Warning: include(../dfpbk1.php): failed to open stream: No such file or directory in /home/bhorerk/public_html/print-edition/wp-content/themes/bkprint/single.php on line 4

Warning: include(): Failed opening '../dfpbk1.php' for inclusion (include_path='.:/usr/lib/php:/usr/local/lib/php') in /home/bhorerk/public_html/print-edition/wp-content/themes/bkprint/single.php on line 4
প্রণয়…

প্রণয়…

শনিবার, ২০ মে ২০১৭

** ফজলে রাব্বী দ্বীন **

হেডমাস্টার ইমদাদুল আজ সকালে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা গেছেন। খবরটা শুনে বুকের ভেতরটাতে কেমন যেন চিনচিন করে ব্যথা অনুভব হলো। এটা কি সত্যি! নাকি পুরুটাই মিথ্যা? আচ্ছা মিথ্যাকে তো আমি জীবনের চেয়েও বেশি ঘৃণা করি তাহলে এখন সত্যটাকে মানতে পারছি না কেন? আর কেনই বা ভাবছি সত্যটা যদি মিথ্যা হয়ে যেত।

মৃত্যু কি তাহলে আমার ঘৃণার দৃষ্টিকে হীন আর পাসকে ফেল করে দিল! কিন্তু মনের ভেতর একের পর এক খটকা লেগেই থাকছে। ইমদাদুল স্যার কেন ট্রেনে কাটা পড়তে যাবেন? এটা কি অসতর্কের কারণে কোনো এক দুর্ঘটনা কিংবা কোনো ষড়যন্ত্রের কবলে পড়ে এমনটা ঘটল নাকি বাস্তব অর্থে এসবের কিছুই নয় বরং এটি একটি আত্মহত্যা?

ফেসবুকের ডাটা কানেকশন অফ না করেই ফোনটাকে দেয়ালের দিকে ছুঁড়ে মারলাম। টুকরো টুকরো হয়ে গেল ফোনের গøাস। এই ফেসবুক, সর্বনাশা এই ফেসবুকটার জন্যই যতসব আজগুবি খবর একের পর এক চোখের পর্দায় এসে হামাগুড়ি খায়। যখনই সেটা অন করি তখনই একটা না একটা দুঃসংবাদ চোখের সামনে এসে পড়বেই। তাও আবার ভিডিওগ্রাফি, ফটোগ্রাফিসহ। কিন্তু আজ খবরটাকে কিছুতেই মানতে পারছি না। না, এভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে না। আমাকে স্যারের বাড়ি যেতে হবে। তারপর ঘেঁটে দেখতে হবে কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা? আসলেই কারণটা কি?

বাড়িভর্তি মানুষের সমাগম। এ যে দেখছি বিয়েবাড়ি! এখানে আবার কার বিয়ে হচ্ছে? কুসুমের না তো! আর হতেই পারে। সেই ছোট মেয়েটা কি আর এখন ছোট আছে? কবে থেকে দেখি না।

আজ নিশ্চয় লাল বেনারসি শাড়ি আর কপালে টিপ পরে বধূ সেজে বসে আছে ঘোমটা দিয়ে। কিন্তু জানি না কেন জানি এমন ঠাণ্ডা দিনেও কপালের ঘামটা আমার চুয়ে চুয়ে শিরদাঁড়া দিয়ে ক্রমাগত নামছে। কি সুন্দর করেই না বিয়েবাড়িটা সাজানো হয়েছে। বিয়েবাড়ির প্রসঙ্গটা চলে আসতেই মনে হলো সেই ছয়মাস আগে স্যারের সঙ্গে আমার শেষ দেখাটা।

অপর্ণা ও কুসুম দুই মেয়ে স্যারের। এ যেন একই বৃত্তে দুটি ফুল।

কোনো এক নবান্নের দিনে একই সঙ্গে স্কুলে যাওয়া আসার গল্প লিখতে লিখতে ছোট মেয়ে কুসুমের হাত ধরে ফেলি। তারপর সাদরে আমন্ত্রণ জানাই ফাল্গুনকে। ফাগুনের আগুন দুজনার বুকের ভেতর ঢেউ তুলে। হু হু করে বইতে থাকে পুবালি বাতাস।

বড় সম্মানী হেডমাস্টারের ছোট মেয়েটার এ কি কাণ্ড! বলাবলি শুরু করে এলাকার মানুষ। আর আমি পরিণত হতে থাকি স্যারের দৃষ্টিতে বাজে ছেলে হিসেবে।

একদিন স্কুল থেকে ফাঁকিবাজের সূত্র ধরে আমাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিলেন ইমদাদুল স্যার। এত বড় স্পর্ধা আমার যে স্যারের মেয়ের সঙ্গে…ছি! ছি! এত সাহসই বা পেলাম কোথায়? সেই সাহসের নাম কি?

হাজার প্রশ্নকে ভেদ করে একদিন গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসি। আর ফাল্গুনের কুসুমকেও ভোলার চেষ্টা করে। কেননা ততদিনে বৈশাখের গান লেখা শুরু করে দিয়েছে কবিরা।

ছয় বছর পর ফেসবুকের কল্যাণে এসে হিমালয়ের সুউচ্চ সেই পাহাড় দেখার স্বপ্ন আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। খুঁজে পাই গলাধাক্কা দেয়া শ্রদ্ধেয় সেই ইমদাদুল স্যারকে। চৌদ্দ গ্রামের ভেতরে উনার মতো ভালো ডাকনাম আর কোনো স্যারই অর্জন করতে পারেনি।

যে পড়া ক্লাসে একদিন বুঝাতেন দ্বিতীয়ত সেই পড়া আর কোনোদিন কোনো ছাত্রের বুঝতে সমস্যা হতো না। যদিও ক্লাস নাইন থেকে স্যারের বুঝানো পড়া আর কোনোদিন শুনতে পাইনি তাতে কি! স্যারের শিক্ষা আজীবন হৃদয়ে গেঁথে আছে আমার।

স্কুল থেকে বের করে দেয়াটাও কি শিক্ষার মধ্যে পড়ে না? স্যারের জায়গায় আমি থাকলে তাই করতাম। কেননা এখন প্রতিষ্ঠিত আমি আর অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎকে বাস্তব চোখে দেখতে পাচ্ছি খেয়ালিমতো। অনেকদিন পর গ্রামে ফিরছি বলে খুবই আনন্দ লাগছিল কিন্তু হঠাৎ ফেসবুকে ঢুকেই এমন একটা আশ্চর্যকর দুঃসংবাদ দেখে সবকিছু গণ্ডগোল হয়ে যাচ্ছিল। শ্রদ্ধেয় স্যারের জন্য কিনতে যাওয়া সারপ্রাইজটা আর টাকা খরচ করে কিনতে হলো না।

বাড়ির ভেতর থেকে ক্রমাগত কান্নার আওয়াজ বিয়েবাড়ির পরিবেশটাকে একেবারে বিচ্ছিরি করে তুলেছে। কাছে গিয়ে শুনি বিয়েটা আসলে কুসুমের না, তার বড় বোন অপর্ণার।

কিন্তু অপর্ণা কোথায়? জানতে চাইলে ভিড়ের মধ্যে থেকে গলাভাঙা কণ্ঠে কেউ একজন বলে ওঠে- ‘ঐ সর্বনাশী, কলঙ্কিনীর জন্যই তো আজ এই দশা। ঘর পালাইয়া যাওয়ার আগে একবারের জন্যও কি তোর বাপের কথা মনে হইল না?’

ব্যাপারটা সাফসাফ পরিষ্কার হয়ে গেল এবার। তার মানে অপর্ণা এই বিয়েটাকে মেনে নিতে পারেনি। সে নিশ্চয় অন্য একটা ছেলেকে ভালোবাসত এবং তার হাত ধরেই বিয়ের রাতে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছে। আর এদিকে মেয়ের বাবা বরযাত্রীদের সামনে মুখ দেখাতে না পেরে ট্রেনে কাটা পড়ে আত্মহত্যা করেছে।

গল্পটা যেন শেষ হয়েও শেষ হতে চায় না আর প্রশ্নের নদীও শুকায় না টুপ করে। ঘরে তো বিয়ের বয়েসী আরেকটা মেয়েও রয়েছে তাকেও তো সে সময় পাত্রীর খাটে বসিয়ে মানসম্মানটা কোনোমতে রক্ষা করা যেত কিন্তু সেটা স্যার কেন করলেন না?

জবাবটা সেই ভিড়ের মধ্য থেকেই মিলে গেল, ‘কুসুম রাজি হয়নি।

মেয়েটা বিয়ের কথা শুনতেই পারে না। জোর করা হয়েছিল বলে দোকান থেকে বিষ কিনে এনে সবাইকে দেখিয়েছে।’

কিন্তু ও এমন করেছিল কেন? পুরো বাড়ির এত বড় একটা অসম্মান ঠেকাতে সে এইটুকু করতে পারল না। এখন কি বাপ- বোন হারিয়ে বিয়ের চেয়েও বেশি সুখ কপালে এলো? অবুঝ মেয়েটার আর বোঝ হলো না। তারই বা দোষ কি! ওর তো পছন্দ অপছন্দ থাকতে পারে। এই নিয়ে যে বাপ-বোন হারাতে হবে সে কে জানত আগে?

নিজের বাড়ির দিকে মুখ ঘোরাই। সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেছে। পাটিসাপ্টা আর খেজুরের রস নিয়ে সামনে আসে মা। কতদিন ধরে মায়ের হাতের এসব পিঠা খাই না। বাইরের দুনিয়াটা বড়ই অসহায় আর বিদঘুটে। ওখানে কোনো মায়ার বাঁধন নেই, নেই কোনো স্নেহ, প্রেম, ভালোবাসা, শ্রদ্ধা। ঠিক করেছি এখান থেকে আর কোথাও যাব না কোনোদিন। কিন্তু আজ মায়ের মুখটাও কেমন যেন মলিন মলিন; কোনো হাসি-ঠাট্টা নেই। মা তো কখনো এমন হয়ে থাকে না। প্রশ্নেরও কোনো উত্তর দিচ্ছে না।

পিঠা খেতে খেতে মায়ের হাত দু’টা হঠাৎ চেপে ধরলাম। জানতে চাইলাম কেন আমার সঙ্গে এমন আচরণ করা হচ্ছে?

‘কুসুমের জন্য বড্ড মায়া লাগছেরে। বেচারি মেয়েটা একেবারে এতিম হয়ে গেল। জানিস তুই যখন বাড়িতে ছিলি না প্রায় প্রত্যেকদিন আমার কাছে এসে বসে থাকত।

শুধু তোর কথা জিজ্ঞাস করত। কেমন আছিস, কোথায় আছিস, কবে আসবি? তুই তাকে ভুলে গিয়েছিস কিনা ইত্যাদি সব। এত লক্ষী একটা মেয়ে কখনো কোনোদিন দেখিনি বুঝলি? আর তোকে দেখে আমিও কেমন যেন চিনতে পারছি না। এই ছয় বছরে শহরে থেকে এভাবে বদলে গেছিস? আগে তো সারাদিন কুসুম কুসুম করে মাথা খেয়ে ফেলতি আর এখন বাড়িতে এসে একবারের জন্যও সেই মেয়েটার নাম নিচ্ছিস না। কেন? ওই মেয়েটা তোকে কি করেছে? ওকে এখন আর ভালো লাগে না তাই তো?’

মায়ের অভিযোগটা শুনে কিছুক্ষণের জন্য থমকে গেলাম। মা তো বদলে গেছে নিজেও। সেই ছোটবেলায় মনে পড়ে এমন একটা দিনেও মা যখন পিঠা বানিয়েছিল ঠিক সেইদিন কুসুমকে আমাদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে এসেছিলাম। সে দেখে মায়ের কি রাগ! ঝাড়–পিটা করে আমাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়েছিল। আর আজ আমি যখন সেই মেয়েটাকে নিয়ে কোনো কথা বলছি না তখন তো মনে হচ্ছে ছোটবেলার মতো এখন আমাকে ঝাড়–পিটা করে বাড়ি থেকে তাড়াবে।

ফিক করে একবার হেসে দিয়ে মাকে বললাম, ‘ওই মেয়েটাকে তাহলে সারাজীবনের জন্য তোমার কাছে এনে নিই? তাহলে আমার আর অত কথা শুনতে হবে না কি বল?’

অমানিশা রাতে হঠাৎ উঁকি দেয়া চন্দ্রের মুখখানি মায়ের বদনের সমরূপ। সেই কবে থেকে মেয়েটাকে দেখি না। গোধূলির বেণু নির্জনে আমায় পৌঁছে দেয় তালদিঘির কাছে। অপলক চোখে তাকিয়ে দেখি দুরন্ত এক মেয়ের ঘন কালো চুল। গাছের সঙ্গে ঠেস দিয়ে বসে আছে কোনো এক প্রতীক্ষিত সমকালের আশায়। ‘কুসুম’ শোক আর সুখে নদী বওয়া চোখ নিয়ে তাকায় আমার দিকে। সকল শঙ্কা টুটে যায়, তিমির গিয়ে মুছে তালদিঘির ওই পাড়ে। যেখানে অতীতরা থাকত।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj

Warning: fopen(../cache/print-edition/2017/05/20/22e9c0e19fabf3413d727014c9debf75.php): failed to open stream: No such file or directory in /home/bhorerk/public_html/print-edition/wp-content/themes/bkprint/single.php on line 218

Warning: fwrite() expects parameter 1 to be resource, boolean given in /home/bhorerk/public_html/print-edition/wp-content/themes/bkprint/single.php on line 219

Warning: fclose() expects parameter 1 to be resource, boolean given in /home/bhorerk/public_html/print-edition/wp-content/themes/bkprint/single.php on line 220