ঠিক আছে ভুলে যাব : আলাউদ্দিন আল আজাদ

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

এমনিতে সরল ও চারুলতা যদিও কারুর কাঁচাকথা ফাঁকা যায় না, কিন্তু তার মধ্যে কিঞ্চিং রসকসের গন্ধ পেলেও খিলখিল করে হাসতে থাকে, এলিয়ে পড়ে এবং এরই নাম মোনালিসা। কেউ কেউ প্রথম শব্দটা বাদ দিয়ে ডাকে লিসা শারমিন। আদিচিত্রের রহস্যময়তা কেউ আবিষ্কার করে থাকলে সেই ভাগ্যবানকে এখনো কেউ চেনে না। এখানে মুশকিল বিশেষত সইটইদের আলাপ-সালাপের খই ফোটানোর বেলায়। অনুমান বা আন্দাজে যা পূরণ করা হয় তা ওর বড় অপছন্দ।

সিলভার ফিনিশ নতুন মডেলের গাড়িটা অবশ্য রেশমসদৃশ বলছিল না, রোজমেরী পেছনের সিটে আসীন থাকা সত্ত্বেও। সে থাকলে, অকারণেই যেন একটু অন্যরকম খেলতে খেলতে যায়। দ্বিতীয় বান্ধবী তাসলিমা নাসরিনের এটা ঠাহর করতে দেরি লাগে না। এই যন্ত্রযানটা যে তার বড় ভাইয়ের। আনকোরা সংগ্রহ। চৌকস যুবক, মহানগরীর অন্যতম উঠতি বাণিজ্যচুম্বক, টেকনোলজি তথা লোহালক্কড়ের কাজ করলেও পুুষ্পল রমণীমহলে হৃদয়-কাঁপানো ব্যক্তিত্ব। ছোট বোনটিকে নিজের আদলে গড়ে তুলেছে। দুতিয়ালিতে করিৎকর্মা, আর তাতে ঝকঝকে বাহনকা বড় ভূমিকাই রাখে। তার অতিরিক্ত উড়ন্ত নাম শাহজাদা, আসল নামে বিশেষ কেউ তাকে চেনে না।

ওরা এগিয়ে যাচ্ছিল, রাস্তা ভাঙা-ভাঙা না হলেও একেবারে চাঙাও না-মাঝে মাঝেই এবড়ো-খেবড়ো। ঝকঝক করছিল।

দুই পাশে দুই জানেমন সামাল দিচ্ছে, মোনার খোলাচুল ছড়িয়ে আছে। যখন ওদের চোখে পড়ে সে কি বিড়বিড় করছে।

স্বভাবরসিক রোজ তার ডান কানটা কাত করে ঠোঁটের কাছে ধরলে নাস ফিসফিস করে উঠল, নেই! করছিল কি?

দেখছিস না, কেমন করছে?

মাথা ওর চক্কর খায়, এত ভিড় এটা তো হতেই পারে- এটা কি এমন অস্বাভাবিক ছিল?

রোজ মিটিমিটি হেসে বলল, কিন্তু মসলাটা কি আমাদের জানা দরকার না? কাঁচা সুপারির রাগ না খইনির ভাগ!

রোজ তুই যেমন দুর্বোধ্য তোর কথা আরও বেশি। মাথামুণ্ডু থাকে না। নাস এইটুকু বলে পা দোলাতে থাকে।

তোর কাছে কঠিন লাগবে, রোজ বলল, এটা কি সাচ বাৎ হলো? কত বীর পুরুষদের ভেড়া বানিয়ে ঘোরাস!

আর তুই পরিচয়ের গোড়ার দিকে নাসরিনকে নাস বলে খেপাত এখন সেটাই আসল ডাকনাম হয়ে গেছে। রোজ মধুর হেসে বলল, ডুবে ডুবে ওয়াটার খাস, এইতো? তফাৎটা খুব বেশি কি?

সখীর প্রশ্নে হেসে ওঠে রোজ। বলল, ঠিক আছে ঠিক আছে। তুই আর আমি এক। আমি চেষ্টা করছি শুনতে মোনা কারুর নাম উচ্চারণ করছে কিনা।

অলরাইট, ভেরি গুড। কিন্তু যে ওর আঁতের খবর রাখি তুই তা বিশ্বাস করবি?

কক্খনো না। আমি রিজনে বিশ্বাসী-নিজের চোখে দেখা আর নিজের কানে শোনা এটাই আসল- বাকি সব আমি উড়িয়ে দিই। সে তো তোর অজানা নয় তবু আবার বলছি। এখন আমি একটি ট্রিকস খেলব, দেখিস, ওর অবস্থা কি হয়! ডানদিক থেকে মুখটা একটু পাশে বাড়িয়ে দিয়ে রোজ যতটা সম্ভব দরদ মিশিয়ে ডাকতে লাগল, মোনা, মোনা! ও মোনালিসা! শুনতে পাচ্ছিস?

কে গো আপনি, কে? চোখজোড়া বোজা অবস্থায়ই উত্তর, অমন মিষ্টি স্বরে আমাকে ডাকছেন? আমাকে তো কেউ পছন্দ করে না- কে আপনি? কে আপনি?

ইস কি ঢং!

আমরা? আমরা অন্সরা-! আকাশ থেকে নেমেছি! নাস কনুই মারল এবং জোরে ডাক দিয়ে বলল, লিসা! তুই অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলি, আমরা তোকে এখন হসপিটালের ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যাচ্ছি। বুঝেছিস?

না, না। কক্খনো বুঝব না। দুদিকে হাত ঝাড়া দিয়ে চেষ্টা করেই যেন দৃষ্টি খুলল এবং চেঁচিয়ে বলল, না, না মিথ্যা কথা দৈবী কেউ নয়- এই তো তোরা আমার প্রিয় বান্ধবীরা। তোরা আমাকে নিয়ে তামাশা করছিস!

ওর থুঁতনিতে নাড়া দিয়ে রোজ বলল, না গো সোনার চান, না। তামাশা না। বুঝেশুনেই বেরিয়ে পড়েছি। কোনটা অসুখ আর কোনটা বেসুখ চেনার মতো লায়েক আমরা হয়েছি তো! অবশ্য ডাক্তার স্যারেরা অধিক পারদর্শী! তাতো হবেই-হামেশা-

তার বিখ্যাত ধরা ধরা গলায় হঠাৎ গান ধরে নাস : না এ চাঁদ হোগা না তারে রাহেগি মাগার হাম হামেশা তুমহারি রাহেগি!

হয়েছে হয়েছে। আর না। বেশি হলে হজম করা যাবে না-

ক্রমেই সহজ হয়ে উঠেছিল মোনা। সে মৃদু হেসে নিচুস্বরে বলল, নারে একেবারে ভিত্তিহীন না। আমি সত্যই কিছু দেখছিলাম! তিনদিকেই ভিড়। এর মধ্যে কিছু দূরে সামনে-চেনা, অথচ যেন চিনতেও পারছিলাম না-

নায়ক-নায়ক বুঝি!

হতেও পারে। কিন্তু কোনো নায়ককে দেখে আমি ভিরমি খাব, তা তো নয়। আসলে জিনিসটা এই! প্রথমে বোধের অগম্য ছিল। পরে সামান্য যা দেখলাম তাতেই মাথাটা যেন ঘুরে গেল। আমি এত-

যাক, যাক কিতাব খুলে বসিস না।

যতটুকু শুনলাম তাতেই আমরা সন্তুষ্ট।

তুই সেরে উঠেছিস এটাই বড় কথা। রোজের সহানুভূতিটা কৃত্রিম নয়, মোনা আরও নরম হয়ে বলল, তোরা দুজন এত করিস আমার জন্য, কেমন করে যে প্রতিদিন দেব, কিছু খুঁজে পাই না।

নাস বলল, পাবি পাবি নিশ্চয় পাবি একদিন, তখন কিন্তু পিঠটান দিবি না। কি যে বলিস! তোদের জন্য আমি জান দিতে পারি।

ব্যস, আর না। রোজ ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল, অন্য যিনি আসবেন তার হাতেই এই মহারতœ তুলে দিস। দূর থেকে দেখে আমরা খুশি হবো!

আগামীকাল রোববার। তেরোই ফেব্রুয়ারি, পহেলা ফাল্গুন। বসন্ত বরণের পূর্বদিন আজ চারুকলার বকুলতলায় প্রস্তুতি সমাবেশ। কারিগররা মঞ্চ তৈরিতে ব্যস্ত। হাড্ডাহাড্ডি আড্ডার ভেতরে এমন কিছুই ছিল না যাতে স্বল্প ভিড়ে ঘেষলা খেতে পারে, কিংবা করমর্দনে কচলা। আত্মভোলা, সুশীল সংস্কৃতিকর্মী ও নানা মাধ্যমের পারফর্মার শিল্পীরাই হাজির, এমন হালকা-পাতলা পরিবেশে তিন সখী প্রলাপে নয় আলাপে আলাপেই যেন বাতাসে উড়ছিল। বাসন্তী রং শাড়ি ও গাঁদাফুলের মালা পরবে কাল, এখন যারা এসেছে তাদের বিচিত্র রকমের বেশভূষা। সবচেয়ে দেখার মতো, বর্ণাঢ্য মোনালিসা। কিছুক্ষণ মহড়ার ব্যবস্থা ছিল। কাঁটায় কাঁটায় কিছুই না, তবু কার্পণ্য করেনি। তবে বৈদগ্ধের চেয়ে বিত্তের প্রদর্শনটাই বেশি। এর জন্য অগ্রিম সম্মেলনে গাড়ি করে নিয়ে আসতে ইন্দিরা রোডে ওদের বাসার সামনে থেমেছিল, দ্রুত খুটখাট দোতলায় উঠে দুই সখী অসমাপ্ত সাজগোজ যে ফিনিশিং টাচ মারে সে অতিরঞ্জন বিশেষভাবে দায়ী। কিন্তু নিজেকে রাজকন্যার মতো ড্রেসিং টেবিলের আয়নার ভেতরে দেখতে মন্দ লাগছিল না।

রোজ ওর মুখটা আঙুলে তুলে তারিফ করল এই কথায়, বাহ। তুই মাত করে দিবি রে মোনা!

হাসি হাসি বলল নাস, হ্যাঁ সত্যি। তুই একশো পাওয়ারের ভাল্ব। আমরা কুপি হয়ে গেলাম!

আমাদের দিকে কেউ তাকাবে না!

পিটি!

কিঞ্চিং উসখুস লাগছিল সহজ-সরল মোনার, সে হাতভরা রঙিন রেশমি চুড়ি বাজিয়ে বলল, আরে না না। তোদের সঙ্গে আমার তুলনা! তোরা হচ্ছিস গিয়ে হেলেন আর মেনকা!

ওর বাব্বা। কিংবদন্তি আর পুরাণ-তুই দুদিকেই পারদর্শিনী দেখছি। কে শিখিয়েছে রে এইসব? রোজ মোনাকে জড়িয়ে ধরে তার হালকা প্রসাধিত ঠোঁটজোড়ার দিকে তাকাল। নাস টিপ্পনি কাটে, আছে আছে। আছে নিশ্চয়ই- ঠিক ঠিক। মোনা বলল, ঠিক বলেছিস। না থাকলে কি চলে!

একটানা হট্টগোল, নানা কিসিমের বয়ান, বিশেষত সমাগমে উচ্চ হাস্যরসের প্রাধান্য ছিল, আর এরই মধ্যে দিনেদুপুরে জলজ্যান্ত এক সুন্দরী পতন! অনেকেই হকচকিয়ে উঠেছিল। নাস সর্বদা তুরুপের তাসের খোঁজে থাকলেও, বিপদ-আপদের সময় ধীরস্থির। সঙ্গে সঙ্গে নিচু হয়ে ধরেছিল। রোজ ও অন্য দুজন মেয়েকে বলল, গাড়ি রাস্তায়, তোমরা ওকে ধরাধরি করে নিয়ে এসো। আমি দৌড়ে যাচ্ছি- ড্রাইভার অবশ্যই সিটেই থাকবে, তবু দেখছি। ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যেতে হবে-

পিজিতে লাইন ছিল, অতিশয় বিজি। মেডিকেল তো আরও হিজিবিজি। হলিফ্যামিলিতে যাওয়ার পথে ফার্মগেটের ট্রাফিক জ্যামে যখন কারক্লকের কাঁটা কষ্টে চলছিল, তখনই চেতনা ফিরে আসে মোনালিসার।

নাস জিগ্যোস করল, আচ্ছা লিসা তুই যখন নিচে পড়ে গেলি তখন শুধু অন্ধকার দেখছিলি?

হ্যাঁ, তাইতো মনে হয়। লিসা উত্তর দেয়, তবে একটু পরে ব্রেনে ঝিমঝিম করাটা যেন থামে, আর আমি লোকের কথাবার্তা, আর আর-

কি? অমন করছিস কেন? প্রশ্ন করে রোজ, বলল, তবে থাক। টেক রেস্ট। না বলতে পারব। আমি একটি গানের কলি শুনছিলাম, মিনি ক্যাসেট প্লেয়ারে সম্ভবত কেউ বাজাচ্ছিল।

কি সেটা?

হ্যাঁ, এই তো স্মরণ করতে পারছি : কেটেছে একেলা বিরহের বেলা/আকাশ কুসুম চয়নে/সবপথ এসে মিলে গেল শেষে তোমার দুখানি নয়নে/নয়নে-

দুই.

অঘটনের আমেজ থাকলেও সেটা তেমন কিছু ছিল না, অথচ একটা বেজে গেল। উচ্চবিত্ত এবং অভিজাত ঘরের মেয়ে হলেও, এরা সীমা জানে, বাঁধন মানে। নিজ নিজ কারিশমা তো আছেই। গাড়িতে থেকেই সইকে নামিয়ে দিয়ে চলে যেতে চাইছিল। কিন্তু সে দিল না। একজনকে হাতে ধরে নামাল, টেনে নিয়ে গেল সিঁড়ির দিকে; তখন আরেকজনও পিছু নিতে বাধ্য হলো। একেক ধাপ মাড়াতে মাড়াতে মোনা প্রায় কাতরস্বরে বলতে থাকে, এত তাড়া কিসের? আমাকে বুঝি ক্ষতি কি? তাতেই যে আমি কৃতার্থ হবো!

মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে রোজ ও নাস। রোজ বলল, কেন এমন করে বলছিস?

ঠিক আছে বলতে দে। নাস বলল, ছোট হোক একটা এক্সিডেন্ট তো হয়ে যাচ্ছিল। লিসা এখনো একটু বিব্রত আছে।

না, তা নয়। আমার ছোটমাকে তো জানিস, তোদের একনজর দেখলেও আমার প্রতি নরম হতে পারেন-

বলছিল কি তুই, মোনা?

কিছু বাড়িয়ে বলছি না।

নাস বলল, মনে হয় বরং কমিয়েই বলছে। চল, একটু বসি। এত কিসসা শুনি, আন্টির চেহারাটা আরেকবার দেখেই যাই-

খাটের ধারে বসে ওরা। রোজ কানের কাছে মুখটা নিয়ে ফিসফিস করে জিগ্যোস করল, এখনো মারধর করে না তো রে?

না। কিন্তু এখন যা করছে তার মধ্যে সেটা অনেক বেশি। ভয়ে আমি চোখ নামিয়ে নিই।

সে কি! আশ্চর্য তো?

নাস বলল, আমি কিছু বুঝতে পারছি না।

তোদের বুঝবার জো নেই, আমিই এক ধাঁধার মধ্যে আছি।

কি রকম?

রাখ, একটু দেখে আসি। অনুচ্চ হাইহিল খুলে রেখে পা টিপে টিপে করিডোরের দক্ষিণ প্রান্তে যায়, আর সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে এসে, বলল, এখনো ফেরেননি। রুমে তালা ঝুলছে। জলদি কিছু বলে ফেলি, রেসকিউ করার যদি প্রয়োজন হয়? আমার কেবল তোরাই তো আছিস-

থাক থাক লিসা। তুই কাঁপছিস, নার্ভাস হয়ে যাচ্ছিস, মনে হয়। বলে নাস ওর চুলে হাত বুলিয়ে আদর করতে থাকে। নারে নাসরিন। বাসায় এসে পড়েছি, এখানে আর আমি আনকনশাস হয়ে পড়ে যাব না। এখানের বাতাস আলাদা, আমার মায়ের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে ভরপুর। এ বাতাস ফুসফুসে টেনে নিয়ে আমি জোর পাই। আমি জোয়ান অব আর্ক হয়ে যাই। কার সাধ্য আমাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, আমাকে মারে? আর এখন তো ভোল পাল্টিয়ে ফেলেছেন। মিঠা মিঠা বোল ছাড়েন। বাইরে গেলে খালি হাতে ফেরেন না, একটা না একটা উপহার সামগ্রী কিনে আনেন। এই দ্যাখ আলনায় কত বাটিক কুর্তা সালোয়ার কামিজ-সব দামি দামি। আমাদের লোকশিল্পের সেলাই কাজ। তুলনা হয় না। একটা চক্রান্ত চলছে, উনি তার নেত্রী। নাটকটা মন্দ না, একেকজন সাহায্যকারী একেকরকম ভিলেন। আমার বাবাকে তো তোরা জানিস-সোনার টুকরা ব্যক্তিত্ব। পুরাতন জমিদার বংশের ছেলে, যেমন আদবকায়দা তেমন দরাজ দিল। আমিই তার একমাত্র সন্তান-নাখাস্তা-তার কিছু হলে আমিই হবো তার সমস্ত ধনসম্পত্তির মালিক। তাই আমাকে একটা বদমাশের হাতে তুলে দিয়ে সেগুলো গ্রাস করতে চান। খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে বাবাকে হত্যা করাও তার পক্ষে অসম্ভব ছিল না। কিন্তু তার দেহে ক্যান্সার ধরা পড়েছে- এই তো সেদিন সিঙ্গাপুর থেকে চিকিৎসা নিয়ে এসেছেন। ভাবছেন বোধহয়, মরেই তো যাবে এমন লোককে মেরে লাভ কি। এ কি উঠে পড়লি যে-!

টাইম ইজ আপ-।

আর আমরাও সব তথ্য পেয়ে গেছি।

এখন শুধু একটা প্রকল্প তৈরি করতে হবে। রোজের প্রতি চোখ টিপে নাস বলল, আমরা আসব আর একদিন, সময় নিয়ে বসন্ত বরণের পর। তারপর দেখবি কত ধানে কত চাল-

ওরা চলে যাবার ঘণ্টাখানেক পরে দলেবলে বাসায় এসে উপস্থিত দুরদানা খান, সৎমা। কাঁচাবাজার হয়ে এসেছেন। একটা বড় আকারের চিতল মাছ পেয়ে যাওয়ায় টুকরি ভর্তি তরিতরকারি, শাক-সবজি সব তাজা। কিন্তু তার গলার ঝনঝন আওয়াজের অন্য মানে ছিল-ঝট করে জিনিসের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে সে প্যাকেটটা নিয়ে মোনার ঘরে এলেন-

মোনা! মোনালিসা!

জী আম্মা, ওয়ারড্রবের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো, ঘর্মাক্ত বাড়ির কর্ত্রীকে দেখে কলজে ঠাণ্ডা, বহুৎ মেহনত করে এসেছেন!

সংসারের টান জোরালোই আছে।

এই নে। খুলে একটু পর তো, আমি দেখব-

শাড়ি! শাড়ি তো আমার অনেক আছে, আম্মা!

তাতে কি? উনি বললেন, বিদিশার শপে গিয়েছিলাম, চমৎকার ডেকোরেশন। বাসন্তী রং কিন্তু আলাদা টেকচার!

ওমা! এত সুন্দর!

তোকে আরও বেশি সুন্দর লাগবে!

থ্যাঙ্ক ইউ ভেরিমাচ। কালচে এটাই আমি পরবো।

আর সেজন্যই তো কিনে আনলাম। আমি চাই তুই হবি লাখো মে এক-!

এরকম সহজ মুহূর্তে মাকে খুব মনে পড়ে মোনালিসার, মনে হয় হাসিমুখে কাছেই দাঁড়িয়ে কথা বলছেন। বুলবুল ললিতকলার ছাত্রী, সরকারি বৃত্তি পেয়েছিলেন। নৃত্যকলায় গ্র্যাজুয়েশন নিয়ে আসেন। শাহনাজ, এক সময়ের মুখে মুখে চলতি নাম। বাবা শাহ মশরুর খান, ব্যবসায়ী কিন্তু শিল্পরসিক। শিল্পকলায় এক অনুষ্ঠান দেখে পাগল-পাগল হয়ে গেলেন। নানা মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ, মনে মনে পাত্র খুঁজছিলেন। জানতেন, আর্টির জগৎ লাভ এফেয়ার্সে খুব স্মার্ট : শিল্পীর জন্য শিল্পীর সহানুভূতি ও বন্ধুত্ব স্বাভাবিক। কিন্তু তার সীমা লঙ্ঘনও অনুক‚ল পরিবেশে দেরি লাগে না। এক্ষেত্রের বালক-বালিকা মূলত মধ্যবিত্ত নিম্নবিত্তদের সন্তান তবু, প্রেম তো হতেই পারে। হঠাৎ কোনো অনন্য অবস্থায় যদি এমনি কারুর গলায়, বাস্তবে না হলেও শব্দে, মালা পরিযে দেয় তবেই তো কম্ম কাবার। বড়শিতে বিঁধে গেলে ছুটতে পারবে না: যৌবনের উন্মাদনায় কিছুকাল ভালো চললেও মোহভঙ্গ হবেই হবে একদিন। আর তখন হে দারিদ্র্য তুমি মোরে করেছ মহান বিড়বিড় করতে করতে দুজনায় দুদিকে প্রস্থান করতে বাধ্য হবে। তার চেযে বিদ্যাবুদ্ধি বিশেষ না থাকলেও মোটাতাজা একটা ধনীপুত্রের গলায় রশি বাঁধানোই উত্তম।

কিন্তু তাও অন্ধভাবে নয়-আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পেলে পানচিবনিতে কথা দেওয়ার সূত্রে তিনি স্বয়ং পাত্রকে বাজিয়ে নিয়েছিলেন।

মধুর জীবন, মধুভরা সংসার মনোরম রূপ নিতে থাকে এবং একটি শিশু ঘরে এলে তা আরও প্রগাঢ় হয়ে গেল।

যে বিদ্যা শ্রমে ঘামে শিখেছে, তাকে বর্জন করা যায় না। বরং এখানে তার উল্টাই বিকশিত হলো। নিবিড় একান্ত, প্রেমমুগ্ধ মশরুর স্ত্রীকে বাধা দেওয়া দূরে থাক, বেশি বেশি অনুপ্রেরণা ও উৎসাহ দিতে লাগলেন। বিদেশে যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে? যাক যাক। একবার দুবার তিনবার। যাক, সুযোগ পায় যতবার। সুনাম ষোলকলায় পূর্ণ হতে লাগল।

সে নর্তকী উর্বশীর প্রতিমূর্তি অর্জন করে দিনে দিনে তার ভক্ত যেমন বাড়ে, পরে নাগরের সংখ্যাও। প্রথমে কেবল হাসির কারণ ছিল, কিন্তু সিরিয়াস হয়ে গেলে বিষণœতা বাড়তে লাগল। মশরুর জানেন জান প্রাণের প্রাণ, অন্যের প্রতি ভালো ব্যবহার সৌজন্যমাত্র- ওদেরকে ফাও বলেও গণ্য করেন না। অথচ সেগুলো একটু ফাঁক পেলেই ধাও মারছে কেন এমন?

একদিন দ্বিপ্রাহরিক মহড়া শেষে একজন শাহনাজের কাছে এসেছিল, অনেকের কলগুঞ্জনের মধ্যেই বলেছিল সন্ধ্যায় যাবে গল্প করতে, আড্ডা মারতে। ঠোঁটে স্মিত হাসি, সম্মতি জানালেন।

বাসার সামনে এক ফালি বাগানের মধ্যেই শাহনাজ হাঁটছিলেন সেদিন। সেসময়- সেই গলিপথ থেকে হেঁটে গিয়ে উঠলে আবছায়াতে কলকণ্টে স্বাগত জানান। কেউ দেখেনি, অন্যজন দাঁড়িয়ে ছিল একটা গাছের আড়ালে-বললেন, চল ভেতরে, উনি এক্ষুনি এসে পড়বেন।

ও আচ্ছা, আচ্ছা।

বারান্দার দিকে যাবার জন্য ঘোরার আগেই অস্পষ্ট উতাভূতা অবয়বটা হাত তুলে অস্ত্র তাক করে। কেউ দেখেনি। ওর দুচোখেই ছিল নিদারুণ ঈর্ষা ও হিংস্রতা। বক্ষ তাক করে গুলি মারল। একটা দুটো তিনটা।

ও মাগো-একটা আর্তচিৎকার।

শাহনাজ ওখানেই লুটিয়ে পড়লেন।

এমন সংক্ষেপেই অনেকটা অকারণেই চিরবিদায় গ্রহণ করেছিলেন বাংলা নৃত্যের বিস্ময়রমণী শাহনাজ। কত হৈচৈ হলো, শোকর‌্যালি স্মৃতিসভা। কলাম নিবন্ধ সম্পাদকীয়-কতকিছু লেখা হলো। উনি ফিরে এলেন না।

ব্যাপক গোয়েন্দা তৎপরতা পরিচালনা করেও কিছু হলো না; কিন্তু ফিসফাসে একটি জিনিস জানা যায়, এই অমানুষিক দুষ্কর্মে দুরদানার হাত ছিল। তা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দেশের আপন গ্রামের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। খুব দরিদ্র ঘর, কিন্তু চটপটে। তাকে নিয়োগ করা হয়েছিল ছয় বছরের শিশু, মানে এইতো এই মেয়েটাকেই প্রতিপালন করতে। নাওয়ানো, খাওয়ানো, ঘুমপাড়ানো, কিন্ডারগার্টেনে নিয়ে যাওয়া, আবার নিয়ে আসা- সবকিছুই। তখন ওর ফষ্টিনষ্টি করার ভাবসাব চারদিকের চ্যাংড়া পরিচালকমহলে সাড়া জাগিয়েছিল। এর মধ্যে বেড়েছে নাজের আরও ব্যস্ততা, বিশেষত বিদেশে প্রেরিতব্য কালচারাল ট্রিপ তার নেতৃত্ব ও নির্দেশনা ছাড়া অতুলনীয় হতো না। চাহিদা বাড়ায় অনুপস্থিতিরও দৈর্ঘ্য। ঝোঁপ বুঝে কোপ মারে দুরদানা। দামি কিছু হাতিয়ে নেবার এটাই সুযোগ। টাকা-পয়সা, মণি-মুক্তা, হীরা দিয়ে কি হবে? খোদ মালিকটারে দখল করলে তো সবই পাওয়া যাবে। বড় একখান স্ক্যান্ডাল হোক না, স্যান্ডেল তো আছে এবং চাইলে, ক্যান্ডাল জ্বলবেই!

যদি বলতাম

আমার সখীরা অনেকটা মুক্তপাখি, তাই নকলও ওদের আকর্ষণ করে; নকলের দিকে ওরা যায়, ওগুলো নেড়েচেড়ে দেখে। কিন্তু আসল ঠিক রাখে। এটা আকস্মিক নয়, ওদের বৈশিষ্ট্য। যদি বলতাম, আমি তাকে দেখেছি এবং একনজর তার কাণ্ড দেখেই জ্ঞান দেখেই হারিয়েছি- ওরা তাজ্জব হতো না। কারণ দুজনেই অভিজ্ঞতার সাজানো নৌকা নয়, জাহাজ। পাথর, পরশপাথর সবকিছুতে ভরা। বড়কে দাম দেয়, ছোটকেও কম না। ওরা মূল্যবতী, হয়তো তাই যথাসময়ে ভাগ্যে পতনকে কৌস্তুভরতন ভাবতে দ্বিধা করে না। আমার মায়ের অপঘাতে মৃত্যুর বছর দেড়েকের মধ্যেই গৃহসেবিকা দুরদানা বেগম দুরদানা খান হয়ে যান। বড় হয়ে শুনেছি সব। তার গল্প, কীর্তি কাহিনী। তার পাশের বাসার বান্ধবী, কাজের মেয়ে মঞ্জুরী, মাঝে মাঝে বলত। হৃদয়টা খুব সাফ ছিল ওর এবং দরদিও। ওর সঙ্গে লাইন করেই উনি একজন ভ্রাম্যমাণ গণসাক্ষরতা এনজিও কর্মীর কাছ থেকে কিছু কথ্য ইংরেজি ও বাংলা শিখেছিলেন। ছোটবেলায় তত্ত্বতালাপি মেনে নিলেও আদর করলে চিৎকার করতাম, আর খামচাতে থাকতাম। বয়েস সাড়ে সাত থেকে এই করতে করতেই তো বেড়ে উঠলাম। খারাপকে সহ্য করতে পারতাম না, কখনো কখনো মূর্ছাও যেতাম।

কাছে গেলে বিতৃষ্ণায় ছেয়ে ফেলে, ঘৃণায় চোখ তুলে তাকাতে পারি না; কিন্তু এখন, ওদের বিদায় করে হালকা শাওয়ার নেওয়ার পর ডাইনিং টেবিলে তার বিপরীতে বসে আস্তে আস্তে খাচ্ছি। তার প্রিয় খাদ্য সবই আছে। বাঁশমতির ভাত, চিতল মাছের পেটি। রুইয়ের মুড়োর মুগডাল। মিষ্টি দইয়ের সঙ্গে খেজুরে গুড় ভেঙে খান। আমি পছন্দ করি রসমালাই, বাইরে থেকে এনেছেন! শাস্ত্রমতে তিন প্রকার রমণী-পদ্মিনী, হস্তিনী, শঙ্খিনী। এনার জাত কি? এ তিনের একটাও না; বরং মনে হয় রাক্ষুসী-যা রূপকথায় এখনো আছে। মাঝে মাঝে কথা বলছেন, আর বড় বড় গ্রাস তুলে খাচ্ছেন। দৃশ্য একখান। রোজের পিতা এবং নাসের ভ্রাতা সম্পর্কে মজার মজার অনেক বললেন এবং নিজে নিজেই গা ঝাঁকিয়ে হাসলেন। রোজের বাপ নাকি মেয়ে দেখলেই বাঁ হাতের তর্জনীতে কান চুলকান, আর দ্বিতীয়ের ভাই, ঢোক গেলেন। বাবা একেবারে অন্যরকম; শান্তশিষ্ট-কথা বলেন খুব কম, বিশেষ করে পতœী প্রয়াত হবার পর থেকে ঘরের দরজা বন্ধ করে কতদিন আমাকে বুকে চেপে কেঁদেছেন। বারবার অবিরল অশ্রæ ঝরেছে শুধু, শব্দ থাকত না। জীবনে নিরুৎসাহ, চলাফেরায় নির্জীব হয়ে গেছেন। একতলার ড্রয়িংরুম, ওপরে ওঠার সিঁড়ি, করিডোর দেয়াল ও শয়নকক্ষে একজন বিখ্যাত ডেকোরেশন বিশারদ এনে মায়ের বিভিন্ন নৃত্যভঙ্গি ও মাঝে মাঝে নিজে দুজনের ছবি টাঙিয়েছিলেন। আস্তে আস্তে সব অদৃশ্য হয়ে গেল। গৃহকর্তার অনুপস্থিতিকালে কোথায় নিয়ে ফেলে দিয়েছেন, কেউ জানে না। এক যুগ মানে বারো বছর। বারো বছর পর কানাঘুষা শুনি, নাজের পুনর্জন্ম ঘটছে। একটি জনপ্রিয় দৈনিকের আনন্দকণ্ঠ পাতায় চার কলামজোড়া আবক্ষ প্রতিকৃতি ও স্তুতিবাদে জড়ানো যে মূল্যায়ন প্রথম বেরল তা চারদিকে রীতিমতো চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। টেলিফোন বাজতে থাকে অনবরত। বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, টিভি চ্যানেল এবং অন্যান্য সংবাদ মাধ্যম যেন একটা অনভিপ্রেত ঘুমের ঘোর থেকে জেগে ওঠে। এসেছিল সে চলে গেছে। বিশেষ কোনো স্বীকৃতি পায়নি। নানা সংগঠনের সম্মাননা উপহার, রাষ্ট্রীয় পদক-দূরের কথা। ভাগ্যিস বিটিভিতে পাঁচ-ছটি পারফর্মেন্সের ভিডিও ফুটেজ পাওয়া গেছে আরকাইভস গঠনের সময়। স্টিল ফটোও পাওয়া যাচ্ছে। সংবাদপত্রের স্টাফ ফটোগ্রাফারদের কভারেজের ছবিসহ শিল্পকলার ডিসপ্লেয়িং ছবির সংগ্রহও প্রশংসনীয়। বাবার চলনে বলনে একটা তেজি ভাব এসেছে দেখে আমি খুশি হলাম। এক বিকেলে আমাকে আদরে জড়িয়ে বললেন, তোর মা। শিল্পী শাহনাজ। মরেনি, এখনো মরেনি। বেঁচে আছে। তোর মায়ের অকৃত্রিম বন্ধু চিত্রশিল্পী মনিরুলকে ধন্যবাদ, উনি তোর নাম রেখেছিলেন, উনিই প্রথম সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

আমাকে ধরে নিয়ে বিশ্রামকক্ষে গেলেন এবং আড়াল থেকে বার করে তার সংগৃহীত আমার মায়ের ছবির একটা মোটাসোটা ভারী অ্যালবাম দেখাতে লাগলেন।

নানা পোজে মুদ্রায় অভিব্যক্তির তোলা ছবিগুলো দেখতে দেখতে এক আশ্চর্য অনুভূতিতে ভেসে যাচ্ছিলাম। কাছেই বাবার নিঃশ্বাস পড়ছে। আমি ঢের পাই তার ভেতরে জোয়ার। তিনি যেন সত্যই সূ²ভাবে বদলে যাচ্ছেন। এতদিন মুমূর্ষু ছিলেন, এখন বেঁচে উঠছেন।

কি সুন্দর ছিলেন আমার মা!

হ্যাঁ। দেবী নয়, দেবীর চেয়ে অতিরিক্ত কিছু-

ছবিগুলো-থেমে যাই।

কি বলবে বলো না?

বলছি বাবা বলছি, স্বাভাবিক অবস্থায় তোলা সেজন্য আরও বেশি সুন্দর- আমার কি মনে হচ্ছে জানিস? বাবা বললেন, আমি আর একলা নই-তোর মা আর আমি আগের মতো একসঙ্গেই আছি!

চোখে পড়ে চেহারায় আত্মপ্রত্যয়ের ছাপ।

অথচ কি অসহায় উনি ছিলেন। চরম লাঞ্ছনার মুহূর্তেও জ্বলে উঠতে পারতেন না। মিইয়ে যেতেন।

এই তো এখন দেখতে পাচ্ছি। ইডেনে পড়ছি। ইয়ারলি হয়ে গেছে, পড়াশোনার চাপ চিল। টেনিস বলটি নিয়ে করিডোরে খেলছিলাম, একলাই।

হঠাৎ বলটি নাচতে নাচতে ওদের বেডরুমের ভেতরে চলে গেল। গেলাম, কিন্তু খুঁজে পাই না। নিচু হলাম এবং হামাগুড়ি দিয়ে খাটের তলার অপর প্রান্ত পর্যন্ত চলে গেলাম। হাতড়ে হাতড়ে দেখছিলাম। আচমকা ধুপধাপ, জুতার দ্রুত খটখট, অদ্ভুত শব্দ। ওদের চিনতে দেরি হলো না, যদিও নিচের দিক ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। শাহ মশরের একটা হাত সজোরে ধরে তাকে টেনে ভেতরে আনছেন দুরদানা, যখন উনি বিব্রত গলায় চাপাস্বরে বলছিলেন, আহ এ কি করছ তুমি দানা? বাসায় লোক আছে তো? থাক না, আমার কি? ঝট করে দরজা টেনে ছিটকিনি লাগিয়ে দিলেন। বললেন, খুব তো ব্যাটাগিরি দেখাও অথচ আলাদা বিছানায় থাকো। মাঝে মাঝে আলাদা ঘরেও। পেয়েছ কি তুমি? মৃত মাগীর ধ্যানে সারাক্ষণ থাকো। আমি সব বুঝে ফেলেছি। তুমি আমাকে তোমার বিষয় আশয় থেকে বঞ্চিত চাও। তুমি আমাকে সন্তান দেবে না, কিন্তু আমি জোর করে নেবো। আরে আরে!

করছো কি? কাপড় টানছো কেন?

কেন বুঝতে পারছো না, নাকে দুধ খাও, না? আমি তোমার স্ত্রী, আমি এখন উত্তেজিত-স্বামীর কর্তব্য পালন কর।

ছি ছি দুরদানা, দিনেদুপুরে-আমরা কি জানোয়ার হয়ে গেছি? শুধু জানোয়ার নয়, জানোয়ারের চেয়েও বড় জানোয়ার আমরা-যদি হাঙ্কিপাঙ্কি করো আমার জিনিস আমি জোগাড় করে নেবো।

কত নচ্ছার হাত বাড়িয়ে আছে-

বেশ বেশ। তাই করো, তাই করো।

তবু আমাকে রেহাই দাও

তখন বাধা দিলে মাথার খুলি উড়িয়ে দেব কিন্তু।

আচ্ছা, আচ্ছা, তাও ভালো।

আমি বলতাম যদি ভিড়ের দিয়ে আমি অদূরে মুবারককে দেখে চমকে উঠেছিলাম, তবে তার কিছু মনে থাকত না। ওরা জানত আমার সঙ্গে তার সম্পর্ক কি। বলা যায়, ভাসা-ভাসা। গ্রামে গোড়া শক্তই আছে; কিন্তু শহরে আছে পরগাছার মতো, টাউট ও বাউণ্ডুলে ছোকরাদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়, আড্ডা মারে। উড়নচণ্ডি মাথার চুল, এলোমেলো। পরণে জীনস গায়ে কখনো বুকছাপ গেঞ্জি, বেশিরভাগ ঢোলাঢালা চেক শার্ট। বাইরে বেরুলে কালো চশমা পরে। দেখলে মনে হয় ফুর্তিবাজ; কিন্তু ভিতরের মতলব কি ঠিক ঠাহর করা যায় না। প্রথম দেখাটা বেশ মজার ছিল। আমাদের গ্রাম রায়পুর থানার নারায়ণপুর, বেশ ঘটা করেই বাবার চাচাতো ভাইয়ের মেয়ে ফারজানার বিয়ে হচ্ছিল। পরিবেশবাদীদের আন্দোলনে পাটের বাজার চাঙা হচ্ছিল, পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ; কম দামের ডিজাইনে তৈরি চটের থলে শহরে-বন্দরে এবং গ্রামেও হু হু করে চলছিল। পাটের চাহিদা মিটিয়ে ফজল চাচার পকেটে পয়সা ঝনঝন করে। আদরের কন্যা, প্রাণভরে খরচ করছিলেন। বিয়ের আসরে হাসির বক্তৃতা দিয়ে জমিয়ে তোলে। তখনো দেখিনি। অন্দরমহল থেকে কানে এসে বাজছিল, তার হররাও হৈচে। বড়ঘরে ঢালাও বিছানা। পরদিন উঠতে দেরি হলো। বিশ্বরোগ হওয়ায় সুবিধা। ভারী নাশতা খাওয়ার পর বিদায় নিয়ে রাস্তায় গিয়ে পড়তে দশটা বেজে গেল। আধমাইলতক চলে বাজার প্রান্তের বাসস্ট্যান্ডের কাছে যেতেই আরেক ফ্যাকড়া। কাঁধ থেকে ঝুলানো একটা ব্যাগ, বাঁহাতে গুটানো ছাতা, গগলসটার এক হালফ্যাশন তরুণ ডানহাত ওপারে তুলে ইঙ্গিত দিচ্ছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও গতিমন্থর করে, অবশেষে ড্রাইভার গাড়ি থামালো। দেখা যাচ্ছে পেছনে তিনজন, বাঁধারে এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক। সকলের পাইকারি দুলাভাই। তার কাছে এসে নিচু হয়ে বলল, এক্সকিউজ মি স্যার আমি বিপদে পড়েছি, একটু লিফট যদি দিতেন। এগারোটার মধ্যে ঢাকায় পৌঁছতে হবে। জরুরি। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি, কোনো বাসই আসছে না।

তাতো বুঝলাম। কিন্তু জায়গা কোথায়?

আপনি অনুমতি দিন, জায়গা আমি করে নেবো।

কেমন করে? তুমি ম্যাজিক জানো নাকি?

জী না, কিন্তু আমি অঙ্ক জানি। অঙ্কের বুদ্ধি খাটাবো। দয়া করে আপনি বলুন, ইয়েস! ইয়েস!

সোজা হয়ে দাঁড়াল, ভিতরটা একনজর দেখে নিয়ে বলে উঠল, ইউরেকা! হয়ে গেছে!

তুমি দেখছি অসম্ভব পোলারে, যেখানে সেখানে ছায়াবাজি খেল। এবার বল, কি করবে?

সমাধান খুব সোজা। আপনিও বাহবা দেবেন। ঠিক আছে? প্রথমত পিছনে তিনজন আছেন তো? তারা চাপাচাপি করে বসবেন। ফলে ডানধারটা ফাঁকা হয়ে যাবে। তারপর সামনে ঘোমটা দিয়ে ছেলেটা কোলের কাছে নিয়ে যে মহিলা বসে আছেন তিনি নামবেন এবং সেখানে বসবেন। ব্যস, হয়ে গেল, আমি সামনে বসবো। কি স্যা, কেমন বুঝলেন? হলো তো?

হয়েছে তো! আতাপাতা ব্যাঙের মাথা। না বাপু, আমাদেরকে ছেড়ে দাও। আমরা এত সব ঝামেলা করতে পারবো না। কি বলো মা মোনালিসা?

মোনালিসা! আশ্চর্য তো? বাংলার গ্রামের পথে এ নাম কেমন করে এলো! মোনালিসা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ চিত্রকলা!

আমি অভিভূত। হয়তো অকারণেই। উৎসবের সাজগোজ তখনো আমার ছিল। কিঞ্চিং লজ্জিত হলাম বৈকি! কিন্তু আমি মূক, কোনো কথা বলতে পারছিলাম না।

এ সময় তিনটা ষণ্ডামার্কা ছেলে ওর কাছে এলো। একজন বলল, কি ওস্তাদ। নিতে চাচ্ছে না? ইট দিয়ে ভাঙবো নাকি? না উলটিয়ে পথের ওধারে ফেলে দেব? সাবধান! তোদের কিছছু করতে হবে না। যেদিকে যাচ্ছিস, চলে যা। আর একটি কথাও যদি বলিস সবকটার ঘাড় মটকে দেব।

মাফ করো, মাফ করো। আসলে বুঝতে পারিনি, তোমার আত্মীয়। আমরা চলে যাচ্ছি, গেলাম!

গুণ্ডাগুলো দ্রুত ভেগে গেলে ড্রাইভারের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে তরুণ বলল, মি. ড্রাইভার। সোজা চালিয়ে যান। কোনো ভয় নেই।

এ সময় আমার শিয়ায় যেন দ্রুত রক্তসঞ্চারণ হতে লাগল। একটু ফিরে ফিসফিস করে দুলাভাই কে বললাম, ওকে নিয়ে চলুন।

হ্যাঁ, হ্যাঁ। অবশ্যই, সাইডে মাথাটা বার করে ওর দিক হাত বাড়ালেন। বললেন, শোনো বাবা। তুমি চল আমাদের সঙ্গে। তুমি যেভাবে বলেছ, জায়গা করে ফেলেছি। সামনে বসে পড়।

জী না স্যার, মাফ করবেন। আমি যেতে পারব না। চাপাচাপিতে আপনাদের খুব কষ্ট হবে, বিশেষ করে মোনালিসার।

না না হবে না। কষ্ট হবে না।

ছেলেটি কিছুতেই শুনল না। আমার ইচ্ছা হচ্ছিল, নেমে পড়ি। আবার বিয়ে বাড়িতে ফিরে যাই, কিন্তু কিছুই করতে পারিনি। গাড়িটা দ্রুতগতিতে চলল যেন আকাশ ছাড়িয়ে অনন্তের দিকে।

তিন.

আহার শেষে আপন কামরায় গিয়ে শৌখিন কুশনটাতে বসল, জননীর ব্যক্তিগত ব্যবহারের অন্যতম ভালো লাগার আসবাব ছিল এটা-পরিশ্রমের কাজ মহড়া ও নির্দেশনা শেষে বাসায় আসার পর ওটার দিকেই চলে যেতেন। কিছুক্ষণ উপবিষ্ট থেকে জিরিয়ে নিলে শান্তি লাগত। মোনা ওটাকেই কোলের ওপরে থুয়ে শাড়িটা নেড়েচেড়ে দেখে। ডিজাইনটা মন কাড়ে এটা সত্য। কিন্তু কেন এটা করবেন উনি? কপাল কুঁচকে গেল। বিরক্তির সঙ্গে খাটের একধারে ফেলে রেখে শুয়ে পড়ল। অনেক প্রকার ভাবনা আসে যায়; কিন্তু একটাই বারবার ঘুরছিল। বান্ধবীর ভেবেছিল শারীরিক দুর্বলতা, যে কারুর কোনো না কোনো কারণে তাতো হতেই পারে। কিন্তু আরাম করতে করতে ওর মনে হচ্ছিল হঠাৎ জাগা আবেগটার পিছনে রিজনও ছিল। খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করে, দেখতে পায়- প্রথমত জরুরি কাজে তিন-চার দিন থাকবে বলে গতকাল সকালে দেশের বাড়িতে চলে গিয়েছিল দুরদানা, সুতরাং চলে যেতে না যেতেই ফিরবে এটা অসঙ্গ। ইনস্টিটিউটের বাইরের গেটের সামনে লিমুজিন থেকে যখন নামল তখন তো বেশ তরতাজা লাগছিল! দ্বিতীয়ত, নামমাত্র তিন-চারটা সুরঞ্জনা গোছের যুবতী তাকে ঘিরে ধরল কেন? একটা উচ্চকণ্ঠও শোনা গেল, ওদিকে যাবেন না। আমাদের দেরি হয়ে যাবে। কালকে তো আসবই।

তারপর দুজনে দুহাতে ধরে নিয়ে যায়। গাড়িতে উঠল সবাই। চলে গেল! দুটো ঘটনাই সন্দেহজনক নয় কি? অনেক বন্ধু-বান্ধবী আছে, থাক না। কিন্তু সবার সঙ্গে সম্পর্ক একেকরকম হলে কিছু কিছু কিন্তু থাকতে পারে বৈকি।

এরকমই যে হবে, প্রথমদিনেই আঁচ করেছিল। নিজেকে পাত্তা দেয়নি। এটা আত্মীয়তার সূত্রও নয় বন্ধুর সাধারণ মেলামেশার একটি ফল। তবে একটার পর একটা কাণ্ডের অভিজ্ঞতা যেন কিছুটা নাটকীয়ই ছিল। আত্মীয়ার বিয়ে খেয়ে ফিরে আসার সময় যেটুকু, অবশ্য মানবিক, নতুন প্রজন্মের ভাবগতিক বোঝা গেছে। যদিও মুখটা তেমন দেখেনি, সন্ধ্যা পর্যন্ত ছেলেটার আচরণ ঘুরেফিরে মনে এসেছে। হাসিও পায়। শুনতে পায়, পঞ্চদশীও নয়, ষোড়শী ইংরেজি যারা জানেন তারা বলেন সুইট সিক্সটিন। আসলেই কি মধুর? হতেও পারে-নইলে ফুল পাখি নাচ-গান এত ভালো লাগবে কেন। রাস্তার একটু সামান্য ঘটনা, গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালে দূর থেকে একটু দেখেছিল, তাও উইন্ডো স্ক্রিনের মধ্য দিয়ে, পরে মনে রাখার মতো সেটা ছিল না। কিন্তু এইটুকুই যে করেছিল তা ব্যতিক্রম বলেই বোধ হয়। যাতে বাস্তব বুদ্ধির ঝুঁকি নেওয়ার পরিচয় আছে; তাছাড়া, কণ্ঠস্বর, পুরুষের কণ্ঠস্বর তো শুনছে হামেশাই। কিন্তু এটা কি ছিল স্বতন্ত্র? ইচ্ছা হচ্ছিল জিজ্ঞেস করে নামটি কোত্থেকে এসেছে; কিন্তু তেমন কাছাকাছিই আসেনি। উপরন্তু সংকোচও ছিল। ইডেনে তখন মাত্র প্রথম বর্ষের ছাত্রী, ইউনিভার্সিটির তরুণীদের মতো তত চালাকচতুর হয়ে ওঠেনি।

বোঝা যায়, গ্রামে ঋতুর কদর শহরের চাইতে বেশি; চলতি প্রথা অনুসারেই এই বিয়েটাও ফাল্গুন মাসে আয়োজন করা হয়েছিল।

কোকিলের কুহু কুহু শুনছিল আর ওর অন্তরে এক অজানা আবেগের ঢেউ উঠছিল, পড়ছিল। ফিরে আসার পর বাড়িটা ঘুরে ঘুরে দেখে। লতাপাতা ঝড়ঝোপড়া অনেক কিছুই নতুন লেগেছে। মা শাহনাজ বাসার লন জুড়ে বাগান করেছিলেন। একজন গার্ডেনার মাঝে মাঝে এসে কাজ করত। পুষ্প উৎপাদন বিষয়ে পাকা লোক ছিল। এখন সেসব গাছও নেই, সেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও অনুপস্থিত। শুকনো পাতা পায়ে কাজে। আগে শরতের জ্যোৎস্নায় জানালা দিয়ে নিচে তাকালে এক নৃত্যরতা শিল্পীর ছায়া দেখতে পেত এবং সেই সঙ্গে তালে তালে চরণ মঞ্জির আওয়াজ। আজকাল আসে না।

ওপরের কিচেনে রাঁধুনি আছে, আর তার আট বছরের ছেলেটা। এটা যেন সরাইখানা। দিনভর ছোটমার চেনা-অচেনা কুটুম-অটুকুম যাওয়া-আসা করছে, তবু এখানে এক নিস্তব্ধতা। উনি দুপুরের খানা খেয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন এক মহিলা সমাবেশে যোগদান করতে, মনোনীত এমপিগণের একজন হবার জন্য আগেভাগেই আপ্রাণ করেছেন। লবিং সুপারিশ উপহার কোনোকিছুই বাদ দিচ্ছেন না। দুরদানা বাইরে গেলেই বাড়ি নিঝুম হয়ে যায়। ও হ্ হো, এটা তো এখনকার অবস্থা-মোনা হঠাৎ সচেতন হলে একরাশ তথ্য এসে ভিড় করে। অনেক আসনপিয়াসী স্বপ্ন দেখতে দেখতে বিগত ডিসেম্বর মাসটা পার করেছেন, এটা নিজেদের বৈঠকখানার নানা প্রসঙ্গে আলোচনা থেকেই তা বুঝেছে এবং জানুয়ারি থেকে আসল প্রোজেক্ট শুরু- কেউ কেউ তা করেছেনও। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর এই নয় কি আট মাসও যায়-রাজনীতি বড়ই ধান্দাবাজি, এই সময়টা আর কতটুকু দীর্ঘ! দুরদানা ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকেই তৎপর, তার যুক্তি অমর একুশের মাস- এর আলাদা এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদা রয়েছে। নাহ অতীত-বর্তমান মস্তিষ্ক ঘুলিয়ে দিচ্ছে। যাক এসব, যাক্ যাক্ গ্রাম থেকে ফেরার পর তখনকার যে দিনটা, তাকেই ওজন করে দেখতে চায়-মনে হচ্ছে ফাঁক-ফাঁকা, শূন্য। এভাবে সময় কাটিয়ে লাভ কি? যখন ভাবল, আচমকা অপূর্বতা। দোতলায় টেলিফোন বাজছে, ক্রিং ক্রিং ক্রিং ক্রিং। তক্ষুনি ছুট দিল। হাঁপাতে হাঁপাতে ওপরে গিয়ে ধরতেই প্রিয় চেনা গলা-

ওদিকে থেকে রোজ বলছে, মোনালিসা, কেমন আছিস? কোথায় ছিলি? অনেকক্ষণ ধরে আছি-

ইস! কতক্ষণ আর? এই তো বাজলো! একা একা খুব বোরিং লাগছিল। আমি দৌড়ে এলাম! ওহো শোন, তুই আর নাসকে কত করে অনুরোধ, মিনতি করেছিলাম। নড়লিও না, চড়লিও না। মাগো, যা ফুর্তি হয়েছে। আমাদের দেশের গ্রামীণ বিবাহ এক আশ্চর্য জিনিস-তার মধ্যে কি আছে কি নেই? ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। অনুষ্ঠানের একেকটা পর্বে একেক উত্তেজনা। মেয়েরা দলবেঁধে বিয়ের গান গাইছে-কত সাধ আহ্লাদ ব্যথা-বেদনা সেসবের মধ্যে অজানা অতীতের জীবন্ত ইতিহাস। বর এলে তাকে নিয়ে হুলস্থুল-ছেলেমেয়েদের অনেক বায়না। জামাইয়ের কাছ থেকে কত বেশি আদায় করা যায়! কিন্তু সবচেয়ে মজার ব্যাপার থালার পানির মধ্যে পরস্পর বর-কন্যার দরশন! দুষ্টু ছেলেরা ঘাড়ে ধরে ঠুস মারে আর সে চেহারা নাস্তানাবুদ।

খুব লোভ হচ্ছে, আর বলিস না। অপর প্রান্ত থেকে রোজ বলল, এদিকে একটা অদ্ভুত কাণ্ড ঘটেছে।

অদ্ভুত? আমি কিছু বুঝতে পারছি না, খুলে বল।

বলব আর কি? নাসরিন তো আর আমাদের চেয়ে বড় নয়-

হ্যাঁ হ্যাঁ, তাতো নয়ই। ষোলোর চাইতে কিঞ্চিং বেশি হতে পারে-

বিলেত থেকে এক বিরাট ধনপতি এসেছেন। উনি রেডফোর্ট নামের এক বিখ্যাত হোটেল মালিক। এক অনুষ্ঠানে ওকে দেখে একেবারে কাত। বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসেছেন।

তা তো দিতেই পারেন, অসুবিধাটা কি?

না, কিছু নেই। ব্যাপারটা উনার ওমর মাত্র একান্ন বছর। মাত্র একান্ন? বাহান্ন হলে ভালো ছিল, একটা গৌরবময় তারিখ। আরেকটু প্রশ্ন করে রোজ, এতকাল উনি কি করেছেন? শরামতে নিশ্চয় গোটা তিনেক দুরস্ত করেছেন।

না, তিনি চিরকুমার ছিলেন। ছোটবেলায় সুনামগঞ্জ থেকে দরিয়ায় পাড়ি জমিয়ে লন্ডন গিয়ে পাউন্ড অর্জনে এতই ব্যস্ত ছিলেন, অওরাত কি জিনিস একদিন ভেবে দেখারও সময় পাননি! বলদ!

ভাণ্ড ভর্তি মণ্ডা নয়, কাণ্ড বটে। অনর্থক আড্ডা দেওয়ার মধ্যে যে বল্গাহারা কৌতুক বন্যা তা অবশ্যই অনন্য। ফোনে আলাপের পর পরই ওরা দুজন শুধু নয়, পথ থেকে আরও তিন-চারজন কুড়িয়ে নিয়ে এসেছিল। আমাদের অস্থিরতায় প্রাঙ্গণও কাঁপছিল। সূর্য ডোবার সময়েই যে যার বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। প্রথমবার তেমন দুঃসাহস থাকে না। বিশেষত হালে সামাজিক পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হচ্ছিল। প্রতিদিন সকালে খবরের কাগজে কোনো না কোনো একটা অপরাধ চিত্র থাকেই। ওপরতলা থেকে নেমেই গেট পর্যন্ত ওদেরকে বিদায় সম্ভাষণ জানিয়ে এলো। খুব হালকা লাগছিল। ব্যথা-বেদনা, দুঃখানুভূতি যেন উড়ে চলে গেছে। সোনারগাঁওয়ে সেমিনারের পরে ডিনার আছে, ছোটমা ফিরবেন দশটার আগে নয়। দোতলার সব বাতি জ্বেলে দেয়, মাগরিবের পর দূর থেকে গানের সুরও বাতাসে ভেসে আসছিল। ওর যেটুকু নাচ, তা জেনেটিক-নিজের শরীরেই বাঁধা থাকে কোনো সাধারণ তরঙ্গ জাগায় না; তবু রবিশঙ্করের সেতার ছেড়ে দিল। মুদ্রা নেওয়ার চেষ্টা করছে, অঙ্গভঙ্গি যেন ঠিকমতো আসে তারও, এমন সময় বাইরের গেটে গাড়ির শব্দ। সে ভিতরে এসে করিডোরে থামল। বাবা ফিরেছেন! দেশে গেলেই হাজারো কাজে তিনি জড়িয়ে পড়েন। বর্তমানে গ্রামে জনকল্যাণমূলক কোনো একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ভাবনাচিন্তা করছেন। পারিবারিক দায়িত্বের বাইরে তার জন্য বৈঠক ও আলাপ-আলোচনা করতে হচ্ছে, মোনা দেখে এসেছে। তার দিল-কলজে খুব বড়, ভয়ডর বলতে কিচ্ছু বোঝেন না। ওর মনে হচ্ছিল, তার ফিরতে বারোটা বেজে যাওয়াও সম্ভব।

সাধারণত উনি চুপচাপ সিঁড়ি মাড়িয়ে ওঠেন এবং নিঃশব্দে নিজের কক্ষে ঢোকেন।

মোনা মা কই গো! আছিস নাকি? শেষ ধাপ ছাড়াতে ছাড়াতে বললেন, আমি এসে পড়েছি!

দুর্বল শরীরে, না ঘামলেও কিছু কিছু হাঁপাচ্ছিলেন। দৌড়ে কাছে যায় মোনা, তার হাত আঁকড়ে ধরে বলল, বাবা। বাবা! তোমার জন্য আমার ভাবনা হচ্ছিল! রাস্তাঘাট তো ভালো না। রাতের বেলায় আরও খারাপ হয়ে যায়।

না না, না। আমরা সাবধানে এসেছি। করিডোরে চেয়ার-টেবিল পাতা আছে। উনি বসে পড়লেন, বললেন, মা! এক গøাস পানি দে, খাবো!

মোনা দ্রুত যায় ফ্রিজের কাছে, কাচের জগটা তুলে এনে পানি ঢেলে দিল, জিগ্যোস করল তোমার খারাপ লাগছে, বাবা?

না, না। খারাপ লাগবে কেন? আমি বেশ ভালো আছি। দ্যাখ তো, আমার চেহারা বেশ তাজা লাগছে না? আসলে কি জানিস? নিজের চোখেই তো দেখেছিস, খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন করলে লোকের ঢল নামে। দাওয়াতের চাইতে ফাও মেহমান বেশি, কিচ্ছু বলাও যায় না। বড় গ্যাঞ্জাম। আমি কাহিল হয়ে পড়েছিলাম।

বিছানায় শুয়ে একটু বিশ্রাম নাও না বাবা? ভালো লাগবে।

হ্যাঁ, হ্যাঁ। নেবো মা নেবো! হঠাৎ বলে উঠলেন, ওহহো বিরাট ভুল হয়ে গেছে একটা!

কি ভুল বাবা?

তোর তো নিশ্চয় মনে আছে আমার বাজানের দোস্ত মনসুর আহমদ প্রাইমারি শিক্ষক ছিলেন।

হ্যাঁ, বাবা। তার সম্পর্কে মাঝে মাঝেই তো আলাপ করো তুমি!

সন্তানাদি খুব বেশি গরিবও হয়ে পড়েছেন।

তোমার কাছে এসেছিলেন নাকি সাহায্য চাইতে?

না, মা। না, না। এমন যদি হতো তবে বেশ ভালো ছিল। মরতে মরতে উনি বাঁচেন, তবু কারুর কাছে হাত পাতেন না। কত কৌশলে কিছু দিতে চেয়েছি, মুখ দেখলেই ধরে ফেলেন। তার বড় ছেলে মহসিন আমার সহকারী ছিল। সে আরও এককাঠি ওপরে-পকেটে হাত ঢোকালেই গালাগাল শুরু করে। টাকা করেছি, চোর চোট্টা ডাকাত বলতেও কসুর করে না।

তোমাকে মন্দ বলেন এটা আমার ভাল্লাগে না! গাল ফুলিয়ে বলল মোনালিসা, এতই যখন আদর্শবাদী, সম্পর্ক না রাখলেই পারেন!

না মা না। এটা ঠিক না। আসলে এটা রসকস্, আমাকে ক্ষেপিয়ে মজা পায়। খুব ভালো মানুষ ওরা-ওই কিছুদিনে নিজেই বুঝতে পারবি।

না, বাবা। আমি চাই না এমন! আমরা কি এমন অপরাধ করেছি যে আজেবাজে লোকজনের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য হজম করে যাব?

সত্য বলছিস মা, তুই সত্য বলছিস। কিছু মনে করিস না মা, কিছু মনে করিস না। আমার ক্রটি আমি সংশোধন করে নেবো।

আমি ঠিক বুঝতে পারছি না বাবা-

বুঝবি না, এটা আমার প্রসাদ ছাড়া কিছু নয়-একটু থেমে বললেন, জানিস? মহসিনের বউ গোপনে আমার কাছে এসে কান্নকাটি করেছে। ওদের বড় ছেলেটিকে যেন আমি নিয়ে আসি। বাসায় রাখি। যে কোনো কাজ সে করতে পারবে। টিফিন ক্যারিয়ার দিয়ে অফিসে ভাত নিয়ে যাক না, তাও মন্দ কি।

তুমি কি সে অনুরোধ রাখতে চাও? আবার গ্রামে যাবে তুমি এই জন্য?

না, না মা। মানে আমি শিগগিরই আবার যাব না। কেমন করে যাব? জলদি আবার কি যেতে পারবো? না না মা, হবে না।

তোমার শরীর ভালো নয়, কি দরকার বাবা-এভাবে জড়িয়ে? কাঁদো কাঁদো হয়ে মশরুর বললেন, তাহলে কি করব আমি? বলে দে তুই বলে দে। আমি যে ওকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি! নিয়ে এসেছ! বলছো কি বাবা?

ঠিকই বলছি। ওর মায়ের আহাজারি বিলাপ আমি সইতে পারিনি, তাই। তবে বলেছে, বেশিদিন থাকবে না। জায়গা খুঁজবে, কামকাজ খুঁজবে। একটা কিছু পেলেই চলে যাবে। তখন আমাদের কোনো অসুবিধা হবে না, মা।

মোনা মুখ নিচু করেছিল, কি একটাতে গলা টনটন করে-আস্তে করে জিগ্যোস করল, এখন কোথায় আছে সে, বাবা?

নিচতলায়, উৎসাহের সঙ্গে বললেন মশরুর। ড্রয়িং রুমে ঢুকতে দেব, কি এমন লেখাপড়া! সামান্যই। বোঝে না কিছু। সোফাটোফাতে বসে পড়ে যদি? বারান্দায় বসিয়েছো বুঝি?

হ্যাঁ হ্যাঁ মা। বারান্দায়, হাতল ভাঙা চেয়ারটাতে-!

আর কোনো কথা বলল না মোনালিসা, মুখটা কালো হয়ে আছে ওর। আস্তে আস্তে হেঁটে সিঁড়ির দিকে যাচ্ছিল।

ওকে খাওয়াতে হবে না মা, কাজে আমাদের প্রায় সারাদিন লেগেছিল। একদম বিকালে ভূরিভোজন করে আমরা বেরিয়েছিলাম।

এক পা দুপা করে ধাপ মাড়িয়ে যখন নিচে যেতে নামছিল তখন মোনার চোখের কোণে বিন্দু বিন্দু পানি জমছিল। বুঝতে পারে না এর অর্থ কি, কেন এমনটা হচ্ছে। কিন্তু একটা জিনিস বুঝল। যিনি কথার্বাতা বলছেন, তিনি যেন ওর পিতা নয়, অন্য কেউ। তিনি যেন অদ্বিতীয় নৃত্যশিল্পী শাহনাজের স্বামীও নন, তার বিপরীত অচেনা কেউ। এক ব্যক্তির ভিতরে কি এমন করেই অন্য অনেক সত্তা লুকিয়ে থাকে? থাকে নিশ্চয়ই, নইলে এমনটা কেন হবে।

দূর থেকে তাকিয়ে ছিল, শেষ ধাপ ছাড়িয়ে বারান্দায় পা দিতেই ভাঙা চেয়ারে কষ্ট করে বসে থাকা মহসিনের জ্যেষ্ঠ পুত্র মুবারক উঠে দাঁড়াল। এটাই প্রথম দেখা।

উপলব্ধির আগেই দুজনে মুখোমুখি এবং সেইক্ষণে নির্বাক নিস্পন্দন। গাছগাছালির পাতায় পাতায় বাতাস থেমে আছে, ঝোপড়া আমের মঞ্জরিতে সুগন্ধ জমাট-ওরা পরস্পর স্থির চোখে চোখে তাকিয়ে আছে অপলক। আকাশ থেকে নিবিড় ধারা নেমে আসছে একটি স্তবক। শুনেছে বারবার, বহুবার। কানের ভিতরে চক্রায়িত, কিন্তু ধমনীতে চলে যায় : সমাজ সংসার মিছে সব, মিছে এ জীবনের কলরব! কেবল আঁখি দিয়ে আঁখির সুধা পিয়ে হৃদয় দিয়ে হৃদি অনুভব-

চাহনি ক্রমে ধোঁয়াটে, পরে ঝপসা হয়ে এসেছিল। মোনা হঠাৎ অনুভব করে অতীতে উড়ে চলে গেছে। ওর কক্ষ। শিকল দিয়ে বাঁধা ওর হাত-পা-শরীর। চেয়ে দেখছিল এদিক-ওদিক। কোথায় আছে পালাবার পথ। ডাকিনী দুরদানা শাস্তি দিয়েছে। একদিন একরাতে কোথাও যেতে পারব না। পিতা চট্টগ্রাম। কে উদ্ধার করবে। বাসার কাজের লোক সব ভয়ডরে জড়সড়। পরম করুণাময়ের নাম উচ্চারণ করতে বিড়বিড় কিছুক্ষণ। একবারে হয় না। তারপর দ্বিতীয়বার। তৃতীয়বার। চতুর্থবারে বিশ্বাসে ভর করে মোচড় দিতেই ঝরঝর করে জিঞ্জিরের আঙটাগুলো খুলে পড়ে যায়। আহ। শান্তি। বাঠেলার সরিয়ে নিচু হয়ে মইটিকে ধরে এবং দেখে বেশ শক্ত। তক্ষুনি তর তর করে ঘামতে থাকে। অল্পক্ষণে শেষ। প্রথম হকচকিয়ে, তারপর নির্ভয়ে ঘুরে ঘুরে একবার চোখ বুলিয়ে নেয় সব কিছুর প্রতি। শ্যাম স্নিগ্ধ সবুজ পিঙ্গলে গাঁথা বনানী, মনে হয় চলে গেছে বহুদূর। ওদিকই যেতে হবে, হয়তো ওদিকেই আছি মনোরম মুক্ত রাজ্য। কিন্তু এখানে কেউ কি নেই? একা একা, অচেনা জায়গা। বিপজ্জনকও হতে পারে।

একটি ডাক দিয়ে দেখা যাক, ভাবল মোনালিসা।

মুখের কাছে দুহাতের আলগা মুঠো রেখে প্রাণপণ শক্তিতে সামনের দিকে ছুঁয়ে দিল, শোনো-! সুজন বন্ধু-! কেউ কি আছেন-?

কণ্ঠস্বর ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে দূরে মিলিয়ে যায় কান পেতে শোনে কোনো আওয়াজ আসে কিনা।

কিন্তু না, শুধু পাতার রিনঝিন বাজনা।

আর কিছু না।

কিন্তু একটু পরেই বজ্রপাতের মতো শব্দ, মনে হয় পিছনে অনেক দূরে। তারপর কোলাহল। দৌড়াতে আসছে এদিকেই।

কোনো দিশবিশ না পেয়ে কোমরে আঁচল পেঁচিয়ে ছুটতে লাগল মোনা-একটাই যেন পথ। চওড়া ফিতার মতো। দুধারে দেবদারু বৃক্ষশ্রেণি সারি সারি। অশ্বত্থ আছে, জারুল আছে। আছে কৃষ্ণচূড়া। শিমুল পলাশের রক্তিম আলোকে ফর্সা লাগে চারদিক। শ্রান্ত-ক্লান্ত, ছড়ানো এলো কালো চুল। ঘন ঘন নিঃশ্বাস ফেলছিল মোনালিসা; এ সময় একরাশ আঁধার এসে ওকে আবৃত করে এবং একটু পরে স্রোতের মতো অন্ধকার। কতক্ষণ এভাবে চলে গেল, বলতে পারবে না- কি একযুগ না অনন্তকাল? জেগে ওঠে ঘাসের বিছানা থেকে দুহাত ভর করে বসলেই দেখে এক দৃঢ় মূর্তি সশস্ত্র যুবক। যেন যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। মুহূর্তে সচেতন হয়ে যায় নিজের প্রতিও, বুঝতে পারে নিজেকেও অ

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj