‘মডেল থানা’ মডেল নয়!

বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০১৬

ইমরান রহমান : রাজধানীসহ সারা দেশে যে লক্ষ্য নিয়ে মডেল থানাগুলো চালু করা হয়েছিল, দীর্ঘ দিন পার হয়ে গেলেও সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। অবস্থাটা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে, সাধারণ থানা থেকে মডেল থানাগুলোকে কোনোভাবেই আলাদা করা যায় না। মডেল থানাগুলোতে তুলনামূলকভাবে মহিলা সদস্যের সংখ্যা বৃদ্ধি করাসহ পুলিশ সদস্যকে অপারেশন, ইন্টেলিজেন্স ও ইনভেস্টিগেশনে আলাদা গ্রুপে বিভক্ত করার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। এমনকি অনেক থানা কাগজে-কলমে মডেল হলেও কর্তৃপক্ষ ‘মডেল থানার’ সাইনবোর্ড ব্যবহার করছেন না। ফলে জনসাধারণ প্রতিনিয়ত বিভ্রান্তিতে পড়ছেন এটাকি সত্যি মডেল থানা? এখানে গেলে পর্যাপ্ত সেবা পাওয়া যাবেতো? আবার এমন মডেল থানাও আছে যেখানে মহিলা আসামিদের রাত কাটছে ডিউটি অফিসারের রুমে। ভুক্তভোগী অনেকেরই অভিযোগ, মডেল থানার সেবার মান সাধারণ থানা থেকেও খারাপ। কথিত মডেল থানার পুরোটাই আসলে সাইনবোর্ড সর্বস্ব।

পুলিশ সদর দপ্তরের ডিসি (এডমিন) আশরাফুজ্জামান ভোরের কাগজকে বলেন, পর্যায়ক্রমে সব থানার সেবার মান বৃদ্ধি করার জন্য প্রথমে মডেল থানাগুলো চালু করা হয়েছিল। কিন্তু এখন শুধু মডেল থানাগুলোতে সেবার মান বাড়ানো হবে সেই হিসেবে কাজ করা হচ্ছে না। আমরা সব থানাতেই মডেল থানার মতো সেবা দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি। এটা একটি চলমান প্রক্রিয়া। সাম্প্রতিক লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, রাজধানীর সব থানায় জিডির সিস্টেম পরিবর্তন করা হয়েছে। সবাই অতি সহজে থানায় জিডি ও মামলা করতে পারবেন। সব থানায়ই হেল্প-ডেস্কের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কেউ কোনো অসুবিধায় পড়লে সেখান থেকে হেল্প নিতে পারবেন। আর সবচেয়ে বড় বিষয়- যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন থানাগুলোর সেবার মান সবচেয়ে ভালো। আগেও বলেছি, এটা একটি চলমান প্রক্রিয়া। সুতরাং একটু বিলম্ব হলেও সব থানার সেবার মান বাড়ছে।

২০০৭ সালে যে লক্ষ্যে রাজধানীসহ সারা দেশে মডেল থানা চালু হয়েছিল, তা পূরণ হয়নি। মডেল থানায় থাকার কথা ছিল আধুনিক ব্যবস্থা। থানায় ‘আগে এলে আগে পাবেন’’ ভিত্তিতে সেবা দেয়ার কথা বলা হয়েছিল। সুন্দর-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, বিশুদ্ধ খাবার পানি সরবরাহ ও আন্তরিক অভ্যর্থনা- এসব থানার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হওয়ার কথা ছিল। অথচ এসব অধরাই থেকে গেছে। বর্তমানে রাজধানীতে ৭টি মডেল থানা থাকলেও সবগুলোর অবস্থাই করুণ। সেখানে পুলিশি সেবার মান অন্য সাধারণ থানার মতোই। কয়েকটি মডেল থানায় দালাল ও তদবিরবাজদের দাপট লক্ষ্য করা গেছে। মডেল থানায় পরিচ্ছন্ন পরিবেশ থাকার কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। রমনা ও চকবাজার মডেল থানার চারিদিকে ময়লার স্ত‚প পড়ে গেছে। এমনকি থানা দুটির টয়লেটও ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত। শ্যামপুর মডেল থানায় জনবল সংকট চরমে। অকেজো হয়ে পড়ে রয়েছে বেশিরভাগ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। মিরপুর মডেল থানায় দালাল আর তদবিরবাজদের দাপট। ধানমন্ডি মডেল থানা দেখলে মনে হবে যেন একটি ‘ডাম্পিং গ্রাউন্ড’। অন্যদিকে, পল্টন মডেল থানার পুলিশ রাজনীতির পেছনে ছুটে ও গুলশান মডেল থানার পুলিশ ভিআইপিদের নিরাপত্তায় ব্যস্ত থাকায় সেবা বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া ভোরের কাগজকে বলেন, মডেল থানার মূল উদ্দেশ্যই ছিল নাগরিকদের উন্নত সেবা দেয়া। আমাদের প্রত্যেকটি মডেল থানায় সেই সুযোগ সুবিধা রয়েছে। নারীদের জন্য সব থানায় যথার্থ সংখ্যক নারী পুলিশ সদস্য রয়েছে। এছাড়াও সম্প্রতি থানায় জিডি করার জন্য কার্বন পেপারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর মাধ্যমেও সবাই অতি সহজে থানায় জিডি করতে পারবে। এটা মডেল থানার বৈশিষ্ট্যেরই একটি অংশ। এক প্রশ্নের উত্তরে ডিএমপি কমিশনার বলেন, যদি কোনো থানায় কোনো সমস্যা থেকে থাকে তাহলে সেটি ব্যক্তিগত সমস্যা। এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ পেলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আছাদুজ্জামান মিয়া আরো বলেন, প্রত্যেক থানায় সেবার মান যেকোনো সময় থেকে ভালো। প্রত্যেক জোনের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) তার আওতাধীন থানাগুলো পর্যবেক্ষণ করছেন। আশা করি, ভবিষ্যতে সেবার মান আরো বাড়বে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ভোরের কাগজকে বলেন, টাকা দিয়ে জিনিসপত্র কিনে দেয়া যায়। সেবাদানের মানসিকতা তো কেনা যায় না। জোর করে চাপিয়ে সেবা আদায়ের চেষ্টা করা বৃথা। এ জন্য মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অনেক, এ প্রত্যাশার জন্য আরো সময় প্রয়োজন। তবে আমরা আশা করছি অতিদ্রুত সময়ের মধ্যেই প্রত্যেক থানা সেবাদানের ক্ষেত্রে মডেল হতে পারবে।

মডেল থানার কার্যক্রম : মডেল থানার কার্যক্রমের মধ্যে অন্যতম ছিল থানায় মহিলা পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো। সব এএসআই এবং অপেক্ষাকৃত বেশি শিক্ষিত কনস্টেবলদের মামলার তদন্তের ক্ষমতা দেয়া। সব পদমর্যাদার কর্মকর্তার দক্ষতা বাড়ানোর জন্য দক্ষ জনবল ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ দেয়া। পুলিশ সদস্যদের অপারেশন, ইন্টেলিজেন্স ও ইনভেস্টিগেশনের জন্য আলাদা গ্রুপে বিভক্ত করা এবং নির্দিষ্ট সময় পর গ্রুপগুলোকে রদবদল করা। যেন সবাই তিনটি বিষয়ে পারদর্শী হতে পারেন। পুলিশ নিয়োগে স্বচ্ছতা এবং মেধাভিত্তিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। মডেল থানায় লাশ বহনের জন্য অ্যাম্বুলেন্স সরবরাহ করা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সুষ্ঠু তদারকির অভাবে এসব পরিকল্পনার কিছুই বাস্তবায়ন হয়নি।

মডেল থানাগুলোতে ২টি করে পিকআপ ভ্যান, ৫টি মোটরসাইকেল, সার্ভিস ডেলিভারি সেন্টারে বসার চেয়ার-টেবিল, কম্পিউটারসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়েছিল। সরেজমিনে দেখা গেছে, ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের জন্য পুলিশি সেবার কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন হয়নি। শুরুতে মডেল থানায় একটি সুন্দর কামরায় বসার ব্যবস্থা ও টয়লেটের ব্যবস্থা ছিল। ডিউটি অফিসারদের জন্য সাপোর্ট রুমে ওয়্যারলেস, ফ্যাক্স, কম্পিউটারের ব্যবস্থা করা হয়। সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্যে জেনারেটরের ব্যবস্থাসহ বিশুদ্ধ খাওয়ার পানির ব্যবস্থা, টয়লেটে পানি সরবরাহের জন্য টিউবওয়েল, পাম্প মেশিন ও ট্যাংকের ব্যবস্থা করার কথা থাকলেও বর্তমান বাস্তবতা ভিন্ন। রাজধানীর বেশিরভাগ মডেল থানার অবস্থা সাধারণ থানা থেকেও খারাপ।

প্রসঙ্গত, ২০০৬ সালের ৮ মার্চ রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে পুলিশ রিফর্ম প্রোগ্রামের (পিআরপি) আওতায় এক মতবিনিময় সভায় মডেল থানা চালুর ঘোষণা দেয়া হয়। এর এক বছর পর ২০০৭ সালে রাজধানীসহ সারা দেশে প্রথম ধাপে চালু হয় ১১টি মডেল থানা। এগুলো হচ্ছে, ডিএমপির ধানমন্ডি, উত্তরা (বর্তমানে উত্তরা পূর্ব থানা), নারায়ণগঞ্জ সদর, নরসিংদী সদর, ময়মনসিংহের ভালুকা, সিএমপির পাঁচলাইশ, পতেঙ্গা, ফেনী সদর, কুমিল্লা সদর, চাঁদপুর সদর ও যশোর সদর। দ্বিতীয় পর্যায়ে পিআরপির আওতায় দ্বিতীয় পর্যায়ে আরো ১৮টি মডেল থানার কার্যক্রম শুরু করার অনুমতি দেয়া হয়। এ ১৮টি হচ্ছে ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইল, জামালপুরের মাদারগঞ্জ, মাদারীপুর সদর থানা, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া, সিলেট বিভাগের জৈন্তাপুর ও সুনামগঞ্জ সদর, চট্টগ্রামের বাঁকলিয়া ও কক্সবাজারের টেকনাফ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর, পাবনার বেড়া, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর, পঞ্চগড় সদর, বাগেরহাটের ফকিরহাট ও কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা, রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের মতিহার থানা, বরিশালের উজিরপুর ও ভোলার সদর থানা।

এরপর জাপান সরকারের অর্থায়নে ২০০৯ সালে প্রথম দফায় চালু হয় মডেল থানা। এগুলো হলো- ডিএমপির শ্যামপুর, চকবাজার, সিএমপির কোতোয়ালি, কেএমপির কোতোয়ালি, কিশোরগঞ্জ সদর, টাঙ্গাইল সদর, ফরিদপুর সদর, শরীয়তপুর সদর, কুমিল্লা সদর দক্ষিণ, নোয়াখালী সদর, লক্ষীপুর সদর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর, চাঁদপুর সদর, খাগড়াছড়ি সদর, দিনাজপুরের পার্বতীপুর, নওগাঁ সদর, বাগেরহাট সদর, হবিগঞ্জ সদর ও সিলেট জেলার গোপালগঞ্জ। দ্বিতীয় দফায় ২৫টি থানাকে মডেল থানায় রূপান্তর করা হয়। এগুলো হচ্ছে ডিএমপির মিরপুর, রমনা, পল্টন, ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ, সাভার, ময়মনসিংহ সদর, নরসিংদীর শিবপুর, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা, গাজীপুরের শ্রীপুর, নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ, ফেনীর পরশুরাম, কক্সবাজার সদর, আরএমপির বোয়ালিয়া, নাটোর জেলার বাগাতিপাড়া, বগুড়ার গাবতলী, রাজশাহীর গোদাগাড়ী, কেএমপির সোনাডাঙ্গা, বিএমপির কোতোয়ালি, এসএমপির সদর ও মৌলভীবাজার সদর থানা।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj