দেশজুড়ে জঙ্গি আস্তানা ও নেপথ্যের খলনায়করা

শনিবার, ২০ মে ২০১৭

গোটা দেশজুড়ে বিভিন্ন স্থানে জঙ্গিবাদী আস্তানার সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। এই যে ক্রমবর্ধমান জঙ্গিবাদী তৎপরতা- এর বিনিফিসিয়ারি কারা? এসব ঘটনার নেপথ্যে কাদের হাত? বিষয়গুলো নিয়ে ভাবা দরকার। আমাদের সামনে একটি দীর্ঘ প্রশ্ন। উত্তর অনেকে জানেন। কেউ জেনেও না জানার ভান করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতিপক্ষ কে? বিষয়টি নিয়ে প্রজন্মকে ভাবা দরকার।

এই দেশে অনেক কিছুই হতে পারত। হয়নি। এর প্রধান কারণ রাজনৈতিক অস্থিরতা। এমন অশান্তি এই জাতি চায়নি। তারপরও আজ বাংলাদেশ জ্বলছে জঙ্গিদের বোমায়। চারদিকে হায়েনার ফণা। হ্যাঁ, দায় নিয়েই চলেছে বাঙালি জাতি। কালের আবর্তনে হারিয়ে গেছে অনেক কথা। অনেক স্মৃতি। তারপর বেইমানি করেছে রাজনীতিকরা। কথা দিয়েও রাখেনি তারা। বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় গিয়ে অনেক ডকুমেন্টস নষ্ট করেছে। তারা তা করবে এটা অজানা ছিল না। কিন্তু যাদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল, তাদের পশ্চাৎপদতা ছিল চোখে পড়ার মতো। চৌধুরী মইনুদ্দীন এখন লন্ডনের বাসিন্দা। আশরাফুজ্জামান খান নিউইয়র্কের বাসিন্দা। এই দুজনই বুদ্ধিজীবী হত্যার অন্যতম সহযোগী। এদের নাম আছে ঘাতক-দালালদের তালিকায়। এরা পালিয়ে এসেছিল। এদের বিচারের রায় হয়েছে। আর রায়ের পর এরা বলেছে- তাদের কেউ স্পর্শ করতে পারবে না।

বাংলাদেশের রাজাকাররা তাদের ক্ষমতা পরীক্ষা অতীতে করেছে। এখনো করে যাচ্ছে। তা নতুন কিছু নয়। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস পাল্টে দেয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আছে তাদের। সে লক্ষ্যে তারা কাজ করছে। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক রাজনীতিকদের তারা কাজে লাগিয়েছে নিজেদের প্রয়োজনে। আবার ছুড়ে দিয়েছে। ব্যবহার করে ছুড়ে দেয়াই মওদুদীপন্থীদের হীনকর্ম। যারা ব্যবহৃত হয়েছেন তারা কেউই লজ্জিত হননি। আর সেরা রাজাকার, আলবদর কমান্ডাররা থেকে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

অতি সম্প্রতি একটা ঘটনা আমাদের চমকে দিয়েছে। ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে জাকাত ফান্ডের অর্থ ‘প্রধানমন্ত্রীর জাকাত তহবিলে দেয়ার সিদ্ধান্ত হলেও’ এখন তা অস্বীকার করছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। ইসলামী ব্যাংকের সহকারী ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ সাইদুল হাসান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘গত ১৩ মে অনুষ্ঠিত বোর্ড সভার বরাত দিয়ে ব্যাংকের জাকাত ফান্ড, শিক্ষাবৃত্তি, ইফতারের অর্থ ব্যয়, শীর্ষ নির্বাহীদের বদলি ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা সংক্রান্ত যেসব সংবাদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে তা বিভ্রান্তিকর। বলা হয়েছে- ‘ব্যাংকের জাকাত ফান্ডের ৪৫০ কোটি টাকা প্রধানমন্ত্রীর জাকাত ফান্ডে প্রদানের কোনো সিদ্ধান্ত বোর্ড সভায় গৃহীত হয়নি। এ ছাড়া ব্যাংকের ১৯ কোটি টাকার শিক্ষাবৃত্তিপ্রাপ্ত সুবিধাভোগীদের বিষয়ে খতিয়ে দেখা এবং সিএসআর সুবিধাভোগীদের তালিকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’ বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, ‘আসন্ন রমজানে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ব্যাংকের ১৩ কোটি টাকার ইফতার বিতরণের সিদ্ধান্ত হয়েছে মর্মে যে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে তাও সঠিক নয়।’ এর মতলব কী? ইসলামী ব্যাংকের প্রকৃত মালিক কারা, তা আমাদের অজানা নয়। তারা কি তাদের ফণা দেখাচ্ছে আবারো? ভাবা দরকার।

আমরা ভুলে যাইনি, খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি নিয়মিত স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে যেতেন। কুচকাওয়াজে সালাম নিতেন। দিবসগুলোতে তার বাণী পড়ত জাতি। তিনি বলতেন, ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের বিজয়, আমাদের স্বাধীনতা। বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এই দেশের সংবিধান আছে। আছে রাজনৈতিক ইতিহাস। ওই ইতিহাস তিরিশ লাখ শহীদ আর দুই লাখ নারীর ইজ্জতের বিনিময়ে লেখা। খালেদা জিয়া যখন ক্ষমতায় ছিলেন, একবারও এ নিয়ে কোনো কথা বলেননি। তার দোসরদের কেউ কেউ তা নিয়ে আড়ালে- আবডালে কথা বলেছে। তিনি দূরে থেকেছেন। এখন তিনি সরাসরি ফ্রন্ট লাইনে চলে এসেছেন। বলেছেন, একাত্তরে শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে! কিসের সেই বিতর্ক? কে করেছে বিতর্ক? একাত্তরের পরাজিত দালালরা? রাজাকাররা? ওদের কথাও শুনতে হবে বিজয়ী বাঙালি প্রজন্মকে? ২০১৫ এর জানুয়ারি-মার্চের কথা পাঠকের মনে আছে? কী করেনি বিএনপি-জামায়াতি মৌলবাদী জোট! জ্বালাও-পোড়াওয়ের খতিয়ানের হিসেব এখনো মেলাতে পারেনি বাংলাদেশ। তারপরও ওদের শিক্ষা হয়নি? তাদের কি বুঝতে বাকি এ দেশ মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের। এক কোটি তরুণ প্রজন্ম ভোট দিয়েই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জোটকে রাষ্ট্রক্ষমতায় বসিয়েছিল। আর বিএনপির নেতারা বলেছেন- যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে, ভালো হয়েছে। বিচারটি তারা করেননি কেন?

বাংলাদেশ আজ জেগে উঠছে। ‘সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলুন’ ¯েøাগানে, ব্যানারে মানুষ জেগে উঠছে।

গোটা বিশ্ব এখন মৌলবাদী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। আর বাংলাদেশে বিএনপিই জঙ্গিদের নেপথ্য সমর্থনকারী, তা বিভিন্নভাবে স্পষ্ট হচ্ছে। বিএনপি যদি এই অজগরদের কবল থেকে বের হতে না পারে- তাহলে তাদের হাতে ভোটের গণতন্ত্র সুরক্ষিত হবে এমনটি আশা করা যায় না। জঙ্গিবাদ মানবতার শত্রু। অথচ এই বিএনপির হাতেই লালিত হয়েছিল বাংলা ভাই, শায়খ রহমান প্রমুখ। এসব অনেক কাহিনীর পালের গোদাদের বিচার হওয়া দরকার। সমূলে উপড়ে ফেলা দরকার জঙ্গিবাদের বীজ। তা করতে আওয়ামী লীগ মানুষের আস্থা নিতে পরেছে ইতোমধ্যে। মনে রাখতে হবে ষোলো কোটি মানুষের দেশে মণিমুক্তামাখা শান্তির নহর কেউই বইয়ে দিতে পারবে না- যদি মানুষ সোচ্চার না হয়। মানুষকেই দাঁড়াতে হবে একাত্তরের চেতনায়। যে চেতনা আমাদের বিজয় এনে দিয়েছিল।

একটি গোপন সত্য আবারো উচ্চারণ করেছেন শেখ হাসিনা। তিনি তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের সভায় বলেছেন, স্বাধীনতার চার বছরের মাথায় বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের জন্য দলের ভেতরের মানুষরাই দায়ী ছিল। দেশের জনগণের ওপর বিশ্বাস থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কখনো হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার কথা ভাবতে পারেননি বলে জানিয়েছেন তিনি।

শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘অনেকেই তাকে সাবধান করেছিলেন; এ রকম একটা ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি বিশ্বাসই করেননি। আব্বা বলতেন, ‘না, ওরা তো আমার ছেলের মতো, আমাকে কে মারবে?’ তিনি বলেছেন, হত্যাকাণ্ডে যারা জড়িত ছিল, তাদের অনেকেই নিয়মিত ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে যাওয়া-আসা করত। প্রধানমন্ত্রী জানান, ‘ডালিম (শরিফুল হক ডালিম), ডালিমের শাশুড়ি, ডালিমের বউ, ডালিমের শালী ২৪ ঘণ্টা আমাদের বাসায় পড়ে থাকত। ডালিমের শাশুড়ি তো সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত, ডালিমের বউ তো সারাদিনই আমাদের বাসায়।’ নিজের ভাই শেখ কামালের সঙ্গে খুনি মেজর এ এইচ এম বি নূর চৌধুরীর মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রধান সেনাপতি কর্নেল আতাউল গণি ওসমানীর এডিসি হিসেবে কাজ করার কথাও বলেন শেখ হাসিনা। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘এরা তো অত্যন্ত চেনা মুখ।’ আরেক খুনি সৈয়দ ফারুক রহমান বঙ্গবন্ধুর তৎকালীন মন্ত্রিসভার অর্থমন্ত্রী এ আর মল্লিকের শালীর ছেলে। এরা খুব দূরের না। এরাই ষড়যন্ত্র করল।’

এই হলো বাংলাদেশে ষড়যন্ত্রের ইতিহাসের ধারাবাহিকতা। এরা এখনো বসে নেই। খন্দকার মোশতাকের প্রতাত্মারা সর্বত্র। এদের চিনে রাখতে হবে। শনাক্ত করতে হবে। জঙ্গিদের দমন, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল করতে চাইলে তাদের উৎপত্তি, বিস্তার, সক্ষমতা ও তৎপরতার কৌশল সম্পর্কে ভালো করে জানতে হবে। জঙ্গিবাদ কাজ করে দুটি স্তরে। প্রথম স্তর বা ম্যাক্রো লেভেলে ধর্মাশ্রয়ী রাজনৈতিক মতাদর্শের ওপর ভিত্তি করে তারা কথিত জেহাদে উদ্বুদ্ধকরণ, প্রশিক্ষণ ও অর্থায়নের ব্যবস্থা করে। জঙ্গিদের শিকড় এখানে প্রোথিত। এই স্তরে জঙ্গিদের সহায়ক ফ্যাক্টর বা উপাদান হিসেবে কাজ করছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির চরম বিভাজন পরিস্থিতি, বৈশ্বিক জঙ্গি পরিস্থিতির প্রভাব এবং বাংলাদেশের ভেতরে জঙ্গি তৎপরতায় পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সরাসরি অংশগ্রহণ। ম্যাক্রো স্তরে জঙ্গি বিস্তারে আরো সহায়ক ভূমিকা রাখছে দুর্নীতি, সুশাসনের অভাব, শিক্ষাব্যবস্থার অসারতা, মাদ্রাসা শিক্ষার পশ্চাৎপদতা ও অন্ধত্ব, দারিদ্র্যতা, বেকার সমস্যা ইত্যাদি।

আমরা দেখছি জঙ্গিবাদীদের বিরুদ্ধে পুলিশ অ্যাকশনে গেলে একটি মহল বলছে, দেশকে ‘পুলিশি রাষ্ট্র’ বানানোর পাঁয়তারা করা হচ্ছে। এরা কারা? তাদের চেনা দরকার। কী মতলবে তারা এমন কথা বলছেন? এসব হিসাব-নিকাশ দরকার। মানুষকে আর অন্ধ বানিয়ে রাখা যাবে না। মানুষ দাঁড়াবেই, সব জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে।

নিউইয়র্ক থেকে
ফকির ইলিয়াস : কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ