লাইলী-মজনু কাব্যে আওরঙ্গ শাহ : এ বি এম ফয়েজ উল্যাহ

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

বাংলাসাহিত্যের ভিত গঠনে মধ্যযুগের অবিভক্ত বাংলায় চট্টগ্রাম যে অনন্য ভূমিকা পালন করেছে, তার সূতিকাঘার বর্তমানের মীরসরাই উপজেলা। চট্টল-নৃপতি পরাগল খাঁন ও ছুটি খাঁনের পৃষ্ঠপোষকতায় রাজধানী পরাগলপুরে কবীন্দ্র পরমেশ্বর ও শ্রীকর নন্দি যথাক্রমে ‘পরাগলী-মহাভারত’ এবং ‘ছুঠিখানি-মহাভারত’ রচনা করে বাংলাভাষা ও Ÿাংলাসাহিত্যের অগ্রযাত্রার সূচনা করেন। এরই ধারাবাহিকতায় চট্টল-নৃপতি নিজাম শাহ শুরের রাজধানী মীরসরাইর ‘শহর-জাফ্রাবাদ’-এর রাজসভায় রচিত হয় বাংলাসাহিত্যের দু’টি প্রধান কাব্য ‘ইমাম বিজয়’ ও ‘লাইলী-মজনু’। রচয়িতা কবি দৌলত-উজির বাহরাম খাঁন। বীর-রস, বীরহ-রসের অনুপম কীর্তি ছাড়াও কাব্য দু’টি চট্টগ্রামের রাজনৈতিক-ইতিহাসের অনেক তথ্যের উৎস-ভাণ্ডার। একদা চট্টগ্রাম, ফেনী, নোয়াখালী ও কুমিল্লা অঞ্চলে ‘লাইলী-মজনু’র পুঁথি খুবই জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু এই কাব্যের প্রাপ্ত পাণ্ডুলিপিগুলির প্রায়গুলোতে সংযোজন, বিয়োজন পরিলক্ষিত হওয়ায় এর মৌলিকত্ব যেমন বিঘ্নিত হয়েছে তেমনি এর রচনাকাল এবং চট্টগ্রামে আরাকান, গৌড় ও মোগল অধিকার নিয়েও জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। আর এর মূলে রয়েছে একটি অনুচ্ছেদ, ‘আওরঙ্গ শাহ প্রশস্তি’।

‘আওরঙ্গ শাহা দিল্লীশ্বর মহামতি

.. .. .. .. .. .. .. .. .. .. .. .. ..

সহস্রেক ছত্রধারী অধিক তাহান,

পৃথিবী পূজিত শাহা মহাবলবান।।.. ..

‘দক্ষিণে সাগরক‚ল উত্তরে হিমাচল।

এ সকল অধিকারী নৃপ মহাবল।।

হীরামণি জড়িত শোভিত সিংহাসন।

পণ্ডিত মণ্ডিত সভা অতি বিলক্ষণ।।’

এই প্রশস্তিকে কেন্দ্র করে ‘লাইলী-মজনু’ কাব্যের রচনাকাল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কোনো কোনো গবেষক। তাঁরা এটিকে সম্রাট আওরঙ্গ জেবের শাসনামল তথা সতর শতকের রচনা বলে দাবি করেন।

(১) ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ রাজ-প্রশস্তিটিকে অকৃত্রিম বলে মনে করেন। (বাংলাসাহিত্যের কথা, মধ্যযুগ) অর্থাৎ তাঁর মতে ‘লাইলী-মজনু’ সতের শতকের রচনা।

(২) অধ্যাপক সুখময় মুখোপাধ্যায়ের মতে, নিজাম শাহের আমলে কবি কাব্য রচনা শুরু করেন আর সমাপ্তিকালে চট্টগ্রাম মুঘল অধিকারে আসে। তাই ‘আওরঙ্গ শাহা’র প্রশস্তিও কবি পরে যুক্ত করেন। (বাংলার ইতিহাসের দুশো বছর)

(৩) ডক্টর মুহাম্মদ এনামুল হকের মতে ‘আওরঙ্গ শাহা’ প্রশস্তিটি প্রক্ষিপ্ত।

তাই বর্তমানে ‘লাইলী-মজনু’ কাব্যের রচনাকাল নিয়ে এই বিভ্রান্তির একটা বাস্তবসম্মত সমাধান আশু প্রয়োজন। এই পরিপ্রেক্ষিতেই এই প্রবন্ধের অবতারণা।

দৌলত-উজির বাহরাম খাঁ বিরচিত ‘লাইলী-মজনু’ কাব্যের এ যাবৎ কালে যতগুলো পাণ্ডুলিপি পাওয়া গেছে, তার কয়েকটিতে রয়েছে ‘রাজ প্রশস্তি’ বা ‘আওরঙ্গ শাহা প্রশস্তি’। ড. আহমদ শরীফ সম্পাদিত ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘লাইলী-মজনু’ কাব্যেও ‘রাজ প্রশস্তি’ রয়েছে।

প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, তাহলে কি ‘লাইলী-মজনু’ কাব্য সম্রাট আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে (১৬৫৮-১৭০৭ খ্রি.) রচিত হয়েছিল? অবশ্যই নয়। সর্বজন শ্রদ্ধেয় আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ, ড. এনামুল হক ও ড. আহমদ শরীফসহ প্রায় প্রত্যেক সাহিত্য-গবেষকই স্বীকার করেছেন যে ‘লাইলী-মজনু’ ষোল শতকের (১৫৪৩-৭৫ খ্রি.) কাব্য। যদিও ড. আবদুল করিমের মতে এর রচনাকাল ১৫৮৫-১৬০৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে। কারণ, তিনি মনে করেন ঐ সময়টাই ছিল নিজাম শাহ সুরের রাজত্বকাল। তার মতে, নিজাম শাহ চট্টল-নৃপতি ছিলেন না, আরাকান রাজের অধীনে নিজামপুর পরগণার সামন্ত শাসক ছিলেন। নিজাম শাহ সুরের নির্দেশে রাজধানী শহর-জাফ্রাবাদে (ফেনীর ইতিহাসের গবেষক রুহুল আমিনের মতে ভূগোলবিদ ব্রুক-ড্রেন’র মানচিত্র মোতাবেক ‘সহর জাফ্রাদ’ ফেনী নদীর মোহনায় অবস্থিত ছিল। কালক্রমে তা ফেনী নদীতে বিলীন হয়ে গেছে) বসে রাজকবি ‘দৌলত-উজির বাহরাম খাঁ’ ‘ইমাম বিজয়’ এবং ‘লাইলী-মজনু’ কাব্য রচনা করেন। কবি তাঁর দুই কাব্যেই চট্টগ্রামের সৌন্দর্য বর্ণনা করতে গিয়ে চট্টগ্রামকে ‘জাফ্রাবাদ’ ও ‘ফতেয়াবাদ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

‘সহর জাফরাবাদ নামে চাটিগ্রাম

তাহাতে বৈস-এ পীর বদর আলম।’ (ইমাম বিজয়)

‘নগর ফতেয়াবাদ দেখিয়া পুরএ সাদ

চাটিগ্রাম সুনাম প্রকাশ।’ (লাইলী-মজনু )

আর সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে তথা ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে বুজুর্গ উমেদ খাঁন কর্তৃক চট্টগ্রাম বিজয়ের পরে উক্ত কাব্যদ্বয় লেখা হলে তিনি অবশ্যই ‘জাফ্রাবাদ’, ‘ফতেয়াবাদ’-এর স্থলে মুঘলদের ঘোষিত নাম ‘ইসলামাবাদ’ই লিখতেন। সুতরাং একশত বছর পরে রাজসিংহাসনে অধিষ্ঠিত সম্রাট আলমগীর আওরঙ্গজেবের স্তুতি বা ‘আওরঙ্গ-শাহ প্রশস্তি’ কবি দৌলত-উজির বাহরাম খানের পক্ষে লিখা ছিল অসম্ভব। মুদ্দা কথা দৌলত-উজির বাহরাম খাঁন ‘লাইলী-মজনু’ কাব্যে ‘আওরঙ্গ শাহ প্রশস্তি’ লেখেননি। মূল কাব্যে এটি ছিল না। তাহলে চট্টল-নৃপতি নিজাম শাহর সময়কালে লিখিত ‘লাইলী-মজনু’ কাব্যে ‘আওরঙ্গ শাহ প্রশস্তি’ এলো কোত্থেকে? যাকে কেন্দ্র করে ‘লাইলী-মজনু’ কাব্যের রচনাকাল নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। এর দু’টি কারণ হতে পারে। (এক) লাইলী-মজনু কাব্য সম্রাট আওরঙ্গ জেব’র আমলে (১৬৫৮-১৭০৭ খ্রি.) রচিত। (দুই) ‘লাইলী-মজনু’ কাব্য যারা পুনর্লেখন বা কপি করেছেন তাদেরই কেউ না কেউ ‘আওরঙ্গ শাহ প্রশস্তি’ মূলকাব্যে সংযোজন করেছেন। হস্তলিখিত পুঁথির অনুলিপির ক্ষেত্রে প্রায় যা ঘটে থাকে।

এ ক্ষেত্রে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, ১৫৪৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৬০/৬৫ বা ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দের (ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবেদ আছে) চট্টল-নৃপতি নিজাম শাহর শাসনামলের পরেও কি ‘নিজামপুর’ নামক কোনো পরগণা বা কোনো নিজাম শাহর অস্তিত্ব চট্টগ্রামে ছিল? হ্যাঁ, ছিল। ইতিহাস এর পক্ষেই সাক্ষ্য দেয়। প্রথমে ‘নিজামপুর’ পরগণা ও এর জমিদারির সপক্ষে ঐতিহাসিক মির্জা নাথান’র ‘বাহারীস্থান-ই-গায়েবী’ থেকে একটি উদ্বিৃতি দেয়া সমীচীন মনে করি। এতে ১৬১৬ খ্রিস্টাব্দে (অর্থাৎ আওরঙ্গ জেবের শাসনামলে চট্টগ্রাম বিজয়ের ৪০ বছর পূর্বে) চট্টগ্রামে মোগল অভিযানকালে যে ‘নিজামপুর পরগণা’র অস্থিত্ব ছিল, তার প্রমাণ ‘বাহারিস্তান-ই-গায়েবি’ তে রয়েছে।

“ঞযব রসঢ়বৎরধষ ধৎসু (সঁমযধষ) যধষঃবফ ধঃ ঃযব ারষষধমব ঘরুধসঢ়ঁৎ যিরপয ধিং ধ ঢ়ড়ংংবংংরড়হ ড়ভ ঃযব গধমং.ঞযব গধমং নবরহম নবংরবমবফ,রঃং তধসরহমধৎ ধপপবঢ়ঃবফ ঃযব াধংংধষধমব ধহফ পধসব ঃড় ংবব অনফঁহ ঘধনর ধহফ ঃযব ধভড়ৎবংধরফ ারষষধমব ধিং ড়পপঁঢ়রবফ নু ঃযব রসঢ়বৎরধষ ধৎসুৃ.রহংঢ়রঃব ড়ভ ঃযব ভধপঃ ঃযব তধসরহফধৎ ড়ভ ঘরুধসঢ়ঁৎ যধফ ঃৎধহংভবৎৎবফ যরং ধষষবমরধহপব ভৎড়স গধমং ঃড় ঃযব রসঢ়বৎরধষরংঃৃঃযব ারষষধমব ঘরুধসঢ়ঁৎ ুরবষফরহম ৎবাবহঁব ড়ভ ংরী যঁহফৎবফ ৎঁঢ়ববং (ঢ়বৎ ধহহঁস)” (ইধযধৎরংঃধহ-ব-এধরনর-গরৎুধ ঘধঃযধহ) এর সারকথা ১৫৩৮-১৫৫৩ মতান্তরে ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দতক নিজাম শাহ নামক যে নৃপতি চট্টগ্রাম শাসন করেছিলেন, তাঁর স্মরণে ‘নিজামপুর পরগনা’র পত্তন হয়েছিল। এবং ১৬১৬ খ্রিস্টব্দে মুঘল সেনানায়ক আবদুন নবীর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম আক্রমণ কালে ‘নিজামপুর পরগণায়’ যে একজন সামন্ত জমিদার ক্ষমতায় ছিলেন, তা মির্জা নাথান’র ‘বাহারিস্থান-ই-গায়েবী’ নামক ইতিহাস গ্রন্থ থেকে জানা গেছে। এই জমিদার অভিযানকারী মোগলদের পক্ষে যোগ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন, যার জমিদারির বার্ষিক রাজস্বের পরিমাণ ছিল ছয়শ রুপি।

ড. আহমদ শরীফ এরই সূত্র ধরে লিখেছেন, “এর থেকে বুঝা যাচ্ছে, ষোল শতকে কোন এক ধনী ও মানী নিযাম চট্টগ্রামে ছিলেন, যাঁর নামে ছয়শ রাজস্বের একটি পরগণা সৃষ্টি হয়েছিল। ইনি যদি শের শাহের ভাই কিংবা শুর বংশীয় নাও হন তবু একজন সামন্ত যে ছিলেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ উদ্ধৃতাংশে সতেরো শতকের গোড়ার দিকেও পরগণার একজন জমিদার বা সামন্ত পাওয়া যাচ্ছে।” (লায়লী-মজনু-ড. আহমদ শরীফ সম্পাদিত) অর্থাৎ ড. শরীফের মূল উদ্দেশ্য ষোল শতকের চট্টল-নৃপতি নিজাম শাহ শুরকে ‘নিজামপুর পরগনার’ই বার্ষিক ছয়শ’ রুপির রাজস্ব প্রদানকারী জমিদার বা সামন্ত শাসক প্রমাণ করা। কারণ তিনি নিজাম শাহ শুরকে চট্টল-নৃপতি মানতে নারাজ। তার মতে, “নিযাম শাহ একজন সামন্ত জমিদার। তার নিবাস ছিল জাফরাবাদ। তার জায়গীর ‘নিজামপুর’ নামে আখ্যাত। তিনি হয়তো শুর বংশীয় আফগান ছিলেন.. ..তিনি ছিলেন আরাকান রাজের নিযুক্ত বা স্বীকৃত আঞ্চলিক প্রশাসক।” (প্রাগুক্ত) অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ষোলশ শতক কেন, কোনো আরাকান রাজের সময়েই চট্টগ্রামকে ‘পরগণা’ ওয়ারী ভাগ যেমন করা হয়নি তেমনি বার্ষিক রাজস্ব প্রথার প্রচলনও সেই সময়ে হয়নি। বরং আফগান শাসনামলেই সুবা-বাংলায় তথা চট্টগ্রামে পরগণা বিভাগ ও রাজস্ব প্রথার প্রচলন হয়। আর বাংলার কোনো ইতিহাসে, বার্মার ‘রাজমালা’ বা ত্রিপুরার রাজোয়াং-এ কোথাও উল্লেখ নেই যে নিজাম শাহ শুর নামক কেউ আরাকান রাজের অধীনস্থ বা সামন্ত শাসক ছিলেন। সুতরাং ড. শরীফের ছয়শ রুপি রাজস্বের সামন্ত-জমিদারের সাথে চট্টল-নৃপতি নিজাম শাহের কাহিনীর ঐতিহাসিক কোনো ভিত্তি নেই। উপরন্তু ড. আবদুল করিম কর্তৃক নিজাম শাহর স্মারক-মুদ্রা আবিষ্কৃত হওয়ায় এবং চট্টগ্রামের বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ আবদুল হক চৌধুরীর গবেষণায় ও বাংলাদেশের বহু ইতিহাসবেত্তার তথ্যে আজ প্রমাণিত হয়েছে যে নিজাম শাহ শুর কোন এলাকার জমিদার বা সামন্ত শাসক ছিলেন না। বরং তিনি ছিলেন স্বাধীন চট্টল-নৃপতি। তার স্মৃতিকে অ¤øান রাখার জন্যেই পরবর্তীতে তাঁর নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘নিজামপুর পরগণা’।

ড. আহমদ শরীফ তার সম্পাদিত ‘লাইলী-মজনু’ কাব্যগ্রন্থে মোট আটটি পাণ্ডুলিপির উল্লেখ করেছেন। এর চারটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ক্রমিক নং ৪৪১, ৪৪২, ৪৪৩ ও ৪৪৪) এবং তিনখানা বাংলা একাডেমিতে (পুঁথি সংখ্যা ৪৮, ৪৯, ৫০ ও ৫১) রচেছে। এ ছাড়াও শ্রদ্ধেয় আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে ‘লাইলী-মজনু’র অসস্পূর্ণ একখানি পাণ্ডুলিপি তৈরি করেছিলেন। ড. আহমদ শরীফের বর্ণনা মতে, “এ যাবৎ বিভিন্ন বিদ্বানের যেসব উপপাদ্য-সম্পাদ্য ও প্রতিজ্ঞা অঙ্গীকার উপস্থাপিত হয়েছে, সেগুলো নিম্নরূপ; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রমিক ৪৪২, বাংলা একাডেমির ৪৮, ৪৯ ও ৫১ সংখ্যক পাণ্ডুলিপিতে এবং সাহিত্য বিশারদ-বিধৃত ১৮৯৫ সালের পাঠে ‘আওরঙ্গ শাহা’ তথা রাজপ্রশস্তি মিলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রমিক ৪৪১ সংখ্যক পাণ্ডুলিপির ৮ম পত্রেই রাজ-প্রশস্তি থাকার কথা, সে পত্রটি খোয়া গেছে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৪৩ সংখ্যক পুঁথির আদ্যে ও অন্তে কিছু পাঠ অলিখিত, ৪৪৪ সংখ্যক এবং একাডেমির ৫০ সংখ্যক পাণ্ডুলিপি আদ্যান্ত খণ্ডিত। অতএব এ সব কয়টিতে রাজ-প্রশস্তি ছিল বলে অনুমান করা অসঙ্গত নয়।” (লাইলী-মজনু-ড. আহমদ শরীফ সম্পাদিত)

এবং এইসব পান্ডুলিপির দু’টির লিপিকর ছিলেন কালিদাস নন্দী, সন-১৮২৯ খ্রি.। একটির লিপিকর মহিলা কবি রহিমুন নিসা, সন ১৮৬৪ খ্রি.। একটির লিপিকর জিন্নত আলী, সন ১৮৬৪ খ্রি.। তবে এটি আর রহিমুন নিসার লিপি একই প্রতিলিপির অনুলিপি। শ্রী মোসরফ আলীও একটি পাণ্ডুলিপির লিপিকর। এটিও ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের দিকে লেখা। একটি ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দের প্রতিলিপি। এই সব পুঁথির প্রায়গুলোতই ‘আওরঙ্গ শাহা প্রশস্তি’ বিদ্যমান।

অর্থাৎ এ পর্যন্ত যতগুলো পুঁথির অনুলিপি পাওয়া গেছে তার সবগুলোই উনিশ শতকের মাঝামাঝি বা তারপরে কপি করা। আর এ সব লিপিকারদের অনেকেই নিজেরাও কবি ছিলেন। ফলে মূল কাব্যগ্রন্থের সাথে তারা কিছু সংযোজন-বিয়োজন যে করেছেন তা বলাই বাহুল্য। এরই ধারাবাহিকতায় মোগল সম্রাটদের চট্টগ্রাম বিজয়ের একশ বছর পূর্বে রচিত ‘লাইলী মজনু’ কাব্যে মোগল সম্রাট আওরঙ্গ জেবের গুণগান গেয়ে ‘আওরঙ্গ শাহ প্রশস্তি’ কোনো না কোনো লিপিকারের দ্বারা লিখিত ও সংযোজিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ড. আহমদ শরীফ লিখেছেন, “কোনো পাণ্ডুলিপিই ১৩০/৩৫ বছরের আগের নয়। অতএব ১৬৬৬-১৭০৭ সনের মধ্যে লিপিকৃত কোনো পাণ্ডুলিপির প্রক্ষিপ্ত রাজবন্দনা লিপিকর পরম্পরায় চালু হয়ে গেছে বলেই আমাদের অনুমান।’ (লাইলী-মজনু-ড. আহমদ শরীফ সম্পাদিত) কিন্তু এই সংযোজন কিসের ওপর ভিত্তি করে হলো এবং এর পেছনের ইতিহাস কি? তা কিন্তু ড. শরীফ জানাতে পারেননি। এখানেই বিভ্রান্তি।

কিন্তু বর্তমান গবেষণায় এর ইতিহাস এবং এ বিষয়ে সঠিক তথ্য-উপাত্ত জানা গেছে। ইতিহাসবিদ শ্রদ্ধেয় জমির আহমেদ প্রণিত ‘ফেনীর ইতিহাস’ গ্রন্থে তার বিস্তৃত আলোচনা আছে। তিনি তার গ্রন্থে বিশিষ্ট গবেষক শেখ রুহুল আমিনের এক প্রবন্ধের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। শেখ রুহুল আমিন লিখেছেন, “জাফর শাহের ( শাহজাদখানী বংশের নৃপতি) মৃত্যুর পর তার ভাই নিজাম শাহ দাঁদরার (বর্তমানের ফেনী জেলা) সামন্ত শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন। তিনি আরাকানী প্রাধান্যের কাছে নতি স্বীকার করেন এবং দাঁদরার প্রশাসনিক কেন্দ্র ফেনী নদীর পূর্বপাড়ে মীরসরাই অঞ্চলে স্থানান্তর করে বসেন। মোগলদের চট্টগ্রাম অভিযান কালে (১৬৬৬ খ্রি.) তিনি বন্দি হন।” এতে প্রমাণীত যে, ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামে মোগল বিজয় প্রক্কালেও নিজামপুর পরগণায় নিজাম শাহ নামক একজন শাসক ছিলেন, যার প্রশাসনিক-অঞ্চল নিজামপুর থেকে দাঁদরা তক বিস্তৃত ছিল বলে ধারণা করা হয়। আর সেই সময় গৌড়-বাংলা দিল্লির সম্রাট আওরঙ্গ জেবের অধীনেই ছিল। ফলে এই নিজাম শাহর আমলেই ‘লাইলী-মজনু’ কাব্য রচিত হয়েছে মনে করেই লিপিকারদের দ্বারা ‘আওরঙ্গ শাহ প্রশস্তি’ সংযোজিত হওয়ার সম্ভাবনাই শতভাগ। আর এ’ ধারণার কারণেই অনেক ঐতিহাসিক, গবেষকও মনে করেছেন ‘লাইলী-মজনু’ সতের শতকের রচিত কাব্য।

ইতিহাসের প্রাসঙ্গীকতায় বলা প্রয়োজন যে, ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে মোগলদের হাতে নিজামপুরে বন্দি হওয়া নিজাম শাহর পূর্বপুরুষদের দাঁদরা ও জুগিদিয়া অঞ্চলে সামন্ত শক্তি হিসেবে অভ্যুদয়ের ধারাবাহিক ইতিহাস জমির আহমদের ‘ফেনীর ইতিহাস’ গ্রন্থে খান বাহাদুর শেখ হামিদুল্লাহ খানের বরাত দিয়ে লিপিবদ্ধ আছে। নিজাম শাহ ছিলেন দাঁদরার সামন্ত শক্তির জনক আহমদ শাহ নামক এক নৃপতির উত্তরাধিকারী।

পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ ‘লাইলী-মজনু’র রাজ-প্রশস্তিটিকে অকৃত্রিম (সতর শতক) বলে মনে করেন। আর অধ্যাপক সুখময় মুখোপাধ্যায় মনে করেন, “নিজাম শাহ কোনো আরাকান রাজের মুসলমানী নাম। কেননা ‘ধবল অরুণ গজেশ্বর’ আরাকান রাজেরই বিশেষ রাজকীয় উপাধি। তার ধারণায় (ড. আহমদ শরীফকে লেখা পত্র) নিজাম শাহর আমলে কবি গ্রন্থ রচনা শুরু করেন আর সমাপ্তিকালে চট্টগ্রাম মুঘল অধিকারে আসে। তাই আওরঙ্গ শাহর প্রশস্তিও কবি পরে যুক্ত করেছেন।” (বাংলা ইতিহাসের দুশো বছর) কিন্তু ড. আহমদ শরীফ সম্পাদিত ‘লাইলী-মজনু’ কাব্যে তিনি অধ্যাপক সুখময় মুখোপাধ্যায়ের এই দাবীকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। কারন, মোগল আমলের চট্টগ্রামের শাসনকর্তাদের আনুক্রমিক নামের উল্লেখ রয়েছে খাঁন বাহাদুর হামিদুল্লাহ খাঁর লিখা চট্টগ্রামের প্রথম ইতিহাস-গ্রন্থ ‘আহাদিসুল খাওয়ানীন’-এ। তাতে ‘নিজাম’-এর নাম নেই। আর আরাকানের ইতিহাস বা রাজকীয় কোনো গ্রন্থেও নিজাম শাহ নামক কোনো আরাকান রাজের নাম মেলেনি। মেলেনি নিজাম শাহ নামের কোন সামন্তের নামও। সুতরাং সুখময় বাবু যে লিখেছেন, মোগল বিজয়ের পূর্বে ‘লাইলী-মজনু’ কাব্যের শুরু এবং মোঘল বিজয়ের পরে সমাপ্ত হয়েছে, তাই আওরঙ্গজেব প্রশস্তি পরে জুড়ে দেয়া হয়েছে, তা ইতিহাসের ধোপে টিকেনা। কারণ নিজাম শাহের শাসনকাল ১৫৩৮/৩৯ থেকে ১৫৬৫ বা ৭৫ খ্রিস্টাব্দ তক। আর মুঘলদের চট্টগ্রাম বিজয়ের কাল ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দ। তা হলে কি ‘লাইলী-মজনু’ কাব্যগ্রন্থ রচনা করতে দৌলত-উজির বাহরাম খাঁনের ৯০ থেকে ১০০ বছর সময় লেগে ছিল? যা শুধু অবিশ্বাস্য নয়, অবাস্তব। তা ছাড়া আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইতিহাসবিদ-গবেষক ড.আবদুল করিম কর্তৃক ব্রিটিশ মিউজিয়ামে নিজাম শাহর স্মারকমুদ্রা আবিষ্কৃত হওয়ায় এটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, নিজাম শাহ না কোনো আরাকান রাজের নাম, না কোনো সামন্ত শাসক। তিনি ছিলেন স্বাধীন চট্টল-নৃপতি (১৫৩৮-১৫৫৩ মতান্তরে ১৫৭৫ খ্রি.)। তাঁর আমলেই লাইলী-মজনু কাব্য দৌলত-উজির বাহরাম খাঁন কর্তৃক রচিত হয়েছিল। এটি ষোলশ খ্রিস্টাব্দের কাব্য। সতেরশ খ্রিস্টাব্দের নয়।

সুতরাং মূল ‘লাইলী-মজনু’ কাব্যে যে ‘আওরঙ্গ শাহ প্রশস্তি’ ছিল না তা যেমন ঐতিহাসিক সত্য তেমনি বুজুর্গ উমেদ খাঁ কর্তৃক চট্টগ্রাম বিজয় প্রাক্কালে (১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দ) নিজামপুর পরগনায় নিজাম শাহ (দাঁদরা থেকে যিনি প্রশাসনিক কেন্দ্র নিজামপুরে স্থানান্তর করে নিয়ে আসেন) নামক আরাকান রাজের যে সামন্ত শাসক (যাকে দ্বিতীয় নিজাম শাহ বলাই সঙ্গত) ক্ষমতায় ছিলেন তাকেই চট্টল-নৃপতি নিজাম শাহ (যাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় লাইলী-মজনু কাব্য রচিত হয়েছিল) ভুলক্রমে পরবর্তীতে লিপিকরদের দ্ধারা যে ‘আওরঙ্গ শাহ প্রশস্তি’ সংযোজিত হয়েছিল তাও শতভাগ সত্য। চট্টল-নৃপতি ‘পাঠান নিজাম শাহ শুর’ (১৫৪০-১৫৬০/৭৫ খ্রি.) আর আরাকান রাজের নিজামপুর পরগণার সামন্ত-শাসক ‘দাঁদরার সামন্ত শাসক আহমদ শাহর উত্তরসূরি নিজাম শাহর’ (১৬৬৬ খ্রি.) সময়, শাসনকাল আর নাম বিভ্রাট নিয়ে এই অনাকাক্সিক্ষত অনুচ্ছেদের সৃষ্টি। সুতরাং ‘আওরঙ্গ শাহ প্রশস্তি’ যে বাহরাম খাঁন রচিত মূল ‘লাইলী-মজনু’ কাব্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল না তা দিবালোকের মতো সত্য। তাই এই পরিচ্ছদকে কেন্দ্র করে ‘লাইলী-মজনু’ কাব্যের রচনাকাল নিয়ে যে বিতর্কের সূচনা হয়েছিল (১৬ শতক না ১৭ শতক) তারও সমাপ্তি হয়েছে বলে আমরা মনে করি। মোদ্দাকথা, চট্টল-নৃপতি নিজাম শাহ শুর, যিনি ১৫৩৮-৪০ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট শের শাহর সেনাপতি রূপে চট্টগ্রামে এসে পরবর্তীতে স্বাধীন-নৃপতি হিসেবে চট্টগ্রাম শাসন করেন, তার আদেশে সভাকবি দৌলত-উজির বাহরাম খান ‘লাইলী-মজনু’ কাব্য রচনা করেন। তাই মূল কাব্যে ‘আওরঙ্গ শাহ’ প্রশস্তি থাকার প্রশ্নই আসে না। পরে এটি সংযোজিত হয়েছে। অতঃপর প্রমাণিত সত্য যে, ‘লাইলী-মজনু’ কাব্য ষোল শতকের কাব্য।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj