খুলনার চুকনগর গণহত্যা দিবস আজ : বধ্যভূমিতে স্মৃতিসৌধ ও জাদুঘর নির্মাণে ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ

শনিবার, ২০ মে ২০১৭

বাবুল আকতার ও ইমরুল ইসলাম, খুলনা থেকে : আজ শনিবার ২০ মে খুলনার চুকনগর গণহত্যা দিবস। ১৯৭১ সালের এ দিনে খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগরে হানাদার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ১০ হাজার নীরিহ মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে একসঙ্গে একই স্থানে এত লোককে হত্যা করার এ ঘটনা ছিল ইতিহাসে পাকিস্তান বাহিনীর নৃশংসতম, বর্বর ও বৃহৎ হত্যাকাণ্ড। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৪৬ বছর পার হলেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ১৫ খণ্ডের দলিলের পাতায় আজও লেখা হয়নি চুকনগর গণহত্যার ইতিহাস। স্বীকৃতি দেয়া হয়নি শহীদদের সন্তানদেরও। তবে এ বধ্যভূমিতে পূর্ণাঙ্গ একটি কমপ্লেক্স নির্মাণ করার জন্য উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে ৫ মে দক্ষিণাঞ্চলে রাজাকার বাহিনী গঠন করা হয়। এ বাহিনী গঠন হওয়ার পর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাধারণ মানুষের উপর শুরু হয় অমানুষিক নির্যাতন। এ নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে বাগেরহাট, খুলনা, বটিয়াঘাটা, দাকোপ, ফুলতলাসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার হাজারো মানুষ ভারতে যাওয়ার উদ্দেশে আশ্রয় নেয় ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর এলাকায়। ২০ মে সকাল ১০টায় খাবার খেয়ে চুকনগর বাজার, ভদ্রা নদী ও মালতিয়া গ্রামের পাতখোলার মাঠে বিশ্রাম নিতে থাকে এসব মানুষ। তাদের উদ্দেশ্য দুপুরের দিকে কেশবপুর দিয়ে সীমান্ত পার হয়ে ভারতের দিকে রওনা হবে। সকাল সাড়ে ১০টায় সাতক্ষীরা থেকে হানাদার বাহিনীর ২টি গাড়ি এসে চুকনগর বাজার ও পাতখোলার মাঠে হানাদাররা সেখানে জড়ো হওয়া হাজার হাজার নারী-পুরুষকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে। জমিতে কাজ করা অবস্থায় মালতিয়া গ্রামের অধিবাসী কৃষক চিকন আলীকে সর্বপ্রথম গুলি করে হত্যা করা হয়। পাকিস্তানি সেনাদের এ বর্বর হত্যাকাণ্ডের পর হাজার হাজার নারী-পুরুষের লাশ এখানে সেখানে পড়ে থাকে।

এ নির্মম হত্যাকাণ্ডে মা-বাবা নিহত হলেও লাশের স্ত‚পের মধ্যে ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় ৬ মাসের শিশুকন্যা সুন্দরী দাসী। লাশের বুকের উপর থেকে জীবিত অবস্থায় সুন্দরীকে এলাকাবাসী উদ্ধার করে নিয়ে আসে। খুলনা জেলা প্রশাসন সুন্দরীকে ডুমুরিয়া শিল্পকলা একাডেমিতে একটি চাকরি দিয়েছে। সুন্দরী দাসী জানান, ৬ মাস বয়সের পর থেকে মা-বাবাকে হারিয়ে খুবই কষ্টে অন্যের কাছে মানুষ হয়েছি। এখনো কষ্টের মধ্যে দিন কাটছে। আগে একা কষ্ট করেছি, পরে যখন গোটা পরিবার নিয়ে দুঃখের মধ্যে ভাসছি, ঠিক তখনই জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আমার একটি চাকরি হয়েছে। চোখের অশ্রæভেজা জলে সুন্দরী দাসী আরো বলেন, এখন আর আমার ইটের ভাটায় কাজ করতে হয় না। বর্তমানে ভালোই আছি। ২০১৩ সালে সুন্দরী দাসীকে বসতবাড়ির জন্য বধ্যভূমির পাশে ১১ শতক জমি বরাদ্দ দেয় খুলনা জেলা প্রশাসন।

সে দিনের এ নির্মম হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী চুকনগর গণহত্যা ’৭১ স্মৃতি রক্ষা পরিষদের সভাপতি ও চুকনগর কলেজের অধ্যক্ষ শফিকুল ইসলাম জানান, ‘আমাদের ৫ দফা দাবি আজও পূরণ হয়নি। আজও চুকনগর রয়েছে অবহেলিত।’ তিনি বলেন, ২০০৯ সালের ২০ মে গণহত্যা দিবসের স্মরণসভায় জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কর্নেল (অব:) শওকত আলীর কাছে চুকনগরে বৃহত্তম গণহত্যার স্মৃতিস্তম্ভ পৃথকভাবে তৈরিসহ ৫ দফা দাবি পেশ করে স্মৃতি রক্ষা পরিষদ। দাবিগুলোর মধ্যে ছিল- বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ১৫ খণ্ডের দলিলে চুকনগর গণহত্যার ইতিহাস যথাযথভাবে উল্লেখ করা, বধ্যভূমিতে জাদুঘর, লাইব্রেরি, কমপ্লেক্স নির্মাণসহ এখানে পর্যটন এলাকা গড়ে তোলা ও কেয়ারটেকার নিয়োগ, ২০ মে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনে সরকারি ঘোষণা প্রদান এবং চুকনগর বাজার থেকে বধ্যভূমি পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার পাকা সড়ক নির্মাণ। তিনি বলেন, ২০০৫ সালে মাত্র ৭ লাখ টাকা ব্যয়ে চুকনগর বধ্যভূমিতে একটি সৌধ নির্মাণ করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের ১৫ খণ্ডের দলিলের পাতায় এখনো চুকনগর গণহত্যার ইতিহাস লেখা হয়নি। যে কারণে এ দলিল ভুয়া হিসেবে প্রমাণিত হবে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

চুকনগর গণহত্যা ’৭১ স্মৃতি রক্ষা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক গোপাল কৃষ্ণ সরকার বলেন, এবার গণহত্যা দিবসে প্রতিশ্রæতি বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে। তিনি বলেন, বধ্যভূমিতে দর্শনীয় স্মৃতিসৌধ, জাদুঘর, পর্যটন কেন্দ্রসহ পূর্ণাঙ্গ একটি কমপ্লেক্স করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ কমপ্লেক্স নির্মাণের জন্য চলতি মাসের প্রথাম সপ্তাহে ৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। তিনি আরো বলেন, বধ্যভূমিতে কমপ্লেক্সের জন্য ১০ একর জমি অধিকরণের জন্য মন্ত্রণালয় নির্দেশ দিয়েছে। এ মাসের শেষের দিকেই নির্মাণের কাজ শুরু হবে। এদিকে গণহত্যা দিবস যথাযথভাবে পালনের দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির উদ্যোগ নিয়েছে চুকনগর গণহত্যা ’৭১ স্মৃতি রক্ষা পরিষদ। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে র‌্যালি, বধ্যভূমিতে ফুলের মালা দিয়ে ’৭১-এর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি, চুকনগর কলেজ প্রাঙ্গণে আলোচনা সভা।

এই জনপদ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj