সাহিত্যের মৃত্যু : সালাহউদ্দীন আইয়ুব

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

সমকালীন সাহিত্য সম্পর্কে বলতে গেলে ‘সাহিত্য’ সম্বন্ধেও সাধারণভাবে কিছু বলতে হয়। যাকে আমরা ‘বিশ্বায়ন’ ‘গোলকায়ন’, ‘গ্লোবালাইজেশনে’র যুগ বলি, সেই একবিংশ শতাব্দী নিশ্চিতভাবে, মীমাংসিতভাবে, সাহিত্যের বিরোধিতায় প্রতিজ্ঞবদ্ধ। একবিংশ শতক সাহিত্যবিরোধী। এই বিরোধিতার সূচনা অবশ্য বিংশ শতাব্দীতে। গত শতাব্দীর শেষ দুই দশকে ‘সাহিত্য’ নামক বস্তুটির- যা মানবিক সৃষ্টিশীলতার উচ্চতম নমুনা- অতীত মূল্য, তার অভিনব অর্জন, চিত্তের উৎকর্ষ বৃদ্ধি ও পরিচর্যায় তার প্রভাব, এ সবই ধ্বংস করে দেয়া হয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপকের সাহিত্যের এই অবিস্মরণীয় ধ্বংসযজ্ঞে নেতৃত্ব দেন।

‘পিউরিটান’ মুরুব্বিদের প্রাগমেটিক আমেরিকায় সাহিত্য বিরোধিতা অবশ্য নতুন নয়, কিন্তু অতীতে সাহিত্যের অধ্যাপকেরা, ‘টেনিউরড প্রফেসরেরা’, তাতে নেতৃত্ব দেননি।

দেননি বলে হারমান মেলভিল থেকে উইলিয়াম ফকনার, মার্ক টোয়েইন থেকে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, ন্যাথানিয়েল হথর্ন থেকে স¤প্রতি লোকান্তরিত জন আপডাইকের মতো কথাশিল্পী; ডিকিনসন, ফ্রস্ট, লাওয়েল, ক্রেইন, কামিংস, রাটকি, স্টিভেনস এমনকি চার্লস বুকাউসকি- আমেরিকায় নির্মলেন্দু গুণের মতো কবির হাতে সাংস্কৃতিক কর্তৃত্ব ছিল; কবি-কথাশিল্পীরাই ছিলেন সাহিত্য-সংস্কৃতির অভিভাবক, ‘সর্বশক্তিমান’ কর্পোরেশন নয়।

আশির দশকে ইংরেজির অধ্যাপকরা যখন সমস্বরে ঘোষণা করলেন, এলিয়টের ‘ওয়েস্ট ল্যান্ড’ এবং দৈনিক পত্রিকার রিপোর্ট, মেলভিলের ‘মবি-ডিক’ এবং ওষুধ কোম্পানির বিজ্ঞাপন, সবই এক জিনিস, সেদিন থেকে সাহিত্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক পরিত্যক্ত বাজেয়াপ্ত প্রাতিষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যাত হলো; সেদিন থেকে ‘সাহিত্যে’র মূল্য নিয়ে সচেতনতার প্রশ্ন, সাংস্কৃতিক বিকাশে সাহিত্যের ভূমিকার প্রশ্ন, সৃষ্টিশীল লেখকদের সাংস্কৃতিক অভিভাবকত্বের প্রশ্ন, সবই অবান্তর হয়ে গেল। সেদিন থেকে এই নিউ ইয়র্কের ম্যাক-গ্র হিলের মতো ‘মাল্টি ন্যাশলালের ম্যানেজারেরা’ সাহিত্য-সংস্কৃতির অভিভাবক হলেন।

‘ইংরেজির অধ্যাপকেরা সাহিত্য বিরোধিতায় নেতৃত্ব দানকারী’, আমার এই কথা কৌতুকের মতো কিংবা নিছক হেঁয়ালির মতো শোনাতে পারে। কিন্তু একটা বিরাট বিষয়ে অতি সংক্ষেপে আমি যা বলছি তা ফ্যাক্ট, এর মধ্যে কোনো হেঁয়ালি বা রহস্য নেই। আর কৌতুকের তো প্রশ্নই ওঠে না, কারণ ‘সাহিত্যে ছাত্র’ হিসেবে আমি একটি মারাত্মক ঘটনার লোকচক্ষুর অন্তরালে সংঘটিত একটি ট্র্যাজেডির কথা বলছি।

প্রশ্ন হলো, সাহিত্য বিভাগগুলো যদি সাহিত্য বিরোধিতার নেতৃত্ব দিয়ে থাকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সাহিত্য বিভাগ এখনো আছে কিনা। সাহিত্য বিভাগ অবশ্যই আছে, যদিও তার ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা নগণ্য, ক্রনিক অর্থাভাবের কারণে তার অধ্যাপকের সংখ্যাও নগণ্য, এবং সবগুলোই সাহিত্য বিরোধী। সাহিত্য, ইতিহাস, হিউম্যানিটিজের জন্য অতীতে যে অর্থ বরাদ্দ হতো, তা বহুদিন থেকে বন্ধ; সেই টাকায় এখন বিজনেস স্কুলের বড় বড় বিল্ডিং ওঠে।

‘সাহিত্য বিরোধী’ সাহিত্যের অধ্যাপক কিংবা ‘সাহিত্য বিরোধী’ সাহিত্য বিভাগ কিভাবে সম্ভব তা বোঝার জন্য উদাহরণ দরকার; হেঁয়ালির জট তাতে খুলে যাবে। এই অনুষ্ঠান যে ম্যানহাটানে হচ্ছে, তার কাছেই তো কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্রের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম। ওখানে ইংরেজি বিভাগে গিয়ে যদি ইংরেজির কোনো অধ্যাপককে জিজ্ঞাসা করেন তিনি ‘সাহিত্য’ পড়ান কিনা, তিনি বলবেন, ‘ঠিক সাহিত্য নয়, আমি পড়াই ‘থিউরি’। তবে আমার অমুক সহকর্মী শেক্সপিয়র পড়ান’। যিনি শেক্সপিয়র পড়ান তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলবেন, ‘দেখুন ঠিক শেক্সপিয়র নয়, তার নাটক-ফাটক নয়, আমি পড়াই ‘টেকস্ট’; আমার আলোচ্য ‘কালচারাল ডিককোর্স’ শেক্সপিয়রের প্রতিভা নয়- আমি শেক্সপিয়রের নাম সংবলিত ‘টেকস্টে’ পুরুষতন্ত্র, বর্ণবাদ, সমাকাম, জেন্ডার এসবের ডাইনামিকস-টা দেখি’। ইংরেজি বিভাগে চসার, মিলটন পড়ানোর লোক পাওয়া যায় না, এটাও এখন এতদিন পর একটা পুরাতন কথা।

কলাম্বিয়ার উদাহরণ থেকে যা বোঝা গেল তা হচ্ছে, ‘সাহিত্য বিভাগে’ সাহিত্য বিরোধীরা অধ্যাপনা করেন এবং তারা যা পড়ান তা ‘সাহিত্য’ নয়, ‘থিওরি’। তারা শেক্সপিয়র নামক কোনো মহাকবি নয়, তারা শক্সপিয়রের ‘টেকস্ট’ পড়ান। শেক্সপিয়র ‘টেকস্ট’ তাদের খোঁজার বিষয় শেক্সপিয়র প্রতিভা নয়; তারা অনুসন্ধান করেন শেক্সপিয়রের ব্যর্থতা, ঐ ইংরেজ মহাকবির সংগুপ্ত সমকামী মন, জেন্ডার, পুরুষতন্ত্র পিতৃতন্ত্র ইত্যাদি। দু’একজন প্রবীণ অধ্যাপক অবশ্য এখনো আছেন যারা সাতিত্যের ‘চরম মূল্যে’ (আলটিমেট ভ্যালু) গভীর বিশ্বাসী- যারা মহৎ প্রতিভার শক্তি সামর্থ্য চরিতার্থতায় অভিভূত; কিন্তু তাদের বেশিরভাগ সেই আশির দশক থেকে সাহিত্য বিরোধী ‘তাত্তি¡ক’দের উগ্র দাপটে কোণঠাসা; তারা হয় অবসর গ্রহণ করেছেন বা করছেন। যেমন ইয়েলের হ্যারল্ড ব্লুম, পশ্চিম উপক‚লের ফ্রেডরিক ক্রুজ, ব্রাউনের আর্নল্ড ওয়েনস্টাইন।

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয় আশির দশকে সাহিত্য বিরোধিতার নেতৃত্ব দেয় এবং অনতিবিলম্বে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই বিরোধী দলের স্থায়ী সদস্য হয়। বিরোধিতায় এই ব্যাধিটি অবশ্য খাঁটি স্বদেশি নয়, অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব নয়। ফরাসি দেশ থেকে জাক দেরিদা এটি এদেশে রপ্তানি করেন যা পরবর্তীতে এখান থেকে ‘ইবোলা’ ভাইরাসের মতো ইংরেজিভাষী কানাডা, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ায় বিস্তৃত হয়। আমেরিকার ইংরেজি বিভাগে ফরাসি দর্শনের অধ্যাপক জাক দেরিদা নিত্য দেবতাস্বরূপ কিন্তু নিজের দেশে জাক দেরিদার অত আদর নেই; তিনি কোনো ‘ফ্লোক লেভি স্ত্রোস’ নন (লেভি স্ত্রোসের টীকা ভাষ্য আর স্ট্রাকচারালিস নিয়ে খোঁচাখুঁচিতেই তার উদ্যম নিঃশেষিত) এবং তিনি কলেজ দ্য ফ্রান্সের অধ্যাপকও ছিলেন না। এ কারণে তার ব্যাধিও ওখানে, ফ্রান্সে বিশেষ সংক্রমিত হয়নি। কিন্তু আমেরিকার সঙ্গে ফরাসিদের মিতালি পুরনো কাহিনী (ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে আমেরিকান মিলিশীয়দের মদদ দিয়ে ফরাসিদের ফকির হওয়ার কথা আমরা জানি); ফলে ‘ফরাসি ব্যাধি’ ফরাসি দেশে ছড়াতে বিলম্ব হলেও, এদেশে তা দ্রুতই সংক্রমিত হয়। সাহিত্য বিরোধিতার ব্যাধি ফ্রান্সে সীমাবদ্ধ থাকলে সমস্যা ছিল না কিন্তু সেই ব্যাধি আমেরিকায় ছড়ানোর পরিণতি ভয়ানক বিপজ্জনক। আমেরিকার ব্যাধিতে ক্রমে ক্রমে সারা পৃথিবীর সাহিত্যই বিপন্ন হবার আশঙ্কা।

এর মধ্যেই পৃথিবীজুড়ে সেই বিপন্নতার কিছু কিছু নজির লক্ষ করা যাচ্ছে; লক্ষ করা যাচ্ছে এমনকি বাংলাদেশেও। বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় সাহিত্য বিরোধিতার নেতৃত্ব দেয়নি; বাংলাদেশের সাহিত্য বিভাগগুলো আগের তুলনায় নি®প্রভ হলেও আগের মতোই বিদ্যমান। কিন্তু এটি তো আশির দশক নয়, এখন গ্লোবালাইজেশনের পরিণতির দিন। বাংলাদেশে সাহিত্য বিরোধিতার জন্য এখন আর নেতৃত্বের প্রয়োজন নেই। আমেরিকার ইন্টারনেট, আমেরিকার ফেসবুকই সেই দায়িত্ব গ্রহণ করেছে।

বাংলাদেশের সাহিত্য- আমি মনে করি যথেষ্ট বিপদগ্রস্ত। বাংলা একাডেমির বিরাট বইমেলা, দৈনিক-মাসিক-সাপ্তাহিকের সমারোহ দেখে এই বিপদগ্রস্ততা বোঝা যাবে না। বুঝতে হলে সমকালীন সাহিত্যের একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে।

আপনারা জানেন যে, এক সময় ‘চল্লিশের দশক’, ‘পঞ্চাশের দশক’, ‘ষাটের দশক’ এমনকি ‘সত্তরের দশক’ এভাবে দশক বিভাজনের উল্লেখ সাহিত্যালোচনায় স্বাভাবিক ছিল। পাঠক জানতো যে, চল্লিশের দশক মানে ফররুখ আহমদ, আবুল হোসেন, আহসান হাবীব, সৈয়দ আলী আহসান; পঞ্চাশের দশক মানে শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী; ষাটের দশক মানে আবদুল মান্নান সৈয়দ, রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ ইত্যাদি। আমি অবশ্য শুধু কবিতার কথাই বলছি। সে যাই হোক, এরশাদের সময় থেকে আর কোনো ‘দশকে’র খবর পাওয়া যায় না; দশকের সঙ্গে যুক্ত করে কোনো কবির নামও উচ্চারিত হয় না। মূল ধারার সাহিত্যের কথাই আমি বলছি, জনপ্রিয় লোকরঞ্জক সাহিত্যের কথা নয়।

‘দশক’- বিলোপের কারণ অনেক, যুক্তি অনেক, অজুহাত অনেক। তবে, আমার মতে এর প্রধান কারণ, এরশাদের সময় থেকেই সমকালীন সাহিত্য প্রথমবারের মতো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। এরশাদের সময় থেকেই দেখা যায় যে, যারা লেখালেখি করেন, তাদের অধিকাংশই বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংশ্রবহীন। শুধু সংশ্রবহীন নন, তারা মূলত বিশ্ববিদ্যালয় বিরোধী।

চল্লিশ-পঞ্চাশ-ষাটের কথা অনেকেই কম বেশি জানে, তার কারণ হলো সেসব দশকের সাহিত্য-সংস্কৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল। যাদের সাহিত্যালোচনার কারণে ওসব দশক কিংবা লেখকদের কথা আমরা জানি, তারা এমনসব সাহিত্যিক ঘরানার অংশ, যার সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘনিষ্ঠ সংযোগ ছিল। যেরকম ঘরানা, গোষ্ঠী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত সেরকম সাহিত্যচর্চার ঐতিহ্য এরশাদের সময় থেকেই দুর্লভ হতে শুরু করে।

সমকালে উল্লেখযোগ্য সাহিত্য পত্রিকার অভাবের কারণও এটি। সাহিত্যিক ঘরানা নেই, সাহিত্য পত্রিকা হবে কি করে? সাহিত্য পত্রিকা মানে তো দশ-বারোটা লেখা জোগাড় করে ছেপে দেয়া নয়। সেরকম পত্রিকা এখনো বেরোয় কিন্তু ওগুলো বিশুদ্ধ সাহিত্যচর্চার উদ্দেশ্যে প্রকাশিত হয় না। ওসব থেকে কোনো প্রতিভার অভ্যুদয় ঘটতেও দেখা যায় না।

তার চেয়েও আশঙ্কার কথা হলো, সমকালীন লেখকরা আগের লেখদের মতো ‘সাহিত্য পত্রিকা’ সম্পর্কে অত উৎসাহী নন। দৈনিক পত্রিকার ‘সাহিত্য পাতা’য় নাম দেখতে পেলেই তারা ধন্য; তাদের কারো কারো কাছে ‘ইন্টারনেট’ ও ‘ফেসবুক’; সাহিত্যপত্রিকার তুলনায় অনেক বেশি ‘উন্নত’ বিকল্প। এদের কাছে ‘সাহিত্য পত্রিকা’ অতীত সনাতন, অত্যন্ত সেকেলে মান্ধাতার আমলের জিনিস; এরা ইন্টারনেট-ফেসবুকের মতো মহা ‘উন্নত’ মাধ্যমে সাহিত্যচর্চায় উৎসাহী। সমকালীন সাহিত্যের এই প্রবণতা আমার বিচারে সাহিত্য-বিরোধী।

এই প্রবণতা সাহিত্য-বিরোধী কেন? ‘সাহিত্যচর্চা’ কিভাবে সাহিত্য-বিরোধী হয়? ইন্টারনেট-ফেসবুকের ‘সাহিত্যে’র সঙ্গে সাহিত্যের বিরোধ কোথায়?

বিরোধ আছে; তার তার কারণ ‘সাহিত্য’ মানে তো গল্প-কবিতা নয়, ‘সাহিত্য’ জ্ঞানও। সাহিত্যচর্চা ও সাহিত্যপাঠ দুটোই মস্তিষ্ক সাপেক্ষ, কগনিটিভ অ্যাকটিভিটি। টেলিভিশন দেখার সময় যেমন মস্তিষ্কের ব্যবহার দরকার হয় না, ইন্টারনেট-ফেসবুকেও মস্তিষ্কের ব্যবহার নিষ্প্রয়োজন। নি®প্রয়োজন বলেই সবাই টেলিভিশন দেখে, ইন্টারনেট ঘাঁটে, ফোন-টেকস্টে দিবারাত্র কাটিয়ে ক্লান্ত হয় না এবং ফেসবুকে দিনপঞ্জি লিখে অমর হওয়ার স্বপ্ন দেখে। ফেসবুকে সাহিত্যচর্চার সঙ্গে এসবের কোনো তফাত আছে কি? আমি এ বছর বাংলা একাডেমিতে গিয়ে (ফ্রেব্রুয়ারি ২০১৫) যা বলে এসেছি, তা আবারো বলি। সাহিত্য দেখার জিনিস নয়, পড়ার জিনিস। কম্পিউটারের স্ক্রিনে আমরা পড়ি না, দেখি। ইন্টারনেটে ‘মবি-ডিক’ পড়বেন? জেমস জয়েস? ‘কপালকুণ্ডলা’? ‘অন্তর্জলী যাত্রা’? চেষ্টা করে দেখুন।

হাতের কাছে যখন কম্পিউটার আছে, চেষ্টা করতে ক্ষতি কি? যারা এসব অর্থাৎ আসল সাহিত্য মুদ্রিত পৃষ্ঠায় পড়েছেন, তাদের ওগুলো ইন্টারনেটে পুনরায় দেখতে দোষ নেই। আমি নিজেও দেখি। বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথের সমগ্র রচনাবলিই তো ইন্টারনেটে দেখা যায়; আপনারা যেমন তা দেখেন, আমিও দেখি কিন্তু পড়ি না। ইন্টারনেট পড়ার জন্য হয়নি। মার্সেল প্রæস্ত ৩৫৬ শব্দ সংবলিত বাক্য লিখেছেন; উইলিয়াম ফকনারের কোনো কোনো বাক্য পৃষ্ঠা ছাড়িয়ে যায়; সুধীন্দ্রনাথের কাব্য পড়তে গেলে ‘বঙ্গীয় শব্দকোষ’ ঘাঁটা লাগে; কমলকুমার মজুমদার একটিমাত্র বাক্যে আস্ত একটি উপন্যাস লিখেছেন। টেলিভিশনে এক চোখ, ফোনে অন্য চোখ রাখার ফাঁকে ফাঁকে এসবও ইন্টারনেটে দেখে নেয়া সম্ভব। অনেকেই এভাবে সাহিত্য দেখছে আজকাল। আমেরিকান ব্যাধির এই এক ভয়ানক পরিণতি।

সাহিত্য দেখার জিনিস নয়, পড়ার জিনিস- এ কথাটা শুনতে এতই সহজ যে আমাদের তা না বোঝারই সম্ভাবনা। অনেকের সঙ্গে আলাপ করে বুঝেছি, কথাটা তাঁরা আদৌ বোঝেন না। না বোঝার কারণ আছে। ফোন-ফেসবুক-ইন্টারনেট দেখতে দেখতে, তার ভেতর ডুব সাঁতার, চিৎ সাঁতার দিতে দিতে তারা তাদের ছেলেমেয়ে, বন্ধু-বান্ধবদের মতো পড়া জিনিসটা ভুলেই গেছেন।

শুধু সাহিত্য কেন, চিত্রকলাও পড়ার জিনিস, দেখার জিনিস নয়। চিত্রকালা যদি দেখার জিনিস হতো, তাহলে তার জন্য ইন্টারনেট তো যথেষ্ট। ইন্টারনেটে কি সব শ্রেষ্ঠ শিল্পীর সমস্ত শ্রেষ্ঠ চিত্রকর্ম পাওয়া যায় না? বার্নিনি থেকে টার্নার, মাইকেল এঞ্জেলো থেকে সেজান, রেমব্রান্ট থেকে পিকাসো, কান্দিনিস্কি থেকে জ্যাকসন পোলাক- কার চিত্রকর্ম ইন্টারনেটে নেই? ওসব ছবির জন্য মিউজিয়ামের পর মিউজিয়াম চষে বেড়াতে হয় কেন? অধিকাংশ নর-নারী অবশ্য চিত্রকলার ‘চ’ও বোঝে না এবং তারা চিত্রকলা দেখার জন্যই মিউজিয়ামে যায় এবং দেখেই খালাস (এদের নিয়ে গল্প তো এলিয়টের সেই বিখ্যাত ‘প্রæফ্রক’ কবিতাতেই আছে)। কিন্তু মিউজিয়ামের ছবি তো দেখার জিনিস নয়, পড়ার জিনিস, স্টাডির জিনিস। এই নিউইয়র্কের ‘মেট্রোপলিটান মিউজিয়াম অফ আর্ট’-এ গেলেই আমার কথা যাচাই করতে পারবেন। দেখবেন, জ্যাকসন পোলাকের অমর চিত্রমালার সামনে দু’একটি মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে রামকৃষ্ণের মতো সমাধিস্থ হয়ে বসে আছে। ওরা জ্যাকসন পোলাকের ছবি দেখছে না (ওই সব ছবিই ইন্টারনেটে দেখা যায়); ওরা জ্যাকসন পোলাকের অবিস্মরণীয় শিল্প পাঠ করছে। শুধু অন্যরাই দেখতে গেছে এবং দেখেই অন্য কক্ষে পিকাসোর আর কটি দেখে নেয়ার জন্য ছুটছে; সবই ম্যাকডোনাল্ডের হ্যমাবার্গারের মতো দ্রুত, ফ্যাস্ট- কারণ বাড়ি ফিরেই ফেসবুকে মিউজিয়াম দর্শনের অভিজ্ঞতা অন্যদের দেখার জন্য পোস্ট করা চাই।

সাহিত্য, শিল্পকলা ফেসবুকের মতো সস্তা নয়। স্বরস্বতীর প্রসন্নতায়, ‘রক্ত জল করা’ শ্রমের বিনিময়ে সাহিত্য রচিত হয়। সাহিত্য ‘প্রাপ্ত-বয়স্ক’ নর-নারীর পড়ার জন্য সেইসব প্রতিভাবান দ্বারা রচিত জ্যাকসন পোলাকের মতো যাদের অভ্যুদয় ঘটে কদাচিৎ। এমন লেখক আছেন, যারা বাক্যের একস্থানে একটি ‘কমা’ বসিয়ে বসে থাকেন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত, তারপর বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত বসে ভাবেন ওটি তুলে দেবেন কিনা। সাহিত্য পাঠ কি জিনিস তা অনুভব করতে হলে ওই ‘কমাটি’ ছুঁয়ে দেখা চাই। অনেকে প্রযুক্তি বলতে উন্মাদ- কিন্তু ‘রাইটিং’-এর চেয়ে বড় উদ্ভাবন, বড় টেকনোলজি আর কি আছে? গণিতের ইকোয়েশন কি রাইটিং নয়? কম্পিউটার প্রোগ্রাম কি লেখা হয় না? সঙ্গীতের নোটেশনকে কি আক্ষরিকভাবেই ‘রাইটিং’ বলে না? বিজ্ঞানের সমস্ত উদ্ভাবনের মূলে আছে ‘রাইটিং’ এবং তার কোনোটাই দেখে শেখা যায় না। যদি যেত, তাহলে ফেসবুকের প্রোগ্রাম যে প্রতিভাবান লেখে এবং যে লাখ লাখ মানবসন্তান ফেসবুক দেখে তাদের মধ্যে কোনো তফাত থাকতো না। সাহিত্য, বিদ্যাচর্চা, শিল্পকলা ও বিজ্ঞান বড় নির্দয়- বিচার ও প্রত্যাখ্যান ও বৈষম্যই এসবের ভার্চু, এসবের মধ্যে কোনো গণতন্ত্র নেই। একমাত্র বেকুবের পক্ষেই একবিংশ শতাব্দীতে এসবকে ‘গণতান্ত্রিক’ মনে করা সম্ভব। সাহিত্য ফেসবুকের মতো ‘গণতান্ত্রিক’ হলে, সাহিত্য আর ‘সাহিত্য’ থাকবে না। সাহিত্য বিরোধ একবিংশ শতাব্দীতে তার বোধহয় খুব দেরি নেই।

[এটি নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনে অনুষ্ঠিত ‘২৯তম নর্থ আমেরিকা বাংলাদেশ’ এ প্রদত্ত ‘কী-নোট’ বক্তৃতার অনুলিপি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষক, অনেক গ্রন্থের রচয়িতা, ড. আইয়ুব শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন-প্রশাসনের অধ্যাপক।]

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj