রবীন্দ্র নাটক রক্তকরবী : রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী : শামস্ আল্দীন

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

কেউ কেউ জানিয়েছেন, ‘রক্তকরবী’ রচনাকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (০৭.০৫.১৮৬১-০৭.০৮.১৯৪১) প্রথম নামকরণ করেছিলেন ‘যক্ষপুরী’, যেমন রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের কন্যা সীতা দেবী পুণ্যস্মৃতিতে নাটকটির নাম ‘যক্ষপুরী’ বলে উল্লেখ করেছেন। আনন্দবাজার পত্রিকা সেই সময় রবীন্দ্রনাথের নতুন এই নাটকটির সংবাদ পরিবেশন (১৪ আষাঢ়, ১৩৩০) প্রসঙ্গে নাটকটির নামোল্লেখ করেছেন ‘যক্ষের ধন’। আষাঢ় সংখ্যা শান্তিনিকেতন পত্রিকায়ও নাটকটির ‘যক্ষপুরী’ নামটিকেই উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ১৯ ভাদ্র ১৩৩০-এ প্রবাসীর সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়কে চিঠিতে লিখেছেন, ‘যক্ষপুরী’ নাটকটি প্রবাসীর পূজা সংখ্যায় প্রকাশ না করিয়া ফাল্গুন বা চৈত্র মাসে প্রকাশের যদি ব্যবস্থা করেন তবে ভালো হয়। অভিনয়ের পূর্বে আমি উহা ব্যবহার করিতে ইচ্ছা করি না। যথাসময়ে লেখাটি পাঠাইয়া দেব।’ (পত্র ২২./চিঠিপত্র)। আবার ২৪ আশ্বিন ১৩৩০-এ অমিয় চক্রবর্তীকে রবীন্দ্রনাথ চিঠিতে লিখলেন, ‘নন্দিনী নাটকটার উপর ক্ষণে ক্ষণে প্রায় তুলি বুলাচ্ছি, তাতে তার রং ফুটছে বলেই বোধ হচ্ছে। কাল সন্ধ্যাবেলায় আত্মীয়সভায় ওটা আর একবার পড়বার কথা আছে।’ নাটকটির সঙ্গে যে ‘অভিভাষণ’, তাতেও রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করলেন, ‘নন্দিনী’র পালা অভিনয় হবে।

যদিও প্রশান্ত কুমার পাল তাঁর ‘রবিজীবনী’র নবম খণ্ডে জানিয়েছেন, কোনো পাণ্ডুলিপিতেই ‘যক্ষপুরী’ বা ‘যক্ষের ধন’ এই নামগুলো নেই। পঞ্চম খসড়ার দুটি খাতায় যথাক্রমে ‘নন্দিনী’, ‘নন্দিনী ২’ শিরোনামে রবীন্দ্র-হস্তাক্ষরে পাওয়া গেছে। তাঁর অনুমান, ‘যক্ষপুরী’ নামটি লোকমুখে এতটাই পরিচিত হয়েছিল যে, রবীন্দ্রনাথের কলমেও স্বতই এসে পড়েছে। এই ‘রক্তকরবী’ নামটি অষ্টম খসড়া থেকেই তিনি জুড়েছেন এবং প্রবাসী পত্রিকায় (আশ্বিন ১৩৩১) ‘রক্তকরবী’ নামে প্রকাশিত হয়েছে।

গ্রন্থ প্রকাশকালে (পৌষ ১৩৩৩/১৯২৬), প্রবাসী (১৩৩১ আশ্বিন) প্রকাশিত কবির এই ‘অভিভাষণ’ ‘প্রস্তাবনা’ রূপে মুদ্রিত হয়। প্রশান্ত কুমার পাল জানিয়েছেন, ‘রক্তকরবী’ ‘কবির অভিভাষণ’ টীকাসহ মুদ্রিত হয়। রবীন্দ্রনাথের এই ভাষণটি কোথাও প্রদত্ত হয়েছিল বলে জানা যায় না। গ্রন্থাকারে প্রকাশের সময় (পৌষ ১৩৩) এটি ‘প্রস্তাবনা’ নামে গ্রন্থ সূচনায় ব্যবহৃত হয়।

নাট্যকার রচিত ‘অভিভাষণ’-এর প্রথম বাক্যটি প্রথমেই উল্লেখযোগ্য- ‘আজ আপনাদের বারোয়ারি-সভায় আমার ‘নন্দিনী’র পালা অভিনয় হবে।’

এই প্রথম বাক্যটির সূত্রে এ কথা স্মরণে আসে, নাটকের সঙ্গে সাহিত্যের অন্য ধারার প্রধান পার্থক্য, কবিতা, গল্প বা উপন্যাসে রচয়িতা যা বলবেন তাতেই পাঠকের সন্তুষ্টি বা আত্মতুষ্টি এবং এই ধারাগুলোতে রচয়িতাই প্রথম ও শেষ কথা বলার মালিক। কিন্তু নাটকে নাট্যকারকে তাঁর রচনাকে সম্পূর্ণতা বা পরিপূর্ণতা দিতে নির্ভর করতে হয় সেই নাটকটি যিনি প্রযোজনা, পরিচালনা করবেন, যাঁরা অভিনয় করবেন, মঞ্চ সাজাবেন, আলো, শব্দ, আবহ, সঞ্চালনা ও নিয়ন্ত্রণ করবেন অনেকাংশে তাঁদের ওপর। সাহিত্যের অন্যান্য ধারার সঙ্গে এই ধারাটির রস গ্রহণেরও পার্থক্য বিদ্যমান। পাঠক মূলত একাকী কবিতা, গল্প বা উপন্যাসের স্বাদ গ্রহণ করে থাকেন, নাটকেও তাই। তবে পাঠক নয়, নাটক প্রধানত দর্শকদের। একজন নয়, প্রেক্ষাগৃহ পরিপূর্ণ সমাজের ভিন্ন ভিন্ন স্তরের মানুষই তার টার্গেট। তাই নাটক রচনার সঙ্গে সঙ্গে নাট্যকার মঞ্চের কথা ভাবেন, অভিনেতার কথা ভাবেন। রবীন্দ্রনাথকে তাই ‘অভিভাষণ’ এর প্রথম বাক্যেই উল্লেখ করতে হয়েছে ‘বারোয়ারি-সভায়’ তাঁর ‘নন্দিনী’র পালা অভিনয় এর প্রসঙ্গ।

এই সূত্রে আর একটু তথ্য উল্লেখ করতে পারি, তখনও ‘রক্তকরবী’ রচনা পরিপূর্ণ হয়ে ওঠেনি, অথচ নাট্যকার থেকে শ্রোতা (যাঁদের রবীন্দ্রনাথ নাটকটি পড়ে শুনিয়েছেন) সকলের ভাবনায় তখন থেকেই নাটকটির মঞ্চায়নের ভাবনা। ২৬ আশ্বিন ১৩৩০-এ রাণু অধিকারীকে লেখা রবীন্দ্রনাথের একটি চিঠি এই প্রেক্ষিতে উদ্ধারযোগ্য : ‘কাল সন্ধ্যের সময় সেই নন্দিনী নাটকটার একটা পাঠ দিয়েছিলুম। অনেক বদল হয়ে গেছে। জান বোধহয় এখন তার নাম হয়েছে রক্তকরবী। সবাই শুনে বললে, রাণু না হলে নন্দিনীর ভূমিকায় আর কেউ করতে পারবে না।’ (পত্র ২৬ চিঠিপত্র ১১)।

‘অভিভাষণ’ এ ‘বারোয়ারি-সভায়’ এই নাটক অভিনয়ের পরিণতি সম্পকে নাট্যকার তাঁর উদ্বেগ চেপে রাখেননি, কারণ ভিন্ন শ্রেণির দর্শক, যাঁদের ভিন্ন রুচি, ভিন্ন যোগ, ভিন্ন মানসিকতা এবং রসগ্রহণের ক্ষেত্রে ব্যক্তির সঙ্গে গড়ে ওঠা পার্থক্য। সেখানেই নাট্যকারের পরীক্ষা, উদ্বেগ, ভয়। সেই উদ্বেগ-ভয় গোপন করেননি রবীন্দ্রনাথ, ‘ভয় হচ্ছে, পালা সাঙ্গ হলে ভিখ মিলবে না, কুত্তা লেলিয়ে দেবেন। তারা পালাটিকে ছিঁড়ে কুটিকুটি করবার চেষ্টা করবে। এক ভরসা, কোথাও দন্তস্ফুট করতে পারবে না।’

এখানে নাট্যকারের শেষে বাক্যটিতে কিন্তু ভয়ের লেশমাত্র নেই, বরং বিরাজ করছে আত্মবিশ্বাসের প্রত্যয়। কৌত‚হল জাগে; এই ভরসা, এই আত্মবিশ্বাস তিনি পেলেন কোথায়?

১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে মে থেকে ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট-সেপ্টেম্বর এই সময়কালের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ দশবারেরও বেশি ‘রক্তকরবী’ নাটকটির ঘসা-মাজা করেছেন। প্রতিবারই সংযোজন-পরিবর্তন করেছেন। এই মুহূর্তে সেই সংযোজন-পরিবর্তনের ইতিহাসকে স্মরণ করা যেতে পারে, যে ইতিহাস আমাদের সাহায্য করবে রবীন্দ্রনাথের ভরসা ও আত্মবিশ্বাসের জায়গাটা খুঁজে নিতে- ১৯২৩-এর এপ্রিলের শেষে রবীন্দ্রনাথ শিলং যাত্রা করেন। সেখানেই অমিয় চক্রবর্তীকে চিঠিতে লিখলেন, ‘একটা নাটক গোচের একটা কিছু লেখবার ইচ্ছা আছে।’ (পত্র ২২, চিঠিপত্র)।

‘রবিজীবনী’তে প্রশান্ত কুমার পাল জানিয়েছেন- ‘নাটক গোচের’ লেখাটি হলো ‘রক্তকরবী’ নাটকের প্রথম খসড়া।

অনুমান করা যায়, ‘রক্তকরবী’র নামহীন প্রথম খসড়াটি লেখা শুরু হয়েছিল অমিয় চক্রবর্তীকে লিখিত ২৮ বৈশাখ (১১ মে) চিঠির অব্যাবহিত পরে অর্থাৎ মে ১৯২৩-র মাঝামাঝি বা জ্যৈষ্ঠ ১৩৩০-র প্রথম দিকে।…

‘৪ পৃষ্ঠায় ১০টি সূ² রুলটানা কাগজে কালো কালিতে পাণ্ডুলিপিটি লিখিত, লেখা পৃষ্ঠা ৩৭। খসড়াটিতে কোথাও নাটকটির নামের উল্লেখ নেই, রচনাটি সংলাপধর্মী হলেও সংশ্লিষ্ট সংলাপের সঙ্গে পাত্রপাত্রীর নাম উল্লিখিত হয়নি। প্রবেশ-প্রস্থান ইত্যাদি কোনো নাট্যক্রিয়ার নির্দেশও নেই এই খসড়াতে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তথ্য এই যে নাটকের নায়িকার নাম ‘খঞ্জন’ বা ‘খঞ্জনী’ ‘নন্দিনী’ নয়।’

প্রথম খসড়ায় ফুল রক্তকরবীর কোনো উল্লেখ নেই, আছে জুঁই ফুল। ১ম- ৪র্থ খসড়া পর্যন্ত খঞ্জন বা নন্দিনীর গ্রামটি নিশানী-পাড়া বলে উল্লিখিত।

দ্বিতীয় খসড়া ‘রক্তকরবী’ ফুলটির প্রথম উল্লেখ দেখা গেল মাত্র দুবার-নাটকের শুরু ও শেষে। এই দ্বিতীয় খসড়ায় নায়িকার নাম ‘খঞ্জন’ বা খঞ্জনার পরিবর্তে ‘নন্দিনী’ (অল্প সময়ের জন্য পাঠে ‘সুনন্দা’ নামটি ব্যবহৃত হয়েছে)। এছাড়া পাত্রপাত্রীর নাম পৃথকভাবে লেখা হলো প্রতিটি সংলাপের পূর্বে; নাটকটিকে ৬টি পর্বে সংখ্যা-চিহ্নিত করে ব্যবহৃত করা হয়েছে; নাটকের সূচনায় ‘নাট্যপরিচয়’ শিরোনামে একটি ভূমিকা যুক্ত হয়েছে।

প্রথম খসড়ার সূত্রপাত হয়েছিল ফাগুলাল-চন্দ্রার সংলাপ দিয়ে, দ্বিতীয় খসড়ার সূচনা রাজা-নন্দিনীর সংলাপে। তৃতীয় খসড়ার থেকে আবার নাটকের সূত্রপাত হচ্ছে অধ্যাপক-নন্দিনীর সংলাপে। আর নাটক সম্পূর্ণ হওয়ার পর আমরা পেলাম, নন্দিনী ও কিশোরের কথোপকথনে নাটকটির শুরু। প্রশান্ত কুমার পাল অনুমান করেছেন এই প্রথম তিনটি খসড়া শিলঙে থাকার সময়ে রচিত। চতুর্থ খসড়াটি কলকাতায়। সেই সময় ‘বিসর্জন’-এর রিহার্সাল ও অন্যান্য কাজের ব্যস্ততার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘রক্তকরবী’র চতুর্থ খসড়াটি শেষ করেছেন বলে রবিজীবনীকার মনে করেছেন। এই খসড়ায়ও কোনো মঞ্চ নির্দেশ নেই।

পঞ্চম খসড়াটি শান্তিনিকেতনে নির্মিত। এই পঞ্চম খসড়াটি হস্তলিপি অমিয় চক্রবর্তীর। তিনি ঐ বছরে পূজার ছুটিতে শান্তিনিকেতনে এলে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে দিয়ে নাটকটির সংশোধিত প্রতিলিপিটি প্রস্তুত করান। তেমনি ষষ্ঠ খসড়াটি তিনি প্রস্তুত করিয়েছেন সুখেন্দুরঞ্জন রায়কে দিয়ে।

পঞ্চম খসড়ায় নন্দিনীর গ্রাম রূপান্তরিত হয়েছে নিশানীপাড়া থেকে ঈশানীপাড়ায়, সঙ্গে যোগ হয়েছে গোকুল ও চিকিৎসক- চরিত্র দুটি, আবার ষষ্ঠপাঠে সর্বপ্রথম ছোট সর্দারের উপস্থিতি ঘটেছে এবং দশম খসড়াতে এসেছে কিশোর চরিত্রটি। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, অষ্টম খসড়ার মলাটে নাটকটি প্রথম ‘রক্তকরবী’ নামে আখ্যায়িত হয়েছে। পৌষমেলা উপলক্ষে রানী মহলনাবিশ শান্তিনিকেতনে এসে ৬ পৌষ ১৩৩০ সালে স্বামী প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশকে চিঠিতে লিখলেন, ‘কাল রাত ১০টা পর্যন্ত আমার ঘরে বসে নতুন নাটকটি আবার পড়লেন। অনেক বদলেছেন- একেবারে প্রায় আলাদা চেহারা। নাম বদলিয়ে ‘রক্তকরবী’; নাম দিয়েছেন- বেশ সুন্দর লাগল।’ মনে হয় অষ্টম খসড়াটি রানী মহলানবিশকে পড়ে শুনিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

ধরে নেওয়া যায়, শিলঙয়ে থাকাকালীন ‘রক্তকরবী’ লেখার শুরু এবং শেষ মোটামুটি ১১ মে ১৯২৩-এর পর থেকে ১২ জুন ১৯২৩-এর সময়কালের মধ্যে। ১২ জুন রবীন্দ্রনাথ প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশকে লিখেছেন, ‘নাটকটা একরকম শেষ হয়েছে। এঁকে নাটক দেওয়া যায় কিনা জানি নে। কলকাতায় শীঘ্র যাচ্চি তখন শুনতে পাবে।’ কিন্তু আমরা দেখলাম, এই একমাস নয়, জ্যৈষ্ঠ ১৩৩০-এর পর থেকে আশ্বিন ১৩৩১ সংখ্যা প্রবাসীতে সম্পূর্ণ মুদ্রিত হওয়ার আগে পর্যন্ত প্রায় একাদশবার সংযোজন-পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে রবীন্দ্রনাথ সম্পূর্ণ করেছেন ‘রক্তকরবী’। এবং তার পরে প্রায় দু’বছরের ব্যবধানে পৌষ ১৩৩৩/ডিসেম্বর ১৯২৬-এ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হলো ‘রক্তকরবী’- এই তথ্যটির পুনরায় উল্লেখ এই কারণে বোঝা যাচ্ছে যে, ‘রক্তকরবী’ সংক্রান্ত নাট্যকারের ভাবনা-চিন্তা প্রসারিত হয়েছে এই সময়কালেও। যদিও এটি আমাদের অনুমাননির্ভর, আর সেই নির্ভরতার মূলে একটি চিঠির উল্লেখ করতে পারি-

‘আশ্বিন ১৩৩১ সংখ্যা প্রবাসীতে ‘রক্তকরবী’ নাটকটি সম্পূর্ণ মুদ্রিত হয়েছিল, এই মুদ্রণের বিভিন্ন প্রমাদ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বিরক্তি প্রকাশ করেছিলেন। এই বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ লেখেন- ‘রক্তকরবী’র একটা পড়ৎৎবপঃবফ কপি তোমার কাছে পাঠাচ্ছি- এটা তোমার কাছে পধৎবভঁষষু রেখে দিও। যখন বই ছাপান হবে তখন দরকার হবে- ‘রক্তকরবী’তে মাঝে এক জায়গা কথাবার্তায় ওলোটপালট কিছু হয়ে গেছে। বাবা বলেন, সংং নেই বলে পড়ৎৎবপঃরড়হ করতে পারলেন না। ইংরেজিতে জবফ ঙষবধহফবৎং’ এর ২১ ও ২২ পাতার যে কথাবার্তা আছে সেইটাই ঠিক- বাংলাটা তার তুলনা করে দেখে রেখ।’

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সুইট-ফরাসি বহুভাষাবিদ অধ্যাপক ঋবসধহফ ইবহড়রঃ-র সহায়তায় রবীন্দ্রনাথ ‘রক্তকরবী’র অনুবাদ করেছেন জবফ ঙষবধহফবৎং নামে। প্রশান্ত কুমার পাল জানিয়েছেন, এই তর্জমাটি ষষ্ঠ খসড়া অবলম্বনে করা। ‘রক্তকরবী’র পাঠান্তর : পাণ্ডুলিপি ও খসড়ার বিবরণ’ প্রবন্ধে প্রণয় কুণ্ডু জানিয়েছেন-… নাটকটি রক্তকরবী নাম নিয়ে ১৩৩১ সালের আশ্বিন মাসে প্রবাসী পত্রিকার ক্রোড়পত্র রূপে মুদ্রিত আকারে প্রকাশিত হয়। মুদ্রিত হওয়ার আগে রক্তকরবীর নেপথ্যে দশটি খসড়া রয়ে গেছে। ‘প্রবাসী‘তে প্রকাশিত একাদশ খসড়ার মুদ্রিত রূপ। ১৯২৩ সালে মে থেকে ১৯২৪ সালের অক্টোবর- দেড় বছর সময়সীমার মধ্যে এই এগারোটি খসড়া করেছিলেন রক্তকরবীর চূড়ান্ত রূপ দিতে গিয়ে। এর থেকে বোঝা যায়- এই নাটকটির রচনার পিছনে কবির কী গভীর মমতা ও মগ্নতা ছিল।’

‘অভিভাষণ’ এর যে বক্তব্যসূত্রে এই দীর্ঘ অনুসন্ধান ও জিজ্ঞাসা এবং তার উত্তর আমরা এই ভাবেই পেয়ে যাই। নাট্যকারের ‘গভীর মমতা ও মগ্নতা’ই কেবল নয়, দেখলাম একটা দীর্ঘ সময় ধরে নানা কাজের মধ্যে; সেই কাজ যেমন ভিন্ন-ভিন্ন রকমের, এমনকি সাহিত্য সৃষ্টির অন্য ধারাতে অংশগ্রহণ করেও রবীন্দ্রনাথ রক্তকরবীকে নিয়ে ভেবেছেন। বারবার পরিবর্তন, পরিমার্জন ও সংশোধনের মধ্য দিয়ে নাটকটিকে সর্বাঙ্গ সুন্দর, নিখুঁত করার চেষ্টা করেছেন। রবীন্দ্রনাথের বিবেচনায় তাঁর এই সৃষ্টি প্রকৃত অর্থেই সর্বাঙ্গ সুন্দর, নিখুঁত। আর সেই কারণেই এক ছদ্ম ভয় প্রকাশ করে গভীর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে, স্থির আত্মপ্রত্যয়ের সঙ্গে বলতে পারেন রবীন্দ্রনাথ :

‘ভয় হচ্ছে পালা সাঙ্গ হলে ভিখ মিলবে না, কুত্তা লেলিয়ে দেবেন। তারা পালাটিকে ছিঁড়ে কুটিকুটি করবার চেষ্টা করবে। এক ভরসা, কোথাও দন্তস্ফুট করতে পারবে না।’

এই সূত্রে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দেয়, নাটক সৃষ্টির পর নাট্যকার কেন লেখেন অভিভাষণ, প্রস্তাবনা?

মনে হয় স্রষ্টা তার সৃষ্টি সম্পর্কে পাঠক-দর্শকদের আগাম সচেতন করে দিতে পাঠক-দর্শকের সঠিকভাবে রসগ্রহণের সুবিধার্থে লেখেন অভিভাষণ, প্রস্তাবনা। নাটকের সেই প্রস্তাবনায় নাট্যকার যদি দাবি করেন নাটকটি ‘সত্যমূলক’, নাটকটি ‘রূপকনাট্য নয়’, তবে সেই নিরিখেই তাঁর রচনার বিচার যথোপযুক্ত।

‘রক্তকরবী’র প্রস্তাবনায় রবীন্দ্রনাথ তাঁর নাটককে কেবল ‘সত্যমূলক’ বা রূপকনাট্য নয়, এই কথা বলেই ক্ষান্ত হননি, তাঁর মতে এই কথাটি বাল্মীকির রামায়ণের ক্ষেত্রেও সত্য। অথচ নাটকের প্রস্তাবনায় তিনি প্রমাণ করে ছেড়েছেন তাঁর নাটকের মতো রামায়ণের কাহিনীও রূপক। আবার রামায়ণের মতো তাঁর এই কাহিনী রূপকও নয়। সে ক্ষেত্রে তাঁর প্রস্তাবনা অংশটি আমাদের কাছে সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই ভাবনা অবশ্যই রবীন্দ্রনাথের এবং তাঁকে অনুসরণ করেই এই দুই সৃষ্টিকে আমাদের গভীরভাবে জানার ও বোঝার চেষ্টা।

রামায়ণ ও ‘রক্তকরবীর’ প্রসঙ্গে আমাদের বিচার-বিশ্লেষণের প্রথম পদক্ষেপে এই কথা স্মরণীয় : যথার্থ রস গ্রহণের ক্ষেত্রে রামায়ণ ও ‘রক্তকরবী’ এই দুটি মহৎ সৃষ্টির নিহিত রূপককে আবরণের অন্তরালে রেখে ‘প্রকাশ্যে যে রস’ আছে তাকেই গ্রহণ করা উচিত, আর স্বাদ গ্রহণের ক্ষেত্রে রবীন্দ্র নির্দেশিত পথই আমাদের অবলম্বন : “রামায়ণ রূপক নয়, আমার রক্তকরবীর পালাটি রূপকনাট্য নয়। রামায়ণ মুখ্যত মানুষের সুখদুঃখ বিরহমিলন ভালোমন্দ নিয়ে ব্যক্তিগত মানুষের আরেক দিকে শ্রেণীগত মানুষের; রাম ও রাবণ একদিকে দুই মানুষের, আরেকদিকে মানুষের আর মানুষগত শ্রেণীর। শ্রোতারা যদি কবির পরামর্শ নিতে অবজ্ঞা না করেন তা হলে আমি বলি শ্রেণীর কথাটা ভুলে যান। এইটি মনে রাখুন, রক্তকরবীর সমস্ত পালাটি ‘নন্দিনী’ বলে একটি মানবীর ছবি। চারিদিকে পীড়নের ভিতর দিয়ে তার আত্মপ্রকাশ। নাটকের মধ্যেই কবি আভাস দিয়েছেন যে, মাটি খুঁড়ে যে পাতালে খনিজ ধন খোঁজা হয় নন্দিনী সেখানকার নয়, মাটির উপরিতলে যেখানে প্রাণের, সেখানে রূপের নৃত্য, যেখানে প্রেমের লীলা, নন্দিনী সেই সহজ সুখের, সেই সহজ সৌন্দর্যের।”

নাট্যকারের অভিপ্রায়- এক্ষেত্রে যদি তাঁর নাটকের কোনো তুলনা হয় তবে বাল্মীকির রামায়ণের সঙ্গেই। কেন? আমরা অনুমান করতে পারি, রবীন্দ্রনাথের অভিমত তাঁর ‘রক্তকরবী’ এই যুগের রামায়ণ। তাঁর সৃষ্টি এই যুগের মহাকাব্য। আধুনিক কবি আদিকবির সঙ্গে সুর মিলিয়ে, তাল মিলিয়ে, লয় মিলিয়ে রচনা করেছেন তাঁর এই আখ্যান। কারণ রামায়ণের কাহিনী ত্রেতাযুগের কাহিনী নয়, কলিযুগের কাহিনী। রামায়ণকে যদি মহাকাব্য বলা যায়, তবে তাঁর রক্তকরবীও মহাকাব্য।

আদিকবি আখ্যান পরিবেশন করেছেন কাব্যের সাহায্যে, আধুনিক কবিও আখ্যান পরিবেশন করেছেন গদ্য সংলাপকে হাতিয়ার করে- যা তাঁর সময়ের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। শুধু তাই নয়, একথা বলা একটুও অতিরঞ্জিত হবে না; রবীন্দ্রনাথ কলিযুগের এক মহাকাব্য রচনা করেছেন।’

কিন্তু কলিযুগের কাহিনী কী?

দ্ব›দ্ব : কৃষির সঙ্গে শিল্পের দ্ব›দ্ব। কর্ষণজীবী এবং আকর্ষণজীবী সভ্যতার দ্ব›দ্ব- সেই ত্রেতাযুগের নয়, কলিযুগের। এরই প্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথের জিজ্ঞাসা, ‘ত্রেতাযুগের তখনো কি সোনার খনির মালিকেরা নবদুর্বাদলবিলাসী কৃষকদের ঝুঁটি ধরে টান দিয়েছিল।’ কল-কারখানা, যন্ত্র-সভ্যতা- এসব এই সময়ের।

‘আজকের দিনের রাক্ষসের মায়ামৃগের লোভেই তো আজকের দিনের সীতা তার হাতে ধরা পড়েছে। নইলে গ্রামের পঞ্চবটচ্ছায়াশীতল কুটির ছেড়ে চাষীরা টাটাগড়ের চটকলে মরতে আসবে কেন। বাল্মীকির পক্ষে সমস্তই পরবর্তীকালের, অর্থাৎ পরস্ব।’

এই কি রামায়ণের সঙ্গে ‘রক্তকরবী’র মিল?

নাট্যকার দেখালেন অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক- উভয়ক্ষেত্রেই তাঁর ‘রক্তকরবী’র সঙ্গে রামায়ণের গভীর মিল, সাযুজ্য। আকারগত দিক থেকে অর্থাৎ স্পেস-এর সুবিধা-অসুবিধার কারণে রামায়ণ ও ‘রক্তকরবী’র কিছু তফাৎ রয়ে গেছে; সাতীককুণ্ডজুড়ে, বৃহৎ পরিসরে রামায়ণ। মাত্র পঁয়ত্রিশ পৃষ্ঠার, পৃথক কোনো দৃশ্য বিভাগ নেই। মাত্র একটিই দৃশ্যে ‘রক্তকরবী’। ফলে ইচ্ছা থাকলেও তাঁর নাটকে বহু চরিত্রকে শামিল করতে পারেননি। রামায়ণে রাবণ ও বিভীষণ- আদিকবি আভাস দিয়েছিলেন তাঁরা একই, তাঁরা সহোদর। রবীন্দ্রনাথ তাঁর নাটকের প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, ‘একই নীড়ে পাপ ও সেই পাপের মৃত্যুবরণ লালিত হয়েছে। আমার স্বল্পায়তন নাটকে রাবণের বর্তমান প্রতিনিধিটি এক দেহেই রাবণ ও বিভীষণ; সে আপনাকেই আপনি পরাস্ত করে।’ কেবল একই দেহে রাবণ-বিভীষণ নয়, রামায়ণের বহু চরিত্র, নানা ঘটনাকে আমরা এই নাটকের সীমিত পরিসরে খুঁজে পাবো।

বাল্মীকি রাবণ দশ মাথাওয়ালা, বিশহাতযুক্ত। ‘রক্তকরবী’র রাজাও তাই, তবে নাট্যকার প্রকাশ্যে এক মাথা, দুহাত যুক্ত করলেও বৈজ্ঞানিক শক্তিতে তিনি দশমাথাওয়ালা, বিশহাতযুক্ত হয়ে গ্রহণ করেন, গ্রাস করেন। এরই সঙ্গে রামায়ণের দশমাথাওয়ালা রাবণের রূপককে তিনি স্থাপন করেন। বাস্তবের মাটিতে, ‘ত্রেতাযুগে বহুসংগ্রহী বহুগ্রাসী রাবণ বিদ্যুৎবজ্রধারী দেবতাদের আপন প্রশাদদ্বারে শৃঙ্খলিত করে তাদের দ্বারা কাজ আদায় করত।’ কোন শক্তিবলে? কোন বিক্রমে? দশজনের সমবুদ্ধিতে, দশজনের সমশক্তিতে শক্তিমান তিনি। আকর্ষণজীবী সভ্যতার প্রতিনিধি যন্ত্রশক্তিতে বলীয়ান রাবণ ধ্বংস করতে চায় কর্ষণজীবী সভ্যতাক। তেমনি কর্ষণজীবী সভ্যতার প্রতিনিধি রাম। এখানেই রামায়ণ রূপক কথা। ‘রাম হলো আরাম, শান্তি; রাবণ হলো চিৎকার, অশান্তি। একটিতে নবাস্কুলের মাধুর্য; পল্লবের মর্মর; আর একটিতে শান বাঁধানো রাস্তার উপর দিয়ে দৈত্যরথের বীভৎস শৃঙ্গধ্বনি।’ যন্ত্রশক্তিতে বলীয়ান দশানন কোন প্রলোভনে কর্ষণজীবীকে কুক্ষিগত করতে চায়? জয় করতে চায়? নাটকে নন্দিনী- বিশু’র সংলাপে এক্ষেত্রে স্মরণ করছি:

“নন্দিনী : সেই অচেনার ধার থেকে এখানে যক্ষপুরীর সুড়ঙ্গ খোড়ার কাজে কে তোমাকে আবার টেনে আনলে?

বিশু : তৃষ্ণার জল যখন আশার অতীত হয়, মরীচিকা তখন সহজে ভোলায়। তার পরে দিক্হারা নিজেকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। একদিন পশ্চিমের জানালা দিয়া আমি চেয়েছিলুম মেঘের স্বর্ণপুরী, সে দেখেছিল সর্দারের সোনার চূড়া। আমাকে কটাক্ষে বললে, ‘ঐখানে আমাকে নিয়ো, দেখি কত বড়ো তোমার সামর্থ্য।’ আমি স্পর্ধা করে বললুম, ‘যাব নিয়ে।’ আনলুম তাকে সোনার চূড়ার নিচে। ততক্ষণ আমার ঘোর ভাঙল।’

বিশুর ঘোর ভাঙলেও, ঘোর ভাঙেনি তার স্ত্রীর। বিশু চিরকালের জন্য হারিয়ে ফেলেছে তাকে। এখানে রামায়ণের আখ্যানই যেন অন্যভাবে উঠে এসেছে; সেই সোনার হরিণের প্রলোভন। স্ত্রীর অন্যায় আবদারে মারীচের মায়া-মরীচিকা জেনেও আনত রাম বাধ্য হয়েছিল সোনার হরিণের পিছন ধাওয়া করতে। সেই সুযোগে দশানন হরণ করেছে কর্ষণজীবী সভ্যতার প্রাণভোমরা সীতাকে। আমরা সকলেই ধরিত্রী সীতার জন্মবৃত্তান্ত জানি। জানি রাবণের পরিণতির কথা : নিজ পরাক্রমে শৃঙ্খলিত দেবতাকে নিয়ে কাজ আদায়ে কোনো অধর্ম নেই, অধর্ম সীতা হরণে। অজেয় রাবণ পরাজিত হয়েছে মূঢ় নিরস্ত্র বানরের হাতে। রবীন্দ্রনাথ সেই প্রসঙ্গ উত্থাপন করে বললেন, “আমার নাটকে ঠিক এমনটি ঘটেনি কিন্তু এর মধ্যেও একটা সূচনা আবির্ভাব আছে। তা ছাড়া কলিযুগের রাক্ষসের সঙ্গে কলিযুগের বানরের যুদ্ধ ঘটবে, এমনও একটা সূচনা আছে।” কেবল যুদ্ধ নয়, রামায়ণের পরিণতির সঙ্গে ‘রক্তকরবী’র পরিণতিকেও একই বিন্দুতে এনে দাঁড় করিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। বলা যায়, তিনি ত্রেতাযুগের পটভূমিতে গড়ে ওঠা এক মহাকাব্যের বিনির্মাণ করেছেন কলিযুগের পটভূমিতে।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj