রেলওয়ের চলমান ৪৩টি প্রকল্পের মধ্যে প্রায় অর্ধেক প্রকল্পের অবস্থাই নাজুক

শনিবার, ২০ মে ২০১৭

আছাদুজ্জামান : আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থাৎ দ্বিতীয় মেয়াদে ২০১১ সালে রেলওয়ের জন্য ৭০টি মিটারগেজ ডিজেল ইলেকট্রনিক লোকোমোটিভ সংগ্রহের প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়েছিল । সর্বশেষ এই প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছিল চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন ২০১৪ সালের দ্বিতীয় দফা দরপত্র আহ্বানের পর অগ্রগতি খুব একটা হয়নি। অথচ ইতোমধ্যে কেটেছে পাঁচ বছর পেরিয়ে ছয় বছর। রেলওয়ের গত বছরের এক প্রতিবেদনে প্রকল্পের অল্পসংখ্যক কাজ শেষ হয়েছে ও বাকি সব প্রকল্পের কাজ চলমান বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ যোগাযোগ খাতের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম রেল বিভাগ। এর উন্নয়নে চলমান ৪৩টি প্রকল্পের মধ্যে প্রায় অর্ধেক প্রকল্পের অবস্থা এমন নাজুক। বাকি প্রকল্পগুলোর মধ্যে বেশির ভাগই যথাসময়ে শেষ হয়নি। এক ভাগ কাজ হয়নি এমন প্রকল্পের সংখ্যা অন্তত ১২টি। ১০টির মতো প্রকল্প আছে যেগুলোর কাজ মেয়াদ শেষেও অর্ধেক হয়নি। সব মিলিয়ে রেলের উন্নয়ন প্রকল্পের কাজে গতি নেই এ কথা বলা যেতেই পারে। সময় যায়। কিন্তু কাজ শেষ হয় না। ঢিমেতালে চলছে উন্নয়ন কাজ। এর মধ্যে বেশির ভাগ প্রকল্পই শুরু হয় ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের মধ্যে। রেল মন্ত্রণালয়ের দাবি, ২০০৯ সাল থেকে ১৪ সাল পর্যন্ত ২৪টি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। এ ছাড়া ২০১৩ সালে রেলওয়ের উন্নয়নে ২০ বছর মেয়াদি মাস্টারপ্ল্যানও চূড়ান্ত করা হয়েছে। এসব প্রকল্প গুরুত্ব বিবেচনায় বাস্তবায়ন করা হবে। ইতোমধ্যে দেশের ৪৪টি জেলা রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হয়েছে। এ ছাড়া নানা জটিলতায় প্রকল্প বাস্তবায়নে কিছুটা বিলম্ব হলেও শেষ না হওয়ার কারণ নেই। সেই সঙ্গে দেশের ৬৪ জেলাকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনারও পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যে রেলের উন্নয়ন বরাদ্দ আগের চেয়ে দিগুণের বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রেল মন্ত্রণালয়ের সচিব ফিরোজ সালাহ উদ্দিন ভোরের কাগজকে বলেন, একেকটি প্রকল্পের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন জটিলতা। সব প্রকল্পে একই ধরনের সমস্যা হয় না। কোনো প্রকল্পে ব্যাংক লোন বা কাগজপত্র তৈরিতে বিলম্ব হয়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে অর্থ প্রাপ্তির বিষয়টিও সহজেই সমাধান হয় না। এ ছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জমি পাওয়া, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন দেশের বাইরে থাকা, মালামাল আনার ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা গেছে এ রকম সমস্যা মোকাবেলা করতে হচ্ছে। তবুও আমরা সব প্রকল্প গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নিয়ে কাজ করছি। পাশাপাশি অর্থ প্রাপ্তি নিশ্চিত হলে কাজ যথাসময়ে শেষ করতে প্রকল্প পরিচালকদের প্রতি নির্দেশনা আছে।

দেখা যাক কোন প্রকল্পের কি অবস্থা : বাংলাদেশ রেলওয়ে সেক্টর ইমপ্রæভমেন্ট প্রকল্পের আওতায় সিগন্যালিংসহ টঙ্গী-ভৈরব বাজার পর্যন্ত ডাবল লাইন নির্মাণকাজ প্রকল্পটি ২০০৬ সালের শুরুতে নেয়া হয়েছিল। কথা ছিল তা শেষ হবে ২০১৪ সালে। দুই দফা সময় বাড়িয়ে যা ২০১৭ সাল পর্যন্ত সর্বশেষ সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে গত বছরের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পের অবকাঠামোগত (ভৌত) অগ্রগতি প্রতিবেদনে শতভাগ কাজ শেষ হওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে! খুলনা রেলওয়ে স্টেশন ও ইয়ার্ড রি-মডেলিং ও বেনাপোল রেলওয়ে স্টেশনের অপারেশনাল উন্নয়ন প্রকল্পটি ২০০৭ সালের জুলাই মাসে শুরু হয়ে গত বছর শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। রেলওয়ের সর্বশেষ প্রতিবেদনে প্রকল্পের ৫৫ ভাগ অগ্রগতি দেখানো হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রকল্পের বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালক জানান, শিডিউল অনুযায়ী আমাদের কাজ চলছে। প্রকল্পের কাজ দ্রুত শেষ করার বিষয়ে ইতোমধ্যে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা জানান তিনি।

২০০৭ সালের জুলাই মাসে শুরু হয়েছিল ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ উন্নয়ন প্রকল্প, যা শেষ হওয়ার কথা ছিল গত বছর। এই প্রকল্পের পাহাড়তলী ওয়ার্কশপ উন্নয়ন ও কনসাল্টিং ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসেস ফর ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলওয়ে ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট এবং স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম এ দুটি প্রকল্প সময় বাজানো হলেও এখনো চূড়ান্তভাবে শেষ হয়নি। প্রকল্পের পাহাড়তলী ওয়ার্কশপের অগ্রগতি হিসেবে ডিপিপি পুনর্গঠন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এ কথা উল্লেখ আছে। বাকি দুটি প্রকল্পের ৫৬ ভাগ অগ্রগতির কথা বলা আছে।

লাকসাম ও চিনকী আস্তানার মধ্যে ডাবল লাইন ট্র্যাক নির্মাণ ২০০৭ সালে শুরু হয়ে মেয়াদ পেরিয়েছে এক বছর। তবুও শেষ হয়নি। সর্বশেষ প্রকল্পের অগ্রগতি প্রতিবেদনে ৮৯ ভাগ কাজ শেষ হওয়ার কথা উল্লেখ আছে।

রপ্তানি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, পাঁচুরিয়া-ফরিদপুর-ভাঙ্গা রেলপথ পুনর্বাসন ও নির্মাণ প্রকল্প ২০১৫ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখনো তা ঝুলে আছে। গত বছরের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি দেখানো হয়েছে ৯৩ ভাগ। প্রকল্পের বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভোরের কাগজকে জানান, পাঁচুরিয়া থেকে ফরিদপুর পর্যন্ত রেল যোগাযোগ তো আছেই। ফরিদপুর থেকে ভাঙ্গা পর্যন্ত মেজর কাজ শেষ হয়েছে।

দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে মিয়ানমারের কাছে গুনদুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্প ২০১০ সালের জুলাই মাসে শুরু হয়ে ইতোমধ্যে প্রায় ছয় বছর চলছে। ২০২২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এ প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হলেও কাজের অগ্রগতি নেই। এ প্রকল্পের মূল সমস্যা এডিবির অর্থায়ন। সর্বশেষ প্রকল্পের অগ্রগতি দেখানো হচ্ছে ১৬ ভাগ। প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ মকবুল আহমদ ইতোমধ্যে বদলি হয়েছেন। নতুন একজনকে প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া ঈশ্বরদী থেকে পাবনা হয়ে ঢালারচর পর্যন্ত ৭৮ কিলোমিটার নতুন রেললাইন নির্মাণ প্রকল্প ২০১০ সালের শেষদিকে শুরু হয়ে যা এখনো চলমান রয়েছে। যদিও গত বছর প্রকল্পের কাজটি শেষ হওয়ার কথা ছিল। গত বছরের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি দেখানো হয়েছে ৫৯ ভাগ। রেলওয়ের লাকসাম-চাঁদপুর সেকশনের পুনর্বাসন প্রকল্পের কাজ ২০১১ সালে শুরু হয়ে ১৭ সালের মাঝামাঝি শেষ হবে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রকল্পের অগ্রগতি খুবই কম। ২০১৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পের ৭৬ ভাগ অগ্রগতি দেখানো হয়েছে।

এ ছাড়া রেলওয়ে অ্যাপ্রোচসহ দ্বিতীয় ভৈরব ও দ্বিতীয় তিতাস সেতু নির্মাণ ২০১০ সালের শুরু হয়ে গত বছর শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি। এই প্রকল্প ২০১০ সালের ১১ নভেম্বর অনুমোদন দেয় একনেক। এরপর প্রায় ৬ বছর পেরিয়ে গেলেও ভারতীয় ঋণে নেয়া এ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়নি। ঋণের পরিবর্তে দেশটির দেয়া শর্তেও ভারে পুরো প্রকল্পই ডুবতে যাচ্ছে। বিষয়টি এরই মধ্যে ভারতীয় দূতাবাস এবং এক্সিম ব্যাংক অব ইন্ডিয়াকে জানানো হয়েছে। প্রকল্পের সর্বশেষ অগ্রগতি পাঁচ ভাগেরও কম।

খুলনা থেকে মংলা পোর্ট পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটি ২০১০ সালে শুরু হয়ে বা ২০১৮ সালে বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। যদিও কাজের অগ্রগতি নিয়ে খোদ প্রকল্প সংশ্লিষ্টরাই খুশি নন। ২০১৪ সালের প্রকল্পের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৬৮ ভাগ অগ্রগতির কথা। গত বছরের মার্চ পর্যন্ত প্রকল্পের সর্বশেষ অগ্রগতি দেখানো হয়েছে ২৩ ভাগ। রেলওয়ের জন্য ২৬৪টি এমজি কোচ ও দুটি বিজি ইন্সপেকশন কার সংগ্রহ প্রকল্প ইন্ডিয়ান ডলার ক্রেডিট লাইনের আওতায় এলওসি অনুমোদিত প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে।

চট্টগ্রামের ষোলশহর-দোহাজারী ও ফতেয়াবাদ-নাজিরহাট সেকশন পুনর্বাসন প্রকল্পের কাজ শেষ হবে ২০১৭ সালে। যদিও ২০১৪ সালে এ প্রকল্পের অগ্রগতি দেখানো হয়েছে ৭১ ভাগ। কুলাউড়া-শাহবাজপুর সেকশন পুনর্বাসন কাজটি ২০১১ সালের শুরু হলেও ২০১৭ সালে শেষ হওয়ার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। সর্বশেষ প্রতিবেদন প্রকল্পের কোনো অগ্রগতি দেখানো হয়নি।

এডিবির সেকেন্ড পিএফআরের আওতায় বাংলাদেশ রেলওয়ে সেক্টর উন্নয়নে তিনটি কাজ মেয়াদ অনুযায়ী চলতি বছরও শেষ হয়নি। এর মধ্যে একটি ১৪ ভাগ, একটি ৬ ভাগ ও অপরটি পাঁচ ভাগ অগ্রগতির কথা সর্বশেষ রেলওয়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। পূর্বাঞ্চলের চিনকী আস্তানা-চট্টগ্রাম সেকশনের ১১টি স্টেশনের বিদ্যমান সিগন্যালিং ব্যবস্থার প্রতিস্থাপন ও আধুনিককরণ প্রকল্প ২০১২ সালে শুরু হয়ে যা আগামী বছর শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে যথাসময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব নাও হতে পারে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের কাজ হয়েছে মাত্র ১৪ ভাগ। ঢাকা-টঙ্গী সেকশনের তৃতীয় ও চতুর্থ ডুয়েলগেজ লাইন এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর সেকশনে ডুয়েলগেজ লাইন নির্মাণ প্রকল্প চলতি বছরের শেষদিকে শেষ হওয়ার কথা আছে। কিন্তু প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রকল্পের কাজ ২০১২ সালে শুরু হলেও গতি কম। ২০১৪ সালের জুন মাসের রেলওয়ের প্রকল্পের অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের অনুক‚লে আহ্বানকৃত ইওআই যা এখনো মূল্যায়নাধীন। ২০১৬ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে শূন্য দশমিক ২৫ ভাগ।

২০১২ সালে শুরু হয়েছিল চিনকী আস্তানা-আশুগঞ্জ সেকশনের ক্ষয়প্রাপ্ত রেল সম্পূর্ণ নবায়ন এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজ। চলতি বছরের মাঝামাঝিতে তা শেষ হওয়ারও কথা ছিল। কিন্তু হয়নি। রেলওয়ের সর্বশেষ প্রকল্প অগ্রগতি প্রতিবেদনে এই প্রকল্পটির ৮৯ ভাগ কাজ শেষ হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ১০০ মিটারগেজ ও ৫০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী গাড়ি সংগ্রহের কথা রয়েছে আগামী বছরের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে।

তিন দফা টেন্ডারের পর

আশুগঞ্জ-আখাউড়া সেকশনের তিনটি স্টেশনের সিগন্যালিং ও ইন্টারলকিং ব্যবস্থার প্রতিস্থাপন ও আধুনিককরণ প্রকল্পের কাজ মেয়াদ শেষেও এখন পর্যন্ত কোনো কাজ হয়নি। প্রকল্পের পরিচালক চন্দন কান্তি দাশ ভোরের কাগজকে বলেন, চুক্তি অনুযায়ী ভারতের কোম্পানি দিয়ে কাজ করার কথা থাকায় প্রকল্পের কাজ শুরু করতে বিলম্ব হচ্ছে। তিনি বলেন, পরপর তিন দফা টেন্ডার আহ্বানের পর কোয়ালিফাইড কোম্পানি পাওয়া গেছে। এখন কাজ শুরু হবে। ইতোমধ্যে ভারত থেকে কিছু মালামাল আসছে।

২০১৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হয়েছিল ঈশ্বরদী-জয়দেবপুর সেকশনের চারটি স্টেশনে নবনির্মিত তৃতীয় লাইনগুলোকে কম্পিউটার বেজড ইন্টারলকিং ব্যবস্থার সম্প্রসারণ কাজ, যা মেয়াদ শেষেও সম্পন্ন হয়নি বলে জানা গেছে। প্রকল্পের সর্বশেষ অগ্রগতি শূন্য দশমিক ৩১ ভাগ। এ ছাড়া দর্শনা-ঈশ্বরদী সেকশনের ১১টি স্টেশনের সিগন্যালিং ব্যবস্থার মানোন্নয়ন কাজ ২০১২ সালের শুরুতে শুরু হয়ে চলতি বছরের জুলাই মাসে শেষ হওয়ার কথা। রেলওয়ের প্রকল্প অগ্রগতি প্রতিবেদনে ১৪ ভাগ কাজ শেষ হওয়ার কথা বলা আছে। প্রকল্প পরিচালক আবুল কালাম ভোরের কাগজকে বলেন, কাজের অগ্রগতি কতটুকু হয়েছে আমার জানা নেই।

আখাউড়া থেকে লাকসাম পর্যন্ত ডুয়েলগেজ ডাবল রেললাইন নির্মাণ এবং বিদ্যমান রেললাইনকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর প্রকল্প শেষ হবে ২০২০ সালে। গত বছরের মার্চে প্রকাশিত রেলওয়ের সর্বশেষ অগ্রগতি প্রতিবেদনে প্রকল্পের ১০ ভাগ কাজ শেষ হওয়ার কথা উল্লেখ আছে। প্রকল্পের পরিচালক রফিকুল আলমের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। ২০১৪ সালের জুলাই মাসে রেলওয়ের জন্য ১২০টি ব্রডগেজ যাত্রীবাহী ক্যারেজ সংগ্রহ প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছিল, যা চলতি বছরের শেষদিকে শেষ হতে পারে।

ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সেকশনে বিদ্যমান মিটারগেজ রেললাইনের সমান্তরাল একটি ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা আছে চলতি বছরের জুন মাসে। অথচ প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র দেড় ভাগ। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রকল্পের কাজ শেষ হতে সময় লাগবে আরো অন্তত কয়েক বছর। প্রকল্প পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান ভোরের কাগজকে বলেন, এখন পর্যন্ত প্রকল্পের দৃশ্যমান তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে কাজটি বিলম্ব হচ্ছে। তিনি জানান, এখন ফিজিক্যাল ডিজাইনের কাজ চলছে। আমানুরা বাইপাস রেললাইন প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা আগামী বছর। এ জন্য বরাদ্দ রয়েছে ১৩ কোটি ১৫ লাখ টাকা। এ প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল আট কোটি টাকা। ২০১৫ সালের শুরুতে প্রকল্পটি হাতে নেয়া হয়েছিল। সর্বশেষ কাজের অগ্রগতি মাত্র ৪১ ভাগ। তবে প্রকল্প পরিচালক মো. আসাদুল হক ভোরের কাগজকে জানান, ইতোমধ্যে প্রকল্পের অগ্রগতি হয়েছে বেশ। ৭০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে।

পশ্চিমাঞ্চলের জন্য ৫০টি এমজি ও ৫০টি বিজি যাত্রীবাহী ক্যারেজ পুনর্বাসন কাজ ২০১৪ সালে শুরু হয়ে ২০১৭ সালে শেষ হওয়ার কথা। চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত সর্বশেষ কাজের অগ্রগতি এক ভাগও দেখানো হয়নি। এ প্রসঙ্গে গত প্রকল্প পরিচালক নূর আহাম্মদ ভোরের কাগজকে বলেন, চুক্তি বিলম্ব হওয়ায় কাজ শুরু করতে সময় লেগেছে। ইতোমধ্যে ২১টি ব্রডগেজ (বিজি) ও ২২টি মিটারগেজের (এমজি) কাজ শেষ হয়েছে। আর্থিক অগ্রগতিও ভালো। সব মিলিয়ে ৪৩ ভাগ কাজ শেষ হওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় প্রকল্প সমাপ্তির সময় কম দেয়া হয়েছে। তবুও আগামী বছরের জুনের মধ্যে আশা করি ৯০ ভাগ কাজ শেষ হবে। তবুও যথাসময়ে কাজ শেষ করার চেষ্টা রয়েছে।

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের লেভেল ক্রসিং গেটগুলোর পুনর্বাসন ও মানোন্নয়ন কাজ শুরু হয় ২০১৫ সালে, যা চলতি বছরের মাঝামাঝিতে শেষ হতে পারে। পশ্চিমাঞ্চলের লেবেল ক্রসিং গেটগুলোর পুনর্বাসন ও মানোন্নয়ন কাজের খুব একটা অগ্রগতি নেই। হাইটেক পার্কের জন্য মির্জাপুর ও মৌচাক স্টেশনের মধ্যবর্তী কালিয়াকৈরে একটি ‘বি’ ক্লাস স্টেশন নির্মাণের কার্যক্রম ২০১৫ সালে শুরু হয়ে তা ২০১৯ সালে শেষ হওয়ার কথা আছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কাজের অগ্রগতি খুবই কম। লোকোমোটিভ রিলিফ ক্রেন এবং লোকোমোটিভ সিমুলেটর সংগ্রহের সময়সীমা ২০১৯ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হলেও কাজের অগ্রগতি নিয়ে খুব একটা আশাবাদী নন সংশ্লিষ্টদের কেউ।

নারায়ণগঞ্জ-জয়দেবপুর সেকশনের ওভারপাস ও আন্ডারপাস নির্মাণের জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা কার্যক্রম আগামী বছরের শেষদিকে শেষ হতে পারে। ১০০টি মিটার অনুঃগেজ যাত্রীবাহী ক্যারেজ পুনর্বাসন ২০১৫ সালের শুরু হলেও অগ্রগতি ভালো নয়। ২০২২ সালে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে, যা শুরু হয়েছে চলতি বছর। এ প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি খুব বেশি নয়।

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে রেলওয়ের ৪৩টি প্রকল্প দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে বিনিয়োগ ৩৪টি ও কারিগরি সহায়তা ৭টি ও জেডিসিএফ একটি। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মোট ৯ হাজার ১১৪ কোটি টাকারও বেশি বরাদ্দ হয়েছে। মোট বরাদ্দের জিওবি তিন হাজার ৫০০ কোটি টাকা। প্রকল্প সাহায্য নির্ধারণ করা হয়েছে পাঁচ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা। রেলওয়ের কর্তা ব্যক্তিরা বলছেন, এসব উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে রেলওয়ের গুরুত্ব ও অবদান বাড়বে। তেমনি সুষ্ঠু ও নিরাপদ রেল চলাচল নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

গত কয়েক দিন আগে এক অনুষ্ঠানে রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক বলেন, বাংলাদেশের সব জেলা রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হবে। রেলমন্ত্রী বলেন, খুলনা থেকে দর্শনা পর্যন্ত রেললাইন ডাবল লাইনে উন্নীত করা হবে। এতে রেল ভ্রমণে সময় কম লাগবে ও আরামদায়কও হবে। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে বিএনপি-জামায়াতের আমলে রেলের কোনো উন্নয়ন হয়নি। আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় আসে তখনই দেশে উন্নয়ন হয়। রেলওয়েতে আগে ৫ হাজার কোটি টাকার বাজেট ছিল। কিন্তু বর্তমানে সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা রেলের উন্নয়নে বরাদ্দ করা হয়েছে। রেলের এই উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নতুন রেললাইন নির্মাণ করা হবে।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj