রেজাউদ্দিন স্টালিনের শ্রেষ্ঠ কবিতা : বিরুদ্ধ স্রোতে যাত্রা

শুক্রবার, ২৪ মার্চ ২০১৭

** গ ও হ র গা লি ব **

কবি রেজাউদ্দিন স্টালিন যখন উচ্চারণ করেন-

আমার সময় গো-ক্ষুরের মতো বিভাজিত

মুহূর্তগুলো কালো কৃষকের পায়ের মতো ফাটা

(সূচনাপর্ব/ফিরিনি অবাধ্য আমি)

তখন তাঁর সম্পর্কে একটু সচেতন হতে হয় বৈকি। এবার ফেব্রুয়ারি ২০১৭ সালে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতা। রেজাউদ্দিন স্টালিনের বিবেচনায় সর্বমোট তিনশত তিনটি কবিতা স্থান পেয়েছে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ফিরিনি অবাধ্য আমি’ থেকে শুরু করে সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ ‘তদন্ত রিপোর্ট’ পর্যন্ত ৪৫টি কাব্যগ্রন্থ থেকে চয়ণকৃত গ্রন্থভুক্ত কবিতাগুলোর বাইরেও অনেক উৎকৃষ্ট কবিতা আছে আমার মনে হয়। কবি প্রকাশনীর আলোচ্য গ্রন্থটি শোভন ও সৌন্দর্যমণ্ডিত। মোস্তাফিজ কারিগরের আঁকা প্রচ্ছদেও আছে কাব্যিকদ্যুতি। কবিতার পাঠক হিসেবে আমার বয়স হাজার বছরেরও অধিক, আমায় পাড়ি দিতে হয়েছে দীর্ঘ প্রলম্বিত এক দুস্তর পথ। কাব্য যাত্রার দীর্ঘ এ পথ যখন সংকীর্ণ হতে হতে ডোবা কাঁদায় রূপ নিতে শুরু করেছে, তখন সহসাই এ হেন উচ্চারণ আমাদের হতচকিত করবে- সেটাই স্বাভাবিক। কারণ কবি চলমান সময়ের আসল রংকেই ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছেন তাঁর কবিতার ক্যানভাসে। রোমাণ্টিকতা, দ্রোহ, কল্পনাবিলাস কিংবা স্রোতের উল্টোদিকে যাত্রা না করে কবি বিজ্ঞানমনস্কভাবে তাঁর কাব্যাদর্শের পথে যাত্রা করলেন চলমান সময়ের সোসিও-ইকোনোমিক কনটেক্সটে। তিনি কবিতা লিখতে গিয়ে নিজেকে আবিষ্কার করলেন এমন এক ত্রিমাত্রিক বাস্তবতায়- যার একদিকে নিরন্ন অসহায় মানুষ, অন্যদিকে কর্পোরেট পুঁজিবাদী বৈশি^ক শিল্পায়ন। তাইতো কবি স্বীয়সত্তা ও সময়কে আবিষ্কার করে বলতে বাধ্য হন, ‘আমার সময় গো-ক্ষুরের মতো বিভাজিত’। আর সময়ের এ সঠিক শঙ্খধ্বনি শ্রবণ করার পারঙ্গমতা অর্জন করার মধ্য দিয়েই রেজাউদ্দিন স্টালিন হয়ে ওঠেন বিজ্ঞানমনস্ক কবি তালিকায় পুরোধা ব্যক্তিত্ব।

বিজ্ঞান তার স্বভাবগত কারণেই একটা অমোঘ নিয়মের অধীন- তেমনি কবিতাও একটা নিয়ম ভাঙার নিয়মের মধ্যে আবর্তিত। উচ্ছৃঙ্খল উষ্ণতা কোনভাবেই সার্থক শিল্পের জন্ম দিতে পারে না। সত্যিকার সাহিত্যসৃষ্টির জন্য চাই শৈল্পিক সৌসম্য সাধন। একটি সর্বাঙ্গসুন্দর কবিতা সৃষ্টির জন্য কাব্যিক অনুশাসনের মধ্যে থাকা খুবই জরুরি। একজন কবি তখনই বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে ওঠেন যখন তিনি কাব্যকলার সঠিক শৃঙ্খলগুলোকে মান্য করেন এবং সেই সাথে পূর্বের শৃঙ্খলগুলোকে ভাঙতে ভাঙতে আবিষ্কার করেন নতুন কোনো ফর্মের। এই দ্বিবিধ শর্তে রেজাউদ্দিন স্টালিন উতরে যান সঠিক শ্রমের পথ ধরে। সে কারণে স্টালিনের কবিতার বিজ্ঞানাগারে প্রতিটি শব্দই এই একটি কবিতার চরিত্র হয়ে দাঁড়ায়। তারা উপসারিত হয় কিংবা আওয়াজ তোলে। তারা আওয়াজ তোলে কখনো মৃদু, উচ্চ কিংবা মধ্যম সুরতন্ত্রীতে। এভাবেই স্টালিনের কবিতার বিজ্ঞানাগারে তৈরি হয় এক একটি নতুন কবিতা-

‘কিছু শব্দ বহু ব্যবহারে জীর্ণ হয়ে গেছে

আমি নিরক্ত শব্দগুলোকে

নতুন অর্থে জাগিয়ে দিতে চাই

যেমন কালো শব্দটির স্থলে লাল

সাদার জায়গায় হলুদ

… … … …

এবার তৈয়ারকৃত নতুন শব্দে

একটি সম্পূর্ণ কবিতা লিখতে চাই :

যন্ত্রণায় যন্ত্রণায় আগুনের পাতারা সাদা হয়ে গেছে।

সেই সাদা পাতার আড়ালে সবুজ বানরেরা আর্তনাদ করে। (নতুন শব্দের কবিতা) এভাবেই নতুন শব্দের ব্যবহারে পূর্বাপর অক্ষরবৃত্তের পথ ধরে তিনি আমাদের নিয়ে চলেন তাঁর স্বকীয় কাব্যভুবনের হরিৎ উপত্যকায়। আসলেই তাই- রেজাউদ্দিন স্টালিন কাব্যকলার সকল শৃঙ্খল মেনেই নির্মাণ করতে সক্ষম হয়েছেন তাঁর স্বতন্ত্র স্বর। দেয়াল দিয়ে ঘেরা আমাদের পারস্পারিক সম্পর্কগুলো যখন এক লবণাক্ত সমুদ্রময় বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো হয়ে উঠছে তখন কবি তাঁর সুচৈতন্য দ্বারা আমাদের দেয়াল ভাঙার গল্প শোনাতে চান। ‘সহে না জনতার জঘন্য মিতালীর মতো’- কবি স্টালিন তৈরি করেন সেই আপ্তবাক্য যাকে বলা যেতে পারে- ‘সহে না জনতার জঘন্য বৈরী’। তাইতো কবি এই বৈনাশিক বাস্তবতা থেকে ‘মীমাংসিত হতে চান এভাবে-

দেয়ালের গল্প আমি অনেক শুনেছি,

এইবার দিগন্তের গল্প কিছু বলি

… … … …

আমি জানি অত্যন্ত গোপনে আমার বন্ধুরা

সারারাত দেয়াল তুলছে

পাছে দখল হয়ে যাবে ভয়ে

… … … …

আমি দুই হাতে কান চেপে দিগন্তের দিকে দৌড়ে যাই

… … … …

দেয়ালের হাত থেকে উজ্জ্বল উদ্ধার পাবি

আয়, আমার বিস্তৃতির মধ্যে

অসীম অদৃশ্যময়তায়…।’

(দেয়াল ও দিগন্ত)

এই বক্তব্যে এসে কবির মনোভাবনা হয়েছে ঊর্ধ্বাচারী। বিশ^যুদ্ধের প্রচণ্ড ক্ষরদাহে বৈশি^ক অশান্তির বাস্তবতা দৃষ্টে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গীতাঞ্জলির মধ্যে যেমন ঊর্ধ্বাচারী শান্তির বাণী বিশ^মানবকে শুনিয়ে স্বস্তি দিয়েছেন; তেমনি আপাতদৃষ্টে পলায়নপর মনে হলেও কবি স্টালিন যেন গৌতম বুদ্ধের মতোই করজোড় মিনতি জানাচ্ছেন- শান্তি-শান্তি-শান্তি চাই। এভাবেই কবি সমকালীন বিদ্বেষের খোয়াড় ও নিমজ্জন থেকে উদ্ধার পেতে নিজেকে ইউলিসিস করে তোলেন।

সমাজে বসবাসকৃত মানুষ হিসেবে কোনোভাবেই আমরা আমাদের সামাজিক দায় এড়াতে পারি না। কবিরাও এর বাইরের কেউ নন; বরং তাঁরা একার্থে আরো বেশি সামাজিক। সাধারণ জনগণ ও লেখকদের ভূমিকা সম্পর্কে বলতে গিয়ে প্রমথ চৌধুরী একবার বলেছিলেন ‘লেখক মাত্রই সামাজিক, বাদবাকি আর সকলে পারিবারিক।’ (সাহিত্য খেলা)

পারিবারিক কিন্তু আত্মকেন্দ্রিকতার ঘুণ বর্তমানে সাধারণের চেয়ে লেখক-কবি-বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে তীব্রভাবে পরিদৃষ্টমান। আত্মপ্রচার, আত্মপ্রসার, আত্মপ্রাপ্তির প্রাসাদে বন্দি হয়ে আমাদের বেশিরভাগ কবিগণ আজ সমকাল ও সমাজ থেকে অনেক দূরে সরে গেছেন। ধসে যাওয়া এই প্রতিপাশের্^ রেজাউদ্দিন স্টালিন সচেতনভাবেই ঘুরে দাঁড়ান। সামাজিক দায়গুলোকে তিনি শ^াস গ্রহণের মতোই অনুভব করেন। হতাশা, অবিশ^াস ও ধ্বংসন্মুখ সমকালের মাঝে দাঁড়িয়ে তাই তাঁর আত্মোপলব্ধি-

‘সমকালে কালবেলা কালে কালে দীর্ঘ বেলা যায়

গড়ায় গভীরভাবে পাথরের উট

মরু ক্যাঁরাভার মতো আতঙ্ক উঠে আসে মানুষে মানুষে

মানুষ তবুও থাকে, থাকে

আমিই থাকি না শুধু পালাই ভেতরে

শামুকের সন্দেহে নিজেকে লিপ্ত হতে দিই

আমি কি মানুষ…’

(সমকালে কালবেলা)

এই যে কবির- ‘আমি থাকি না শুধু পালাই ভেতরে’ কিংবা আমি কি মানুষ’? উচ্চারণের মধ্য দিয়েই তিনি হয়ে ওঠেন কবি হিসেবে অনেক বেশি সামাজিক। সমাজের ঘূর্ণাবর্তের মধ্যে নিজেরে কষ্টের জায়গাটিকে চিহ্নিত করাই হলো সামাজিকতার নামান্তর। তবে কবি পালিয়ে যান না কিংবা তিরিশের কোন এক কবির মতো আত্মহননের পথ ও বেছে নেন না। বরং বিশ শতকের উপত্যকায় এসে নজরুল, সেজায়ার, লিওপোল্ড সেদর সেঙ্ঘর, নিকোলাস গিলেন, ভাসকো পোপা, পাবলো নেরুদার মতো ঘুরে দাঁড়ান এবং দ্রোহী কণ্ঠে উচ্চারণ করেন-

“রাজার পুত্র দেবদূত আর জনগণ কাঠ কাটে/ক্ষুধার্তদের কঙ্কাল ঘোরে নগরের তল্লাটে/অন্ধকার ও ভয় পায় শোনে হেকাটির আহ্বান/মূক হয়ে আছে মানবরচিত সীমিত সংবিধান/ভেসে আসে দূর দূতাবাস থেকে ড্রাকুলার বন্দনা এইভাবে দিন অন্ধের মতো চলতে পারে না পারে না…

(এইভাবে দিন চলতে পারে না)

ধসে যাওয়া, ক্ষয়ে যাওয়া রুগ্ণ প্রতিপার্শ্ব থেকে এ উচ্চারণে কবি হয়ে ওঠেন অনেক বেশি সমাজঘনিষ্ঠ। আমাদের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মুক্তবুদ্ধির ওপর অঘাতে, দেশীয় সংস্কৃতির মেলবন্ধন যখন এক নিদারুণ ঘূর্ণাবর্তের মধ্যে পতিত তখন স্বাভাবিকভাবেই বন্ধ্যা হতে বাধ্য আমাদের মেধা ও মনন। সমকালীন তথাকথিত রাজনৈতিক সচেতন কবিগণ যখন স্লোগানসর্বস্ব কবিতা লিখে এক ধরনের পাঠকদের মন কেড়ে নেয়ায় ব্যস্ত, তখন রেজাউদ্দিন স্টালিন আমাদের নতুনদের জেগে ওঠাকে চিহ্নিত করেন একজন দার্শনিকের প্রজ্ঞায়- ‘একটি দীর্ঘ রাত্রির উপত্যকায় শাহবাগকে উঠে আসতে দেখলাম। যেন বহুপথ পার হয়ে একটি মরু ক্যাঁরাভা আশ্রয় নিয়েছে তাঁবুতে/শহরের সমস্ত ফ্ল্যাট, সড়ক, বিপণি, প্রেসক্লাবে বৈদ্যুতিক আলোর ফিস্্ফাস্্ /সিন্ধু সারসের মতো সতর্ক সজাগ।’

(রাত্রির উপত্যকায় শাহবাগ)

এভাবেই চেতনার বিশ^াসী অনুষঙ্গে এবং নতুন শক্তির আত্মবোধনের চিহ্নায়নের সূত্রে রেজাউদ্দিন স্টালিন শিল্পের কাছে হয়ে উঠেন আত্মনিবেদিত। তাই সমকালীন চিন্তায় তাঁর কবিতার প্রেক্ষাপটে সময়ের এই বিনির্মাণ ভাবনা আমাদের অনুপ্রাণিত করে। সময় ও সমকালের প্রতি কবির এই সচেতনতার কারণেই আমরা তাকে চিহ্নিত করাবো একজন বৈশি^ক কবি হিসেবে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতো মহান কবিও শেষ পর্যন্ত বেদনাহত হয়ে বলেছেন-

‘আমার কবিতা জানি আমি

গেলেও বিচিত্র পথে হয় নাই সে সর্বত্রগামী

… … … …

যে আছে মাটির কাছাকাছি

সে কবির বাণী-লাগি কান পেতে আছি।’

(ঐক্যতান)

সহসাই সবাই সবকিছু পেরে ওঠে না।

তবে যাঁরা স্বীকার করেন তাদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা থাকে অটুট। এ কথা সত্য শেকড়ের সাথে সম্পর্ক রেখে চলা এবং প্রান্তিক মানুষের যন্ত্রণা-দাহ-সংক্ষোভের সাথে আত্মিক সম্পর্ক রেখে স্বকীয় কবিতার মেঠোপথ নির্মাণ করা একটি দুরূহতম কাজ। তবে রেজাউদ্দিন স্টালিন পেরেছেন- স্বভূমির দুঃখ-দুর্দশার সাথে সাথে বৈশি^ক বৈনাশিকতা তাঁর অন্তরে ঝরিয়েছে দু’চারিটি অশ্রæজল। বিশ^ায়ন ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট সব কাজে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো আজ দানবীয় চরিত্র পরিগ্রহ করেছে। তাদের আগ্রাসন ও নির্যাতিত বিশ^মানবের মাঝে দাঁড়িয়ে রেজাউদ্দিন তাঁর অবস্থানকে স্বচ্ছ করেন এভাবে :

‘প্যালেস্টাইন

তোমার ভস্মস্ত‚পের ভেতর থেকে উদগত শোকাশ্রæ পৃথিবীর বৃহত্তম নদী হতে পারে

হৃদয়ের শোকার্র্ত শিলাখণ্ড থেকে জন্ম নিতে পারে

হিমালয়, আলপস

কিন্তু কোনো অশ্রæময় নদীর কিনারে কিংবা শোকার্ত পর্বতের পাদদেশে

দাঁড়াবার ইচ্ছা আমার নেই, আমি তোমার, ভস্মস্ত‚পের ভেতর গিয়ে দাঁড়াতে চাই।

( তোমার ভস্মস্ত‚পের ভেতর থেকে)

এখানে কবি কোনো সৌখিন ত্রাণকর্তার ভূমিকা নিতে চান না; তিনি দুঃখী নির্যাতিতদের ভস্মস্ত‚পের ভেতরে নিজেও এক জীবাশ্ম হতে চান। রেজাউদ্দিনের এ প্রত্যয় আমাদের মুগ্ধ করে না, বরং আমাদের প্রতিনিয়ত সচকিত করে আর তার জীবনবাদিতা আমাদের ভাবায়, ভাবাতে বাধ্য করে। সময়কে সুই সুতো দিয়ে এফোড়-ওফোড় করে কোনো নকশীকাঁথা তৈরি সম্ভব নয়।

তবে সময়ের নিষ্ঠুর বেদিতে হৃদয়ের রক্ত ঢেলে নৈবেদ্য সাজানো সম্ভব। রেজাউদ্দিন স্টালিন সময়ের বেদিত হৃদয়ের রক্ত ঢালতে জানেন; রক্ত ঢেলে দিয়েই তিনি একদিন হয়ে উঠবেন ওই বেদিরই কোনো এক তির্যক উপলখণ্ড। তিনি তার সমকালের কাব্যসমুদ্রে বিরুদ্ধ স্রোতের যাত্রী।

রেজাউদ্দিন স্টালিনের শ্রেষ্ঠ কবিতা

প্রকাশক : কবি প্রকাশনী

প্রচ্ছদ : মোস্তাফিজ কারিগর

মূল্য : ৪৫০ টাকা

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj