২০ মে রাষ্ট্রীয়ভাবে চা-শ্রমিক দিবস ঘোষণা ও সবেতনে ছুটির দাবি

শনিবার, ২০ মে ২০১৭

সালেহ এলাহী কুটি, মৌলভীবাজার থেকে : আজ শনিবার ২০ মে ঐতিহাসিক চা-শ্রমিক দিবস। ১৯২১ সালের এ দিনে ব্রিটিশদের অত্যাচার থেকে মুক্ত হতে প্রায় ৩০ হাজার চা-শ্রমিক নিজের জন্মস্থানে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা চালায়। এ সময় চাঁদপুরের মেঘনা ঘাটে গুলি চালিয়ে নির্বিচারে হত্যা করা হয় চা-শ্রমিকদের। যারা পালিয়ে এসেছিলেন তাদের আন্দোলন করার অপরাধে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়। এরপর থেকে চা-শ্রমিকরা ২০ মে দেশের ১৬৩টি বাগানে ‘চা-শ্রমিক দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছেন। দিবসটি রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপন ও স্বীকৃতির দাবি চা-শ্রমিকদের। কিন্তু ৯৬ বছরেও স্বীকৃতি পায়নি দিবসটি। অবসান হয়নি চা-শ্রমিকদের বঞ্চনার।

ব্রিটিশ কোম্পানি ১৮৫৪ সালে প্রথম সিলেটের মালিনীছড়ায় চা উৎপাদনের উদ্যোগ গ্রহণ করে। তাই ভারতের বিহার, মাদ্রাজ, উড়িস্যা, অন্দ্র প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে সুবিধাবঞ্চিত আদিবাসী ও দলিত শ্রেণির মানুষদের জমি ও কাজের নিশ্চয়তাসহ নানা স্বপ্ন দেখিয়ে নিয়ে এসেছিল বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের চা-বাগানগুলোতে কাজ করার জন্য। প্রলোভনের ফাঁদে তাদের জীবন আটকা পড়ে বাগানের লেবার লাইনে কুলি হিসেবে। সিলেট অঞ্চলের চা-বাগানে কঠোর পরিশ্রমে বাধ্য করা হতো নামমাত্র মজুরিতে। সারাদিনের খাটুনির পর এক বেলা খাবারো ঠিকমতো জুটতো না তাদের।

পাহাড় পরিষ্কার করে চা-বাগান করতে কত শ্রমিকের জীবন গেছে তার কোনো হিসেব নেই। এ ছাড়া ব্র্রিটিশদের অত্যাচার তো ছিলই। শোষণ-বঞ্চনা, নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে ১৯২১ সালের ২০ মে হাজার হাজার চা শ্রমিক বিদ্রোহ করে। অব্যাহত নির্যাতনের প্রতিবাদে সে সময়ের চা-শ্রমিক নেতা পণ্ডিত গঙ্গাচরণ দীক্ষিত, পূজারী দেওশরণ ও রামপ্রসাদ চৌ ‘মুল্লুকে চল’ (দেশে চল) আন্দোলনের ডাক দেন। কাছাড়, করিমগঞ্জ ও সিলেটের প্রায় ৩০ হাজার চা-শ্রমিক এক ঐতিহাসিক আন্দোলনের সূচনা করেন। রেললাইন ধরে পায়ে হেঁটে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার উদ্দেশে চাঁদপুরে মেঘনা নদীর স্টিমার ঘাটে যায় চা-শ্রমিকরা। ২০ মে রাতে জাহাজে ওঠার চেষ্টা করলে বাধা দেয় শাসক শ্রেণি। শত শত চা-শ্রমিক বাধা উপেক্ষা করে নিজ জন্মস্থানে চলে যেতে চায়। বাগান মালিকদের নির্দেশে তখন গুর্খা সৈন্যরা চা-শ্রমিকদের গুলি ছুড়ে হত্যা

করে। নিহতদের লাশ মেঘনা নদীতে ভাসিয়ে দেয় তারা। এ ঘৃণ্যতম ঘটনা ১ মে ১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটের ঘটনাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ঐতিহাসিক এ দিনটি চা-শ্রমিকদের কাছে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর সংগ্রামের চেতনার উৎস হয়ে আছে।

চা-শ্রমিকদের শ্রমে-ঘামে দেশের অর্থনীতির চাকা ঘুরলেও তাদের ভাগ্যের চাকা আগের মতোই স্থির। ৮৫ টাকা দৈনিক মজুরিতে সংসার চালাতে হয় তাদের। সংসারের ঘানি টানতে গিয়ে পড়ালেখা খুব বেশি হয়ে ওঠে না তাদের। দৈন্যতা এখনো তাদের নিত্যসঙ্গী।

চা-শ্রমিক নেতা ও টেংরা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য বিপ্লব মাদ্রাজীপাশী জানান, মেঘনা ঘাটে আসাম রাইফেলসের গুর্খা সৈনিকরা নির্মমভাবে চা-শ্রমিকদের হত্যা করে। এরপর যারা বেঁচে ছিলেন তারা নিরুপায় হয়ে বাগানে ফিরে আসেন। আন্দোলন করার অপরাধে যাতে ট্রেনে না চলতে পারেন তার জন্য সহজ-সরল শ্রমিকদের বাগানের নামাঙ্কিত একটি করে ট্যাগ লাগিয়ে দেয়া হয় শরীরে। সেই ট্যাগ দেখলেই শ্রমিকদের নামিয়ে দেয়া হতো। তিনি আরো বলেন, ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর ডাকে চা-শ্রমিকরা তীর-ধনুক নিয়ে যুদ্ধ করে। কিন্তু স্বাধীন দেশে এখনো চা-শ্রমিকরা ভূমির অধিকার থেকে বঞ্চিত। ৮৫ টাকা দৈনিক মজুরিতে সংসার চালাতে গিয়ে পড়ালেখা খুব বেশি হয়ে ওঠে না তাদের। দৈন্যতা এখানেও তাদের নিত্যসঙ্গী।

রতœা চা-বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি মন্টু রুদ্র পাল ভোরের কাগজকে বলেন, চা-বাগানের সূচনালগ্ন থেকেই যে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ব্রিটিশ মালিকরা বাগান পরিচালনা করত বর্তমানেও তার কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। বাজার দরের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ মজুরি থেকে চা-শ্রমিকরা আজও বঞ্চিত। উন্নত আবাসন, শিক্ষা, চিকিৎসার নামে চলছে প্রহসন। বিশুদ্ধ পানি, উন্নত পয়ঃপ্রণালি, মানসম্মত রেশন, নিরাপদ কর্ম-পরিবেশ কোনো কিছুই সন্তোষজনক নেই। বংশ পরম্পরায় চা-বাগানে বসবাস করলেও নেই ভূমির অধিকার।

কেন্দ্রীয় চা-শ্রমিক ফেডারেশনের আহ্বায়ক সত্য নাইডু জানান, দেশে ১৫৯ সম্প্রদায়ের ১৫ লাখ নৃতাত্তি¡ক চা-শ্রমিক আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকেরা কোটা সুবিধা পেলেও চা-শ্রমিকরা তা পায় না। নিজেদের ভাগ্য ফেরাতে লেখাপড়া ও চাকরি ক্ষেত্রে কোটা সুবিধা চায় চা-শ্রমিকরা। স্বাধীনতার ৪৭ বছরে এখনো চা-শ্রমিকদের জীবনমানের কোনো উন্নয়ন ঘটেনি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থানের মৌলিক চাহিদা এখনো পূরণ হয়নি। অবিলম্বে চা-শ্রমিকদের চুক্তি নবায়ন, দৈনিক মজুরি ৩০০ টাকা, রেশন সাপ্তাহিক ৫ কেজি, প্রতি মাসে ২ কেজি চা-পাতা, ২০ মে রাষ্ট্রীয়ভাবে চা-শ্রমিক দিবস ঘোষণা এবং ওই দিন সবেতনে ছুটি বাস্তবায়নেরও দাবি জানান তিনি।

চা শ্রমিকদের রক্তে, ঘামে, শ্রমে সৃষ্ট নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের চা-বাগান। কিন্তু যাদের হাড়ভাঙ্গা খাটুনিতে এ শিল্পের উন্নতি, তারা যুগ যুগ ধরে অধিকার থেকে বঞ্চিত। চা-শ্রমিকদের পূর্বপুরুষদের মুলুøকে ফেরা আন্দোলনকে স্মরণ রাখতে দিনটিকে সরকারি ছুটি ঘোষণাসহ অবহেলিত চা-শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবিসহ ২০ মের চেতনা পৃথিবীর অন্য ঐতিহাসিক দিনের তাৎপর্যের চেয়ে কোনো অংশে কম নয় বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আবু জাফর আহমদ।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj