নক্ষত্র ও মানুষের প্রচ্ছদ : সময়ের শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ

শুক্রবার, ৭ এপ্রিল ২০১৭

** হু মা য়ু ন ক বী র ঢা লী **

অমর একুশে বইমেলায় কবি হাসানআল আব্দুল্লাহর ‘নক্ষত্র ও মানুষের প্রচ্ছদ’ কাব্যগ্রন্থের ২য় সংস্করণ হাতে এলো। বইটির প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ২০০৭। দশ বছর পর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হলো ২০১৭-এ। ‘নক্ষত্র ও মানুষের প্রচ্ছদ’-এর পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩০৪। মূল্য ৪৫০ টাকা। ডাউস সাইজের এই বইয়ের, দশ বছর পরে হলেও যে, দ্বিতীয় সংস্করণ বেরিয়েছে, ভেবে প্রথমে অবাক হলেও, বইয়ের কবিতাগুলো যখন পড়তে শুরু করলাম, আমার ধারণা পাল্টে যেতে থাকলো। স্বীকার করছি, হাসানআল আব্দুল্লাহর কবিতা ২০১৪ সালের আগে পড়িনি। সে বছর নিউইয়র্কে বেড়াতে গিয়ে কবির গভীর সান্নিধ্য লাভ করি, একটা ভালোবাসার সম্পর্কও তৈরি হয়, এরপর ফেসবুকে, অনলাইনে, দৈনিকের পাতায়, লিটলম্যাগে যেখানেই পেয়েছি তাঁর কবিতা, বিচ্ছিন্নভাবে পড়েছি। এই প্রথম তাঁর মলাটবদ্ধ কোনো গ্রন্থ হাতে নিয়ে পড়ছি। যত পড়ছি অবাক হচ্ছি। ঘোরতর ঘোরে আটকে গেছি।

আমি কথাকার। শিশুসাহিত্য করি, গদ্যের সাথে যতটা সখ্য, কবিতার সঙ্গে ততটা নয়। তবে কবিতা পড়ি নিয়মিত। কিন্তু হাসানআল আব্দুল্লাহর কবিতা পড়ে কী এক ঘোরে আটকে যাই বারবার। কোনো এক বোদ্ধার লেখায় পড়েছিলাম, ‘কবিতা হলো দ্রষ্টার অনন্য মননদৃষ্টি ও শুদ্ধতম হৃদয়বৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম নান্দনিক শব্দসৌধ সৃষ্টি।’ কবিতা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত থেকে পেলাম, ‘একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট, ঘটনাকে রূপকধর্মী ও নান্দনিকতা সহযোগে কবিতা রচিত হয়। কবিতায় সাধারণত বহুবিধ অর্থ বা ভাবপ্রকাশ ঘটানোর পাশাপাশি বিভিন্ন ধারায় বিভাজন ঘটানো হয়।’ পক্ষান্তরে প্রখ্যাত সাহিত্যিক জ্যোতির্ময় দত্ত হাসানআল আব্দুল্লাহর আলোচ্য কাব্যগ্রন্থ সম্পর্কে লিখেছেন, কবিতার বিশুদ্ধ কাব্যগুণ মাপা যায় না। তা জাদু। ‘কাব্যের আঙ্গিকের মাপজোক হয়।’ বুদ্ধদেব বসু ‘কবিতা’ পত্রিকার একটি প্রবন্ধ সংখ্যার (বৈশাখ, ১৩৪৫) পরিকল্পনা করেছিলেন মূলত কবিদের গদ্য প্রকাশের উদ্দেশ্য নিয়ে। এরই সূত্রে জীবনানন্দ তাঁর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধটি লিখেছিলেন। যার নাম ‘কবিতার কথা’। এ প্রবন্ধের শুরু এই ভাবে :

‘সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি; কবি- কেননা তাদের হৃদয় কল্পনার এবং কল্পনার ভিতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার সারবত্তা রয়েছে এবং তাদের পশ্চাতে অনেক বিগত শতাব্দী ধরে এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক জগতের নব নব কাব্যবিকীরণ তাদের সাহায্য করেছে। কিন্তু সকলকে সাহায্য করতে পারে না; যাদের হৃদয়ে কল্পনা ও কল্পনার ভিতরে অভিজ্ঞতা ও চিন্তার সারবত্তা রয়েছে তারাই সাহায্যপ্রাপ্ত হয়; নানারকম চরাচরের সম্পর্কে এসে তারা কবিতা সৃষ্টি করবার অবসর পায়।’

এবার আসা যাক, হাসানআল আব্দুল্লাহর কবিতাকে কোন ধারায় ব্যাখ্যা করা যায়? কিংবা কোন ভাবধারায় তিনি লিখছেন? তাঁর কবিতার অন্তর্ভেদী রহস্য ও মর্মভেদ কি? একদম সহজ স্বীকারোক্তি হলো, আমার মতো নগণ্য কথাকারের পক্ষে হাসানআল আব্দুল্লাহর কবিতার যথার্থ মর্মার্থ উদ্ধার করা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে আমি আর কী বলবো, যেখানে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘ওঁর কবিতায় বিষয়কে নতুন করে দেখার চোখ আছে।’ যথার্থই বলেছেন তিনি। হাসানআল আব্দুল্লাহ বিষয়কে নতুন করে দেখেছেন বলেই প্রকাশ করতে পেরেছেন,

‘আমাকেও বেঁধে রাখে সারাটা প্রহর- বাঁকা হয়ে মেলে দিই নিজের শরীর;

পাথর আবেগে ধীর স্থির; মৃদু হাসে, তারপর শুষে নেয় প্রবহমান রক্তের

সাবলীল ক্ষীর- সমুদ্র তলের মসৃণতা নেমে আসে তার নিজের শরীরে।‘



‘অবিকল মানুষের পরিত্যক্ত হাড়, পচে যাওয়া চামড়ার বিনিময়

হয়ে যেতে পারে, হয়ে যায়। খাদ্য তালিকায় পেট্রোলিয়াম, আগুন

লেলিহান-ডলার, ইয়েনগুলো জীব ও জড়ের ব্যবধান তুলে দেয়।’

উল্লিখিত কাব্যাংশ দুটির বিষয়, ভাব, অন্তর্ভেদী ব্যঞ্জনা, রহস্যের গভীরতা খুঁজে পেতে হলে যে কোনো বোদ্ধা ও আলোচকের পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠায় কালির আঁচড় টেনে যেতে হবে। তবুও বিষয় ও ভাবার্থ উদ্ধারপর্ব শেষ হবে না। এটাই হচ্ছে প্রকৃত কবির কৃতিত্ব, মুন্সিয়ানা। তাই তো বিশিষ্ট কলমবোদ্ধা-গবেষক আবুল কালাম মনজুর মোরশেদ কবিকে নিয়ে লিখেছেন, ‘চিত্রকল্প, উপমাকে তিনি সততার সঙ্গে কবিতায় বেঁধে রেখেছেন ভাবের স¤প্রসারণ ঘটাতে। পরিচিত বিষয়কে নতুন রূপদান করাই একজন সচেতন কবির দায়িত্ব এবং সেখানেই তার শক্তিমত্তার প্রকাশ ঘটে। হাসানআল আব্দুল্লাহ এদিক থেকে সাফল্যের অধিকারী।’

আসলে কবিতাচর্চা হচ্ছে নিষ্ঠার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। কবি হাসানআল আব্দুল্লাহর কবিতা পড়লে তাঁর কাব্যনিষ্ঠা ও সততার সাক্ষাৎ পাই। যেমনটি তাঁকে নিয়ে বলেছেন কবি শামসুর রাহমান। তিনি জীবিতাবস্থায় হাসানআল আব্দুল্লাহর কাব্যনিষ্ঠা সম্পর্কে বলেছেন, ‘তিনি (হাসানআল আব্দুল্লাহ) কবিতার ব্যাপারে এতো নিবেদিত, এতো নিষ্ঠাবান যে প্রত্যেক কবির, প্রত্যেক সমালোচকেরই তাঁর এই গুণটির প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার কারণ আছে।’ আলোচিত কবির কবিতা পড়ে বাংলাসাহিত্যের এই সময়ের প্রধানতম কবির সাথে একমত না হয়ে উপায় থাকে না।

হাসানআল আব্দুল্লাহর কবিতা একবার পড়ে সমস্তটা অনুধাবন করা সম্ভব নয়। বারবার পড়তে হবে। তাহলে তাঁর কবিতার গভীরতা হয়তো কিছুটা আত্মস্থ করা সম্ভব। হাসানআল আব্দুল্লাহকে ধন্যবাদ এই সময়ের শ্রেষ্ঠ একটি কাব্যগ্রন্থ আমাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj