সাজেকের পাদদেশে কমলক ঝর্ণা

রবিবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৬

পাহার আর ঝর্ণা দেখার মজাই আলাদা। লোভটা সামলানো যায় না। তাইতো এসো ঘুরে দেখি বাংলাদেশ-এর শওকত হোসেনের আহ্বানে যখন সাড়া দিলাম তখন তিনিও একপটে আমাকে যুক্ত করে নিলেন। এবারের ভ্রমণ খাগড়াছড়ি হয়ে সাজেক; দীঘিনালা-লংগদু হয়ে রাঙ্গামাটি অনেকটা অন্যান্য ভ্রমণের চেয়ে আনন্দদায়ক তো বটেই এবং বিশাল অভিজ্ঞতার ভান্ডার।

ঢাকা থেকে ১২ জনের টিম রাতের বাসে রওনা দিয়ে আমরা ভোরেই পৌঁছে গেলাম খাগড়াছড়ি। শাপলা চত্ত্বরে নাস্তা সেরে চাঁন্দের গাড়ি চড়ে আলুটিলার রহস্যময় সুড়ঙ্গ, বৌদ্ধবিহার, রিছাং ঝর্ণা, অপু ঝর্ণা ও জেলা পরিষদের পার্ক দর্শন শেষে দীঘিনালা-বাঘাইছড়ি-কাসলং-মাসালং পথ ধরে সাজেকে। সমতল ভূমি শেষ হয়ে যখন পাহাড়ের চড়াই-উৎরাই শুরু তখনই পাল্টে যাচ্ছে দৃশ্যপট। যতই পথচলা ততই সবুজের সমারোহ। ভয়ংকর টানিং আর আঁকাবাঁকা সর্পিল পথ; প্রায় ৬০ ডিগ্রি খাঁড়া ঢাল বেয়ে নিচে নামা, কিংবা ওপরে ওঠার সময় যতটা রোমাঞ্চকর মনে হয়েছে ততটা মনে হয়েছে অ্যাডভেঞ্চার। সমতল ভূমি থেকে প্রায় ১৮শ ফুট উঁচুতে সাজেক ভ্যালি। এখানে মূলত রুইলুই ও কংলাকদের বসতি। রাঙ্গামাটির জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক একটি ইউনিয়ন। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী পাংখোয়াদের বসতি এখানে। বিকালে সাজেকের সূর্যাস্ত আর সকালে সূর্যদয় সেই সাথে মেঘের সাথে লুকোচুরি খেলা শেষে কিছু সময় রয়েছে আমাদের হাতে। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম সাজেকের পাদদেশে অবস্থিত কমলক ঝর্ণা দেখার। যার আরেক নাম পিদাম তৌসা। ঝর্ণায় যাওয়ার পথের প্রাথমিক ধারনা নিতে গিয়ে ছটকে পড়লেন আমাদের ৬ সদস্য। গহীন পাহাড়ী জঙ্গল, সোজা নিচে নেমে যাওয়া আবার উঠা, তার মধ্যে জোঁকের আক্রমণ তাই দ্বিমত। রুইলুইপাড়ার কংলাক সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পেছন দিয়ে পাহাড় থেকে সে পথটি নিচে নেমে গেছে এটা দিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু তবে সাজেকের ২ নাম্বার হেলিপ্যাডের পাশ থেকেও কমলক ঝর্ণায় যাওয়া যায়। রুইলুইপাড়ার বিতরাম দা’র সহযোগিতায় তারই বাবা শুদ্ধ বসন ও তার ৬ বছরের ছেলে মনেদ বাবুকে নিয়ে আমিসহ টিম লিডার শওকত হোসেন, সিদ্দিকুর রহমান, নেপাল পন্ডিত, কার্তিক বিশ্বাস ও ইরফান আহম্মেদ রওনা হলাম।

পাহাড়ের এলোমেলো ঝোপঝাড় সামনে থেকে সরিয়ে আমাদের যাওয়ার রাস্তা সুগম করতে ব্যস্ত গাইড শুদ্ধ বসন তারপাশেই ৬ বছরের শিশু মনেদ বাবু। দাদার সঙ্গে বায়না ধরেছে সঙ্গে যাবে তাই সেও এপথের যাত্রী। প্রায় ১৫ মিনিট হাঁটার পর কানে পর্দায় ভেসে আসলো পানি পড়ার ঝিরঝির শব্দ। মনে হলো এই বুঝি কমলক ঝর্ণা। না, গাইড থামিয়ে দিয়ে বললো এটা ঝিরি। পেছন থেকে ইরফান ভাইয়ের আহ্বান, গাইড দাদা আমরা নামতে পারছি না আমাদের লাঠির ব্যবস্থা করে দিন। সত্যিই খাড়া পথে লাঠি ছাড়া নামা দুস্কর। গাইডও কিছুটা বিরতি নিয়ে আমাদের সবার হাতে বাঁশের লাঠি ধরিয়ে দিল। হাঁটার মাঝে অনুভব করলাম শুধু পাহাড় থেকে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছি তো যাচ্ছি কিন্তু ওঠার সময় ওঠবো কি করে? মনের মধ্যে একটা অজানা আতংক রয়ে গেল। আধা ঘন্টার পথ পাড়ি দিয়ে আবিস্কার করলাম উড়ান থেকে বেয়ে আসা পাহাড়ী জলের। বিশাল প্রস্থ ঝিরি বেয়ে নিচের দিকে পানি নেমে যাচ্ছে ছোট বড় পাথরের বাঁধা ডিঙ্গিয়ে। ভেবেছিলাম যেদিক থেকে পানি গড়িয়ে আসছে সেদিকে ঝর্ণা হবে। কারণ এতো পানির স্রোত অবশ্যয় ঝর্ণা থেকে আসছে। না, এখানেও বিপত্তি, গাইড বললো, গড়িয়ে পড়া জলের পথ ধরেই আমাদের এগুতে হবে। একতো পিচ্ছিল পথ তার উপর বিশাল পাথরের গাঁয়ে নিজের গাঁ লাগিয়ে একটা পাথর থেকে নেমে আসা আবার আরেকটা পাথরে উঠা কি যে কষ্ট হচ্ছিল বলে শেষ করা যাবে না। একে অপরের সহযোগিতা নিয়েই এপথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। ঝিরি পথের মাঝখানে গাইড আমাদের থেমে দেয় বলে সামনে এগুনো যাবে না; কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, একটু সামনে থেকে পানি খাড়া নিচে পড়ে যাচ্ছে যা কমলক ঝর্ণা। তবে আমাদের আরেকটা পাহাড় বেড়ে উপরে উঠে আবার নিচে নামলেই ঝর্ণার দেখা পাবো। যে কথা সেই কাজ। আবার পাহাড়ে ওঠা। হঠাৎ আমার চোখ পড়লো নিজের পায়ের দিকে; জোঁকের আক্রমণ দেখে শরীরে শিহরণ জাগলো, মনে উদয় হলো ভয়। পেছনে থাকা সিদ্দিক ভাই তার কৌশল প্রয়োগ করে একটু শান্তি দিলো। কিন্তু একটা অজানা ভয় দেহের মধ্যে বাসা বেঁধে নিলো। জোঁকের অত্যাচার থেকে রক্ষা পায়নি সিদ্দিক ও ইরফান ভাই, গাইড শুদ্ধ বসন ও ৬ বছরের মনেদ বাবু। ভাগ্য ভালো সকাল থেকে বৃষ্টি হয়নি যদি বৃষ্টি হতো তাহলো জোঁকের প্রচুর আক্রমণ আমাদের সহ্য করতে হতো। প্রায় ৫৫ মিনিট পর দেখা পেলাম কমলক ঝর্ণার। শীতল বাতাসে বেসে আসা হিমেল জলের স্পর্শে দেহ-মন প্রশান্তি পেল। আধা ঘন্টা ঝর্ণায় দাপাদাপির পর পা বাড়ালাম ফিরতে পথের। নেমে যাওয়া পথে উঠে আসা যে কত কষ্টের তা অবলোকন করতে হলে পাড়ি দিতে হবে কমলক ঝর্ণার পথ। প্রায় তিন ঘন্টা সময় অতিবাহিত করে একটি ক্লান্ত দেহ নিয়ে নিজেকে পুনরায় আবিষ্কার করলাম রুইলুই পাড়ায়।

জেনে নিন

কিভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি বিভিন্ন বাস সার্ভিস আছে। ভাড়া ৫৫০-৬০০। ঢাকা থেকে শান্তি পরিবহনে দীঘিনালাও যাওয়া যায়। খাগড়াছড়ি শাপলা চত্ত্বর অথবা দীঘিনালা থেকে চাঁন্দের গাড়ি অথবা মোটরসাইকেলে সাজেক যাওয়া যায়। চাঁন্দের গাড়ির ভাড়া ৩ হাজার ৫০০-৪ হাজার টাকা (যাওয়া-আসা), মোটরসাইকেলে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা।

কোথায় থাকবেন

যতই দিন যাচ্ছে সাজেকে থাকার ব্যবস্থা উন্নত হচ্ছে। এখানে আদিবাসীদের ঘরেও রাত্রিযাপন করা যায়। জনপ্রতি ভাড়া পড়বে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। এছাড়াও খাগড়াছড়ি ও দিঘিনালায় থাকতে পারেন। খরচ পড়বে জনপ্রতি ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা।

কোথায় খাবেন

সাজেকে খাওয়ার জন্য আগে অর্ডার দিতে হবে। ইচ্ছা করলে আদিবাসীদের সহযোগিতায় নিজেদের ব্যবস্থায় রান্না করতে পারবেন।

ফ্যাশন (ট্যাবলয়েড)'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj