মুক্তিসংগ্রামে স্বাধীন বাংলা বেতার : কামাল লোহানী

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র অনন্য অবদান রেখেছে, এটা সর্বজনবিদিত এবং অনস্বীকার্য। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রকে আমি মনে করি মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় ফ্রন্ট। সম্মুখ সমরে অবশ্যই সশস্ত্র মুক্তিবাহিনীই প্রধান, তা সত্ত্বেও স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র অথবা বিপ্লবী বেতারের মতো প্রচার মাধ্যম না হলে মুক্তিযুদ্ধ সম্পন্ন হতো না। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন মুক্তিযুদ্ধ চলতে পারে না। কারণ প্রচলিত বেতার কেবল রং চড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধকে বিকৃত করে বিরুদ্ধ প্রচারই করে থাকে। সে কারণেই বোধহয় এই প্রচারকে ‘মনস্তাত্তি¡ক যুদ্ধ’ বলা হয়ে থাকে। সুতরাং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণাপাঠ, রণাঙ্গনের খবর, মুক্তিসেনাদের সফলতা, শত্রু বধের সংবাদ প্রচার, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, প্রেরণাদায়ক বক্তৃতা-বিবৃতি, সংবাদ প্রচারই ছিল তাদের প্রধান উদ্দেশ্য।

স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র অভিন্ন সত্তার মুক্তিযুদ্ধের কণ্ঠ ছিল। ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র প্রথমে চালু হয়েছিল রেডিও পাকিস্তান চট্টগ্রামের শিল্পী-কলাকুশলী ও সংস্কৃতিজনদের উদ্যোগে এবং এর নামকরণ করা হয়েছিল স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতারকেন্দ্র। এর সূচনা হয়েছিল ২৬ মার্চ, ১৯৭১। চট্টগ্রামে উদ্যোগী সংস্কৃতিজন ও বেতারকর্মীদের মধ্যে অনেকেই এলেন, চলে গেলেন। এদের মধ্যে বেলাল মোহাম্মদ ছিলেন বয়োজ্যেষ্ঠ এবং সংস্কৃতি ও বেতার সংশ্লিষ্ট। তিনিই নেতৃত্ব গ্রহণ করে আবুল কাশেম স›দ্বীপ, মোস্তফা আনোয়ার, আব্দুল্লাহ আল ফারুক, সৈয়দ আব্দুস শাকের, আমিনুর রহমান, রাশেদুল হোসেন, শরফুজ্জামান, রেজাউল করিম চৌধুরী এবং হাবিবুর রহমান মনিকে নিয়ে দলবদ্ধ হলেন। রেডিও পাকিস্তান, চট্টগ্রাম কেন্দ্রে সৃষ্টি হলেও তাদের নিরাপত্তার জন্য কালুরঘাট ট্রান্সমিটার ভবনে যাবার পরামর্শ দিলেন বেতার কর্মকর্তা আব্দুল কাহহার চৌধুরী। এরপর কালুরঘাটের প্রক্ষেপণ কেন্দ্রই হলো বিপ্লবী বেতারের মূল প্রচার স্থল।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ২৫ মার্চ মধ্যরাতে অপারেশন সার্চলাইট এবং পূর্ববাংলায় গণহত্যা শুরু হবার পর ১ কিলোওয়াট যন্ত্র ব্যবহার করে হলেও মুক্তিযুদ্ধ শুরুর কথা প্রচার করতে শুরু করে এই কেন্দ্রই। কিন্তু উদ্যোগী শব্দসৈনিকরা ভাবলেন এ অবস্থায় কোনো বাঙালি সেনা কর্মকর্তার একটি আহ্বান প্রচার করতে পারলে পাকিস্তান বাহিনীর বাঙালি সেনাসদস্যরা এই মুক্তিযুদ্ধে যোগদানে উৎসাহিত হবেন এবং এটা মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রয়োজনও। ফলে উদ্যোক্তারা অনুসন্ধান করতে লাগলেন একজনকে। চট্টগ্রাম ইপিআর প্রধান ক্যাপ্টেন রফিকুল ইসলাম পরামর্শ দিলেন মেজর জিয়াউর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য। এদিকে মেজর জিয়া পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্দেশ পালন করতে চট্টগ্রাম বন্দরে সোয়াত জাহাজ খালাস করতে গেলেন। তাঁর সিও ব্রিগেডিয়ার মজুমদারকে তুলে ঢাকা নিয়ে যাবার ও বাঙালি সেনাদের ‘নিরস্ত্র’ করার খবর শুনলেন চট্টগ্রাম বন্দরে, যেখানে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জন্য বিপুল অস্ত্রশস্ত্র বোঝাই জাহাজ ‘সোয়াত’ খালাস করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু মজুমদার আটক ও বাঙালিদের নিরস্ত্র করার খবরে সমূহ বিপদের আশঙ্কায় মেজর জিয়া বন্দর এলাকা ছেড়ে চট্টগ্রাম থেকে ভারত সীমান্তের দিকে রওনা হয়ে পটিয়া গিয়ে পৌঁছলে স্থানীয় জনগণ তাদের যাত্রাপথ রুখে দেন। বলেন, দেশের ভেতর যুদ্ধ লাগিয়ে আপনারা কোথায় যাচ্ছেন? এখানেই থাকুন। মেজর জিয়া সেখানেই এক স্কুলগৃহে থেকে গেলেন এবং গ্রামের জনগণ একটি স্কুলে থাকা-খাওয়ার সব ব্যবস্থাই করে দিলেন। ইতোমধ্যেই মোহাম্মদ হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে বেলাল মোহাম্মদ খোঁজ করে এসে হাজির হলেন সেখানে এবং মেজর জিয়াকে আদ্যোপান্ত বলে তাকে চট্টগ্রাম গিয়ে ‘বেতার ভাষণ’ দেওয়ার অনুরোধ জানালেন। মেজর জিয়া কিছুতেই রাজি হচ্ছিলেন না। বেলাল মোহাম্মদ এই জাতীয় দুর্যোগ সংকট মুহূর্তে তার এ করণীয় যে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য, তা বোঝানোর চেষ্টা করলেন। বহু যুক্তিতর্কের পর মেজর জিয়া সম্মত হলেন এবং চট্টগ্রাম রওনা হলেন। কিন্তু কালুরঘাট গিয়ে এক তাজ্জব ঘটনা ঘটিয়ে ফেললেন। তিনি যারা ‘বিদ্রোহী বেতার’ পরিচালনা করছিলেন তাদেরকেও আটক করে ফেললেন। পরে অবশ্য ভুল বুঝতে পেরে ওদের ছেড়ে দিয়ে বেতার পরিচালনায় সহযোগিতাও করেছিলেন। একটি ৪ ব্যান্ডের সিংগার ট্রান্জিসটার দিয়ে সংবাদ মনিটর করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে এরও পেছনের ইতিহাস আছে।

২৭ মার্চ ১৯৭১। মেজর জিয়াউর রহমান বেতারে পৌঁছে চিরাচরিত সামরিক কৌশল হিসেবে ভাবলেন এটা একটা সামরিক অভ্যুত্থান। তাই তিনি বাঙালি সেনাসদস্যদের মুক্তিযুদ্ধে সাড়াদানের আহ্বান না জানিয়ে নিজেকে ‘প্রভিশনাল গভর্নমেন্টের প্রধান’ ঘোষণা করে বিদ্রোহের বার্তা দেন। এটা শোনার পর বেতারকর্মী ও সচেতন জসগণ ক্ষুব্ধ হন। যেখানে দেশে গণহত্যা, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ শুরু করেছে পাকিস্তান বাহিনী, সর্বত্র হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে, সেখানে মেজর জিয়া কী করে ‘ক্যু প্রধান’ সেজে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন! জাতির সংকটময় সময়ে এ ধরনের ‘বালখিল্য’ আচরণে সবাই ক্ষুব্ধ হয়ে জিয়াকে বোঝালেন। এমনকি আইয়ুব খানের সাবেক শিল্পমন্ত্রী ও চট্টগ্রামের প্রখ্যাত শিল্পপতি এ কে খান তার জামাতা এম আর সিদ্দিকীকে ডেকে বললেন, বেতার কর্মীরাও বোঝালেন সবাই মিলে। তিনি বোধহয় বুঝলেন। ২৭ মার্চ ১৯৭১ মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করলেন, তাকে মহান নেতা হিসেবে উল্লেখ করে। এই ঘোষণা ত্বরিতগতিতে সমগ্র জাতিকেই শুধু নয়, গোটা বঙ্গবাসী মানুষমাত্র সবাইকে জীবন উৎসর্গ করতে অনুপ্রাণিত করতে পেরেছিল। এটা অস্বীকার করা যাবে না। কিন্তু ঘোষণাপাঠ নিয়ে যারা আজ বিতর্কের সৃষ্টি করেছে, তারা কেবল বাস্তবকে অস্বীকার এবং ইতিহাসকেই বিকৃত করতে অপপ্রয়াস পেয়েছে। মেজর জিয়া যে স্বাধীনতার ঘোষণাপাঠ করেছিলেন তাতে তিনি বলেছিলেন- তিনি বঙ্গবন্ধুর নামেই স্বাধীনতার ঘোষণাপাঠ করেছেন। কিন্তু আজ ক্ষমতার রাজনীতিতে মত্ত হওয়ায় মেজর জিয়াকে ‘স্বাধীনতা ঘোষক’ বানাতে সেই ঘোষণা পাঠকে আংশিক সংশোধন করে নতুন ভার্সন তৈরি করেছে ক্ষমতালোভীরা। এবং চেষ্টা করছে জিয়াকে বঙ্গবন্ধুর সমপর্যায়ে আনার। সেটি কি আদৌ সম্ভব? না। কারণ ওই তুলনায় আসতে হলে যে রাজনৈতিক পটভূমি প্রয়োজন, রাজনীতিহীন সামরিক বাহিনীর মেজরের তা ছিল না। অবাস্তব বিতর্ক জিইয়ে রেখে জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসকে কলঙ্কিত করছে সংশ্লিষ্টরা। সে কথা বুঝেও বুঝতে চাইছে না ক্ষমতালিপ্সার কারণে।

এখানে একটা কথা বলা প্রয়োজন, সেটা হলো ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতারকেন্দ্র’ ছিল যার নাম, সে কেন ‘স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র’ হয়ে গেল? তার নেপথ্য কাহিনী হলো, মেজর জিয়াউর রহমান ২৭ মার্চ যখন ঘোষণাপাঠ করতে যাবেন তার আগে কি কথায় বা ভাষায় স্বাধীনতার কথা বলবেন সে কথা ভাবতে যেমন সময় নিলেন তেমনি খসড়া তৈরির সময় একা একটি রুমে বসে কি লিখবেন চিন্তা করছেন আর লিখছেন কাগজে কিন্তু পরক্ষণেই ছিঁড়ে ফেলছেন। এমনি করে ঘরের মেঝেটা ছেঁড়া কাগজে নাকি একেবারে সাদা হয়ে গেল। অবশেষে একসময় তার লেখা শেষ করলেন কিন্তু রেকর্ড করতে যাবার আগেই বললেন, ‘বিপ্লবী’ শব্দটা বাদ দিতে হবে, না হলে আমি ঘোষণা পড়ব না। বেতার উদ্যোগীরা প্রথমে চিন্তায় পড়লেন, পরে বুঝতে পারলেন সামরিক বাহিনীর মানুষ ‘বিপ্লব’ শব্দটি সহ্য করতে পারবেন না। এটাই স্বাভাবিক। তখন তারা সিদ্ধান্ত নিলেন, ঠিক আছে ‘বিপ্লবী’ শব্দটা না হয় বাদই দেয়া যায়, কারণ দুটো, তাকে দিয়ে ঘোষণাটা দেওয়াতে হবে এবং দ্বিতীয় হলো ‘স্বাধীন বাংলা’ শব্দ তো আছেই তাহলে বিপ্লবী শব্দটা না থাকলেও চলতে পারে। সেই থেকে মেজর জিয়ার চাপের কারণে শব্দটি বাদ হয়ে গেল এবং আমরা ‘স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র’ বলতে এবং ব্যবহার করতে শুরু করলাম।

২৭ মার্চ ১৯৭১ মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতার ঘোষণাপাঠ করলেন এবং এই ডাকে জাতি সাহসী ও সঠিক দিকনির্দেশনা পেল। বাংলার মানুষ তখন বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের মর্মবাণী বুঝে এবং ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ এমন চূড়ান্ত ঘোষণার কথা শোনার পর যে প্রতিরোধ গড়ে উঠেছিল, সে ছিল অনন্য, আত্মোৎসর্গকারী। সব মানুষ যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’ স্লোগানে মাতৃমুক্তি পণে সমুদ্যত। লাখো কোটি মানুষের অবিনাশী ঐক্য দেশটাকে প্রতিরোধের সশস্ত্র দুর্গে পরিণত করেছিলাম আমরা জনগণ।

স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র যে ক’দিন কালুরঘাটে ছিল পাকিস্তানি বোমাবর্ষণের আগে পর্যন্ত, তখন থেকেই জনগণকে ঐক্যশক্তি প্রতিষ্ঠা, প্রতিরোধ সংগ্রামের আহ্বান শত্রুসেনাদের আক্রমনের মুখে সাধারণ মানুষকে কখন কি করতে হবে তারও নির্দেশ দেয়া হতো। এই নির্দেশনাবলির মধ্যে বিপজ্জনক ঘোষণা জারি করা হয়েছিল কিন্তু বুঝতে পেরে পরে তা প্রত্যাহার করা হয়েছিল। এভাবেই ওই বেতারকেন্দ্র থেকে নানা প্রোগ্রাম প্রচার করা হয়েছে জনগণকে এই ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ ও ঘৃণ্য আক্রমণের বিরুদ্ধে শক্তি সঞ্চয়ের জন্য। গানে কবিতায় বক্তৃতা বিবৃতিতে, স্লোগানে বজ্রকণ্ঠের বাণীতে উদ্দীপ্ত রাখা হয়েছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী দ্বারা অবরুদ্ধ জনগণকে এবং হানাদার বাহিনীকে রুখে দাঁড়াতে আহ্বান জানানো হয়েছিল। কিন্তু এ ধরনের পাকিস্তানি দখলদারদের বিরুদ্ধে নিয়মিত প্রোগ্রাম অব্যাহত থাকার কারণে পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠী ক্রমেই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠতে উঠতে একদিন সন্ধান পেল এবং কালুরঘাট ট্রান্সমিটারে বোমাবর্ষণ করল ৩০শে মার্চ। সহযোদ্ধা শব্দসৈনিক কবি মোস্তফা আনোয়ারের জবানিতে শুনেছি, ওই বোমাবর্ষণে ভবনটি ভেঙে গিয়েছিল বটে কিন্তু একটি কুকুর ছাড়া কেউই মরেনি। তাই বিদ্রোহী বেতার কর্মীদল যদিও নিরাপদে ছিলেন কিন্তু ভবনটি ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় প্রচারে বিঘ্ন ঘটে। বিকল্প ব্যবস্থা করার কোনো সুযোগ ছিল না। বোমা থেকে বাঁচলেও তারা যে কারণে বিপ্লবী বেতারকেন্দ্র চালু করেছিলেন তা স্তব্ধ হয়ে গেল। কিন্তু বেতার স¤প্রচার অব্যাহত রাখতেই হবে, না হলে জনমনে হতবিহŸল হয়ে পড়বেন এমন অবস্থার সৃষ্টি হতে দেয়া যাবে না। তাই নিজেরা সবাই নিরাপদ স্থানে থেকে পরদিন শব্দসৈনিক দল দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে সীমান্ত পাড়ি দিলেন। কিন্তু এক কিলোওয়াট যে মধ্যম তরঙ্গের প্রচারযন্ত্রটি ব্যবহার করছিলেন সেটি অক্ষত তাকায় ওই ট্রান্সমিটারটিকে বের করে নিয়ে আসেন এবং ভারত সীমান্ত দিয়ে ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলার সীমান্তবর্তী ‘বগাফা’র জঙ্গলে, বিএসএফের সহায়তায় স্থাপন করেন। এ ক্ষেত্রে ট্রান্সমিটার বহন করার জন্য ট্রাক ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন মেজর জিয়া।

চট্টগ্রামের বিপ্লবী বেতারকর্মীদের মধ্যে দু’ভাগ হয়ে গেল সীমান্ত পারের সময়। একদল বগাফার জঙ্গলে এক কিলোওয়াট মধ্যম তরঙ্গের ট্রান্সমিটারটি পুনঃস্থাপন করলেন, অন্য দলটি আগরতলা শহরে চলে গেলেন। তবে বসে রইলেন না কেউই।

বগাফার জঙ্গলে এক কিলোওয়াট ট্রান্সমিটারটি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে শব্দসৈনিকরা ৪ এপ্রিল থেকে স¤প্রচার শুরু করলেন। অন্যদলের সহযোগিতায় আগরতলায় স্বাধীন বাংলা বেতার চালু করেছিলেন। এখানে অবশ্য বেতারবহির্ভূত ব্যক্তিরাও অংশগ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু বগাফার জঙ্গলে এক কিলোওয়াট প্রক্ষেপণ যন্ত্রটি বসানো এবং অনুষ্ঠান প্রচার চালু করায় চট্টগ্রামের বেতার প্রকৌশল বিভাগের তরুণ কর্মীদের ‘কৃতিত্বই সর্বাধিক’। তারা বিশেষ করে রাশেদুল হোসেন সহযোদ্ধাদের সহায়তায় যে অসাধ্য সাধন করেছিলেন, যা সবাইকে বিস্ময়াভিভূত করে দিয়েছিল। কপিবুক ছাড়াই এই তরুণ দল জীবনযুদ্ধের চরম মুহূর্তে প্রয়োজনের তাগিদে যে কাজটি সম্পাদন করেছিলেন, তা সত্যিই ছিল ‘অসম্ভব’। সূ²াতিসূ² যন্ত্রাংশ, বিশেষ করে ট্রান্সমিটারের মতো জটিল-জটিলতর যন্ত্র পুনঃস্থাপন করে নতুন করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক অনুষ্ঠান-সংবাদ ইত্যাদি প্রচার যে কতটা অপরিহার্য ছিল, তা কেবল সংশ্লিষ্টরাই বুঝতে পারছিলেন। তাই জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে নেমে প্রখর বুদ্ধিমত্তায় সেদিন ওই তরুণ প্রকৌশলকর্মীরা অভিজ্ঞ প্রবীণ প্রকৌশলীদেরও তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। আর সেই জঙ্গলে বসেই অনুুষ্ঠানকর্মীরা শূকর জাতীয় পশু কিংবা সাপ, পোকামাকড়ের ভয় উপেক্ষা করে প্রচারসূচি অব্যাহত রেখেছিলেন। আজ ৪৫ বছর পরও তাদের দেশমাতৃকার প্রতি প্রবল আনুগত্যকে সেলাম। আর আমিনুর, রাশেদ, শরাফুজ্জামানদের বেঁচে থাকা সার্থক, কিন্তু দেশমাতৃকার বুকে বিষধর সাপের মতো আবার সেই পরাজিত শক্তি জামায়াত-শিবির তথা মৌলবাদী সা¤প্রদায়িক অপশক্তির আস্ফালন দেখে এত বছর পরও ওই শব্দসৈনিক বেতার যোদ্ধারা যেন নতুন বলে বলীয়ান হয়ে সবাইকে ডাক দেন এক হবার।

স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের এক কিলোওয়াট বগাফায় চালু করার পর অল ইন্ডিয়া রেডিও অর্থাৎ আকাশবাণীর প্রধান প্রকৌশলী এবং সেই সময়ের ভারতীয় তথ্য ও বেতার প্রতিমন্ত্রী শ্রীমতী নন্দিনী সৎপতি স্বাধীন বাংলার বেতার কর্মীদের দেখতে বগাফায় গিয়েছিলেন এবং ওই কীর্তি দেখে শ্রীমতি সৎপতি নাকি মন্তব্য করেছিলেন- ‘তোমরা অবশ্যই জয়ী হবে।’ তাৎক্ষণিক এই মন্তব্যে শব্দসৈনিকদের আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে গিয়েছিল।

পরে যখন মুক্তিযুদ্ধের পরিসমাপ্তির চরম মুহূর্ত পেরিয়ে আমরা গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সমাজতন্ত্রে মনোযোগ দিতে চলেছি, তখনই এলো পূর্ব চক্রান্তের চরম মুহূর্ত, বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করল মার্কিন মদদপুষ্ট খোন্দকার মোশতাক গং। যেখানে অন্তর্ভুক্ত ছিল মাহবুব আলম চাষী, তাহের উদ্দিন ঠাকুর, সেনাসদস্য কর্নেল ফারুক-রশীদ, মেজর ডালিম, শাহরিয়ার, ক্যাপ্টেন নূর, মহিউদ্দিন প্রমুখ। যে মহাপরিকল্পনা চলছিল মুক্তিযুদ্ধকালে, এ ছিল তারই ফসল। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী পরাশক্তি আমেরিকার সপ্তম নৌবহর পাঠিয়ে ভীতি প্রদর্শন করতে চেয়েছিল, কিন্তু সোভিয়েত হুমকিতে তা ব্যর্থ হওয়ায় পাকিস্তানের সঙ্গে ‘কনফেডারেশন’-এর আশায় ছিলেন অনেকেই। তাও যখন ব্যর্থ হয়ে গেল। মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জিত হলো চূড়ান্তভাবে। তখন পাকিস্তানিরা বুদ্ধিজীবী হত্যার মাধ্যমে জাতিকে পঙ্গু করতে চেয়েছিল। তারপরও যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ শিরদাঁড়া খাড়া করে দাঁড়ালে ‘মার্কিন চক্রান্ত’ অব্যাহতভাবে অন্তর্ঘাত ঘটিয়ে ১৫ই আগস্ট হত্যাকাণ্ড ঘটালো। কলঙ্কিত অধ্যায় রচিত হলো বাংলার গর্বিত ইতিহাসে। দেশমাতৃকার প্রতি গভীর আনুগত্যে চট্টগ্রামের শব্দসৈনিক বন্ধুরা যে আত্মপ্রত্যয়ী উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন, তা ছিল বিশ্বের মুক্তিকামী জনগণের বিপ্লবী মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ। এতকাল যারা পৃথিবীর দেশে দেশে মুক্তিসংগ্রামের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানাবার জন্য দেশের মাটিতে গণঐক্য গড়ে সাম্রাজ্যবাদী ইঙ্গ-মার্কিন-ফরাসি চক্রের বিরুদ্ধে সব লড়াইয়ে সংহতি প্রকাশ করেছেন। তা থেকেই শিক্ষা নিয়ে দেশবাসী জনগণ নিজেরাও ঔপনিবেশিক সা¤প্রদায়িক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করেছিল একাত্তরে, সেখানে বীর চট্টলার অকুতোভয় তরুণদের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত আমাদের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে বিস্তৃত করে জনগণের মনে প্রবল সাহস স্থাপন করে দিয়েছিল। বিপ্লবী নেতা-কর্মী-সহযোদ্ধারা কিন্তু কোনো পরামর্শ বা রাজনৈতিক উপদেশ সেদিন পাননি। তাই বিদ্রোহী চট্টগ্রামের বিপ্লবী নেতা যোদ্ধা যে দশজনকে অবশেষে একত্রে পাই, তাদের মানসিকতায় ছিল অসা¤প্রদায়িক চেতনাবোধ, মুক্তিসংগ্রামী জাতিসমূহের যুদ্ধের ইতিহাস এবং সর্বোপরি মাতৃভক্তি ও দেশপ্রেম; যা তাদের উজ্জীবিত করেছিল ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে। তারা বুঝতে পেরেছিলেন, সময়ের ঘণ্টা বেজে গেছে, এবার ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের লড়াই একসঙ্গে। তাই সেদিনের চট্টলা আবারও প্রমাণ করল- সূর্যসেন, প্রীতিলতা আর কাজেম মাস্টারের রক্তধোয়া যুব স¤প্রদায় আজও উদ্দীপ্ত, মাতৃমুক্তিপণে নিজেদের সিদ্ধান্তে ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতারকেন্দ্র’ সৃষ্টি করেছিলেন। নিজেরাই মেজর জিয়ার কারণে বিপ্লবী শব্দ বাদ দিয়েছিলেন বটে কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় ফ্রন্ট হিসেবে ওই বেতার সেদিন অভূতপূর্ব ভূমিকা পালন করেছিল মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার প্রথম পর্যায়ে। [মুক্তিযুদ্ধ শেষে বঙ্গবন্ধু চট্টলার ওই বীর বেতারকর্মী দশজনকে সম্মানিত করার ঘোষণা দিয়েছিলেন কিন্তু ঘৃণিত নৃশংস হত্যার শিকার হওয়ায় তিনি তা করতে পারেননি। ফলে ‘বঙ্গবন্ধু স্বর্ণপদক’ আজও ওই দশজনের ভাগ্যে জোটেনি। তবে জাতির পিতার নির্দেশ অনুযায়ী বেতারের ৭৫ বছর উপলক্ষে চট্টগ্রামের ১০ জনকে সম্মানিত করেছেন হাসিনা সরকার]

মুজিবনগর বেতার

এবারে আসি স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের মুজিবনগর অধ্যায়ে। এ পর্যায়ে এপ্রিল এবং মে মাস-বৈশাখ এবং জ্যৈষ্ঠ আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এবং স্বাধীন বাংলা সরকার গঠন ও বেতার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমেদ ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে নিয়ে ভারতে যান। সীমান্ত পার হতে তিনি ভারত সরকারের বগাফায় অনুমতি ও সম্মানসহ প্রবেশ করেছিলেন। এরপর ত্বরিত সব ঘটনা ঘটে গেছে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু করেছেন সচেতন, সাহসী দেশপ্রেমিক জনগণ। কালবিলম্ব করা যাবে না। তাই তাজউদ্দীন আহমেদ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করেন। পরে ১০ই এপ্রিল, ১৯৭১ মন্ত্রিসভা গঠন করেন। রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যেহেতু তিনি গ্রেফতার হয়েছেন পাকিস্তানিদের হাতে, সেহেতু উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত থাকবেন, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, মন্ত্রী হলেন- এম মনসুর আলী, খোন্দকার মোশতাক আহমদ, এ এইচ এম কামরুজ্জামান। চিফ হুইপ হলেন অধ্যাপক ইউসুফ আলী, প্রধান সেনাপতি (অব.) এমএজি ওসমানী। কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুর মহকুমার (বর্তমানে জেলা) বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে প্রবাসী মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হলো ১৭ এপ্রিল। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেছিলেন টাঙ্গাইলের এম এ মান্নান এমএনএ যিনি পরে বেতার ও তথ্য উপদেষ্টা হয়েছিলেন। ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম আনুষ্ঠানিক যে স্বাধীনতার ঘোষণা রচনা করেছিলেন, সেটা পাঠ করেছিলেন চিফ হুইফ অধ্যাপক ইউসুফ আলী। গার্ড অব অনার দিয়েছিলেন এসপি মাহবুব। দেশি-বিদেশি অগণিত সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে।

মুক্তিযুদ্ধের পরিচালক প্রবাসী মন্ত্রিসভার প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে প্রথম যখন দেখা করেন তখনই সব সহযোগিতা- আশ্রয়, অস্ত্র সাহায্য এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন স¤প্রচার কেন্দ্র চেয়েছিলেন। সেই চাহিদা পূরণে ভারতীয় সহযোগিতায় ৫০ কিলোওয়াট মিডিয়ামওয়েভ ট্রান্সমিটারের ব্যবস্থা হয়েছিল। সেই অনুযায়ী আগরতলায় অবস্থানরত ঢাকা বেতারের কর্মীদের কলকাতা যাবার নির্দেশ হলো। আশফাকুর রহমান খান, তাহের সুলতান, শহীদুল ইসলাম, টিএইচ শিকদারসহ ক’জন এসে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন প্রবাসী সরকারের তত্ত্বাবধানে বেতার স¤প্রচারের। বালীগঞ্জ সার্কুলার রোডের একটি দোতলা বাড়িতে প্রবাসী সরকারের মন্ত্রীরা থাকতেন, তারা বেতারকেন্দ্রের জন্য ওটা ছেড়ে দিয়ে চলে গেলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকার সিদ্ধান্ত নিল বিদ্রোহী কবি নজরুল ইসলামের জন্মদিন ১১ই জ্যৈষ্ঠ ২৫শে মে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত এবং চালু হবে। অনেকটা নিধিরাম সর্দারের মতনই আমাদের অবস্থা। ঢাল-তলোয়ার কিছুই নেই তবু স¤প্রচার শুরু করতে হবে। এতদিন যে নামে স¤প্রচার চলছিল সেই ‘স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র’ নামেই চালু হলো। আমরা সবাই যারা ইতোমধ্যেই পৌঁছে গেছি, তাদের নিয়েই যাত্রা শুরু।

মে’র প্রথম দিকেই কুমিল্লা থেকে ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্ত এলাকার ধর্মনগর থেকে আগরতলা হয়ে কলকাতা পৌঁছলাম। ক’দিন বাদে বাংলাদেশ মিশন খুঁজে পেলাম আমার ছোটবেলার সার্কাস এভিনিউয়ে। দাঁড়িয়ে আছি। পরিচিত কাউকে পাই কিনা ভাবছি। কারণ তখন আমার মাথায় চিন্তা, এতদিন যে গলা স্লোগানে রাজপথে অথবা জনসভায় ধারা বিবরণী পাঠে উচ্চকিত ছিল, তাকে বিদ্রোহী বেতারে মুক্তিসংগ্রামের কাজে লাগাতে হবে। কাকতালীয়ভাবে বাদশার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। আমিনুল হক বাদশা, দৈনিক আজাদ পত্রিকার রিপোর্টার ছিলেন এবং বঙ্গবন্ধুর খুব কাছের। বাদশা বললেন, লোহানী ভাই, দাঁড়ান আমি ভেতর থেকে আসছি। আমি বাইরে দাঁড়িয়ে মিশনের সামনে নজরুল জয়ন্তীর প্যান্ডেল তৈরির কাজ দেখছি আর বাল্যস্মৃতি রোমন্থন করছি।… একি! বাদশা কি অগস্ত্যাযাত্রা করল নাকি?… কিছুক্ষণ পরে এসে অবশ্য বাদশা বললেন, চলুন, আপনাকে এক জায়গায় নিয়ে যাই। আপনার পছন্দসই জায়গা। পার্ক সার্কাস মোড় থেকে একটা ট্যাক্সি নিলাম, চলল কংগ্রেস এক্সিবিশন রোড ছাড়িয়ে বালীগঞ্জের দিকে। অবশেষে গিয়ে পৌঁছলাম সেই বাড়িটায়। দোতলার একটা ঘরে ঢুকে একটা টার্কিস টাওয়েল হাতে দিয়ে বাদশা বললেন, এটাই আপনার গামছা, বিছানা সবকিছু। স্থান হলো আশফাক-শহীদের সঙ্গে। দেখলাম, বেতার স¤প্রচারের প্রস্তুতি চলছে। কবি নজরুল ইসলাম বিদ্রোহের কবি, তাই তার জন্মদিনটাই বেছে নিয়েছিলেন, তবে এর পেছনে হয়তো একটা আবেগও জড়িত ছিল। যাহোক, লেগে গেলাম। নতুন অভিজ্ঞতা, কী করব, কীভাবে করব জানি না। আমি যেহেতু সাংবাদিক, তাই আমাকে প্রস্তাবিত বেতারের সংবাদ বিভাগ দেখার দায়িত্ব নিতে হলো। আগেই বলেছি, ঢাল নেই, তলোয়ার নেই, তবু নিধিরাম সর্দারকে প্রয়োজন মেটাতে হবেই। ক’জন সাংবাদিক বন্ধু এলেন। শিল্পী, ঘোষক, কলাকুশলী অনেকেই এলেন। কিন্তু আমাদের তো মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বেতার অনুষ্ঠান এবং সংবাদ প্রচার করতে হবে।

ভারত সরকারের কাছ থেকে একটা রেকর্ডিং মেশিন পেলাম বটে কিন্তু চালাবে কে?

কারও তো সেই অভিজ্ঞতা নেই। তাছাড়া আমরা স্বাধীন বাংলা বেতারে কোনো বিদেশি লোকবল নিতে চাই না। যা পারি আমরাই করব। আমাদের মধ্যে তাহের সুলতান যদিও প্রোগ্রাম বিভাগের প্রযোজক ছিলেন ঢাকা বেতারে, তা সত্ত্বেও তিনি বেশ খানিকটা অভিজ্ঞ ছিলেন রেকর্ড করায়। তিনিই দেখিয়ে দিলেন আশফাক, টিএইচ শিকদারদের। এটুকু অভিজ্ঞতা সম্বল করেই স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র চালু করা হলো। যন্ত্র না হয় চালাতেই শিখলেন কিন্তু সঙ্গে আনা রেকর্ডেড গান ছাড়া নতুন করে রেকর্ডিং করার কোনো সরঞ্জাম- হারমোনিয়াম একটা ছিল কিন্তু তবলা, বাঁশি-বেহালা, সেতার এমন কোনো অনুষঙ্গ যন্ত্রও ছিল না- এটাই স্বাভাবিক। কারণ দেশত্যাগের সময় সবাই তো প্রাণ নিয়ে ছুটেছেন, বাদ্যযন্ত্র তো নিয়ে আসার কোনো অবস্থা ছিল না। তবু ২৫শে মে অনুষ্ঠান চালু করতে হবে।

তবলা না থাকলেও টেবিলে ‘টোকা’ দিয়ে দু-চারদিন চালিয়ে দেয়া হলো। আর সংবাদ বিভাগ তো আরো ন্যাড়া। সংবাদ বুলেটিন তৈরির কেউ নেই, আছেন দুজন বাংলা সংবাদ পাঠক। ইংরেজির কেউ তখনো আসেননি। কী আর করব। আমাদের কাজের জন্য বসার কোনো চেয়ার ছিল না। ছিল না কোনো টেবিল। লেখার জন্য ছিল না প্যাড, পেন্সিল। তবু চালু করতে হবে সংবাদ বিভাগ, তাও বাংলা এবং ইংরেজি ভাষায়। আমি পড়লাম বিপদে। এ সময় শ্রদ্ধেয় পটুয়া কামরুল হাসান পরামর্শ দিলেন, টেবিল ছাড়ো, শান্তিনিকেতনি কায়দায় মেঝেয় বসে পড়ো। উঁচু কিছু একটা নিয়ে ওর ওপরই লিখতে শুরু করো। তার পরামর্শই কাজে লাগল। কিন্তু বিপদ হলো ইংরেজি বুলেটিন নিয়ে। কারণ আমি তো কোনোদিন ইংলিশ জার্নালিজম করিনি। তো কী করে লিখব ইংরেজি বুলেটিন। সংকটে পড়লে মানুষ নিজেই উত্তরণের পথ খুঁজে বের করে নেয়। আমিও তাই করলাম। সাহসে ভর করলাম। নিজেই লিখে ফেললাম বুলেটিন, পাঁট মিনিটের। কিন্তু পড়বে কে? রিডারও তো কেউ আসেননি। অগত্যা আমিই রিডার হয়ে গেলাম। এরপর চট্টগ্রামের বিদ্রোহী শব্দসৈনিক আব্দুল্লাহ আল ফারুকসহ অন্য সহযোদ্ধারাও এসে পৌঁছলেন। কালুরঘাটে থাকতে আবুল কাশেম স›দ্বীপ ও ফারুক এরা দুজনায় বাংলা ও ইংরেজি বুলেটিন লেখা ও পড়া দুটোই করেছেন। স›দ্বীপকে বাংলা পড়তে দেয়া হলো না তার আঞ্চলিক উচ্চারণের কারণে। কিন্তু আমার মনে আছে, প্রথমদিকে কালুরঘাট থাকতে যে বাংলা সংবাদ শুনতাম স›দ্বীপই পড়তেন এবং সত্যি কথা বলতে কী স›দ্বীপের সেই সংবাদপাঠ সবাইকেই অনুপ্রাণিত করত। ও চিটাগোনিয়ান অ্যাকসেন্টে বাংলা পড়ত সেটাই অসাধারণ লাগত, পরিস্থিতি আমাদের অভ্যস্ত করে ফেলেছিল। যাক, একে একে সবাই এলেন, সংকট কাটল আমিও বাঁচলাম। ছদ্মনামে সালেহ আহমদ ছিলেন সৈয়দ হাসান ইমাম প্রথম বুলেটিন তিনি পাঠ করেছিলেন।

সে কী দুরবস্থা। স্টুডিও যাকে বানিয়েছি সেখাসে কোনো এসি নেই, এমনকি সাউন্ড প্রæফের কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই রেকর্ডিং করার সময় ফ্যান পর্যন্ত খোলা যেত না, দরজা জানালা বন্ধ রাখতে হতো। এভাবে সংবাদ রেকর্ড করতেন হাসান অর্থাৎ সালেহ আহমদ। কিছুক্ষণ পড়ার পর যখন ঘর্মাক্ত কলেবর তখন দরজা খুলে ফ্যানের তলায় গা জুড়িয়ে ঘাম মুছে একটু বিশ্রাম সেরে আবার রেকর্ড করতো হতো। রেকর্ড করা গণসঙ্গীত, দেশাত্মবোধক, রবীন্দ্র-নজরুলসঙ্গীত কিংবা সুকান্তের গান, সেসব পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনে ব্যবহার হতো, সেগুলো তো ছিলই। আবার গান আমাদের মধ্যে যারা লিখতেন তারা তো ছিলেনই কিন্তু যারা লেখেননি কোনোদিন তারাও প্রয়োজন মেটানোর জন্য গীতিকবি হবার চেষ্টা করলেন। সে গানগুলোও সুর করা হয়েছিল। তবে শহীদুল ইসলাম ছিলেন গীতিকার ও বেতার ঘোষক-সাংবাদিকও ছিলেন। তিনি লিখেছেন। লিখেছেন টিএইচ শিকদার। বেতারের প্রযোজক। সবচেয়ে তাজ্জব ব্যাপার হলো, যারা কোনোদিন গান লেখেননি, তারাও লিখেছেন। সুর করে গাওয়াও হয়েছে। প্রয়োজনে মানুষ কিই না করতে পারেন! বারবার যেন সেই প্রমাণই পাচ্ছিলাম। কিন্তু সব ছাড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গের এক গীতিকার গোবিন্দ হালদার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর অনেকগুলো গান লিখে তার ও আমার প্রিয় বন্ধু কামাল আহমদের মাধ্যমে দুটো ২নং এক্সারসাইজ বুক অর্থাৎ খাতা ভর্তি করে আমাকে দিলেন। ভদ্রলোকের পূর্বপুরুষও এ দেশের নন। কিন্তু বাঙালিদের মুক্তিসংগ্রামে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি এই গানগুলো লিখেছিলেন। গানের যখন ঘাটতি, তখন এগুলো পেয়ে যেন ‘ধড়ে জল’ এলো। দিলাম খ্যাতিমান সুরস্রষ্টা সমর দাসের কাছে। হপ্তাদুয়েক কেটে গেল, কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে আপেল মাহমুদকে বললাম, ‘কী হে গান পাচ্ছিলে না, এনে দিলাম কিছুই করছ না।’ আপেল অনুযোগ করে বলল, ‘আমাকে তো দেননি।’ ‘তুমি সুর করবে’- জিজ্ঞেস করে সমর দার কাছ থেকে একটা খাতা এনে দিলাম। আপেল কিন্তু একটা গানের সুর করে ফেলল। জিজ্ঞাসা করলাম ‘কোন গানটা সুর করলে?’ বলল, ‘সন্ধ্যের অধিবেশনে যাবে, তখনই শুনবেন।’ অপেক্ষায় রইলাম। প্রতিদিনের মতো এমএনএ ইনচার্জ মান্নান ভাইয়ের সঙ্গে দুই এমএনএ জিল্লুর রহমান এবং দৈনিক আজাদী সম্পাদক ও এমএনএ অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ এলেন। বসলেন দোতলার বারান্দায়। আমরাও যোগ দিতাম সে আড্ডায়। সেদিনও দিলাম। স্বাধীন বাংলা বেতারের সান্ধ্য অধিবেশন শুরু হলে এক সময় নতুন একটি গান বেজে উঠল ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’।… গানটি শোনার পরপরই আমরা সবাই আবেগাপ্লুত হয়ে উল্লাস প্রকাশ করলাম এবং আপেলকে অভিনন্দন জানালাম সবাই। আমি তো ওকে জড়িয়ে ধরলাম। কামাল ভাই ও গোবিন্দ হালদার দারুণ খুশি হলেন। অধিবেশন শেষ হবার পর একটা ফোন এলো। এক ভদ্রমহিলা করেছেন, আমাদের পরিচিত। তিনি নিজেও এক খ্যাতিমান গায়কের স্ত্রী। তিনি বলেই বসলেন, তোমরা কি এখানে প্রেম করতে এসেছ, না যুদ্ধ করতে?

আমি একটু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। তবু বললাম, গানটি তোমাদের বন্ধু গোবিন্দর লেখা। তাছাড়া একটি ফুল তো প্রতীক মুক্তিসংগ্রামী জনগোষ্ঠীর। কিছুতেই মানতে রাজি নন তিনি। আজও মেনে নেননি। অথচ এই গানটি বিবিসি পরিচালিত শতাব্দীর সেরা বাংলা গানের দশটির মধ্যে একটি মনোনীত হয়েছিল।… যা হোক আপেল একটি গান করে ফেলায় সমরদাও আরেকটি গানে সুর দিলেন। ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে রক্ত লাল রক্ত লাল’। অসাধারণ সুর এবং পরিবেশনা। কোরাসে অজিত রায়, রথীন রায়সহ অন্য শিল্পীরা। সমরদা নিজেই লিড করলেন গানটি। সংগ্রামরত মানুষকে সে গান উদ্দীপ্ত করল প্রবলভাবে। গোবিন্দর আরও ৪-৫টি গান সুর করা হয়েছিল, তবে এই দুটির জনপ্রিয়তার সঙ্গে টক্কর দিল বিজয় অর্জিত হবার পর আপেল, গোবিন্দর বাড়িতে বসে লিখিয়ে এনেছিল ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা আমরা তোমাদের ভুলব না’ গানটি। এই গানগুলো রেডিও, টিভিতে, মঞ্চ, জনসভায়, কত না অনুষ্ঠানে গাওয়া হয়েছে তার হিসাব নেই। তবে গীতিকারের নাম কেউ উচ্চারণ করেন কিনা, বলা মুশকিল। বেতার থেকেও তিনি গানের সম্মানী কখনোই পাননি। স্বৈরাচারী হলেও এরশাদ কিন্তু দু-তিন বছর টেলিভিশন থেকে গোবিন্দ হালদারকে কিছু টাকা দেবার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। পরে অবশ্য ১৪ দলীয় সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আবেদন জানালে তিনি ১৫ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। তাছাড়া হাসিনা সরকার বিদেশিদের মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য যে সম্মান জানিয়েছেন, সেখানে গোবিন্দ হালদার অসুস্থতার কারণে আসতে পারেননি কিন্তু তার কন্যা ও জামাতা এসে ক্রেস্ট, স্বর্ণপদক, নগদ অর্থ নিয়ে গেছে। গোবিন্দ হালদার এই তো ক’মাস হলো পরলোকগমন করেছেন কিন্তু বাংলাদেশ সরকার তাকে কতটা সম্মান জানিয়েছেন তা তিনি জেনে বা দেখে যাননি।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, গোবিন্দর অসুস্থতার কথা জেনে নিউইয়র্ক প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাকে চার হাজার ডলার এবং বাংলাদেশ থেকে স্বাধীন বাংলার বেতারকেন্দ্র কিছু অর্থ সাহায্য পাঠান। এছাড়া একটি প্রতিষ্ঠান ডিনারের বিনিময়ে কিছু টাকা তুলেছিল এবং তাঁকে দিয়েছিলও। মৃত্যুর আগে যখন তিনি চিকিৎসারত ছিলেন হাসপাতালে, তার সব খরচ বাংলাদেশ সরকার বহন করার দায়িত্ব নিয়েছিল। হাসপাতালে তার মৃত্যু থেকে শ্মশান পর্যন্ত বাংলাদেশ উপকমিশনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা পরিবারের সঙ্গে ছিলেন। সবচেয়ে সম্মানের, শ্রদ্ধার বিষয় হলো আমাদের রাষ্ট্রপতি আবুল হামিদও তাঁকে কলকাতার হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলেন।

গোবিন্দ হালদার ছাড়া প্রখ্যাত গীতিকবি গৌরি প্রসন্ন মজুমদারের লেখা- ‘শোনো একটি মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি, আকাশে বাতাসে উঠে ধ্বনি’ গানটি পশ্চিমবঙ্গের লোকগায়ক অংশুমান রায়ের সুরে ও কণ্ঠে গাওয়া হয়েছিল। ১৭ই এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় প্রবাসী মন্ত্রিসভার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের বিবরণ আকাশবাণী সেই রাতে ‘সংবাদ সমীক্ষা’য় উপস্থাপন করেছিল উপেন তরফদারের পরিচালনায়। শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানটি প্রচারিত হয়েছিল আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকে। এ গানটি সেখানেই প্রথম পরিবেশিত হয়। সেদিন অবরুদ্ধ বাংলাদেশের অগণিত মানুষ এই গানটি ও অনুষ্ঠানটি শুনেছিলেন। কত যে মানুষ জিম্মি হয়ে পাকিস্তানিদের কবলে থেকেও কী যে উল্লাস প্রকাশ করেছিলেন, তার বর্ণনা এখন আর দেওয়া যাবে না।

কাজী সব্যসাচীর আবৃত্তি ‘বিদ্রোহী’ ও ‘একই বৃন্তে দুটি ফুল’ কবিতা রেকর্ডে পরিবেশিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলা বেতারে। এছাড়া অন্য কোনো সহাযোগিতা কখনোই স্বাধীন বাংলা বেতার বাইরের কারও কাছ থেকে নেয়নি।

কিন্তু প্রতিদিন সন্ধ্যেবেলায় আকাশবাণী কলকাতা থেকে প্রচারিত হতো ‘সংবাদ পরিক্রমা’। এটি লিখতেন প্রণনেশ সেন। ভাষার কী লালিত্য, আর আবেগ তাতে।

সেই যে লেখা দেব দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভূতপূর্ব স্বতন্ত্র স্বরে উচ্চারিত হয়ে যখন ছড়িয়ে পড়ত আকাশবাণীর বেতার তরঙ্গে সে স্বরধ্বনি ও বাক্যনির্মাণ ইথারে যেন উত্তাল জলোচ্ছ¡াসের সৃষ্টি করত। মানুষকে সাধারণভাবে উদ্দীপ্ত তো করতই, রণাঙ্গনে মুক্তিসেনা দলকে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সৈনিকে পরিণত করত আর অবরুদ্ধ বাংলাদেশের শঙ্কিত ভয়ার্ত লাখো কোটি মানুষের জীবনে আনত দোলা, ওরা মনেপ্রাণে গেয়ে উঠতেন ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর বাংলাদেশ স্বাধীন কর।’

কী মোক্ষম অস্ত্রের মতোন শত্রুবোধের উৎসবে এ পঙ্ক্তিমালা বন্দি মানুষগুলোকে নতুন জীবনের প্রত্যাশায় সবল প্রাণের আশ্বাসে অনুপ্রাণিত করেছে। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের অনুষ্ঠানমালা আর দেব দুলালের কণ্ঠ মানুষের বেঁচে থাকা এবং লড়াইয়ের অপার শক্তির আধার ছিল। আর সে কারণেই বোধহয় হামিদুল হক চৌধুরীর সরকারপন্থী সংবাদপত্র টাইকুন (অবজার্ভার গ্রুপের স্বত্বাধিকারী) মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছিলেন, ঞযরং রং ধিৎ নবঃবিবহ এবহ. ঘরধুর ধহফ এবহ. উবনফঁষধষ. হামিদুল হকের এই উক্তিতে মুক্তিফৌজকে খাটো না ভেবে যদি গ্রহণ করি, তাহলে বোঝা যাবে দেব দুলালের কণ্ঠে প্রণনেশ সেনের বাক্য ও শব্দগুলো কী প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছিল সরকারপক্ষীয়দের মনে! প্রণনেশ সেন, দেব দুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, গৌরি প্রসন্ন মজুমদার, অংশুমান রায়, কাজী সব্যসাচী- ‘এরা কেউই এখন বেঁচে নেই। ওদের প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।’

মুক্তিযুদ্ধের দ্বিতীয় ফ্রন্ট : সেক্টর নয় কেন

স্বাধীন বাংলার বেতারকেন্দ্রের ইতিহাস অনেক ঘটনাবহুল এবং বিস্তৃত। তবু ন’মাসের মুক্তিযুদ্ধে এই যন্ত্র দিয়ে যে ‘মনস্তাত্তি¡ক যুদ্ধ’ সাধিত হয়েছে, তা সত্যিই গৌরবোজ্জ্বল এবং অপরিহার্য। যত বিস্তৃতই হোক না কেন, উল্লেখযোগ্য ও প্রয়োজনীয় প্রসঙ্গ ও তথ্যাদি জানা উচিত সবারই।

এই প্রথম প্রবাসী সরকারের পরিচালনাধীনে ২৫শে মে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিন উদ্বোধন হলো স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের ৫০ কিলোওয়াট মিডিয়াম ওয়েভ ট্রান্সমিশন। সরকারের পক্ষ থেকে দায়িত্বে রইলেন আব্দুল মান্নান এমএনএ। প্রবাসী সরকারের মন্ত্রিসভা সিদ্ধান্ত নিয়ে দায়িত্ব দেয়া হলো, বেলাল মোহাম্মদ ও আশফাকুর রহমান খানকে অনুষ্ঠানের, সৈয়দ হাসান ইমাম নাটকের, এবং কামাল লোহানীকে বার্তা বিভাগের প্রধান হিসেবে। পরে ইংরেজি ভাষার সংবাদ ছাড়াও অনুষ্ঠান প্রচারের দায়িত্ব পেলেন আলমগীর কবির।

‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ গানটিই হলো স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের সূচনা সঙ্গীত। চট্টগ্রাম থেকেই এটাই সূচনা সঙ্গীত হিসেবে চলে আসছিল। এমন চমৎকার বর্ণনামূলক রচনাটি গাজী মাজহারুল আনোয়ারের। সুর করেছিলেন চলচ্চিত্রের সুরকার আনোয়ার পারভেজ। উদ্বোধনী অধিবেশনে শুরু হলো কোরআন তেলাওয়াত দিয়ে এবং তেলাওয়াত করেছিলেন দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার প্রবীণ সাংবাদিক মুক্তিযোদ্ধা, সাপ্তাহিক ‘জয় বাংলা’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক জনাব মোহাম্মদ উল্লাহ চৌধুরী। ইসলামের দৃষ্টিতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে বলেছিলেন সৈয়দ আলী আহসান। বাংলা সংবাদ পাঠ করেছিলেন সৈয়দ হাসান ইমাম সালেহ আহমদ ছদ্মনামে। ইংরেজি সংবাদ পড়েছিলাম আমি আবু নঈম নামে। সংবাদপাঠক হিসেবে নূরুল ইসলাম সরকার, বাবুল আখতার, আলী রেজা চৌধুরী ছিলেন। ইংরেজি সংবাদ আব্দুল্লাহ আল ফারুক পরে আলমগীর কবীর, আলী যাকের, নাসরিন আহমদ (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি) জেরিন আহমদ নামে, পারভীন হোসেন, আরও একজন (যার নাম বিস্মৃত হয়েছি)। একেকটি অধিবেশন গান, জীবন্তিকা, কথিকা এ ধরনের অনুষ্ঠান দিয়ে সাজানো হয়েছিল। ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি আবৃত্তি করেছিলাম আমি। রেকর্ডেড গণসঙ্গীত প্রচার করা হয়েছিল। তারপর আস্তে আস্তে অনেক শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, বাদ্যযন্ত্রী, সাংবাদিক, সংবাদ পাঠক ও পাঠিকা এলেন। বালীগঞ্জ সার্কুলার রোডের বাড়িটি জমজমাট হয়ে উঠল।

এর মধ্যে মোহাম্মদ বেলাল, মোস্তফা আনোয়ার, সৈয়দ আব্দুস শাকের, আব্দুল্লাহ আল ফারুক, আবুল কাশেম স›দ্বীপ, আমিনুর রহমান, রাশেদুর হোসেন, শরফুজ্জামান, রেজাউল করিম চৌধুরী ও হাবিবুর রহমান মনি এসে হাজির হলেন। এরা সবাই চট্টগ্রাম বেতারের বিপ্লবী কর্মী ও স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা। সাংবাদিকদের মধ্যে ফয়েজ আহমদ, তোয়াব খান, এমআর আখতার, আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী, জালাল উদ্দিন আহমদ, মৃণাল কৃষ্ণ রায়, ম. মামুন প্রমুখ এলেন। কিছুদিন বাদে ইংরেজি প্রোগ্রাম চালু হলো। কিন্তু যখন প্রয়োজন বোধ করা হলো, তখন উর্দুতেও সার্ভিস চালু করা হলো জাহিদ সিদ্দিকীকে প্রধান করে। পারভীন হোসেন ইংরেজি নিউজ পড়লেও উর্দুতেও সহযোগিতা করেছেন। উর্দু জীবন্তিকাতেও অংশ নিতেন। উর্দু সার্ভিস চালু করার পেছনে যুক্তি ছিল, মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মনোবল অনেকটাই ভেঙে গেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মুক্তিবাহিনী ও গেরিলাদের আক্রমণে। সুতরাং এই সময় ওদেরকে উর্দু ভাষায় বোঝাতে হবে যে, কেন তারা এবং কাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে অকারণে প্রাণ হারাচ্ছে। আরেকটা কারণ ছিল ভারতের অবাঙালি বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের উর্দুভাষী জনগণ ভাবতেন, আমরা পাকিস্তান ভেঙে দিতেই এই যুদ্ধ শুরু করেছি। তারা জানে না যে পাকিস্তানিরা আমাদের ওপর কি ধরনের জুলুম করেছে এবং কত সম্পদ অপহরণ করে পশ্চিমে নিয়ে গেছে। এই যুক্তিতে উর্দু সার্ভিস দারুণ প্রয়োজন ছিল। এবং ময়মনসিংহের জাহিদ সিদ্দিকীকে পেয়েও গেলাম, তিনি ছিলেন পাকিস্তানের বাবায়ে উর্দু আব্দুল হকের সহকর্মী কিন্তু বাঙালি। তার উদ্যোগেই উর্দু ভাষার কর্মসূচি রীতিমতো শুরু করা সম্ভব হলো। ফলে বেতার কর্মসূচি বাংলা, ইংরেজি ও উর্দু ভাষায় নিয়মিত প্রচার হতে শুরু হয়ে গেল। সাধারণ মানুষ কী আগ্রহ নিয়ে এই অনুষ্ঠানমালা শুনতেন, তা আমরা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে লোকমুখে জানতে পেরেছি এবং পরে অবরুদ্ধ বাংলাদেশে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তার কথা জেনেছিলাম। অবরুদ্ধ বাংলায় সব মানুষই গোপনে দরজা-জানালা বন্ধ করে কাঁথা কিংবা লেপের তলায় ট্রানজিসটার নিয়ে শব্দ কমিয়ে দিয়ে নিয়মিতভাবে শুনতেন। অনুষ্ঠান প্রথমে দুটি অধিবেশনে সকাল ও সন্ধ্যায় প্রচারিত হতো কিন্তু প্রয়োজনের তাগিদে তিনটি অধিবেশন চালু করা হয়েছিল- সকাল, দুপুর ও সন্ধ্যায় প্রচারিত হতো। প্রতি অধিবেশনেই সূচনা সঙ্গীত জয়বাংলা, কোরআন পাঠ, বজ্রকণ্ঠ, দেশাত্মবোধক গান, গণসঙ্গীত, কথিকা, জীবন্তিকা, নাটক ইত্যাদি প্রচার হতো। সংবাদ তো তিন অধিবেশনেই তিন ভাষায় প্রস্তুত করা হতো। তিনটি অধিবেশনের অনুষ্ঠানমালা স্পুল টেপে রেকর্ড করে একটি পোর্টফোলিও ব্যাগে পুরে তা বিএসএফের একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত অফিসারের হাতে দিয়ে দেয়া হতো। তিনি একটি জিপে ওই টেপ নিয়ে চলে যেতেন ট্রান্সমিটার ভবনে। ভবনটি কোথায় ছিল, তা আমাদের জানা ছিল না। তবে শুনেছিলাম, মোটামুটি ৪০-৫০ মাইল স্পিডে গাড়ি ছাড়লে ট্রান্সমিশন হাউসে পৌঁছতে ৪০-৪৫ মিনিট লাগত। এটি ছিল ভারত সীমান্তের কাছাকাছি। নিরাপত্তার কারণে আমাদেরও কোনোদিন জানানো হয়নি, এটি কোথায় ছিল। এমনকি আমাদের মুক্তিবাহিনী প্রধান কর্নেল এমএজি ওসমানীও জানতেন না। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, যেদিন পাকিস্তান ভারত আক্রমণ করেছিল, সেদিন আগাম খবর জানতে পেরে সেনাধ্যক্ষ কর্নেল ওসমানী আমাকে তার থিয়েটার রোডের অফিসে ডেকে পাঠিয়ে বললেন, খবরটা স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে ‘ব্রেক’ করতে হবে। অর্থাৎ প্রথম আমাদেরকেই ওই নিউজ প্রচার করতে হবে। তখন সন্ধ্যে গড়িয়ে গেছে। টেপ তৈরি করে তৃতীয় অধিবেশনের জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয়ে গেছে। অধিবেশন শুরুও হয়ে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যে শেষও হয়ে যাবে। কিন্তু ওসমানী সাহেবের ধারণা কাছে ধারে কোথাও থেকে নিশ্চয়ই স¤প্রচার করা হয়, তাই তিনি আমাকে নির্দেশ দিলেন, আপনাদেরই এ নিউজ ব্রেক করতে হবে। আমি বললাম, এ নিউজ ইতোমধ্যেই বিদেশি বেতারে প্রচার হয়ে গেছে। তাছাড়া আমাদের অধিবেশনও শেষ হয়ে আসছে। কি করে প্রচার করব? তিনি কিছুতেই আমার কথা শুনতে চাইলেন না। তার বক্তব্য, স্বাধীন বাংলা বেতারকেই এটা প্রচার করতে হবে। অবশেষে তিনি বললেন, আকাশবাণী তো বেশি দূরেও নয়, কেন পারবেন না?… পরিস্থিতি নাজুক হয়ে গেল এবং উপপ্রধান সেনাপতি এ কে খোন্দকার এসে আমাকে এ বিপন্ন অবস্থা থেকে রক্ষা করলেন। তিনি বললেন, আদৌ সম্ভব কি এই সংবাদটা প্রচার করা? আমি বললাম, সম্ভব হবে না। অধিবেশন প্রায় শেষ। আর ট্রান্সমিশন ভবনটিও বহুদূরে আকাশবাণী কলকাতা নয়, সেখানে তাৎক্ষণিক পৌঁছানোও সম্ভব নয়। খোন্দকার সাহেব বললেন, চেষ্টা করে দেখুন না, পারেন কিনা, চিফ যখন বলছেন?

এরপর থিয়েটার রোড থেকে বালীগঞ্জ সার্কুলার রোডে গিয়ে সম্ভবত আশফাকুর রহমান খানকে নিয়ে বিএসএফের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি মি. কাউলের বাড়ি খুঁজে বের করলাম। এ ছিল আমাদের, মুক্তিবাহিনীর প্রধানের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন। তার নির্দেশ পালন করে, হবে না জেনেও চেষ্টা করে বিবেককে সান্ত¡না দিলাম। কিন্তু কাউল বন্ধুত্বের সুযোগ নিয়ে একটু গালমন্দও করতে ছাড়ল না, বললেন, ‘তোমাদের কি ধারণা নেই, এখন কোনো কিছুই পাঠানো সম্ভব নয়।’… নিউজ নিয়ে আরেকবার বিপদে পড়েছিলাম। পশ্চিমবঙ্গে তখন সিপিএমের অপ্রতিদ্ব›দ্বী জনপ্রিয়তা। কংগ্রেসবিরোধী গণআন্দোলনের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। মানুষ অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে ক্ষমতার পরিবর্তন চান। সময়টা ঠিক খেয়াল নেই তবে সিপিএম লাগাতার তিনদিন ‘বনধ্’-এর ডাক দিল। সিপিএম বনধ্ ডাকা মানে হলো গাড়ি-ঘোড়া তো চলবেই না, এমনকি পাখিরাও উড়বে না, এমন নিñিদ্র জনপ্রিয়তা। নিরবচ্ছিন্ন ৭২ ঘণ্টা হরতাল হলে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের প্রতিদিনের অনুষ্ঠান ও সংবাদ স¤প্রচারের কী করে হবে? গাড়ি তো বেরোবে না। তাহলে আমরা বেতারকর্মীরা কী করব? ভেবে পাচ্ছিলাম না। এই তিনদিন কীভাবে ট্রান্সমিটারে রেকর্ডেড অনুষ্ঠানমালা ও সংবাদ বুলেটিন পাঠানো যাবে! যদি না পাঠাতে পারি তাহলে রণাঙ্গনে মুক্তিসেনা এবং অবরুদ্ধ বাংলাদেশে সাধারণ মানুষ ভাববেন স্বাধীন বাংলা বেতার হয়তো বন্ধ হয়ে গেছে! তবে কি পাকিস্তানিরা মুক্তিযুদ্ধকে নস্যাৎ করে দিল? আমরা কি তবে পাকিস্তানি নিপীড়ক সেনা ও শাসকগোষ্ঠীর কাছে হেরে গেলাম। পরাধীনতার শৃঙ্খল তবে কি ছিঁড়তে পারলাম না? এসব দুশ্চিন্তা মনটাকে দুর্বল করে ফেলছিল।… কিন্তু না, এমন অবস্থা মেনে নেওয়া তো দূরের কথা ভাবারও কোনো উপায় আমাদের নেই। আমরা চূড়ান্ত লড়াইয়ে নেমেছি। সুতরাং যেভাবেই হোক মুক্তিযুদ্ধ যখন অব্যাহত রয়েছে, তখন স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র যে কোনোভাবে হোক চালু রাখতেই হবে। উপায় কোনো না কোনো একটা বের করতে হবে। এই তিনদিন তো অনেক অনুষ্ঠান চালাতে হবে। অবশ্য অনুষ্ঠানমালা তো আগেই যেগুলো রেকর্ড করা আছে, সেগুলো আবার চালিয়ে দেওয়া যাবে কিন্তু নিউজ তো দৈনন্দিন ব্যাপার, এ কী করে চালু রাখার ব্যবস্থা করা যাবে? সবাই চিন্তিত কারণ ভারতীয় নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ স্বাধীন বাংলা বেতারের গোপনীয়তা রক্ষা করার জন্য কাউকেই অনুমতি দিচ্ছিল না ওই ট্রান্সমিটার ভবনে যাওয়ার। আমরা জানতামও না কোথায় এই ট্রান্সমিটার। আমরা জানার চেষ্টাও কোনোদিন করিনি। কিন্তু এবারে তো জানতেই হবে এবং ৭২ ঘণ্টা বন্ধের আগেই আমাদের ওখানে পৌঁছতে হবেই স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রের নিত্যদিনের স¤প্রচার অব্যাহত রাখার স্বার্থে। আমরা ভারতীয় নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানালাম। কিন্তু হতাশ হলাম প্রথমে নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের একজন (যিনি বেতারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন) মি. দাশকে (পুরোনাম জানি না) সব খুলে বললে তিনি আমাদের যে ক’জন যাওয়া প্রয়োজন তার একটা তালিকা চাইলেন। গোড়াতেই আমরা ১৪ জনের তালিকা দিলাম। সারাদিন এবং এই তিনদিন সম্পূর্ণ অধিবেশন যাদের চালাতে হবে তাদের নাম লিখে দিলাম। কিন্তু এত লোক দেখে তিনি নিজেই প্রাথমিকভাবে এ প্রস্তাব বাতিল করে দিলেন। তালিকা ছোট করে দিলে উচ্চপর্যায়ে সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে দেখবেন কী করা যায়। এরপর তিনটি সংবাদ বুলেটিন লেখা ও পাঠের জন্য তিনজন, একজন উপস্থাপক এবং প্রকৌশলীদের একজন অন্যূন এই পাঁচজনের তালিকা দিলাম বটে কর্তৃপক্ষ একজনকে মাত্র অনুমতি দিল। কী করে সম্ভব একজনকে দিয়ে পুরো অধিবেশন চালানো? ভেবে পাচ্ছিলাম না। ভাবছিলাম, ভারতীয় নিরাপত্তা বিভাগের লোকজন কেন ভাবতে পারছেন না যে একজনকে দিয়ে সব কাজ সম্ভব হবে না। বুঝলাম, ভারতীয় গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষের গোঁয়ার্তুমি ছাড়া এটা আর কী? বাস্তবকে অস্বীকার করা কী করে সম্ভব? আমরা তাদের এই অবাস্তব প্রস্তাবে রাজি হতে পারলাম না। অনন্যোপায় হয়ে আমাদের বিকল্প খুঁজতে হলো। অবশেষে ব্যর্থ হয়ে আমরা ঠিক করলাম, অনুষ্ঠানমালা রেকর্ড করে দেব তিনদিনের জন্য। কিন্তু সংবাদ বুলেটিনের কী হবে? ভেবে কুল পাচ্ছিলাম না। অবশেষে বিপদ থেকে উদ্ধার পাবার একটা পথ খুঁজে পাওয়া গেল।… রণাঙ্গনে যে বন্ধু মুক্তিসেনারা লড়াই করতেন অকুতোভয়ে, তাদের কেউ কেউ দিনরাত্রির যুদ্ধের অবসাদ-ক্লান্তি দূর করার জন্য কলকাতা আসতেন এক-দুদিনের জন্য। তখন তারা অবশ্যই স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে আসতেন এবং জমজমাট আড্ডা দেওয়ার সময় ওঁদের অ্যাকশনের কাহিনী শুনতাম। রোমহর্ষক তাজ্জব করা রূপকথা যেন মুক্তিফৌজের জয়ের কাহিনী। আপ্লুত হয়ে শুনতাম। আর ওদের কাছ থেকেই জেনে নিয়েছিলাম আড্ডাচ্ছলে কোথায় কোন অস্ত্র ব্যবহার করা হয়, করলে সেসব অ্যাকশনে কেমন ক্ষয়ক্ষতি হয় বা হতে পারে। তখন ওদেরকেই অনুরোধ করেছিলাম, কোথায়, কবে কী কী অস্ত্র ব্যবহার করা হয় এবং তাতে ক্ষতি হয় কতটা? তার একটা রূপরেখা সহযোদ্ধারা ছকের মতো এঁকে দিয়েছিলেন। তাকেই নির্ভর করে তিনটি অধিবেশনের জন্য বাংলা, ইংরেজি এবং উর্দু বুলেটিন মোট ৯টা এবং তিনদিনে ৩দ্ধ৯টি সর্বমোট ২৭টি সংবাদ বুলেটিন রেকর্ড করে পাঠিয়েছিলাম। তিনদিন প্রচারের জন্য, যেন কেউ না বুঝতে পারেন যে, পশ্চিমবঙ্গের বন্ধের কারণে স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। আমরা তো জানতাম, বেতার স¤প্রচার একবেলা শুনতে না পেলে যুদ্ধরত মুক্তিসেনা আর অবরুদ্ধ বাংলার সাধারণ মানুষের মনে কী বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে। এ লড়াইয়ে আমরা জয়ী হলাম। যত বিপদই আসুক, আমরা অসম্ভবকে এভাবেই সম্ভব করেছি যুদ্ধক্ষেত্রে আর মনস্তাত্তি¡ক লড়াইয়ে।

সূত্র : মুক্তিসংগ্রামে স্বাধীন বাংলা বেতার।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj