সিলেট-নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের উপভাষা : ড. শ্যামল কান্তি দত্ত

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

আমেরিকান ভাষাবিজ্ঞানী নোয়াম চমস্কি উপভাষাকে ‘মূল ভাষা-দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মিলে যেমন দেহ, ভাষাও তেমনি কোনো দেশের জনসমষ্টির পূর্ণাঙ্গ দেহের সাথে তুলনীয়; আর উপভাষা হলো দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সদৃশ। প্রকৃত অর্থে উপভাষা ভাষা অপেক্ষা ভিন্ন নয়। বাংলা ভাষায় এ বিষয়ে আরও সহজ ভাষায় লিখেছেন ড. মনিরুজ্জামান। তাঁর ভাষায়, ‘কোনো ভাষার যে মান্য বা চলিত রূপ দেখা যায়, তার সাথে ধ্বনিগত, রূপগত ও বাগধারাগতভাবে যথেষ্ট স্বাধীন তবে পৃথক নয় এমন পার্থক্যযুক্ত কোনো স্থানিক বা ভূ-আঞ্চলিক রূপভেদই ‘উপভাষা’। রূপভেদের দিক থেকে এগুলি বিভক্ত হলেও পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়, বরং একটা অনবচ্ছেদের মাধ্যমে ঐক্য নিয়ে বিন্যস্ত।…‘বোধগম্যতা’-ই (সঁঃঁধষ রহঃবষষরমরনরষরঃু) এখানে মূল সংযোগ-ক্ষেত্র।১ এ বোধগম্যতা প্রসঙ্গে লক্ষণীয়, বাংলাদেশের প্রমিত বাংলা কিংবা বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষার সাথে সিলেট, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের উপভাষার তফাৎ অনেক সময় এতটাই বেশি হয় যে, একে অপরের কথা সঠিকভাবে বুঝতেও পারে না।২ এ কারণে অনেকে এই অঞ্চলগুলোর ভাষাকে বাংলার বিকৃতরূপ বা ‘পিকিউলিয়র’ মনে করেন। এ প্রসঙ্গে স্মরণীয় ড. মুহম্মদ এনামুল হক-এর অভিমত-চট্টগ্রামের ভাষা বাংলার বিকৃতি নয়, এক ধরনের বিকাশ, ইহাও বাংলা বিশেষ। একই কথা প্রযোজ্য সিলেট ও নোয়াখালীর ক্ষেত্রেও। আমরা দেখি এ-তিন অঞ্চলের উপভাষার মধ্যে কিছু সাদৃশ্যও রয়েছে, যে কারণে এদের একটি উপভাষা শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

জার্মান পণ্ডিত ম্যাকসমুলারের মতে, ‘ভাষার স্বাভাবিক ও যথার্থ জীবন উপভাষায় পাওয়া যায়’। প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্রভাষা এবং মাতৃভাষা এক কথা নয়। রাষ্ট্রভাষা রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহৃত রাষ্ট্রের প্রমিত বা সর্বজন বোধ্য ভাষা, আর মাতৃভাষা হচ্ছে মায়ের মুখ থেকে শেখা ভাষা। সুতরাং রাষ্ট্রভাষা পোশাকী এবং মাতৃভাষা আটপৌরে। অন্যভাবে বলা যায় বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও কম সাক্ষর জনগণ কেবল রাষ্ট্রীয় কাজে বা অফিস আদালতে প্রমিত বাংলা ব্যবহার করেন। অন্য সময় ঐ কম অর্ধেক সাক্ষর জনগণ এবং সবসময় বেশি অর্ধেক নিরক্ষর জনগণ তাদের আঞ্চলিক বা উপভাষায় কথা বলেন। সর্বোপরি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অভিবাসী বাঙালি জনগণ প্রমিত বাংলা না শিখে নিজেদের আঞ্চলিক বাংলাই রপ্ত করে। সুতরাং আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের মুখের ভাষার কাছে যেতে হলে কিছু সংখ্যক মানুষের সামান্য সময় ব্যবহৃত প্রমিত বাংলাকে আঞ্চলিক বাংলার আলিঙ্গনে প্রয়াসী হওয়া আবশ্যক।

বাংলা উপভাষাতত্ত্বের প্রথম প্রবাদপুরুষ জর্জ আব্রাহাম গ্রিয়ার্সন। উল্লেখ্য, গ্রিয়ার্সনের আগে এবং সমকালেই বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষার বিবরণমূলক আলোচনা শুরু করেন। গ্রিয়ার্সন বাংলা উপভাষা অঞ্চল বলতে আসাম (অসম) সীমান্ত থেকে বিহার (পুর্নিয়া) সীমান্ত ও দক্ষিণে একদিকে (দক্ষিণ-পূর্ব) পার্বত্য চট্টগ্রাম ও মিয়ানমারের নাফ নদীর ক‚ল, ও অন্যদিকে (দক্ষিণ-পশ্চিম) উড়িষ্যা-সীমান্ত ও (পশ্চিমে) সাঁওতাল পরগনার আরম্ভ-সীমা পর্যন্ত বিস্তৃত ভূ-অঞ্চলে ও অধুনা রাজনৈতিকভাবে দ্বিধান্বিত দুটি আধুনিক রাষ্ট্রে যে ভাষা-অঞ্চল বিস্তৃত তাকে বুঝিয়েছেন।৩ তিনি বাংলার উপভাষাকে সাতটি শ্রেণিতে বিন্যাস করেন। আর পূর্ববঙ্গীয় শ্রেণিকে আরও তেরোটি উপশ্রেণিতে ভাগ করেন।৪ গ্রিয়ার্সন’র উপভাষার এই শ্রেণিকরণ সাংগঠনিক ভাষাতত্ত্বীয় পদ্ধতির পরিবর্তে আঞ্চলিক সীমারেখার ওপর গুরুত্ব আরোপিত। সাংগঠনিক পদ্ধতির আলোকে বিচার করলে দেখা যায় যে, সিলেটি বাংলা নোয়াখালী ও চট্টগ্রামে প্রচলিত বাংলার নিকটবর্তী (চৌধুরী ১৯৬০, হাই ১৯৬৫ ও ১৯৬৬, রায় ১৯৬৬)। এই পর্যায়ে সিলেটের ভাষা শ্রেণিকরণে ধ্বনিগত বৈশিষ্ট্য, রূপমূল গঠনের কাঠামো ও বাক্য গঠনের প্রক্রিয়াগত দিকের ওপর প্রাধান্য আরোপিত।৫

সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় গ্রিয়ার্সনকৃত ভিত্তির ওপর নির্ভর করে বাংলা উপভাষাগুলোর আঞ্চলিক বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্বের উপাদান মিশিয়ে চারটি ভৌগোলিক বিভাজনে মাগধী প্রাকৃত এবং অপভ্রংশ থেকে উদ্ভূত বাংলা অসমীয়া এবং উড়িষ্যার উপভাষাগুলিকে শ্রেণিকরণ করেন- রাঢ়, পুণ্ড্র বা বরেন্দ্র, বঙ্গ ও কামরূপ।৬ তিনি মনে করেন বাংলা উপভাষাগুলি বাংলা ভাষার একটি প্রাচীন রূপ থেকে উদ্ভূত নয় বরং মাগধী অপভ্রংশের বিভিন্ন আঞ্চলিক রূপ থেকে তা বিবর্তিত।৭ সুনীতি কুমার প্রমাণ দেখান বাংলা ভাষা ও বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষার উদ্ভবের পেছনে আর্য ভাষা আগমনের পূর্বে প্রচলিত স্থানীয় ভাষাগুলির প্রভাব রয়েছে। একে ভাষাবিজ্ঞানের ভাষায় নিম্ন বা অবস্তরীয় বা ংঁনংঃৎধঃঁস ভাষা প্রভাব বলে। এ প্রসঙ্গে তিনি কোল (অস্ট্রিক), দ্রাবিড়, এবং ভোট-চীন এই তিনটি অনার্য ভাষার কথা উল্লেখ করেছেন।৮ উপভাষা শ্রেণিকরণে তিনি লক্ষ করেছেন যে, পূর্ববঙ্গীয় সিলেট কাছাড় ত্রিপুরা নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের ভাষায় যে বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান অন্য উপভাষায় তা অনুপস্থিত।৯

মুহম্মদ শহীদুল্লাহ১০ গ্রিয়ার্সন দ্বিভাজন রীতি (প্রাচ্য/পাশ্চাত্য) রক্ষা করেও প্রত্যেক ভাগকে দুইটি উপভাগে বিভক্ত করেন এবং কাছাড় থেকে চট্টগ্রাম অঞ্চলকে প্রাচ্যের পূর্বপ্রান্তিক উপবিভাগের অন্তর্ভুক্ত করেন। আর জেলা চব্বিশ পরগনার পূর্বাংশ যশোর খুলনা ঢাকা বিভাগ এবং নোয়াখালী অঞ্চলকে প্রাচ্যের দক্ষিণ-পূর্ব উপবিভাগের অন্তর্ভুক্ত করেন। সিলেটকে তিনি তাঁর সারণিতে আলাদা উপভাষা হিসেবে দেখাননি। যদিও তিনি তাঁর বাংলা একাডেমি বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান (১৯৬৫)-এর ভূমিকায় যে-২০টি উপভাষার নমুনা গ্রিয়ার্সনের বই থেকে দিয়েছেন তাতে এবং সংগৃহীত শব্দের পাশে যে-১৬টি জেলার নামের সংকেত দিয়েছেন তাতেও সিলেট জেলা উল্লেখ আছে। এমনকি এ বইয়ের ভূমিকায় মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলাদেশের বিভিন্ন উপভাষায় রক্ষিত ভাষার কিছু প্রাচীন লক্ষণের উল্লেখ করেছেন। যেমন সিলেটিতে সর্বনামের উত্তম পুরুষে ‘মুই’, সর্বনামের প্রথম পুরুষে ‘তাই’ ইত্যাদি আসামি ভাষায় আছে। এই সাদৃশ্য সম্পর্কে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ লিখেছেন, “হইতে পারে প্রাচীন বাংলা ভাষার একটি স্রোত উত্তরবঙ্গ হইতে পূর্ব অভিমুখে আসামে প্রবেশ করে। পরে সেই স্র্রোত আসাম হইতে দক্ষিণ অভিমুখে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এককালে বাংলাদেশের এই পূর্ব প্রান্তের ভাষা বোধ হয় আসামির সহিত একরূপ ছিল; কিন্তু পূর্ববঙ্গের উপভাষার প্রভাবে তাহার বৈশিষ্ট্য লোপ হইয়া পূর্ববঙ্গের উপভাষা গোষ্ঠীর সামিল হইয়াছে। সিলহেটী উপভাষায় এবং ময়মনসিংহের পূর্বাঞ্চলে ‘তাই’ (ংযব) শব্দ তাহার প্রাচীনত্ব রক্ষা করিয়াছে।”১১ এ উদ্ধৃতিতেই প্রমাণ পাওয়া যায় সিলেটি উপভাষার সাথে অসমিয়া ভাষার এক কালে মিল ছিল। বর্তমানে পূর্ববঙ্গীয় উপভাষার প্রভাবে এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবধানে সে মিল লোপ পেলেও তা পুরোপুরি মিলিয়ে যায়নি। একই কথা নোয়াখালী-চট্টগ্রামের উপভাষার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

মুনীর চৌধুরী গ্রিয়ার্সন অবলম্বনে আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য অনুসারে বাংলাদেশের বাংলা উপভাষার শ্রেণিকরণ করেছেন :

১. উত্তরবঙ্গীয় : দিনাজপুর, রাজশাহী, বগুড়া ও পাবনা;

২. রাজবংশী : রংপুর;

৩. পূর্ববঙ্গীয় :

(ক) ঢাকা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, বরিশাল, পটুয়াখালী,

(খ) ফরিদপুর, যশোহর, খুলনা,

(গ) সিলেট;

৪. দক্ষিণবঙ্গীয় : চট্টগ্রাম, নোয়াখালী।১২

এখানে লক্ষণীয় মুনীর চৌধুরীই প্রথম সিলেটি উপভাষাকে পূর্ববঙ্গীয় শ্রেণির আলাদা উপশ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন। ধ্বনিতাত্তি¡ক বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, সিলেটিতে স্পৃষ্ট কণ্ঠ্য ‘ক’ এবং স্পৃষ্ট ওষ্ঠ্য ‘ফ’ ধ্বনির ঘর্ষণজাত রূপ পাওয়া যায়। রূপতাত্তি¡ক বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করে লিখেছেন, সিলেটিতে সম্বন্ধের একবচনে ‘অর’ -গরর; অপাদানে ‘ত’, ‘ও’,-গরত, গরো; কর্তায় বহুবচনে ‘আইন’ -গরাইন, ‘টাইন’,-গরটাইন ইত্যাদি। তিনি উল্লেখ করেন বাংলাদেশের উপভাষাসমূহে রূপতাত্তি¡ক বৈচিত্র্য অধিক এবং তা তিনটি ক্ষেত্রে সর্বাধিক- সর্বনাম, কারক বিভক্তি ও ক্রিয়া বিভক্তি। আমাদের আলোচ্য তিনটি অঞ্চলে এই বৈচিত্র্য সবচেয়ে বেশি।

অনুমান করা যায় মধ্যযুগেও বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা-আসাম এর ভাষা আরও অনেক বেশি অভিন্ন ছিল। পরবর্তীতে শ্রীচৈতন্যের বৈষ্ণব ভাববাদী সাহিত্যের ভাষা হিসেবে নবদ্বীপের আঞ্চলিক ভাষা এবং আধুনিক যুগে ইংরেজ আনুক‚ল্যে কলকাতা অঞ্চলের উপভাষার প্রমিতকরণ বা মান্যায়ন- সাহিত্য-সংবাদপত্রের ভাষার সাথে বিস্তৃত এ অঞ্চলের ভাষার ব্যবধান তৈরি করে। এভাবে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কারণে ভৌগোলিকভাবে দূরবর্তী অঞ্চলের ভাষাগুলি পৃথক হয়ে উঠে। আর একই কারণে আঞ্চলিক ভাষা বা উপভাষাগুলির অপরিবর্তিত কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য অনেকটা অভিন্ন মনে হয়। অবশ্য এই অভিন্নতার কারণ হিসেবে জনঅভিবাসনকেও অস্বীকার করা যায় না। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে এবং উপর্যুক্ত উপভাষাবিজ্ঞানীগণের মতামতের ভিত্তিতে আমরা বাংলাভাষার উপভাষাগুলোর শ্রেণিকরণ এভাবে দেখাতে চাই :

এখানে উল্লেখ্য, বাংলাদেশের উপভাষাকে প্রথমে মুনীর চৌধুরী১৩ এবং পরে আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ১৪ চারটি উপশ্রেণিতে ভাগ করেন; তবে উভয়েই সিলেটকে পূর্ববঙ্গীয় উপশ্রেণিতে দেখান। অথচ বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষাভাষীর মধ্যে বোধগম্যতার দিক থেকে সবচেয়ে দূরবর্তী উপভাষা হচ্ছে সিলেট-নোয়াখালী-চট্টগ্রামের উপভাষা। প্রান্তবঙ্গীয় এ উপভাষাগুলোর সাদৃশ্য-স্বাতন্ত্র্য সম্পর্কে সুনীতি কুমারও মন্তব্য করেন : ‘ঞযব বীঃৎবসব ঊধংঃবৎহ ভড়ৎসং ড়ভ ঃযব ঠধ?মধ ংঢ়ববপয, রহ ঝুষযবঃ, শধপযধৎ, ঞরঢ়ঢ়বৎধ, ঘড়ধশযধষর ধহফ ঈযরঃঃধমড়হম, যধাব ফবাবষড়ঢ়বফ ংড়সব ঢ়যড়হবঃরপ ধহফ সড়ৎঢ়যড়ষড়মরপধষ পযধৎধপঃবৎরংঃরপং যিরপয ধৎব ভড়ৎবরমহ ঃড় ঃযব ড়ঃযবৎ মৎড়ঁঢ়ং. অ মৎবধঃ ফবধষ ড়ভ ঃযবংব যধাব ঁহয়ঁবংঃরড়হধনষু ধহ বঃযহরপ নধংরং’ ১৫ বাংলাদেশের উপভাষা আলোচনায় ভারতের কাছাড় ও ত্রিপুরা বাদ দিয়ে পাই : সিলেট-নোয়াখালী-চট্টগ্রামের উপভাষা। মুনীর চৌধুরী, মুহম্মদ আবদুল হাই, আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ প্রমুখ ভাষাবিজ্ঞানীর সাংগঠনিক আলোচনাতেও এ তিনটি অঞ্চলের ভাষার সাদৃশ্য দৃশ্যমান।১৬ এমনকি পবিত্র সরকার ও মহাম্মদ দানীউল হকও মনে করেন: এ তিনটি অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষাকে অন্য একটি বা দুটি স্বতন্ত্র উপভাষা হিসেবে শ্রেণিকরণ করা সমীচীন।১৭ রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে তাকালেও দেখা যাবে এ অঞ্চলগুলি বাংলার প্রান্তে অবস্থিত হবার কারণে বিভিন্ন সময় প্রতিবেশী রাজ্য (অসম, ত্রিপুরা, লুসাই ও বর্মা) কর্তৃক অধিকৃত হয়েছে; কিংবা বাংলা থেকে ছিটকে গিয়ে স্বাধীন রাজ্য হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। আর এ কারণেই হয়তো বাংলাদেশের অন্য যে কোনো উপভাষার চেয়ে এই তিনটি উপভাষায় অনার্য (অস্ট্রিক, দ্রাবিড় ও ভোটবর্মী) প্রভাব সর্বাধিক। এসব দিকে লক্ষ রেখে আমরা এদের একত্রে ‘প্রান্তবঙ্গীয়’ নাম প্রস্তাব করছি।

আমাদের বক্তব্যের পক্ষে একটি উদাহরণ দেয়া যাক :

প্রমিত বাংলা ভাষায় আমরা যখন বলি : আমি তোমাকে ভালোবাসি।

সিলেটের উপভাষায় বলি: মুই তুমারে ভালাপাই। কিংবা, আমি তরে দেখতে ফারি।

নোয়াখালীর উপভাষায় বলি: আঁই তোঁয়ারে দেখতাম পারি।

আর,

চট্টগ্রামের উপভাষায় বলি : আঁই তোঁয়ারে দেইদ্ ফারি। কিংবা, আঁত্তুন তোঁয়ারে গম লাগে।

বাংলা ভাষার পূর্বপ্রান্তের দূরবর্তী এ তিন উপভাষার মধ্যে তখন বেশ মিল অনুভূত হয়। এ তিনটি উপভাষা নিয়ে ইতোমধ্যে পৃথক পৃথকভাবে একাধিক দৃষ্টিকোণ থেকে গবেষণা হয়েছে। এমনকি রবীন্দ্রকুমার দত্ত ‘নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের উপভাষা : একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ’ শীর্ষক গবেষণা-অভিসন্দর্ভ-র জন্য ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি (১৯৯৬) লাভ করেছেন। তবু এ তিনটি উপভাষার তুলনামূলক বিশ্লেষণে অদূর ভবিষ্যতে কোনো গবেষক এগিয়ে আসবেন বলে আমরা আশা করি। এতে বাংলা ভাষার আরও অনেক অজানা তথ্য হাতের কাছে ধরা দেবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj