আমেরিকায় সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক সম্মিলনের অভিজ্ঞতা

শনিবার, ২০ মে ২০১৭

আমেরিকা বেড়াতে আসার আগে স্থির করেছিলাম, এখানকার বাঙালি সমাজকে খুব ভালোভাবে দেখব। পরিচিত, আত্মীয়স্বজন এই বিশাল দেশে যে কত, তা হিসাব করে শেষ করা যাবে না। ষাটের দশকে আমরা যখন বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে আমাদের জাতীয় স্বাধিকার ও গণতন্ত্রের জন্য পাকিস্তানের সামরিক সরকারের সহযোগী মার্কিন সা¤্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছি, তখন সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে প্রবল সা¤্রাজ্যবাদবিরোধী মনোভাব থাকলেও উচ্চ শিক্ষার্থে ইংল্যান্ড যাওয়ার চাইতে আমেরিকায় যাওয়ার ঝোঁক বেড়ে যায়। কেননা ‘নতুন দুনিয়া’ আমেরিকা ইতোমধ্যে প্রমাণ করে ফেলেছে, দেশটি অর্থ ও অস্ত্রের প্রতিপত্তি বা শিক্ষাদীক্ষায়ই কেবল এক নম্বর নয়, ‘সব পেয়েছির দেশ’ আমেরিকাই। আমাদের মুক্তিযুদ্ধে আমেরিকা বিরোধিতা করার পরও এই দেশে আসা মানুষের সংখ্যা কমেনি। বরং অব্যাহতভাবে বেড়েছে এবং এই কাফেলায় শিক্ষিতদের সঙ্গে অন্যরাও যুক্ত হয়েছেন। তাদের পরবর্তী প্রজন্ম অর্থাৎ ছেলেমেয়ে, নাতি-নাতনিরাও কেউবা পড়ছে, চাকরিও করছে।

ফলে বাংলাদেশের বাঙালি সমাজ এখানে গড়ে উঠেছে। এই সমাজের জীবনাচরণের গতিপ্রকৃতি প্রত্যক্ষ করার একটা অদম্য ইচ্ছা আসার আগে থাকাটা ছিল স্বাভাবিক। স্বদেশে আমরা যারা আছি, তারা তো চাইবই, আমেরিকান সমাজের মূলধারার ¯্রােতের টান থাকা সত্ত্বেও প্রবাসী বাঙালিদের বাঙালিয়ানা যেন প্রজন্মের ধারাবাহিকতার মধ্যে যথাসম্ভব বজায় থাকে। এটা কে না জানে যে, মূলধারার ¯্রােতের টান দেশ-কাল নির্বিশেষে প্রবল। এই টান কতটা প্রবল, তা গভীর মনোযোগের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পাব, এমনটাই ভেবে এসেছিলাম। কেননা আমেরিকা থাকাকালীন প্রথম পর্যায়ে নিউইয়র্ক, নিউজার্সি, বাল্টিমোর, ভার্জিনিয়া, কানসাস, আরকানসাস প্রভৃতি জায়গায় যখন ঘুরব, তখন হোটেল নয়, প্রবাসী আত্মীয়-বন্ধুদের বাড়িতে থাকব। প্রসঙ্গত বলি, আমরা যখন আমেরিকা ভ্রমণের প্রোগ্রাম ঠিক করি, তখন নিউইয়র্ক থেকে পারিবারিক বন্ধু, সাবেক বিমানচালক, সংস্কৃতিমনা রহমান লতিফ এবং ভার্জিনিয়া থেকে আমার কাকা, আর্ট কলেজের সাবেক ছাত্র, সুগায়ক সুরঞ্জন দত্ত ও সংস্কৃতমনা কাকিমা ছায়া দত্ত দুটো তারিখ সুনির্দিষ্ট করে দিয়ে বললেন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতেই হবে। আমাদের এমনই সৌভাগ্য যে, ওই দুই তারিখ ঠিক রেখে বেড়ানোর প্রোগ্রাম করে নিতে একটুও অসুবিধা হলো না।

এদিকে আমেরিকা আসার পর একটি রাজনৈতিক সমাবেশে থাকার সুযোগও মিলে গেল। আমেরিকার আরকানসাসের ফেইটভিলে এসেই টেলিফোনে কথা হলো, নিউইয়র্কে বসবাসরত রাজনৈতিক বন্ধু সাবেক কমিউনিস্ট নেতা চট্টগ্রামের খোরশেদুল ইসলাম, অনুজপ্রতিম বন্ধু হবিগঞ্জের সাবেক ছাত্রনেতা কাসেম আলী এবং প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, পরিবেশবিজ্ঞানী ড. নজরুল ইসলামের সঙ্গে। তারা তখন ছিলেন উদীচীর অনুষ্ঠানে। কথোপকথনের মধ্যে ওনারা জানিয়ে দিলেন, ছাত্র ইউনিয়নের ৬৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন উপলক্ষে সমাবেশের তারিখ এবং তাতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকতে হবে। ১৮ এপ্রিল থেকে ১১ মে। ২৩ দিনের প্রথম পর্যায়ের আমেরিকা ভ্রমণের মধ্যে তাই তিন তিনটা প্রবাসী বাঙালিদের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার সুযোগ এসে গেল। অনুষ্ঠানগুলোতে উপস্থিত থাকায় প্রবাসীদের জীবনযাপনের গতিপ্রকৃতি বুঝতে যথাসম্ভব সহজ হয়েছে। তবে অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি নিয়ে কিছু বলার আগে প্রথমেই বলে নিতে হয়, অনুষ্ঠানগুলোতে উপস্থিত থেকে আমি অভিভূত।

দুই.

২৮ এপ্রিল। নিউইয়র্কের প্রথম সকাল। রোদ ঝলমলে। গাছে গাছে নতুন পাতা। ফুলে ফুলে সুশোভিত। নানা রঙে রাঙানো প্রকৃতি। চা-নাশতা খেতে খেতে গৃহকর্তা লতিফভাই বললেন, যাবেন নাকি আমাদের রঙ্গমেলার অনুষ্ঠানের রিহার্সেল দেখতে। এককথায় রাজি হয়ে গেলাম। রিহার্সেলে যারা যান, সবাই বাসা থেকে কিছু না কিছু খাবার নিয়ে যান। এমনটাই সাধারণভাবে রেওয়াজ। লতিফভাই নিজ হাতে বানানো এক বাক্স রসগোল্লা নিলেন। দেশে থাকলে তিনি রসগোল্লা বানানো শিখতেন বলে মনে হয় না। প্রসঙ্গত, সকালের নাশতায় নতুন প্রজন্মের বাঙালি লতিফভাইয়ের জামাই পাভেলের বানানো রসমালাই পরিবেশন করা হলো। পরে উল্লিখিত স্থানগুলোতে বেড়ানোর সময় দেখলাম, ঘরে ঘরে রসগোল্লা বানানো হচ্ছে। দেশে আমরা কিনি দোকান থেকে আর প্রবাসে ওরা সব ধরনের মিষ্টি বানায়। বিষয়টা আমরা খুবই উপভোগ করলাম। পরে মনের আনন্দে রিহার্সেলের স্থান অভিমুখে রওনা দিলাম। হেঁটে পাঁচ মিনিটের পথ।

ফরিদা-সোবহান দম্পতির বাসায় উপস্থিত হয়ে প্রথমে কিছুটা বিব্রত হয়ে ভাবলাম, এত সাজানো-গুছানো বাসা! কোথায় হবে রিহার্সেল? আরো কোনো স্থানে কি যেতে হবে? কিন্তু না! লতিফভাই আমাদের সিঁড়ি দিয়ে মাটির নিচের বেইজমেন্ট ফ্লোরে নিয়ে এলেন। এটা ‘রঙ্গালয়’ প্রতিষ্ঠানের অফিস ও রিহার্সেলের স্থান। উপযুক্ত বটে! সুন্দর করে সাজানো। ব্যাকসিনসহ স্টেজ, সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র, ছোট জায়গায় ব্যবহারের জন্য মাইক, চেয়ার, খাবার ব্যবস্থা প্রভৃতি সব আছে সেখানে। কোনো শব্দ না করে আমরা চেয়ারে গিয়ে বসলাম। প্রথম ধাক্কাতেই শিল্পীদের গান ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার দেখে আমরা অবাক।

সঙ্গীত পরিচালনা ও পরিকল্পনা করছেন ডাকসুর সাবেক নির্বাচিত সাংস্কৃতিক সম্পাদক সুনামগঞ্জের সুপ্রিয়া চৌধুরী। কোরাসের লিডও দিচ্ছেন তিনিই। তবে ভালো লাগল এই দেখে যে, রিহার্সেলের পরিবেশটা বেশ গণতান্ত্রিক। অনুষ্ঠান ভালো করার জন্য প্রয়োজন বুঝে সবাই মতামত দিচ্ছেন। কিছুক্ষণ যেতেই বুঝে উঠতে অসুবিধা হলো না, প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সভাপতি ও সহসভাপতি বাড়ির মালিক দম্পতি। বাসার পুরো বেইজমেন্ট ফ্লোর তারা ছেড়ে দিয়েছেন। আর পুরো অনুষ্ঠানের পরিকল্পক, সমন্বয়ক ও গ্রন্থক হচ্ছেন সংগঠনের সম্পাদক প্রকৌশলী ড. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম। এক সময় সবার সঙ্গে পরিচয় হলো। উপস্থিত সবাই সংগঠন অন্তঃপ্রাণ। অনুষ্ঠান সফল করার জন্য দায়দায়িত্ব সবই ভাগ করা রয়েছে। প্রবাসে বাঙালি সংস্কৃতি রক্ষা ও চর্চা এবং বাঙালি জাতিসত্তা ঊর্ধ্বে তুলে ধরার জন্য সবাই সময় দিচ্ছেন এবং বেশ সিরিয়াস।

পরদিন লতিফভাই আমাকে প্রাতঃভ্রমণ শেষে নিয়ে গেলেন অনুষ্ঠানস্থলে। আমরাই প্রথমে গেলাম সেখানে। একটা চার্চের অডিটরিয়াম। ব্যাকসিন লাগানো রয়েছে। করেছেন সংগঠনেই একজন মহিলা। পেশায় আর্কিটেক্ট। তিনি গানেরও শিল্পী। ইতোমধ্যে ভলেন্টিয়াররা সব একে একে আসছেন। কাজ করছেন। সবাই উচ্চশিক্ষিত ও বড় চাকুরে। বাংলাদেশে এমন মাপের ব্যক্তিরা ভলেন্টিয়ারগিরি করেন না। আমারও অনেক বছর পর ভলেন্টিয়ার হতে ইচ্ছা হলো। কিন্তু! আমি যে গেস্ট! তাই অকর্মণ্য হয়েই থাকতে হলো। এক সময় লতিফভাইসহ ফিরে এলাম বাসায় এবং রেডি হয়ে দ্রুতই আবার চলে গেলাম অনুষ্ঠানে।

মেলার মধ্যে অনুষ্ঠান। সকাল থেকে শুরু হয়ে রাত পর্যন্ত চলবে। বিশাল হলরুমে স্টেজের সামনে চেয়ার পাতা। তারপর একটু ফারাক ও আড়াল রেখে বসেছে দোকানপাট। কাপড়, প্রসাধনী দ্রব্য ও অলঙ্কার সবই আছে। দাম নাকি সস্তা, কেনাকাটাও নাকি হয় প্রচুর। ক্রমে দর্শকরা আসতে শুরু করেছেন। প্রথমেই হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। মোমবাতি প্রজ¦ালন ও ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে হল চত্বরে এই শোভাযাত্রায় অংশ নিলাম। শোভাযাত্রার পরিসর ছোট, মানুষজনও কম, কিন্তু তাৎপর্য এর বিশাল। ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ^সংস্কৃতির অংশ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর প্রথম পালিত প্রবাসের এই শোভাযাত্রায় অংশ নিতে পেরে মনটা আবেগে পরিপ্লুত হয়ে উঠল। দেশে দেশে এই শোভাযাত্রা হতে পারে বাংলা ও বাঙালির পরিচয়ের স্মারক। একদিন এই শোভাযাত্রা আন্তর্জাতিক রূপ নেবে বলে মনে হলো। কেননা এর মধ্যে রয়েছে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অংশ নেয়ার সুযোগ, তেমনি রয়েছে সর্বজন মঙ্গলের একান্ত কামনা। অনুষ্ঠানের শুরুটা এমন হওয়ায় সংগঠনের উদ্যোক্তাদের প্রতি মনটা কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠল।

সুদীর্ঘ সময় ধরে চলা এই অনুষ্ঠানের কয়েকটা দিক খুবই মনে রাখার মতো। প্রথমত প্রাণবন্ত সম্মিলন। অনুষ্ঠান চলার মধ্যে প্রবাসী অনেকের সঙ্গে আলাপ পরিচয় হলো। খাওয়াও চলল। সঙ্গে গান আর নাটক দেখা। একঘেয়ে লাগার কোনো সুযোগ নেই এই মিলনমেলায়। দ্বিতীয়ত নতুন প্রজন্মের কথা, চালচলন প্রভৃতি সব আমেরিকানদের মতো। কিন্তু অনুষ্ঠানের সব ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ রয়েছে। শাড়ি, পাঞ্জাবি পরছে কম বয়সের ছেলেমেয়েরা। গানেও ওরা অংশ নিল। প্রবাসে মূলধারার তীব্র ¯্রােতের টান সত্ত্বেও ওরা যদি আমাদের জাতিসত্তা ও সংস্কৃতি তুলে ধরার ক্ষেত্রে যথাসম্ভব ভূমিকা রাখতে পারে, তবে তা হবে আমাদের জাতিরাষ্ট্রের জন্য বড় এক পাওনা। তৃতীয়ত রঙ্গমেলা অনুষ্ঠান করতে খুবই অভিজ্ঞ। এই প্রতিষ্ঠানটি ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে অনুষ্ঠান করেছে সর্বমোট ৫২টি। এ বছর এপ্রিল পর্যন্ত অনুষ্ঠান করেছে ১০টি। এই সংখ্যাটা দেশের যে কোনো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য ঈর্ষণীয় হতে পারে। অনুষ্ঠানের সঙ্গে অর্থের সম্পর্ক চিরদিনের। অনুষ্ঠান করতে অর্থ এখানে তেমন যে সমস্যা নয়, এটা বুঝতে অসুবিধা হয় না। আছে অর্থ আর সঙ্গে প্রবল ইচ্ছা। প্রবাসী বাঙালিরা যে আমাদের সংস্কৃতি রক্ষা ও প্রসারের ক্ষেত্রে প্রভূত ভূমিকা রাখতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা চলে। আমাদের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, সাংস্কৃতিক সংগঠন এসব সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা দরকার বলে মনে হলো।

অনুষ্ঠানের শেষে প্রচণ্ড এক ভালোলাগার ঘোরের মধ্যে দুটো বিষয় মনে এলো। সমালোচনার জন্য নয়, তবে কথাগুলো উদ্যোক্তাদের ভেবে দেখতে বলি। প্রথমত অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার আগে এবং অন্য গানের সঙ্গে মিলিয়ে হঠাৎ করে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়াটা একেবারেই ভালো লাগেনি। দেশের স্বনামধন্য গায়ক ফেরদৌস ওয়াহিদের গানের পর সবাই মিলে জাতীয় সঙ্গীত গাইলে তা যথাযথ হতো। অনুষ্ঠান শেষে যখন বিদায় নিচ্ছি তখন এক দিকে ফেরদৌস ওয়াহিদের ‘এমন একটি মা দে না…’ গানটা তখন কানে বাজছিল আর অন্যদিকে মনে পড়ছিল হাওর অঞ্চলের বানভাসী মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা। প্রকৃত অর্থেই বাংলা মায়ের সন্তানেরা হাসি-কান্নার মধ্যে আছে। কোনটা বেশি? তা প্রবাসের এই অনুষ্ঠান শেষে ভেবে ক‚লকিনারা পেলাম না। (অসমাপ্ত)
বাকি অংশ পড়ুন আগামীকাল

শেখর দত্ত : রাজনীতিক, কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj