বিষাদ-সিন্ধু : পাপ অথবা প্রেমের জয়-পরাজয় : আবুল আহসান চৌধুরী

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১১) উনিশ শতকের এক বহুমাত্রিক সব্যসাচী লেখক। মশাররফই সমাজ-প্রগতির মূল স্রোতধারা থেকে বিচ্ছিন্ন বাঙালি মুসলমানের জড়বুদ্ধি, ভাষাগত সংস্কার, দোভাষী পুঁথির রুচি, জাতিগত স্বাতন্ত্র্য-চিন্তার বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে আসা প্রথম সার্থক সাহিত্যশিল্পী কেবল মুসলমান স¤প্রদায়েরই শ্রেষ্ঠ লেখক নন, বাংলা সাহিত্যের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটেই তিনি একজন স্মরণীয় শিল্পস্রষ্টা। তাঁর জীবন ও ব্যক্তিত্বে যুগপৎ ক্ষয়িষ্ণু সামন্তসমাজ ও উন্মেষ-যুগের মধ্যশ্রেণির আচরণ-রুচি-প্রবণতা-বিশ্বাস প্রতিফলিত।

মশাররফ ছিলেন নব্য-উত্থিত মুসলিম মধ্যশ্রেণির প্রধান সাংস্কৃতিক মুখপাত্র। তাঁর জীবন ও সাহিত্য উনিশ শতকের বাঙালি মুসলমানের জীবন-ভাবনা, মনন-মানস ও চিন্তা-চেতনার সঙ্গে দ্ব›দ্ব-সংহতির সূত্রে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাঁর রচনার বিষয়-বৈচিত্র্য, প্রকাশ-নৈপুণ্য, সমাজমনস্কতা, মুক্তমন, অসা¤প্রদায়িক চেতনা ও অকপট স্বীকারোক্তি তাঁকে শিল্পী হিসেবে একটি স্বতন্ত্র মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

দুই.

প্রায় ৬৫ বছরের জীবনকালে, ১৮৬৫ থেকে ১৯১০ সাল পর্যন্ত, মোটের ওপর প্রায় ৪৫ বছর মশাররফের শিল্পসৃষ্টির সময়কাল। এই দীর্ঘসময়ে তাঁর সাহিত্যসাধনার ফসল স্বল্প নয়। এ-পর্যন্ত তাঁর পঁচিশখানা প্রকাশিত বইয়ের সন্ধান পাওয়া গেছে। এ-ছাড়া আছে বেশকিছু অপ্রকাশিত ও অগ্রন্থিত রচনাও।

মশাররফ ছিলেন বিচিত্রধর্মী সৃষ্টিশীল লেখক। বিষয়-বৈচিত্র্যে তাঁর রচনা বিশিষ্টতার দাবি রাখে। সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতেই তাঁর ছিল স্বচ্ছন্দ বিচরণ। উপন্যাস-উপাখ্যান-নকশা, নাটক-প্রহসন, কবিতা-সঙ্গীত-পদ্য, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, জীবনী-আত্মজীবনী, ছাত্রপাঠ্য পুস্তক প্রভৃতি সব মাধ্যমেই তিনি লেখনী চালনা করেছেন। কেবল মুসলমান সমাজেই নয় উনিশ শতকের সমগ্র বাংলা সাহিত্যের প্রেক্ষাপটেই তাঁর মতো সব্যসাচী লেখকের দৃষ্টান্ত বিরল।

মশাররফের শিল্পীমানস পূর্বাপর সরলরৈখিক ছিল না। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা-উপলব্ধি ও সামাজিক-রাজনৈতিক কারণে তা কখনো কখনো বিচলিত ও দ্বিধান্বিত হয়েছে। শিল্পীজীবনের সূচনাকাল থেকে ‘গাজী মিঁয়ার বস্তানী’ (১৮৯৯) রচনার পূর্ব পর্যন্ত তাঁর শিল্প ও সমাজসম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। এই কালপর্বে প্রগতিচিন্তা ও অসা¤প্রদায়িক চেতনা তাঁর মানসতা ও সাহিত্যকর্মকে প্রাণিত করেছে। কিন্তু এরপর তাঁর পূর্ব-বিশ্বাস ও ধারণায় চিড় ধরে। উত্তরকালের সাহিত্যে শিল্পপ্রেরণার পরিবর্তে ধর্মীয় বোধের প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ তাঁর মানসকে আচ্ছন্ন করে। তাই এই নিরিখে মীরের সাহিত্যকর্মকে শিল্পপ্রেরণাজাত ও ধর্মাশ্রিত, প্রবণতার দিক দিয়ে, এই দুইভাবে বিভক্ত করা চলে।

মশাররফের সাহিত্যধারণার জন্ম লৌকিক কাহিনী ও দোভাষী পুঁথির মাধ্যমে। এই গ্রাম্যরুচির সাহিত্যবোধ পরিশীলিত হয় মূলত তারাশঙ্কর তর্করতœ (?-১৮৫৮)-অনূদিত বাণভট্টের ‘কাদম্বরী’ (১৮৫৪) উপাখ্যানের সঙ্গে পরিচয়ের ভেতর দিয়ে। এই প্রসঙ্গে তাঁর সাহিত্যগুরু কাঙাল হরিনাথের (১৮৩৩-১৮৯৬) বিভিন্ন রচনা, বিশেষ করে ‘বিজয়-বসন্তে’র (১৮৫৯) কথাও উল্লেখ করতে হয়। মশাররফের উপাখ্যান রচনার প্রাথমিক প্রেরণা এই তিন সূত্র থেকেই এসেছে বলে অনুমান করা চলে। মশাররফের ‘রতœবতী’র (১৮৬৯) আগে প্যারীচাঁদ মিত্র (১৮১৪-১৮৮৩) কিংবা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-১৮৯৪) কয়েকটি উপন্যাসধর্মী বই প্রকাশিত হলেও, অন্তত প্রথম উপাখ্যান ‘রতœবতী’তে মশাররফ এসব রচনার দ্বারা প্রভাবিত হননি।

মশাররফ মূলত গদ্যশিল্পী। তাঁর গদ্যনির্ভর শিল্পকর্মের মধ্যে উপন্যাস-উপাখ্যান-নকশাজাতীয় রচনা সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য। এই ধারার রচনার মধ্যে একটি ক্রমোত্তরণের আভাস অত্যন্ত স্পষ্ট। এই শিল্প-বিবর্তন কেবল ভাষার ক্ষেত্রেই সীমিত নয়, তা বিষয়োপকরণ ও আঙ্গিক সম্পর্কেও সমান সত্য। তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘রতœবতী’র সঙ্গে উত্তরকালের অগ্রন্থিত রচনা ‘নিয়তি কি অবনতি’র তুলনা করলে এই সিদ্ধান্ত আরো পোক্ত হয়। ‘রতœবতী’তে যেখানে কেবল রূপকথাশ্রিত কাহিনী-পরিবেশনের মাধ্যমে গল্পরস ও নীতি-প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য নিহিত, সে-ক্ষেত্রে ‘নিয়তি কি অবনতি’র কাহিনী বাস্তব-সমস্যার সামাজিক ভূমি থেকে উত্থিত। চিরায়ত প্রণয়-কাহিনী পরিবেশনের জন্যে তিনি পুরাণের সাহায্য গ্রহণ করেন, তার প্রমাণ মেলে ‘হজরত ইউসোফ’ (‘প্রেম-পারিজাত’) কিংবা ‘তহমিনা’য়। পবিত্র কোরআন শরিফ ও প্রচলিত লোকপুরাণ থেকে চয়ন করেন ইউসুফ-জোলেখার প্রণয়-কাহিনী। পারস্য-পুরাণ ‘তহমিনা’র কাহিনীর উৎস। এক ভিন্ন আঙ্গিকে শ্রæতি ও স্মৃতিনির্ভর নীল-চাষ ও বিদ্রোহের কাহিনী বিবৃত হয় ‘উদাসীন পথিকের মনের কথা’য় (১৮৯০)। সমকালীন ইতিহাসের এক শিল্পগাঢ় রূপ এই গ্রন্থ। এর বহিরঙ্গে অত্যাচারী নীলকরের কথা ও কাহিনী, আর অভ্যন্তরে প্রচ্ছন্ন আছে রিপু-শাসিত মানব-মানবীর স্খলন-পতনের দুঃখময় পরিণতি। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে উদ্ভাসিত মীরের অভিনব নকশা ‘গাজী মিঁয়ার বস্তানী’। তীব্র ব্যঙ্গ-কৌতুক-শ্লেষের মধ্য দিয়ে মানবপ্রকৃতির রহস্যঘন স্বরূপ এখানে উন্মোচিত। ইতিহাসের এক মর্মন্তুদ মানবিক ট্র্যাজেডিকে তিনি রূপ দিয়েছেন ‘বিষাদ-সিন্ধু’তে (১৮৮৫-৯১)। সেইসঙ্গে গভীর শৈল্পিক মমতায় উদঘাটিত করেছেন অচরিতার্থ প্রণয়ের বেদনায় জর্জরিত এক অসহায় ও নিয়তি-লাঞ্ছিত মানবের হৃদয়গত উপলব্ধিকে। মূলত ইতিহাসে তিরস্কৃত ও ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে ঘৃণিত এক চরিত্রের প্রেম-তাড়িত বিফল কামনা-বাসনার প্রকৃতি ও পরিণাম চিত্রণই এই উপাখ্যানের মূল লক্ষ্য।

তিন.

‘বিষাদ-সিন্ধু’ বাংলা সাহিত্যের একটি ধ্রæপদি গ্রন্থ। শিল্পবোধ, জীবনানুভূতি ও ভাষাসৌকর্যে ‘বিষাদ-সিন্ধু’ মশাররফ হোসেনের এক স্মরণীয় সাহিত্যকীর্তি। মীরের অসামান্য লোকপ্রিয়তা ও ব্যাপক পরিচিতির মূলেও আছে এই বই। কারবালার মর্মন্তুদ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এই উপাখ্যানের কাহিনী। ‘মহরম পর্ব্ব’, ‘উদ্ধার পর্ব্ব’, ‘এজিদবধ পর্ব্ব’- ‘বিষাদ-সিন্ধু’র এই তিনটি পর্ব স্বতন্ত্রভাবে প্রকাশিত হয় যথাক্রমে ১৮৮৫, ১৮৮৭ ও ১৮৯১ সালে। শেষ পর্ব প্রকাশের পরে একসঙ্গে এর তিন পর্বের অখণ্ড সংস্করণ প্রকাশিত হয়। মশাররফ ‘বিষাদ-সিন্ধু’র প্রথম সংস্করণ ‘মাত’ সম্বোধনে উৎসর্গ করেন টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার এস্টেটের জমিদার করিমন্নেসা খানমকে। অবশ্য মশাররফের সঙ্গে তাঁর ‘অন্নদাত্রী’ করিমন্নেসার সম্পর্কের অবনতির কারণে পরবর্তী সংস্করণে এই উৎসর্গপত্রটি প্রত্যাহার করে নেন। ‘বিষাদ-সিন্ধু’ রচনায় মশাররফ ‘সংবাদ প্রভাকরে’র সহকারী সম্পাদক ভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের (১৮৪২-১৯১৬) বিশেষ সহায়তা পেয়েছিলেন বলে জানা যায়। ভুবনচন্দ্র ‘বিষাদ-সিন্ধু’কে ‘উত্তমরূপে শোধন করিয়া বিশুদ্ধ বঙ্গভাষায় সজ্জিত করেন’। অবশ্য এই তথ্যের যথার্থতা নির্ণয় এখন আর সম্ভব নয়।

চার.

কারবালার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ থেকেই কাব্য-কবিতা রচনার প্রয়াস লক্ষ করা যায়। কারবালা-কাহিনী নিয়ে গড়ে উঠেছে মর্সিয়া সাহিত্যের বিশাল এক ভাণ্ডার। আধুনিককালেও এ-ধারা নিঃশেষিত হয়ে যায়নি। কারবালার ট্র্যাজেডি মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩)-কেও স্পর্শ করেছিল। মহররমের কাহিনী নিয়ে একটি মহৎ মহাকাব্য রচিত হতে পারে বলে তিনি মত পোষণ করেছিলেন।

‘মহরমপর্ব্বে’ লেখকের ‘মুখবন্ধে’ মশাররফ ‘বিষাদ-সিন্ধু’র কাহিনী-উৎস সম্পর্কে জানিয়েছেন : ‘পারস্য ও আরব্য গ্রন্থ হইতে মূল ঘটনার সারাংশ লইয়া ‘বিষাদ-সিন্ধু’ বিরচিত হইল। প্রাচীন কাব্যগ্রন্থের অবিকল অনুবাদ করিয়া প্রাচীন কবিগণের রচনাকৌশল এবং শাস্ত্রের মর্যাদা রক্ষা করা অত্যন্ত দুরূহ।… তবে মহররমের মূল ঘটনাটি বঙ্গভাষাপ্রিয় প্রিয় পাঠক-পাঠিকাগণের সহজে হৃদয়ঙ্গম করিয়া দেওয়াই আমার একমাত্র মুখ্য উদ্দেশ্য।’ তবে সমালোচকেরা মশাররফের এই বক্তব্য অনুমোদনে দ্বিধান্বিত। মুনীর চৌধুরী মশাররফের দাবি সম্পর্কে যৌক্তিক সংশয় পোষণ করেছেন। তিনি দোভাষী পুঁথির সঙ্গে ‘বিষাদ-সিন্ধু’র আন্তরিক সাদৃশ্য আবিষ্কার করে নিশ্চিন্ত হয়েছেন যে মশাররফের অবলম্বন ছিল কারবালা-বিষয়ক জনপ্রিয় বাংলা পুঁথিই। গোলাম সাকলায়েনের অভিমতও অভিন্ন। আনিসুজ্জামান ও মুস্তাফা নূরউল ইসলামও মনে করেন দোভাষী পুঁথিই মশাররফের কাহিনীর প্রেরণা ও মূল উৎস।

পাঁচ.

তিন পর্বে বিভক্ত ‘বিষাদ-সিন্ধু’র ‘মহরম পর্ব্বে’র পরিচ্ছেদ সংখ্যা ছাব্বিশ, ‘উদ্ধারপর্ব্বে’র ত্রিশ ও ‘এজিদবধ পর্ব্বে’র পাঁচ। অবশ্য ‘মহরম পর্ব্বে’র ‘উপক্রমণিকা’ ও ‘উদ্ধার পর্ব্বে’র ‘উপসংহার’কে ধরলে আরো দুটি অধ্যায় বৃদ্ধি পাবে। এখানে পরিচ্ছেদ চিহ্নিত হয়েছে ‘প্রবাহ’ নামে।

‘মহরম পর্ব্বে’ বর্ণিত হয়েছে দামেস্ক-অধিপতি মাবিয়া-পুত্র এজিদের প্রণয়াসক্তি, ব্যর্থতা এবং তার পরিণাম। হাসানপতœী জয়নাবের প্রতি এজিদের প্রণয়-দৌর্বল্য থাকলেও জয়নাবকে সে করায়ত্ত করতে সক্ষম হয়নি। এই ব্যর্থতার সূত্রে হাসানের প্রতি সে বৈরী মনোভাব পোষণ করে এবং তার ষড়যন্ত্রকৌশলে হাসানকে জীবন দিতে হয়। এজিদ হাসান-অনুজ হোসেনকেও ধ্বংস করতে উদ্যত হয় এবং অবশেষে কারবালা প্রান্তরের এক অসম যুদ্ধে অপ্রস্তুত হোসেন নৃশংসভাবে নিহত হন।

‘উদ্ধার পর্ব্বে’র কাহিনী-অংশে আছে বিপন্ন হোসেন-পরিবারের অস্তিত্বরক্ষা এবং ক্রোধান্ধ দুর্জয় বীর মোহাম্মদ হানিফার প্রতিশোধ-গ্রহণের বিবরণ।

‘বিষাদ-সিন্ধু’র শেষখণ্ড ‘এজিদবধ পর্ব্বে’ হানিফার এজিদ-হত্যার প্রচেষ্টা, এজিদের ভূ-গর্ভস্থ গুপ্তকক্ষে পলায়ন ও জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নারকীয় কষ্টভোগ, দৈবনির্দেশে বহু প্রাণক্ষয়কারী হানিফার প্রাকৃতিক বন্দিত্ব এবং হোসেন-বংশধর জয়নাল আবেদীনের রাজ্যলাভের কাহিনী বিবৃত হয়েছে। উপসংহারে লেখক সত্যের জয় ও পাপের পরিণামফল ভোগের অবশ্যম্ভাবিতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

ইতিহাস-সূত্রে জানা যায়, এজিদের সঙ্গে হাসান-হোসেনের বিবাদ-বিরোধ রাজনৈতিক, রাষ্ট্রক্ষমতার দখলই এই দ্ব›েদ্বর মূল কারণ। কিন্তু ‘বিষাদ-সিন্ধু’তে এই বৈরিতার মূল কারণ হিসেবে এজিদের জয়নাব-লাভের তীব্র কামনাই চিহ্নিত। ‘বিষাদ-সিন্ধু’তে জয়নাবই যে এই মহা-ট্র্যাজেডির উপলক্ষ তা তার স্বগতোক্তিতেই জানা যায় : ‘হায়!… আমার নিজ জীবনের আদি অন্ত ঘটনা মনোযোগের সহিত ভাবিয়া দেখিলে প্রত্যক্ষ প্রমাণের সহিত সপ্রমাণ হইবে, এই হতভাগিনীই বিষাদ-সিন্ধুর মূল। জয়নাব এই মহা প্রলয়কাণ্ডের এক মর্মান্তিক কারণ।’ [এজিদবধ পর্ব্ব, তৃতীয় প্রবাহ]।

এ-দিক দিয়ে ‘বিষাদ-সিন্ধু’র সঙ্গে হোমারের ‘ইলিয়াডে’র কাহিনীর কিছু সাদৃশ্য আছে। সেখানেও এক রমণী, হেলেনের কারণেই ঘটে যায় গ্রিক ও ট্রোজানদের মধ্যে বিনাশী সমর, রচিত হয় মানবিক বিপর্যয়ের এক মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি।

‘বিষাদ-সিন্ধু’র প্রকরণ-প্রকৃতি বিচারে সমালোচকদের মধ্যে মতভেদ আছে। কেউ কেউ একে ‘ঐতিহাসিক উপন্যাস’ হিসেবে অভিমত পেশ করেছেন (আবদুল লতিফ চৌধুরী, মোহাম্মদ আবদুল আউয়াল)। কারো বিবেচনায় এটি ‘উপন্যাস’ (মুস্তাফা নূরউল ইসলাম)। কেউ একে চিহ্নিত করেছেন ‘গদ্যে-লেখা মহাকাব্য’ ও ‘ইতিহাসাশ্রয়ী রোমান্স হিসেবে’ (ক্ষেত্র গুপ্ত)। কেউ বা আবার সিদ্ধান্ত করেছেন, ‘বিষাদ-সিন্ধু’ ‘… ইতিহাস, উপন্যাস, সৃষ্টিধর্মীয় রচনা ও নাটক ইত্যাদি সাহিত্যের সংবিধ সংমিশ্রণে রোমান্তিক আবেগ মাখানো এক সংকর সৃষ্টি’ (মুহম্মদ আবদুল হাই)।

‘বিষাদ-সিন্ধু’ রচনার পশ্চাতে ইতিহাসচেতনা বা ধর্মীয় উদ্দেশ্য নয়, মানবিক উপলব্ধি ও শিল্পপ্রেরণার প্রভাবই সক্রিয় ছিল বলে সমালোচকদের অনুমান। তাই এই উপাখ্যানে লেখকের ইতিহাসনিষ্ঠা বারবার বিচ্যুত হয়েছে, রূপায়িত হয়নি ধর্মীয় উদ্দেশ্যও।

ছয়.

মহাকাব্যিক ক্যানভাসে অঙ্কিত, ‘বিষাদ-সিন্ধু’তে গৌণ-মুখ্য চরিত্রের এক মহা-মিছিলের সমাবেশ ঘটেছে। তবে সব চরিত্রই কাহিনীর প্রয়োজনে অপরিহার্য নয় কিংবা তারা সমানভাবে প্রস্ফুটিতও হয়নি। অধিকাংশ চরিত্রই বৃত্তাবদ্ধ, তাদের আচরণ বা কর্মের মাধ্যমে সক্রিয় ও স্বতঃস্ফ‚র্ত ভূমিকা পালন করতে পারেনি। ধর্মীয় ক্ষেত্রে বা ইতিহাসে যে-সব চরিত্র শ্রদ্ধেয়, মহিমান্বিত, গুণসমৃদ্ধ তাঁরা এই উপন্যাসে নিতান্তই নি®প্রভ ও নিষ্ক্রিয়।

এজিদই ‘বিষাদ-সিন্ধু’র প্রধান চরিত্র। তার কামনা-বাসনাকে কেন্দ্র করেই এই উপন্যাসের সূচনা এবং তার শোচনীয় বিপর্যয়েই এই কাহিনীর সমাপ্তি। তার কর্মকাণ্ডকে অবলম্বন করেই ‘বিষাদ-সিন্ধু’র কাহিনী পল্লবিত হয়ে উঠেছে। লেখক এজিদ চরিত্র-চিত্রণে যতটা আন্তরিক ও মনোযোগী, অন্য চরিত্র অঙ্কনে ততখানি নিবিষ্ট হতে পারেননি। রিপুশাসিত রক্ত-মাংসের একজন মানুষের প্রকৃতি, প্রবণতা ও বাস্তবতা নিয়ে এজিদ চরিত্রটি উপস্থাপিত। এ-প্রসঙ্গে মুনীর চৌধুরীর বিশ্লেষণ স্মরণীয় : ‘গ্রন্থের সর্বাপেক্ষা স্পষ্ট এবং প্রদীপ্ত চরিত্র এজিদের। তার চিন্তায়-আচরণে, আবেগে-অভিব্যক্তিতে এমন একটা দৃঢ় গাঢ় ঔজ্জ্বল্য আছে যে অন্যান্য চরিত্র তার পাশে নিতান্ত মর্যাদাহীন বলে মনে হয়। নীতিবিদের দৃষ্টিতে এজিদের ক্রিয়াকর্ম যত গর্হিত ও অভিশপ্ত বিবেচিত হোক না কেন, চরিত্র বিচারের সাহিত্যিক মানদণ্ডে এজিদের মতো প্রাণময় পূর্ণাবয়ব পুরুষ সমগ্র উপন্যাসে দ্বিতীয়টি নেই। এজিদ পাপী, ধর্মদ্রোহী এবং ইন্দ্রিয়পরবশ। কিন্তু এজিদের পাপের প্রকৃতি অসামান্য, তার বিকাশ প্রলয়ঙ্করী, তার পরিণাম যেমন ভয়াবহ, তেমনি শোকাবহ।’

এজিদের রূপতৃষ্ণাই তার ট্র্যাজিক পরিণতির জন্যে দায়ী। রূপজমোহের তীব্র আগুনে এজিদ অসহায় প্রেম-পতঙ্গের মতোই দগ্ধ হয়েছে সারাজীবন। ইতিহাসে এজিদের যে রাজনৈতিক অভিপ্রায় বিবৃত, তা এই উপন্যাসে অনুপস্থিত। এখানে মহানবী (সা.)-এর দৌহিত্র হাসান-হোসেনের সঙ্গে এজিদের দ্ব›েদ্বর মূল কারণ হিসেবে এক রমণীর প্রতি তার তীব্র প্রণয়-কামনাই নির্দেশিত হয়েছে। রাজ্য নয়, রমণীই তার লক্ষ্য। উপাখ্যানে স্পষ্টই বিবৃত হয়েছে : ‘এজিদ রাজ্যের প্রয়াসী নহেন, সৈন্যসামন্ত ও রাজমুকুটের প্রত্যাশী নহেন, রাজসিংহাসনের আকাক্সক্ষী নহেন। তিনি যে রতেœর প্রয়াসী, তিনি যে মহামূল্য ধনের প্রত্যাশী তাহা তাঁহার পিতার মনের অগোচর, বুদ্ধির অগোচর।’ [মহরম পর্ব্ব, প্রথম প্রবাহ]।

উপন্যাসের সূচনাতেই এজিদ তার মনের গোপন আকাক্সক্ষা আবেগকম্পিত কণ্ঠে প্রকাশ করেছে : ‘পিতঃ আমার দুঃখ অনন্ত, এ দুঃখের সীমা নাই, উপশমের উপায় নাই। আমি নিরূপায় হইয়াই জগতের আশা হইতে একেবারে বহুদূরে দাঁড়াইয়াছি। আমার বিষয় বিভব, ধনজন ক্ষমতা সমস্তই অতুল, তাহা আমি জানি। … কিন্তু আমার অন্তর যে মোহিনী মূর্ত্তির সুতী² নয়নবানে বিদ্ধ হইতেছে, সে বেদনার উপশম নাই। পিত! সে বেদনার প্রতিকারের প্রতিকার নাই। যদি থাকিত তবে বলিতাম।… আর বলিবার সাধ্য নাই। হয় দেখিবেন না হয় শুনিবেন,- এজিদ বিষপান করিয়া যেখানে শোকতাপের নাম নাই, প্রণয়ে হতাশ নাই, অভাব নাই এবং আশা নাই, এমন কোন নির্জ্জন স্থানে এই পাপময় দেহ রাখিয়া সেই পবিত্রধামে চলিয়া গিয়াছে।…’ [মহরম পর্ব্ব, প্রথম প্রবাহ]।

জয়নাবের প্রতি এজিদের প্রেমাসক্তির তীব্রতা সম্পর্কে লেখক উল্লেখ করেছেন : ‘এজিদের শিরায় শিরায়, শোণিতবিন্দুর প্রতি পরমাণু-অংশে, প্রতি শ্বাস-প্রশ্বাসে, শয়নে-স্বপ্নে জয়নাব-লাভের চিন্তা অন্তরে অবিরতভাবে রহিয়াছে।’ [মহরম পর্ব্ব, তৃতীয় প্রবাহ]। আবার অন্যত্র বলেছেন : ‘এজিদ ত পূর্ব্ব হইতেই জয়নাবরূপে আত্মসমর্পণ করিয়া বসিয়া আছে। যেদিন জয়নাবকে দেখিয়াছে, জয়নাবের অজ্ঞাতে সেদিন এজিদের নয়ন-চকোর জয়নাবের মুখচন্দ্রিমার পরিমলসুধা পান করিয়াছে, সেইদিন এজিদ জয়নাবকেই মনঃপ্রাণ সমর্পণ করিয়া জয়নাব রূপসাগরে আত্মবিসর্জ্জন করিয়াছে, জয়নাবকেই জপমালা করিয়া দিবানিশি জয়নাব-নাম জপ করিতেছে। জয়নাব ধ্যান, জয়নাব জ্ঞান।’ [মহরম পর্ব্ব, চতুর্থ প্রবাহ]।

জয়নাবের-প্রেমে উন্মাদ-প্রায় এজিদ তার ‘রাজ্যসুখ তুচ্ছ’ ও ‘প্রাণ পর্য্যন্ত পরিত্যাগ’ করতে উদ্যত। হাসান-হোসেনের ‘বধসাধনের জন্য’ মদিনায় সৈন্যদল প্রেরণে তার কোনো রাজনৈতিক অভিপ্রায় ছিল না। এজিদের মনোগত আকাক্সক্ষা উন্মোচিত হয় যখন মন্ত্রী মারওয়ানকে সেনাদলের অধিনায়ক নির্বাচন করে আবেগী ভাষায় সে বলে : ‘ভাই মারওয়ান! … যদি এজিদের মানরক্ষা করিতে চাও, যদি এজিদের অন্তরাগ্নি নির্বাণ করিতে চাও, যদি এজিদের মনের দুঃখ দূর করিতে চাও, যদি এজিদের জয়নাবলাভের আশা-তরী বিষাদ-সিন্ধু হইতে উদ্ধার করিতে চাও, তবে এখনই অগ্রসর হও আর পশ্চাতে ফিরিও না।’ [মহরম পর্ব্ব, দশম প্রবাহ]।

এজিদ একনিষ্ঠ প্রেমিক। তার প্রেমে খাদ নেই, কপটতা নেই। বন্দিনী জয়নাবকে লক্ষ করে উচ্চারিত বক্তব্যে প্রণয়কাতর অন্তরের মর্মকথাই প্রকাশিত হয়েছে : ‘এ ভীষণ সমর কাহার জন্য? এ শোণিতপ্রবাহ কাহার জন্য? কি দোষে এজিদ আপনার ঘৃণার্হ? কি কারণে এজিদ আপনার চক্ষের বিষ? কি কারণে দামেস্কের পাটরাণী হইতে আপনার অনিচ্ছা?’ [উদ্ধার পর্ব্ব, তৃতীয় প্রবাহ]।

এজিদের প্রণয়াকাক্সক্ষা মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও- আত্মবিনাশের পদধ্বনি শুনেও জাগ্রত থাকতে জানে। মোহাম্মদ হানিফার আক্রমণে সন্ত্রস্ত এজিদ আত্মরক্ষার জন্যে যখন পলায়নোদ্যত তখনও তার মনের গভীরে লালিত জয়নাবের স্মৃতি তাকে আলোড়িত করে : ‘বন্দীগৃহ চক্ষে পড়িল। এজিদের চক্ষে দামেস্কের বন্দীগৃহ পড়িতেই তাঁহার মন যেন কেমন করিয়া চমকিয়া উঠিল। এমন সঙ্কট সময়েও এজিদের মন যেন কেমন করিয়া উঠিল। যে রূপ হৃদয়ের নিভৃত স্থানে লুকাইয়া ছিল, সরিয়া আসিল।’ [এজিদবধ পর্ব্ব, চতুর্থ প্রবাহ]।

এজিদের জীবন বেদনা, অচরিতার্থতা আর অসাফল্যে পূর্ণ। যে-জয়নাবের জন্যে এজিদ মনুষ্যত্ব ও নৈতিকতার সকল সীমা অতিক্রম করে চরম নিষ্ঠুরতার পরিচয় দিয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার জয়নাব-লাভের আশা ফলবতী হয়নি, বরঞ্চ বলি হয়েছে বহুসংখ্যক মানুষের জীবন। কৃতকর্মের জন্যে তার মনে অনুশোচনা জেগেছে, আত্মদ্ব›দ্ব আর বিবেক-দংশনে জর্জরিত হয়ে বলে সে : ‘কেন হেরিলাম? সে জ্বলন্ত রূপরাশির প্রতি কেন চাহিলাম? হায়! হায়! সেই এক দিন, আর আজ এক দিন! কি প্রমাদ! প্রেমের দায়ে কি না ঘটিল? কত প্রাণ-ছি! ছি! কত প্রাণের বিনাশ হইল।’ [উদ্ধার পর্ব্ব, ঊনবিংশ প্রবাহ]। তীব্র শোচনাজাত আত্মগøানি আর অন্তরের প্রচ্ছন্ন হাহাকারে দীর্ণ এজিদের এই স্বগতোক্তি তার চরিত্রের একটি ভিন্ন দিকের পরিচয় তুলে ধরে।

এজিদ-চরিত্রে নিষ্ঠুরতা-নির্মমতা, দানবীয় পৈশাচিকতা, অমানবিক আচরণ- সবকিছুরই ব্যাখ্যা পাওয়া যায় তার প্রণয়-তৃষ্ণার সূত্রে। প্রণয়ে ব্যর্থতা ও দয়িতার প্রত্যাখ্যানের মর্মপীড়া তার অন্তরে যে প্রতিহিংসার ক্রোধবহ্নি জ্বেলেছে তাতেই ভস্মীভূত হয়েছে সকল মানবিক গুণাবলি, নীতিবোধ ও স্বাভাবিক বিবেচনাশক্তি। এজিদ স্পষ্টই বলেছে : ‘আমি যাহার জন্য প্রাণ পর্য্যন্ত পরিত্যাগ করিতে প্রস্তুত, আমি যাহার জন্য রাজ্যসুখ তুচ্ছ করিয়া এই কিশোর বয়সে জীবন পর্য্যন্ত বিসর্জ্জন করিতে অগ্রগামী, যাহার জন্য এতদিন কষ্ট সহ্য করিলাম, সেই জয়নাবকে হাসান বিবাহ করিবে? এজিদের চক্ষে তাহা কখনই সহ্য হইবে না। এজিদের প্রাণ কখনই তাহা সহ্য করিতে পারিবে না।… জয়নাবলাভের প্রতিশোধ এবং সমুচিত শাস্তি অবশ্যই এজিদ তাহাদিগকে দিবে। আমার মনে যে ব্যথা দিয়াছে, আমি তাহা অপেক্ষা শত সহস্রগুণে তাঁহাদের মনে ব্যথা দিব। এখনই হউক বা দুদিন পরেই হউক, এজিদ বাঁচিয়া থাকিলে ইহার অন্যথা হইবে না; এই এজিদের প্রতিজ্ঞা।’ [মহরম পর্ব্ব, ষষ্ঠ প্রবাহ]।

প্রকৃতপক্ষে প্রণয়-প্রত্যাশাই ঘটনাপ্রবাহের মাধ্যমে এজিদকে ক্রমান্বয়ে আসক্ত, মুগ্ধ, অভিভূত, হতাশ, রক্তাক্ত, উদ্ভ্রান্ত, ক্রোধান্বিত, প্রতিশোধস্পৃহ ও অনুশোচনাদগ্ধ করে তোলে। প্রণয়ের অভিঘাতে এজিদের এই যে রূপান্তর তা তাকে বহুমাত্রিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী করে তুলেছে। ‘রূপজমোহ যে হৃদয়কে সম্পূর্ণরূপে অধিকার করিয়া বসিয়াছে, সে হৃদয় যথার্থ মানব-হৃদয় হইলেও সময়ে সময়ে পশুভাবে পরিণত হয়’ (উদ্ধারপর্ব্ব, একবিংশ প্রবাহ)- প্রণয়-ব্যর্থ এজিদের মাত্রা-অতিক্রমী প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে লেখকের এই ব্যাখ্যা অযথার্থ নয়।

এজিদ-চরিত্র সৃষ্টিতে মশাররফ ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র রাবণ-চরিত্রের দ্বারা প্রভাবিত হন বলে অনুমান করা যায়। পুরাণ ও ইতিহাসের এই দুই ‘ভিলেন’ চরিত্র উনিশ শতকীয় নবচেতনায় প্রাণিত দুই মহৎ শিল্পীর হাতে নতুন তাৎপর্য ও ব্যঞ্জনা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। অমিত শক্তির অধিকারী এই দুই চরিত্রেই নিয়তি-নির্ধারিত বিপর্যয় ও পতন সম্পূর্ণ মানবিক এবং করুণা ও দীর্ঘশ্বাস উদ্রেককারী। কাজী আবদুল ওদুদ এজিদ-চরিত্রের পরিকল্পনায় রাবণ-চরিত্রের সাদৃশ্য ও প্রভাব নির্দেশ করেছেন। তবে সমালোচকের সতর্ক বীক্ষণে যথার্থই উদঘাটিত হয়েছে যে : ‘… মধুসূদনের বেলায় ব্যক্তিগত সহানুভূতি ও শৈল্পিক দৃষ্টিভঙ্গির কোনো বিরোধ ঘটেনি- পক্ষান্তরে মশাররফ হোসেন শিল্পী ও ব্যক্তি-চৈতন্যের টানাপোড়েনে ক্ষত-বিক্ষত, রক্তাক্ত’ (আবু হেনা মোস্তফা কামাল)।

‘প্রচণ্ড প্রতাপে, নিষ্ঠুর নির্যাতনে, ঈর্ষা-হিংসা, ক‚ট-ষড়যন্ত্রণা ও প্রবঞ্চনা প্রবণতায়’ এজিদ যে মহাভারতের দুর্যোধনের সমগোত্রীয়,- সে-ধারণাও কেউ কেউ পোষণ করেছেন (হাসান আজিজুল হক)।

এজিদ কেবল ‘বিষাদ-সিন্ধু’র কেন্দ্রীয় চরিত্রই নয়, কাহিনীর নিয়ন্ত্রকশক্তিও সে। হাসান-হোসেন বা কারবালার কাহিনী এই উপন্যাসে উপলক্ষ মাত্র, মূল লক্ষ্য এজিদ, তার প্রেমতৃষ্ণার ভয়াবহ পরিণাম-নির্দেশ। তাই ‘শিল্পী মশাররফ এজিদ-চরিত্র রূপায়ণেই তাঁর শ্রেষ্ঠ মনোযোগ অর্পণ করেছিলেন’ (আবু হেনা মোস্তফা কামাল)।

এই উপন্যাসে পাপ ও প্রেমের অবস্থান সমান্তরাল। প্রেম তার জীবনকে আনন্দ-সুখে পূর্ণ করেনি, পক্ষান্তরে পাপ তার জীবনকে বেদনা-বিষে করে তুলেছে জর্জরিত। নিয়তি-নির্ধারিত এক মানবভাগ্যের করুণ পরিণতি নেমে এসেছে এজিদের জীবনে। প্রণয়-বঞ্চিত আত্মদ্ব›েদ্ব পরাভূত এক বিক্ষত মানুষের করুণ মর্মস্পর্শী কাহিনী হয়ে উঠেছে ‘বিষাদ-সিন্ধু’। যথার্থই, ‘ইতিহাসের প্রকৃত মরুপ্রান্তর নয়, এজিদের প্রেমদীর্ণ হৃদয়ই এখানে কারবালায় রূপান্তরিত হয়েছে। বিষাদের উত্তাল তরঙ্গসমূহের উৎস এজিদের হৃদয়-সিন্ধু’ (মুনীর চৌধুরী)

সাত.

একমাত্র এজিদই ‘বিষাদ-সিন্ধু’র প্রাণবন্ত চরিত্র, যার বিকাশ ও বিবর্তন আছে। অন্যসব চরিত্রই ভালো বা মন্দ এই মোটা দাগে বিভক্ত। ধর্ম, ন্যায়, নীতি ও সত্যের সপক্ষে ভূমিকা পালন করেছেন হাসান, হোসেন, হানিফা, গাজী রহমান, আজর ও জয়নাব। মারওয়ান, সীমার, জাএদা, মায়মুনা ঈর্ষা, স্বার্থ, লোভ, নিষ্ঠুরতার প্রতীক। মাবিয়া এবং অলিদ চরিত্র কিছুটা ভিন্নধর্মী। মাবিয়া এজিদের পিতা হলেও পুত্রের সব অন্যায় ও দুষ্কর্মই তিনি অনুমোদন করেননি। তাঁর সচেতন বিবেকের পরিচয় মেলে ‘মহররম পর্ব্বে’র ষষ্ঠ প্রবাহে। এজিদ-সেনাপতি অলিদ-চরিত্রেও বিবেকবোধ ও বিবেচনাশক্তির পরিচয় আছে।

ধর্মপ্রাণ হাসান ও হোসেন চরিত্রে সদ্গুণাবলীর অনুশীলন ও পরিচয় ‘বিষাদ-সিন্ধু’তে অত্যন্ত স্পষ্ট ও সার্থকভাবে প্রতিফলিত। হাসান-চরিত্র সম্পর্কে সমালোচকের উক্তি : ‘… ইমাম হাসানের চরিত্র বাস্তবিক বড় মধুর করে ‘বিষাদ-সিন্ধু’কার এঁকেছেন। যে বৃদ্ধ নিজের মনের বিষে তাঁকে বর্শা ফেলে মেরেছিল তার প্রতি ও তাঁর প্রাণঘাতী স্ত্রী জাএদার প্রতি তাঁর যে ব্যবহার তা বড় সৌজন্যময়’ (কাজী আবদুল ওদুদ)।

হোসেনও ধর্মপ্রাণ সজ্জন, তাঁর মধ্যে কর্তব্যবোধ, নির্ভীকতা, আবেগপ্রবণতা, ক্ষমাশীলতা ও সরলতার প্রকাশ আছে। তবে এজিদের সঙ্গে প্রতিতুলনায় হোসেন অনুজ্জ্বল ও নি®প্রভ। তাঁর ভূমিকা অনেকটাই পূর্ব-নির্ধারিত। তবুও অভাবিত মানবিক সংকটের মুখে যখন অস্তিত্ব বিপন্নপ্রায় তখনও চিন্তা ও আচরণে হোসেন অনেক বেশি জীবন্ত ও প্রাণময়। নারীচরিত্রের মধ্যে জয়নাব, জাএদা ও মায়মুনা উল্লেখযোগ্য। এক অর্থে, ‘বিষাদ-সিন্ধু’র কাহিনী অনুসারে জয়নাবই এই বিনাশী সমর-সংঘাতের মূল কারণ। তার সঙ্গে ‘ইলিয়াডে’র হেলেনের তুলনা মনে আসে। সামগ্রিক বিচারে জয়নাবই ‘বিষাদ-সিন্ধু’র নায়িকা। তার অন্তর্দহন ও ট্র্যাজেডিও গভীর। এই চরিত্রটির পরিকল্পনাতেও ‘মেঘনাদবধ কাব্যে’র সীতা-চরিত্রের সাদৃশ্য আছে। সমালোচকের সাক্ষ্য : ‘… ‘মেঘনাদবধে’র সীতা-চরিত্রের মাধুর্য ও কোমলতার অনেকখানি সমাবেশ ঘটেছে ‘বিষাদ-সিন্ধু’র জয়নাব-চরিত্রে। গ্রন্থের শেষের দিক জয়নাবের যে দীর্ঘ আত্মবিলাপ রয়েছে তার সঙ্গে সীতা ও সরমার কথোপকথনের সাদৃশ্য সহজেই চোখে পড়ে’ (কাজী আবদুল ওদুদ)। তবে হাসান-হোসেন যেমন এজিদ-চরিত্রের পাশাপাশি অনুজ্জ্বল, তেমনি জয়নাবও জাএদার কাছে নি®প্রভ।

জাএদা ‘বিষাদ-সিন্ধু’ উপাখ্যানের সবচেয়ে প্রাণবন্ত নারী-চরিত্র। জাএদা স্বভাবে-আচরণে অনেকটাই এজিদের সমানধর্মা। সে এজিদের মতোই প্রেমের দাবি পূরণ করতে গিয়ে নির্মম-নিষ্ঠুর-অমানবিক হতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করে না। সামান্যতম হলেও, এজিদের অনুশোচনাবোধ আছে, কিন্তু জাএদা চরিত্রে তার লেশটুকুও মেলে না। এ-কথা মানতেই হয়, জাএদা চরিত্রে ‘প্রেমিক নারীর ঈর্ষা এবং সপতœীদ্বেষের তীব্র রূপ’ প্রকাশিত হয়েছে এবং তা ‘একটি অসাধারণ নারীচরিত্রের মনস্তাত্তি¡ক বিকারের ছবি’। ‘জাএদা বাঁচিয়া থাকিতে স্বামী ভাগ করিয়া লইবে না’ (মহরম পর্ব্ব, ত্রয়োদশ প্রবাহ)- এই উপলব্ধি থেকেই জাএদার মনে প্রতিহিংসা জাগ্রত হয়েছে, জন্ম নিয়েছে ঈর্ষা। মায়মুনার সঙ্গে আলাপচারিতায় তার অন্তরের গভীর বেদনা প্রকাশিত হয়েছে : ‘যে আমার হইল না, আমার মুখের দিকে যে ফিরিয়া তাকাইল না, আমার মুখের দিকে যে ফিরিয়া তাকাইল না, তাহাকে ঔষধে বশ করিয়া লাভ কি বোন।’ [মহরম পর্ব্ব, ত্রয়োদশ প্রবাহ]। স্বামীসঙ্গবঞ্চিতা এক ব্যথিত নারীর করুণ আর্তিই এখানে ফুটে উঠেছে। প্রেম-প্রত্যাখ্যাতা জাএদার একসময় মনে হয়েছে, ‘এখন শীঘ্র মরণ হইলেই আমি নিস্তার পাই’ (মহরম পর্ব্ব, ত্রয়োদশ প্রবাহ)। মায়মুনা যখন তাকে স্বামী-হত্যার পরামর্শ দিয়েছে তখন সে এই প্রস্তাব তীব্রভাবে অগ্রাহ্য করে বলেছে : ‘… এই দুঃখে যদি মরিয়াও যাই, আরও শত শত প্রকার দুঃখ যদি ভোগ করি, সপতœী-বিষম বিষে আরও যদি জর্জ্জরিত হই পরমায়ুর শেষ পর্য্যন্ত যদি এই দুঃখের শেষ না হয়, তথাপিও উহা পারিব না; আমার স্বামী আর আমি- আমার প্রাণের প্রাণ- কলিজার টুকরা আর আমি-।’ [মহরম পর্ব্ব, ত্রয়োদশ প্রবাহ]।

একদিকে মায়মুনার প্রলোভন, প্ররোচনা, ক‚ট-পরামর্শ ও সপতœীসঙ্গের অন্তর্জ্বালা, অপরদিকে স্বামীর প্রতি গভীর অনুরাগ, প্রীতি ও আকর্ষণ- এই টানাপড়েনে ক্ষণিক মুহূর্তের জন্যে হলেও জাএদার অন্তর ক্ষতবিক্ষত হয়েছে : ‘জাএদা মলিনমুখী হইয়া উঠিয়া গেলেন। যেখানে গেলেন, সেখানেও স্থির হইয়া বসিতে পারিলেন না। পুনরায় নিজ কক্ষে আসিয়া শয়ন করিলেন। একদিকে রাজভোগের লোভ, অপরদিকে স্বামীর প্রণয়, এই দুইটী ক্রমে ক্রমে তুলনা করিতে লাগিলেন। কতবার পরিবর্তন করিলেন, দুরাশা-পাষাণ ভাঙ্গিয়া তুলাদণ্ড মনোমত ঠিক করিয়া অসীম দুঃখভার চাপাইয়া দিলেন, তথাচ স্বামীর প্রাণের দিকেই বেশি ভারী হইল। কিন্তু জয়নাবের নাম মনে পড়িবামাত্রই পরিমাণদণ্ডের যেদিকে স্বামীর প্রাণ, সেইদিক একেবারে লঘু হইয়া উচ্চে উঠিল।’ [মহরম পর্ব্ব, ত্রয়োদশ প্রবাহ]।

এই গভীর আত্মদ্ব›দ্ব স্বামীনিধনের আয়োজনের মুহূর্তে আবার জেগে উঠেছে, কিন্তু তা ক্ষণিক বিদ্যুৎ-চমকের মতোই মিলিয়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়েছে ঈর্ষা আর লোভ : ‘… অল্পে অল্পে দ্বার মুক্ত করিয়া গৃহের মধ্যে প্রবেশ করিয়া জাএদা দেখিলেন দীপ জ্বলিতেছে। এমাম হাসান শয্যায় শায়িত- জয়নাব বিমর্ষবদনে হাসানের পদ দুখানি আপন বক্ষে রাখিয়া শুইয়া আছেন।… জাএদা বিষের পুঁটুলি খুলিতে আরম্ভ করিলেন। খুলিতে খুলিতে ক্ষান্ত দিয়া কি ভাবিয়া আর খুলিলেন না। হাসানের মুখের দিকে চাহিয়া রহিলেন। ক্রমে ক্রমে মুখ, বক্ষ, উরু ও পদতল পর্য্যন্ত সর্ব্বাঙ্গে চক্ষু পড়িলে সে ভাব থাকিল না। তাড়াতাড়ি বিষের পুঁটুলি সোরাহীর মুখের কাপড়ের উপর সমুদয় হীরকচূর্ণ ঢালিয়া দিলেন।’ [মহরম পর্ব্ব, ষষ্ঠদশ প্রবাহ]।

সপতœীবাদের এই যে বিষময় ফল ‘বিষাদ-সিন্ধু’তে বিবৃত হয়েছে, তাতে মশাররফের ব্যক্তিজীবনের অভিজ্ঞতা ছায়া ফেলেছে বলে সমালোচকের যে ধারণা আমাদের বিবেচনায় তা অমূলক নয়। এই ধারণার সমর্থনে আজীজন-কুলসুমের দ্ব›েদ্ব মীরের বিড়ম্বিত দাম্পত্য জীবনের কথা এখানে পাঠকের সহজেই মনে পড়বে।

‘বিষাদ-সিন্ধু’ উপন্যাসের চরিত্র-চিত্রণে মশাররফ হোসেনের সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে কাজী আবদুল ওদুদ যে সংক্ষিপ্ত অথচ প্রাসঙ্গিক আলোচনা করেছেন তা গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বিবেচনায়, মশাররফের সৃষ্ট চরিত্রসমূহ পূর্ণাবয়ব লাভ করতে পারেনি মূলত তাঁর কবিসুলভ আবেগোচ্ছ¡াসের জন্যে। ধর্ম ও আদর্শের অনুশীলন যাঁদের চরিত্রে সর্বাধিক, তাঁরা রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা না পেয়ে হয়ে উঠেছে ‘ধর্মাচারের সমষ্টি-মাত্র’। তবে এর বাইরে একমাত্র সীমার ব্যতীত অন্যান্য চরিত্র ‘স্বাভাবিক মানুষ’ হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছে, কেউই নিরঙ্কুশ ‘অমানুষ’ বা ‘শয়তান’ হিসেবে চিত্রিত হয়নি।

আট.

পুঁথির জগৎ থেকে মশাররফ ‘বিষাদ-সিন্ধু’র কাহিনী চয়ন করলেও এই উপাখ্যানে তিনি যে শিল্পবোধের স্বাক্ষর রেখেছেন তা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। আয়তন ও স্বভাবে মহাকাব্যিক লক্ষণাক্রান্ত এই রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য এর ভাষাসম্পদ। সমকালে ‘বিষাদ-সিন্ধু’র আলোচনায় সঙ্গত কারণেই এর ভাষা-প্রসঙ্গই বেশি গুরুত্ব ও বিবেচনা লাভ করেছে। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত অভিমত বিশ্লেষণ করলে সহজেই মীরের ভাষা-সাফল্যের স্বরূপ বোঝা যায়।

‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ (১১ জ্যৈষ্ঠ ১২৯২) ‘বিষাদ-সিন্ধু’র ভাষার বিশুদ্ধতার প্রশ্নে মন্তব্য করে, ‘বিষাদ-সিন্ধু’র মতো গ্রন্থ ‘বঙ্গভাষা বিস্তৃতির আর একটি নূতন পথ’ এবং এর ফলে ‘মাতৃভাষা বাঙ্গালার প্রতি মুসলমানদিগের শ্রদ্ধা’ জন্মাচ্ছে। ‘ইতিপূর্বে একজন মুসলমানের এত পরিপাটী বাঙ্গলা রচনা আর দেখিয়াছি বলিয়া মনে হয় না’- ‘সিন্ধু’র ভাষাকে লক্ষ্য করে ‘ভারতী’র (ফাল্গুন ১২৯৩) এই মন্তব্যে ‘সুলভ সমাচার’ (১৯ বৈশাখ ১২৯৩) কিংবা ‘ঢাকা প্রকাশে’র (৪ আশ্বিন ১২৯৩) মতেরই প্রতিধ্বনি শোনা যায়। ‘চারুবার্ত্তা’র (২৩ জ্যৈষ্ঠ ১২৯২) সমালোচনায় বলা হয়, ‘বিষাদ-সিন্ধু’ রচয়িতার ‘লিপিশক্তি অতি মনোহর’, ‘ভাষা বিশুদ্ধ মধুর ও লালিত্যপূর্ণ’। মশাররফের মতো ‘বিশুদ্ধ ও সুমধুর বাঙ্গালা’ যে অনেক শিক্ষিত হিন্দুও লিখতে পারেন না, সেই কথাটিও আলোচক স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

কাব্যের দ্যোতনা, আবেগের স্পন্দন, ধ্বনির ব্যঞ্জনা আর অলঙ্কারের প্রাচুর্য, ‘বিষাদ-সিন্ধু’র ভাষা-শরীরে এক ধরনের শ্রী ও কান্তি এনে দিয়েছে- অনায়াসেই স্বতন্ত্র স্বাদ অনুভব করা যায় এই ভাষায়। যেমন : ‘যে নগরের সুখসাগরের তরঙ্গের উপর তরঙ্গ খেলা করিতেছিল, মহানন্দের স্রোত বহিতেছিল, রাজপ্রাসাদ, রাজপথ, প্রধান প্রধান সৌধ আলোকময় পরিশোভিত হইয়াছিল, ঘরে ঘরে নৃত্য সহিত বাজনার ধূম পড়িয়াছিল, রঞ্জিত পতাকাসকল হেলিয়া জয়সূচক চিহ্ন দেখাইতেছিল- তৎসমুদয় বন্ধ হইয়া গেল। মুহূর্ত্তমধ্যে মহানন্দবায়ু থামিয়া বিষাদ-ঝটিকা বেগে রহিয়া রহিয়া বহিতে লাগিল। মাঙ্গলিক পতাকারাজি নতশিরে হেলিতে দুলিতে পড়িয়া গেল। রাজপ্রাসাদের বাদ্যধ্বনি, নূপুরের ঝন্ঝন্ সুমধুর কণ্ঠস্বর আর কাহারও কর্ণে প্রবেশ করিল না। সুহাস্য আস্ফালন বিষাদকালিমা রেখায় মলিন হইয়া গেল।’ [উদ্ধার পর্ব্ব, ষষ্ঠ প্রবাহ]। উৎসব-আনন্দে মুখর রমণীয় প্রফুল্ল পরিবেশ বিপক্ষ ঘটনায় আকস্মিকভাবে কেমন নীরব ও নিরানন্দ হয়ে গেল তার একটি উজ্জ্বল ছবি এখানে অঙ্কিত হয়েছে।

‘বিষাদ-সিন্ধু’র ভাষায় আবেগ আছে, চিত্রধর্মিতা, নাটকীয়তা আছে, আছে গীতিময়তা, গতিশীলতাও। এজিদের প্রেমতৃষ্ণা, অন্তর্জ্বালা, আবেগ, অস্থিরতা ও মনোদ্ব›দ্ব প্রকাশে এই ভাষার সহায়তা উল্লেখযোগ্য। যেমন, রূপজ মোহে আচ্ছন্ন বিভ্রান্ত-বিক্ষত এজিদের ট্র্যাজিক-উপলব্ধির প্রকাশ : ‘প্রথম কথাতেই জয়নাবের মনের ভাব এজিদ অনেক জানিতে পারিয়াছেন, তাঁহার হস্তে সুতী² ছুরিকাও দেখিয়াছেন, সে অস্ত্র এজিদের বক্ষে বসিবে না; যাঁহার অস্ত্র, তাঁহারই বক্ষ, তাঁহারই শোণিত,- কিন্তু বিনা আঘাতে, বিনা রক্তপাতে, নিজ হৃদয়ের রক্ত যে আজীবন শরীরের প্রতি লোমক‚প হইতে অদৃশ্যভাবে ঝরিতে থাকিবে, তাহাও এজিদ বুঝিয়াছিলেন।’ [উদ্ধার পর্ব্ব, একবিংশ প্রবাহ]। জয়নাব-প্রত্যাখ্যাত এজিদের অতৃপ্ত প্রেমাকাক্সক্ষা ও আহত পৌরুষ যখন বিক্ষুব্ধ অভিমানে চঞ্চল হয়ে ওঠে তখন একজন প্রেম-ভিক্ষু বিপর্যস্ত মানুষের প্রতিকৃতি পাঠকের সম্মুখে উদ্ভাসিত হয়।

সদ্য-বিবাহিত, যুদ্ধাহত কাসেমের অন্তিমকাল যখন আসন্ন, তখন তিনি শোণিতসিক্ত দেহে পতœী সখিনার কাছে উপস্থিত হন। এইসময়ে তাঁর যে আচরণ ও উক্তি তাতে নাটকীয়তা ফুটে উঠেছে : ‘… কাসেমের পরিহিত শুভ্রবসন লোহিতবর্ণে রঞ্জিত হইয়াছে, শোণিতধারা অশ্বপদ বহিয়া পড়িতেছে। কাসেম অশ্ব হইতে নামিয়া সখিনাকে বলিলেন, ‘সখিনা। দেখ, তোমার স্বামীর শাহানা পোষাক দেখ। আজ বিবাহ সময়ে উপযুক্ত পরিচ্ছেদে তোমাকে বিবাহ করি নাই, কাসেমেরই দেহবিনির্গত শোণিতধারে শুভ্রবসন লোহিতবর্ণে পরিণত হইয়া বিবাহবেশ সম্পূর্ণ করিয়াছে। এই বেশ তোমাকে দেখাইবার জন্য বহুকষ্টে শত্রুদল ভেদ করিয়া এখানে আসিয়াছি। আইস, এই বেশে তোমাকে একবার আলিঙ্গন করিয়া প্রাণ শীতল করি। সখিনা! আইস, এই বেশেই আমার মানসের চিরপিপাসা নিবারণ করি।’ [মহরম পর্ব্ব, পঞ্চবিংশ প্রবাহ]।

‘বিষাদ-সিন্ধু’র ভাষার বড়ো বৈশিষ্ট্য এর কাব্যধর্মিতায়। নির্বাচিত তৎসম শব্দের ব্যবহার, ক্রিয়াপদের পৌনঃপুনিক প্রয়োগ, অনুপ্রাসের ধ্বনিতরঙ্গ, ‘সিন্ধু’র গদ্যকে অনেকসময় কাব্যের কাছাকাছি পৌঁছে দেয়। মীরের শিল্প-স্বভাবের একান্ত অনুবর্তী ছিল এই প্রবণতা, সে-কারণেই বোধহয় ‘বিষাদ-সিন্ধু’কে তিনি আখ্যাও দিয়েছে ‘মহাকাব্য’ বলে। তাঁর আবেগনির্ভর গীতল গদ্যের নমুনা : ‘এখন এজিদের চক্ষে জল নাই। তাঁহার বিশাল বিস্ফারিত যুগলচক্ষে এখন আর জল নাই।… যদি কিছু পড়িবার হয়, যদি এজিদের অক্ষিদ্বয় হইতে এইক্ষণে কিছু পড়িবার থাকে, তবে কি পড়িবে?… না, না, না, সে জল নহে! যে দুইএক ফোঁটা পড়িবে, সে দুইএক ফোঁটা জল নহে- জল হইবার কথা নহে। মর্ম্মাঘাতের আহতস্থানের বিকৃত শোণিতধার, মর্ম্মাঘাতে ক্ষতস্থানের রক্তের ধারা, দুই চক্ষু ফাটিয়া পড়িবে। জগৎ দেখিবে,- এজিদের চক্ষে জল পড়ে নাই।’ [উদ্ধার পর্ব্ব, ঊনত্রিংশ প্রবাহ]। এজিদের অন্তরের শুশ্রƒষাহীন বেদনা ও রক্তক্ষরণের এই আবেগময় প্রকাশ যে গদ্য ও কাব্যের ব্যবধান কমিয়ে আনে, সে-কথা অকুণ্ঠচিত্তে বলা যায়।

শিল্প ও ভাষারীতিতে বঙ্কিমচন্দ্রের কাছে মশাররফের ঋণ উল্লেখযোগ্য। বঙ্কিমের সংযম ও পরিমিতিবোধ মশাররফের ভাষায় অনুপস্থিত থাকলেও বঙ্কিমিগদ্যের প্রবাহমানতা, গীতল-স্বভাব, আবেগ ও অলঙ্কার-শোভার বৈশিষ্ট্য এখানে দুর্লক্ষ্য নয়। ভাব ও ভাষায় মাঝে-মধ্যে আশ্চর্য সাদৃশ্য আবিষ্কার সম্ভব। যেমন নিচের দুটি অংশের সঙ্গে ‘চন্দ্রশেখর’ উপন্যাসের প্রাসঙ্গিক অংশের তুলনা করা যেতে পারে। প্রেমজ মোহে আচ্ছন্ন বিরহতাপিত দীর্ণ-হৃদয় এজিদের খেদোক্তি : ‘হয় দেখিবেন, না হয় শুনিবেন, এজিদ বিষপান করিয়া যেখানে শোকতাপের নাম নাই, প্রণয়ে হতাশা নাই, অভাব নাই, এমন কোন নির্জ্জন স্থানে এই পাপময় দেহ রাখিয়া সেই পবিত্রধামে চলিয়া গিয়াছে।’ [মহরম পর্ব্ব, প্রথম প্রবাহ]। এ-ছাড়া, আসন্ন বিচ্ছেদ-মুহূর্তে কাসেমের প্রতি সখিনার আবেগ-গাঢ় উচ্চারণ স্মরণীয় : ‘যেখানে শত্রুর নাম নাই, এজিদের ভয় নাই, কারবালা প্রান্তরও নাই, ফোরাত-জলের পিপাসাও যেখানে নাই সেইস্থানে যেন আমি তোমাকে পাই…।’

উদ্ধৃত অনুচ্ছেদদ্বয়ের সঙ্গে বঙ্কিমের ‘চন্দ্রশেখর’ উপন্যাসের উপসংহার-মন্তব্যের ভাব-ভাষাগত সাদৃশ্য আদৌ কষ্ট-কল্পনা নয় : ‘তবে যাও, প্রতাপ, অনন্তধামে। যাও, যেখানে ইন্দ্রিয়জয়ে কষ্ট নাই, রূপে মোহ নাই, প্রণয়ে পাপ নাই, সেইখানে যাও, যেখানে রূপ অনন্ত, প্রণয় অনন্ত, সুখ অনন্ত, সুখে অনন্ত পুণ্য, সেইখানে যাও।’ [অষ্টম পরিচ্ছেদ, যুদ্ধক্ষেত্রে]।

‘বিষাদ-সিন্ধু’তে মীর বঙ্কিম-বিদ্যাসাগরের প্রচলিত ভাষারীতিই অনুসরণ করেছেন। এখানে তৎসম শব্দের প্রাধান্যের তুলনায় আরবি-ফারসি শব্দের সংখ্যা অতি নগণ্য। তাও যে তিনি এইসব শব্দ স্বেচ্ছায় ও স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে ব্যবহার করেছেন তা নয়। এ-বিষয়ে ‘বিষাদ-সিন্ধু’র প্রথম সংস্করণের মুখবন্ধে তিনি জানিয়েছিলেন : ‘শাস্ত্রানুসারে পাপভয়ে ও সমাজের দৃঢ় বন্ধনে বাধ্য হইয়া ‘বিষাদ-সিন্ধু’ মধ্যে কতকগুলি জাতীয় শব্দ ব্যবহার করিতে হইল।’ তবুও তিনি স্বজাতি ও স্বধর্মীয়দের নিন্দা ও বিরূপ সমালোচনা এড়াতে পারেননি। ‘উদ্ধার পর্ব্বে’র চতুর্থ প্রবাহে তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘পয়গম্বর এবং এমামদিগের নামের পূর্ব্বে বাঙ্গালাভাষায় ব্যবহার্য শব্দে সম্বোধন’ করার কারণে ‘স্বজাতীয় মূর্খদল হাড়ে হাড়ে চটিয়া রহিয়াছেন’। মশাররফ ব্যথিত চিত্তে আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘শাস্ত্রের খাতিরে’, ‘সমাজের কঠিন বন্ধন’ ও ‘দৃঢ় শাসনে’ নিয়ন্ত্রিত হওয়ার কারণে ‘কল্পনা-কুসুমে আজ মনোমত হার গাঁথিয়া পাঠক-পাঠিকাগণের পবিত্র গলায় দোলাইতে পারিলাম না’। ভাষা-ব্যবহারে তাঁর ছিল উদার দৃষ্টিভঙ্গি ও মুক্তমন। এখানে একজন লেখক-ব্যক্তিত্বের আন্তরিক উপলব্ধি ও সচেতন ভাষাশিল্পীর পরিচয় খুঁজে পাওয়া যায়।

মশাররফের ভাষা-বৈশিষ্ট্যের সর্বাধিক সিদ্ধি ও সাফল্যের পরিচয় পাওয়া যায় এই বইয়ে। সামগ্রিক বিচারে ‘বিষাদ-সিন্ধু’ই যে মীরের শ্রেষ্ঠ গদ্য-নিদর্শন, এ-কথায় বোধকরি কোনো দ্বিমত হবে না।

দশ.

বাংলা সাহিত্যে মশাররফের স্থান-নির্দেশ করতে গিয়ে ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯১-১৯৫২) বিদ্যাসাগরের সঙ্গে তাঁর প্রতিতুলনা করে যে-মন্তব্য করেছিলেন, ‘বিষাদ-সিন্ধু’র প্রেক্ষাপটে মশাররফ হোসেনের মূল্যায়ন-প্রসঙ্গে সেই উক্তি বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য : ‘বিদ্যাসাগর মহাশয়ের ‘সীতার বনবাস’ বাংলাদেশের ঘরে ঘরে যেমন এককালে পঠিত হইয়াছিল, ‘বিষাদ-সিন্ধু’ তেমনই আজও পর্য্যন্ত জাতীয় মহাকাব্যরূপে বাঙালী মুসলমানের ঘরে ঘরে পঠিত হয়; বাংলা-সাহিত্যের অপূর্ব্ব সম্পদ হিসাবে সকল সমাজেই এই গদ্যকাব্যখানির সমান আদর।… তাঁহার সাহিত্য-প্রতিভা এমনই উচ্চশ্রেণীর ছিল যে, সুদূর অতীতের কারবালা-প্রান্তরের ট্রাজেডিকে তিনি সমগ্র বাংলাভাষাভাষীর ট্রাজেডি করিয়া তুলিতে পারিয়াছেন।’

এগারো.

‘বিষাদ-সিন্ধু’ নিয়তি-লাঞ্ছিত মানবভাগ্যের এক মর্মস্পর্শী গদ্য-মহাকাব্য। একদিকে নীতি, ন্যায় ও সত্য এবং অপরদিকে মানবের কামনা-বাসনা ও শিল্পের দায়- এই দুই টানাপড়েনে মশাররফ দ্বিধাবিভক্ত হয়েছেন। মশাররফের ধর্মচেতনা ও স্বজাতির কাছে দায়বদ্ধতা তাঁকে অনিবার্যভাবে হাসান-হোসেনের পক্ষাবলম্বী করে তুলেছে, এখানে সত্যের জয়-বন্দনায় তাঁর মনোযোগ নিবেদিত। কিন্তু শিল্পী মশাররফের সহানুভূতি ও মমত্ববোধ যে এজিদের প্রতিও ধাবিত, তা-ও বিস্মৃত হওয়া চলে না। বাহ্যত হাসান-হোসেনের প্রতি তাঁর পক্ষপাত, কিন্তু শিল্প-মনোরাজ্যের গভীরে ‘দুরাত্মা’ এজিদই আন্তরিক অনুরাগ ও মমতায় প্রতিষ্ঠিত। শিল্পী মশাররফের অভিপ্রায়ের বিজয় সাধিত হয়েছে এই ধর্মাশ্রিত কাহিনীর শিল্প-রূপায়ণে। ইতিহাসের মর্মান্তিক ট্রাজিক-ঘটনা শেষ পর্যন্ত পরিণত হয়েছে এক প্রেম-পতঙ্গের আত্মহননের আধুনিক রূপকথায়।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj