বাতিল হলো অগ্রণী ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষা : প্রশ্নপত্র ফাঁসের মূল হোতাদের চিহ্নিত করা যাচ্ছে না

শনিবার, ২০ মে ২০১৭

কাগজ প্রতিবেদক : পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ হবে কবে? এ নিয়ে আর কত অপেক্ষার যেন শেষ নেই। এ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে বিভিন্ন মহলে। আর যে কোনও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রকৃত মেধাবীরা বরাবরই বঞ্চিত, এ অভিযোগ তো নতুন নয়। প্রশাসনের কিছু পুরনো বক্তব্যকে শান্তনা মনে করে ফিরে যেতে হয় বার বার করে চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়া প্রকৃত মেধাবীদের। এভাবেই পার হয় বছরের পর বছর। এরই মধ্যে হঠাৎ করে কখন যে প্রার্থীদের নির্দিষ্ট বয়স পার হয়ে যায়, তা নিয়ে কোনও মাথাব্যাথা নেই কারো। এ অপেক্ষার নিরসন যেন কিছুতেই ঘটছেই না।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক সার্টিফিকেটসহ বিভিন্ন চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র একের পর এক ফাঁস হলেও এর মূল হোতারা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে যে কোনো নিয়োগ পরীক্ষাসহ পাবলিক পরীক্ষায় নিয়মিত প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে রুটিন মাফিক প্রশ্ন ফাঁস হলেও মূল হোতাদের চিহ্নিত করতে পারেনি পুলিশ ও প্রশাসন।

তবে, পুলিশ ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে বিজি প্রেস অথবা প্রত্যেক সেন্টার সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে পরীক্ষা শুরু হওয়ার ঘণ্টা খানেক আগে প্রশ্নপত্রের ছবি মুঠোফোনে তুলে ভাইভার, হোয়াটস অ্যাপসহ বিভিন্ন অ্যাপসের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। ফলে প্রশ্নপত্র মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকের নির্ধারিত কিছু আইডিতে। কিন্তু কোথা থেকে ফাঁস হচ্ছে, তা বের করতে পারছেন না তারা। অন্যদিকে একের পর চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রার্থীরা। সর্বশেষ গতকাল প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ওঠার পর অগ্রণী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পদে নিয়োগ পরীক্ষার বিকালের অংশের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। দুই ভাগে হওয়া এই পরীক্ষার দ্বিতীয় ভাগের প্রশ্ন সকাল ১০টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত প্রথম ভাগের পরীক্ষা শুরুর আগেই একটি পত্রিকার অনলাইন সংস্করণে প্রশ্ন ফাঁসের খবর প্রকাশ পায়। ফেসবুকেও ‘ফাঁস হওয়া প্রশ্নের’ ছবি দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রার্থীরা। পরে দ্বিতীয় অংশের পরীক্ষা স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ। তবে কিভাবে প্রশ্ন ফাঁস হলো সে বিষয়ে তাদের কিছু জানা নেই বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

রবি ইসলাম নামের এক চাকরি প্রত্যাশী বলেন, বৃহস্পতিবার রাত থেকেই শুনছিলাম প্রশ্ন নাকি ফাঁস হয়েছে। সকালে হলে ঢোকার আগে দেখি প্রশ্ন দেখে দেখে উত্তর মুখস্ত করছে। পরে পরীক্ষার হলে প্রশ্ন পাওয়ার পর দেখি ফাঁস হওয়া প্রশ্নের হু বহু মিল। এভাবে চলতে থাকলে প্রকৃত মেধাবীরা চাকরি থেকে বঞ্চিত হবেন। এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে জড়িত মূল হোতাদের আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি জানান তিনি। এর আগে, গত ২১ এপ্রিল জনতা ব্যাংকের নির্বাহী কর্মকর্তা পদে লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়।

গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর রেলের ট্রেড অ্যাপ্রেনটিস পদে প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়। এদিকে, সাম্প্রতিক সময়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেশ তৎপরতার সঙ্গে অভিযান শুরু করে। অভিযানে গ্রেপ্তার হতে থাকে কলেজ অধ্যক্ষ, স্কুল শিক্ষক থেকে শুরু করে কোচিং সেন্টারের মালিকরা। এমনকি অনেক কেন্দ্রের সামনে শিক্ষক দিয়ে প্রশ্ন সমাধান করার সময়েও হাতেনাতে গ্রেপ্তারের চিত্র দেখা গেছে। কিন্তু তারা গ্রেপ্তারের পরেও রহস্যজনক কারণে মূলহোতারা গ্রেপ্তার হচ্ছে না। ফলে প্রশ্ন ফাঁসও থামছে না। এদিকে এ সমস্যা সমাধানে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ‘ডিজিটাল’ ব্যবস্থায় প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করে পরীক্ষার দিন সকালেই স্থানীয়ভাবে প্রশ্নপত্র ছেপে পরীক্ষা নেয়ার পরিকল্পনা করলেও তা কবে বাস্তবায়িত হবে তা এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, গত মঙ্গলবার রাতে রাজধানীর শাজাহানপুর ছাড়াও গাজীপুর ও নরসিংদী থেকে পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে চক্রের পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা শ্রীপুর রহমত আলী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক আশরাফুল ওরফে আশরাফসহ অন্তত ২০ জনের কাছ থেকে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করার কথা স্বীকার করে। প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে নয় ফাঁস হওয়া প্রশ্ন সমাধানের সময় গত ১২ এপ্রিল আটক হন এক শিক্ষক ও এক শিক্ষার্থী। গত ৩ মার্চ বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগে কলেজ অধ্যক্ষসহ ২ চক্রের ৯ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি এসএসসি পরীক্ষার ভুয়া প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। এসব চিত্রই বলে দেয় প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে কত বড় একটি চক্র কাজ করছে। তবে কাদের ইন্ধনে তারা এসব কাজ করেছে তাদের চিহ্নিত করতে পারছে না আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী। সম্প্রতি মোবাইল অ্যাপে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে গ্রেপ্তার হন এ এম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে সাভার উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শাহরিয়ার মেনজিশের নাম আসলেও তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের এআইজি (মিডিয়া এন্ড পিআর) সোহেলি ফেরদৌস বলেন, প্রশ্ন ফাঁস চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে যারা গ্রেপ্তার হন তারা নিজেরাও জানেন না আসলে কারা তাদের দিয়ে কাজগুলো করাচ্ছেন কারা। ফলে মূল হোতাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয় না।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার আবদুল বাতেন বলেন, প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার অভিযোগ ওঠার পর থেকেই আমরা গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছি। এতদিনে যারা গ্রেপ্তার হয়েছেন তাদের দেয়া তথ্য মতে আমাদের ধারণা বিজি প্রেস অথবা পরীক্ষার হলে পৌঁছানোর সময় প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে। পরীক্ষার আগের দিন কিভাবে প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে এমন প্রশ্নে উত্তরে বলেন, একটি চক্র আছে যারা ভুয়া প্রশ্ন পরীক্ষার আগের দিন আসল প্রশ্ন হিসেবে বিক্রির চেষ্টা করে। আমরা বিষয়টি নিয়ে কাজ করছি। এখনকার মূল টার্গেটই মূল হোতাদের গ্রেপ্তার করা। আশা করি, প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত সকলকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ