, সিন্দুর ঘাটে, নন্দরানী ও আশপাশের জঙ্গলঘেরা চা-বাগানের বিস্তৃত ভূমিতে ঘুরে বেড়াচ্ছি, প্রাণভরে নিসর্গের রূপ উপভোগ করছি। প্রতিদিনই ছবি আঁকছি-কখনও জলরং, কখনওবা কালো কালিতে, কলমে, পেন্সিলে। চা-শ্রমিকরা শত ব্যস্ততার মধ্যেও ক্ষণিক দাঁড়িয়ে আমাদের আঁকা দেখত। নানারকম সরস মন্তব্য করত। কখনও কখনও ছবি আঁকার সময় রোদ এসে আমাদের গায়ে ও ছবিতে পড়লে নিজেরা কয়েকজন আড়াল করে দাঁড়িয়ে থাকত। যাতে রোদে আমাদের জলরং করার সময় কষ্ট না হয়। আঁকতে অসুবিধা না হয়। রংধোয়া পানি ময়লা হয়ে গেলে পরিষ্কার পানি নিয়ে আসত। দু-চারজন শ্রমিক অতি উৎসাহে এবং খুব সরলভাবেই বলে উঠত,

-বাবু, কত কষ্ট করে তোমরা কী সুন্দর ছবি খাঁড়িছ, কত সময় ধরে বসি আছ। একটু চা খেলে খুব ভালো হবি। কিন্তু বাবুরা আমার কাছে তো পয়সা নাইরে।

-তুমি ঠিক বলিছ, সিধুরাম। একটু চা খেলে বেশ মজা হতো।

-বাবু তোকে নমস্কার আমার নামটা তোর মনে আছে? বলেই পা ছুঁয়ে সালাম করল।

-কেন মনে থাকবে না, সিধু। তুমি সেদিন হঠাৎ বৃষ্টি এসে গেলে কত কষ্ট করে আমার ছবি, কাগজ বৃষ্টির পানি থেকে বাঁচিয়ে দিলে। আর আমরা দুজনেই ভিজে একাকার। সিধুরাম এই নাও টাকা, গরম গরম চা নিয়ে আনো, সঙ্গে কুকিস আনবে। সবার জন্যই আনবে। আমরা তো খাবই, তোমরাও যে কজন এখানে তারাও একসঙ্গে চা-কুকিস খাবে।

-তুই খুবই ভালো বাবু। চায়ের সঙ্গে কুকিস খুব মজা হবি। এই তোরা দুজন আয় আমার সাথি।

বলতে বলতে সিধুরাম তার সঙ্গে দুজনকে নিয়ে আনন্দে লাফাতে লাফাতে চা-কুকিসের জন্য কাছেই বটতলায় ছাপড়া চা-দোকানে চলে গেল।

কালিঘাটে আমাদের ছবি আঁকা আরও আনন্দময় হয়ে উঠেছিল আমাদের প্রতিদিনের সঙ্গী মুক্তার কারণে। মুক্তা মৌলভীবাজার কলেজের ছাত্র। শ্রীমঙ্গলে চা-বাগান এলাকার টগবগে এক তরুণ। আমাদের প্রধান গাইডের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে সবরকম সহযোগিতা করে যাচ্ছে। দরাজ গলায় চমৎকার সব ভালোলাগা আধুনিক গান একটির পর একটি গেয়ে চলে। পথ চলার সময় কখনওবা আমরা যখন তন্ময় হয়ে ছবি আঁকি, মুক্তা তখন গেয়ে চলে। তিন চারটি গান মুক্তার গায়কী বৈশিষ্ট্যের কারণে চমৎকার আবহ তৈরি করত। যেমন, ‘এই ক‚লে আমি আর ওই ক‚লে তুমি- মাঝখানে নদী ওই’…। আরেকটি গান সে প্রায়শ গেয়ে শোনাত। ‘চোখের নজর কম হলে আর কাজল দিয়ে কী হবে…। রূপ যদি না থাকে সখী…।’ মুক্তা পরবর্তীকালে সঙ্গীতের ক্ষেত্রে খ্যাতি অর্জন করেছিল। তার ভালো নাম এ কে আনাম।

ফয়জুর রহমান ও আলতাফুর রহমান সাহেব প্রায়ই সন্ধ্যাবেলা আমাদের চিত্রশিল্পী দলের সম্মানে চা-বাগানের কর্মকর্তাদের বাড়িতে গানের আসর, কবিতা পাঠ ও গল্পগুজবের আসর বসাতেন। শিল্পী মুক্তা তো গাইতই, আরও কয়েকটি ছেলেমেয়ে গাইত। আর সালেহা ভাবিও (মিসেস আলতাফুর রহমান) সুরেলা কণ্ঠে সন্ধ্যা মুখার্জির গান শোনাতেন। একদিন সিলেট থেকে নিয়ে এলেন খ্যাতিমান সঙ্গীতশিল্পী রঙ্গলাল দেব চৌধুরীকে। সারা দিন শিল্পীদের সঙ্গে ঘুরলেন, গল্পগুজব করলেন, সন্ধ্যায় শোনালেন অনেক গান।

কালিঘাট চা-বাগানে একুশ দিন

কটিকের গল্প বলতে গিয়ে চা-বাগানের পাঁচ ছাত্রশিল্পীর ছবি আঁকার ঘটনা উল্লেখ করতে হলো। কালিঘাটে সাতদিন ছবি আঁকার পরদিন হঠাৎ করেই আমার সঙ্গে কটিকের পরিচয় ঘটে।

খুব ভোরেই আমার ঘুম ভেঙে যায়। বন্ধুরা সবাই কম্বলমুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছে। সকালবেলা চা-বাগানের শ্রমিকদের বালিশিরা নদী হেঁটে পার হওয়ার দৃশ্যটা জলরঙে আঁকার জন্য বেরিয়ে পড়ি। একটা চিরকুটে লিখে বন্ধুদের জানিয়ে যাই, সকালের নাশতা করব না, আমি একবারে দুপুরে ফিরব।

একটু একটু করে কুয়াশা সরে যাচ্ছে। সূর্য উঠছে। শ্রমিকরা চায়ের ঝাঁকা মাথায় কেউবা পিঠে ঝুলিয়ে কুলিবস্তি থেকে নেমে বালিশিরা হেঁটে পার হয়ে যাচ্ছে। আমি যতটুকু পারি দ্রুত জলরঙে ছবিটা আঁকতে থাকি। শ্রমিকরা বেশিরভাগই মেয়ে। এরা সাদা শাড়িই বেশি পরে। শাড়ির পাড় কোনোটা লাল, কোনোটা নীল ও কালো, খয়েরি রঙেরও হয়ে থাকে। তবে শীত থেকে রক্ষা পেতে দু-চারজন রঙিন চাদর বা জাম্পার জোগাড় করে পরেছে। ছবিটা আঁকতে পেরে নিজের কাছেই ভালো লাগল। কুলি ছেলেমেয়েরা কয়েকজন আমার পেছনে ভিড় করে আঁকা দেখল। দু-একজন খুশি হয়ে মন্তব্য করল- খুব সুন্দর আঁকিছ বাবু।

ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি- সকাল নটা চল্লিশ। প্রায় আড়াই ঘণ্টা লেগেছে ছবিটা আঁকতে। সকালে না খেয়ে বেরিয়েছি, ক্ষিদে পেয়েছে বেশ। কিন্তু বাসায় ফিরতে ইচ্ছে করল না। আর বলেই এসেছি দুপুরে ফিরব। বোর্ড-কাগজ, রং, তুলি ও ভাঁজ করা ছোট্ট কাঠের ইজেলটা গুটিয়ে বটতলায় চায়ের দোকানে চলে এলাম। এক বুড়ি-শ্রমিক গরম গরম ভাপাপিঠা বানাচ্ছে। পেঁয়াজ, মরিচ দিয়ে খাচ্ছে দু-একজন। গুড় দিয়েও খাওয়া যায়। দুটো গরম ভাপাপিঠা পেঁয়াজ, মরিচ দিয়ে খেতে গিয়ে বেশ মজা লাগল, ঝালও লাগল খুব। ধীরে ধীরে এক কাপ গরম চা খেয়ে জিভের ঝাল কিছুটা কমল। কুলি শ্রমিকরা প্রচণ্ড ঝাল খায়। কখনও কখনও বাটা সরিষার ভর্তা দিয়েও ভাপাপিঠা খাওয়া হয়। সেটা দুপুরের পর পাওয়া যায়।

সইত্যা নামে এক তরুণ চটপটে চা-শ্রমিকের সঙ্গে গল্প হলো। তার কাছ থেকে গল্পে গল্পে কালিঘাটের ও চা-বাগানের অনেক খবর জানা গেল। বটতলা থেকে দক্ষিণ দিকে একটা রাস্তা চা-বাগানের মাঝ দিয়ে সোজা চলে গেছে। মোটামুটি চওড়া রাস্তা, কিন্তু মাটির। হঠাৎ হঠাৎ দু-একটা ট্রাক ছুটে যায় প্রচণ্ড ধুলা উড়িয়ে। এ ছাড়া চা-বাগান মালিকদের দু-একটা গাড়ি ছাড়া এ অঞ্চলে আর কোনো যানবাহন নেই। অবশ্য সাইকেল আছে। চা-কারখানার বাঙালি বাবুরা এমনকি শ্রমিক নেতারা অনেকেই সাইকেলে চলাফেরা করে। সইত্যার কাছেই জানা গেল প্রায় আধা ক্রোশ বা মাইলখানেক সোজা এই রাস্তা। একেবারে দক্ষিণে কালিঘাট চা-বাগানের শেষ সীমানা। তারপর ঘন জঙ্গল। বেতবন ও বড় বড় গাছের অরণ্য। টিলা অঞ্চল। ডানপাশে কিছুদূর গেলে বেতবনের ধারে আছে চাষবাসের জমি। সেখানে ধানের চাষ হয়। ছোট গ্রাম। চাষিরা থাকে। কয়েক ঘর সাঁওতাল আছে। সইত্যার গল্প শুনে আমার উৎসাহ বেড়ে গেল। বনজঙ্গল আমার ভালো লাগে। শুধু ভালো লাগা নয়, আমাকে টানে।

চা-বাগানের মাঝ বরাবর রাস্তা ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। রাস্তার দুপাশের বাগানে শ্রমিকদের চোখে পড়ল না। চা-গাছের মাথার দিকে তাকিয়ে দেখি দুটি পাতা একটি কুঁড়ি সবেমাত্র বের হয়েছে। যার অর্থ চার-পাঁচদিন আগেই এই এলাকায় পাতা তোলা হয়ে গেছে। দুটি পাতা একটি কুঁড়ি পরিপুষ্ট হতে কয়েকদিন সময় লাগবে। এলাকাটা বেশ নির্জন। চা-বাগানের ছায়াগাছগুলোতে ওড়াউড়ি করছে কিছু পাখি। কণ্ঠি ঘুঘু চোখে পড়ল। হাঁড়িচাচা বেশ বড় পাখি- একসঙ্গে দুটি দেখলাম। শালিক, বুলবুলি ও বেশকিছু ছোট পাখি। সবগুলো চিনতেও পারিনি।

বনমোরগ হঠাৎ উড়াল দিল

দুদিন আগে খুব ভোরবেলা কালিঘাটের পুব পাশের জঙ্গলে ফয়জুর রহমানের সঙ্গী হয়েছিলাম, বনমোরগ শিকারে। দুজনে মিলে কুয়াশা ও কনকনে শীতের মধ্যে ইতিউতি অনেক খুঁজলাম। পা টিপে টিপে গভীর জঙ্গলে চুপচাপ থেমে থেমে, নজরদারি করেও বনমোরগের হদিস মিলল না। ফয়জুর রহমান বললেন,

-না, আজকে কপালটাই খারাপ। এতক্ষণ ধরে খুঁজলাম। গতকাল বিকেলে সামনের ঝোপঝাড়ের পাশে কিছু গম ছিটিয়ে গিয়েছিলাম। সকালবেলা দু-একটি বনমোরগ তাদের দলবল নিয়ে নিশ্চয় খাবারের খোঁজে বের হবে। এই ঝোপের পাশে আসার কথা। কিন্তু একটা ব্যাপার বুঝতে পারলাম না। যে পরিমাণ গম ছিটিয়েছিলাম বেশিরভাগই কে খেয়ে গেল?

হঠাৎ ফয়জ ভাই ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে চুপ থাকতে ইশারা দিলেন। সামনে ঝোপের ডানে তাকাতে বললেন।

ওমা! কী সুন্দর খরগোশ। একটি, দুটি না আরও কয়েকটি ঝোপের আড়াল থেকে নিঃশব্দে লাফিয়ে লাফিয়ে বের হয়ে এল। মাটি থেকে খুঁজে খুঁজে কুটকুট করে খাবার খাচ্ছে। মোরগের জন্য ছিটিয়ে যাওয়া গমের দানা। ফয়জ ভাই তড়িৎগতিতে তার একনলা বন্দুকটি তাক করে ফেললেন। আমিও দ্রুত বন্দুকে হাত রেখে তাকে গুলি করতে নিষেধ করলাম। ফয়জুর রহমান চোখ কুঁচকে খানিকটা বিরক্ত হলেন। তার বন্দুকের নলটা ওপর দিকে তুলে ধরলাম। ফিসফিস করে বললাম,

-ফয়জ ভাই, ক্ষমা করবেন। খরগোশকে গুলি করবেন না। বড় দুটো খরগোশ হলো মা ও বাবা, ছোট তিনটি ওদের বাচ্চা। এদের মাংস আমরা কেউই খেতে পারব না। এত নিরীহ প্রাণী, যাদের আদর করতেই ভালো লাগে।

ফয়জ ভাই একটু সহজ হয়ে হাসতে হাসতে বললেন,

-এই দেখ, এত আবেগ নিয়ে জঙ্গলে শিকার করা যায় নাকি? তুমি জান? শিকার সামনে পেয়েও গুলি করার মুহ‚র্তে তাকে বাধা দেওয়া ও শিকারির পক্ষে তা সংযতভাবে মেনে নেওয়া কত কঠিন কাজ? আর এই জঙ্গলে এত কাছে পাঁচ-পাঁচটি বাদামি খরগোশ একসঙ্গে পেয়ে যাওয়া যে কোনো শিকারির জন্য খুবই লোভনীয়।

এমন অবস্থায় আমি কিছুই বলতে পারলাম না। আমাদের সাড়া পেয়ে খরগোশ মা-বাবা তাদের তিন ছানাসহ পগারপার। ফয়জুর রহমান এবার গা ঝাড়া দিয়ে বললেন,

-চলো ফেরা যাক। সূর্য উঠে গেছে। চারদিকেই ফর্সা হয়ে যাচ্ছে। আলো ও রোদ বাড়ছে। এখন আর কিছুই পাওয়া যাবে না। কিন্তু বন্ধুদের কী জবাব দেবে? তারা তো বসে আছে শিকার করা বনমোরগ দেখার জন্য। গতকাল সন্ধ্যায় যে গল্প করলে- ভোররাতে কনকনে শীতের মধ্যেই জঙ্গলে এসে বনমোরগ ধরবে। খাসা একটা খাওয়া হবে বনমোরগের মাংস দিয়ে। এখন? খালি হাতে ফিরলে ওদের ঠাট্টা আর হাসিতে বেকুব হয়ে যাব আমরা দুজন। একটা কাজ করা যাক, ডানদিকে এগুলেই একটা ঝিল আছে। আমাদের ফেরার পথেই পড়ছে। আসার সময় দেখে এসেছি, আলো-আঁধারিতে হাঁটাহাঁটি করছে কিছু বক। দুধের স্বাদ এখন ঘোলে মেটাই। সেটাই ভালো। যে কটা পারি বক শিকার করে নিয়ে যাওয়া যাক।

হঠাৎ যেন ভূত দেখার মতো আমি অবাক হয়ে যাই। আমাকে থামতে দেখে, চমকাতে দেখে ফয়জ ভাইও থামলেন। আমি ইশারায় তাকে নিঃশব্দ থাকতে বলি। তারপর আঙুল দিয়ে দেখাই বামপাশে ঘন ঝোপে বসে আছে একটি বড়সড় পাখি। রংবেরঙের লেজের অংশ দেখা যাচ্ছে। মুখ ও শরীরের বেশিরভাগ ঝোপের পাতার আড়ালে। ওই যে বলা হয়, ‘ল্যাজ দিয়ে যায় চেনা’। বুঝতে দেরি হলো না বনমোরগ মশায় চুপচাপ বসে আছে। তড়িৎগতিতে ফয়েজ ভাই ইশারায় আমাকে নিচু হয়ে বসে পড়তে বললেন। মাত্র সাত আট ফুট দূরে আমাদের কাক্সিক্ষত শিকার। আমরা দুজনেই উত্তেজিত। আমি ভাবলাম হাতের সামনেই তো মোরগরটা। ঝাপটে ধরি না কেন? কী দরকার গুলি করার? ফয়েজ ভাই আরও চার ফুট পিছিয়ে বন্দুক তাক করলেন। হঠাৎ কী হলো! ঝটপট পাখা ঝাপ্টনোর আওয়াজসহ কক কক শব্দ করে বনমোগরটি ওপর দিকে উড়াল দিল। গুড়–ম করে ফয়েজ ভাইয়ের বন্দুকের গুলিও বেরিয়ে গেল। কোনটা যে আগে হলো- বনমোরগের উড়াল দেওয়া আর ফয়েজ ভাইয়ের গুলি, বুঝতেই পারলাম না। আসলে দুটোই একসঙ্গে ঘটেছে। আরও দুটি মোরগ কিংবা মুরগি একইভাবে ঝোপের ভেতর থেকে আকাশে দ্রুত উড়াল দিল। বনমোরগ অন্যান্য পাখির মতোই উড়তে পারে তা জানা ছিল না। উড়াল দিয়ে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটা দেখতে চমৎকার লাগল। ফয়েজ ভাইকে বুঝতে না দিয়ে আমি মনে মনে চাইছি- পাখিদের যেন ক্ষতি না হয়। জঙ্গলে শিকার করা বিষয়ে বই-পুস্তক পড়ে এবং শিকারিদের কাছে গল্প শুনে যতই রোমাঞ্চিত হই না কেন আজ বাস্তবে শিকার করতে এসে আমার চিন্তায় পরিবর্তন হচ্ছে উপলব্ধি করি। বনের এই সুন্দর প্রাণীগুলো না খেলেই কি নয়? শিকার করে পশুপাখি খাওয়া যে নিষ্ঠুর কাজ। খেলাচ্ছলে আনন্দ। বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে, এই প্রবাদবাক্যটির গূঢ় অর্থ ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করি।

ফয়েজ ভাই বললেন,

-মোরগটির গায়ে গুলি লেগেছে, আমি নিশ্চিত। গুলি করার মুহ‚র্তেই সে উড়াল দিয়েছে। আর উড়ে গিয়ে পাশের ঝোপে সে ‘ঝপাৎ’ শব্দ করে পড়েছে। তাতে বোঝা যায় বনমোরগটি আহত হয়েছে। চলো খুঁজে দেখি।

ছয়-সাত মিনিট ধরে দুজনে অনেক খুঁজলাম। যে ঝোপ থেকে ঝপাৎ শব্দ কানে এসেছে সেখানেও তন্নতন্ন করে খুঁজে কোনো হদিস মিলল না। পাখা ঝাপটানো বা কক কক শব্দ কানে এল না। তবে আমি একটা সুন্দর লম্বা পালক পেলাম। গাঢ় নীল রং ও সাদারঙের একটু ছোঁয়া আছে। সুন্দর পালকটি হাতে নিয়ে ফয়েজ ভাই বললেন,

-এটা বনমোরগের লেজের লম্বা পালক। এটা অন্য কোনো বনমোরগের পালক নয়। আমি যেটাকে গুলি করেছি, সেটারই পালক, দেখো, কেমন ঝকঝকে, কোনো ধুলাবালি নেই। পালকটি খুব যতœ করে ছবি আঁকার রং-তুলির ব্যাগে রেখে দিলাম।

সেদিন আমরা জলার ধার থেকে চারটে বক শিকার করে আমাদের আস্তানা ফয়জুর রহমানের কুটিরে ফিরে এলাম।

হরিণরা পালিয়ে গেল

মাত্র তিনদিন আগের শিকারের গল্প মনে করতে করতে অনেকক্ষণ হেঁটে কালিঘাট চা-বাগানের দক্ষিণের সীমানায় চলে এলাম। সামনে ঢালু একটি টিলা পার হয়েই দেখি- বড় বড় গাছগাছালির এক ঘন অরণ্য। এলাকাটা খুবই নির্জন। একটা পায়ে হাঁটা সরুপথ বনের ভেতরে চলে গেছে। মানুষজন যে এ বনে যাতায়াত করে তা বোঝা গেল। ঢুকব কি না ভাবছি। কিন্তু এতদূর এলাম এই বনের টানেই তো। কিছুদূর এগুতেই কয়েকজন মানুষের কথাবার্তার আওয়াজ কানে এল। কান খাড়া করে ভালো করে শোনার চেষ্টা করলাম কোনদিক থেকে শব্দ আসছে! বামদিকের ঘন গাছপালার ভেতর থেকে প্রায় লাফিয়ে পায়ে হাঁটা পথে এসে দাঁড়াল তিনজন। এরা হয় চা-বাগানের শ্রমিক বা কাঠুরে। তিনজনের মাথায় রান্নাবান্নার জন্য কাঠের বোঝা। একজনের হাতে একটা বোতল। বোতল থেকে যে চোলাই মদ খাচ্ছে তা তার হাবভাব ও অঙ্গভঙ্গিতে বোঝা যাচ্ছে। আরেকজনের হাতে ঝুলছে দুটি জবাই করা বনমোরগ। বোতল হাতে শ্রমিকটি অদ্ভুত একটা শব্দ করে ঢেঁকুর তুলে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। বলল,

-তুই এখানে কেন?

আরেকজন বলল,

-এই জঙ্গলে ছবি খাড়িবি নারে, চলে যা। এখানে শিয়াল কামড়ি দিবে। বড় অজগর সাপ কামড়ি দিবে। পা গিলে খাইবে।

বোতল হাতে শ্রমিক দু-পাটি দাঁত দেখিয়ে হেসে বলল,

-একটা রুপি দে বাবু। আমার খুব দরকার আছে।

এক রুপি তখন অনেক টাকা। এখনকার দুশ টাকার মতো। আমি একটু সরে গিয়ে বললাম,

-রুপি নাইরে। কোনো পয়সা নাই আমার পকেটে।

-ঠিক আছে রুপি না দিবে তো আট আনি পয়সা দে।

-তাও নাই।

-চার আনি তো দিবি। দে না বাবু তুই তো ভালো বাবুরে।

অন্য দুজন ওর ওপর বিরক্ত হয়ে ওকে তাড়া দিল,

-এই চল বাবুর পথ ছেড়ে দে।

কিন্তু ও নাছোড়বান্দা। মাতাল হয়ে আছে। পথ ছাড়ছে না। আমি পকেট থেকে এক আনা (তখনকার ১ টাকার ১৬ ভাগের ১ ভাগ) বের করে দিতেই মুখটা ব্যাজার করে বলল,

-এক আনি দিয়ে কী মুরলি খাবি?

-হ্যাঁ এক আনি নিয়ে অনেক মুরলি পাবি। তিনজনে পেট ভরে খেতে পারবি।

ওর দুই বন্ধু এক আনাটা খাবলে নিতে চাইলে ও তড়িৎগতিতে মুঠিটা বন্ধ করে দে দৌড়। খানিকটা গিয়ে পেছনে ফিরে আমাকে বলল,

-বাবু মুরলিই খাবি, মা-কালীর দিব্যি। অন্য কিছু খাবি না। তবে বাবু, সামনের জঙ্গলে যাবি না। জঙ্গলটা ভালো না। ডানদিকে চলে যা। ছড়া পাবি, পানি পাবি।

পানির কথা শুনে তেষ্টাটা বেড়ে গেল। ব্যাগে যে এক বোতল পানি ছিল তা অনেক আগেই শেষ। ডানদিকেই হাঁটা পথ। রাস্তা বলে কিছু নেই। এগুতে থাকি পথ ধরে। পাঁচ মিনিট পরই ছড়া পেয়ে যাই। রঙের ঝোলা আর ছবির বোর্ড ইজেল রেখে ছড়ায় নেমে পড়ি। টলটলে পরিষ্কার পানি। ঠাণ্ডা পানি। হাঁটুর নিচে পর্যন্ত পানি, গভীর নয়। স্বচ্ছ জলের নিচে ছোট ছোট নুড়ি পাথর, দু-একটা শামুক খুব সুন্দর লাগছে। তিড়িংবিড়িং করে দ্রুত ছুটছে কিছু মাছ। আজলা ভরে পানি পান করলাম। অনেকক্ষণ ধরে হাঁটার ক্লান্তি খানিক জুড়াল।

ছড়ার অপর পাড় ঢালু থেকে ধীরে ধীরে উঁচু হয়ে ওপর দিকে উঠে গেছে। এটা একটা টিলা। ছবি আঁকার বোর্ড ইজেল নিয়ে উঁচু পাড়ে উঠে এলাম। কিছুটা সমতল জায়গায় বেশ বড় বড় গাছ। বন হলেও আগের ঘন বনের মতো অন্ধকার নয়। আরে! দুটো ছোট জীব পাতার আড়ালে নড়ছে। পেছনের চারটে পা দেখা যাচ্ছে। এগিয়ে গিয়ে দেখি দুটি ছোট হরিণ, তবে সাধারণ হরিণের মতো বাদামি রঙের নয়। চিত্রল হরিণ তো নয়ই। ছাই-সাদা ও পিঠের দিকে একটু কালচে রঙের আভা। ঝোপের পাশ থেকে হুটহাট ও খটখট আওয়াজ তুলে বেরিয়ে এল বড় ধরনের আরও দুটি জন্তু। এ ধরনের পশুর ছবি ‘জানবার কথা’ বইতে দেখেছি। জলজ্যান্ত চারটি প্রাণী একেবারে চোখের সামনে দেখে আমি মুগ্ধ ও বিস্মিত। বড় দুটি বাবা-মা ও ছোট দুটি তাদের সন্তান। এরা হরিণের আরেকটি প্রজাতি ‘সম্বর’। সাধারণ হরিণের তুলনায় এরা আকারে বড় ও উঁচু। অনেকটা গরুর কাছাকাছি। শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজারে চা-বাগান ও আশপাশের বন এদের চারণভূমি। সম্বরের মাংস মানুষের যেমন প্রিয়, বাঘের কাছেও সুস্বাদু। এমন সময় ঝোপের আড়াল থেকে ভেসে এল মানুষের গলা,

-হেই হেই-উদ বিরান যাইট নে।

অদ্ভুত কিছু শব্দ, যার কোনো অর্থ বোঝা গেল না।

সঙ্গে সঙ্গে পালা পালা দে ছুট করে ক্ষিপ্র গতিতে সম্বর হরিণগুলো পালিয়ে গেল। আর দুদ্দাড় করে দৌড়ে এসে সটান আমার মুখোমুখি এক কিশোর। বয়স অনুমান করলাম পনের ষোল বছর হবে। দেহের রং কালো, ধুলোবালি মাখা। শরীরে কাপড় বলতে কোমরের নিচে এক চিলতে কাপড় বা নেংটি। কাঁধে তীর-ধনুক। চোখ কুঁচকে তির্যক চাহনিতে আমাকে প্রশ্ন ছুড়ে দিল,

-তুই এখানে? একা এই জঙ্গলে? তোর বন্ধুরা কই?

আমরা তো শিকারির জাত রে

এভাবেই কটিকের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল কালিঘাটের বনে। এই গল্পের শুরুতেই বলেছি কটিকের সঙ্গে পরিচয়ের কথা।

কটিককে জিগ্যেস করলাম,

-সম্বর হরিণগুলো তো আমাকে দেখে ভয় পায়নি। তুমি দূর থেকে কী রকম শব্দ করে কী বললে যে ওরা ছুটে পালাল?

-ওরা বনের জীব। আর আমি তো সারা দিন বনেই ঘুরে বেড়াই। বনের পশুপাখিরা আমার বন্ধু আছে। আমি ওদের সাবধান করি। আমি তোকে আগে দেখিনি। চিনতে পারিনি। তাই ওদের পালাতে বলিছি। চা-বাগানের বাবুরা আর তাদের বন্ধুরা যারা চা-বাগানে বেড়াতে আসে, তারা অনেকেই লুকিয়ে শিকার করতে আসে। যদিও আইন আছে বনের পশুপাখি মারা নিষেধ। বাবুরাও আইন মানে না, তারা পশু শিকার করে সব নিয়েও যায় না, একটা-দুইটা নিয়ে যায়। বাকিগুলোর ছাল লিয়ে যায়।

কটিকের কথা শুনে আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকাই। আদিবাসী নাকি চা-শ্রমিক এই কিশোর বড়দের মতো ও একজন সচেতন সমাজকর্মীর মতো কথা বলছে!

-তোর এই তীর-ধনুক দিয়ে কী করিস? তুইও তো শিকার করিস কটিক?

কটিক হেসে ওঠে। মুক্তোর মতো সাদা দাঁতগুলোসহ ওর হাসিমুখটা খুব সুন্দর দেখাল। খুব সহজ সরল হাসি। কটিক বলে, হ্যাঁ! ঠিক ধরেছিস বাবু। আমার এই তীর-ধনুক দেখলে সবাই বলিবে আমি শিকারি। আমরা তো শিকারির জাত রে বাবু। আমরা সাঁওতাল। আমাদের বাবা-দাদারা হরিণ-খরগোশ, সম্বর, সাপ, ব্যাঙ, ইঁদুর, বনগাই, নীলগাই, শূকর ও নানারকম পাখি শিকার করি খেত। চাষবাস তো সাঁওতালরা আগে করত না। কিন্তু এখন অনেক রীতিনীতি পাল্টে গেছে বাবু। এখন আমাদেরও ধান, সবজি ফলাতে হয়। জঙ্গলের পশুপাখি এখন অনেক কমে গেছে। এ ছাড়া সায়েবরা, বাবুরা বন্দুক দিয়ে বড় বড় জানোয়ার মারিছে। বাঘ, ভালুক, গয়াল, বানর, গণ্ডার, নীলগাই, হাতি- এসব এখন অনেক কমে গেছে। সায়েবরা বাবুরা তো বড়লোক। ওরা মজা করার জন্য বনে আসে আর জানোয়ার মারে। শিকার করা ওদের কাছে মজার খেলা। আটটা-নয়টা জানোয়ার মারলে দু-তিনটে খাওয়ার জন্য নিয়ে যায়। বাকিগুলো বনে ফেলি যায়। কুলি কামিনরা তো গরিব। ওরা বাকিগুলো বস্তিতে নিয়ে মজা করি খায়। আমি এসব মাংস খাই না রে বাবু। আমার এই জানোয়ারের মাংস খাইতে ভালো লাগে না।

-কিন্তু কটিক, আমি যেটা জানতে চাইছি তার জবাব তুই এখনও দিস নাই। শিকার যদি নাই করিস তাহলে এই তীর-ধনুক দিয়ে করিস কী?

-এই দেখ্ বাবু, ভুলেই গেছি। এই তীর-ধনুক দিয়ে আমি জানোয়ারদের পাখিদের বাঁচিয়ে দেই।

-কীভাবে?

-বল্চি রে বাবু। এই জঙ্গলটায় ঢোকার জন্য সায়েবরা চওড়া রাস্তা করিছে, সেইখানে একটা অনেক বড় ঝিল আছে। ঝিলে আছে ছোট-বড় অনেক মাছ। মাছ খাওয়ার লাগি সেই ঝিলে অনেক পাখি আসে। শীতকালে যে হাজার হাজার পাখি কোথা থিকে আসে। ওরা তিন-চার মাস থাকে আবার উড়ে উড়ে দলবেঁধে কোথায় যে চলি যায়! এই পাখিদের শিকার করার জন্য চা-বাগানের ইংলিশ সায়েবরা, বাবুরা গাড়ি করে আসে। শুধু পাখিই মারে না, তারা খরগোশ, সম্বর, হরিণ, জঙ্গলের সব পশুই শিকার করে। আগে বলেছি না সায়েবরা সব খায় না। বনের পশু মেরে ওরা মজা করে। খেলা করে। এই তীর ছুড়ে সায়েবদের গাড়ির চাকা ফুটো করে দেই। ঝোপের ভেতরে চুপ করি বসে থাকি। বন্দুক দেখলে বুঝে ফেলি সায়েবরা শিকার করবে।

আমি অবাক হয়ে এই সাংঘাতিক সাঁওতাল ছেলের গল্প শুনি। সহজ ও স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই নিজের কীর্তিকাণ্ড প্রকাশ করতে পেরে সে যে খুব মজা পাচ্ছে তা ওর বলার ভঙ্গিতেই আমি বুঝতে পারি।

-তুই কয়বার এভাবে সাহেবদের বাধা দিতে পেরেছিলি?

-তিনবার। আর অনেকবার শব্দ করি, তাড়া করি পশুপাখিদের সাবধানি করে দিয়েছি।

-তোকে ধরতে পারেনি? তোকে শাস্তি দেয়নি?

-ধরা পড়েছি, চারবারের বার। খুব মাইর দিয়েছে। আমার তিনটা বন্ধুরেসহ ধরিছে। ওদের কম মারিছে। আমার তীর-ধনুক ভেঙে ফেলে দিয়েছে। আমার খুব জখম হয়েছি, হাত-পা-গায়ে কেটে রক্ত ঝরিছে। তারপর আমাকে আর বন্ধুদের থানায় দিয়েছে। পুলিশরাও আমাদের মারিছে। সে অনেক কথা অনেক কাণ্ড রে বাবু। তুই এই জঙ্গলে বইসে কত শুনবি? তুই কেন এই জঙ্গলে এলি রে? তোর বন্ধুরা আজ কই? এখানে ছবি খাড়তে এলি?

গল্প থামিয়ে একনাগাড়ে অনেকগুলো প্রশ্ন করে যায় কটিক। ওর গল্প শুনতে বেশ লাগছিল। খেয়াল করিনি যে বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে। সূর্য মধ্যগগন থেকে পশ্চিমে ঢলে পড়েছে। এবার ক্ষিধেটা টের পাই। প্রচণ্ড ক্ষুধায় পেট মোচড় দিচ্ছে। কিন্তু এই বনজঙ্গলে খাবার পাব কোথায়! ফলফলারির বাগান নয়। সেগুন, মেহগনি, গর্জনসহ ছোট ছোট জংলি গাছের বন। ঘন বেত জঙ্গল। মাঝেমধ্যে জংলি কলাগাছে পাকা কলা পাওয়া যায়। কিন্তু আজ জংলি কলার ঝোপ চোখে পড়েনি। মাঝেমধ্যে আমলকী ও হরীতকী গাছ আছে। তার নিচে আমলকী ও হরীতকী ঝরে পড়ে। কিন্তু হরিণের দল অতি দ্রুত তা সাবাড় করে দেয়। কালিঘাটে ফিরে যেতে দুঘণ্টার বেশি লেগে যাবে। বিকেল হয়ে যাবে। কটিকের সঙ্গে গল্প করতে গিয়েই দেরি হয়ে গেল। কিন্তু কটিকের মজার গল্পের কাছে ক্ষুধা কিছুই না। সেই মুহ‚র্তে মনে হলো ওর গল্প আরও শুনতে হবে। আমার কৌত‚হল বেড়েই চলেছে।

কটিক যে বুদ্ধিমান ছেলে তা এতক্ষণে বুঝে ফেলেছি। সাহায্য করলে সে-ই করতে পারবে। তাই কোনো ফল হবে কি না জানার জন্য কটিককে জিগ্যেস করি,

-কটিক, এখানে ধারেকাছে কোনো চায়ের দোকান আছে?

আমার প্রশ্ন শুনে কটিক হেসে ফেলল। ওর হাসি দেখে আমি বোকা বনে গেলাম। হাসতে হাসতেই সে বলল,

-চায়ের দোকান? না রে বাবু, জঙ্গলে চা খেতে কে আসবে? এখানে ধারেকাছে বেশি মানুষ থাকে না। কুলিদের বস্তি চা কারখানার কাছে। তবে কয়েকটা ঘরবাড়ি আছে, এই কাছেই। জঙ্গল থেকে ডাইনে।

একটু থেমে কটিক আমাকে নিরিখ করে বলল,

-তোরা তো দুপুরে ভাত খাও। তোর মুখ দেখে মনে হয় দুপুরে কিছু খাও নাই। আমাদের ঘরে এখন ভাত নাই। মা, দুই বইন, জ্যেঠু, জেঠিমা, কাকা সবাই এখন কাজকর্মে আছে। বড়রা কেউ বাড়িতে নাই, সবাই ফিরবে বিকালের পর। আমরা সকালে খাই, আবার সাঁঝবেলায়। দুপুরবেলা ভাত রান্না হয় না। তুই আমার সঙ্গে চল, এই কাছেই আমাদের বাড়ি। ঘরে মুড়ি আছে। জেঠুর ঘরে গুড়, মুরলি কিছু পাইলে খাবি।

প্রচণ্ড ক্ষুধার মধ্যে সবই অমৃত। গুড়-মুরলি না পেলেও শুধু মুড়ি হলেই চলবে। দেরি না করে কটিককে নিজেই তাড়া দেই,

-চল কটিক, তোদের বাড়িটা দেখি। জ্যেঠুর কথা বললি। মা, কাকা ও বোনের কথা বললি, কিন্তু তোর বাবা কোথায়?

-বাবা, মরে গেছে। না মরে যায়নি, মেরে ফেলিছে। ওরা আমার বাবাকে মারিছে।

কটিকের মুখটা গম্ভীর হয়ে যায়। একটু থেমে আবার বলতে থাকে,

-বাবার কথা বলতি গেলে অনেক কথা রে বাবু, অনেক সময়ও লাগবে। আমাদের ঘরে চল। সেখানে বলিবে।

হাঁটতে থাকি কটিকের সঙ্গে। পুরো বনটি একটি টিলার ওপরে। আমরা দুজন এখন নামতে থাকি। কিছুক্ষণের মধ্যেই বন ফাঁকা হতে শুরু করে। গাছগাছালি একটু কম। আর গাছগাছালির ফাঁক দিয়েই সামনে দেখি বিস্তৃত ধান ক্ষেত।

ধান ক্ষেতে নামার আগেই একটি বড়সড় বেত ঝোপের পাশ দিয়ে যেতে হয়। ঘন সবুজ লতানো বেতগাছ। বেশ বড় বড় সব বেতগাছ। কাঁটাযুক্ত চিরল বিরল পাতা। ঝোপের ভেতরটা ঘন ছায়া, কোথাও ছায়া অন্ধকার। এই ঘনছায়া অন্ধকারে নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়ায় ডাহুক ও বনমোরগ। টুকটুক ও কক্ কক্ মৃদু শব্দ তুলে ডাহুক ও বনমোরগ বেতঝোপে ঘুরে বেড়ায়। বনমোরগ ও ডাহুকদের ধরার জন্য আশপাশে ঘুরে বেড়ায় বাঘডাশা, শেয়াল, বনবেড়াল, খাটাশ ও দিগল্যাঞ্জি। শিকার বেতঝোপের এত কাছে চোখের সামনেই ঘুরে বেড়াচ্ছে, তা দেখে লোভ সামলাতে না পেরে শেয়াল ও বাঘডাশা যেই ডাহুক বা বনমোরগের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তারপর হয়ে যায় লেজে গোবরে অবস্থা। বেতের সরু কাঁটালতায় পেঁচিয়ে, টানাহেঁচড়ায় শরীরের সর্বত্র এমনকি নাকে-মুখে শক্ত কাঁটা বিঁধে রক্তারক্তি অবস্থা। ততক্ষণে ডাহুক, বনমোরগ পগারপার। তাই বেতঝোপে পাখি ও ছোট ছোট প্রাণী অনেক নিরাপদ। এমনকি মানুষ নামের শিকারিরাও বেতঝোপের ভেতর গুলি করে না। কারণ সেই কাঁটালতা। শিকার করা পাখি বেতঝোপ থেকে খুঁজে আনা সম্ভব নয়। বেতঝোপের ভেতর শেয়াল বাগডাশারা ঢুকতে না পারলেও আশপাশের ঝোপে ওঁৎ পেতে চুপচাপ বসে থাকে। খাবার খুঁজতে খুঁজতে যেই মাত্র বেতঝোপের বাইরে আসে পাখিরা, ওঁৎ পেতে থাকা পশুরা সেই সুযোগে ওদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আমাদের চোখেও পড়ল কয়েকটি ডাহুক। বেতঝোপে ছোটাছুটি করছে। হঠাৎ দেখি দুটি শেয়াল প্রায় আমাদের পথের ধারেই। কিছুক্ষণ আমাদের দিকে তাকিয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও একটু দূরে সরে গেল।

থলির মধ্যে আরও তিনটা ইন্দুর

কার্তিক মাসের মাঝামাঝি এখন। হেমন্ত ঋতু। ধানে পাক ধরেছে। এখনও ধানমাঠে সবুজের আভা আছে। দিন পনেরর মধ্যেই হলুদাভ পাকা ধানের রঙে মাঠ ছেয়ে যাবে। দলবেঁধে চাষিরা ধান কাটতে নামবে। দু-একটি ক্ষেতে আগাম ধান পেকেছে। চাষিরা কয়েকজন সেই ধান কাটছে। এই ধানকে বলা হয় কার্তিকের ধান। কালিঘাট চা-বাগান ও বনজঙ্গলের মাঝখানে এমন বিস্তীর্ণ ধান ক্ষেত দেখতে পাব তা গত কয়েকদিনে বুঝতেই পারিনি। এটি একটি উপত্যকার মতো। চারদিকে উঁচু পাহাড় না থাকলেও ঢালু চা-বাগানের টিলা ও বনজঙ্গলে ভর্তি উঁচু-নিচু টিলা রয়েছে। এই উপত্যকার নামই কি তাহলে ‘বালিশিরা ভেলি’ বা বালিশিরা উপত্যকা!

ধান ক্ষেতের মাঝ দিয়ে যে আলপথ, তা ধরে আমরা দুজন হেঁটে চলছি। কটিক একনাগাড়ে টুকটাক গল্প করে চলেছে। ওর গল্প শুনতে আমার ভালোই লাগছে। হঠাৎ কটিক আলের পাশে কী দেখে যেন থেমে গেল। তীর-ধনুক আর ওর ছোট চটের থলেটি মাটিতে রেখে সামনের দিকে দৌড়ে গেল। ধান ক্ষেতে ঢুকে পড়ে উপুড় হয়ে কী যেন খুঁজে খুঁজে ত্রস্তে এগুচ্ছে। হাতের দুই ফুট লম্বা লাঠিটা দিয়ে পিটাচ্ছে আবার খোঁচাচ্ছে। আমি দাঁড়িয়ে ওর কাণ্ড দেখছি। সাপ না ব্যাঙ কিছু একটার পেছনে লেগেছে। একটু পরে দেখি বাঁহাতে ঝুলন্ত একটি বেজির মতো মনে হলো। কটিকের মুখে জয়ের হাসি। কাছে আসার পর দেখি, না বেজি নয়। মোটাসোটা বড় আকারের এক ইঁদুর।

-বাবু,

-আজিকে আমার কপালি ভালো, থলির মধ্যে আছে তিনটা ইঁদুর। এইটা খুব মোটা, অনেক মাংস হবি। আজ চারটা ইঁদুর পাইয়েছি। জ্যেঠুমশাই খুব পছন্দ করে ইঁদুরের মাংস। চল্ বাবু, তাড়াতাড়ি যাই। বাড়ি গিয়ে তোকে মুড়ি দিব। তুই খাবি। আমি ইঁদুরগুলো কেটে লবণ দিয়ে সিদ্ধ করে রাখব। মা, জেঠিমা ফিরবে চা-পাতা জমা দিয়ে বিকালে। বাবু, তোর কি ঘেন্না লাগছে? সাঁওতালরা ইঁদুর খাই বলে বাগানের সায়েবরা, বাঙালি বাবুরা আমাদের ঘেন্না করে।

-আমি জানি সাঁওতালরা ইঁদুর, সাপ, ব্যাঙ, খাটাশ, খরগোশ, গুঁইসাপ এসব শিকার করে খায়।

বনজঙ্গলে বাস করা আদিবাসীরা জঙ্গলে শিকার করেই খাবার সংগ্রহ করত। এখন জীবজন্তু অনেক কমে গেছে। তাই আদিবাসীরা এমনকি যারা গভীর জঙ্গলে বাস করে তারাও এখন চাষবাস করছে, কৃষিকাজ করছে, কেউ-বা নানারকম পেশায় যোগ দিচ্ছে। বনবাদাড়ের জীবজন্তু শিকার করার আর প্রাকৃতিকভাবে হওয়া ফলফলাদির ওওপর নির্ভর করতে পারছে না।

-বাবু, তু বললে না তো আমরা ইঁদুর খাই, তুই আমার হাতে মুড়ি খাবি তো? ঘেন্না করবি না?

-তুই কিছু ভাবিস না কটিক। তুই দিয়ে দেখ আমি কী মজা করে খাই।

কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা আরেকটা টিলার কাছে চলে এলাম। নিচ থেকে টিলার ওপর উঠে দেখি ছোট-বড় গাছগাছালির ফাঁকে কয়েকটি বসতবাড়ি। ঘরগুলো মাটির, ঘরের চালে ছন ও শুকনো কাশ দিয়ে ছাওয়া। কিছু ঘরের চাল সেগুন গাছের বড় বড় পাতা দিয়ে বানিয়েছে। দুটো ঘরের চালে দেখলাম মরচে ধরা পুরোনো টিন।

-ওই যে সামনের ডানের ঘরটা আমাদের। মাঝখানে উঠান। উঠানের চারদিকেই জ্যেঠু, কাকু তাদের ঘর।

কটিকদের বাড়িঘরের অবস্থা দেখে মনে হলো এরা অভাবী হলেও খানিকটা পরিচ্ছন্ন। ঘরের আশপাশে ময়লা-আবর্জনা নেই। নিকানো উঠোন। মাটির তৈরি ঘরের দেয়াল সুন্দরভাবে লেপে দেওয়া। দেয়ালে নানারকম ছবি এঁকেছে ও নকশা করেছে। রং তৈরি করেছে লাল মাটি গুলিয়ে হলুদ মিশিয়ে ও পুঁইশাকের বেগুনি ফল বেটে। আরও নানাভাবে সাঁওতালরা নিজেরাই রং বানিয়ে নেয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাঁওতাল পল্লীতে ঠিক এই ধরনের বাড়ি দেখেছি।

ওদের ঘরের এক চিলতে বারান্দায় একটি পিঁড়িতে আমাকে বসতে বলল কটিক। নিজে ঘরের ভেতরে ঢুকে গেল। ওর গমন পথের দরজা দিয়ে দেখি প্রায় রাতের মতো অন্ধকার ঘরে। কারণ এসব মাটির ঘরে দরজা-জানালা খুব ছোট হয়। দু-একটি ছাড়া বেশি দরজা-জানালা সাধারণত থাকে না। বাড়িতে দিনেরবেলা বড়রা যে থাকে না, সেটা কটিকের কাছ থেকে আগেই শুনেছি। কটিকের মা, জেঠিমা, কাকি ও বোনেরা বাগানে চা-পাতা তোলে। জ্যেঠার বয়স হয়েছে অনেক, তবুও চা-বাগানে নিত্যদিন নানারকম টুকটাক কাজ করে। চা-গাছের যতœ নেওয়া, বাগানের আগাছা পরিষ্কার করা ইত্যাদি। কটিকের কাকা, কাকার ও জ্যেঠুর ছেলেরা ক্ষেতে চাষের কাজ করে। নিজেদের সামান্য জমিতে ও অন্যের জমিতে বর্গা নিয়ে। মাঝেমধ্যে চা-পাতা তোলার মৌসুমে চা-বাগানেও কাজ করতে যায়।

কটিক আমাকে তাদের ঘরের দাওয়ায় বসিয়ে ঘরের ভেতরে চলে যাবার সময় জেবি, ছবি, দুরন, মাগন, এমনি কিছু কথা উচ্চারণ করে মনে হলো কাউকে ডাকল। তারপরই কয়েকটি ছোট ছেলেমেয়ে হৈহৈ রৈরৈ করে দৌড়ে এসে আমার চারদিকে দাঁড়াল। কারও চোখে কৌত‚হল, কেউ কেউ মুচকি হাসছে। কেউ-বা একটু সাহস করে আমার ছবি আঁকার বোর্ডের কাগজগুলো একটু উল্টে অনুমতির জন্য জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। আমি আমার আঁকা দুটো ছবি খুলে ওদের দেখালাম। শিশুরা আমার আঁকা ছবি দেখে অবাক, এত বড় ছবি ওরা কোনোদিন দেখেনি। ওদের বিস্ময়, চোখেমুখে অপার কৌত‚হল, দেখেই তা বুঝা গেল। ছবি আঁকার বোর্ডে জলরঙে আঁকা ছবি দুটো ক্লিপ দিয়ে আটকে ঘরের দেয়ালে ঠেস দিয়ে ওদের ভালো করে দেখার সুযোগ করে দিলাম। আজ ভোরবেলায় আঁকা একটি ছবির কথা আগেই উল্লেখ করেছি- চা-বাগানের কুলি-মজুরদের বালিশিরায় হাঁটুপানি দিয়ে হেঁটে নদী পার হওয়া আর আশপাশের দৃশ্য। দ্বিতীয় ছবিটি- কয়েকজন চা-শ্রমিক মাথায় খালি ঝাঁকা, দলবেঁধে চা-বাগানে যাচ্ছে চা-পাতা তুলতে। শিশুরা ছবি দুটোর সামনে, কেউ বসে, কেউ দুহাতে থুঁতনি রেখে উপুড় হয়ে নিরিখ করে ছবি দুটো দেখছে আর টুকটাক ওদের ভাষায় মন্তব্য ও গল্প করছে। এমন সময় কটিকের গলা শোনা গেল। মনে হলো কাউকে ডাকছে। দু-তিনটি শিশু দৌড়ে চলে গেল। একটু পরেই দেখি চৌদ্দ বছরের একটি মেয়ে হাতে সান্কি তাতে খাবার। আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে সান্কিটা আমার হাতে এগিয়ে দিল। সান্কিতে মুড়ি ও তার ওপর কয়েকটি মুরলির ভাঙা টুকরো।

অনেকক্ষণ ধরে চেপে রাখা ক্ষিধেটা খাবার দেখে পেটে মোচড় মেরে চাগিয়ে উঠল। মুড়ি আর মুরলির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। গোগ্রাসে মুড়ি চিবুতে লাগলাম। আমার মুড়ি খাওয়ার হুড়োহুড়ি ও আকুতি দেখে সাঁওতাল শিশুরাও অবাক। কিছুক্ষণ ভ্রæ কুঁচকে আমার মতো বাবুর হামলে পড়া খাওয়ার দৃশ্য দেখল, তারপর মজা পেয়ে হাসতে লাগল। বাবুদেরও ক্ষিধে পেলে কোনো কিছু খেয়াল থাকে না। সেদিন কালিঘাটের বনে প্রচণ্ড ক্ষুধার মধ্যে কটিকের দেওয়া মুড়ি ও মুরলির স্বাদ- আজ ছাপ্পান্ন বছর পরও ভুলিনি। আর অমন স্বাদ করে খাওয়ার স্মৃতিও খুব বেশি নেই। খাওয়া শেষ করে মাটির বাটিতে রাখা ঠাণ্ডা পানিটুকু পান করে বেশ ভালো লাগল। আমার তৃপ্তির ভাব দেখে সাঁওতাল ছেলেমেয়েগুলোও বেশ খুশি খুশি ভাব নিয়ে হাসি ও গল্প করতে লাগল। কিশোরী মেয়েটি, যে সান্কিতে খাবার এনেছিল, সে একটু ঝুঁকে আমার কাছে জানতে চাইল,

-আরও মুড়ি আনবে বাবু? তোর ক্ষিধা মিটে নাই?

-না না আমার খাওয়া হয়ে গেছে। খুব ভালো খেয়েছি। তুই খুব ভালো।

এতক্ষণ মেয়েটির দিকে খেয়াল করিনি। একটু রোগা হলেও মুখটি সুন্দর, হাসিটা আরও সুন্দর। হাসলে গালে টোল পড়ে। মুক্তোর মতো সাদা দাঁত দেখতেও ভালো। গলায় রংবেরঙের পুঁতির মালা। কয়েকটা পয়সাও আছে। নাকে একটা নোলক ঝুলছে। গায়ের রং স্বাভাবিক কালো। পরনে এক চিলতে হলুদ ও কালো ডোরা শাড়ি। দূর থেকে দেখলে হঠাৎ মনে হতে পারে একটা ছোটখাটো বাঘ বা বাঘিনী দৌড়ে যাচ্ছে। জিগ্যেস করি,

-তোর নাম কী রে?

একটু হাসল। তারপর এদিক ওদিক তাকাতেই সঙ্গী ছেলেমেয়েরাও হাসল। একসঙ্গে তিন চারজন অদ্ভুত উচ্চারণে কী একটা নাম বলল। বুঝতেই পারলাম না। বললাম, তোরা চুপ থাক। ও নিজেই বলুক।

-লাতুয়া হরতকী।

-লাতুয়া আবার হরতকী। দুটা নাম মনে হচ্ছে?

-একটা ছেলে তড়িঘড়ি বলে উঠল,

-হ্যাঁ রে বাবু। ওর দুই নাম। লাতুয়া ও হরতকী। একবারে ও বলে লাতুয়া হরতকী। আসলে ওর নাম লাতুয়া। ও খুব হরতকী খায় তো। জঙ্গলে গিয়ে হরতকী খুঁজে খুঁজে নিয়ে আসে। নিজে খায়। সবাইকে দেয়। নুন মাখি রইদে শুকায়। ওর কাছে অনেক হরতকী আছে। তাই, লাতুয়াকে হরতকী বলি ডাকে।

সবাই হেসে উঠল একসঙ্গে। লাতুয়াও হাসল। ওদের সঙ্গে গল্প করে আমারও ভালো লাগল। অল্পক্ষণের মধ্যেই সহজ সরল আদিবাসী শিশুদের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব জমে উঠল। লাতুয়াকে জানালাম, লাতুয়া, তু আমার সামনে একটু বসে থাক। বেশি নড়াচড়া করবি না। আমি তোর ছবি আঁকব।

শেয়াল বাঘডাশা মানুষকে কামড়ে দেখে

লাতুয়া ওর মতো চুপচাপ করে আমার সামনে বসে পড়ল। ওর দেখাদেখি আরও ৪-৫টি শিশু ওর দুপাশে বসে পড়ল। আমি আমার বড় স্কেচ খাতা খুলে তুলি ও কালো কালিতে লাতুয়ার ছবি আঁকতে শুরু করে দিলাম। লাতুয়াকে বারবার ইশারা করে, কখনও সরাসরি বলছি- একদম নড়বে না লাতুয়া। নড়লে ছবি আঁকা যায় না।

১৯৫৯ সালে চারুকলা শিক্ষায় দ্বিতীয় বর্ষ মাত্র পার হয়েছি। শ্রেণি শিক্ষায় মানুষ আঁকা শিক্ষা তখনও শুরুই হয়নি। যদিও আমি প্রথম বর্ষ থেকেই মানুষ, জীবজন্তু নিজে নিজেই পেন্সিলে, কলমে এমনকি জলরঙেও আঁকার অভ্যাস বা অনুশীলন করে চলেছি। মানুষের মুখ আঁকতে গেলে তাদের চেহারাটা মেলাতে হয়। চেহারা না মেলাতে পারলে আঁকায় আনন্দ নেই। তাই মানুষ আঁকা শিখতে গিয়ে প্রথম থেকেই আমি খুব সচেতনভাবে চেহারা মেলাবার চেষ্টা ও অভ্যাস করতাম। গত কয়েকদিন চা-বাগানের শ্রমিক মজুরদের বস্তিতে গিয়ে বেশকিছু মানুষ ও তাদের চেহারা আঁকা রপ্ত করেছি। ইতোমধ্যে আঁকার হাত অনেক সহজ হয়ে এসেছে। আড়ষ্টতাও দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। বেশ দ্রুত হাত চালিয়ে লাতুয়ার মুখটা এঁকে ফেললাম। সঙ্গে আরও দুজনের মুখ। শিশুরা ভিড় করে আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আঁকাআঁকি দেখছে। লাতুয়াও উশখুশ করছে- ছবি দেখার জন্য, উঠে পেছনে আসার জন্য। বহু অনুনয় বিনয় করে ওকে কিছুক্ষণ বসিয়ে রাখা গেল। আমার আঁকা মোটামুটি শেষ হয়ে এসেছে। এমন সময় হৈহৈ করে বাড়ির ভেতর থেকে কটিক এসে হাজির। বললে,

-বাবু, এট্টু দেরি হয়ে গেল। ইঁদুরগুলো কেটে ধুয়ে নুন হলদি দিয়ে সিদ্ধ করেছি। মা বিকেলবেলা এসে রাঁধবে। বাবু তুই মুড়ি ভালো করে খেয়েছ, কী করিবে বাবু, আর কিছু নাই রে আমার ঘরে।

-আমি খুব মজা করে খেয়েছি রে কটিক, পেট ভরে গেছে। আমার খাওয়া নিয়া তোর কোনো চিন্তা করতে হবে না।

কটিকও আমার পেছনে এসে ছবি আঁকা দেখতে দেখতে আনন্দে বলে উঠল,

-বাবু কী সুন্দর ছবি খাঁড়লি। আরে! এই যে আমাদের হরতকী, পাশে ওই দুইটা কে রে?

হরতকী বা লাতুয়া আর বসে থাকতে পারল না। উঠে চলে আসল আমার আঁকা ছবি দেখতে। নিজেকে চিনতে পারল কি না জানি না। হাসিহাসি মুখে সবার দিকে তাকাচ্ছে আর বারবার ছবিটা দেখছে।

ভালো একটা ছবি বা ড্রইং করতে পারলে শিল্পীর আনন্দের সীমা থাকে না। আমি কটিককে বললাম,

-কটিক তোমার সঙ্গে জঙ্গলে যেভাবে দেখা হয়েছিল- সেরকম তীর-ধনুক লাঠি ও ঝোলা কাঁধে উঠোনে এই গাছটার পাশে দাঁড়িয়ে থাক। আমি তোমার ছবি খাঁড়ব।

আমার কথা শুনে কটিক খুশি মনে সেইভাবে তীর-ধনুক নিয়ে উঠোনের পাশে দাঁড়ায়। আমি দ্রুত স্কেচ খাতায় কালি ও তুলিতে ওর শিকারি ভঙ্গির দুটি ড্রইং করে ফেলি। ওর পাড়ার শিশুরা হুমড়ি খেয়ে আমার আঁকা দেখে। কটিককে নিষেধ করা সত্ত্বেও কিছুক্ষণ পরপর এসে ছবি দেখে আবার গিয়ে ঠিকঠাক দাঁড়ায়। রীতিমতো অভিজ্ঞ মডেল দেওয়ার মতো।

ছবি আঁকার জন্য মডেল হয়ে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকা বা বসে থাকা, প্রথমে খুব সহজ মনে হলেও আসলে বিষয়টা মোটেই সহজ নয়। কয়েক মিনিট স্থির হয়ে থাকার পর বোঝা যায় বিষয়টি কত কঠিন। যথেষ্ট বিরক্তিকর ও কষ্টের। কটিক যাতে কষ্টটা বুঝতে না পারে সেজন্য আমি ছবি আঁকার ফাঁকে ফাঁকে গল্প করতে থাকি।

ইতোমধ্যে বেলা অনেক গড়িয়েছে। কার্তিকের বিকেলের ছায়া নামছে। রোদের তেজ কমে এসেছে। কালিঘাটে ফেরা দরকার। অনেকক্ষণ পর এবার ঘড়ি দেখি- বিকেল চারটা বেজে গেছে। তাই তো এবার ফিরতে হবে। দুপুরে না ফেরার কারণে বন্ধুরা- ফয়জুর রহমান ও আলতাফুর রহমানসহ অনেকেই এখন ভাবতে শুরু করেছে হয়তো। আজকের মতো সেই সময় মোবাইল ফোন ছিল না। যে দরকার হলেই খবরাখবর পৌঁছে দেব। কটিককে বলল

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj