দুঃখরাশি

শনিবার, ২০ মে ২০১৭

** মো. ওবায়দুল হক **

দিনমজুর বাবার একমাত্র ছেলে ঊষার। অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। এসএসসি পরই পড়াশুনা ছেড়ে দিয়ে বিদেশ যাওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল। বাবার অনুরোধ রাখতে গিয়ে পড়াশুনা ছাড়া হলো না। বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্য বুকে নিয়ে এগিয়ে চলা। খুব সাধারণ চলাফেরা। নিজের চাহিদা কখনোই বাবার ওপর চাপিয়ে দেয় না। টিউশনি করে যে টাকা পায় তা দিয়েই কোনো মতে পড়ার খরচ চালায়। পাড়াগাঁয়ে বেড়ে ওঠা ছেলে ঊষার।

আজকাল ফেসবুক ওপেন করলেই দেখা যায় কালবৈশাখী ঝড়ের নির্দয় বার্তা। বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যাওয়া হাওরবাসীর আর্তনাদ। ওই কাতর মুখগুলোর চোখের জল যেন পৃথিবীটা কাঁপিয়ে দেয়। ঝড়-তুফানের খবর যখনই দেখে তখনই বাবার কাছে ফোন দিয়ে জানতে চায়, কেমন আছেন তারা। বাড়ির পাশের জমিটার কি অবস্থা? ধান কাটার আর কতদিন বাকি? সহজ-সরল বাবার সাদামাটা উত্তর, ‘আমরা ঠিক আছি। আমাদের কোনো সমস্যা নেই। চিন্তা করিস না। মন দিয়ে পড়াশোনা করিস।’

ভোরের কাক জানালার পাশে আমগাছে বসে কা কা করছে। ঘুম ভাঙার পর থেকেই মনটা আনচান করছে। বালিশের পাশে ফোনটা বাজছে। হাতে নিয়ে রিসিভ করতেই মায়ের কণ্ঠ, ‘বাজান, যদি পারস কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে বাড়িতে চলে আয়।’

মায়ের ভেজা কণ্ঠ যেন বুকটা নেড়ে ওঠে।

‘কেন, মা, কোনো সমস্যা?’

‘রাতে ঘূর্ণিঝড় হয়েছে! আমদের ঘরটা পড়ে গেছে!’

মায়ের কথাটা শুনে অবাক হয়ে যায় ঊষার!

‘ঊষার বাজান।’

‘মা, আমি এখনই রওনা দিতেছি।’ এই বলে ফোনটা রেখে সাব্বির, সাব্বির বলে কয়েকবার ডাকল।

খানিকক্ষণ পর সাব্বির বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে বলল, ‘কিরে কাপড় গোচ্ছাচ্ছিস কেন?’

‘দোস্ত, আমাকে এক্ষুনি বাড়িতে যেতে হবে।’

‘কিন্তু কেন? কোনো সমস্যা?’

ঊষার সবকিছু খুলে বলল, শুনে সাব্বিরের মনটাও খারাপ হয়ে গেল। ‘কি বলব দোস্ত, গরিবদেরই কপাল পুড়ে। ভাঙা পা’ই খাদে পড়ে।’ এই বলে ড্রয়ার থেকে কিছু টাকা এনে ঊষারের হাতে দিয়ে বলল, ‘নে। তোদের ঘর মেরামতের কাজে লাগাস।’

‘এগুলো তো তোর খরচের টাকা, তুই কি করে চলবি?’

‘আরে চলবে। সমস্যা নেই। আমার মতো তুইও তো পাড়াগাঁয়ের গরিব বাবার সন্তান। তুই চলতে পারলে আমি পারব না?’

‘ঠিকই বলছিস, আমি গরিব বাবার সন্তান বলেই আমাদের দুঃখ। এমন একটা পরিস্থিতিতে, একটা পরিবার কতটা অসহায় হতে পারে তা আমি জানি। দুঃখ-কষ্ট; অভাব-অনটনের প্রতিক‚লতার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছি; গরিবের দুঃখ উপলব্ধি করতে পারি।’

‘দোস্ত আসলে আমাদের গরিবদের ভাগ্যটাই এমন।’

‘যা, দেরি করিস না। দেখেশুনে যাস। আর হ্যাঁ, কোনো চিন্তা করিস না। ক্যাম্পাসে গিয়ে সবার সঙ্গে কথা বলে দেখি তোদের ঘরের ব্যাপারে কি করা যায়।’

২.

লঞ্চ থেকে নেমে গ্রামের পথে হাঁটা ধরে ঊষার। রাতে কত বড় ঘূর্ণিঝড় হয়েছে, তা আশপাশ দেখেই বুঝা যাচ্ছে। নদীপাড়ের কাশবন উপড়ে পথের মাঝে পড়ে আছে। গাছপালা সবকিছু এলোমেলো হয়ে আছে। ভেসে আসা কুচরিপানা ছুটছে ভাটির দিকে। কেমন যেন একটা মুমূর্ষু হাহাকার বিরাজ করছে! ঊষার হাঁটছে, পা যেন চলছে না। নিজেদের একমাত্র অবলম্বন দেড় বিঘা ধানের জমি। যে জমির ধান তাদের ঘরের বছরের ভাত হয়। আর বাবা টুকিটাকি কাজ করে যে টাকা পায় তা দিয়ে হাটবাজার করেন।

জমিটার পাশে দাঁড়িয়ে ঊষার। আধাপাকা ধানগাছ, ঘোলাপানিতে তলিয়ে গেছে। এই আধাকাঁচা ধান কাটা নিয়ে ব্যস্ত কৃষক। এই দৃশ্য দেখে বুকের ভেতরটা হু হু করে কেঁপে উঠছে। এই দুঃসময়ে বাবার পাশে দাঁড়ানোর মতো কোনো পা তার নেই। ঝড়ে পড়ে যাওয়া ঘর মেরামত করার জন্য অনেক টাকার দরকার। এ টাকা বাবা কোত্থেকে আনবে! ঋণ করতে হবে। এই ঋণের বোঝা বাবাকে কাঁধে নিয়ে বইতে হবে। সাতপাঁচ ভাবনা খেলছে মনের ভেতর।

বাড়ির ভেতর পা রাখতে চোখের পানি আর আটকে রাখতে পারল না। দাদার রেখে যাওয়া ঘরটা মাটিতে ল্যাপ্টে পড়ে আছে। বাবার মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। পৃথিবীর সমস্ত অসহায়ত্ব বাবার চোখে দেখা যাচ্ছে। বাবার হাসিখুশি মুখটায় যে অমাবস্যা লেগে আছে। ঊষার বাবাকে জড়িয়ে ধরল।

‘বাবা, ছেলে হয়েও তোমার দুঃসময়ে আমি তোমার পাশে দাঁড়াতে পারছি না….’ এই বলে কান্নায় ভেঙে পড়ল।

রহিম মিয়া, ছেলেকে সান্ত¡না দিয়ে বলতে থাকে, ‘চিন্তা করিস না বাজান। আল্লাহ যা করে মঙ্গলের জন্যই করে।’

সব ঠিক হয়ে যাবে।

:: কুয়ালালামপুর, মালয়েশিয়া

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj