সাইবার হামলার শঙ্কায় বিশ্ব : র‌্যানসমওয়্যারের আক্রমণ বাংলাদেশেও >> সতর্কবার্তা প্রকাশ করবে টেলিভিশন

মঙ্গলবার, ১৬ মে ২০১৭

এস এম মিজান : বিশে^র দেড়’শরও বেশি দেশে কয়েক লাখ কম্পিউটার অচল করে দেয়া ‘চাঁদাবাজ’ ম্যালঅয়্যারের আঘাতের মাত্রা কমে এলেও আতঙ্ক পুরোপুরি কাটেনি এখনো। প্রথম দফা হামলার পর বিশেষজ্ঞদের সতর্কবাণী সত্ত্বেও সপ্তাহের শুরুতেই এশিয়া এবং ইউরোপের বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নতুন করে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তাই আবারো সাইবার হামলার আশঙ্কায় বিশ্বব্যাপী আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে শুরু হওয়া সাইবার হামলাকে বিভিন্ন দেশের সরকারের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে অভিহিত করেছে বিখ্যাত সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফট। সামনে আরো হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে। বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, সাপ্তাহিক ছুটি কাটিয়ে সোমবার লোকজন কাজে ফিরে কম্পিউটার চালুর পর ইমেইল চেক শুরু করলেই ম্যালঅয়্যারটির প্রভাব আরো দৃশ্যমান হয়ে উঠবে। বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া খবর অনুযায়ী ঠিক তাই ঘটেছে।

এদিকে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি পিসিতে ম্যালওয়্যারে আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এসব আক্রান্ত পিসির ফাইলে ঢোকা যাচ্ছে না। সেখানে ঢুকতে অর্থ দাবি করা হচ্ছে। এশিয়ান টিভির ১২টি কম্পিউটারে এ ধরনের ম্যালওয়্যার আক্রমণ হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন প্রতিষ্ঠানটির কারিগরি বিভাগের প্রধান পারভেজ চৌধুরী। এ ছাড়া আরো অন্তত ৩০ জনের আক্রান্ত হওয়ার খবর পেয়েছেন দেশের সাইবার নিরাপত্তা সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশের অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি পর্যায়ে পাইরেটেড সফটওয়্যার ব্যবহার হওয়ায় সামনে বড় ধরনের ঝুঁঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করছেন তারা। গতকাল সোমবারও এশিয়া ও ইউরোপের অল্প কিছু নতুন কম্পিউটার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। ফেইসবুক ভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা সহায়তাকারী সংগঠন ‘ক্রাইম রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস ফাউন্ডেশন’-এর উপদেষ্টা তানভীর হাসান জোহা বাংলাদেশেও আক্রান্ত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত ৩০ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের নিজস্ব কম্পিউটার আক্রান্ত হওয়ার খবর পেয়েছি এবং সেগুলো সমাধানও করে দেয়া হয়েছে।

ওয়ানাক্রাই নামের এ র‌্যানসাম অয়্যারটি গত শুক্রবার থেকে ইউজারদের সিস্টেমের দখল নিয়ে নেয়। ফলে স্থবির হয়ে পড়ে বিশ্বের ১৫০টিরও অধিক দেশের দুই লাখের বেশি কম্পিউটার। ‘মৃত’ কম্পিউটারগুলো পুনরায় ‘বাঁচিয়ে’ তোলার জন্য মাথাপিছু ৩০০ ডলার, বা সমপরিমাণ অর্থ ‘মুক্তিপণ’ দাবি করা হয় আক্রমণকারীদের পক্ষ থেকে।

বিবিসির বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন হ্যাকারদের দাবি মেনে কম্পিউটারের ‘ফাইল’ বাঁচাতে ইতোমধ্যেই ৩৮ হাজার ডলারের বেশি পরিশোধ করেছেন ইউজাররা। এ ছাড়াও হ্যাকাররা আগেই হুমকি দিয়ে রেখেছিল এই বলে, তিন দিন পার হলে কিন্তু ‘মুক্তিপণ’ বর্তমানের চেয়ে তিন গুণ বাড়ানো হবে।

সাইবার বিশে^র ইতিহাসে ভয়াবহতম এ হ্যাকার হামলায় রাতারাতি বিপর্যয়ের মধ্যে গিয়ে পড়ে শিল্পকারখানা, হাসপাতাল, চেইনশপ ও স্কুল-কলেজ-বিশ^বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম। হংকং ভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা কোম্পানি নেটওয়ার্ক বক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাইকেল গ্যাজেলি এ ব্যাপারে জানান, ইমেইলের মাধ্যমেই অধিকাংশ হামলার ঘটনা ঘটছে। বলা যায়, লোকজনের ইনবক্সে আরো অনেক ‘ল্যান্ডমাইন’ অপেক্ষা করে আছে। চীনের বৃহৎ জ্বালানি কোম্পানি পেট্রো চায়না জানিয়েছে, তাদের বেশ কিছু পেট্রল স্টেশনের পেমেন্ট সিস্টেম র‌্যানসামওয়্যারটির কবলে পড়েছে। চীনের পুলিশ ও ট্র্যাফিকসহ বেশ কয়েকটি সরকারি বিভাগ জানিয়েছে, তারাও এ সাইবার হামলার শিকার হয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ার স্কুল শিক্ষার্থীদের ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। তাইওয়ানের সরকার বড় ধরনের হামলা এড়াতে পেরেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশ^জুড়ে যেসব প্রতিষ্ঠান এবং সংস্থাকে হামলার টার্গেট করা হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছে জার্মানির রেল নেটওয়ার্ক ডুশ বান, স্পেনের টেলি কম্যুনিকেশন অপারেটর টেলিফোনিকা, মার্কিন ক্যুরিয়ার জায়ান্ট ফেডএক্স এবং রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয়। চাঞ্চল্যকর এ হামলার পেছনে কারা রয়েছে এখনো তা জানা সম্ভব না হলেও রুশ প্রেসিডেন্ট

ভøাদিমির পুতিন জানিয়েছেন, এর সঙ্গে কোনো সম্পৃক্তি নেই রাশিয়ার।

র‌্যানসমওয়্যার হচ্ছে পরিচিত ম্যালওয়্যার বা ক্ষতিকর কম্পিউটার প্রোগ্রাম, যা কম্পিউটার বা মুঠোফোন ব্যবহারে বাধা দিয়ে থাকে। এটি এক ধরনের র‌্যানসম বা মুক্তিপণ দাবি করার মতো ব্যাপার। নজিরবিহীন এই সাইবার হামলার পেছনের মূল হোতাদের ধরতে আন্তর্জাতিক তদন্তকারীরা কাজ শুরু করেছেন। এ বিষয়ে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও বিডিনগ বোর্ড অব ট্রাস্টির চেয়ারম্যান সুমন আহমেদ সাব্বির জানিয়েছেন, বাংলাদেশে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত কম্পিউটারে র‌্যানসমওয়্যার আক্রমণ করেছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত পিসিতে আক্রমণের বিষয়টি তিনি নিশ্চিত হয়েছেন। আক্রান্ত অনেক প্রতিষ্ঠান নিজের নাম প্রকাশ করতে চায় না। ব্যক্তিগত পর্যায়ে কিছু পিসি আক্রান্ত হয়েছে। তবে আক্রান্ত পিসির সঠিক সংখ্যা জানাননি তিনি।

বাংলাদেশ ও ভুটানে ক্যাসপারস্কি ল্যাবের ডিস্ট্রিবিউটর অফিস এক্সট্রাক্টসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা প্রবীর সরকার বলেন, ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বেশ কিছু পিসি ও প্রতিষ্ঠানে র‌্যানসমওয়্যারটি আক্রমণ করেছে। এটি বিশ্বের অন্যতম বড় সাইবার হামলার ঘটনা। উইন্ডোজের নিরাপত্তা ত্রুটি কাজে লাগিয়ে এ আক্রমণ চালানো হয়েছে বলে অ্যান্টিভাইরাসের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এটি কোনো হ্যাক নয়। যেহেতু আজ (গতকাল) থেকে আক্রমণের খবর পাওয়া যাচ্ছে, এ আক্রমণ আরো বাড়বে। ওয়ানাক্রাই কোনোভাবেই শেষ সাইবার হামলা হবে না। একের পর এক আক্রমণ হতেই থাকবে। সাইবার অপরাধীরা বসে নেই। থাকবেও না। আমাদের বুঝতে হবে যে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে হেলাফেলা করার আর কোনো সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের অধীন জাতীয় ডেটা সেন্টারের পরিচালক তারেক বরকত উল্লাহ জানান, বাংলাদেশের সরকারি পর্যায়ে অপারেটিং সিস্টেম হিসেবে লিনাক্স ব্যবহৃত হওয়ার সব সিস্টেম নিরাপদে আছে। আক্রমণ হয়েছে ঝুঁঁকিপূর্ণ উইন্ডোজ সফটওয়্যারচালিত ডিভাইস।

তারেক বরকতউল্লাহ বলেন, র‌্যানসমওয়্যার বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে গতকাল সোমবার সরকারের টেলিযোগাযোগ বিভাগে প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বিশেষ সভা হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ সাইবার ইমারজেন্সি রেসপন্স টিমের (সার্ট) পক্ষ থেকে করণীয় নিয়ে সার্টের ওয়েবসাইটে (সিআইআরটি ডটগভ ডটবিডি) তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ টেলিকম রেগুলেটরি কমিশন সবকটি টেলিভিশনে র‌্যানসমওয়্যার বিষয়ে সতর্কবার্তা প্রকাশ করবে।

প্রতিরোধে কী করণীয়? : ভাইরাস প্রতিরোধে কিছু সাবধানতা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছে সাইবার নিরাপত্তা সহায়তাকারী সংগঠন ‘ক্রাইম রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস ফাউন্ডেশন’-এর উপদেষ্টা তানভীর জোহা। ১. অপরিচিত কারও মেইল খোলা যাবে না। ২. পাইরেটেড কোনো সফটওয়্যার ব্যবহার করা যাবে না। ৩. সফটওয়্যার অথেনটিক না হলে ডাউনলোড করা যাবে না। ৪. গুগল প্লে স্টোর ছাড়া অ্যাপ নামানো ঠিক হবে না। এ ছাড়া আপডেটেড উইন্ডোজ ও সিকিউরিটি সফটওয়্যার ব্যবহার, সব তথ্য ও ফাইলের ব্যাকআপ রাখা এবং যে কোনো অপরিচিত মেইল, এটাচডমেন্ট ও ফাইল খোলা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন এক্সট্রেক্টের সিইও প্রবীর সরকার।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj