বাঙালির আবশ্যিক আশ্রয় : নজরুল : ফরিদ আহমদ দুলাল

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

বাঙালির কবি নজরুল তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় সর্বধর্মীয় এবং সর্বমানবীয় যে চেতনাকে নিজের অস্তিত্বের কথা ঘোষণা করেছেন তা কেবল বৈচিত্র্য সৃষ্টিকারীই নয় অভিনবও বটে। নজরুলের সময় ও প্রেক্ষাপট বিবেচনায় যেমন তেমনি সমকালীন বাংলার বাস্তবতা বিবেচনায়ও তাঁর ‘বিদ্রোহী’ বাংলা কাব্যসাহিত্যের এক কালজয়ী কবিতা। একই কবিতায় হিন্দু-পুরাণের অসংখ্য অনুষঙ্গের ব্যবহার যেমন তিনি করেছেন, পাশাপাশি ‘তাজি র্বোরাক্’, ই¯্রাফিলের শিঙ্গা, হাবিয়া দোজখ, জাহান্নামের কথাও উল্লেখ করেছেন, উল্লেখ করেছেন ‘বেদুঈন, চেঙ্গিস, অর্ফিয়াসের’ কথাও। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার সাবলীল উপস্থাপন-শৈলীর কথা না বলেও এর শব্দবিন্যাসের সৌন্দর্যে দৃষ্টি দিলে চমৎকৃত হতেই হয়। অন্যদিকে বাঙালির শাশ্বত চেতনার সন্ধানও পাওয়া যায়। বাংলাদেশের গণমানুষের প্রাণের কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর সাহিত্য জীবনের উল্লেখযোগ্য সময় জুড়ে নজরুল তাঁর সমকালীন মানুষের কাছে নানানভাবে সমালোচিত হলেও আজ তিনি সব মহলেই সমাদৃত। কারো মনে নজরুল বিষয়ে বিদ্বেষ থাকলেও তা খুব একটা প্রকাশ্য নয়। শহুরে এলিট শ্রেণির বিচারে নজরুল হয়তো ততটা গ্রাহ্য নন, তবু বিশাল সাধারণ জনগোষ্ঠীর আবেগের মুখে, নিজেদের অস্তিত্ব বিপন্ন হবার আশঙ্কায় তাঁকে অগ্রাহ্য করার স্পর্ধা এলিট শ্রেণির সব সময় থাকে না। সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি নজরুল সম্পর্কে অনিয়ন্ত্রিত কথা বলে কোন কোন বুদ্ধিজীবী কেমন দুর্বিপাকে পড়েছেন। শহুরে এলিট শ্রেণি নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতার কাছে আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। বিদ্রোহী কবিতায় নজরুল যখন উচ্চারণ করেন-

‘আমি ঝঞ্ঝা, আমি ঘূর্ণি,

আমি পথ-সম্মুখে যাহা পাই যাই চুর্ণি’।

আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ,

আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ।

আমি হাম্বীর, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল,

আমি চল-চঞ্চল, ঠমকি’ ছমকি’

পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি’

ফিং দিয়া দিই তিন দোল;

আমি চপলা-চপল হিন্দোল।

আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা,

করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা,

আমি উন্মাদ, আমি ঝঞ্ঝা!’

তখন শহুরে বুদ্ধিজীবী-এলিট শ্রেণি নজরুলের শক্তিমত্তার কাছে পরাভব মানতে বাধ্য হয়।

কবি নজরুলের সাহিত্য সাধনায় যে বৈচিত্র্য প্রত্যক্ষ করা যায়, তা এক কথায় অসাধারণ। সেখানে যেমন ছিলো সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, ধর্মীয় কূপমণ্ডুকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই, স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং সর্বোপরি প্রেম; অন্যদিকে নজরুল গেয়েছেন সাম্যের গান, লিখেছেন ইসলামী সঙ্গীত-শ্যামা সংগীত-কীর্তনসহ অজস্র বিচিত্র গীতসম্ভার। নজরুল তাঁর সাহিত্যে সাধারণ মানুষের কথা, তাঁদের জীবনের ব্যথা-বেদনা, আশা-নৈরাশ্য এবং জীবন-সংগ্রামকে বাক্সময় করে তুলেছেন। যে কারণে আমরা লক্ষ করি সমাজের উচ্চ পর্যায়ের মানুষের মনে তাঁকে নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকলেও সাধারণ মানুষ কখনো কবি নজরুলের বিরুদ্ধাচরণ করেনি। ত্রিশোত্তর কাব্য ধারায় ‘আধুনিক কবিতা’ সংকলনে কাজী নজরুল ইসলামের কোন কবিতা স্থান পায়নি-স্থান পেয়েছিলো কবির গান। নজরুলের সমকালে তাঁর কবিতা যথেষ্ট পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছিলো, একথা যেমন সত্য, তেমনি তিনি সমালোচিতও হয়েছিলেন নানাভাবে, সে কথাও মিথ্যে নয়। স্বধর্মীয় মৌলবাদীরা তাঁকে কাফের ফতোয়া দিয়েছে, মুসলমান সমাজ থেকে তাঁকে খারিজ করতে চেয়েছে; মুন্সী মোহাম্মদ রিয়াজ উদ্দিন তো ১৯২৯ সালে কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে ‘লোকটা মানুষ না শয়তান’ শিরোনামে লিখলেন-

‘এই উদ্দাম যুবক যে ইসলামী শিক্ষা আদৌ পায় নাই, তাহা ইহার লেখার পত্রে পত্রে ছত্রে ছত্রে প্রকাশ পাইয়াছে। হিন্দুয়ানী মান্দায় ইহার মস্তক পরিপূর্ণ। হতভাগ্য যুবকটি ধর্মজ্ঞান সম্পন্ন মুসলমানদের সংসর্গ কখনও লাভ করে নাই। দুঃখের বিষয় অজ্ঞান যুবক এখনো আপনাকে মুসলমান বলিয়া পরিচয় দিতেছে।… নরাধম ইসলাম ধর্মের মানে জানে কি? খোদাদ্রোহী নরাধম নাস্তিকদিগকে পরাজিত করিয়াছে। লোকটা শয়তানের পূর্ণাবতার। ইহার কথা আলোচনা করিতেও ঘৃণাবোধ হয়। এইরূপ ধর্মদ্রোহী কুবিশ্বাসীকে মুসলমান বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে না। পুনর্জন্মে বিশ্বাসী কাফের বলিয়া পরিগণিত হইবে। খাঁটি ইসলামী আমলদারী থাকিলে এই নরাধম ফেরাউন, নমরুদকে শূলবিদ্ধ করা হইত বা উহার মুণ্ডুপাত করা হইত নিশ্চয়।’ নজরুলের শ্যামা সঙ্গীত, কীর্তন ও হিন্দু-পুরাণপ্রীতি একশ্রেণির হিন্দু মৌলবাদীর প্রিয় হয়ে উঠলেও অধিকাংশ রক্ষণশীল উচ্চবর্ণীয় হিন্দুর চোখে নজরুল ছিলেন অস্পৃশ্য। ভারতবর্ষে আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে হিন্দু-মুসলমানে বিদ্বেষ ছিলো না কখনো, মুসলমানদের আগমন এবং উত্থানের পর বিদ্বেষ তৈরি হয়েছিলো ক্রমান্বয়ে, কিন্তু ইংরেজদের ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ পলিসির কারণে হিন্দু-মুসলিমের দ্ব›দ্ব অনেক দূর বিস্তৃতি পায়। লোকবাংলার মানুষের যে চেতনা ‘নানান বরণ গাভী রে ভাই একই বরণ দুধ/ জগৎ ভরমিয়া দেখি একই মায়ের পুত’ অথবা ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই।’ এই চেতনাভিত্তিকই ছিলো বাংলার লোকমানসের জীবনপ্রবাহ।

কবি নজরুল তাঁর চিন্তা-চেতনা ও সৃষ্টিতে লোকবাংলার মানুষের চেতনাকেই ধারণ করেছিলেন, বাংলাদেশের মাটি ও মানুষকে নিজের চেতনায় ধারণ করেছিলেন বলেই তিনি লিখতে পেরেছিলেন-

মানুষেরে ঘৃণা করি

ও’ কা’রা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি মরি

ও’ মুখ হইতে কেতাব-গ্রন্থ নাও জোড় করে কেড়ে,

যাহারা আনিল গ্রন্থ-কেতাব সেই মানুষেরে মেরে

পুজিছে গ্রন্থ ভণ্ডের দল!-মূর্খরা সব শোনো,

মানুষ এনেছে গ্রন্থ; গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো।

(মানুষ \ সাম্যবাদী)

অন্যত্র তিনি বলেন-

‘সাম্যবাদী-স্থান-

নাই কো এখানে কালা আর ধলার আলাদা গোরস্থান।

নাই কো এখানে কালা আর ধলার আলাদা গীর্জাঘর

নাই কো পাইক-বরকন্দাজ নাই পুলিশের ডর।

এই সে স্বর্গ, এই সে বেহেশত্, এখানে বিভেদ নাই,

যত হাতাহাতি হাতে হাত রেখে মিলিয়াছে ভাই ভাই!

নেইকো এখানে ধর্মের ভেদ শাস্ত্রের কোলাহল,

পাদরী-পুরুত-মোল্লা-ভিক্ষু এক গøাসে খায় জল।

হেথা ¯্রষ্টার ভজন-আলয় এই দেহ এই মন,

হেথা মানুষের বেদনায় তাঁর দুখের সিংহাসন!

(সাম্য \ সাম্যবাদী)

এভাবেই নজরুল লোকমানসের অন্তরের কথাটি তাঁর কবিতার ছত্রে ছত্রে বাক্সময় করে তুলেছেন, অন্যদিকে নজরুল সাধারণ খেটে খাওয়া নিরন্ন মানুষের কথা গভীর মমতায় উচ্চারণ করেছেন তাঁর কবিতায়-গানে। তাঁর সিন্ধু-হিন্দোল কাব্যের দারিদ্র; সর্বহারা কাব্যের কৃষাণের গান, শ্রমিকের গান অথবা আমার কৈফিয়ত; জিঞ্জীর কাব্যের নকীব; সাম্যবাদী কাব্যের কুলি-মজুর ইত্যাদি কবিতার কথা আমরা স্মরণ করতে পারি। এখানে ‘কুলি-মজুর’ কবিতা থেকে কয়েকটি পংক্তি উদ্ধার করছি-

‘আসিতেছে শুভ দিন,

দিনে দিনে বহু বাড়িয়াছে দেনা , শুধিতে হইবে ঋণ!

হাতুড়ি শাবল গাঁইতি চালায়ে ভাঙিল যারা পাহাড়,

পাহাড় কাটা সে পথের দু’পাশে পড়িয়া যাদের হাঁড়,

তোমারে সেবিতে হইল যাহারা মজুর, মুটে ও কুলি,

তোমারে বহিতে যারা পবিত্র অঙ্গে লাগাল ধূলি;

তারাই মানুষ, তারাই দেবতা, গাহি তাহাদেরি গান,

তাদেরই ব্যথিত বক্ষে পা ফেলে আসে নবউত্থান!

তুমি শুয়ে রবে তেতালার প’রে, আমরা রহিব নিচে,

অথচ তোমারে দেবতা বলিব সে ভরসা আজ মিছে!’

নজরুলের গান, নজরুলের কবিতা এভাবেই সাধারণ মানুষকে স্পর্শ করেছে। নজরুল তথাকথিত ধার্মিকদের কূপমণ্ডুকতাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন তাঁর কবিতা দিয়েই-

মৌ-লোভী যত মৌলবী আর মোল্-লারা কন হাত নেড়ে,

দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে!

ফতোয়া দিলাম-কাফের কাজী ও,

যদিও শহীদ হইতে রাজি ও!

‘আমপারা’-পড়া হামবড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মেরে। (আমার কৈফিয়ত)

নজরুলের লোকপ্রিয়তা শহুরে বিদগ্ধজনের মধ্যে জরিপের ফল নয়, বরং শিক্ষিত-অশিক্ষিত-জ্ঞানী-অর্ধজ্ঞানী-শিষ্ট-অশিষ্ট-শহুরে-গ্রাম্য-ইতর-ভদ্র সর্বস্তরের মানুষের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন। নজরুলের গান ধর্মান্ধ শ্রেণি নিজেদের স্বার্থে যেমন ব্যবহার করেছে, আমরাও তাঁর গান-কবিতা দিয়েই ১৯৭১-এ তাদের পরাস্ত করেছি। নজরুলের কবিতা থেকেই আমরা সংগ্রহ করেছি ‘জয়বাংলা’ ধ্বনি। বাঙালির জন্য স্বরাজ চেয়ে নজরুল উচ্চারণ করেছেন-

‘বাঙালিকে, বাঙালির ছেলেমেয়েকে ছেলেবেলা থেকে শুধু এই এক মন্ত্র শেখাও;

এই পবিত্র বাংলাদেশ

বাঙালির-আমাদের।

দিয়া ‘প্রহারেণ ধনঞ্জয়’

তাড়াব আমরা করি না ভয়

যত পরদেশী দস্যু ডাকাত

রামাদের গামা’দের

বাঙলা বাঙালির হোক। বাঙালির জয় হোক। বাঙালির জয় হোক।’

নজরুল-সঙ্গীতের সুরবৈচিত্র্য, বাণীবৈচিত্র্য আর আবেগ বাঙালি মানসকে মোহাবিষ্ট-অচ্ছন্ন করে রাখে। তাঁর প্রতিবাদ-দ্রোহ ও গণসঙ্গীত বাঙালির দ্রোহ ও সংগ্রামে সাহস যোগায়। প্রেমসঙ্গীতের বাণী ও সুর যেমন প্রতিটি প্রেমিক-হৃদয়কে তোলপাড় করে-উদ্বেলিত করে, তেমনি প্রতিটি ইসলামী সঙ্গীত ধর্মপ্রাণ প্রতিটি মানুষকে আবিষ্ট করে; অন্যদিকে তাঁর শ্যামাসঙ্গীত-কীর্তন প্রতিটি ভক্তহৃদয়ে প্রেমের ফল্গুধারা বইয়ে দেয়। এভাবেই নজরুল হয়ে ওঠেন বাঙালির জন্য আবশ্যিক আশ্রয়।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj