বাজেট ২০১৬-১৭ এবং বাংলাদেশের রাজনীতি

মঙ্গলবার, ২ আগস্ট ২০১৬

বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক বক্তব্যগুলোর সঙ্গে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের ঘোষিত দেশের জাতীয় বাজেট কতটুকু মানানসই? অনেক আগে আমেরিকান পলিটিক্যাল সায়েন্স এসোসিয়েশনের (১৯৮৫-৮৬ মেয়াদে) প্রেসিডেন্ট আরন ওয়াইল্ডাভস্কি (১৯৬১) বলেছিলেন, ‘অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নয়, বাজেট সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত মূলত রাজনৈতিক।’ ওয়াইল্ডাভস্কি বিশ্বের খ্যাতনামা বাজেট তাত্তি¡কদের অন্যতম। সূচনার প্রশ্নটি বিবেচনার আগে দেশে চলমান রাজনৈতিক কথকতা বা বক্তব্য সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করা সমীচীন। বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক কথকতাগুলোকে আমরা দু’ভাগে ভাগ করতে পারি। একটি হচ্ছে, বর্তমানে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোট সরকারের বক্তব্য। সরকারের মতাদর্শগত চিন্তা-চেতনা হচ্ছে দেশকে সত্যিকার ‘সোনার বাংলা’ হিসেবে গড়ে তোলা। ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ যে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছিল সেটিকে ‘চার্টার ফর চেইঞ্জ’ বা ‘পরিবর্তনের সনদ’ নামে আখ্যায়িত করা হয়েছিল। যার লক্ষ্য দেশের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি পরিবর্তন করে দেশটিকে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত করা। এই লক্ষ্যে ইতিমধ্যেই, সরকার কর্তৃক গৃহীত পদক্ষেপসমূহের সুফল আমরা দেখতে পাচ্ছি। আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ‘রোল মডেল’ হিসেবে গণ্য হচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিশীল চেতনা তথা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ অনুযায়ী দেশ পরিচালিত হচ্ছে বলেই এটি সম্ভব হচ্ছে। বিশ্ব-পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বের স্বীকৃতি-স্বরূপ পুরস্কার পেয়েছেন। সম্প্রতি প্রতিবেশী কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার ২৪ জুলাই তারিখের শিরোনাম হচ্ছে, ‘সার্কে ভারতের পরেই বাংলাদেশ, রিজার্ভে পিছিয়ে পড়ল পাকিস্তান’। বাংলাদেশ ব্যাংকে রিজার্ভের পরিমাণ হচ্ছে ৩ হাজার কোটি ২০ লাখ ডলার। এই বক্তব্য এবং কার্যক্রমের ফলশ্রæতির পাশাপাশি আমরা দেখতে পাই ‘সরকারবিরোধী রাজনীতিকদের বক্তব্য’। সরকারবিরোধী রাজনীতিকদের মধ্যে আবার, দৃশ্যত, জাতীয় সংসদের সদস্যভুক্ত রাজনীতিক এবং জাতীয় সংসদের সদস্য নয় এবং সরকারি দলের সদস্যও নয় এমন রাজনীতিকদের বক্তব্য। জাতীয় সংসদের সদস্য নয় এবং আওয়ামী লীগের সদস্যও নয়, এমন ধরনের রাজনীতিকদের মধ্যে আবার প্রধানত তিন ধরনের রাজনীতিক আছেন। এক ধরনের রাজনীতিক আছেন তারা সরকারবিরোধী এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতারও বিরোধী। আর এক ধরনের রাজনীতিক আছেন, তারা সরকারবিরোধী কিন্তু দেশের স্বাধীনতার পক্ষে। সর্বশেষ ধরনের রাজনীতিক, অর্থাৎ সরকারবিরোধী কিন্তু দেশের স্বাধীনতার পক্ষে, এ ধরনের রাজনীতিকদের মধ্যে আবার দুই ধারা আছে। কেউ কেউ আছেন, তারা সরকারবিরোধী এবং দেশের স্বাধীনতায়ও বিশ্বাস করেন কিন্তু একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীদের সঙ্গে একাট্টা। মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধের শক্তির কাঁধে হাত বা পা রেখে অথবা হাতে কিংবা পায়ে ধরে এরা ক্ষমতার মসনদে আসীন হতে আগ্রহী। এই শেষের শ্রেণির চেষ্টাতেই নির্বাচনের জন্য দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু হয়েছিল! খোলাসা করে না বললেও এটি বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বিয়োগান্তক পরিণতি এই শ্রেণির রাজনীতিকদেরই সৃষ্টি! এরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুফলভোগী অথচ মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিরোধী শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলে, এ ধরনের রাজনীতিক বা অবসরপ্রাপ্ত আমলা-কাম-রাজনীতিক কি শুধু বিএনপি শিবিরেই আছেন? উত্তরটা হচ্ছে ‘না’! এই ধরনের রাজনীতিক ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেও আছেন! বর্তমান সরকারের একজন প্রভাবশালী তরুণ প্রতিমন্ত্রীর একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস দেখে এই ‘অনুকল্পটি’র সত্যতা কিছুটা উপলব্ধি করা যেতে পারে। ‘সাপে পেচিয়ে ধরার’ কাহিনী বলছিলেন তিনি!

রাজনীতির চলমান এসব কথকতার সারমর্ম হচ্ছে, ‘উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে নেয়া’ এর বিপরীতে, প্রতিটি কর্মকাণ্ডে সরকারকে বাধা দেয়া এবং সম্ভব হলে টেনে-হিঁচড়ে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়া। সরকার পক্ষের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, এবং এর বিপরীতে, সরকারের বিপক্ষের রাজনীতিকদের ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড সমর্থিত কথাবার্তা। এই শ্রেণির রাজনীতিকরা যে কোনো উপায়েই হোক সরকারকে নাস্তানাবুদ করে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে ক্ষমতা দখল করতে চায়। দৃশ্যত এরা ক্ষমতাশালী না হলেও নিঃসন্দেহে প্রভাবশালী। রাজনীতির দুই ধারার এই দ্বা›িদ্বক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেট অনুমোদিত হয়েছে। ১ জুলাই ২০১৬ সাল থেকে বাস্তবায়নের কাজ শুরু হওয়া বাজেট সম্পর্কে ২৭ জুলাই বুধবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের উদ্যোগে ‘বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট ২০১৬-১৭’ শীর্ষক একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এতে এবারের বাজেট নিয়ে মোট তিনটি প্রবন্ধ উপস্থাপিত হয়। প্রথম প্রবন্ধটির শিরোনাম ‘ন্যাশনাল বাজেট ২০১৬-১৭ : দ্য পার্সপেক্টিভস অব গুড গভর্নেন্স ইন বাংলাদেশ’, দ্বিতীয় প্রবন্ধের শিরোনাম, ‘এনভিসনিং এন্ড এনভিছেজিং অ্য ওয়েলফেয়ার স্টেট ফোকাস অন দ্য ন্যাশনাল বাজেট ২০১৬-১৭ এবং সর্বশেষটির শিরোনাম, ‘বাজেট রি এলোকেশন ইন এডুকেশন : অ্যান অ্যানালাইসিস’। দেশে সুশাসন, সমাজসেবা খাতে বাজেট বরাদ্দ, শিক্ষা খাতে অধিকতর ব্যয় বরাদ্দ প্রভৃতি সবই বর্তমান সরকারের ‘রাজনৈতিক অঙ্গীকারের’ ফলশ্রæতি। সুশাসন, উত্তম বাজেট এবং উন্নয়ন প্রচেষ্টার সফলতা বর্তমান সরকারের ‘রাজনীতির’ গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য ‘উপাদান’। রাজনীতি সম্পর্কে এই ধারণা আমরা পেতে পারি ডেভিড ইস্টন (১৯১৭-২০১৪) ও হ্যারল্ড ডি. ল্যাসওয়েলের (১৯০২-১৯৭৮) সংজ্ঞা থেকে। ডেভিড ইস্টন (১৯৬৫) ‘রাজনীতিকে’ সংজ্ঞায়িত করেছেন, ‘সম্পদ বা মূল্যের কর্তৃপক্ষীয় বরাদ্দ’ হিসেবে, অপর পক্ষে, ল্যাসওয়েল (১৯৩৬), ‘কে, কী, কখন এবং কীভাবে পায়’ সেভাবেই ‘রাজনীতিকে’ বুঝেছেন। অপর পক্ষে, আমেরিকান পলিটিক্যাল সায়েন্স এসোসিয়েশনের ১৯৮৫-৮৬ মেয়াদের প্রেসিডেন্ট আরন ওয়াইল্ডাভস্কি (১৯৬১) বাজেট সম্পর্কে বলেছেন, ‘যখন একটি প্রক্রিয়া ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, সংস্কৃতি এবং সংঘাত প্রভৃতি যুক্ত করে তখন এটি জাতীয় রাজনৈতিক জীবনের বিশাল একটি অংশ ধারণ করে।’ বস্তুত পক্ষে, অন্যান্য বারের মতো ২০১৬-১৭ অর্থবছরে জাতীয় সংসদে অনুমোদিত বাজেটও বাংলাদেশের জাতীয় রাজনৈতিক জীবনে বিশাল একটি অংশ ধারণ করে আছে। স্বাধীন বাংলাদেশে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ অঙ্কের ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকার বাজেটের প্রেক্ষাপট হচ্ছে আগেই যেমনটি উল্লেখ করা হয়েছে, এই বাজেটটি স্বাধীন বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বাজেট। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাজেট ঘোষণার সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে, বিগত সাত বছরে বাংলাদেশ অভাবনীয় আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। আর এই সাত বছর যাবৎ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অব্যাহতভাবে ক্ষমতায় আছে। এই মেয়াদে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস্/এমডিজি)অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশ উন্নয়নের অনন্য উচ্চতা অতিক্রম করেছে। যা এর আগে আর কখনো দেখা যায়নি। সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তাৎপর্যপূর্ণ অর্জন বাংলাদেশকে অধিকতর বৃহৎ, সাহসী ও উচ্চাকাক্সক্ষী টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (সাসটেইন্যাবল ডেভেলপমেন্ট গোলস/এসডিজি) নির্ধারণে উৎসাহিত করেছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭০তম অধিবেশনে বাংলাদেশসহ ১৯৩টি দেশ ১৭টি চূড়ান্ত লক্ষ্য এবং ১৬৯টি লক্ষ্যমাত্রাসহ ২০১৫ উত্তর এসডিজি অনুমোদন করেছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে এসডিজি প্রণয়ন ও অনুমোদনে বাংলাদেশ মূল ভূমিকা পালন করেছে। উল্লেখ্য, ড. কাজী খলিকুজ্জমান আহমদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ দল প্রথমে ১১টি চূড়ান্ত লক্ষ্য ঠিক করেছিল। বাংলাদেশের এই প্রস্তাবের ফসল হচ্ছে জাতিসংঘ কর্তৃক অনুমোদিত ১৭টি এসডিজি। বাংলাদেশের সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় এসডিজি সন্নিবেশিত করা হয়েছে। এর জন্য ইতোমধ্যে, মন্ত্রণালয়/বিভাগওয়ারি চূড়ান্ত-লক্ষ্য চিহ্নিত করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় এসডিজি বাস্তবায়নের নিমিত্তে অ্যাকশন প্ল্যান তৈরির কাজ চলমান থাকার কথা উল্লেখ করেছেন।

২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত দেশে পরিণত করার মহাপরিকল্পনার সমর্থনসূচক ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতার শিরোনাম ছিল ‘মার্চিং টুওয়ার্ডস গ্রোথ, ডেভেলপমেন্ট এন্ড ইক্যুইট্যাবল সোসাইটি’। উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে কৌশল হিসেবে চারটি বিষয়ের ওপর মূলত গুরুত্ব দেয়া হয়েছে, সামষ্টিক-অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, মাথাপিছু মোট জাতীয় আয়ের (জিএনআই) বিকাশ বৃদ্ধি করা, উচ্চতর উপার্জনের মুনাফা আরো সর্বসমেত (ইনক্লুসিভ) করা এবং টেকসই ও পরিবেশ-বান্ধব অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা।

বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকা দিয়ে যে বাজেটের শুরু হয়েছিল সেই বাজেটের আকৃতি এখন বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়ে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকায়। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেট ছিল ২ লাখ ৯৫ হাজার ১০০ কোটি টাকার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) পরিমাণ ধরা হয়েছে ১৯ লাখ ৬১ হাজার ১৭ কোটি টাকা। এটি গত বছর ছিল ১৭ লাখ ২৯ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের মোট ট্যাক্স রাজস্ব ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪২ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক রাজস্ব আদায় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৩ হাজার ১৫২ কোটি টাকা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ব্যতীত রাজস্ব আদায় ধরা হয়েছে ৭ হাজার ২৫০ কোটি টাকা, এবং নন্-ট্যাক্স আদায় ধরা হয়েছে ৩২ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা। মোট ২ লাখ ৪২ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হিসাব ধরে, মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৪০ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। মোট ঘাটতি হচ্ছে ৯৭ হাজার ৮৫৩ কোটি টাকা। প্রাক্কলিত ঘাটতি সংকুলান বাইরের উৎস থেকে ধরা হয়েছে ৩৬ হাজার ৩০৫ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আসবে ৬১ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকা। এই ৬১ হাজার ৫৪৮ কোটি টাকার মধ্যে ব্যাংকিং উৎস থেকে আসবে ৩৮ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা এবং অবশিষ্ট ২২ হাজার ৬১০ কোটি টাকা আসবে নন-ব্যাংকিং উৎসসমূহ থেকে। কিন্তু ঘাটতি ব্যয় মিটানোর অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ব্যাংকিং খাত থেকে আদায় হওয়ার জন্য অনুমান করা হয়েছিল ৩৮ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা। কিন্তু সেখান থেকে আদায় হয়েছিল ৩১ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত অর্থবছরে প্রাক্কলিত অঙ্ক থেকে ৬ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা ব্যাংকিং খাত থেকে কম আদায় হয়েছিল। ব্যাংকিং খাত সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী এ এম এ মুহিত ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খল অবস্থাকে ‘সমুদ্র চুরির’ সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। এই অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতে এ বছরে ব্যাংকিং খাতে প্রদর্শিত ৩৮ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকার আদায়যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে। স্পষ্টভাবেই বলা যায়, ব্যাংকিং খাতের গভর্নেন্স সমস্যা প্রকট। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে রিজার্ভ চুরির ধাক্কা সামলিয়েও বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। রিজার্ভ চুরির ঘটনার পরে জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘রিজার্ভ চুরি নিয়ে বেশি চিন্তার কারণ নেই। নিশ্চিন্ত হওয়ার উপায় তিনি ব্যাখ্যা করেননি।’

বাংলাদেশের অব্যাহত অগ্রগতির পথে এই মুহ‚র্তের বড় বাধা হচ্ছে জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা। জঙ্গিবাদ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। ‘জন-নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা’ খাতকে শক্তিশালী করার জন্য ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৫০ হাজার নতুন পদ সৃষ্টি করা হবে এবং পুলিশ বাহিনীতে লোকবল নিয়োগ করার কথা বাজেটে বলা হয়েছে। এ ছাড়া বর্ডার গার্ড বাংলাদেশে ১০০ জন নারী সদস্য নিয়োগ দেয়া হবে। জননিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা খাতে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে প্রাথমিক বরাদ্দ ছিল ১৩ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা। এই খাতে সংশোধিত বাজেট দাঁড়িয়েছিল ১৭ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা। এ বছর অর্থাৎ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ খাতের বরাদ্দ চার হাজার কোটি টাকা বাড়িয়ে করা হয়েছে ২১ হাজার ৬২ কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, ‘অধিকন্তু, সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী এবং বর্ডার গার্ডের দক্ষতা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধি করার জন্য আমাদের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।’

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও রাজনীতির ক্ষেত্রে পাকিস্তানপন্থীদের অপতৎপরতাকে অতিক্রম করে বাংলাদেশ অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ যখন ৩ হাজার কোটি ২০ লাখ ডলার তখন পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, আনন্দবাজার পত্রিকার সংবাদ অনুসারে, বাংলাদেশের অর্ধেকেরও কম। রিজার্ভ বৃদ্ধির অন্যতম কারণগুলো হচ্ছে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের প্রেরিত রেমিট্যান্স। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দেখা গেছে, শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি কৃষি ও সেবা খাত থেকে অনেক বেশি। শিল্প খাতে যেখানে প্রবৃদ্ধি শতকরা ১০.১ ভাগ, সেবা খাতে ৬.৭ এবং কৃষি খাতে ২.৬ ভাগ। আবার দেখা যাচ্ছে ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানি বেড়েছে। এই সঙ্গে বেড়েছে প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ। সব মিলিয়ে শুধু যে রেমিট্যান্সের কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে এটি বলা যাবে না। সংবাদমাধ্যম বলছে, ‘বিশ্ব বাজারের চাহিদা সামাল দিতে ব্যতিব্যস্ত বাংলাদেশ। …বেশি নজর পোশাক শিল্পে। সেটাই ডলারের খনি। বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিরা দেশে ডলার পাঠাচ্ছে বেশি। উপার্জন বাড়ছে। রেমিট্যান্সের অঙ্কটা ঊর্ধ্বমুখী।’

বাংলাদেশের এই অভাবনীয় অগ্রগতিতে পাকিস্তান ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে উঠছে। আর সে কারণেই পাকিস্তান মদদ দিচ্ছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ধ্বংসাত্মক তৎপরতা চালাতে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে নিন্দা প্রস্তাব পাস হওয়া সেই ইঙ্গিতই দেয়। সব বাধা পেরিয়ে বাংলাদেশ এখন এগিয়ে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু কন্যা দেশরতœ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে এবং এগিয়ে যাবে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেট বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার আরো একটি দৃঢ় বার্ষিক পরিকল্পনা।

প্রফেসর ড. অরুণ কুমার গোস্বামী : চেয়ারম্যান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj