বাংলাদেশে চলমান ভাষাপরিস্থিতি ও বাংলা ভাষা : আবুল কাসেম ফজলুল হক

সোমবার, ৪ জুলাই ২০১৬

ইংরেজি অবশ্যই আমাদের ভালো করে শিখতে হবে। ইংরেজি ভাষার মহান জ্ঞানভাণ্ডারকে ব্যবহার করার যোগ্যতা আমাদের অর্জন করতে হবে। ইংরেজির মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান দ্বারা বাংলা ভাষার জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করতে হবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্যও ইংরেজি অপরিহার্য। ইউরোপ-আমেরিকার প্রযুক্তি আয়ত্ত করার জন্যও ইংরেজি দরকার। কেবল কাণ্ডজ্ঞানহীনেরাই ইংরেজির প্রয়োজন অস্বীকার করতে পারে।

যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে ইংরেজি প্রথম ভাষা। ভারতে, মনে হয়, ইংরেজি ভাষা রাষ্ট্রভাষা ও প্রাদেশিক ভাষাসমূহের উপরে স্থান নিয়ে আছে। দক্ষিণ আফ্রিকায়ও ইংরেজি রাষ্ট্র পরিচালনার ভাষা। এই কয়টি দেশ ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো দেশেই ইংরেজি প্রথম ভাষার, কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনার ভাষার স্থান নিয়ে নেই। এই দেশগুলোতে ইংরেজির অবস্থা এক রকম নয়। যে ইংরেজি বিশ্বগ্রাসী, তা যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের ইংরেজি। এইসব দেশে আদিবাসীদের কিংবা ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীসমূহের আলাদা আলাদা ভাষাও আছে।

এগুলোর বাইরে অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ও জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রযুক্তি আহরণের প্রয়োজন বিবেচনা করে আরো কিছু ভাষা শেখার সুব্যবস্থা সরকারি উদ্যোগে বাংলাদেশে করা দরকার। বাংলাদেশের উন্নতির জন্য বাংলাসহ সব ভাষা শেখার ব্যবস্থাকেই বাস্তবসম্মত ও উন্নত করতে হবে। গোটা শিক্ষাব্যবস্থাকে আমূল সংস্কারের দ্বারা উন্নত করা একান্ত অপরিহার্য। আমাদের দেখা দরকার ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, রাশিয়া, চীন, জাপান, ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ আমেরিকার রাষ্ট্রসমূহের ভাষানীতি। এগুলোর মধ্যেও কিছু দেশ অনেক উন্নত। তলিয়ে দেখা দরকার, ইংরেজি এত উন্নত ভাষা হওয়া সত্ত্বেও কেন তারা তাদের জাতীয় ভাষা ত্যাগ করে ইংরেজি গ্রহণ করছে না। দেখা দরকার কিভাবে তারা তাদের দেশে ইংরেজির সমস্যার সমাধান করছে। তাদের অভিজ্ঞতা দেখলে আমাদের বুদ্ধি খেলতে পারে। আমরা কোনোটা অনুকরণ করব না, তবে অন্যদের অভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করে আমরা আমাদের উন্নতির পথ প্রশস্ত করব।

প্রতিটি উন্নত জাতি নিজের রাষ্ট্রভাষার সর্বাঙ্গীণ উন্নতিতে অত্যন্ত যতœবান। রাষ্ট্রভাষার উন্নতির সঙ্গে তারা তাদের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক উন্নতিকে এক করে দেখে। নিজেদের রাষ্ট্রভাষার ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি যতœবান যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র। তারা পৃথিবীর সকল ভাষা থেকে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও তত্ত্ব-তথ্য আহরণ করে ইংরেজি ভাষাকে সমৃদ্ধ করে আসছে। তাদের দেশে ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকার নানা ভাষা ও নানা বিষয় শেখার ভালো ব্যবস্থা আছে। প্রতিযোগিতার পৃথিবীতে বাংলাদেশে কেবল ইংরেজি ও অন্যান্য বিদেশি ভাষা নয়, রাষ্ট্রভাষা বাংলা নিয়েও আমাদের সচেতন ও যতœবান হওয়া দরকার। উন্নতির কোনো সংক্ষিপ্ত উপায় নেই। অন্তত পাঁচ-সাতটা বিদেশি ভাষা ভালোরূপে শেখার ব্যবস্থা বাংলাদেশে করতে হবে। সারা দেশের সকল শিশুকেই বিদেশি ভাষা শেখাতে হবে তা নয়। জাতীয় প্রয়োজন বিবেচনা করে সংখ্যা নির্ধারণ করা যেতে পারে। বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করার জন্য নানা ভাষা থেকে জ্ঞানবিজ্ঞান ও তত্ত্ব-তথ্য আহরণ করতে হবে। বাংলা আমাদের প্রথম ভাষা এবং বাংলাই আমাদের অস্তিত্বের ও উন্নতির অবলম্বন।

বাংলাদেশে বাংলা ভাষা ছাড়াও আছে ৪৫টি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ৪৫টি মাতৃভাষা। এই ৪৫টি জনগোষ্ঠীর মোট জনসংখ্যা বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার এক শতাংশের সামান্য বেশি। আবার কিছৃু লোকের মধ্যে আছে উর্দুভাষা। আরবি, সংস্কৃত ও পালি ভাষার সঙ্গে রয়েছে ধর্মীয় অনুষঙ্গ। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল ও জাতিসংঘের প্রভাবে বাংলাদেশে কিছু জায়গায় কার্যকর রয়েছে ইংরেজি ভাষা। বাংলাদেশের যে নাগরিকেরা বাংলাভাষী নন, তারাও বাংলা শেখেন কিংবা শিখতে বাধ্য হন। বাংলা বাদ দিয়ে কেবল তাদের ভাষা নিয়ে যদি তারা চলতে চেষ্টা করে, তাহলে তা দ্বারা কি তারা উন্নতি করতে পারবে? বিলীয়মান মাতৃভাষাসমূহকে রক্ষা করার জন্য জাতিসংঘের যে আয়োজন, তা সফল হবে না। জাতিসংঘের আদিবাসী-নীতি ভুল। ‘আদিবাসী’দের চিরকালের জন্য ‘আদিবাসী’ করে রাখা, কিংবা ‘আদিবাসী’দের চিরকালে ‘আদিবাসী’ থাকা একটু উচিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রে, কানাডায়, অস্ট্রেলিয়ায়, নিউজিল্যান্ডে প্রচলিত আদিবাসী নীতি ন্যায়সঙ্গত নয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অবস্থার পটভূমিতে ‘আদদিবাসী’দের ও ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীসমূহের ভাগ্য নির্ধারণে ‘আদিবাসী’দের ও ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীসমূহের স্বাধীন ভূমিকা বাঞ্ছনীয়।

বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা রূপে প্রতিষ্ঠা করার এবং এ ভাষার উন্নতির জন্য সরকারি উদ্যোগে গ্রহণ করা দরকার সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও কার্যক্রম। ভাষার বেলায় গ্রহণ করতে হবে বহুত্বমূলক সমন্বয়ের কিংবা বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের নীতি। জাতির ও রাষ্ট্রের সর্বাঙ্গীণ উন্নতির লক্ষ্যে ক্লাসিকের ও গুরুত্বপূর্ণ সমকালীন বিষয়াদির অনুবাদের জন্য দরকার অনুবাদের বৃহদায়তন রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা। বহুত্বমূলক সমন্বয়ের কিংবা বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের নীতি অবলম্বন করে মানবজাতি সুদূর ভবিষ্যতে কোনো কালে হয়তো একভাষী হয়ে উঠবে। তবে তা যে অল্প সময়ের ম:্যে হয়ে যাবে, তা ভাবা যায় না। বর্তমান ভাষিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য দরকার একটি সুষ্ঠু জাতীয় ভাষানীতি। সে নীতি অবলম্বন করে রাষ্ট্রের ভেতরকার সকল প্রতিষ্ঠান নিজেদের ভাষানীতি স্থির করবে। সরকার যদি তা প্রণয়ন করে এবং তার জন্য পরিকল্পনা ও কার্যক্রম গ্রহণ করে, তা হলে খুব ভালো হয়। সরকার এ ব্যাপারে উদ্যোগী না হলে, দেশের বিবেকবান চিন্তাশীল ব্যক্তিদের কর্তব্য বাংলাদেশের জন্য একটি সর্বাঙ্গীণ, সুষ্ঠু জাতীয় ভাষানীতি প্রণয়ন করা এবং প্রচার-আন্দোলন দ্বারা তার পক্ষে জনমত গঠন করা ও তার বাস্তবায়নের উপায় বের করা। এখন ভাষার প্রশ্নে বাংলাদেশে বিরাজ করছে সার্বিক বিভ্রান্তি। তাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলা ভাষা। বাংলা বানান ও রচনারীতি নিয়েও বিশৃঙ্খলা ও ভ্রান্ত ধারণা বিরাজমান আছে। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা রূপে প্রতিষ্ঠা করতে হলে, উচ্চশিক্ষায় গবেষণায় ও বিচারব্যবস্থায় বাংলা চালু করতে হলে, বাংলা বানানের আরো সংস্কার করতে হবে। ইংরেজি বানান স্থিতি লাভ করেছে সংস্কারের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়ে। সাহিত্য সৃষ্টিতে ও গবেষণায় রচনারীতি ও সবঃযড়ফড়ষড়মু-কে মুখ্য মনে করে বিষয়বস্তুকে গৌণ মনে করা ভুল। বিষয়বস্তু, রচনারীতি, সবঃযড়ফড়ষড়মু-সবই গুরুত্বপূর্ণ কোনোটারই গুরুত্ব কম নয়। বৈদেশিক সাহায্যনির্ভর গবেষণা আমাদের স্বাভাবিক উন্নতির সহায়ক হয় না।

ব্রিটিশ শাসিত বাংলায় সাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়েছিল। বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময় (১৯০৫-১১) থেকে রাজনীতিতে ইংরেজির জায়গায় বাংলা ও অন্যান্য ভারতীয় ভাষা ব্যবহৃত হতে থাকে। তখনই সূচিত হয় গণজাগরণ। স্বদেশি আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার লেখক-পাঠকদের ও জনসাধারণের মধ্যে বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিরাট উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আশা দেখা দেয়। ১৮৫৭-র মহাবিদ্রোহের পরে বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথের কালেও বাংলা ভাষার লেখক-পাঠকদের মধ্যে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছিল। তখন বাংলা ভাষার লেখকদের মনে জাতীয় জীবনে বড় কিছু অর্জনের প্রবল আকাক্সক্ষা ছিল। ব্রিটিশ-শাসন-বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনে গোটা ভারতে বাংলা ভাষা ছিল অন্যতম প্রধান অবলম্বন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরেই সূচিত হয় আমাদের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। তারপর প্রতি বছর সংগ্রামী স্পৃহা নিয়ে, সৃষ্টিশীল উপায়ে প্রতিবন্ধকতার পর প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করে, একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপন, যুক্তফ্রন্টের একুশ দফা আন্দোলন, আওয়ামী লীগের ছয়দফা আন্দোলন, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের এগুরো দফা আন্দোলন, উনসত্তের গণঅভ্যুত্থান ইত্যাদির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়ে, স্বাধীতাযুদ্ধে জয়লাভের পরিণতিতে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্ররূপে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা। সরকারি প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও উক্ত প্রতিটি আন্দোলনই ছিল বাংলা ভাষার, বাংলা সাহিত্যের ও বাংলায় জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার জন্য প্রেরণাদায়ক। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন শেষ পর্যন্ত আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারও আন্দোলন ছিল। বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার পর বাংলা ভাষার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিয়ে শিক্ষিত সমাজে অভূতপূর্ব আশা দেখা দিয়েছিল। বাংলা ভাষার বিকাশের পেছনে হাজার বছরের প্রতিক‚লতার পটভূমিতে একজন লেখক মত প্রকাশ করেছিলেন : ‘বাংলা ভাষাকে রক্ষা করার, লালন করার এবং তাকে এক অন্তহীন শুভ-পরিণামের দিকে এগিয়ে নিয়ে চলার পূর্ণ দায়িত্ব বাংলাদেশেরই। এ ধারণা এখন ব্যক্তিগত, শ্রেণিগত ও সম্প্রদায়গত চেতনাকে অতিক্রম করে রাষ্ট্রগত ও জাতিগত চেতনায় এসে সুস্থির হয়েছে বলেই আমাদের বিশ্বাস।’ (আজীজুল হক) এটাই তখন বৃহত্তর শিক্ষিত সমাজের বিশ্বাস রূপে দেখা দিয়েছিল। কিন্তু এ বিশ্বাস ভেঙে গেছে ১৯৯১ সালে বৃহৎ শক্তিবর্গের সহযোগে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন শুরু হওয়ার পরেই। নিঃরাজনীতিকরণের প্রক্রিয়া আরম্ভ করা হয় আরো অন্তত দশ বছর আগে। এর মধ্যে এনজিও ও সিভিল সোসাইটির বিস্তার ঘটেছে, নির্বাচিত সরকারগুলো বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিলের প্রভাবে বাংলার প্রতি উদাসীন হয়ে ইংরেজির দিকে ঝুঁকে গিয়েছে। ১৯৯৯ সালে একুশে ফেব্রুারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করার পর নীতিনির্ধারকদের, বিশিষ্ট নাগরিকদের, রাজনীতিবিদদের ও সরকারের মনোযোগ চলে গেল বিলীয়মান মাতৃভাষাসমূহকে রক্ষা করার দিকে এবং বেশি করে অবহেলিত হতে লাগল বাংলা ভাষা। তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলয়ের (১৯৯১) পর বাংলাদেশের শিক্ষিত সমাজে ইংরেজির প্রতি অন্ধ মোহ সৃষ্টি হয়েছে। ঝঅঞ, ঞঙঊঋখ, ওঊখঞঝ, এজঊ, এগঅঞ ইত্যাদি পরীক্ষা বাংলাদেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের গ্রাস করে নিয়েছে। এ অবস্থায় ১৯৯১ সাল থেকে একটির পর একটি ‘নির্বাচিত’ অদূরদর্শী সরকার বাংলা ভাষার প্রতি মনোযোগ ত্যাগ করে ইংরেজির দিকে ঝুঁকে গিয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিও হয়ে পড়েছে বৃহৎ শক্তিবর্গের স্থানীয় দূতাবাসমূহের অভিমুখী। ক্রমে রাষ্ট্রভাষা রূপে বাংলা ভাষাকে প্রতিষ্ঠিত করার এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার সকল স্তরে বাংলা চালু করার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। এখন শাসক শ্রেণির বুদ্ধিজীবীদের মনোভাব বাংলা ভাষার অনুক‚ল নয়। বাংলা ভাষার গোটা ইতিহাসের মধ্যে ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত মাত্র আঠারো বছর চলেছিল বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা রূপে প্রতিষ্ঠিত করার রাষ্ট্রীয় আয়োজন।

গোটা ইতিহাস জুড়েই দেখা যায় প্রতিক‚ল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা তার অস্তিত্ব রক্ষা করেছে এবং বিকশিত ও সমৃদ্ধ হয়েছে। এক সময় এমন ধর্মীয় বিধান প্রচলিত ছিল যে, রামায়ণ, মহাভারত ও অষ্টাদশ পুরাণ কেউ যদি মানব ভাষায় আলোচনা করে তবে সে রৌরব নরকে যাবে। ‘মানবভাষা’ বলে বোঝানো হতো সংস্কৃত ভাষার বাইরেরর সব ভাষাকে, আর সংস্কৃত ভাষাকে বলা হতো ‘দেবভাষা’। সংস্কৃত ছিল ধর্মানুশীলনের ও রাজকার্য পরিচালনার ভাষা। তুর্কি, পাঠান, মোগল শাসকদের কালে সংস্কৃতের জায়গায় ফারসিকে করা হয় রাজকার্য পরিচালনার ভাষা। সেকালে বাংলা ভাষার দেশে ধর্মচর্চার ও জ্ঞানচর্চার ভাষা ছিল আরবি, ফারসি ও সংস্কৃত। চাকরি ও ব্যবসায় প্রয়োজনে ধর্ম নির্বিশেষে লোকে তখন ফারসি ভাষা শিখত। লোকজীবনের অবলম্বন ছিল বাংলা ভাষা। লোকসাহিত্য ছিল, দরবারি সাহিত্যও ছিল। মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব সাহিত্য, অনুবাদ সাহিত্য ও রোমান্সকাব্য দরবারি সাহিত্যরূপেই বিকশিত হয়েছিল। ফারসি ও সংস্কৃতের প্রতিপত্তির মধ্যে প্রতিক‚ল পরিবেশেও বাংলা বিকাশশীল ছিল। বাঙালি বাংলা ভাষায়ই চিন্তা করেছে, উপলব্ধি করেছে, অনুভব করেছে- ভাব বিনিময় করেছে মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণব সাহিত্য ইত্যাদি সৃষ্টি করেছে। বাংলা ভাষাই ছিল বাংলার জনগণের অস্তিত্বের ও জীবনযাপনের সবচেয়ে মূল অবলম্বন। চিন্তাশক্তি ও শ্রমশক্তির, কিংবা শ্রমশক্তি ও চিন্তাশক্তির নিরন্তর ব্যবহার ছাড়া এপ (ধঢ়ব) মানুষ হয়ে উঠতে পারত না- সভ্যতা ও সংস্কৃতি সৃষ্টি হতো না। জীবন প্রয়াসের মধ্য দিয়ে মানুষ আপন জৈবিক সামর্থ্যরে বলে ভাষা সৃষ্টি করেছে। ভাষা ও চিন্তা অবিচ্ছেদ্য। ভাষা ছাড়া চিন্তা হয় না, চিন্তা ছাড়া ভাষা হয় না। ইন্দ্রিয় ও স্নায়ুমণ্ডলীর ওপর বস্তজগতের স্পর্শে ও প্রভাবে মানুষের আবেগ-অনুভূতি ও চিন্তাশক্তি জাগ্রত ও সক্রিয় হয়-মানুষ চিন্তা করে। বস্তুজগত ছাড়া চিন্তা হয় না, ভাষাও হয় না। ভাষার উদ্ভবের পেছনে চিন্তাশক্তি ও চিন্তার সঙ্গে শ্রমশক্তি ও শ্রমও কাজ করেছে। বাংলা ভাষা বাঙালির সার্বিক জীন প্রয়াস থেকেই নিঃসৃত। আলাউদ্দিন হোসেন শাহ ও আরো দু’একজন পাঠান সুলতান বাংলা ভাষার উন্নতিতে সচেষ্ট ছিলেন। ওই সময়েই আত্মপ্রকাশ করেছিলেন শ্রীচৈতন্য। চৈতন্য-প্রবর্তিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম বাংলা ভাষার বিকাশে বিস্ময়কর রকম সুফল ফলিয়েছে। এদিকে চৈতন্যচরিতামৃত, চৈতন্যভাগবৎ, চৈতন্যমঙ্গল, চৈতন্যপ্রদীপ প্রভৃতি তত্ত্বগ্রন্থ, অপরদিকে বৈষ্ণব পদাবলি। পাশাপাশি রয়েছে মুকুন্দরাম, বিজয়গুপ্ত, বাহরাম খাঁ, আলাওল, ভারতচন্দ্রের কাব্য। ভাষার, চিন্তার, অনুভূতির এমন উৎকর্ষ মধ্যযুগের কয়টি জাতির সাহিত্যে আছে; ফারসি যখন রাজভাষা, তখন বাঙালি দ্বারা বাংলা ভাষায় সম্ভব হয়েছিল এইসব অমূল্য সৃষ্টি। ব্রিটিশ শাসনকালে, পরাধীনতার মধ্যে, ইংরেজি ভাষার দোর্দণ্ড প্রতাপের মধ্যে, বাঙালি বাংলা ভাষায় জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্যের সব শাখায় সাধন করেছে অসাধারণ উন্নতি। সে ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানকালেও ঢাকাকেন্দ্রিক সংস্কৃতিতে বাংলা ভাষার উন্নতি অব্যাহত থাকে। ঢাকা গড়ে ওঠে জাতীয় সংস্কৃতির নতুন কেন্দ্ররূপে। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাক্সক্ষা এবং মানববাদী জীবনানুভূতি ও চিন্তা-চেতনা অবলম্বন করে বিকশিত হয় বাংলা ভাষা ও সাহিত্য। বিশ শতকের ষাটের, সত্তরের ও আশির দশকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা বিষয, প্রশাসনিক কর্মধারা ও সাহিত্য অবলম্বন করে ঘটে বাংলা ভাষার বিপুল উন্নতি। ইংরেজি, আরবি ও ফারসি ভাষা থেকে অনূদিত হয় কালজয়ী অনেক গ্রন্থ। বাংলা একাডেমি ও অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রকাশিত বিভিন্ন বিষয়ের রচনাবলিতে, সাহিত্যে ও সাময়িকপত্রে বিধৃত আছে বাঙালির সৃষ্টিশক্তির পরিচয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন থেকে প্রচারিত বাংলায় লিখিত ও অনূদিত গ্রন্থাদিও বাংলা ভাষার বিকাশের সহায়ক হয়েছে। ফ্রাঙ্কলিন পাবলিকেশনস ও জার্মান কালচারাল ইনস্টিটিউট থেকে প্রচারিত বাংলায় লিখিত ও অনূদিত সমাজতন্ত্র বিরোধী পুস্তকাদিও বাংলা ভাষার উন্নতির সহায়ক হয়েছে। বাংলাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা রূপে প্রতিষ্ঠা করা হলে, বাঙালির জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় উন্নতির ধারা সুস্থ, স্বাভাবিক ও বর্ধিষ্ণু হলে, বাইরের জগত আকৃষ্ট পর্যায়ে বাংলা প্রচলনের জন্য দেখা দেয় বিরাট উদ্দীপনা। বাংলা ভাষা দিয়ে জাতির জীবনে সঞ্চায়িত ২য় নবচেতনা। ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষা থেকে মানবজাতির শ্রেষ্ঠ জ্ঞানস্পদ ও সাহিত্যসম্পদ আহরণ করে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করার প্রবল আকাক্সক্ষা জেগে ওঠে শিক্ষিত লোকদের ও জ্ঞানানুরাগীদের বৃহত্তর অংশে। অশিক্ষিত লোকেরাও নিজেদের ভাষা ও রাষ্ট্রের উন্নতি নিয়ে বিরাটভাবে আশান্বিত হয়ে ওঠে। চাকরি সূত্রে বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল ও পশ্চিমা বৃহৎ শক্তিবর্গের সঙ্গে যারা জড়িত ছিলেন তারা বাংলার এই প্রসার পছন্দ করছিলেন বলে মনে হতো না। নানা ক্ষেত্রে নানাভাবে তারা বাংলা নিয়ে ক্রমাগত সংশয় প্রকাশ করেছেন। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের গড়ে না ওঠার পেছনে তাদের নিয়ামক ভূমিকা আছে। সরাসরি বাংলা প্রচলনের বিরোধিতা অবশ্য তাঁরা করেন না। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর বছর পাঁচেকের মধ্যে বিচার বিভাগ ছাড়া সকল সরকারি অফিসে বাংলা চালু হয়ে যায়, বছর বিশেকের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা ও গবেষণার কাজে বাংলা চালু হয়। বাংলা ভাষার মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের রীতি চালু হয়েছিল। সৃষ্টিশীল জ্ঞানানুশীলদের জন্য ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষা শেখার সুব্যবস্থা করার কথা চিন্তা করা হচ্ছিল। উচ্চ শিক্ষা পর্যায়ের জন্য নতুন নতুন গ্রন্থ রচিত হচ্ছিল; অনূদিতও হচ্ছিল। সংস্করণের পর সংস্করণে কালজয়ী ও উৎকৃষ্ট গ্রন্থসমূহের অনুবাদের উৎকর্ষ সাধনের চিন্তা ও চেষ্টাও দেখা দিয়েছিল। বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি, কৃষিবিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়েও বাংলায় গ্রন্থ রচনার ও অনুবাদের বিপুল আগ্রহ লক্ষ করা গিয়েছিল। বাঙালির হাজার বছরের লিখিত ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো বাংলা ভাষা নিয়ে এমন উৎসাহ-উদ্দীপনা ও কর্মপ্রচেষ্টা দেখা গিয়েছিল। বাংলা ভাষা নিয়ে এই সময়ের কর্মকাণ্ডের মধ্যে বাঙালির অসাধারণ যোগ্যতার প্রমাণ রয়েছে। বিচারব্যবস্থায়ও বাংলা চালুর তাগিদ দেখা দিয়েছিল। রাজনৈতিক নেতৃত্বের দুর্বলতা ও বিশৃঙ্খলা ক্ষতির কারণ হয়েছিল বটে তবে তাতে বাংলা ভাষার উন্নতির গতি বন্ধ হয়নি। এ অবস্থায়, পশ্চিমা বৃহৎ শক্তিবর্গের প্রত্যক্ষ সহযোগে এবং অরাজনৈতিক নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে গঠিত নির্বাচিত সরকারগুলোর আমলে, সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলয়ের এবং এনজিও সিভিল সোসাইটি ও ইন্টারনেটের বিস্তারের পর, একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ঘোষণা করার পর, বাংলা ভাষার গতিধারায় দেখা দিয়েছে দারুণ ভাটা। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রচারকার্য বাংলা ভাষাকে উন্নত ও বিস্তৃত করার আবেগ ও চিন্তাধারার ওপর আঘাত হেনেছে। ইন্টারনেটে ইংরেজির মতোই বাংলা ভাষার ব্যবহারও যে সম্ভব এটা অল্পই ভাবা হয়েছে। ইন্টারনেটকে যতই অলৌকিক মনে করা হোক, আসলে তা মোটেই অলৌকিক নয়, সম্পূর্ণই মানুষের দ্বারা সৃষ্ট ও চালিত। রোবটও মানুষের দ্বারা সৃষ্ট ও চালিত।

বাংলা সমৃদ্ধ ভাষা। মধুসূদন ও বঙ্কিমচন্দ্রের কালে তাঁদের সমকক্ষ কোনো লেখক জাপান, চীন, ইন্দোচীন, ইন্দোনেশিয়া, বাংলার বাইরে ভারতের অন্যান্য প্রদেশ, আফগানিস্তান, ইরান, ইরাক, আরব, সিরিয়া, মিসর, লিবিয়া, আবিসিনিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার রাষ্ট্রসমূহের ভাষায় ছিল না। রামমোহন, দেবেন্দ্রনাথ, অক্ষয়কুমার, বিদ্যাসাগর, বিকেকাকন্দ, কালীপ্রসন্ন ঘোষ প্রমুখ মনীষী চিন্তা প্রকাশের ও সমাজসংস্কারের প্রয়োজনে, পরম ভালোবাসায়, কঠোর পরিশ্রম সহকারে বাংলা ভাষাকে গড়ে তুলেছিলেন। বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতিকে তাঁরা অভিন্ন সত্তা রূপে দেখেছিলেন। এ দুয়ের একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটির অস্তিত্ব তাঁরা কল্পনা করতে পারতেন না। জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদি, রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল, শরৎচন্দ্র, রোকেয়া, নজরুল, জীবনানন্দ, বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কও, মানিক বাংলা ভাষায় যে সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন, তা পৃথিবীর যে কোনো উন্নত জাতির সাহিত্যেও সমতুল্য। ইসমাইল হোসেন সিরাজী, মোহাম্মদ লুতফর রহমান, এস ওয়াজেদ আলি, আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ, মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, আবুল হুসেন, কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী মোতাহার হোসেন, মোতাহের হোসেন চৌধুরী, মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ, আবুল ফজল, আহমদ শরীফ, শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান ও আরো অনেক লেখক চিন্তা ও অনুভূতি প্রকাশেরও সমাজ প্রগতির প্রয়োজনে বাংলা ভাষায় লিখেছেন এবং ভাষাটিকে ক্রমাগত সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর করেছেন। জগদীশচন্দ্র বসু, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিস, মেঘনাদ সাহা, সত্যেন্দ্রনাথ বসু, কাজী মোতাহার হোসেন প্রমুুখ বিজ্ঞানী বিজ্ঞানচর্চা ও আবিষ্কার উদ্ভাবন দিয়ে বাংলার তো বটেই, বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডারকেও সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁরা প্রত্যেকেই ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ভাষায়ও লিখেছেন এবং দেশবাসীকে বাংলা ভাষা অবলম্বন করে চিন্তার, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার ও কাজ করার জন্য ক্রমাগত আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁরা বলে গেছেন যে, বিজ্ঞানচর্চা ও আবিষ্কার-উদ্ভাবনের বেলায় তাঁরা বাংলা ভাষায়ই চিন্তা করেছেন এবং বিশ্ববাসীকে জানানোর জন্য তাঁরা তাঁদের চিন্তা আবিষ্কার-উদ্ভাবনকে মনে মনে তর্জমা করে ইংরেজিতে লিখেছেন। তাঁদের মতে সৃষ্টির কাজে এক ভাষার লেখকদের অন্য ভাষা ব্যবহারের বেলায় এইরকম অনুবাদের বিকল্প নেই। নানা বিষয়ে কাজ চালানোর মতো ইংরেজি ভিন্ন-ভাষীরা লিখতে পারেন-বলতে পারেন; কিন্তু সৃষ্টির কাজে মাতৃভাষায় চিন্তা করে প্রয়োজনবোধে তা অন্য ভাষায় তর্জমা করে প্রকাশ করার কোনো বিকল্প নেই। সরাসরি ভিন্ন ভাষায় চিন্তা করে সৃষ্টি সম্ভব হয় না। বাঙালির ইংরেজিকে মাতৃভাষা করে নেয়ার চেষ্টা ইংরেজ আমলে ব্যর্থ হয়েছে। সে চেষ্টা এখন কি সফল হবে? বাংরাদেশের সব মানুষ কি মাতৃভাষা বাংলা ছেড়ে ইংরেজিকে মাতৃভাষা করে নিতে পারবে?

বাংলা ভাষার প্রকাশ সামর্থ্য ও সম্ভাবনা নিয়ে সেকালের বাঙালি বিজ্ঞানীরা ও বিভিন্ন ক্ষেত্রের চিন্তাশীলেরা আশান্বিত ছিলেন। তাঁরা মনে করতেন, বাংলা বিকাশশীল ভাষা এবং তার বিকাশের সম্ভাবনা বহুমাত্রিক ও অন্তহীন। বাংলা ভাষায় রচিত হয়েছে বিস্ময়কর রকম সুন্দর সুর ও গান। রবীন্দ্রনাথ, দ্বিজেন্দ্রলাল, নজরুলের গানে কথা ও সুরের যে সুন্দর সামঞ্জস্যপূর্ণ অভিব্যক্তি, তা অতুলনীয়। অবনীন্দ্রনাথ, যামিনী রায়, জয়নুল আবেদীন, সুলতান বাংলায় চিন্তা করেছেন এবং সৃষ্টি করেছেন অপূর্ব শিল্পকলা। চলচ্চিত্র নিয়ে সত্যজিৎ রায় বাংলায় চিন্তা করেছেন, লিখেছেন; সূচিত্রা সেন, উত্তম কুমারদের অভিনয়শিল্পের মর্মে আছে বাংলা ভাষার চিন্তা ও অনুভূতি। বাঙালির অত্যন্ত বলিষ্ঠ চিন্তাশক্তি ও সৃষ্টিশক্তির অত্যন্ত সুন্দর অভিব্যক্তি রয়েছে আধুনিক যুগের বাংলা ভাষার সব সৃষ্টিতে। সৃষ্টিকে চিন্তা থেকে আলাদা করা যায় না। চিন্তাকে ভাষা থেকে আলাদা করা যায় না। চিন্তা, ভাষা, সৃষ্টি অবিচ্ছেদ্য। আর এসবের মূলে থাকে জন্মকাল থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান। বাংলা ভাষার দেশে হাজার বছর ধরে মানুষের জীবনপ্রয়াস ও সৃষ্টি অনুধাবন করলে অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, বাংলা ভাষা বাঙালির মহান সৃষ্টি- এই সৃষ্টি বিকাশশীল থাকবে, কোনো শক্তি একে বিলুপ্ত করতে পারবে না। যে জনসমষ্টি বাংলা ভাষার ভূভাগে বসবাস করে আসছে, তাদের কৃতি ও কীর্তির দিকে ভালো করে তাকালে তাকে হীন মনে করবার কোনো করাণ পাওয়া যায় না। পশ্চিমারা নিজেদের শ্রেষ্ঠতা প্রচার করে আর আমাদের মনে জাতীয় হীনতাবোধ জাগিয়ে রাখার জন্য নিরন্তর তৎপর থাকে। আমরা কি তাদের অভিসন্ধি অনুযায়ী হীনচেতা থাকব?

বাংলা ভাষার যাঁরা লেখক, শিক্ষক, প্রশাসক, বিচারক, রাজীতিক আজ তাঁদের ঐতিহাসিক কর্তব্য বাংলাদেশে বাংলা এবং ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষার স্থান কী হওয়া উচিত, তা নিয়ে দূরদর্শিতার সঙ্গে গভীরভাবে চিন্তা করা ও সিদ্ধান্ত নেয়া। আজ জাতির সামনে প্রশ্ন :

এক. বাংলাদেশ কি তার সংবিধানে ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’- এই কথাটি রেখে অনির্দিষ্টকাল ধরে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে, প্রশাসনে, বিচারব্যবস্থায় ও শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজি মাধ্যম নিয়ে চলবে?

দুই. নাকি বাংলাদেশ তার নিজের সত্তায় অবস্থান করে, ইংরেজি ও অন্যান্য ভাষা থেকে জ্ঞানসম্পদ আহরণ করে, বাংলা ভাষাকে বিকাশশীল ও সমৃদ্ধিমান রেখে কার্যকর রাষ্ট্রভাষায় উন্নীত করবে?

তিন. বাংলা ভাষার লেখক-পাঠকেরা কি শিল্প-সাহিত্যে কলাকৈবল্যবাদ, গবেষণায় পদ্ধতিসর্বস্বতা, উত্তরাধুনিকাবাদ, নব্যউদারতাবাদ, বহুত্ববাদ, বিশ্বায়ন ইত্যাদি অন্ধভাবে গ্রহণ করে চলবেন? না কি সৃষ্টির প্রয়োজনে তাঁরা বিচার-বিবেচনা করে পশ্চিমের প্রগতিশীল মহান ভাবধারাকে গ্রহণ করবেন এবং উপনিবেশবাদী, ফ্যাসিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী ভাবধারাকে পরিহার করে চলবেন? সর্বজনীন গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদও তার সম্পূরক আন্তর্জাতিকবাদ এবং আন্তর্জাতিক ফেডারেল বিশ্বরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে রাষ্ট্রব্যবস্থা ও বিশ্বব্যবস্থাকে পুনঃগঠিত করার চেষ্টা কি আমরা করতে পারি না?

চার. পশ্চিমের উন্নত প্রযুক্তি গ্রহণ করতে গিয়ে আমরা কি আত্মসত্তা বিসর্জন দিয়ে আমেরিকান কিংবা ইংরেজ হয়ে যেতে চাইব? না কি আমরা পশ্চিমের প্রগতিশীল মহান ভাবধারা গ্রহণ করে বাঙালি হিসেবে উন্নত হতে চাইব? আমেরিকান বা ইংরেজ হতে গেলে আমরা আমাদের কালো চামড়াকে সাদা করব কীভাবে? মনমানসিকায় বাঙালি বৈশিষ্ট্য আমরা কতটা বদলাতে পারব?

পাঁচ. বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল, বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা, ন্যাটো ইত্যাদির অন্ধ অনুসারী যাঁরা, বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যাপারদিতে তাঁদের নিয়ামক ভূমিকা অব্যাহত রেখে বাংলাদেশ কি কোনোকালে রাষ্ট্র হিসেবে দানা বেঁধে উঠবে? তাঁদের দৌরাত্ম্যের মধ্যে বাংলা ভাষা কি কোনোকালে বাংলাদেশের কার্যকর রাষ্ট্রভাষা হবে? বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র রূপে গড়ে তুলতে তাঁরা কি ইচ্ছুক?

জাতীয় জীবনের অপরিহার্য নানা প্রশ্নের সঙ্গে এ প্রশ্নগুলোরও কার্যকর উত্তর সন্ধান করতে হবে এবং সেই মতো কর্মসূচি প্রণয়ন করে কাজ করতে হবে।

চলমান শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজি, বাংলা কোনোটাই ভালোভাবে শেখার উপায় নেই। কোনো বিষয়ও ভালোভাবে শেখা হচ্ছে না। গোটা শিক্ষাব্যবস্থারই আমূল সংস্কার দরকার। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য তাদের ব্যবসায়িক ও সাম্রাজ্যবাদী পরিকল্পনা অনুযায়ী ঝঅঞ, ঞঙঊঋখ, ওঊখঞঝ, এজঊ, এগঅঞ ইত্যাদি পরীক্ষা প্রবর্তন করে ইংরেজি শেখানোর ব্যবস্থা করেছে, তাতে ইংরেজি ভালোভাবে শেখা যায় না। এগুলোতে আত্মহারা হয়ে, ইংরেজি ভালোভাবে না শিখে, আমরা নিজেদের ক্ষতি করছি। একটু তলিয়ে দেখলে দেখা যায়, বাইরে থেকে আরোপিত নীতি নিয়ে পরিচালিত হয় বাংলাদেশের শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থা। দরকার জাতীয় শিক্ষার আত্মশক্তি-নির্ভর স্বতন্ত্র নীতি ও ব্যবস্থা। জাতীয় পর্যায়ে শিক্ষার মাধ্যম ইংরেজি করা ঠিক হচ্ছে না।

বৃহৎ শক্তিবর্গের আরোপিত নীতি নিয়ে বাংলাদেশ উন্নতি করতে পারছে না। কেবল মোট জাতীয় আয় কিংবা মাথাপিছু গড় আয় কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে কোনো জাতির প্রকৃত উন্নতি বোঝা যায় না। উন্নত প্রযুক্তির ও বিজ্ঞানের আবিষ্কার-উদ্ভাবনের কল্যাণে এসব এখন পৃথিবীর সকল রাষ্ট্রেই বেড়ে চলছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দ্বারা জাতির ভেতরে কার কী লাভ হচ্ছে, সামাজিক ন্যায় বাড়ছে কিনা, অন্যায় কমছে কিনা, তাও দেখতে হবে। জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে জাতির কী অবস্থা, সেটাও বিচার্য। বৃহৎ শক্তিগুলো এদেশে তাদের জাতীয় শ্রেষ্ঠতাবোধ প্রচারে এবং আমাদের মধ্যে জাতীয় হীনতাবোধ (হধরড়হধষ রহভবৎরড়ৎরঃু পড়সঢ়ষবী) সৃষ্টিতে অত্যন্ত সফল হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, এদেশে ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবার মনে প্রবল জাতীয় হীনতাবোধ বিরাজ করছে। এ অবস্থায় এদেশের সিভিল সোসাইটি থেকে, শাসক শ্রেণির বুদ্ধিজীবীদের থেকে বলা হবে, বাংলা নিয়ে আমরা পিছিয়ে আছি, যত দ্রুত আমরা ইংরেজি মাধ্যমে চলে যাই, তত আমাদের উন্নয়ন হবে। তাঁরা প্রচার করতে আরম্ভ করবেন যে, আমরা ফরাসি, জার্মান, রুশ, জাপানি, চীনাদের মতো পারব না- আমরা অনেক খারাপ অবস্থায় আছি, বৃহৎশক্তিবর্গের সাহায্য ছাড়া আমরা চলতেই পারব না। এই হীনতাবোধ নিয়ে পরনির্ভর থেকে চলতে চলতে আমরা কোন গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছব? সম্প্রতি প্রচার আরম্ভ করা হয়েছে যে, চড়ষরঃরপং ধহফ ফবাবষড়ঢ়সবহঃ ধৎব রহাবৎংবষু ঢ়ৎড়ঢ়ড়ৎঃরড়হধষ. অর্থনৈতিক উন্নয়ন চাইলে রাজনৈতিক উন্নতির বিবেচনা স্থগিত রাখতে হবে। আর রাজনৈতিক উন্নতি চাইলে- গণতন্ত্র চাইলে- অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিচেনা স্থগিত রাখতে হবে। এভাবেই একটু একটু করে ১৯৮০-র দশক থেকে নিঃরাজনীতিকরণের কার্যক্রম চালিয়ে আসা হয়েছে। হীনচেতা সুশীলসুজনেরা ও শাসকগেুণির বুদ্ধিজীবীরা রাত-দিন বিভিন্ন কৌশলে এমন সব কথা বলছেন এবং এমন সব কাজ করছেন যাতে আমাদের জাতউড হীনতাবোধ বাড়ছে ও পরাধীনতাকে বরণ করে নেয়ার মনোবৃত্তি তৈরি হচ্ছে। যাঁরা বাংলা প্রচলনের কার্যক্রম ত্যাগ করে ইংরেজি গ্রহণে উদগ্রীব, তাঁদের আচরণে তো বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার প্রতি কোনো অনুরাগের পরিচয় পাওয়া যায় না। বাংলাদেশের রাজনীতিকে প্রকাশ্য দিবালোকে, গাড়িবহর করে তাঁরাই প্রথম বৃহৎ শক্তিবর্গের স্থানীয় দূতাবাসগুলোতে নিয়ে গিয়েছিলেন। পরে তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা। দেখা যাচ্ছে, নানা প্রলোভনে-প্ররোচনায় যাঁরা বাংলা ভাষার প্রতি অনুরাগ হারান, তাঁদের বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অস্তিত্বের প্রতি আর আগ্রহ থাকে না। যে বাঙালিরা চার দশক আগেও ‘ঘরকুনো বাঙালি’ বলে নিন্দিত হতো, তারা এখন এমনই বহির্মুখী হয়েছে যে, তাদের ‘ঘরবিমুখ’ বলা যায়। এ ব্যাপারে আমাদের কোনো সন্দেহ নেই যে, বাংলাকে রাষ্ট্রভাষারূপে রক্ষা না করে যাঁরা ইংরেজিতে চলে যাচ্ছেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা বা রাষ্ট্রীয় অস্তিত্ব তাঁদের দ্বারা রক্ষা পাবে না। সম্প্রতি নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে যে, বাংলা ভাষার উন্নতির জন্য যাঁরাই কথা বলতে চেষ্টা করেন, তাঁদেরই ইংরেজি-বিরোধী প্রতিপন্ন করার তৎপরতা চালানো হয়।

বাংলা ভাষার অর্থনৈতিক ভিত্তি সামান্য নয়। ষোল কোটি মানুষের এই রাষ্ট্রের প্রশাসনব্যবস্থা বাংলায় চলছে। তাতে বিরাট সংখ্যক লোকের জীবিকা-সংস্থান হচ্ছে। উৎপাদনশীল শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্তরা বাংলা ভাষা অবলম্বন করেই চিন্তা ও কাজ করেন। বিদেশি সূত্র থেকে বাংলাদেশের যে আয়, তারও মূলে আছে বাংলাভাষী জনগণ। বিদেশে কাজ করার জন্য সাময়িকভাবে নানা ভাষা গ্রহণ করতে হলেও বাংলা ভাষা তাঁরা ভোলেন না। বাংলাদেশের অর্থনীতি বাংলা ভাষাকে অবলম্বন করেই প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। যাঁরা বিদেশিদের সঙ্গে ইংরেজিতে কাজ করেন, তাঁদের উচিত বাংলায়ও পারদর্শিতা অর্জন করা। বিশ্বব্যাংক আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল ইত্যাদির ওপর নির্ভরশীলতা কাটানোর জন্য এটা দরকার। আজকের পৃথিবীতে সব দেশেই উচ্চশিক্ষিত লোকেরা অন্তত দ্বিভাষিক। সর্বত্র নিজেদের ভাষাই প্রথম ভাষা, তারপর অন্য ভাষা। বাংলাদেশে স্বাধীন জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষারূপে প্রতিষ্ঠিত করলে এবং সরকার বাংলা ভাষার উন্নয়নে পরিকল্পনা ও কর্মসূচি অবলম্বন করে কাজ আরম্ভ করলে, বাংলা ভাষা অবলম্বন করে আরো বহু লোকের জীবিকা সংস্থানের ও অর্থবিত্ত অর্জনের উপায় হবে। বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষারূপে কার্যকর করে রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে পুনর্গঠিত করলে, বাংলাদেশের প্রতিটি নর-নারীর সম্মানজনক জীবিকা সংস্থানের ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে।

বাংলা ভাষার অর্থনৈতিক ভিত্তিকে ক্রমে ছোট করে ফেলা হচ্ছে। আর স্বাধীন জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তোলার বদলে ক্রমাগত পরনির্ভরতা বাড়ানো হচ্ছে। বাংলাদেশের যেসব কাজ বাংলায় সম্পন্ন করা সম্ভব, সেগুলোতে যতই ইংরেজি কায়েম করা হচ্ছে, ততই বাংলাদেশ পরাধীনতার দিকে এগুচ্ছে। চাইলে, চেষ্টা করলে, ইন্টারনেটে ইংরেজির মতো বাংলাও ব্যবহার করা সম্ভব। আমাদের জাতি ও রাষ্ট্র যদি উন্নতি করে, তাহলে বাংলা ভাষার উন্নতিও ত্বরান্বিত হবে। বাংলা ভাষার উন্নতি দ্বারা আমাদরে জাতীয় উন্নতির পথও প্রশস্ত হবে। আমরা যদি ‘পরাধীনতার সুখ’ ভোগ করার জন্য এগিয়ে চলি তাহলে আমাদের ভাষা, রাষ্ট্র কোনোটারই উন্নতি হবে না। বাংলাদেশকে উন্নতি করতে হবে বাংলা ভাষা অবলম্বন করেই। কেবল ইংরেজিতে মনোযোগী হয়ে বাংলাদেশ যেমন আছে, ক্রমে তার চেয়ে খারাপ হবে। বাংলা ও ইংরেজি দুটোকেই যথোচিত গুরুত্ব দিতে হবে।

বাংলাদেশকে প্রগতিশীল সফল রাষ্ট্ররূপে গড়ে তুলতে হলে স্বাধীন জাতীয় অর্থনীতি, স্বাধীন জাতীয় রাজনীতি ও স্বাধীন জাতীয় সংস্কৃতি অবলম্বন করেই তা করতে হবে। গণবিরোধী গণতন্ত্রের স্থলে সর্বজনীন গণতন্ত্র অবলম্বন করতে হবে। বাংলাদেশকে জ্ঞান-বিজ্ঞানে উন্নতি লাভের জন্য বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষারূপে এবং উচ্চশিক্ষার ও গবেষণার ভাষারূপে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। বাংলাদেশে সর্বস্তরে শিক্ষার মাধ্যমরূপে প্রতিষ্ঠা করতে হবে বাংলা ভাষা। প্রয়োজনের ক্ষেত্রে ইংরেজি অবলম্বন করতে হবে। বাংলা ভাষার ও বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার জন্য পাকিস্তানকালের রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলনের চেয়েও বড় আন্দোলন এখন চালাতে হবে। সিভিল সোসাইটিসমূহের বিশিষ্ট নাগরিকরা এবং শাসক শ্রেণির বুদ্ধিজীবীরা এ আন্দোলনে বাধা না দিলে সমস্যার সমাধান দুরূহ হবে না। কিন্তু তাঁরা তো স্বাধীনতার চেয়ে ‘পরাধীনতার সুখ’কেই বেশি মূল্য দেন!

বাংলাদেশের ৪৫টি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে তাদের প্রাপ্য অধিকার দিতে হবে। বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে তারা যদি কেবল তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়েই চলতে চায় তাহলে সে সুযোগ তাদের দিতে হবে। তারা যদি বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি আকর্ষণ বোধ করে এবং বাংলায় শিখতে চায়, তাহলে বাংলা মাধ্যমে শিক্ষা লাভের পর্যাপ্ত সুযোগ তাদের জন্য সৃষ্টি করতে হবে। বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাস দূর করতে হবে। বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীসমূহের কোনো ভাষাই তো আজকের প্রতিযোগিতার জগতে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার উপযোগী ভাষা হয়ে ওঠেনি। বিলীয়মান এই ভাষাগুলোকে কতটা উন্নত করা যাবে? তারা নিজেদের ভাষাকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে উপকৃত হবে, না বাংলা ও ইংরেজিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে উপকৃত হবে, তা তাদের নিজেদেরই ঠিক করতে হবে।

দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ব্যবস্থাকে চৌদ্দটি ধারা-উপধারায় বিভক্ত করে জাতীয় ঐক্যের পরিপন্থী সব ব্যবস্থাকে পাকা করে রাখা হয়েছে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয়তাবোধ হারিয়ে হীন স্বার্থে জাতিকে নানাভাবে বিভক্ত করে গোত্রীয় চেতনায় নিমজ্জিত রেখেছে। যাঁরা বাঙালি জাতীয়তাবাদ বলেন, তাঁদের মধ্যে জাতীয়তাবাদ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা নেই। যাঁরা বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ বলেন, তাঁদের মধ্যেও তা নেই। বহু বিভক্তির মধ্যেও শিক্ষাব্যবস্থার যে ধারাটি মূল ধারা বলে পরিচিত, ঘঈঞই যে ধারার পাঠ্যপুস্তকের জোগান দেয়, সেই ধারার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাকে এখন বাংলা মাধ্যম ও ইংলিশ ভার্সনে বিভক্তি করে ফেলা হয়েছে। এটাই বোধ হয় এখন পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থার সবর্চশেষ বিভক্তি। এই বিভক্তি বাংলাদেশে জাতি ও রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে মারাত্মক ক্ষতির কারণরূপে সামনে এসেছে। সরকার ২০১০ সালের শিক্ষানীতি প্রণয়নের সময় মাদ্রাসা শিক্ষার সংস্কার করতে গিয়ে অবস্থার চাপে মাদ্রাসা শিক্ষাকে সব দিক দিয়ে শক্তিশালী করেছে এবং শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে ধর্মশিক্ষার প্রসার ঘটিয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষার মান উন্নত হয়নি, নিম্নগামী হয়েছে। অপরদিকে বাংলা মাধ্যমের শিক্ষাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। ইংলিশ ভার্সন সফল হবে না- সফল হতে পারে না। পঞ্চম শ্রেণি ও অষ্টম শ্রেণিতে পাবলিক পরীক্ষা প্রবর্তন করে শিক্ষা বাণিজ্যে স্বর্ণযোগ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষানীতির আমূল সংস্কার দরকার। ভবিষ্যতের নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা বাংলা ভাষার, বাঙালির জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার এবং বাঙালি-সংস্কৃতির স্বর্ণযুগ প্রবর্তন করতে হবে। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হবে এবং শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ করতে হবে।

অত্যুন্নত নতুন প্রযুক্তির এই যুগে কায়েমি স্বার্থবাদীরা দেশের জনসাধারণকে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে। কখনো কখনো মনে হয় যে, জনজীবনে অ্যানেসথেসিয়া প্রয়োগ করে সকলকে অচেতন করে রাখা হয়েছে। জনগণের মহৎ সব বোধ-বৃদ্ধি নিষ্ক্রিয়। সুশীলসুজনেরা জনসচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম যত চালায়, জনগণের অচেতন অবস্থা ততই গভীর হয়। এই বাস্তবতায় কী করে জনসাধারণকে জাগানো যাবে? গণজাগরণ হলো জনগণের ভেতরকার মহৎ সব চেতনা ও গুণাবলির জাগরণ। ঘৃণা-বিদ্বেষ, জুলুম-জবরদস্তি, মারামারি, খুনাখুনি, হিংসা-প্রতিহিংসা ও হুজুগ গণজাগরণের পরিচায়ক নয়। নিদ্রামগ্ন কুম্ভকর্ণের নিদ্রিত দশার মতো অবস্থা এখন আমাদের! সারা দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বাংলা বিভাগগুলোকে বেশি অচেতন দেখা যায়। পাকিস্তান আমলে এসব বিভাগ বাঙালি জাতীয়তাবাদ, রাষ্ট্রভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি প্রচারের এক-একটি দুর্গ হিসেবে কাজ করত। শিক্ষা ও গবেষণার নিয়মিত কাজ বজায় রেখেই এসব বিভাগ লেখালেখি, সৃষ্টিশীল আলোচনা সভা, প্রতিবাদ সভা, সঙ্গীতানুষ্ঠান ইত্যাদি করতে। প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি উদযাপনে তখন সৃষ্টিশীলতা থাকত- চিন্তা-চেতনার নবায়ন ও বিকাশ ঘটত। ইংরেজ আমলেও বাংলা ভাষা স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান অবলম্বন ছিল। তখনকার গবেষণা ও শিক্ষাদীক্ষার খোঁজ নিতে গেলে শ্রদ্ধাযোগ্য অনেক কিছু পাওয়া যায়। বাংলা ভাষার লেখকরাও তখন জাগ্রত ও সক্রিয় ছিলেন। বিকেবান চিন্তাশীল কিছু লেখক বিশেষ শ্রদ্ধার অধিকারী ছিলেন। জনজীবনের বর্তমান দুর্গতিতে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা এবং চিন্তাশীল লেখকেরা অ্যানেসথেসিয়ার ক্রিয়া কাটিয়ে জেগে উঠতে চেষ্টা করতে পারেন। তাঁরা জেগে উঠে, জাতীয় জাগরণের সূচনা করে, ঐতিহাসিক গৌরবের অধিকারী হতে পারেন। কেবল বাংলার শিক্ষক কেন, বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশকে ভালোবাসেন- এমন সকল বিষয়ের শিক্ষকেরাই চোখ খুলতে পারেন। সদিচ্ছা ও সাহস দরকার। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার সম্পর্কে শিক্ষকদের, লেখকদের, অভিভাবকদের ও শিক্ষিত লোকদের নীরব থাকা অন্যায়।

প্রথমে দরকার বৌদ্ধিক আন্দোলন- অগ্রসর চিন্তার বিবেকবান ব্যক্তিদের জাতীয় লক্ষ্য নির্ণয়ের ও জনমত গঠনের জন্য প্রচার আন্দোলন। তারপর দরকার নেতৃত্ব সৃষ্টি ও গণজাগরণ। লক্ষ্য স্থির করে গণআন্দোলনে যাওয়া সমীচীন। ইংলিশ ভার্সন জাতি ও জনগণের জন্য ক্ষতিকর। এজন্য দেশবাসীর কর্তব্য এই সরকারি ব্যবস্থাকে ব্যর্থ করে দেয়া। এটি কোনো কঠিন কাজ নয়। ছেলেমেয়েদের বাংলা মাধ্যমে পড়তে দিন এবং বাংলা মাধ্যমকে উন্নত করার জন্য জনমত গড়ে তুলুন, সরকারকে সুপরামর্শ দিন। খোঁজ নিতে গেলে দেখা যায়, বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার চেয়ে ইংলিশ ভার্সনের শিক্ষা বেশি খারাপ হচ্ছে। ইংলিশ ভার্সনকে সফল করতে হলে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা যুক্তরাজ্য থেকে শিক্ষক ও বিশেষজ্ঞ আনতে হবে। ব্যয়বহুল আরো অনেক কিছু করতে হবে। সরকার কি সে ব্যবস্থা করবে? যাঁরা ছেলেমেয়েদের ইংরেজি মাধ্যমে শেখাতে চান, তাঁদের জন্য তো ব্রিটিশ সরকার ব্রিটিশ কাউন্সিলের মাধ্যমে বাংলাদেশে ‘এ লেভেল’ ‘ও লেভেল’ চালিয়ে যাচ্ছে। ভালো শিক্ষার জন্য ছেলেমেয়েদের যুক্তরাষ্ট্রে, যুক্তরাজ্যে ও ভারতে ভর্তি করারও সুযোগ আছে। কিছু লোক সে সুযোগ গ্রহণ করছেন। এসবের অতিরিক্ত ইংলিশ ভার্সন কেন?

বর্তমানে পৃথিবীতে বাংলাভাষী মানুষের সংখ্যা ত্রিশ কোটির মতো। ইউনেস্কোর হিসাব অনুযায়ী পৃথিবীর ভাষিক জনগোষ্ঠীসমূহের মধ্যে বাংলাভাষীদের স্থান চতুর্থ। দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হয় এমন ভাষার সংখ্যা গোটা পৃথিবীতে দুইশর মতো। বাংলাভাষীরা বাংলাদেশ, পশ্চিমবাংলা, আগরতলা, মিজুরাম ও পার্শ্ববর্তী আরো কিছু এলাকার বাসিন্দা। অসমিয়া ও ওড়িয়া ভাষা শব্দভাণ্ডার ও রূপ-রীতির দিক দিয়ে বাংলা ভাষার খুব কাছাকাছি। বাংলা ও অসমিয়া ভাষার বর্ণমালা প্রায় এক। বাংলাভাষীদের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতি দরকার। বাংলা ভাষাকে রক্ষা করে ও সমৃদ্ধ করে চলার আকাক্সক্ষাকে বাংলাভাষী সকলের মধ্যেই শক্তিশালী করা দরকার।

আইস্টাইনের এটি উক্তি দিয়ে শেষ করছি : ওঃ রং বংংবহঃরধষ ঃযধঃ ঃযব ংঃঁফবহঃ ধপয়ঁরৎব ধহ ঁহফৎংঃধহফরহম ড়ভ ধহফ ধ ষরাবষু ভববষরহম ভড়ৎ াধষঁবং. ঐব সঁংঃ ধপয়ঁরৎব ধ াধষরফ ংবহংব ড়ভ ঃযব নবধঁঃরভঁষ ধহফ ড়ভ ঃযব সড়ৎধষষু মড়ড়ফ. ঙঃযবৎরিংব যব, রিঃয যরং ংঢ়বপরধষরুবফ শহড়ষিবফমব, সড়ৎব পষড়ংবষু ৎবংবসনষবং ধ বিষষ ঃৎধরহবফ ফড়ম ঃযধহ ধ যধৎসড়হরড়ঁংষু ফবাবষড়ঢ়বফ ঢ়বৎংড়হ.

জীবন-জীবিকার জন্য শিক্ষা অপরিহার্য; তার সঙ্গে মানবিকীকরণের (যঁসধহরুধঃরড়হ ড়ভ সধহ রহ ংড়পরবঃু) শিক্ষাও অপরিহার্য। সকলেই সৃষ্টিশীল হয় না, কেউ কেউ সৃষ্টিশীল হয়। বাংলাদেশকে উন্নতি করতে হলে রাষ্ট্রব্যবস্থায় ও সমাজে সৃষ্টিশীলদের আত্মবিকাশের সুযোগ রাখতে হবে।

ঈদ সাময়িকী ২০১৬'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj