গুনাইবিবির কিস্সা : দাদা আর যাব না ঐ ইশকুলেতে : তপন বাগচী

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

‘গুনাইবিবি’ বাংলার চিরায়ত লোকগাথা নয়। সত্য ঘটনাই গ্রাম্য লোককবির বয়ানে পেয়েছে চিরায়ত রূপ। রবিশাল অঞ্চলে থেকে উৎসারিত যে দুটি কাহিনী সারাদেশে প্রচারিত ও জনগৃহীত তার মধ্যে ‘আসমান সিংহ’ ও ‘গুনাইবিবি’ উল্লেখযোগ্য। ‘গুনাইবিবি’ লোকমুখে গীত ও পরিবেশিত হতে হতে টিকে আছে। লোকগাথার শক্তিই এমন। এই কাহিনী প্রথম কে সংগ্রহ করেছিল, তা আর নির্ণয় করা সম্ভবপর নয়। এর প্রয়োজনও নেই। অনেকের মতে এটি ঝালকাঠি জেলায় জন্ম নিলেও, এখন সব বাঙালির সম্পদ। মৈমনসিংহ গীতিকার মতো এর আবেদনও সর্বজনীন হয়ে উঠেছে। অঞ্চলভেদে এই কাহিনীর পাঠান্তর ঘটলেও মূল চেতনা অক্ষুণœ রয়েছে।

‘দাদা, আর যাব না অই ইশকুলে পড়তে’ গুনাইর কান্নাজড়িত সুরের এই গান দক্ষিণাঞ্চলের প্রতিটি মানুষ জানে। আর এই গান যেকোনো বাঙালির মনেই আলোড়ন তোলে। প্রচলিত এই লোকগাথাই কিস্সার আসরে পরিবেশিত হয়। এক সময় এটি যাত্রার মঞ্চে উঠে আসে। কেবল ‘গুনাইবিবির পালা’ পরিবেশনের জন্য বরিশাল অঞ্চলে কয়েকটি অ্যামেচার যাত্রাদলও গড়ে ওঠে এক সময়।

যেহেতু এটি প্রচলিত লোকগাথা, তাই এর অনেক অসঙ্গতিকে মেনে না উপায় থাকে না। এই কাহিনীর রচয়িতা গ্রামের কোনো নিরক্ষর কথক। কাহিনীতে আছে গ্রামের পাঠশালায় পড়ে গুনাই ও তোতা। পাঠশালা অবশ্যই গ্রামীণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। গাছতলায় বসা পাঠশালায় অবশ্যই লোকজ আবহ রয়েছে। গুনাইবিবির কাহিনী নিঃসন্দেহে শতবর্ষ ধরে চলে আসছে। সেই সময় মুসলিম সমাজে সহশিক্ষার সুযোগ ছিল না বলেই জানি। কিন্তু ‘গুনাইবিবি’-র তোতাই-গুনাই একসঙ্গে পাঠশালায় পড়ে। নায়ক তোতা স্কুলে নায়িকা গুনাইকে খুব জ্বালাতন করে। তাই সে রাগে-অভিমানে ভাইয়ের কাছে নালিশ করে-

দাদা আর যাব না ঐ ইশকুুলেতে

ঐ ইশকুলেতে যেতে গেলে দাদা

ঐ দাদা সম্মান বাঁচে না।

ঐ ইশকুলের তোতা মিয়া

দাদা গো, গালি দিল মোরে

দাদা আর যাব না ঐ ইশকুুলেতে\

গুনাইয়ের ভাই রফিক স্কুলের শিক্ষকের কাছে তোতার বিরুদ্ধে নালিশ করার তোতাকে বেতের লাঠি দিয়ে পেটানো হয়। এতে গুনাই মর্মযাতনা অনুভব করে। প্রতিটি বেতের বাড়ি মনে হয় গুনাইয়ের পিঠে লাগে। স্কুল শেষে গুনাই অনুতাপ প্রকাশ করে তোতার কাছে। গুনাই তোতার ক্ষতস্থানে ওষুধের পাতা লাগিয়ে দেয়। তোতার কাছে গুনাই ক্ষমা চায়। এরপর দুজনের অনুরাগ জমে ওঠে। গ্রামের বিভিন্ন বাগানে তারা দেখা করে মনের কথা বলে। গানে গানে হৃদয়ের ভাব প্রকাশ করে।

নায়ক তোতার মা নেই। বাবা মৃত্যুশয্যায় চাচা দলিলুদ্দিনকে তোতার ভার দেয়। কিন্তু দলিলুদ্দিন তোতাকে লেখাপড়া শেখাতে চায় না। তার সম্পত্তি কেড়ে নেয়ার ষড়যন্ত্র করে। এক সময় চাচা দলিলুদ্দিন গুনাইয়ের দিকে দৃষ্টি দেয়। তাকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায়। এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হলে দলিলুদ্দিন ক্ষেপে ওঠে।

এক সময় তোতার সঙ্গে গুনাইয়ের বিয়ের আয়োজন হলে দলিলুদ্দিন ক্ষেপে ওঠে। সে গুনাইয়ের একভাই খালেককে লোভ দেখিয়ে বড় ভাই রফিককে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলার পরামর্শ দেয়। তোতা গুনাইয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে শোনা যায় চিরায়ত বিয়ের গান-

আজ বুজি তোরে যাবে লইয়া লো বুবুজান

আজ বুঝি তোরে যাবে লইয়া\

শ্বশুরবাড়ি যাবি রে তুই ঘোমটা মাথায় দিয়া

হলুদ বরণ অঙ্গে দেব হলুদ মাখাইয়া\

হায় হায়!

সবাই মিলে দিবে তোরে গোছল করাইয়া\

বিয়ের আনন্দ-আয়োজনের ফাঁকে গুনাইয়ের ছোটভাই বিষ খাইয়ে বড়ভাইকে মেরে ফেলে। পরে অনুতাপে দগ্ধ হয়ে খালেক নিজেও বিষপানে আত্মহত্যা করে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করে। দুই ভাইকে হারিয়ে গুনাইকে কণ্ঠের সুরে ফুটে ওঠে হাহাকার ধ্বনি-

আগে যদি জানতাম গো দাদা

জানতাম গো দাদা- যাইবা গো ছাড়িয়া

জন্ম আমি নিতাম না দাদা, তোমার বইন হইয়া\

খালেকের মৃত্যুর পরে যে গানটি পরিবেশিত হয়, তা হলো-

ও দাদা খালেক রে,

খালেক রে দাদা, করলি একি তুই?

ভাইকে মারিলি নিজেও মরিলি

এখন কী করি মুই!

কত সুখে ছিলাম গো আমি

ছিলাম গো আমি তোমাদের আদর পাইয়া

সেই কথা আজ মনে হইলে

আমার পরান যায় ফাটিয়া\

গুনাই তোতার বিয়ের পরেও দলিলুদ্দিনের ষড়যন্ত্র থামে না। তোতার ঘর পুড়িয়ে দেয়। এখন কী আর করা! তোতা সংসার খরচ জোগানোর জন্য বরিশাল শহরে যেতে চাইলে গুনাই নিষেধ করে। নিষেধের বাণী ফুটে ওঠে গুনাইয়ের গান-

চাকরিতে না যাইও রে বন্ধু

চাকরিতে যাইও না

চাকরির নামে বিদেশ যাইয়া ভুইলা থাইক না।

দলিলুদ্দিন গুনাইকে দেখার জন্য বাড়ির পাশে একটি বকুলগাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকে। তোতার গাছটি কেটে ফেলার জন্য মালিক কাঠুরিয়াকে ডাকে। মালিক গাছচাপা পড়লে তাকে রক্ষা না করে বরং মেরে ফেলে। তারপর পুলিশ ডেকে তোতাকে ধরিয়ে দেয়। তোতার ঠাঁই হয় বরিশালের কারাগারে। এইবার দলিলুদ্দিন গুনাইকে পাবার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। কিন্তু যাত্রার বিবেকের মতো এক দরবেশ দলিলুদ্দিনকে গানে গানে সতর্ক করিয়ে দেয়।

গুনাই একা থাকে। গাছে ডাকে কোকিল। কোকিলের ডাকে বিরহী গুনাইয়ের অন্তর কেঁদে ওঠে তাই গেয়ে ওঠে-

ও কোকিল ডাইকো না ডাইকো না

ওই কদমের ডালে

শত বসও সুখের কালে

আমার পতি নাই ঘরে

একদিন গুনাইয়ের ঘরে ঢুকে দলিলুদ্দিন ‘তার ইজ্জত লুটে নিতে চায়। এই সময় দলিলের পোষা চামচাই প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। সে গুনাইকে রক্ষা করে। তার পরামর্শে গুনাই বরিশাল যায় তোতার খোঁজ নিতে। মামির কণ্ঠে ভেসে আসে ভাটিয়ালি সুর-

গঙ্গায় তরঙ্গ ঢেউ খেলে,

ও বুবুজান গঙ্গায় তরঙ্গ ঢেউ খেলে\

আগি দিয়া আসে ঢেউ,

পাছা নায়ে ঠেলে

আল্লার নাম জপোরে বাঁচিতে চাইলে\

আল্লা বিনে গতি নাইরে

জীবননদের ভেলে\

বরিশাল এসে গুনাই জানতে পারে যে তোতাকে মৃতুদণ্ড দেয়া হয়েছে। সে বিচারকের কাছে পুনর্বিচারের আর্তি জানায়। বিচারক পুনর্তদন্তের নির্দেশ দিলে তোতা যে নির্দোষ তা প্রমাণিত হয়। দলিলুদ্দিন দোষী সাব্যস্ত হয়। গুনাই আর তোতা গ্রামে ফিরে আসে।

অনেকে মনে করেন, গুনাইবিবির পালা একটি সত্য ঘটনাশ্রয়ী। ব্রিটিশ শাসনামলে ঝালকাঠির বর্ধিষ্ণু নবগ্রাম এলাকায় গুনাই ও তোতার প্রেম পরিণয়ের কাহিনী রচিত হয়। এ কে এম শহিদুল হকের নাটকে তোতা মিয়ার পরিচয় দেয়া হয়েছে বরিশালের শালগ্রামের জমিদার পুত্র হিসেবে। হুমায়ুন রহমানের সংগৃহীত কাহিনীতে এটি বরিশালের রূপাইনগর বলা হয়েছে। নতুন কোনো লেখক হয়তো নতুন কোনো গ্রামকে প্রেক্ষাপট হিসেবে বেছে নেবেন। এভাবেই এটি সমবেত লোকমানুষের রচনা হিসেবে গ্রাহ্য হয়ে উঠেছে। জানা যায়, গ্রাম্য ভাটকবিতার ধরনে এই কাহিনী প্রথম রচিত হয়। গ্রাম্য কবিরা সুর করে পড়ে শোনাত এবং হাটে হাটে ফেরি করে বিক্রি করত। এক সময় এই কাহিনী নিয়ে রচিত হয় নাটক, যাত্রা ও চলচ্চিত্র। এই কাহিনী নিয়ে লেখা নাটকগুলোর মধ্যে গোলাম মোস্তফা মাসুমের ‘গুনাইবিবি’, চারুচন্দ্র রায়চৌধুরীর ‘আসল গুনাইবিবি ও তোতা মিয়া’, এ কে এম শহীদুল হকের ‘গুনাইবিবি’ উল্লেখযোগ্য। গুনাইবিবি কাহিনী অনেকে হাতে পড়ে বিকৃত হতে চলছিল বলে চারুচন্দ্র রায়চৌধুরী তার নাটকের নামের আগে ‘আসল’ শব্দটি জুড়ে দেন। সম্প্রতি গুনাইবিবি নাটক মঞ্চস্থ হয় গৌরনদীতে। এর নাট্যরূপ দিয়েছেন জালালউদ্দিন। এছাড়া এই কাহিনী সংগ্রহ, সংকলন ও আলোচনা করেছেন কবি জসীমউদ্দীন, সফদর আলী ভুঁইয়া, ড. সৈকত আসগর, মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন, সিকদার আবুল বাশার, হুমায়ুন রহমান, ড. মিজান রহমান প্রমুখ গবেষক।

গুনাইবিবির কাহিনী নিয়ে ১৯৬৬ সালে দুটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। সৈয়দ আউয়ালের চলচ্চিত্রের নাম ‘গুনাইবিবি’, বজলুর রহমানের চলচ্চিত্রের নাম ‘গুনাইবিবি’। আর ১৯৮৫ সালে হারুনর রশীদ নির্মাণ করেন ‘গুনাইবিবি’ নামের রঙিন চলচ্চিত্র। তবে এসব চলচ্চিত্রের জন্য নতুন করে গানও রচিত হয়। হারুনর রশীদের চলচ্চিত্রের জন্য ইন্দ্রমোহন রাজবংশী ও হাসান মতিউর রহমান গান রচনা করেন। সেগুলোও এখন গুনাইবিবির গান নামে প্রচলিত হয়ে উঠেছে। কিসসা, নাটক, যাত্রা, চলচ্চিত্র প্রভৃতি মাধ্যমে গুনাইবিবি-কাহিনী প্রতিনিয়ত ব্যাখ্যাত ও পরিমার্জিত হয়ে লোকমানসে স্থায়ী ও চিরায়ত রূপ ধারণ করেছে। এটি বরিশালের গণ্ডি পেরিয়ে এখান বাঙালির লোকসম্পদ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj